অষ্টম খণ্ড।
(দ্বিতীয় ভাগ)
[No legible text]
প্রকাশক শ্রীসুবোধচন্দ্র মজুমদার। দেব সাহিত্য কুটীর প্রাইভেট লিঃ ২১, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা। সন ১৩৩৯ সাল
সপত্নব্যাখ্যানফলমাহ—তেনেতি। অসপত্নগুণকপ্রাণোপাসনে ফলবাক্যং প্রমাণয়তি—তত্রেতি। প্রাণস্যাসপত্বে সিদ্ধে সতীতি যাবৎ। প্রাসঙ্গিকত্বং প্রজোৎপত্তিপ্রসঙ্গাদাগতত্বম্ ॥ ৬৬। ১২॥
ভাষ্যানুবাদ।—এই যে, প্রাজাপত্য অন্নরূপে মন উক্ত হইল, দ্যুলোক হইতেছে ইহার শরীর অর্থাৎ কার্য্যস্বরূপ আশ্রয়, আর এই আদিত্য হইতেছে জ্যোতিঃস্বরূপ করুণ। আধ্যাত্মিক বা আধিভৌতিক মনের যাহা পরিমাণ, জ্যোতির্ময় করণস্বরূপ মনের আধাররূপে কল্পিত দ্যুলোকেরও ঠিক সেইরূপই পরি- মাণ; এবং তদাধেয় দ্যুলোকাশ্রিত প্রকাশময় করণস্বরূপ আদিত্যের পরি- মাণও তত্তুল্য; আধিদৈবিক বাক্ ও মনঃস্থানীয় সেই অগ্নি ও আদিত্য মাতা- পিতারূপে পরস্পরে সম্বন্ধ লাভ করিল—উভয়ে উপগত হইল; উদ্দেশ্য—আধ্যা- ত্মিক মন ও আধিদৈবিক আদিত্যরূপী পিতাকর্তৃক উৎপাদিত এবং বাক্স্থানীয় অন্নরূপা মাতাকর্তৃক প্রকাশিত হইয়া কর্ম্ম সম্পাদন করা; এইরূপ মনে করিয়া দ্যুলোক ও পৃথিবীর মধ্যে উভয়ে পরস্পর সম্মিলিত হইল। তাহাদেরই সংসর্গের ফলে স্পন্দনাত্মক কর্ম্ম করিবার জন্য প্রাণবায়ু উৎপন্ন হইল। যিনি জন্মিলেন, তিনি ইন্দ্র—পরমেশ্বর(পরম ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন), তিনি যে কেবল ইন্দ্রই বটে, তাহা নহে, পরন্তু অসপত্নও বটে—যাহার সপত্ন(শত্রু) নাই; সপত্ন কে? যে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রতিপক্ষরূপে উপস্থিত হয়, সেই দ্বিতীয় ব্যক্তিই ‘সপত্ন’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। সেই হেতু বাক্ ও মনের মধ্যে সদ্বিতীয়ভাব বিদ্যমান থাকিলেও তাহারা সপত্নভাব(প্রতিপক্ষতা) ভজনা করে না; দেহমধ্যে তাহারা যেরূপ প্রাণের অধীন, অধিদৈবতভাবেও তাহারা তদ্রূপ প্রাণের অধীনতা অবলম্বন করিয়া থাকে। এ বিষয়ে প্রসঙ্গাগত এই অসাপত্ন-বিজ্ঞানের এইরূপ ফল কথিত হই- তেছে যে, যিনি এই প্রকার যথোক্তরূপে প্রাণকে অসপত্ন বলিয়া জানেন, কেহ তাঁহার প্রতিপক্ষ বা শত্রু হয় না ॥ ৬৬ ॥ ১২ ॥
অথৈতস্য প্রাণস্যাপঃ শরীরং জ্যোতীরূপমসৌ চন্দ্রস্তদ্যাবা- নেব প্রাণস্তাবত্য আপস্তাবানসৌ চন্দ্রস্ত এতে সর্ব্ব এব সমাঃ সর্ব্বেহনন্তাঃ, স যো হৈতানন্তবত উপাস্তেহন্তবন্তং স লোকং জয়ত্যথ যো হৈতাননন্তানুপাস্তেহনন্তং স লোকং জয়তি ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(বাক্যারম্ভে) এতস্য(প্রজাপত্যান্নভূতস্য) প্রাণস্য আপঃ(জলানি) শরীরং(কার্য্যং); অসৌ চন্দ্রঃ জ্যোতীরূপং(প্রকাশাত্মক-
করণভূতং); তৎ(সঃ) প্রাণঃ যাবান্ এব, আপঃ(জলানি) অপি তাবত্যঃ (তৎপরিমাণাঃ), অসৌ চন্দ্রঃ[অপি] তাবান্। তে(পূর্ব্বোক্তাঃ) এতে(বাগাদয়ঃ) সর্ব্বে এব সমাঃ(সদৃশাঃ) সর্ব্বে অনন্তাঃ; সঃ যঃ হ এতান্ অন্তবতঃ(অধ্যাত্মাধিভূতরূপেণ পরিচ্ছিন্নান্ কৃত্বা) উপাস্তে, সঃ(উপাসকঃ) অন্তবন্তং(পরিচ্ছিন্নং) লোকং(ভোগং) জয়তি(বশীকরোতি); অথ- (পক্ষান্তরে) যঃ হ এতান্ অনন্তান্(অপরিচ্ছিন্নান্) উপাস্তে, সঃ (উপাসকঃ) অনন্তং(অপরিচ্ছিন্নং) লোকং জয়তি ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥
মূলানুবাদ।—এই যে প্রজাপতির অন্নস্বরূপ প্রাণ, জলইহার শরীর এবং চন্দ্র ইহার প্রকাশময় রূপ; এইজন্য, প্রাণের যেরূপ পরিমাণ, জলেরও সেইরূপই পরিমাণ এবং এই চন্দ্রেরও সেইরূপ পরিমাণ; প্রকৃত পক্ষে ইহারা সকলেই সমপরিমাণ এবং সকলেই অনন্ত বা অপরিচ্ছিন্ন। সেই যে কেহ ইহাদিগকে অন্তবান্ বা পরিচ্ছন্নভাবে উপাসনা করেন, তিনিও অন্তবান্ বা পরিচ্ছিন্ন লোক(ভোগস্থান) লাভ করেন, আর যে ব্যক্তি এ সমস্তকে অনন্ত বলিয়া উপাসনা করেন, তিনি অনন্ত লোক লাভ করেন ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—অথৈতস্য প্রকৃতস্য - প্রাজাপত্যান্নস্য প্রাণস্য, প্রজোক্তস্যানন্তরনিদ্দিষ্টস্য, আপঃ শরীরং কার্য্যং করণাধারঃ; পূর্ব্ববজ্জ্যো- তীরূপমসৌ চন্দ্রঃ; তত্র যাবানের প্রাণঃ যাবৎপরিমাণঃ অধ্যাত্মাদিভেদেষু তাব- দ্ব্যাপ্তিমত্য আপঃ তাবৎপরিমাণাঃ; তাবানসৌ চন্দ্র অবাধেয়ঃ তাস্বপ্সমু- প্রবিষ্টঃ করণভূতঃ অধ্যাত্মমধিভূতঞ্চ তাবদ্ব্যাপ্তিমানেব। তান্যেতানি পিত্রা পাঙ্ক্তেন কর্মণা সৃষ্টানি ত্রীণ্যন্নানি বাঘ্মনঃপ্রাণাখ্যানি; অধ্যাত্মমধিভূতঞ্চ জগৎ সমস্তম্ এতৈর্ব্যাপ্তম্; নৈতেভ্যোহন্যদতিরিক্তং কিঞ্চিদস্তি কার্য্যাত্মকং করণাত্মকং বা।
সমস্তানি ত্বেতানি প্রজাপতিঃ, ত এতে বাঘ্মনঃপ্রাণাঃ সর্ব্ব এব সমান্তল্যা ব্যাপ্তিমন্তঃ যাবৎপ্রাণিগোচরং সাধ্যাত্মাধিভূতং ব্যাপ্য ব্যবস্থিতাঃ; অতএবানন্তাঃ; যাবৎসংসারভাবিনো হি তে। নহি কার্যকরণপ্রত্যাখ্যানেন সংসারো- হবগম্যতে; কার্যকরণাত্মকা হি ত ইত্যুক্তম্। স যঃ কশ্চিৎ হ এতান্ প্রজাপতেরাত্মভূতানন্তবতঃ পরিচ্ছিন্নান্ অধ্যাত্মরূপেণ অধিভূতরূপেণ বোপাস্তে, স চ তদুপাসনানুরূপমেব ফলমন্তবন্তং লোকং জয়তি পরিচ্ছিন্ন এব জায়তে,
নৈতেষামাত্মভূতো ভবতীত্যর্থঃ। অথ পুনর্যো হৈতাননন্তান্ সর্ব্বাত্মকান্ সর্ব্বপ্রাণ্যাত্মভূতানপরিচ্ছিন্নান্ উপাস্তে, সোহনন্তমেব লোকং জয়তি ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥ সর্বপ্রাণ্যাত্মভূতানপরিচ্ছিন্নান্ উপাস্তে, সোহনন্তমেব লোকং জয়তি ॥ ৬৭ ॥ ১৩॥ টাকা।—আধিদৈত্যয়োর্বাহ্বনসয়োর্বিভূতিনির্দেশানন্তর্য্যমখেত্যুক্তম্। নস্বেতস্যেত্যে- তচ্ছব্দেন প্রজাত্বেনোক্তস্য প্রাণস্য কিমিতি ন গ্রহণং, তত্রাহ—ন প্রজেতি। অন্নত্রয়স্য সমপ্রধানত্বেন প্রকৃতত্বাদেতচ্ছব্দেন প্রধানপরামর্শোপপতৌ নাপ্রধানং পরামৃশ্যত ইত্যর্থঃ। পূর্ব্ববদ্বাচো মনসশ্চ পৃথিবী চৌশ্চ শরীরং যথা তথেত্যর্থঃ। দ্বৈরুপ্যে প্রাণস্যোক্তে ব্যাপ্তি- মবশিষ্টাং ব্যাচষ্টে—তত্রেতি। তাবানিত্যাদি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—চন্দ্র ইতি। বাঘ্ননঃ- প্রাণানামাধিবিকরূপেণোপাসনং বিধাতুং বৃত্তং কীর্তয়তি—তানীতি। এতেভ্যোহতিরিক্ত- মধিষ্ঠানমস্তীত্যাশঙ্ক্য বিশিনষ্টি—কার্য্যাত্মকমিতি। প্রজাপতিরেতেভ্যোহতিরিক্তোহস্তীত্যা- শঙ্ক্যাহ—সমস্তানীতি। সোপস্করং-বৃত্তমনুদ্য বাক্যমাদায় ব্যাচষ্টে—ত এত ইতি। তুল্যাং ব্যাপ্তিমেব ব্যনক্তি—যাবদিতি। তাবদশেষং জগদ্ব্যাপ্যেতি যোজনা। তুল্যব্যাপ্তিমত্ত্বমুপ- জীব্যাহ—অত এবোত। তেষাং যাবৎসংসারভাবিত্বমভিব্যনক্তি—ন হীতি। কার্য্যকরণয়ো- যাবৎসংসারভারিত্বেহপি প্রাণানাং কিমায়াতমত আহ—কার্য্যেতি। তেষু পরিচ্ছিন্নত্বেন ধ্যানে দোষমাহ—স য ইতি। এবং পাতনিকাং কৃত্বা বিবক্ষিতমুপাসনমুপদিশতি—অথেতি। ৬৭। ১৩॥ ভাষ্যানুবাদ।—অথ-শব্দের অর্থ আনন্তর্য; আর ‘এতস্য’ পদের অর্থ—প্রাজাপত্য অন্নরূপে বর্ণিত প্রাণ, কিন্তু অব্যবহিত পূর্ব্বে প্রজারূপে উক্ত প্রাণ নহে। সেই প্রাজাপত্য অন্নস্বরূপ প্রাণের জল হইতেছে শরীর— করার অধিকরণস্বরূপ কার্য্য; পূর্ব্বোক্ত এই চন্দ্র হইতেছে তাহার জ্যোতীরূপ(করণস্বরূপ); তন্মধ্যে অধ্যাত্মাদি বিভাগ ক্রমে উক্ত প্রাণের যেরূপ পরিমাণ, জলও ঠিক সেইরূপ ব্যাপ্তি বা ব্যাপক-পরিমাণবিশিষ্ট, জলে স্থিত অর্থাৎ অধ্যাত্ম ও অধিদৈবতরূপে সেই জলের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট করণ- স্বরূপ এই চন্দ্রও ঠিক সেই প্রকার পরিমাণবিশিষ্ট। পিতা(আদিকর্তা প্রজাপতি) পূর্ব্বোক্ত পাঙক্ত কৰ্ম্ম দ্বারা এই বাক্, মন ও প্রাণ-নামক তিনটি অন্ন সৃষ্টি করিয়াছিলেন; অধ্যাত্ম(দেহসংবদ্ধ) ও অধিভূত(ভূত—প্রাণিসংবদ্ধ) সমস্ত জগৎই উক্ত ত্রিবিধ অন্নে পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে; এ জগতে উক্ত অন্নত্রয়ের অতিরিক্ত কার্য্য বা করণাত্মক কোন বস্তু নাই।
উক্ত সমস্ত অন্নই প্রজাপতিস্বরূপ, সেই যে এই বাক্, মন ও প্রাণ, ইহারা সকলেই সমান, সকলেই তুল্যপরিমাণ, এবং অধ্যাত্ম ও অধিভূতভাবে যত কিছু প্রাণি-বিষয় আছে, তৎসমস্ত ব্যাপিয়া অবস্থিত রহিয়াছে; এই কারণেই অনন্তও বটে; কারণ, উহারা সকলেই যাবৎসংসারভাবী, অর্থাৎ যতকাল সংসার আছে, ততকাল বর্তমান থাকে। কেন না, কার্য্য-করণ-ভাব ত্যাগ করিলে সংসার
বলিয়া কোন পদার্থ প্রতীতিগোচর হয় না। যে কোন ব্যক্তি প্রজাপতির আত্ম- স্বরূপএই সমুদয়কে অন্তবান্ অর্থাৎ অধ্যাত্ম-রূপেই হউক, আর অধিভূতরূপেই হউক, পরিচ্ছিন্নজ্ঞানে উপাসনা করেন, তিনি সেই উপাসনারই অনুরূপ ফল—অন্তবান্ ( পরিচ্ছিন্ন—সীমাবদ্ধ) ভোগস্থান জয় করেন, অর্থাৎ তিনিও পরিচ্ছিন্নই থাকেন, কখনও এ সমস্তের আত্মস্বরূপ হন না। পক্ষান্তরে যিনি এ সমস্তকে অনন্তরূপে সর্ব্বাত্মক—সর্ব্ব-প্রাণীর আত্মারূপে অর্থাৎ অপরিচ্ছিন্নরূপে উপাসনা করেন, তিনি অনন্ত—অপরিচ্ছন্ন লোকই জয় করেন, অর্থাৎ তিনি নিজেও এ সমুদয়ের আত্মভাব প্রাপ্ত হন ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥
আভাস ভাষ্যম্।—পিতা পাঙ্ক্তেন কর্মণা সপ্তান্নানি সৃষ্ট্বা ত্রীণ্যন্নান্যা- স্মার্থমকরোদিত্যুক্তম্; তান্যেতানি পাঙ্ক্তকৰ্ম্মফলভূতানি ব্যাখ্যাতানি; তত্র কথং পুনঃ পাঙ্ক্তস্য কৰ্ম্মণঃ ফলমেতানীত্যুচ্যতে—যস্মাৎ তেষপি ত্রিঘন্নেষু পাঙ্ক্ততা অবগম্যতে, বিত্তকর্মণোরপি তত্র সম্ভবাৎ। তত্র পৃথিব্যগ্নী মাতা, দিবাদিত্যো পিতা, যোহয়মনয়োরন্তরা প্রাণঃ, স প্রজেতি ব্যাখ্যাতম্। তত্র বিত্তকর্মণী সম্ভা- বয়িতব্যে, ইত্যারম্ভঃ—
আভাস ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, পিতা, পাঙ্ক্ত কর্ম দ্বারা সপ্তপ্রকার অন্ন সৃষ্টি করিয়া—তন্মধ্যে তিনটি অন্ন আপনার জন্য নিদ্দিষ্ট রাখিলেন; সেই এই অন্নগুলিকে পাঙ্ক্ত কর্মের ফলস্বরূপ বলিয়া বর্ণনা করিয়া- ছেন। সেই অন্নগুলি যে, পাঙ্ক্ত কর্মের ফলস্বরূপ হইল কি প্রকারে, এখন তাহা কথিত হইতেছে,—যেহেতু, উক্ত ত্রিবিধ অন্নেতেও বিত্ত ও কর্মের সম্ভাব বিদ্যমান রহিয়াছে, সেই হেতু উক্ত অন্নত্রয়েরও পাঙ্ক্ততা বা পঞ্চাত্মকভাব অবগত হওয়া যাইতেছে। তন্মধ্যে পৃথিবী ও অগ্নি হইতেছে মাতা, দ্যুলোক ও আদিত্য হইতেছেন পিতা, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী যে প্রাণ(বায়ু), তাহা হইতেছে প্রজা বা সন্তানস্থানীয়; এ কথাও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। এখন কেবল অন্নত্রয়ের মধ্যে বিত্ত ও কর্মের সম্ভাব কিরূপে সম্ভাবিত হইতে পারে, তাহার জন্যই পরবর্তী শ্রুতির অবতারণা করা হইতেছে—
স এষ সংবৎসরঃ প্রজাপতিঃ ষোড়শকলস্তস্য রাত্রয় এব পঞ্চদশ কলা ধ্রুবৈবাস্য ষোড়শী কলা, স রাত্রিভিরেবা চ পূর্য্যতে- হপ চ ক্ষীয়তে, সোহমাবাস্যাৎ রাত্রিমেতয়া ষোড়শ্যা কলয়া সর্ব্ব- মিদং প্রাণভৃদনুপ্রবিশ্য ততঃ প্রাতর্জায়তে, তস্মাদেতাং রাত্রিং
প্রাণভৃতঃ প্রাণং ন বিচ্ছিন্যাদপি কৃকলাসস্যৈতস্যা এব দেবতায়া অপচিত্যৈ ॥ ৬৮ ॥ ১৪ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ(অন্নত্রয়াত্মা) এবঃ সংবৎসরঃ(সংবৎসরসংজ্ঞকঃ কাল- স্বরূপঃ) প্রজাপতিঃ ষোড়শকলঃ(ষোড়শ কলাঃ—অবয়বাঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ); রাত্রয়ঃ(অহোরাত্রঘটকাঃ প্রতিপদাদ্যাঃ তিথয়ঃ) এব তস্য পঞ্চদশ কলাঃ, ধ্রুবা (নিত্যা—অমানাম্নী মহাকলা) এব অন্য ষোড়শী(ষোড়শানাং পূরণী) কলা (অবয়বঃ)। সঃ(প্রজাপতিঃ) রাত্রিভিঃ(প্রতিপদাদিভিঃ তিথিভিঃ) এব চ আপূর্য্যতে(পূর্ণো ভবতি) চ[শুক্লপক্ষে], অপক্ষীয়তে চ(ক্ষীণশ্চ ভবতি)[কৃষ্ণ- পক্ষে]; সঃ(প্রজাপতিঃ) অমাবাস্যাং(তৎসংজ্ঞকাম্) রাত্রিং(তিথিং)[প্রাপ্য!] এতয়া(প্রাগুক্তয়া) ষোড়শ্যা(অমানাম্ন্যা) কলয়া ইদং(জাগতিকং) সর্ব্বং প্রাণভূৎ(প্রাণিজাতং) অনুপ্রবিশ্য(সর্ব্বেযু প্রাণিষু প্রবিশ্য) ততঃ(অনন্তরং) প্রাতঃ(পরদিবসে প্রাতঃকালে) জায়তে(প্রতিপৎ-কলাসংযুক্তঃ প্রাদুর্ভবতি)। তস্মাৎ(অমাবাস্যায়াং প্রাণিষু প্রজাপতেঃ প্রবেশাৎ হেতোঃ) এতাং(অমাবাস্যাৎ) রাত্রিং[প্রাপ্য] এতস্যা দেবতায়া এব অপচিত্যৈ(পূজায়ৈ—সম্মাননার্থং), প্রাণভৃতঃ(প্রাণিনঃ),[কিং বহুনা], কৃকলাসস্যাপি প্রাণং ন বিচ্ছিন্দ্যাৎ(ন বিষোজয়েৎ);[কৃকলাসো হি দৃষ্টমাত্রোহপি অমঙ্গল্যঃ, সোহপি যত্র ন হন্তব্যঃ, কিমু বক্তব্যং তত্র অন্যে ইতি ভাবঃ] ॥ ৬৮ ॥ ১৪ ॥ মূলানুবাদ।-সেই অন্নত্রয়ের আত্মস্বরূপ সংবৎসররূপী (কালাত্মক) প্রজাপতি ষোড়শ কলাসংযুক্ত; রাত্রি অর্থাৎ প্রতিপদাদি পঞ্চদশ তিথিই তাহার পঞ্চদশ কলা(অবয়ব), এবং ধ্রুবা(নিত্যা অমা) তাহার ষোড়শসংখ্যক কলা; তিনি এই সমস্ত রাত্রি দ্বারাই[শুক্লপক্ষে] পূর্ণ হন, আবার[কৃষ্ণপক্ষে] ক্ষীণ হন; তিনি অমাবাস্যারাত্রিতে সমস্ত প্রাণীর অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট থাকিয়া পরদিবস প্রাতঃকালে অর্থাৎ প্রতিপৎ তিথিতে পুনঃ প্রাদুর্ভূত হন; সেই হেতু সেই রাত্রিতে ঐ দেবতারই পূজার জন্য অর্থাৎ সম্মানার্থ কোন প্রাণীর প্রাণবিযোজন(হিংসা) করিবে না, এমন কি, কৃকলাসেরও(কাঁকলাসেরও) নহে ॥ ৬৮ ॥ ১৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—স এষ সংবৎসরঃ—যোহয়ং এন্নাত্মা প্রজাপতিঃ প্রকৃতঃ, স এষ সংবৎসরাত্মনা বিশেষতো নির্দ্দিশ্যতে। ষোড়শকলঃ—ষোড়শ কলা অবয়বা অন্য, সোহয়ং ষোড়শকলঃ, সংবৎসরঃ সংবৎসরাত্মা কালরূপঃ। তস্য চ
কালাত্মনঃ প্রজাপতেঃ রাত্রয় এব অহোরাত্রাণি-তিথয় ইত্যর্থঃ, পঞ্চদশ কলাঃ; ধ্রুবা এব নিত্যৈব ব্যবস্থিতা অন্য প্রজাপতেঃ ষোড়শী ষোড়শানাং পূরণী কলা। স রাত্রিভিরেব তিথিভিঃ কলোক্তাভিঃ আপুর্যতে চ অপক্ষীয়তে চ; প্রতিপদাদ্যা- ভিহি চন্দ্রমাঃ প্রজাপতিঃ শুক্লপক্ষে আপুর্যতে কলাভিরুপচীয়মানাভির্ব্বদ্ধতে- যাবৎ সম্পূর্ণমণ্ডলঃ পৌর্ণমাস্যাম্; তাভিরেবাপচীয়মানাভিঃ কলাভিরপক্ষীয়তে কৃষ্ণপক্ষে যাবধ্রবৈকা কলা ব্যবস্থিতা অমাবাস্যায়াম্। সঃ প্রজাপতিঃ কালাত্মা অমাবাস্যামমাবাস্যায়াং রাত্রিং রাত্রৌ যা ব্যবস্থিতা ধ্রুবা কলোক্তা, এতয়া ষোড়শ্যা কলয়া সর্ব্বমিদং প্রাণভূৎ প্রাণিজাতমনুপ্রবিশ্য-যদপঃ পিবতি, যচ্চৌষধীরশ্নাতি, তৎ সর্ব্বমেবৌষধ্যাত্মনা সর্ব্বং ব্যাপ্য-অমাবাস্যাৎ রাত্রিমবস্থায় ততোহপরেদ্যুঃ প্রাতর্জায়তে দ্বিতীয়য়া কলয়া সংযুক্তঃ। ১
এবং পাঙ্ক্তাত্মকোহসৌ প্রজাপতিঃ-দিবাদিত্যো মনঃ পিতা, পৃথিব্যগ্লী বাগজায়া মাতা, তয়োশ্চ প্রাণঃ প্রজা, চান্দ্রমস্যস্তিখয়ঃ কলাঃ বিত্তম্-উপচয়াপ- চয়ধর্মিত্বাদ্বিতবৎ, তাসাং চ কালানাং কালাবয়বানাং জগৎপরিণামহেতুত্বম্ কৰ্ম্ম; এবমেষ কৃৎস্নঃ প্রজাপতিঃ-জায়া মে স্যাদথ প্রজায়েয়, অথ বিত্তং মে স্যাদথ কৰ্ম্ম কুব্বীয়-ইত্যেষণানুরূপ এব পাঙ্ক্তস্য কর্ম্মণ: ফলভূতঃ সংবৃত্তঃ; কারণানুবিধায়ি হি কার্য্যমিতি লোকেহপি স্থিতিঃ। ২
যম্মাদেষ চন্দ্র এতাং রাত্রিং সর্ব্বপ্রাণিজাতমনুপ্রবিষ্টো ধ্রুবয়া কলয়া বর্ত্ততে, তস্মাদ্ধেতোঃ এতামমাবাস্যাং রাত্রিং প্রাণভৃতঃ প্রাণিনঃ প্রাণম্ ন বিচ্ছিন্দ্যাৎ প্রাণিনং ন প্রমাপয়েদিত্যেতৎ—অপি কৃকলাসস্য—কৃকলাসো হি পাপাত্মা স্বভাবেনৈব হিংস্যতে প্রাণিভির্দৃষ্টোহপ্যমঙ্গল ইতি কৃত্বা। ননু প্রতিষিদ্ধৈব প্রাণি- হিংসা “অহিংসন্ সর্ব্বভূতান্যন্যত্র তীর্থেভ্যঃ” ইতি; বাঢ়ম্ প্রতিষিদ্ধা, তথাপি ন অমাবাস্যায়া অন্যত্র প্রতিপ্রসবার্থং বচনং হিংসায়াঃ কৃকলাসবিষয়ে বা, কিং তর্হি, এতস্যাঃ সোমদেবতায়া অপচিত্যৈ পূজার্থম্ ॥ ৬৮ ॥ ১৪ ॥
টাকা। -অন্নত্রয়ে ফলবন্ধনবিষয়ে ব্যাখ্যাতে বক্তব্যভাবাৎ কিমুত্তরগ্রন্থেনেত্যাশঙ্ক্য বৃত্তং কীর্তয়তি-পিতেতি। তেষাং তৎফলত্বে প্রমাণাভাবমাদায় শঙ্কতে-তত্রেতি। প্রকৃতং ব্যাখ্যানং সপ্তম্যর্থঃ। কার্যলিঙ্গকমনুমানং প্রমাণয়ন্নুত্তরমাহ-উচ্যত ইতি। অনুমানমেব স্ফুটয়িতুমন্নেষু পাঙ্ক্তত্বাবগতিং দর্শয়তি-যম্মাদিতি। তস্মাৎ কারণমপি তাদৃশমিতি শেষঃ। কথং পুনস্তত্র পাঙ্ক্তত্বধীরিত্যাশঙ্ক্যাহ-বিত্তেতি। আত্মা জায়া প্রজেতি ত্রয়ং সংগ্রহীতুমপিশব্দঃ। উক্তং হেতুং ব্যক্তীকুর্ব্বন্নুক্তং স্মারয়তি-তত্রেতি। অন্নত্রয়ং সপ্তম্যর্থঃ। তথাহপি কথং পাঙ্ক্তত্ব- মিত্যাশঙ্ক্যানন্তরগ্রন্থমবতারয়তি-তত্র বিত্তেতি। সপ্তমী পূর্ব্ববৎ। অবতারিতং গ্রন্থং ব্যাচষ্টে- যোহয়মিত্যাদিনা। কথং প্রজাপতেস্তিথিভিরাপূর্য্যমাণত্বমপক্ষীয়মাণত্বং চ, তত্রাহ-প্রতি-
পদাভ্যাভিধিত। বৃক্ষধর্ম্মাদ্যং দর্শয়তি—যাবদিতি। অপক্ষয়স্য মর্য্যাদামাহ—যাবদ্- দ্রবেতি। ১
অবশিষ্টামমাবাস্যায়াং নিবিষ্টাং কলাং প্রপঞ্চয়ন্ দ্বিতীয়কলোৎপত্তিং শুক্লপ্রতিপদি দর্শয়তি- স প্রজাপতিরিতি। প্রাণিজাতমেব বিশিনষ্টি-যদপ ইতি। স্থাবরং জঙ্গমং চেত্যর্থঃ। ওষধ্যাত্ম- নেত্যুপলক্ষণং, জলজ্যনেত্যপি দ্রষ্টব্যম্। ফলভূতে প্রজাপতৌ পাঙ্ক্তত্বং বক্তমুপক্রান্তং, তদদ্যাপি নোক্তমিত্যাশঙ্ক্যাহ-এবমিতি। তদেব পাঙ্ক্তত্বং ব্যনক্তি-দিবেতি। কলানাং বিত্তবদ্বিত্তত্বে হেতুমাহ-উপচয়েতি। পাঙ্ক্তত্বনির্দেশেন লব্ধমর্থমাহ-এবমেষ ইতি। সম্প্রতি কৃৎস্নস্য প্রজা- পতেরুপক্রমানুসারিত্বং দর্শয়তি-জায়েতি। ভবতু প্রজাপতেরুক্তরীত্যা পাঙ্ক্তত্বং, তথাপি কথং পাঙ্ক্তকর্মফলত্বং, তত্রাহ-কারণেতি। ২ পাঙক্তকৰ্ম্মফলত্বং প্রজাপতেরুক্ত। প্রাসঙ্গিকমর্থমাহ-যস্মাদিতি। অপি কৃকলাসস্যেতি কুতো বিশেষোক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-কৃকলাসো হীতি। কুতস্তস্য পাপাত্মত্বং, তত্রাহ-দৃষ্টোহপীতি। বিশেষনিষেধস্থ্য শেষানুজ্ঞাপরতাদ্বিরোধঃ সামান্যশাস্ত্রেণ স্যাদিতি শঙ্কতে-নম্বিতি। তীর্থশব্দঃ শাস্ত্রবিহিতপ্রদেশবিষয়ঃ। সাধারণ্যেন সর্ব্বত্র নিষিদ্ধাপি হিংসা বিশেষতোহমাবাস্যায়াং নিবিধ্যমানা সোমদেবতাপুজার্থা, ততঃ শেষানুজ্ঞাভাবান্ন সামান্যোক্তিবিরোধোহস্তীতি পরি- হরতি-বাঢ়মিতি। ৬৮। ১৪। ভাষ্যানুবাদ।—‘সঃ এষঃ সংবৎসরঃ” ইত্যাদি। এই যে ত্রিবিধ অন্নাত্মক প্রজাপতি বর্ণিত হইলেন, তিনিই বিশেষভাবে সংবৎসররূপেও নির্দিষ্ট হইতেছেন। ‘ষোড়শকল’ অর্থ—যাহার ষোলটি কলা—অবয়ব আছে, তিনি ষোড়শকল, সংবৎসর—সংবৎসাত্মক—কালস্বরূপ। সেই কালস্বরূপ প্রজাপতির রাত্রিসমূহ—দিবারাত্র অর্থাৎ পঞ্চদশ তিথিই পঞ্চদশ কলা; আর ধ্রুবা—নিত্যা— সর্ব্বদা স্থিররূপা[ অমানাম্নী মহাকলা] এই প্রজাপতির ষোড়শ—ষোড়শসংখ্যার পূরক কলা। চন্দ্ররূপী সেই প্রজাপতি রাত্রিসমূহ দ্বারা—কলারূপে উক্ত তিথি- সমূহ দ্বারাই সম্যক্ পূর্ণ হন, আর অপক্ষীণও—ক্ষয়প্রাপ্তও হন; চন্দ্ররূপী প্রজাপতি শুক্লপক্ষে পূর্ণিমাতে যাবৎ পরিপূর্ণমণ্ডল না হন, তাবৎ বর্দ্ধমান কলা—প্রতিপদাদি তিথি দ্বারা বৃদ্ধি পাইতে থাকেন, আবার যে পর্য্যন্ত অমাবস্যাতিথিতে সেই নিত্যা কলাতে(অমাতে) পর্যবসিত না হয়, সেই পর্য্যন্ত ক্ষীয়মাণ কলাসসমূহ দ্বারা কৃষ্ণ- পক্ষে ক্ষয় পাইতে থাকেন(১)। অমাবস্যা রাত্রিতে যে ধ্রুবা কলা বর্তমান থাকে
বলা হইয়াছে, কালাত্মা প্রজাপতি সেই ষোড়শসংখ্যক কলার সাহায্যে এই সমস্ত প্রাণিমণ্ডলের মধ্যে প্রবেশ করিয়া—যাহারা জল পান করে, এবং ওষধি—তৃণ- লতাদি ভক্ষণ করিয়া থাকে, ওষধিরূপে সে সমুদয়ের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হইয়া অমাবস্যা রাত্রিতে বাস করিয়া—তাহার পর পরদিনে অপর কলার সহিত সংযুক্ত হইয়া প্রাতঃকালে প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকেন। ১
প্রজাপতি বক্ষ্যমাণরূপে পাঙ্ক্তস্বরূপ—পঞ্চাত্মক; দ্যুলোক, আদিত্য ও মন হইতেছে পিতা, পৃথিবী, অগ্নি ও বাক্ তাহার জায়াস্থানীয় মাতা; তদুভয়ের মধ্য- বর্তী প্রাণ প্রজাস্বরূপ; চন্দ্রকলা তিথিসমূহ হইতেছে—বিত্ত; কেন না, বিত্তের যেমন হ্রাস-বৃদ্ধি আছে, তেমনি চন্দ্রকলারও হ্রাসবৃদ্ধি আছে; এবং মহাকালের অংশভূত সেই কলাসমুহই জগতের বিচিত্র পরিণাম ঘটাইতেছে; তজ্জন্য তাহারাও কর্ম্মস্বরূপ; এইরূপে অর্থাৎ উক্তপ্রকার পিতা, মাতা(জায়া), পুত্র, বিত্ত ও কর্ম্ম, সম্বন্ধ বশতঃ পূর্ণতাপ্রাপ্ত উক্ত প্রজাপতি—‘আমার জায়া হউক, আমি জন্মিব; আমার বিত্ত হউক, আমি কৰ্ম্ম করিব,’ ইত্যাকার কামনানুযায়ী পাঙ্ক্ত কর্ম্মের ফলস্বরূপে অভিব্যক্ত হইয়াছেন; কেন না, জগতে কারণানুরূপ কার্য্যসৃষ্টিই স্বাভা- বিক নিয়মসিদ্ধ। ২
যেহেতু, উক্ত প্রজাপতি এই অমাবস্যা-রাত্রিতে চন্দ্ররূপে সমস্ত প্রাণীর অভ্য- স্তরে প্রবিষ্ট হইয়া ধ্রুবা(অমা) কলার সহিত অবস্থান করেন, সেই হেতু এই অমাবস্যা-রাত্রিতে কোন প্রাণীরই প্রাণবিচ্ছেদ করিবে না,—প্রাণিহিংসা করিবে না; এমন কি, কৃকলাসেরও(কাঁকলাসেরও) না। কৃকলাস স্বভাবতই পাপাত্মা, দর্শন করিলেও অমঙ্গল জন্মায়; এইজন্য সহজেই তাহাকে হিংসা করিয়া থাকে, [ কিন্তু অমাবস্যারাত্রিতে তাহাকেও হিংসা করিবে না]। ভাল কথা, ‘তীর্থ ভিন্ন- স্থলে কোন প্রাণীরই হিংসা করিবে না’ ইত্যাদি শ্রুতিতে যখন সাধারণভাবে
প্রাণিমাত্রেরই হিংসা নিষিদ্ধ হইয়াছে;[ তখন এখানে আবার বিশেষ করিয়া নিষেধ করিবার প্রয়োজন কি?] হাঁ, হিংসামাত্রই নিষিদ্ধ বটে, তথাপি যে এখানে হিংসার নিষেধ করা হইয়াছে, তাহার উদ্দেশ্য—অমাবস্যার অন্যত্র হিংসার প্রতিপ্রসবের(অনুমতির) জন্য নহে, অথবা কৃকলাসের হিংসাবিধানের জন্যও নহে; তবে কি’ না, এই সোমদেবতার(চন্দ্ররূপী প্রজাপতির) অপচিতির— পূজার জন্য মাত্র, অর্থাৎ সোমদেবতার প্রতি আদর বা সম্মান প্রদর্শনার্থই এই নিষেধের অবতারণা করা হইয়াছে ॥ ৬৮ ॥ ১৪ ॥
যো বৈ স সংবৎসরঃ প্রজাপতিঃ ষোড়শকলোহয়মেব সঃ, যোহয়মেবংবিৎ পুরুষস্তস্য বিত্তমেব পঞ্চদশ কলা আত্মৈবাস্য ষোড়শী কলা স বিত্তেনৈবা চ পূর্য্যতেহপ চ ক্ষীয়তে তদেতন্নভ্যম্ যদয়মাত্মা প্রধিবিত্তং তস্মাদ যদ্যপি সর্বজ্যানিং জীয়ত আত্মনা চেজ্জীবতি প্রধিনাগাদিত্যেবাহুঃ ॥ ৬৯ ॥ ১৫ ॥
সরলার্থঃ।—যঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) সংবৎসরঃ ষোড়শকলঃ প্রজাপতিঃ, অয়ং এব সঃ;[কোহসৌ?] যঃ অয়ং(প্রত্যক্ষগম্যঃ) এবংবিৎ (এ্যন্নাত্মবিৎ) পুরুষঃ; বিত্তং(সম্পত্তিঃ) এব তস্য(পুরুষস্থ্য) পঞ্চদশ কলাঃ, আত্মা এব(স্বয়মেব) অন্য(পুরুষস্থ্য) ষোড়শী কলা(অংশঃ);[যতঃ] সঃ (পুরুষঃ) বিত্তেন এব আপূর্য্যতে(পুষ্টিং লভতে) চ, অপক্ষীয়তে চ। যঃ অয়ং আত্মা(দেহপিণ্ডঃ), তৎ(সঃ) এতৎ নভ্যং(রথচক্রস্থানীয়ং—সর্ব্বপ্রধানম্), বিত্তং(সম্পৎ) প্রধিঃ(নেমিস্থানীয়ং); তস্মাৎ(হেতোঃ) যদ্যপি(সম্ভাবনায়াং) [সঃ] সর্ব্বজ্যানিং জীয়তে(সর্ব্বস্বাপহরণেন হীয়তে), চেৎ(যদি) আত্মনা (দেহপিণ্ডেন) জীবতি,[তদা অয়ং] প্রধিনা অগাৎ(বাহ্যেন বিত্তেন ক্ষীণো ভূতঃ) ইত্যেব আহুঃ(কথয়ন্তি)[জনাঃ]।[রথচক্র-স্থানীয়ঃ আত্মা চেৎ জীবতি, তদা প্রধিস্থানীয়-বিত্তাধিগমেহপি পুনস্তেন সংযুজ্যত এবেতি ভাবঃ]॥ ৬৯৷ ১৫ ॥
মূলানুবাদ।—সেই যে ষোড়শ কলাযুক্ত সংবৎসরাত্মক প্রজাপতি, তিনিই সেই প্রজাপতি—এই যিনি এবংবিধ-জ্ঞানসম্পন্ন অর্থাৎ অন্নত্রয়াভিজ্ঞ পুরুষ; বিত্ত তাহার পঞ্চদশ কলা, এবং আত্মা অর্থাৎ দেহপিণ্ড তাহার ষোড়শ কলা; সেই পুরুষ এই বিত্ত দ্বারাই
পুষ্টিলাভ করিয়া থাকেন, আবার ক্ষীণও হইয়া থাকেন; তাহার এই যে, দেহপিণ্ড, ইহা হইতেছে-নভ্য অর্থাৎ রথের চক্রস্থানীয়(প্রধান), আর বিত্ত হইতেছে-প্রধি-রথচক্রের প্রান্তভাগস্থানীয়; এই জন্য পুরুষ কখনও যদি সর্বস্বাপহরণে ক্ষীণও হয়, অথচ আপনি জীবিত থাকে,[তাহা হইলে,] লোকে বলিয়া থাকে-রথচক্রস্থানীয় ইনি বিত্তহীন হইয়াছেন মাত্র। অভিপ্রায় এই যে, নেমি নষ্ট হইয়াও চক্রটি রক্ষা পাইলে যেমন পুনঃ সমাধান করা যায়, তেমনি বিত্ত নষ্ট হইলেও যদি দেহপিণ্ড রক্ষা পায়, তাহা হইলে তাহার পুনঃ পূর্ববাবস্থাপ্রাপ্তি সম্ভবপর হয়৷ ৬৯॥১৫॥
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—যো বৈ সঃ পরোক্ষাভিহিতঃ সংবৎসরঃ প্রজাপতিঃ ষোড়শকলঃ, স নৈবাত্যন্তং পরোক্ষো মন্তব্যঃ, যম্মাদয়মেব সঃ প্রত্যক্ষ উপলভ্যতে। কোহসাবয়ম্? যঃ যথোক্তং এ্যন্নাত্মকং প্রজাপতিমাত্মভূতং বেত্তি, স এবংবিৎ পুরুষঃ; কেন সামান্যেন প্রজাপতিরিতি, তদুচ্যতে—তস্যৈবংবিদঃ পুরুষস্য গবাদিবিত্তমেব পঞ্চদশ কলাঃ, উপচয়াপচয়ধর্মিত্বাৎ—তদ্বিত্তসাধ্যঞ্চ কৰ্ম্ম; তস্য কৃৎস্নতায়ৈ—আত্মৈব পিণ্ড এব অন্য বিদুষঃ ষোড়শী কলা ধ্রুবস্থানীয়া; স চন্দ্রবদ্বিতেনৈব আপূর্য্যতে চ অপক্ষীয়তে চ, তদেতল্লোকে প্রসিদ্ধম্।
তদেতৎ নভ্যং-নাভ্যৈ হিতং নভ্যম্, নাভিং বা অর্হতীতি। কিং তৎ? যদয়ং যোহয়ম্ আত্মা পিণ্ডঃ; প্রধিঃ বিত্তং পরিবারস্থানীয়ং বাহ্যং-চক্রস্যেবা- রনেম্যাদি। তস্মাদ যদ্যপি সর্ব্বজ্যানিং সর্ব্বস্বাপহরণং জীয়তে হীয়তে গ্লানিং প্রাপ্নোতি, আত্মনা চক্রনাভিস্থানীয়েন চেদ্ যদি জীবতি; প্রধিনা বাহেন পরি- বারেণায়ম্ অগাৎ ক্ষীণোহম্-যথা চক্রম্ অরনেমিবিমুক্তম্,-এবমাহুঃ; জীবন্ চেদরনেমিস্থানীয়েন বিত্তেন পুনরুপচীয়ত ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৬৯ ॥ ১৫ ॥
টীকা।—যৎপূর্ব্বমাধিদৈবিকত্র্যন্নাত্মকপ্রজাপত্যুপাসনমুক্তং, তদহমস্মি প্রজাপতিরিত্যহং- গ্রহেণ কর্তব্যমিত্যাহ—যো বা ইতি। প্রত্যক্ষমুপলভ্যমানং প্রজাপতিং প্রশ্নদ্বারা প্রকটয়তি— কোৎসাবিতি। তস্য প্রজাপতিত্বমপ্রসিদ্ধমিত্যাশঙ্কা পরিহরতি—কেনেত্যাদিনা। কলানাং জগদ্বিপরিণামহেতুত্বং কর্ম্মেত্যুক্তং, বিত্তেহপি কৰ্ম্মহেতুত্বমস্তি, তেন ভত্র কলাশব্দপ্রবৃত্তিরুচিতে- ত্যাহ—বিত্তেতি। যথা চন্দ্রমাঃ কলাভিঃ শুক্লকৃষ্ণপক্ষয়োরাপূর্য্যতেহপক্ষীয়তে চ, তথা স বিদ্বান্ বিত্তেনৈবোপচীয়মানেনাপূর্য্যতেহপচীয়মানেন চাপক্ষীয়তে। এতচ্চ লোকপ্রসিদ্ধত্বান্ন প্রতি- পাদনসাপেক্ষমিত্যাহ—স চন্দ্রবদিতি। আত্মৈব ধ্রুবা কলেত্যুক্তং, তদেব রথচক্রদৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-তদেতদিতি। নাভিশ্চক্রপিণ্ডিকা, তৎস্থানীয়ং বা নভ্যং, তদেব প্রশ্নদ্বারা ক্ষোরয়তি-কিং তদিতি। শরীরস্য চক্রপিত্তিকাস্থানীয়ত্ব-
মযুক্তং পরিবারাদর্শনাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—প্রধিরিতি। শরীরস্য রথচক্রপিণ্ডিকাস্থানীয়ত্বে ফলিত- মাহ—তস্মাদিতি। পদার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ—জীবংশ্চেদিতি। ৬৯। ১৫।
ভাষ্যানুবাদ।—ইতঃ পূর্ব্বে ষোড়শ-কলাযুক্ত সংবৎসরাত্মক যে প্রজা- পতিকে পরোক্ষভাবে(ইন্দ্রিয়ের অগোচররূপে) নির্দেশ করা হইয়াছে, তাহাকে নিতান্তই পরোক্ষ বলিয়া মনে করা উচিত নহে; যেহেতু, ইনিই সেই প্রজাপতি- রূপে প্রত্যক্ষতঃ জ্ঞানগোচর হইতেছেন; এই ‘ইনি’ কে? যিনি উক্তপ্রকার অন্নত্রয়াত্মক প্রজাপতিকে আত্মস্বরূপে উপলব্ধি করিয়াছেন, যথোক্ত জ্ঞানসম্পন্ন সেই পুরুষ। কিরূপ ধর্ম্ম-সাম্য নিবন্ধন তাহার প্রজাপতিত্ব, তাহা বলিতে- ছেন—সেই যে, এবংবিধ জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষ, গবাদি বিত্তই তাহার পঞ্চদশ কলা, কারণ, চন্দ্রকলার ন্যায় বিত্তেরও হ্রাস-বৃদ্ধি আছে, এবং বিত্ত দ্বারা কর্ম্মানুষ্ঠানও সম্পন্ন হইয়া থাকে(১)। সেই বিদ্বান্ পুরুষের আত্মা—দেহপিণ্ডই তাহার পূর্ণতা সম্পাদনের উপযোগী ধ্রুবা নামক ষোড়শ কলাস্থানীয়। চন্দ্রের ন্যায় সেই বিদ্বান্ পুরুষও বিত্তের বৃদ্ধিতে বৃদ্ধি পান, আবার বিত্তের অপচয়ে ক্ষীণ হন, ইহা প্রসিদ্ধ কথা।
ইহাই সেই নভ্য। নভ্য অর্থ—নাভির হিতকর, অথবা নাভির যোগ্য; সেটি কি? যাহা এই দেহপিণ্ড; চক্রের যেমন অর-নেমি প্রভৃতি(চক্রের শলাকা ও তাহার প্রান্তবেষ্টনী প্রভৃতি), বিত্তও তেমনি পরিবারবর্গস্থানীয়; এই কারণেই যদি কখনও সর্ব্বস্বাপহরণে পুরুষের হানি বা গ্লানিও(দুঃখও) ঘটে, আর রথ- চক্রের নাভিস্থানীয় দেহপিণ্ড জীবিত থাকে, অর্থাৎ সর্ব্বস্বনাশ হইলেও পুরুষ যদি স্বশরীরে রক্ষা পায়, তাহা হইলে লোকে বলিয়া থাকে—অর ও নেমিপ্রভৃতি- বিযুক্ত রথচক্রের ন্যায় ইনিও প্রধি দ্বারা—বিত্তাদি বাহ্য পরিজনে ক্ষীণ হইয়াছেন। অভিপ্রায় এই যে, যদি পুরুষ জীবিত থাকে, তাহা হইলে চক্রের অর-নেমিস্থানীয় বিত্ত দ্বারা তাহার পুনর্ব্বার বৃদ্ধি প্রাপ্তি সম্ভবপর হয়॥ ৬৯ ॥ ১৫ ॥
আভাসভাষ্যম্।—এবং পাঙ্ক্তেন দৈববিত্তবিদ্যাসংযুক্তেন কর্ম্মণা ত্র্যন্নাত্মকঃ প্রজাপতির্ভবতীতি ব্যাখ্যাতম্, অনন্তরঞ্চ জায়াদিবিত্তং পরিবারস্থানীয়-, মিত্যুক্তম্, তত্র পুত্রকর্ম্মাপরবিদ্যানাং লোকপ্রাপ্তিসাধনত্বমাত্রং সামান্যেনাবগতম্;
ন পুত্রাদীনাং লোকপ্রাপ্তিফলং প্রতি বিশেষসম্বন্ধনিয়মঃ। সোহয়ং পুত্রাদীনাং সাধনানাং সাধ্যবিশেষসম্বন্ধো বক্তব্য ইত্যুত্তরকণ্ডিকা প্রণীয়তে—
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—এই প্রকার দৈব বিত্ত ও বিদ্যাসমন্বিত পাক্ত কর্ম্ম দ্বারা পুরুষ অন্নত্রয়াত্মক প্রজাপতি হইতে পারেন, এ কথা বর্ণিত হইয়াছে। সেখানে সাধারণভাবে জানা গিয়াছে যে, পুত্র, কর্ম্ম ও অপরা বিদ্যা, ইহারা সকলেই লোক-বিশেষপ্রাপ্তির উপায়স্বরূপ, কিন্তু পুত্র, কর্ম্ম ও অপরাবিদ্যার যে, বিভিন্ন প্রকার লোক-ফলসাধনের সহিত কোন প্রকার বাঁধাবাঁধি সম্বন্ধ আছে, তাহা জানিতে পারা যায় নাই; অতঃপর পুত্রাদিরূপ সাধনের সহিত সাধনীয় বিশেষ ফলের যেরূপ সম্বন্ধ আছে, তাহা বলা আবশ্যক, অর্থাৎ কোন্ সাধন হইতে কিরূপ ফলের সিদ্ধি হয়, এখন তাহা বলিতে হইবে; তজ্জন্য পরবর্তী কণ্ডিকা(শ্রুতি) আরব্ধ হইতেছে—
অথ ত্রয়ো বাব লোকা মনুষ্যলোকঃ পিতৃলোকো দেবলোক ইতি, সোহয়ং মনুষ্যলোকঃ পুত্রেণৈব জয্যো নান্যেন কৰ্ম্মণা, কৰ্ম্মণা পিতৃলোকো বিদ্যয়া দেবলোকঃ, দেবলোকো বৈ লোকানাং শ্রেষ্ঠস্তস্মাদ্বিদ্যাং প্রশংসন্তি ॥ ৭০॥ ১৬॥
সরলার্থঃ।—অথ(অতঃপরং) ত্রয়ঃ(ত্রিবিধাঃ) লোকাঃ(ভোগস্থানানি) বাব(প্রসিদ্ধাঃ),—মনুষ্যলোকঃ, পিতৃলোকঃ, দেবলোকঃ—ইতি। সঃ অয়ং মনুষ্য- লোকঃ পুত্রেণ এব জয্যঃ(জেতুং বশীকর্তুং শক্যঃ), অন্যেন কর্মণা ন(জেতুম্ অশক্যঃ); কৰ্ম্মণা পিতৃলোকঃ[জয্যঃ]; বিদ্যয়া(অপর-ব্রহ্মবিষয়য়া উপাসনয়া) দেবলোকঃ[জয্যঃ]; লোকানাৎ(ত্রয়াণাং ভোগস্থানানাং মধ্যে) দেবলোকঃ বৈ(এব) শ্রেষ্ঠঃ(প্রশস্তঃ), তস্মাৎ হেতোঃ বিদ্যাং(দেবলোকসাধিনীং উপা- সনাং) প্রশংসন্তি(স্তুবন্তি)[সন্তঃ ইতি শেষঃ] ॥ ৭০ ॥ ১৬ ॥
মূলানুবাদ।—অতঃপর প্রসিদ্ধ ত্রিবিধ লোক অর্থাৎ ভোগস্থান বর্ণিত হইতেছে—লোক ত্রিবিধ—মনুষ্যলোক, পিতৃলোক ও দেবলোক। তন্মধ্যে একমাত্র পুত্রদ্বারাই এই মনুষ্যলোক জয় করিতে পারা যায়, কিন্তু অন্য দ্বারা—কৰ্ম্ম দ্বারা নহে; কর্মদ্বারা একমাত্র পিতৃলোকই জয় করিতে পারা যায়, এবং একমাত্র বিদ্যা দ্বারাই দেবলোক জয় করিতে পারা যায়। লোকত্রয়ের মধ্যে দেবলোকই শ্রেষ্ঠ; সেই কারণে পণ্ডিতগণ দেবলোকলাভের সাধনভূত বিদ্যার প্রশংসা করিয়া থাকেন ॥ ৭০ ॥১৬॥
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—অথেতি বাক্যোপন্যাসার্থঃ। ত্রয়ঃ—বাবেত্যবধারণার্থঃ —ত্রয় এব শাস্ত্রোক্তসাধনার্হা লোকাঃ, ন ন্যূনা নাধিকা বা। কে তে ইত্যু- চ্যতে—মনুষ্যলোকঃ পিতৃলোকো দেবলোক ইতি। তেষাং সোহয়ং মনুষ্যলোকঃ পুত্রেণৈব সাধনেন জয্যঃ জেতব্যঃ সাধ্যঃ; যথা চ পুত্রেণ জেতব্যঃ, তথোত্তরত্র বক্ষ্যামঃ, নান্দেন, কৰ্ম্মণা বিদ্যয়া বেতি বাক্যশেষঃ। কর্মণা অগ্নিহোত্রাদিলক্ষণেন কেবলেন পিতৃলোকো জেতব্যঃ, ন পুত্রেণ, নাপি বিদ্যয়া। বিদ্যয়া দেবলোকঃ, ন পুত্রেণ, নাপি কৰ্ম্মণা। দেবলোকো বৈ লোকানাং ত্রয়াণাং শ্রেষ্ঠঃ প্রশস্যতমঃ; তস্মাৎ তৎসাধনত্বাদিদ্যাৎ প্রশংসন্তি ॥ ৭০ ॥ ১৬ ॥
টীকা। -অন্নত্রয়াত্মনি প্রজাপতাবহংগ্রহোপাসনস্য সফলস্যোক্তত্বাদ্বক্তব্যাভাবাদুত্তর গ্রন্থ- বৈয়র্থ্যমিত্যাশঙ্ক্য তদ্বিষয়ং বক্তুং বৃত্তমনুবদতি-এবমিতি। সাধনোক্ত্যৈব ফলমুক্তং, তয়োমিথো বন্ধত্বাৎ, প্রাজাপত্যং চ ফলং প্রাগেব দর্শিতং, তৎ কিমুত্তরগ্রন্থেনেত্যাশঙ্ক্য সামান্যেন তৎপ্রতীতা- বপীদমস্থ্যেতি বিশেষো নোক্তস্তদুভ্যর্থমুত্তরা শ্রুতিরিত্যাহ-তত্রেতি। পূর্ব্বগ্রন্থঃ সপ্তম্যর্থঃ। নিয়মো নাবগত ইতি সম্বন্ধঃ। উপন্যাসঃ প্রারম্ভঃ। বাবশব্দস্যাবধারণরূপমর্থং বিবৃণোতি- এয় এবেতি। তদেব লোকত্রয়ং প্রশ্নদ্বারা ক্ষোরয়তি-কে ত ইত্যাদিনা। জয়ো নাম পুত্রেণ মনুষ্যলোকস্যাতিক্রম ইতি কেচিৎ, তান্ প্রত্যাহ-সাধ্য ইতি। পুত্রেণাস্য সাধ্যত্বমসিদ্ধমিত্যা- শঙ্ক্যাহ-যথা চেতি। দ্বিবিধো হি মনুষ্যলোকজয়ঃ-কর্তব্যশেষানুষ্ঠানং ভোগশ্চ। তত্রাদ্য- মাশ্রিত্যান্যযোগব্যবচ্ছেদমেবকারার্থং দর্শয়তি-নান্যেনেতি। দ্বিতীয়ে ত্বযোগব্যবচ্ছেদস্তদর্থো জ্যোতিষেমং লোকং জয়তীতি সাধনাস্তরেণাপি মনুষ্যলোকজয়শ্রুতেরিতি ভাবঃ। পূর্ব্ববাক্যস্থ- মেবকারমুত্তরবাক্যয়োরনুষক্তমুপেত্য বাক্যদ্বয়ং ব্যাচষ্টে-কর্মণেত্যাদিনা। সাধনদ্বয়াপেক্ষয়া ফলম্বার কমুৎকর্ষং বিদ্যায়াং দর্শয়তি-দেবলোক ইতি। ৭০। ১৬॥
ভাষ্যানুবাদ।—অথ শব্দটি বাক্যারম্ভসূচক। “ত্রয়ঃ বাব” এই বাব শব্দের অর্থ অবধারণ;—শাস্ত্রোক্ত সাধনলভ্য লোক বা ভোগভূমি নিশ্চয়ই তিনটি, ন্যূনও নয়, অধিকও নয়। সেই লোকত্রয় কি কি, তাহা বলা হইতেছে—মনুষ্য-লোক, পিতৃলোক ও দেবলোক। ইহাদের মধ্যে এই মনুষ্যলোকটি একমাত্র পুত্ররূপী সাধনের সাহায্যেই জয় করিতে পারা যায়—ভোগায়ত্ত করিতে পারা যায়; কিন্তু অন্য দ্বারা—কর্ম্ম বা বিদ্যা দ্বারা জয় করা যায় না; পুত্রদ্বারা যেরূপে মনুষ্য-লোক জয় করিতে হয়, সেই প্রণালী পরে বলা হইবে। কর্ম্ম দ্বারা—উপাসনারহিত অগ্নিহোত্রাদি দ্বারা পিতৃলোক জয় করিতে পারা যায়; কিন্তু পুত্র বা বিদ্যা দ্বারা নহে; আর কেবল বিদ্যা দ্বারা(অপর-ব্রহ্মবিষয়ক উপাসনা দ্বারা) দেবলোক জয় করিতে পারা যায়; কিন্তু পুত্র বা কর্ম্ম দ্বারা নহে। দেবলোকই ত্রিলোকের মধ্যে শ্রেষ্ঠলোক; সেই কারণে জ্ঞানিগণ দেবলোকসিদ্ধির উপায়ভূত বিদ্যার প্রশংসা করিয়া থাকেন ॥ ৭০ ॥ ১৬ ॥
অথাতঃ সম্প্রতির্যদা প্রৈষ্যন্মন্যতেহথ পুত্রমাহ—ত্বং ব্রহ্ম ত্বং যজ্ঞস্ত্বং লোক ইতি; স পুত্রঃ প্রত্যাহাহং ব্রহ্মাহং যজ্ঞোহহং লোক ইতি। যদ্বৈ কিঞ্চানূক্তং তস্য সর্ব্বস্য ব্রহ্মেত্যেকতা, যে বৈ কে চ যজ্ঞাস্তেষাং সর্ব্বেষাং যজ্ঞ ইত্যেকতা, যে বৈ কে চ লোকাস্তেষাং সর্ব্বেষাং লোক ইত্যেকতৈতাবদ্ধা ইদং সর্ব- মেতন্মা সর্ব্বং সন্নয়মিতোহভুনজদিতি, তস্মাৎ পুত্রমনুশিষ্টং লোক্যমাহিস্তস্মাদেনমনুশাসতি; স যদৈবংবিদস্মাল্লোকাৎ প্রৈত্য- থৈভিরেব প্রাণৈঃ সহ পুত্রমাবিশতি। স যদ্যনেন কিঞ্চিদ- ক্ষ্ণয়াহকৃতং ভবতি, তস্মাদেনং সর্ব্বস্মাৎ পুত্রো মুঞ্চতি; তস্মাৎ পুত্রো নাম সঃ, পুত্রেণৈবাস্মিল্লোকে প্রতি- তিষ্ঠত্যথৈনমেতে দৈবাঃ প্রাণা অমৃতা আবিশন্তি॥ ৭১ ॥ ১৭ ॥
সরলার্থঃ। -[পুত্রস্য লোকজয়হেতুত্বং কেন রূপেণ, তদাহ-অথেত্যাদি]। অথ(বাক্যারম্ভে), অতঃ(অতঃপরৎ) সংপ্রত্তিঃ(সম্প্রদানং-পুত্রে স্বাত্মকর্তব্য- সম্প্রদানং, বক্ষ্যমাণ-কৰ্ম্মনাম চৈতৎ)[উচ্যতে-][পিতা] যদা(যস্মিন্ কালে) প্রৈষ্যন্(মরিষ্যন্-ইতি) মন্যতে(বিজানাতি), অথ(অনন্তরং-তদা) পুত্রম্ [আহূয়] আহ(ব্রবীতি)-ত্বং ব্রহ্ম, ত্বং যজ্ঞঃ, ত্বং লোকঃ ইতি। সঃ(এবমুক্তঃ) পুত্রঃ প্রত্যাহ(পিতরং প্রতিবদতি)-অহং ব্রহ্ম, অহং যজ্ঞঃ, অহং লোক:- ইতি।[এতদেব বিশদীকৃত্যাহ-] যৎ কিঞ্চ(যৎ কিমপি) অনুক্তং(ময়া অধীতম্ অনধীতং, চ অবশিষ্টং) তস্য সর্ব্বস্থ্য ব্রহ্ম ইতি একতা(ব্রহ্মপদেন একত্বং বিবক্ষিতমিত্যর্থঃ); যে কেচ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) যজ্ঞাঃ(মদনুষ্ঠেয়াঃ-অনুষ্ঠিতাঃ অননুষ্ঠিতাশ্চ), তেষাং সর্ব্বেষাং যজ্ঞঃ-ইতি একতা(যজ্ঞ-পদেন কর্মসামান্য- বাচিনা একত্বং বিবক্ষিতমিত্যর্থঃ)। তথা যে কে চ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) লোকাঃ(মম জেতব্যাঃ সন্তঃ জিতাঃ অজিতাশ্চ), তেষাৎ সর্ব্বেষাং লোকঃ-ইতি একতা, (লোক-শব্দেন চ লোকসামান্যগ্রহণাৎ একত্বং বিবক্ষিতমিত্যর্থঃ), এতাবন্তং[কালং যদধ্যয়নং মম কর্তব্যমাসীৎ, ইতঃ পরং তৎ সর্ব্বং ত্বয়া সম্পাদনীয়ম্; তথা এতাবন্তং কালং যে যজ্ঞাঃ মম অনুষ্ঠেয়া আসন্, তত্র চ কেচিৎ অনুষ্ঠিতা, অননুষ্ঠিতাশ্চ কেচিৎ, অতঃপরং তে সর্ব্বে ত্বয়া অনুষ্ঠেয়াঃ; তথা যে লোকাঃ মম জেতব্যাঃ সন্তুঃ
কেচিং জিতাঃ অজিতাশ্চ কেচিৎ সন্তি, ইতঃপরং তে সর্ব্বে ত্বয়া জেতব্যাঃ। অত্র ব্রহ্মযজ্ঞ-লোকশব্দৈঃ অধ্যয়ন-কর্মানুষ্ঠান-লোকজয়-কর্তৃতা বিবক্ষিতা]। ইদং সর্ব্বং (গৃহিকর্তব্যং) এতাবৎ বৈ(এতৎপরিমাণমেব, যৎ বেদস্য অধ্যয়নং, যজ্ঞস্য অনুষ্ঠানং, লোকস্য চ জয়ঃ); এতৎ সর্ব্বং সন্ অয়ং(পুত্রঃ) ইতঃ(অস্মাৎ লোকাৎ)[প্রস্থিতং] মা(মাং) অভুনজৎ(পালয়িষ্যতি, ভবিষ্যদর্থে লঙ্), ইতি। তস্মাৎ-[যস্মা- দেবম্,](তস্মাৎ হেতোঃ) অনুশিষ্টং(পিতুঃ শাসনে স্থিতং) পুত্রং লোক্যং (লোকহিতকরং) আহুঃ(কথয়ন্তি)[পণ্ডিতাঃ]; তস্মাৎ(হেতোঃ) এনং পুত্রং অনুশাসতি(স্বলোকসাধনায় উপদিশন্তি)[পিতরঃ]। এবংবিৎ(যথোক্ত- তত্ত্বজ্ঞঃ) সঃ(উপদেষ্টা পিতা) যদা(যস্মিন্ কালে) অস্মাৎ লোকাৎ প্রৈতি (ম্রিয়তে),[তদা] এভিঃ প্রাণৈঃ(বাঙ্মনঃপ্রাণৈঃ) সহ পুত্রং আবিশতি (অধ্যাত্মভাবং পরিত্যজ্য আধিদৈবিকেন রূপেণ ব্যাপ্নোতি); অনেন(আসন্ন- মৃত্যুনা পিত্রা) যদি কিঞ্চিৎ(স্বকর্তব্যং) অক্ষুয়া(ছিদ্রতঃ প্রমাদতো বা) অকৃতৎ (অননুষ্ঠিতং) ভবতি,[তদা] সঃ পুত্রঃ[স্বয়ং অনুষ্ঠানেন পুরয়িত্বা] তস্মাৎ (কর্তব্যাকরণরূপাৎ লোকপ্রাপ্তিপ্রতিবন্ধাৎ) এনং(পিতরং) মুঞ্চতি(মোচয়তি) যস্মাৎ, তস্মাৎ,(পিতুঃ অসম্পূর্ণকর্মপরিপূরণেন ত্রাণকরণাৎ) পুত্রো নাম,(এতদেব পুত্রনামনির্বচনমিতি ভাবঃ)। সঃ(পিতা) পুত্রেণ(যথোক্তেন পুত্রেণ) এব অস্মিন্ লোকে প্রতিতিষ্ঠতি(মৃতোহপি সন্ জীবতীত্যর্থঃ); অথ (মৃত্যোঃ পরং) এনং(যথোক্তেন প্রকারেণ কৃতসম্প্রতিকং পিতরম্) এতে অমৃতাঃ(মৃত্যুরহিতাঃ) দৈবাঃ(হিরণ্যগর্ভসম্বন্ধীয়াঃ) প্রাণাঃ (বাগাদয়ঃ) আবিশন্তি(প্রবিশন্তি), স খলু মর্ত্যধৰ্মাৎ প্রমুচ্যতে ইতি ভাবঃ] ॥ ৭১ ॥ ১৭ ॥
মূলানুবাদ।—অতঃপর ‘সম্পত্তি’ বর্ণিত হইতেছে—[সম্প্রতি অর্থ সম্প্রদান—পুত্রেতে আপনার কর্তব্য সম্পাদনের ভার সমর্পণ]। লোক যখন আপনাকে আসন্নমৃত্যু বুঝিতে পারেন, তখন পুত্রকে আহ্বান করিয়া বলেন—তুমি ব্রহ্ম(বেদ), তুমি যজ্ঞ, এবং তুমি লোক। [ পিতা এইরূপ বলিলে পর] সেই পুত্র প্রতিবচনে বলেন—হাঁ, আমি ব্রহ্ম, আমি যজ্ঞ এবং আমিই লোক।[ ইহার অর্থ এই যে, আমার] যাহা কিছু অধীত বা অনধীত—অধ্যয়ন করিতে বাকী আছে, তুমিই সেই সকলের ব্রহ্ম, অর্থাৎ তুমিই তৎস্বরূপ—আমার কর্ত্তব্য অধ্যয়ন তুমি
পূর্ণ করিবে; যে সকল যজ্ঞ[আমার কর্তব্য ছিল], তুমি সে সমুদয়ের যজ্ঞস্বরূপ, অর্থাৎ তুমি আমার কর্তব্য যজ্ঞ সম্পাদন করিবে; আর যে কোন লোক(ভোগস্থান)[জয় করা-আয়ত্ত করা আমার উচিত ছিল], তুমি সে সকলের লোকস্বরূপ, অর্থাৎ তুমি সে সমুদয় লোক জয় করিবে; এ সমস্ত-(গৃহীর কর্তব্য) এই পর্য্যন্তই অর্থাৎ অধ্যয়ন, যজ্ঞ ও লোকজয়ের অতিরিক্ত আর কিছু নাই। আমি ইহলোক হইতে প্রয়াণ করিলে পর পুত্র আমার এই কর্তব্যভার বহনপূর্ব্বক আমাকে রক্ষা করিবে; এই জন্যই পণ্ডিতগণ অনুশিষ্ট(সুশাসনপ্রাপ্ত) পুত্রকে লোক্য অর্থাৎ পিতার শুভলোকলাভের অনুকূল বলিয়া থাকেন; এবং এই কারণেই পিতা পুত্রকে[ঐরূপ] উপদেশ দিয়া থাকেন। এবংবিধ জ্ঞানসম্পন্ন পিতা যে সময়ে ইহলোক হইতে প্রস্থান করেন, তখন তিনি এই সমুদয় প্রাণের সহিতই(বাক্, মন ও প্রাণের সহিতই) পুত্রে প্রবেশ করেন। পিতার কোনও কর্তব্য কৰ্ম্ম যদি ঘটনাক্রমে করা না হুইয়া থাকে, তাহা হইলে পুত্র[নিজে অনুষ্ঠানপূর্ব্বক] সেই কৰ্ম্ম পূরণ করিয়া এই সম্প্রত্তিকারী পিতাকে সেই কর্তব্যতা-বন্ধন হইতে বিমোচিত করে। এইরূপে পিতার কর্তব্য পূরণ করে বলিয়াই সন্তানের পুত্র নাম প্রসিদ্ধ। সেই পিতা[মৃত হইয়াও] এবংবিধ উপদেশপ্রাপ্ত পুত্ররূপে ইহলোকে বর্তমান থাকেন। মৃত্যুর পর সেই পিতাতে হিরণ্যগর্ভের এই সমুদয় অমর প্রাণ প্রবেশ করে, অর্থাৎ তখন তাহার মর্ত্যভাব চলিয়া যায় ॥ ৭১ ॥ ১৭॥.
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—এবং সাধ্যলোকত্রয়-ফলভেদেন বিনিযুক্তানি পুত্র- কৰ্ম্ম-বিদ্যাখ্যানি ত্রীণি সাধনানি; জায়া তু পুত্রকর্মার্থত্বাৎ ন পৃথক্ সাধনমিতি পৃথক্ নাভিহিতা; বিত্তং চ কর্মসাধনত্বাৎ ন পৃথক্ সাধনম্। বিদ্যাকর্মণোলোক- জয়হেতুত্বং স্বাত্মপ্রতিলাভেনৈব ভবতীতি প্রসিদ্ধম্। পুত্রস্য তু অক্রিয়াত্মকত্বাৎ কেন প্রকারেণ লোকজয়হেতুত্বমিতি ন জ্ঞায়তে; অতস্তদ্বক্তব্যমিতি অথ অনন্তরমারভ্যতে—
সম্পত্তিঃ সম্প্রদানম্; সম্প্রত্তিরিতি বক্ষ্যমাণস্য কর্ম্মণো নামধেয়ম্। পুত্রে হি স্বাত্মব্যাপারসম্প্রদানং করোত্যনেন প্রকারেণ পিতা, তেন সম্প্রত্তিসংজ্ঞকমিদং
কৰ্ম্ম। তৎ কস্মিন্ কালে কর্তব্যমিত্যাহ—সঃ পিতা যদা যস্মিন্ কালে প্রৈষ্যন্ মরিষ্যন্ মরিষ্যামীত্যরিষ্টাদিদর্শনেন মন্যতে, অথ তদা পুত্রমাহূয়াহ—ত্বং ব্রহ্ম, ত্বং যজ্ঞঃ, ত্বং লোক ইতি। স এবমুক্তঃ পুত্রঃ প্রত্যাহ; স তু পূর্ব্বমেবানু- শিষ্টো জানাতি—ময়ৈতৎ কর্তব্যমিতি, তেনাহ—অহং ব্রহ্ম, অহং যজ্ঞঃ, অহং লোক ইতি, এতত্রাক্যত্রয়ম্। ২
এতস্যার্থস্তিরোহিত ইতি মন্বানা শ্রুতির্ব্যাখ্যানায় প্রবর্ততে-যদ্বৈ কিঞ্চ যৎ কিঞ্চ অবশিষ্টম্ অনুক্তমধীতমনধীতঞ্চ, তস্য সর্ব্বস্যৈব ব্রহ্মেত্যেতস্মিন্ পদে একতা একত্বম্; যোহধ্যয়নব্যাপারো মম কর্তব্য আসীদেতাবন্তং কালং বেদবিষয়ঃ, স ইত ঊর্দ্ধং ত্বং ব্রহ্ম ত্বৎকর্তৃকোহস্তিত্যর্থঃ। তথা যে বৈ কে চ যজ্ঞা অনুষ্ঠেয়াঃ সন্তো ময়ানুষ্ঠিতাশ্চ অননুষ্ঠিতাশ্চ, তেষাং সর্ব্বেষাং যজ্ঞ ইত্যেতস্মিন্ পদে একতা একত্বম্; মৎকর্তৃকা যজ্ঞা যে আসন, তে ইত ঊর্দ্ধং ত্বং যজ্ঞঃ ত্বৎকর্তৃকা ভবন্তু ইত্যর্থঃ। যে বৈ কে চ লোকা ময়া জেতব্যাঃ সন্তো জিতা অজিতাশ্চ, তেষাং সর্ব্বেষাং লোক ইত্যেতস্মিন্ পদে একতা; ইত ঊর্দ্ধং ত্বং লোকঃ ত্বয়া জেতব্যাস্তে। ইত ঊর্দ্ধং ময়া অধ্যয়ন-যজ্ঞ-লোকজয়কর্তব্য-ক্রতুস্বরি সমর্পিতঃ, অহন্তু মুক্তোহস্মি কর্তব্যতাবন্ধনবিষয়াৎ ক্রতোঃ। স চ সর্ব্বং তথৈব প্রতিপন্নবান্ পুত্রঃ, অনুশিষ্টত্বাৎ। ৩
তত্রেমং পিতুরভিপ্রায়ং মন্বানা আচষ্টে শ্রুতিঃ-এতাবৎ এতৎপরিমাণং বৈ ইদং সর্ব্বং-যদ্ গৃহিণা কর্তব্যম্, যদুত বেদা অধ্যেতব্যাঃ, যজ্ঞা যষ্টব্যাঃ, লোকাশ্চ জেতব্যাঃ; এতমা সর্ব্বং সন্নয়ং সর্ব্বং হীমং ভারং মদধীনং মত্তোহপচ্ছিদ্য আত্মনি নিধায় ইতোহস্মাল্লোকাৎ মা মাম্ অভুনজৎ পালয়িষ্যতি-ইতি লুড়র্থে লঙ্, ছন্দসি কালনিয়মাভাবাৎ। যম্মাদেবং সম্পন্নঃ পুত্রঃ পিতরমস্মাল্লোকাৎ কর্তব্যতা-বন্ধনতো মোচরিষ্যতি, তস্মাৎ পুত্রমনুশিষ্টং লোক্যং লোকহিতং পিতুঃ আহুব্রাহ্মণাঃ। অতএব হেনং পুত্রমনুশাসতি-লোক্যোহয়ং নঃ স্যাদিতি- পিতরঃ। ৪
স পিতা যদা যস্মিন্ কালে এবংবিৎ পুত্রসমর্পিত-কর্তব্যতাক্রতুঃ অস্মাল্লোকাৎ প্রৈতি ম্রিয়তে, অথ তদা এভিরেব প্রকৃতৈর্বাত্মনঃপ্রাণৈঃ পুত্রমাবিশতি পুত্রং ব্যাপ্নোতি। অধ্যাত্মপরিচ্ছেদহেত্বপগমাৎ পিতুর্বাত্মনঃপ্রাণাঃ স্বেনাধিদৈবিকেন রূপেণ পৃথিব্যগ্নাদ্যাত্মনা ভিন্ন-ঘট-প্রদীপপ্রকাশবৎ সর্ব্বমাবিশন্তি; তৈঃ প্রাণৈঃ সহ পিতাপি আবিশতি, বাষ্মনঃপ্রাণাত্মভাবিত্বাৎ পিতুঃ; অহমস্ম্যনন্তা বাষ্মনঃপ্রাণা অধ্যাত্মাদিভেদবিস্তারাঃ—ইত্যেবং ভাবিতো হি পিতা; তস্মাৎ প্রাণানুবৃত্তিত্বং
পিতুর্ভবতীতি যুক্তমুক্তম্—এভিরেব প্রাণৈঃ সহ পুত্রমাবিশতীতি; সর্ব্বেষাং হ্যসা- বাত্মা ভবতি পুত্রস্য চ। এতদুক্তং ভবতি—যস্য পিতুরেবমনুশিষ্টঃ পুত্রো ভবতি, সোহস্মিন্নেব লোকে বর্ত্ততে পুত্ররূপেণ, নৈব মৃতো মন্তব্য ইত্যর্থঃ। তথা চ শ্রুত্যন্তরে—“সোহস্যায়মিতর আত্মা পুণ্যেভ্যঃ কর্ম্মভ্যঃ প্রতিধীয়তে” ইতি। ৫
অথেদানীং পুত্রনির্বচনমাহ-স পুত্রঃ যদি কদাচিদনেন পিত্রা অক্ষয়া কোণচ্ছিদ্রতঃ অন্তরা অকৃতং ভবতি কর্তব্যম্, তস্মাৎ কর্ত্তব্যতারূপাৎ পিত্রা অকৃতাৎ সর্ব্বম্মাল্লোকপ্রাপ্তিপ্রতিবন্ধরূপাৎ পুত্রো মুঞ্চতি মোচয়তি, তৎ সর্ব্বং স্বয়মনু- তিষ্ঠন্ পুররিত্বা; তস্মাৎ-পূরণেন ত্রায়তে স পিতরম্ যস্মাৎ, তস্মাৎ পুত্রো নাম। ইদং তৎ পুত্রস্য পুত্রত্বং-যৎ পিতুশ্ছিদ্রং পুররিত্বা ত্রায়তে। স পিতা এবংবিধেন পুত্রেণ মৃতোহপি সন্ অমৃতঃ অস্মিন্নেব লোকে প্রতিতিষ্ঠতি, এবমসৌ পিতা পুত্রেণেমং মনুষ্যলোকং জয়তি; ন তথা বিদ্যাকৰ্ম্মভ্যাং দেবলোক-পিতৃলোকৌ স্বরূপলাভসত্তামাত্রেণ; নহি বিদ্যাকৰ্ম্মণী স্বরূপলাভব্যতিরেকেণ পুত্রবদ্ব্যাপারান্ত- রাপেক্ষয়া লোকজয়হেতুত্বং প্রতিপদ্যেতে। অথ কৃতসম্প্রতিকং পিতরমেনম্ এতে বাগাদয়ঃ প্রাণা দৈবা হৈরণ্যগর্ভা অমৃতা অমরণধৰ্মাণ আবিশন্তি ॥ ৭১ ॥ ১৭
টীকা।—বৃত্তমনুবদতি—এবমিতি। পুত্রাদিবজ্জায়াবিত্তয়োরপি প্রকৃতত্বাৎ ফলবিশেষে বিনিয়োগো বক্তব্যঃ, ইত্যাশঙ্ক্যাহ—জায়া ত্বিতি। ন পৃথক্ পুত্রকর্মভ্যামিত শেষঃ। ন পৃথক্- সাধনং কর্ম্মণং সকাশাদিতি, দ্রষ্টব্যম্। ভবত্বেবং সাধনত্রয়নিয়মস্তথাপি বিদ্যাকর্ম্মণী হিত্বা সমনন্তরগ্রন্থে কিমিতি পুত্রনিরূপণমিত্যাশঙ্ক্যাহ—বিদ্যাকর্ম্মণোরিতি। যথোক্তে চোদ্যে পুত্রস্য লোকহেতুত্বজ্ঞাপনার্থং সংপ্রত্তিবাক্যমিত্যাহ—অত ইতি। ১
অথাত ইতি পদদ্বয়ং ব্যাখ্যায় সংপ্রত্তিপদং ব্যাচষ্টে-সংপ্রত্তিরিতি। কিমিদং সম্প্রদানং নাম, তদাহ-সংপ্রত্তিরিতীতি। তদেব কৰ্ম্ম বিশদয়তি-পুত্রে হীতি। অনেন প্রকারেণেতি বক্ষ্যমাণপ্রকারোক্তিঃ। অরিষ্টাদীত্যাদিপদেন দুঃস্বপাদিসংগ্রহঃ। প্রত্যাহ বাক্যত্রয়মিতি সম্বন্ধঃ। পুত্রস্যাহং ব্রহ্মেত্যাদিপ্রতিবচনে হেতুমাহ-স ত্বিতি। ময়া কাৰ্য্যং যদধ্যয়নাদি, তদেবাবশিষ্টং ত্বয়া কার্য্যমিতি পুত্রস্থ্য প্রাগনুশিষ্টতাভাবে প্রতিবচনানুপপত্তিরিত্যর্থঃ। ২
যদ্বৈ কিঞ্চেত্যাদিবাক্যানাং পুত্রানুমন্ত্রণবাক্যৈরর্থভেদাভাবাৎ পুনরুক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ- এতস্যেতি। যদ্বৈ কিঞ্চেত্যাদিবাক্যে বাক্যার্থমাহ—যোহধ্যয়নেতি। ত্বং ব্রহ্মেতিবাক্যবৎ ত্বং যজ্ঞ ইতি বাক্যমপি শক্যং ব্যাখ্যাতুমিত্যাহ—তথেতি। ব্রাহ্মণার্থং সংগৃহ্লাতি—মৎকর্তৃকা ইতি। ত্বং লোক ইত্যস্য ব্যাখ্যানং যে বৈ কে চেত্যাদি। তত্র পদার্থানুক্ত। বাক্যার্থমাহ— ইত ইতি। কিমিতি ত্বৎকর্ত্তৃকমধ্যয়নাদি ময়ি সমর্প্যতে, ত্বয়ৈব কিং নানুষ্ঠীয়তে, তত্রাহ—ইত উর্দ্ধমিতি। কর্তব্যতৈব বন্ধনং তদ্বিষয়ঃ ক্রতুঃ সঙ্কল্পস্তস্মাদিতি যাবৎ। স পুত্র ইত্যাদেস্তাৎ- পর্য্যমাহ—স চেতি। ৩
তত্রৈব যথোচিতানুশাসনোক্তিঃ। এষ্যা সর্ব্বমিত্যাদি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে-সর্ব্বং হীতি
অনঘতনে ভূতেহর্থে বিহিতস্য লঙো ভবিষ্যদর্থত্বং কথমিত্যাশঙ্ক্যাহ—ছন্দসীতি। পুত্রানুশাসনস্থ্য ফলবত্ত্বমাহ—যস্মাদিত্যাদিনা। ৪
কৃতসংপ্রত্তিকঃ সন্ পিতা কিং করোতীত্যপেক্ষায়ামাহ-স পিতেতি। কোহয়ং প্রবেশঃ? ন হি বিশিষ্টস্য কেবলস্য বা বিলে সর্পবৎ প্রবেশঃ সম্ভবত্যত আহ-অধ্যাত্মেতি। হেতুমিখ্যা- জ্ঞানাদিঃ। বাগাদিঘাবিষ্টেষপি কুতোহর্থান্তরস্য পিতুরাবেশধীরিত্যাশঙ্ক্যাহ-বাগিতি। তদ্ভাবিত্ব- মেব ক্ষোরয়তি-অহমিতি। ভাবনাফলমাহ-তস্মাদিতি। পুত্রবিশেষণাৎ পরিচ্ছিন্নত্বং পিতুস্তদবস্থমিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্ব্বেষাং হীতি। মৃতস্য পিতুরিতো লোকাদ্বাবৃত্তস্য কথং যথোক্ত- রূপত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-এতদুক্তমিতি। পুত্ররূপেণাত্র স্থিতিমেব বিভজতে-নৈবেতি। মৃতোহপি পিতাঽনুশিষ্টপুত্রাত্মনাত্র বর্ত্ততে নাম্মাদত্যন্তং ব্যাবৃত্তঃ ফলরূপেণ চ পরত্রেতি ভাবঃ। উক্তেহর্থে ঐতরেয়শ্রুতিং সংবাদয়তি-তথা চেতি। ষষ্ঠীপ্রথমাভ্যাং পিতাপুত্রাবুচ্যেতে। ৫
স যদীত্যাদিবাক্যমবতার্য্য ব্যাকরোতি-অথেত্যাদিনা। অকৃতমকৃতাদিতি চ চ্ছেদঃ। তস্মাদিতি প্রতীকমাদায় ব্যাকরোতি-পূরণেনেতি। তদেব প্রপঞ্চয়তি-ইদং তদিতি। পুত্রবৈশিষ্ট্যং নিগময়তি-স পিতেতি। পুত্রেণৈতল্লোকজয়মুপসংহরতি-এবমিতি। যথোক্তাৎ পুত্রাদিদ্যাকৰ্ম্মণোবিশেষমাহ-ন তথেতি। কথং তর্হি তাভ্যাং পিতা তৌ জয়তি, তত্রাহ- স্বরূপেতি। তদেব স্ফুটয়তি-ন হীতি। অনুশিষ্টপুত্রেণৈতল্লোকজয়িনং পিতরমধিকৃত্যাথৈন- মিত্যাদি বাক্যং, তদ্ব্যাকরোতি-অথেতি। পুত্রপ্রকরণবিচ্ছেদার্থোহথশব্দঃ ॥ ৭১ ॥ ১৭ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—যথোক্তপ্রকার সাধনীয় ত্রিবিধ লোকপ্রাপ্তিরূপ ফল- ভেদানুসারে পুত্র, কর্ম্ম ও অপরা বিদ্যা, এই তিন প্রকার সাধন কথিত হইয়াছে; পত্নীও একটি সাধন বটে, কিন্তু পুত্রোৎপাদন ও কর্ম্মসম্পাদনই পত্নীর প্রধান উদ্দেশ্য; সুতরাং উহা পৃথক্ স্বতন্ত্রসাধন নহে; এই কারণেই সাধনরূপে পত্নীর আর পৃথক্ নির্দেশ করা হয় নাই; এইরূপ বিত্তও কর্ম্মসম্পাদনেরই উপায়স্বরূপ; সুতরাং তাহাও স্বতন্ত্র সাধনরূপে পরিগণিত হয় নাই। তাহার পর বিদ্যা(উপা- সনা) ও কর্ম্ম যে, লোকবিশেষ জয়ে সহায়তা করে, তাহাও আত্মলাভ দ্বারাই করে, অর্থাৎ বিদ্যা ও কর্ম্ম উভয়ই ক্রিয়াত্মক; সুতরাং তাহারা উৎপন্ন হইবার পর লোকবিশেষ-প্রাপ্তির উপায় হইতে পারে; কিন্তু পুত্র যখন ক্রিয়াত্মক নহে,(সিদ্ধ বস্তু), তখন সেই পুত্র যে, কি প্রকারে লোকজয়ের হেতু বা সাধন হইতে পারে, তাহা ত বুঝা যাইতেছে না; অতএব তাহা প্রকাশ করিয়া বলা উচিত; এইজন্য পরবর্তী শ্রুতি আরব্ধ হইতেছে—
‘অথ’ অর্থ—অনন্তর—অতঃপর; সম্পত্তি অর্থ—সম্প্রদান; ‘সম্পত্তি’ শব্দটি বক্ষ্যমাণ কর্ম্মের নাম। পিতা নিম্নলিখিত পদ্ধতিক্রমে পুত্রের উপর নিজের অনু- ষ্ঠেয় কর্ম্মসম্পাদনের ভার সমর্পণ করিয়া থাকেন; এই কারণে এই কর্ম্মটির নাম হইয়াছে—‘সম্পত্তি’। সেই কর্ম্মটি কোন সময়ে করিতে হইবে, তাহা বলিতেছেন—
সেই পিতা যে সময়ে অরিষ্টাদিদর্শনে(১) মনে করেন—‘আমি শীঘ্রই পরলোকে গমন করিব—মরিব’ এইরূপ বুঝিতে পারেন, সে সময় পুত্রকে আহ্বান করিয়া বলিতে থাকেন—তুমি ব্রহ্ম(বেদ), তুমি যজ্ঞ এবং তুমিই[আমার] লোক। সেই পুত্র এবংপ্রকার অভিহিত হইয়া প্রতিবচনে বলেন,—পুত্র পূর্ব্বেই ঐরূপ উপদেশ পাইয়াছিল—জানিয়াছিল যে, আমাকে এইরূপ করিতে হইবে; তাই সে তখন প্রতিবচনের সময় বলে যে, হাঁ, আমি ব্রহ্ম, আমি যজ্ঞ এবং আমিই লোক; বুঝিতে হইবে, এই তিনটি পৃথক্ বাক্য। ২
এই অংশের অর্থ প্রচ্ছন্ন বা অস্পষ্ট আছে মনে করিয়া শ্রুতি নিজেই তাহার ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হইয়া বলিতেছেন-আমার যাহা কিছু অনুক্ত, অধীত বা অনধীত অবশিষ্ট আছে,[তুমি] সে সমুদয়েরই ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম-পদে একতা অর্থাৎ একত্ব বা অভিন্নত্ব বিবক্ষিত হইয়াছে; অভিপ্রায় এই যে, এতকাল বেদ সম্বন্ধে আমার যে, অধ্যয়ন কার্য্য কর্তব্য ছিল, ইতঃপর তুমিই সেই ব্রহ্ম,-তোমার কর্তৃত্বে তাহা সম্পন্ন হউক; সেইরূপ, যে সমস্ত যজ্ঞ আমার অনুষ্ঠেয় ছিল, তন্মধ্যে যে সমস্ত যজ্ঞ আমি অনুষ্ঠান করিয়াছি বা করি নাই; সে সমুদয়েরও তুমি যজ্ঞ; এখানেও একত্ব বিবক্ষিত। অভিপ্রায় এই যে, ইতঃপূর্ব্বে যে সমস্ত যজ্ঞে আমার কর্তৃত্ব ছিল, ইহার পর তুমি সেই সকল যজ্ঞ, অর্থাৎ সে সমুদয় যজ্ঞ তোমার কর্তৃত্বে সম্পন্ন হউক; আর যে সমস্ত লোক বা ভোগভূমি আমার জয় করা(আয়ত্ত করা) উচিত ছিল, তন্মধ্যে জিত ও অজিত উভয় প্রকারই আছে, তুমি সে সমুদয় লোক; এখানেও লোকপদে একত্ব বিবক্ষিত; ইতঃপর তুমি সেই লোক, অর্থাৎ তোমাকে সেই সমুদয় লোক জয় করিতে হইবে। বুঝিবে যে, ইহার পরে আমার অধ্যয়ন, যজ্ঞানুষ্ঠান ও লোকজয় করার ভার তোমাতে সমর্পিত হইল; আমি কিন্তু অবশ্য- কর্তব্যতারূপ যজ্ঞ-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইলাম। পুত্র পূর্ব্বেই ঐরূপ শিক্ষা পাইয়াছিল; কাজেই সে পিতার কথাগুলি যথাযথরূপে অঙ্গীকার করিয়া লইবে।
শ্রুতি এ বিষয়ে উক্ত পিতার এইরূপ অভিপ্রায় মনে করিয়া বলিতেছেন- ‘এতাবৎ’ এই পরিমাণই এ সমস্ত অর্থাৎ গৃহীর কর্তব্য কৰ্ম্ম,-বেদ অধ্যয়ন করিতে হইবে, যজ্ঞ সম্পাদন করিতে হইবে, এবং লোক-সমূহ জয় করিতে হইবে। এই পুত্র আমার কর্তব্য সমস্ত ভার আমা হইতে পৃথক্ করিয়া অর্থাৎ আমার কর্তব্যভার নিজে গ্রহণ করিয়া এই জগৎ হইতে প্রস্থিত আমাকে পালন করিবে। বেদেতে কালব্যবহারের বাঁধাবাঁধি নিয়ম না থাকায় ভবিষ্যদর্থে অতীতকালবোধক লঙ্- বিভক্তির প্রয়োগ(অভুনজৎ) হইয়াছে। যেহেতু, এবংবিধ সৎপুত্র(পিতার কর্তব্য- ভারগ্রহণকারী পুত্র) ইহলোকে পিতাকে কর্তব্যতা-বন্ধন হইতে বিমোচিত করিবেন; সেই জন্যই ব্রাহ্মণগণ অনুশিষ্ট(উক্তপ্রকার শিক্ষাপ্রাপ্ত) পুত্রকে পিতার লোক্য-স্বর্গাদিলোক জয়ের উপযোগী বলিয়া থাকেন; এই উদ্দেশ্যেই- এই পুত্র আমার লোকলাভের অনুকূল হইবে মনে করিয়াই জনকগণ পুত্রকে যথোক্তপ্রকার উপদেশ দিয়া থাকেন। ৪
এবংবিধ জ্ঞানসম্পন্ন সেই পিতা যে সময় আপনার কর্তব্যভার পুত্রের উপর সমর্পণ করিয়া এই পৃথিবী হইতে প্রস্থান করেন,-মৃত্যুগ্রস্ত হন, তখন তিনি এই প্রস্তাবিত বাক্, মনঃ ও প্রাণ দ্বারাই পুত্রেতে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ’ পুত্রেতে প্রবিষ্ট হন। অভিপ্রায় এই যে, ঘট ভগ্ন হইলে তন্মধ্যস্থিত প্রদীপের প্রভা যেমন আবরণ নষ্ট হওয়ায় চতুর্দিকে প্রসারিত হয়, তেমনি সেই পিতার বাক্, মনঃ, প্রাণও তখন অধ্যাত্ম-পরিচ্ছেদ ছিন্ন করায় ‘অর্থাৎ দৈহিক সীমায় আবদ্ধ না থাকায় স্বীয় প্রকৃত রূপে-আধিদৈবিক পৃথিবী ও অগ্নিপ্রভৃতিরূপে সর্ব্ববস্তুর মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া থাকেন; পিতাও বাক্, মনঃ ও প্রাণকে আত্মভাবে ভাবনা করায় উক্ত বাক্, মনঃ ও প্রাণের সহিত প্রবিষ্ট হইয়া থাকেন; কারণ, পিতা তখন এইরূপ ভাবনাসম্পন্ন হন যে, আমি হইতেছি অধ্যাত্ম ও অধিদৈবাদি বিবিধভাবে বিস্তৃতিপ্রাপ্ত অনন্ত বা অপরিচ্ছিন্ন বাক্, মনঃ ও প্রাণস্বরূপ; সেই কারণে পিতা তখন প্রাণের অনুবৃত্তি বা অনুসরণ করিয়া থাকেন; অতএব ‘এভিরেব প্রাণৈঃ সহ’ ইত্যাদি বাক্যে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা যুক্তিযুক্তই বটে। বিশেষতঃ পিতা তখন সকলেরই আত্মস্বরূপ হন; সুতরাং পুত্রের সঙ্গেও অভিন্ন হইয়া পড়েন, অতএব এখানে যে, ‘এভিরেব প্রাণৈঃ সহ পুত্রমাবিশতি’ বলা হইয়াছে, তাহাও যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। অভিপ্রায় এই যে, যে পিতার পুত্র এইরূপ অনুশিষ্ট বা সুশিক্ষাপ্রাপ্ত হয়, তিনি পুত্ররূপে ইহলোকেই বর্তমান থাকেন, তাঁহাকে কখনও মৃত বলিয়া মনে করা উচিত নহে। দেখ, অন্য শ্রুতিতেও সেইরূপ
কথাই আছে—‘তাহার(মৃত পিতার) এই পুত্ররূপী অপর আত্মা পুণ্যকর্ম্ম- সম্পাদনের জন্য প্রতিনিধিরূপে রক্ষিত হয়’ ইতি। ৫
ইহার পর, এখন পুত্র-শব্দের নির্বচন—যোগার্থ বলিতেছেন,—এই পিতা কর্তৃক যদি কখনও কোনপ্রকারে কোন কর্তব্যকর্ম্ম অসম্পাদিত থাকে, তাহা হইলে সেই পুত্র নিজ অনুষ্ঠান দ্বারা তাহা পূরণ করিয়া সেই পিতার অসম্পাদিত কৰ্ম্মলভ্য স্বর্গাদি-লোকপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকীভূত সেই কর্তব্যতা-বন্ধন হইতে পিতাকে বিমুক্ত করে; সেই হেতু—যেহেতু পুত্র কর্তব্যপরিপূরণ দ্বারা পিতাকে পরিত্রাণ করে, সেই হেতু পুত্র নামে প্রসিদ্ধ; ইহাই পুত্রের পুত্রত্ব অর্থাৎ পুত্রসংজ্ঞার কারণ যে, সে পিতার ছিদ্র অর্থাৎ অপূর্ণতা পূরণ দ্বারা পিতাকে পরিত্রাণ করে। সেই পিতা মৃত হইয়াও এবংবিধ পুত্র দ্বারা ইহলোকেই প্রতিষ্ঠিত(বর্তমান) থাকেন। এই প্রকারে উক্ত পিতা ঈদৃশ পুত্র দ্বারা এই মনুষ্য লোক জয় করেন; কিন্তু বিদ্যা ও কৰ্ম্ম দ্বারা এই প্রকারে দেবলোক ও পিতৃলোক জয় করিতে পারেন না; পুত্র যেরূপ নিজের অস্তিত্ব লাভের অতিরিক্ত কর্মানুষ্ঠান দ্বারা লোক-জয় সম্পাদন করে, বিদ্যা ও কৰ্ম্ম কিন্তু সেরূপ কিছু করে না, তাহারা কেবল আত্মলাভ করি- য়াই লোকজয়ে সহায়তা করিয়া থাকে। এইরূপে পুত্রেতে কর্তব্য কর্মের ভারার্পণ- কারী পিতাতে দৈব অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভসম্বন্ধীয় এই অমর প্রাণসমূহ প্রবেশ করিয়া থাকে ॥ ৭১ ॥ ১৭ ॥
পৃথিব্যৈ চৈনমগ্নেশ দৈবী বাগাবিশতি, সা বৈ দৈবী বাগ্ যয়া যদযদেব বদতি তত্তদ্ভবতি ॥ ৭২ ॥ ১৮ ॥
সরলার্থঃ।—[ কথমাবিশতীতি প্রতিপাদয়িতুমাহ—“পৃথিব্যৈ” ইত্যাদি।] পৃথিব্যৈ(পৃথিব্যাঃ) চ অগ্নেঃ চ(পৃথিব্যগ্যোঃ) দৈবী(অধিদেবতারূপা) বাক্ [ আধ্যাত্মিকপরিচ্ছেদং ত্যক্তা] এনম্(কৃতসম্প্রতিকং) আবিশতি। সা বৈ বাক্ দৈবী(শুদ্ধা—অনৃতাদিদোষরহিতা); যয়া(দৈব্যা বাচা) যৎ যৎ এব বদতি, তৎতৎ ভবতি(সাফল্যং লভতে,—অমোঘা চাস্য বাগ্ ভবতীত্যর্থঃ)॥ ৭২ ॥ ১৮ ॥
মূলানুবাদ।—কি প্রকারে প্রবেশ করে, তাহা বলিতেছেন— পৃথিবী ও অগ্নির অধিদেবতা বাক্ যথোক্ত সম্প্রত্তিকারী পুরুষে প্রবেশ করে। তাহাই দৈবী বাক্, যাহা দ্বারা যাহা যাহা বলা হয়, তাহা তাহাই সম্পন্ন হয়; অর্থাৎ তাহার অমোঘ বাক্শক্তি লাভ হয় ॥ ৭২ ॥ ১৮ ॥
শৈঙ্কর-ভাষ্যম্।—কথমিতি বক্ষ্যতি—পৃথিব্যা চৈনমিত্যাদি। এবং
পুত্রকর্মাপরবিদ্যানাং মনুষ্যলোকপিতৃলোক দেবলোকসাধ্যার্থতা প্রদর্শিতা শ্রুত্যা স্বরমেব। অত্র কেচিৎ বাবদুকাঃ শ্রুত্যুক্তবিশেষার্থানভিজ্ঞাঃ সন্তঃ পুত্রাদিসাধনানাং মোক্ষার্থতাং বদন্তি; তেষাং মুখাপিধানং শ্রুত্যেদং কৃতম্—“জায়া মে স্যাৎ” ইত্যাদি পাক্তং কাম্যং কর্ম্মেত্যুপক্রমেণ, পুত্রাদীনাং চ সাধ্যবিশেষবিনিয়োগোপসংহারেণ চ; তস্মাদ্ ঋণশ্রুতিঃ অরিদ্বদ্বিষয়া, ন পরমাত্মবিদ্বিষয়েতি সিদ্ধম্; বক্ষ্যতি, চ— “কিং প্রজয়া করিষ্যামো যেষাং নোহয়মাত্মায়ং লোকঃ” ইতি। ১
কেচিত্তু পিতৃলোক-দেবলোকজয়োহপি পিতৃলোক-দেবলোকাভ্যাং ব্যাবৃত্তিরেব; তস্মাৎ পুত্রকর্মাপরবিদ্যাভিঃ সমুচ্চিত্যানুষ্ঠিতাভিঃ ত্রিভ্য এতেভ্যো লোকেভ্যো ব্যাবৃত্তঃ পরমাত্মবিজ্ঞানেন মোক্ষমধিগচ্ছতীতি পরস্পরয়া মোক্ষার্থান্যের পুত্রাদি- সাধনানীচ্ছন্তি। তেষামপি মুখাপিধানায় ইয়মেব শ্রুতিরুত্তরা কৃতসম্প্রতিকস্য পুত্রিণঃ কর্ম্মিণঃ এ্যন্নাত্মবিদ্যাবিদঃ ফলপ্রদর্শনায় প্রবৃত্তা। ২
ন চেদমেব ফলং মোক্ষফলমিতি শক্যং বক্তুম্, এ্যন্নসম্বন্ধাৎ মেধাতপঃকার্য্য- ত্বাচ্চান্নানাং পুনঃ পুনর্জনয়ত ইতি দর্শনাৎ, “যদ্ধৈতন্ন কুৰ্য্যাৎ ক্ষীয়েত হ” ইতি চ ক্ষয়শ্রবণাৎ, শরীরং জ্যোতীরূপমিতি চ কার্য্য-করণত্বোপপত্তেঃ, “ত্রয়ং বা ইদম্”- ইতি চ নামরূপকৰ্ম্মত্বেনোপসংহারাৎ। ন চেদমেব সাধনত্রয়ং সংহতং সৎ কস্য- চিন্মোক্ষং কশ্যচিৎ এ্যন্নাত্মফলমিত্যম্মাদেব বাক্যাদবগন্তুং শক্যম্, পুত্রাদিসাধনানাং এ্যন্নাত্মফলদর্শনেনৈবোপক্ষীণত্বাদ্বাক্যস্য। ৩
পৃথিব্যৈ পৃথিব্যাশ্চ এনমগ্নেশ দৈবী অধিদৈবাত্মিকা বাক্ এনং কৃতসম্প্রত্তিকম্ আবিশতি; সর্ব্বেষাং হি বাচ উপাদানভূতা দৈবী বাক্ পৃথিব্যগ্নিলক্ষণা; সা হধ্যাত্মিকাসঙ্গাদিদোষৈনিরুদ্ধা; বিদুষস্তদ্দোষাপগমে আবরণভঙ্গ ইবোদকং প্রদীপপ্রকাশবচ্চ ব্যাপ্নোতি। তদেতদুচ্যতে-পৃথিব্যা অগ্নেশ্চৈনং দৈবী বাগাবি- শতীতি। সা চ দৈবী বাক্ অনৃতাদি-দোষরহিতা শুদ্ধা, যয়া বাচা দৈব্যা যৎ যদেব আত্মনে পরস্মৈ বা বদতি, তৎ তদ্ভবতি-অমোঘা অপ্রতিবদ্ধাস্য বাগ্ভব- তীত্যর্থঃ ॥ ৭২॥ ১৮॥
টীকা।—আবেশপ্রকারবুভুৎসায়ামুত্তরবাক্যপ্রবৃত্তিং প্রতিজানীতে—কণমিত্যাদিনা। পৃথিব্যৈ চেত্যাদিবাক্যস্য ব্যাবর্ত্তং পক্ষং বৃত্তানুবাদপূর্ব্বকমুখাপয়তি—এবমিতি। অত্রেতি বৈদিকান্নির্দ্ধারয়িতুং সপ্তমী। বহুবদনশীলত্বে হেতুঃ শ্রুত্যুক্তেতি। মোক্ষার্থতামৃণাপাকরণ- শ্রুতিস্মৃতিভ্যাং বদন্তীতি শেষঃ। মীমাংসকপক্ষং প্রকৃতশ্রুতিবিরোধেন দূষরতি—তেষামিতি। কথমিত্যাশঙ্ক্য শ্রুতেরাদিমধ্যাবসানালোচনয়া পুত্রাদেঃ সংসারফলত্বাবগমান্ন মুক্তিফলতেত্যাহ— জায়েত্যাদিনা। পুত্রাদীনাং চেতি চকারাদেতাবান্ বৈ কাম ইতি মধ্যসংগ্রহঃ। যদুক্ত- মৃণাপাকরণশ্রুতিস্মৃতিভ্যাং পুত্রাদের্মুক্তিফলতেতি, তত্রাহ—তন্মাদিতি। পুত্রাদেঃ শ্রুতং সংসার-
ফলত্বং পরাভ্রষ্টুং তচ্ছব্দঃ। শ্রুতিশব্দঃ স্মৃতেরুপলক্ষণার্থঃ। শ্রুতিস্মৃত্যেরবিরক্তবিষয়ত্বে বাক্য- শেষমনুকূলয়তি—বক্ষ্যতি চেতি। ১
মীমাংসকপক্ষং নিরাকৃত্য ভর্তৃপ্রপঞ্চপক্ষমুখাপয়তি-কেচিন্বিতি। মনুষ্যলোকজয়স্ততো ব্যাবৃত্তির্ষথেত্যপেরর্থঃ। পুত্রাদিসাধনাধীনতয়া লোকত্রয়ব্যবৃত্তাবপি কথং মোক্ষঃ সম্পদ্যতে, ন হি পুত্রাদীন্যেব মুক্তিসাধনানি বিরক্তত্ববিরোধাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। পৃথিব্যে চেত্যাদ্যোত্তরা শ্রুতিরেব মীমাংসকমতবস্তুর্প্রপঞ্চমতমপি নিরাকরোতীতি দূষয়তি-তেষামিতি। কথং সা তন্মতং নিরাকরোতীত্যাশঙ্ক্য শ্রুতিং বিশিনষ্টি-কৃতেতি। ২
এ্যন্নাত্মোপাসিতুস্তদাপ্তিবচনবিরুদ্ধং পরমতমিত্যযুক্তং, তদাপ্তেরেব মুক্তিত্বাদিত্যাশঙ্ক্যাহ- ন চেতি। তথাপি কথং যথোক্তং ফলং মোক্ষোন ভবতি, তত্রাহ-মেধেতি। এ্যন্নাত্মনো জ্ঞানকৰ্ম্মজন্যত্বে হেতুমাহ-পুনঃ পুনরিতি। সূত্রাপ্তেরমুক্তিত্বে হেত্বন্তরমাহ-যদ্ধেতি। কার্য্য- করণবত্ত্বশ্রুতেরপি সূত্রভাবো ন মুক্তিরিত্যাহ-শরীরমিতি। অবিদ্যাতদুখ-দ্বৈতস্য এ্যাত্মকত্বে- নোপসংহারাত্তদাত্মসূত্রভাবো বন্ধান্তর্ভূতো ন মুক্তিরিতি যুক্ত্যন্তরমাহ-ত্রয়মিতি। নম্ববিরক্তস্যাজ্ঞস্য সূত্রাপ্তিফলমপি কর্মাদিবিরক্তস্য বিদুষো মুক্তিফলমিতি ব্যবস্থিতিরেত্যাহ-ন চেদমিতি। ন হি পৃথিব্যে চেত্যাদিবাক্যস্যৈকস্য সকৃৎ শ্রুতস্যানেকার্থত্বম্। ভিদ্যতে হি তথা বাক্যমিতি ন্যায়াদিত্যর্থঃ। ৩
পৃথিব্যে চেত্যাদিবাক্যাবষ্টন্তেন পক্ষদ্বয়ং প্রতিক্ষিপ্য তদক্ষরাণি ব্যাচষ্টে-পৃথিব্যা ইতি। এনমিত্যুক্তমনুঘ্ন ব্যাকরোতি-এনমিতি। কথং পুনঃ সূত্রাত্মভূতা বাগুপাসকমাবিশতি, তত্রাহ-সর্ব্বেষাং হীতি। তর্হি তয়োরভেদাদবিদুষোহপি ব্যাপ্তৈব বাগিতি বিদুষি বিশেষো নাস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-সা হীতি। দৈব্যাং বাচি দোষবিগমমুত্তরবাক্যেন সাধয়তি-সা চেতি। বিদ্বদ্বাচঃ স্বরূপং সংক্ষিপ্তপতি অমোঘেতি। ৭২।১৮।
ভাষ্যানুবাদ।—কি প্রকারে, তাহা বলিতেছেন—“পৃথিব্যে চৈনম্” ইত্যাদি। এই প্রকারে পুত্র দ্বারা মনুষ্যলোক, কর্ম্ম দ্বারা পিতৃলোক ও বিদ্যা দ্বারা দেবলোক জয় করাই পুত্র, কর্ম্ম ও অপরা বিদ্যার(ব্রহ্মবিদ্যা ভিন্ন বিদ্যার) প্রধান ফল, ইহা স্বয়ং শ্রুতিই প্রদর্শন করিয়াছেন। এ বিষয়ে কোন কোন বাবদুক(বাচাল) শ্রুতিবাক্যের বিশেষার্থ বুঝিতে না পারিয়া পুত্র, কর্ম্ম ও অপরা বিদ্যারও মোক্ষসাধনতা কল্পনা করিয়া থাকেন। শ্রুতি নিজেই উপক্রমে “জায়া মে স্যাৎ” ইত্যাদি কাম্য পাঙ্ক্ত কর্ম্মের উল্লেখ দ্বারা, এবং উপসংহারেও পুত্রাদিকে ফল- বিশেষসাধনোদ্দেশ্যে বিনিযুক্ত করিয়া তাহাদের মুখ বন্ধ করিয়া দিয়াছেন; অতএব পূর্ব্বোক্ত ঋণবোধক শ্রুতি ব্রহ্মবিদ্যারহিত অজ্ঞ লোকের সম্বন্ধেই প্রযুক্ত হইয়াছে, কিন্তু পরমাত্মবিৎ জ্ঞানী লোকের সম্বন্ধে নহে, ইহা সিদ্ধ হইল; এবং পরেও বলিবেন—‘আমরা সন্তান দ্বারা কি করিব, যাহা দ্বারা আমাদের এই পরমাত্মলাভ সম্পন্ন হইবে না’ ইতি। ১
কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, ‘পিতৃলোক ও দেবলোক জয় করা’ শব্দের অর্থও পিতৃলোক ও দেবলোক হইতে ব্যাবৃত্তি(বিরক্তি বা নিবৃত্তি) ভিন্ন আর কিছুই নহে; অতএব একসঙ্গে পুত্র, কৰ্ম্ম ও অপরা বিদ্যার অনুষ্ঠান করিলে এই ত্রিবিধ লোক হইতে লোকের নিবৃত্তি বা বৈরাগ্য উপস্থিত হইবে, অনন্তর বৈরাগ্যসম্পন্ন সেই পুরুষই ক্রমে পরমাত্ম-বিষয়ে জ্ঞান লাভ করিয়া, তদ্দ্বারা মোক্ষ পর্য্যন্ত লাভ করিতে পারেন; অতএব পরম্পরাসম্বন্ধে পুত্রাদি সাধনত্রয়ও মোক্ষলাভেরই উপায়স্বরূপ ইত্যাদি। অন্নত্রয়ে আত্মজ্ঞানসম্পন্ন পূর্ব্বোক্ত সম্প্রত্তিকারী পুত্রবান্ কর্মীর ফলপ্রদর্শনে প্রবৃত্ত স্বয়ং শ্রুতিই তাহাদের মুখ বন্ধ করিবার মত উত্তর দিয়াছেন। অভিপ্রায় এই যে, পুত্র ও কর্ম্মাদি সাধনগুলি যদি সত্যসত্যই মোক্ষ-সাধন হইত, তাহা হইলে কখনই মোক্ষসাধন পুত্রকে লৌকিক ফলসাধনে বিনিযুক্ত করা হইত না। ২
আর যথোক্ত ফলই যে, মোক্ষফল, একথাও বলিতে পারা যায় না; কারণ, এই ফল অন্নত্রয়ের সহিত সম্বদ্ধ, অন্নত্রয়ও আবার মেধা ও তপস্যার কার্য্য বা ফল। শ্রুতিতে পুনঃ পুনঃ অন্নোৎপাদনের কথা আছে, এবং ‘যদি উৎপাদন না করিতেন, তাহা হইলে সে সমস্ত নিশ্চয়ই ক্ষয় হইত’, এই শ্রুতিতে ক্ষয়েরও উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ‘শরীর জ্যোতিঃস্বরূপ’ এখানে আবার কার্য্য ও সাধনত্বের নির্দেশ রহিয়াছে; অধিকন্তু উপসংহারে “এয়ং বা ইদং” শ্রুতিতে উক্ত ফলকে নাম, রূপ ও কর্মাত্মক বলিয়া বাক্য-সমাপ্তি করা হইয়াছে। আর একই বাক্য হইতে যে, দুই রকম কল্পনা করিবে—উক্ত সাধনত্রয় একত্র অনুষ্ঠিত হইয়া কাহারো পক্ষে মোক্ষ ফল, আবার কাহারো পক্ষে অন্নত্রয়ফল সমুৎপাদন করিয়া থাকে, তাহাও নহে, একই বাক্য হইতে ঐরূপে দুই রকম অর্থ কল্পনা কিছুতেই বুঝিতে পারা যায় না; কেন না, পুত্রাদি সাধনত্রয়ের অন্নত্রয়াত্মক ফল প্রদর্শনেই সম্পূর্ণ বাক্যটি পরিসমাপ্ত হইয়াছে; সুতরাং একই বাক্যে ঐ প্রকার দুই রকম ফলের কল্পনা করা ত কোন মতেই সঙ্গত হইতে পারে না। ৩
পৃথিবী ও অগ্নির দৈবী—অধিদেবতাস্বরূপা বাক্—ইহাতে যিনি যথোক্ত প্রকারে সংপ্রতি সম্পাদন করেন, তিনি তাহাতে প্রবেশ করেন। পৃথিবী ও অগ্নিরূপা বাক্ হইতেছে সর্ব্বপ্রাণীর বাক্যের উপাদান বা উৎপত্তির কারণ; কিন্তু দেহাসক্তিদোষে সেই বাক্ নিরুদ্ধভাবে(পরিচ্ছিন্ন হইয়া) থাকে; জ্ঞানীর সেই আসক্তি-দোষ দূরীভূত হইয়া যায়; সুতরাং পরিচ্ছেদ-জনক আবরণও ভাঙ্গিয়া যায়, তখন আবরণভঙ্গে জল ও প্রদীপ-প্রকাশের ন্যায় বাক্ও বিস্তৃতি লাভ
করিয়া থাকে; “পৃথিব্যৈ অগ্নেশ” ইত্যাদি বাক্যে সেই অভিপ্রায়ই প্রকাশ করা হইয়াছে। সেই দৈবী বাক্ই অসত্যতাদি-দোষশূন্য অতি বিশুদ্ধ। যে ব্যক্তি নিজের জন্যই হউক বা পরের জন্যই হউক, এই দৈবী বাক্ দ্বারা যাহা যাহা বলেন, তাঁহার তাহাই সিদ্ধ হয়, অর্থাৎ ইহার বাক্য অমোঘ—অব্যাহত হয় ॥ ৭২ ॥ ১৮ ॥
দিবশ্চৈনমাদিত্যাচ্চ দৈবং মন আবিশতি, তদ্বৈ দৈবং মনো যেনানন্দ্যেব ভবত্যথো ন শোচতি ॥ ৭৩ ॥ ১৯ ॥
সরলার্থঃ।—তথা দিবঃ(দ্যুলোকাৎ) চ আদিত্যাৎ(সূর্য্যাৎ) চ(অপি) দৈবং(স্বভাবনিৰ্ম্মলং) মনঃ এনং(কৃতসম্প্ৰতিকং জনং) আবিশতি। তৎ বৈ(এব) দৈবং মনঃ,[কিং তৎ?] যেন(মনসা)[জনঃ] আনন্দী(আনন্দবান্) এব ভবতি, অথো(পুনঃ) ন শোচতি(ন দুঃখমনুভবতি, তৎ) ॥ ৭৩ ॥ ১৯ ॥
মূলানুবাদ।—সেইরূপ দ্যুলোক এবং আদিত্য হইতেও দৈব মন আসিয়া ইহাতে প্রবিষ্ট হয়। তাহাই সেই দৈব মন, যে মন দ্বারা এই ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্ন আনন্দী—কেবলই সুখী হয়, কিন্তু কখনও শোক পায় না;[কারণ, তখন কোন প্রকার দুঃখ-কারণের সহিত তাহার সম্বন্ধ থাকে না]॥ ৭৩॥ ১৯॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা দিবশ্চৈনম্ আদিত্যাৎ চ দৈবং মন আবিশতি,— তচ্চ দৈবং মনঃ, স্বভাবনিৰ্ম্মলত্বাৎ; যেন মনসা অসাবানন্দ্যেব ভবতি সুখ্যেব ভবতি; অথো অপি ন শোচতি, শোকাদিনিমিত্তাসংযোগাৎ॥ ৭৩॥ ১৯॥
টাকা।—বাচি দর্শিতস্যায়ং মনস্তুতিদিশতি—তথেতি। যৎ মনঃ স্বভাবনির্মূলত্বেন দৈব- মিত্যুক্তং, তদেব বিশিনষ্টি—যেনেতি। অসাবিতি বিদ্বদুত্তিঃ। যেন মনসা বিদ্বান্ন শোচত্যপি তদ্ধেত্বভাবাৎ, তদ্দৈবমিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ৭৩। ১৯।
ভাষ্যানুবাদ।—সেই প্রকার, দ্যুলোক হইতে ও আদিত্য হইতে দৈব মন তাহাতে প্রবেশ করে, স্বভাব-শুদ্ধ বলিয়া তাহাই দৈব মন,—যে মন দ্বারা এই ব্যক্তি কেবলই আনন্দী—সুখীই হন; কখনও শোক করেন না; কারণ, তখন তাহার কোন প্রকার শোক-কারণের সহিত সম্বন্ধ থাকে না॥ ৭৩॥ ১৯॥
অদ্যশ্চৈনং চন্দ্রমসশ্চ দৈবঃ প্রাণ আবিশতি, স বৈ দৈবঃ প্রাণো যঃ সঞ্চরশ্চাসঞ্চরশ্চ ন ব্যথতেহথো ন রিষ্যতি, স এবংবিৎ সর্ব্বেষাং ভূতানামাত্মা ভবতি, যথৈষা দেবতৈবং সঃ, যথৈতাং দেবতাং সর্ব্বাণি ভূতান্যবস্ত্যেবং
হৈবংবিদং সর্ব্বাণি ভূতান্যবন্তি। যদু কিঞ্চেমাঃ প্রজাঃ শোচন্ত্যমৈবাসাং তদ্ভবতি পুণ্যমেবামুং গচ্ছতি, ন হ বৈ দেবান্ পাপং গচ্ছতি ॥ ৭৪ ॥ ২০ ॥
সরলার্থঃ।—তথা অদ্যঃ চ চন্দ্রমসঃ চ দৈবঃ প্রাণঃ এনং(কৃতসম্প্রতিকং.. জনং) আবিশতি; সঃ বৈ(এব) দৈবঃ(বিশুদ্ধঃ) প্রাণঃ, যঃ(প্রাণঃ) সঞ্চরন্ (ব্যাপারং কুর্ব্বন্) চ অসঞ্চরন্ চ(ব্যাপাররহিতঃ চ—সর্ব্বাসু অবস্থাসু চ) ন ব্যথতে (ন কাতর্য্যম্ অনুভবতি), ন রিষ্যতি(ন বিনশ্যতি) অথো(অপি)। সঃ এবং- বিদ(ত্র্যন্নাত্মদর্শী জনঃ) সর্বেষাং ভূতানাং আত্মা(সর্ব্বাত্মা) ভবতি; যথা এষা(পূর্ব্বোক্তা) দেবতা(হিরণ্যগর্ভঃ), এবং সঃ(ত্র্যন্নাত্মদর্শী); সর্বাণি ভূতানি যথা এতাং দেবতাং(হিরণ্যগর্ভং) অবন্তি(যজ্ঞাদিভিঃ পালয়ন্তি পূজয়ন্তি), এবং(তথা) হ(এব) সর্ব্বাণি এবংবিদং(ত্র্যন্নাত্মদর্শিনং) অবন্তি (পূজয়ন্তি)। ইমাঃ প্রজাঃ(জনাঃ) যৎ উ কিং চ(যৎকিঞ্চিৎ) শোচন্তি, আসাং(প্রজানাং) তৎ(শোচনং) অমা(সহ)[প্রজাভিঃ] এব ভবতি; অমুং (ত্র্যন্নাত্মবিদং) তু পুণ্যং(শুভং) এব গচ্ছতি; ন হ(নৈব) দেবান্ পাপং.. গচ্ছতি(দেবা ন পাপিনঃ ভবন্তি ইত্যর্থঃ) ॥ ৭৪॥ ২০॥
মূলানুবাদ?—জল এবং চন্দ্র হইতেও দৈব প্রাণ আসিয়া অন্নত্রয়বিদ্ ব্যক্তিতে প্রবেশ লাভ করে। তাহাই দৈব প্রাণ, যাহা সঞ্চরণ করুক বা না-ই করুক, কোন অবস্থায়ই ব্যথিত হয় না, এবং বিনষ্টও হয় না; যথোক্ত ত্রিবিধ অন্নতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি সর্বভূতের আত্ম-- স্বরূপ হন—এই দেবতা—হিরণ্যগর্ভ যেরূপ(সর্বভূতের আত্মা), তিনিও তেমনি; এবং সমস্ত ভূতগণ যেমন এই দেবতার(হিরণ্য- গর্ভের) রক্ষা করেন—যজ্ঞাদি দ্বারা পূজা করেন, তেমনি এই অন্নত্রয়- বিদ্ ব্যক্তিকেও সর্বভূতে রক্ষা করিয়া থাকে। এই প্রাণিগণ যাহা কিছু শোক করিয়া থাকে, সেই শোক সর্বপ্রাণি-সাধারণ হইয়া থাকে, কিন্তু অন্নত্রয়াত্মবিদ্ ব্যক্তিতে কেবল পুণ্যই গমন করে; কেননা, পাপ কখনই দেবগণকে আশ্রয় করিতে পারে না ॥ ৭৪ ॥ ২০ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা অন্ত্যশ্চৈনং চন্দ্রমসশ্চ দৈবঃ প্রাণ আবিশতি; সং বৈ দৈবঃ প্রাণঃ কিংলক্ষণ ইত্যুচ্যতে—যঃ সঞ্চরন্ প্রাণিভেদেষু, অসঞ্চরন্ সমষ্টি-
ব্যষ্টিরূপেণ, অর্থবা সঞ্চরন্ জঙ্গমেষু অসঞ্চরন্ স্থাবরেষু, ন ব্যথতে ন দুঃখনিমিত্তেন ভয়েন যুজ্যতে; অপো অপি ন রিষ্যতি ন বিনশ্যতি ন হিংসামাপদ্যতে। সঃ- যো যথোক্তমেবং বেত্তি এ্যন্নাত্মদর্শনম্, সঃ-সর্ব্বেষাৎ ভূতানামাত্মা ভবতি, সর্ব্বেষাৎ ভূতনাং প্রাণো ভবতি, সর্ব্বেষাৎ ভূতানাং মনো ভবতি, সর্ব্বেষাৎ ভূতানাং বাগ্ভবতি-ইত্যেবং সর্ব্বভূতাত্মতয়া সর্ব্বজ্ঞো ভবতীত্যর্থঃ, সর্ব্বকৃচ্চ। যথৈষা পূর্ব্বসিদ্ধা হিরণ্যগর্ভদেবতা, এবেমের নাস্য সর্ব্বজ্ঞত্বে সর্ব্বকৃত্যে বা কচিৎ প্রতিঘাতঃ, স ইতি দাস্তান্তিকনির্দেশঃ। কিঞ্চ, যথৈতাৎ হিরণ্যগর্ভদেবতাম্ ইজ্যা- দিভিঃ সর্ব্বাণি ভূতান্যবন্তি পূজয়ন্তি, এবং হ এবংবিদং সর্ব্বাণি ভূতান্যবন্তি- ইজ্যাদিলক্ষণাৎ পূজাং সততং প্রযুঞ্জত’ইত্যর্থঃ। ১
অথেদমাশঙ্ক্যতে-সর্ব্বপ্রাণিনামাত্মা ভবতীত্যুক্তম্; তস্য চ সর্ব্বপ্রাণিকার্য্য- করণাত্মত্বে সর্ব্বপ্রাণিসুখদুঃখৈঃ সম্বধ্যেত ইতি। তন্ন; অপরিচ্ছিন্নবুদ্ধিত্বাৎ-পরি- চ্ছিন্নাত্মবুদ্ধীনাং হি আক্রোশাদৌ দুঃখসম্বন্ধো দৃষ্টঃ-অনেনাহমাক্রুষ্ট ইতি; অন্য তু সর্ব্বাত্মনো য আক্রুশ্যতে, যশ্চাক্রোশতি-তয়োরাত্মত্ববুদ্ধিবিশেষাভাবান্ন তন্নি- মিত্তৎ দুঃখমুপপদ্যতে। মরণদুঃখবচ্চ নিমিত্তাভাবাৎ-যথা হি কস্মিংশ্চিন্মৃতে কস্যচিদ্দুঃশমুৎপদ্যতে-মমাসৌ পুত্রো ভ্রাতা চেতি-পুত্রাদিনিমিত্তম্; তন্নি- মিত্তাভাবে তন্মরণদর্শিনোহপি নৈব দুঃখমুপজায়তে, তথা ঈশ্বরস্যাপি অপরি- চ্ছিন্নাত্মনো মম-তবতাদিদুঃখনিমিত্ত-মিথ্যাজ্ঞানাদিদোষাভাবান্নৈব দুঃখমুপজায়তে। তদেতদুচ্যতে-। ২
যৎ উ কিঞ্চ যংকিঞ্চ ইমাঃ প্রজাঃ শোচন্তি, অমৈব সহৈব প্রজাভিঃ তচ্ছোকা- দিনিমিত্তং দুঃখং সংযুক্তং ভবতি, আসাং প্রজানাং পরিচ্ছিন্নবুদ্ধিজনিতত্ত্বাৎ; সর্ব্বাত্মনস্ত কেন সহ কিং সংযুক্তং ভবেৎ বিযুক্তং বা। অমুং তু প্রাজাপত্যে পদে বর্তমানং পুণ্যমেব—শুভমেব ফলমভিপ্রেতং পুণ্যমিতি—নিরতিশয়ং হি তেন পুণ্যং কৃতম্, তেন তৎফলমেব গচ্ছতি; ন হ বৈ দেবান্ পাপং গচ্ছতি, পাপফল- স্যাবসরাভাবাৎ—পাপফলং দুঃখং ন গচ্ছতীত্যর্থঃ ॥ ৭৪ ॥ ২০ ॥
টীকা।—মনস্যুক্তং ন্যায়ং প্রাণেহতিদিশতি—তথেতি। তমেব দৈবং প্রাণং প্রশ্নপূর্ব্বকং প্রকটয়তি—স বা ইতি। স এবংবিদিত্যাদি ব্যাচষ্টে—স য ইতি। বিদিরত্র লাভার্থঃ। ন কেবলং যথোক্তমের বিদ্যাফলং, কিন্তু ফলাহরমপ্যস্তীত্যাহ—কিঞ্চেতি।
সর্ব্বভূতাত্মত্বে তদ্দোষযোগাৎ প্রাজাপত্যং পদমনাদের মিত্যুত্তরবাক্যব্যাবর্ত্যামাশঙ্কামাহ- অথেতি। সর্ব্বপ্রাণিসুখদুঃখৈরিত্যস্লাদুর্দ্ধং সশব্দোহধ্যাহর্তব্যঃ। সর্ব্বাত্মকে বিদুষ্যেকৈকভূতনিষ্ঠ- ‘দুঃখযোগো নাস্তীত্যুত্তরমাহ-তন্নেতি। তদেব প্রপঞ্চয়তি-পরিচ্ছিন্নেতি। অপরিচ্ছিন্নধীত্বেপি সূত্রাত্মকে বিদুষি সর্ব্বভূতান্তর্ভাবাত্তদ্দুঃখাদিযোগঃ স্নাদেবেত্যাশঙ্ক্য জঠরকুহরবিপরিবর্তিক্রিমি-
দোষৈরস্মাকমসংসর্গবৎ প্রকৃতেহপি সম্ভবাৎ মৈবমিত্যভিপ্রেত্যাহ-মরণোত। নোপপদ্যতে বিদুষো দুঃখমিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। দৃষ্টান্তং বিবৃণোতি-যথেতি। মৈত্রস্য স্বহস্তাদ্যভিমান- বতস্তদুঃখাদিযোগবদ্বিদুষঃ সূত্রাত্মনঃ স্বাংশভূত সর্ব্বভূতাভিমানিনস্তদ্দ:খাদিসংসর্গঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্য দাষ্টান্তিকমাহ-তখেতি। মম-তবতাদীত্যাদিপদেন অহস্তাগ্রহণং, তদেব দুঃখনিমিত্তং মিথ্যা- জ্ঞানম্। আদিশব্দেন রাগাদিরুক্তঃ। উক্তেহর্থে শ্রুতিমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-তদেতদিতি। শুভমেক গচ্ছতীতি সম্বন্ধঃ। ফলরূপেণ বর্তমানস্য কথং কৰ্ম্মসম্বন্ধঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ফলমিতি। উক্তমেব ব্যনক্তি-নিরভিশয়ং হীতি। ৭৪। ২০।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্ববৎ জল হইতে এবং চন্দ্র হইতে দৈব প্রাণ আসিয়া ইহাতে(অন্নত্রয়াত্মবিদ্ ব্যক্তিতে) ব্যাপ্ত হয়। সেই দৈব প্রাণের লক্ষণ বা পরিচয় কিপ্রকার, তাহা বলিতেছেন—যাহা বিভিন্নপ্রকার প্রাণিগণের মধ্যে সঞ্চরণ করে, এবং সমষ্টি-ব্যষ্টিভেদে সঞ্চরণ নাও করে, অথবা যাহা জঙ্গমে- (গতিশীলে) সঞ্চরণ করে, আর স্থাবর—পাষাণাদির মধ্যে সঞ্চরণ করে না, তাহা কোন অবস্থায়ই ব্যথিত হয় না—দুঃখের কারণীভূত অবস্থায়ও ভয়ে কাতর হয় না, এবং বিনষ্টও হয় না, অর্থাৎ কোন প্রকারে হিংসিতও হয় না: তাহাই দৈব প্রাণ। সেই ব্যক্তি—যিনি যথোক্তপ্রকারে অন্নত্রয়াত্মজ্ঞান জানেন, সেই ব্যক্তি সর্ব্বভূতের আত্মস্বরূপ হন, সর্ব্বভূতের প্রাণস্বরূপ হন, সর্ব্বভূতের মনঃস্বরূপ হন, “এবং সর্ব্ব- ভূতের বাক্স্বরূপ হন—এই প্রকারে সর্ব্বভূতাত্মক ভাবে সর্বজ্ঞ এবং সর্ব্বকর্ত্তাও হন। পূর্ব্বসিদ্ধ হিরণ্যগর্ভের ন্যায় ইহার সর্বজ্ঞতায় এবং সর্ব্বকর্তৃত্বে কোন প্রকার ব্যাঘাত ঘটে না। শ্রুতির দ্বিতীয় ‘সঃ’ পদে দাষ্টান্তিক নির্দেশ। অপিচ, সমস্ত ভূত যাগযজ্ঞাদি দ্বারা যেমন এই হিরণ্যগর্ভনামক দেবতার পালন—পুজা করিয়া থাকে, তেমনি সমস্ত ভূতগণ যথোক্ত অন্নত্রয়াত্মবিদকেও রক্ষা করিয়া থাকে, অর্থাৎ তাহার উদ্দেশ্যেও সর্ব্বদা যজ্ঞাদিরূপ পূজার অনুষ্ঠান করিয়া থাকে। ১
অতঃপর এইরূপ আশঙ্কা করা হইতেছে—পূর্ব্বে বলা হইয়াছে যে, তিনি সর্ব্বপ্রাণীর আত্মস্বরূপ হন, কিন্তু তিনি যদি সর্ব্বপ্রাণীর দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত অভিন্নভাবই প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে সেই প্রাণিগণের সুখ-দুঃখের সহিত সম্বন্ধ লাভ করাও তাঁহার পক্ষে সম্ভবপর ‘হয়? না—তাহা সম্ভব হয় না; কারণ? যেহেতু, তখন তাঁহার বুদ্ধি পরিচ্ছিন্নভাব পরিত্যাগ করিয়া অপরিচ্ছিন্নভাব প্রাপ্ত হয়। যাহারা আত্মাকে পরিচ্ছিন্ন বলিয়া মনে করে, তাহাদেরই আক্রোশাদি কারণে দুঃখ-সম্বন্ধ হইতে দেখা যায়, কিন্তু এই সর্ব্বাত্মভাবাপন্ন অন্নত্রয়াত্মদর্শীর পক্ষে আক্রোশের কর্ত্তা ও আক্রোশের কর্ম্ম—উভয়েতেই তুল্যপ্রকার আত্মবুদ্ধি থাকায় অর্থাৎ সর্ব্বত্র তুল্যরূপে আত্মভাব সমুৎপন্ন হওয়ায় আক্রোশাদিজনিত
-দুঃখেরও সম্ভাবনা থাকে না; কারণ না থাকায় যে, দুঃখের অভাব হয়, মরণদুঃখও তাহার অপর দৃষ্টান্ত। যেমন কোন ব্যক্তির মৃত্যু হইলে ‘ব্যক্তিবিশেষের দুঃখ হইয়া থাকে,-‘এই মৃত ব্যক্তি আমার পুত্র কিংবা ভ্রাতা’ ইত্যাদি সম্বন্ধজ্ঞানই সেই দুঃখের নিদান। অপিচ, সেই সম্বন্ধরূপ কারণটি যাহার নাই, মৃত্যুদর্শনেও কিন্তু তাহার সেরূপ দুঃখ জন্মে না; তেমনি অপরিচ্ছিন্নাত্মবুদ্ধিসম্পন্ন তাদৃশ ঈশ্বরের পক্ষেও দুঃখনিদান মমতাদি ভ্রান্তিজ্ঞানরূপ দোষ বিদ্যমান না থাকায় অর্থাৎ বিনষ্ট হইয়া যাওয়ায় নিশ্চয়ই দুঃখ সমুৎপন্ন হয় না। অতঃপর এখানে এই কথাই বিশেষ- ভাবে বলা হইতেছে।-২
এই প্রজাগণ(প্রাণিসমূহ) যে কিছু শোক করিয়া থাকে, তাহারা পরিচ্ছিন্ন- জ্ঞানসম্পন্ন; এই কারণে সেই প্রাণিগণের সহিতই সেই শোকাদিজনিত দুঃখের সম্বন্ধ হইয়া থাকে, অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণীর সহিত সম্বন্ধবোধই সেই শোকাদি দুঃখের কারণ, কিন্তু যিনি সর্বাত্মক, তাঁহার সহিত কোন্ বস্তু সংযুক্ত বা বিযুক্ত হইবে? পরন্তু প্রাজাপত্য পদে(হিরণ্যগর্ভের অধিকারে) অবস্থিত এই পুরুষে কেবল পুণ্যই আশ্রয় লাভ করে। এখানে পুণ্য-শব্দে পুণ্যফল বুঝিতে হইবে। তিনি অত্যধিক পুণ্যকর্ম্ম করিয়াছেন, সেই হেতু সেই পুণ্যফলই তাঁহাকে আশ্রয় করিয়া থাকে; দেবগণকে কখনও পাপে আশ্রয় করে না, অর্থাৎ তাঁহাদের পাপফল দুঃখ-সমুৎপত্তির উপযুক্ত অবসরই থাকে না; সুতরাং পাপফল দুঃখ তাঁহাদিগকে আশ্রয় করে না বলা হইল ॥ ৭৪ ॥ ২০ ॥
আভাস-ভাষ্যম্।—“ত এতে সর্ব্ব এব সমাঃ সর্ব্বেহনন্তাঃ” ইত্য- বিশেষেণ বাষ্মনঃপ্রাণানামুপাসনমুক্তম্, নান্যতমগতো বিশেষ উক্তঃ। কিমেবমেব প্রতিপত্তব্যম্, কিংবা বিচার্য্যমাণে কশ্চিদ্বিশেষঃ ব্রতমুপাসনং প্রতিপত্তুং শক্যতে, ইত্যুচ্যতে—
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—‘ইহারা সকলেই সমান, সকলেই অনন্ত’ ইত্যাদি বাক্যে সাধারণভাবে বাক্, মনঃ ও প্রাণের উপাসনামাত্র উক্ত হইয়াছে, কিন্তু তন্মধ্যে কাহারো সম্বন্ধে কোনরূপ বিশেষ কথা বলা হয় নাই। এখন সন্দেহ হইতেছে যে, যাহা বলা হইয়াছে, তাহা ঠিক সেই ভাবেই অর্থাৎ সাধা- রণভাবেই বুঝিতে হইবে; কিংবা বিচার করিয়া দেখিলে সে সম্বন্ধে ব্রত ও উপাসনাসম্বন্ধে কোনপ্রকার বিশেষ কিছু বুঝিতে পারা যাইবে; এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—
অথাতো ব্রতমীমাংসা, প্রজাপতিই কর্ম্মাণি সহজে, তানি
সৃষ্টান্যন্যোন্যেনাস্পর্দ্ধন্ত—বদিষ্যাম্যেবাহমিতি বাগ্দধ্রে, দ্রক্ষাম্য- হমিতি চক্ষুঃ, শ্রোয্যাম্যহমিতি শ্রোত্রমেবমন্যানি কর্মাণি যথাকৰ্ম্ম, তানি মৃত্যুঃ শ্রমো ভূত্বোপযেমে, তান্যাপ্নোৎ, তান্যাপ্ত। মৃত্যুর- বারুন্ধ, তস্মাচ্ছাম্যত্যেব বাক্ শ্রাম্যতি চক্ষুঃ শ্রাম্যতি শ্রোত্রমথে- মমেব নাপ্নোদ যোহয়ং মধ্যমঃ প্রাণস্তানি জ্ঞাতুং দধিরে।
অয়ং বৈ নঃ শ্রেষ্ঠো যঃ সঞ্চরশ্চাসঞ্চরশ্চ ন ব্যথতে ন রিষ্যতি, হন্তাস্যৈব সর্ব্বে রূপমসামেতি, ত এতস্যৈব সর্ব্বে রূপ- মভবৎ স্তস্মাদেত এতেনাখ্যায়ন্তে প্রাণা ইতি; তেন হ বাব তৎ কুলমাচক্ষতে যস্মিন্ কুলে ভবতি য এবং বেদ, য উ হৈবংবিদা স্পর্দ্ধতেহনুশুষ্যত্যনুষুষ্য হৈবান্ততো ম্রিয়ত ইত্যধ্যাত্মম্ ॥৭৫॥২১৷৷
সরলার্থঃ।—অথ(প্রজাসৃষ্টেরনন্তরং) ব্রতমীমাংসা(ব্রতস্য বক্ষ্যমাণো- পাসন-কর্মণঃ মীমাংসা—সিদ্ধান্তঃ)[উচ্যতে]—প্রজাপতিঃ কিল(ঐতিহ্যে) কর্মাণি(ক্রিয়াসাধনানি ইন্দ্রিয়াণি) সসৃজে(সৃষ্টবান্); তানি সৃষ্টানি (উৎপাদিতানি সন্তি) অন্যোন্যেন(পরস্পরং) অস্পর্দ্ধন্ত(স্পর্দ্ধাৎ চক্রুঃ)। [স্পর্দ্ধাপ্রকারমাহ—] ‘অহং বদিষ্যামি এব(শব্দোচ্চারণং করিষ্যামি এব) ন ততো নিবৃত্তা ভবেয়ম্’ ইতি(এতৎ ব্রতং) বাক্(বাগিন্দ্রিয়ং কর্তৃ) দধ্রে(ধৃত- বতী); তথা অহং দ্রক্ষ্যামি এব(দর্শনব্যাপারং করিষ্যাম্যের, ন ততো বিরতং ভবিষ্যামি) ইতি চক্ষুঃ দধ্রে(এবং ব্রতং ধৃতবৎ); তথা ‘অহং শ্রোয্যামি (শ্রবণব্যাপারং করিষ্যাম্যের) ইতি(ব্রতং) শ্রোত্রং[দধ্রে], অন্যানি কর্মাণি (ত্বপ্রভৃতীনি ইন্দ্রিয়াণি) এবং(বাগাদিবৎ ব্রতং ধৃতবন্তি)। মৃত্যুঃ(মারকঃ) শ্রমঃ(শ্রমরূপী) ভূত্বা তানি কর্মাণি(ইন্দ্রিয়াণি) উপযেমে(উপগতঃ), তানি (ইন্দ্রিয়াণি) আপ্নোৎ(শ্রমরূপেণ ব্যাপ্তবান্)। তানি চ আপ্তা(প্রাপ্য) অব- রুদ্ধ(অবরোধং কৃতবান্—স্বস্বকর্মভ্যো বিরতানি কৃতবান্); তস্মাৎ(মৃত্যুনা আক্রান্তত্বাৎ হেতোঃ) বাক্(বাগিন্দ্রিয়ং) শ্রাম্যতি(স্বকর্মণঃ বিরম্যতে) এব (নিশ্চয়ে), চক্ষুঃ[অপি] শ্রাম্যতি এব, শ্রোত্রং শ্রাম্যতি এব; অথ ইমম্ এব -ন আপ্নোৎ(স্বকর্মণঃ নিবারয়িতুং শক্তো ন বভূব)[মৃত্যুরিতিশেষঃ]; কোহসৌ?] যঃ অয়ং মধ্যমঃ(মুখ্যঃ) প্রাণঃ(প্রাণনাদিপঞ্চবৃত্তিকঃ)। তানি মৃত্যুগ্রস্তানি বাগাদীনি ইন্দ্রিয়াণি) জ্ঞাতুং দধিরে(তং জ্ঞাতুং মনোনিবেশং
চক্রুঃ); অয়ং(মুখ্যঃ প্রাণঃ) বৈ(এব) নঃ(অস্মাকং মধ্যে) শ্রেষ্ঠঃ(প্রধানঃ), যঃ সঞ্চরন্ চ অসঞ্চরন্ চ(স্বব্যাপারং কুর্ব্বন্ অকুর্ব্বন্ অপি) ন ব্যথতে(ন দুঃখ- মনুভবতি), অথ(তথা) ন রিষ্যতি(ন বিনশ্যতি); হন্ত(আহলাদে) সর্ব্বে (বয়ং) অন্য(প্রাণস্য) এব রূপং অসাম(আত্মত্বেন ভজামহে)‘ইতি।[ততঃ] তে সর্ব্বে(বাগাদয়ঃ) এতস্য(প্রাণস্য) এব রূপং অভবন্(তমেব আত্মত্বেন প্রাপ্তাঃ); তস্মাৎ(বাগাদীনাং প্রাণাত্মভাবাৎ হেতোঃ) এতে(বাগাদয়ঃ) এতেন(প্রাণেন প্রাণ-শব্দেন) প্রাণাঃ ইতি আখ্যায়ন্তে(কথ্যন্তে)। যঃ(জনঃ) এবং(যথোক্তপ্রকারং প্রাণতত্ত্বং) বেদ(জানাতি), তেন(বিদুষা-তন্নান্না) তৎ কুলং(বংশৎ) আচক্ষতে(কথরন্তি)[লৌকিকাঃ],-[সঃ] যস্মিন্ কুলে ভবতি(উৎপদ্যতে); যঃ উহ(পুনঃ) এবংবিদা(যথোক্তবিজ্ঞানবতা সহ) স্পর্দ্ধতে,[সঃ] অনুশুষ্যতি(প্রত্যহং শোষম্ আপদ্যতে), অনুশুষ্য হ(এব) অন্ততঃ(অন্তে) ম্রিয়তে(মৃতো ভবতি), ইতি অধ্যাত্মম্(আত্মানং-দেহম্ অধিকৃত্য প্রবৃত্তং ব্রতমিত্যর্থঃ) ॥ ৭৫ ॥ ২১॥
মূলানুবাদ:-অতঃপর ব্রতমীমাংসা অর্থাৎ উপাসনাত্মক কর্মবিচার আরব্ধ হইতেছে,-পুরাকালে প্রজাপতি কৰ্ম্মসমূহ অর্থাৎ কৰ্ম্মনির্বাহক ইন্দ্রিয়গণকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন; সেই ইন্দ্রিয়গণ সৃষ্ট হইয়া[স্ব স্ব কর্তব্য বিষয়ে] পরস্পরের প্রতি স্পর্দ্ধা করিতে লাগিল, -বাগিন্দ্রিয় স্থির করিল যে, আমি সর্বদাই কথা বলিব,(কখনও বিরত হইব না); চক্ষুঃ নিয়ম করিল যে, আমি সর্বদাই দর্শন করিব, এবং শ্রবণেন্দ্রিয় নিয়ম গ্রহণ করিল যে, আমি সর্বদাই শ্রবণ করিব; এইরূপ অন্যান্য ইন্দ্রিয়গণও যথাযোগ্য নিজ নিজ কৰ্ম্মসম্বন্ধে[নিয়ম গ্রহণ করিল]; কিন্তু মৃত্যু শ্রমরূপী হইয়া তাহাদের নিকট উপস্থিত হইল, এবং তাহাদিগকে আয়ত্ত করিল। তাহার পর মৃত্যু তাহা- দিগকে অবরুদ্ধ করিল অর্থাৎ তাহাদের অবিশ্রান্তভাবে কর্মসম্পাদনে বাধা ঘটাইল; সেই কারণে বাকও কার্য্য করিয়া পরিশ্রান্ত হয়, চক্ষুও পরিশ্রান্ত হয় এবং শ্রবণেন্দ্রিয়ও পরিশ্রান্ত হইয়া(স্বব্যাপার হইতে’ বিরত হয়); পক্ষান্তরে, মৃত্যু কেবল ইহাকেই আয়ত্ত করিতে পারে নাই, যাহার নাম মধ্যম প্রাণ বা প্রাণাপানাদি পঞ্চবৃত্তিবিশিষ্ট মুখ্য প্রাণ। সেই ইন্দ্রিয়গণ
তাহাকে জানিবার জন্য মনোনিবেশ করিল, তাহারা বুঝিল যে, ইনিই আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ,—যিনি কার্য্য করুন বা না-ই করুন, কিছুতেই শ্রান্ত হন না, এখন আমরা সকলে ইহারই রূপ ভজনা করি। তাহারা সকলে আনন্দসহকারে এতৎস্বরূপই হইল অর্থাৎ প্রাণকেই আত্মারূপে গ্রহণ করিল; সেই হেতুই এই বাগাদি ইন্দ্রিয়গণ ইহার নামে—প্রাণ- সংজ্ঞায় অভিহিত হইয়া থাকে। যিনি এই তত্ত্ব অবগত হন, তিনি যে বংশে জন্মগ্রহণ করেন, সেই বংশ তাঁহারই নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়া থাকে। এবংবিধ জ্ঞানীর সহিত যে লোক স্পর্দ্ধা করে, সে লোক দিন দিন শুষ্কতা প্রাপ্ত হয়, শুষ্ক হইতে হইতে শেষে মরিয়া যায়; ইহা হইল অধ্যাত্মাধিকারে ব্রত ॥ ৭৫ ॥ ২১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথাতঃ, অনন্তরং ব্রত-মীমাংসা উপাসন-কর্ম্মবিচা- রণেত্যর্থঃ। এষাং প্রাণানাং কস্য কৰ্ম্ম ব্রতত্বেন ধারয়িতব্যম্—ইতি মীমাংসা প্রবর্ত্ততে। তত্র প্রজাপতির্হ—হ-শব্দঃ কিলার্থে,—প্রজাপতিঃ কিল প্রজাঃ সৃষ্ট্বা কর্ম্মাণি—করণানি বাগাদীনি—কর্ম্মার্থানি হি তানীভি কর্ম্মাণীত্যুচ্যন্তে, সসৃজে সৃষ্টবান্ বাগাদীনি করণানীত্যর্থঃ। তানি পুনঃ সৃষ্টানি অন্যোন্যেন ইতরেতরম- স্পর্দ্ধন্ত স্পর্দ্ধাৎ সঙ্ঘর্ষৎ চক্রুঃ। কথম্? বদিষ্যাম্যেব—স্বব্যাপারাদ্বদনাদ্ অনুপর- তৈবাহং স্যামিতি বাক্ ব্রতং দত্রে ধৃতবতী,—যদ্যন্যোহপি মৎসমোহস্তি স্বব্যাপা- রাদনুপরন্তুং শক্তঃ, সোহপি দর্শয়ত্বাত্মনো বীর্য্যমিতি। তথা দ্রক্ষ্যাম্যহমিতি চক্ষুঃ; শ্রোয্যাম্যহমিতি শ্রোত্রম্; এবমন্যান্যপি কর্ম্মাণি করণানি যথাকৰ্ম্ম—যদ্ যদ্ যস্য কৰ্ম্ম—যথাকৰ্ম্ম; তানি করণানি মৃত্যুরারকঃ শ্রমঃ শ্রমরূপী ভূত্বা উপযেমে সংজগ্রাহ। কথম্? তানি করণানি স্বব্যাপারে প্রবৃত্তান্যাপ্নোৎ শ্রমরূপেণাত্মানং দর্শিতবান্; আপ্তা চ তানি অবারুদ্ধ অবরোধং কৃতবান্ মৃত্যুঃ—স্বকৰ্ম্মভ্যঃ প্রচ্যা- বিতবানিত্যর্থঃ। তস্মাদদ্যত্বেহপি বদনে স্বকৰ্ম্মণি প্রবৃত্তা বাক্ শ্রাম্যত্যেব— শ্রমরূপিণা মৃত্যুনা সংযুক্তা স্বকৰ্ম্মতঃ প্রচ্যবতে; তথা শ্রাম্যতি চক্ষুঃ; শ্রাম্যতি শ্রোত্রম্। অথ ইমমেব মুখ্যং প্রাণং নাপ্নোৎ ন প্রাপ্তবান্ মৃত্যুঃ শ্রমরূপী,— যোহয়ং মধ্যমঃ প্রাণঃ, তম্; তেনাদ্যত্বেহপি অশ্রান্ত এব স্বকৰ্ম্মণি প্রবর্ত্ততে। তানীতরাণি করণানি তং জ্ঞাতুং দধিরে ধৃতবন্তি মনঃ,—অরং বৈ নোহম্মাকং মধ্যে শ্রেষ্ঠঃ প্রশস্যতমঃ অভ্যধিকঃ, যস্মাৎ যঃ সঞ্চরংশ অসঞ্চরংশ ন ব্যথতে, অথো ন রিষ্যতি—হস্তেদানীং অস্যৈব প্রাণস্থ্য সর্ব্বে বয়ং রূপমসাম প্রাণমাত্মত্বেন প্রতি-
পদ্যেমহি—এবং বিনিশ্চিত্য তে এতস্যৈব সর্ব্বে রূপমভবন্ প্রাণরূপমেবাত্মত্বেন প্রতিপন্নাঃ প্রাণব্রতমেব দধিরে—অস্মদ্রতানি ন মৃত্যোর্ব্বারণায় পর্য্যাপ্তানীতি।
যস্মাৎ প্রাণেন রূপেণ রূপবন্তীতরাণি করণানি চলনাত্মনা স্বেন চ প্রকাশাত্মনা; ন হি প্রাণাদন্যত্র চলনাত্মকত্বোপপত্তিঃ; চলনব্যাপারপূর্ব্বকাণ্যের হি সর্ব্বদা স্বব্যাপারেষু লক্ষ্যন্তে,-তস্মাদেতে বাগাদয়ঃ এতেন প্রাণাভিধানেনাখ্যায়ন্তেহভি- ধীয়স্তে-প্রাণা ইত্যেবম্। য এবং প্রাণাত্মতাৎ সর্ব্বকরণানাং বেত্তি প্রাণশব্দাভি- ধেয়ত্বং চ, তেন হ বাব তেনৈব বিদুষা তৎকুলমাচক্ষতে লৌকিকাঃ, যস্মিন্ কুলে স বিদ্বান্ জাতো ভবতি-তৎ কুলং বিদ্বন্নাম্নৈব প্রথিতং ভবতি-অমুষ্যেদং কুলমিতি, যথা তাপত্য ইতি। য এবং যথোক্তৎ বেদ বাগাদীনাং প্রাণস্বরূপতাং প্রাণাখ্যত্বং চ, তস্যৈতৎ ফলম্।
কিঞ্চ, যঃ কশ্চিৎ উহ এবংবিদা প্রাণাত্মদর্শিনা স্পর্দ্ধতে তৎপ্রতিপক্ষী সন্, সঃ অস্মিন্নেব শরীরে অনুশুষ্যতি শোষমুপগচ্ছতি, অনুশুষ্য হৈব শোষৎ গত্বৈব অন্ততঃ অন্তে ম্রিয়তে, ন সহসা অনুপদ্রুতো ম্রিয়তে—ইত্যেবমুক্তমধ্যাত্মং প্রাণাত্ম- দর্শনমিতি উক্তোপসংহারোহধিদৈবতপ্রদর্শনার্থঃ ॥ ৭৫ ॥ ২১ ॥
টাকা-অথেত্যাদিবাক্যস্য বক্তব্যশেষাভাবাদানর্থক্যমাশঙ্ক্য ব্যবহিতোপাসনানুবাদেন তদঙ্গব্রতবিধানার্থমুত্তরং বাক্যমিত্যানর্থক্যং পরিহরতি-ত এত ইত্যাদিনা। ব্রতমিত্য- বশ্যানুষ্ঠেরং কর্মোচ্যতে। জিজ্ঞাসায়াঃ সত্ত্বমতঃশব্দার্থঃ। উপাসনোজ্ঞ্যানন্তর্য্যমথশব্দার্থং কথয়তি-অনন্তরমিতি। বিচারণামেব ক্ষোরয়তি-এযামিতি। প্রবৃত্তায়াং মীমাংসায়াং প্রাণব্রতমভগ্নত্বেন ধারণীয়মিতি নির্দ্ধারণার্থমাখ্যায়িকাং প্রণয়তি-তত্রেত্যাদিনা। কথং বাগাদিষু করণেষু কৰ্ম্মশব্দপ্রবৃত্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-কর্মার্থানীতি। তদীয়সৃষ্টেরুপযোগমুপদর্শয়িতুং ভূমিকাং করোতি-তানীতি। স্পর্দ্ধাপ্রকারং প্রশ্নপূর্ব্বকং প্রকটয়তি-কথমিত্যাদিনা। যথাকৰ্ম্ম স্বীয়ং স্বীয়ং ব্যাপারমনুসৃত্য ব্রতং দস্ত্রিবে বাগাদীনি করণানীত্যর্থঃ।
প্রজাপতের্ব্বাগাদিষু শ্রমদ্বারা স্বকৰ্ম্মপ্রচ্যুতিরাসীদিত্যত্র কাৰ্য্যলিঙ্গমনুমানং প্রমাণয়তি- তস্মাদিতি। বাগাদীনাং ভগ্নব্রতত্বনিদ্ধারণানন্তর্য্যমথশব্দার্থঃ। প্রাজাপত্যে প্রাণে মৃত্যুগ্রস্তত্বা- ভাবে কার্য্যলিঙ্গকমনুমানং সূচয়তি-তেনেতি। প্রবর্ততে প্রাণ ইতি সম্বন্ধঃ। তথাহপি কথং প্রাণস্থৈব ব্রতং ধার্য্যমিতাপেক্ষায়ামাহ-তানীতি। জ্ঞানার্থমনুসন্ধানপ্রকারমেব দর্শয়তি- অয়মিতি। তস্য শ্রেষ্ঠত্বে ফলিতমাহ-হন্তেতি। ইতিশব্দং ব্যাকরোতি-এবং বিনিশ্চিত্যেতি। অস্মাকং বাগাদীনাং ব্রতানি মৃত্যোর্ব্বারণায় ন পর্যাপ্তানীতি বিনিশ্চিত্য দধ্রিয়ে প্রাণব্রত- মেবেতি সম্বন্ধঃ।
প্রাণরূপত্বযুক্ত। করণানাং তন্নামত্বমাহ—যম্মাদিতি। যম্মাদিত্যস্য তস্মাদিতি ব্যবহিতেন সম্বন্ধঃ। প্রাণরূপং চলনাত্মত্বমিতি কুতো নিশ্চীয়তে, তত্রাহ—ন হীতি। তর্হি করণেষু প্রকাশাত্মকত্বমেব ন চলনাত্মত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ—চলনেতি। সংপ্রতি বিদ্যাফলমাহ—য এবমিতি।
তদেব স্পষ্টয়তি-যস্মিন্নিতি। তপতী সূর্য্যসুতা, তস্যা বংশস্তাপত্যঃ। কস্যেদং ফলমিত্যুক্তে পূর্ব্বোক্তমেব স্ফুটয়তি-য এবমিত্যাদিনা। ন কেবলং বিদ্যায়া যথোক্তমেব ফলং, কিন্তু ফলান্তরমপ্যস্তীত্যাহ-কিঞ্চেতি। প্রাণবিদা সহ স্পর্দ্ধান কর্তব্যেতি ভাবঃ। ইত্যধ্যাত্মমিত্যস্যা- নর্থক্যনাশঙ্ক্যাহ-ইত্যেবমিতি। ৭৫। ২১।
ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর ব্রতমীমাংসা—উপাসনাবিচার[আরব্ধ হই- তেছে], অর্থাৎ উল্লিখিত প্রাণগণের(চক্ষুরাদি করণবর্গের) মধ্যে কাহার কর্ম্ম ব্রতরূপে(অবশ্যপালনীয়রূপে) গ্রহণ করিতে হইবে, তাহার মীমাংসা(সিদ্ধান্ত) বলা হইতেছে—
শ্রুতির হ-শব্দটি ঐতিহ্যসূচক; পুরাকালে প্রজাপতি প্রজাসমূহ সৃষ্টি করিয়া কৰ্ম্ম-সমূহ অর্থাৎ বাক্প্রভৃতি করণবর্গ সৃষ্টি করিয়াছিলেন। কর্ম সম্পাদন করাই বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য, এইজন্য বাক্প্রভৃতি করণসমূহকেই ‘কর্ম’- নামে অভিহিত করা হইয়াছে। সেই বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়বর্গ হৃষ্ট হইয়া পরস্পরের সহিত স্পর্দ্ধা—সংঘর্ষ অর্থাৎ পরস্পরের প্রতি প্রতিযোগিতা করিতে আরম্ভ করিল। তাহা কি প্রকার? বাগিন্দ্রিয় এইরূপ ব্রত ধারণ করিল যে, ‘আমি বলিবই—নিজের কর্তব্য ব্যাপার—শব্দোচ্চারণ হইতে কখনও বিরত হইব না; আমার ন্যায় আরও যদি কেহ নিজের কর্তব্য কৰ্ম্ম হইতে বিরত না হইয়া থাকিতে সমর্থ হয়, তবে সেও নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করুক।’ সেইরূপ চক্ষু[ব্রত ধারণ করিল যে,] আমি নিরন্তর দর্শন করিব; এবং শ্রবণেন্দ্রিয়[ব্রত ধারণ করিল যে,] ‘আমি নিরন্তর শ্রবণই করিব।’ এইরূপ অপরাপর করণসমূহও(ইন্দ্রিয়গণও) যথাকৰ্ম্ম,—অর্থাৎ যাহার যেরূপ কাজ, তদনুসারে[ব্রত ধারণ করিল]। মৃত্যু(অর্থাৎ মৃত্যুর হেতু) শ্রমরূপী হইয়া সেই করণগণকে অধিকার করিল। ১
তাহা কি প্রকার? সেই বাক্প্রভৃতি করণগণ নিজ নিজ কার্য্যে প্রবৃত্ত হইলে পর, মৃত্যু তাহাদিগকে শ্রমরূপে দেখা দিলেন, অর্থাৎ তাহারা কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া শ্রম অনুভব করিতে লাগিল। মৃত্যু এইরূপে তাহাদের নিকট আত্মপ্রকাশ করিয়া তাহাদিগকে অবরুদ্ধ করিল—স্ব স্ব কর্তব্য কর্মসমূহ হইতে তাহাদিগকে বিচ্যুত বা বিরত করিল; সেই কারণে আজ পর্য্যন্তও বাগিন্দ্রিয় স্বকার্য্য বাক্যো- চ্চারণে প্রবৃত্ত হইয়া নিশ্চয়ই পরিশ্রান্ত হয়, অর্থাৎ শ্রমরূপী মৃত্যুকর্তৃক আক্রান্ত হইয়া নিজের কর্ম্ম হইতে বিরত হয়; সেইরূপ চক্ষুও শ্রান্ত হয়; এবং শ্রবণেন্দ্রিয়ও শ্রান্ত হয়।
করণবর্গের মধ্যে এই যে মধ্যম প্রাণ, শ্রমরূপী মৃত্যু কেবল সেই মুখ্য প্রাণ- কেই(প্রাণাপানাদিভেদযুক্ত পঞ্চবৃত্তি প্রাণকেই) অভিভূত করিতে পারিল না; সেই কারণে একমাত্র প্রাণই অবিশ্রান্তভাবে স্বকর্মে(শ্বাসপ্রশ্বাসাদি কার্য্যে) প্রবৃত্ত হইয়া থাকে(অন্যে নহে)। তখন অপরাপর করণগণ সেই প্রাণকে জানিবার জন্য অর্থাৎ মুখ্য প্রাণের তত্ত্ব অবগত হইবার জন্য মনোনিবেশ করিল; তখন তাহারা বুঝিতে পারিল যে, আমাদের মধ্যে এই মুখ্য প্রাণই শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ সর্ব্বাপেক্ষা অধিক প্রশংসাভাজন; যেহেতু, এই প্রাণ সঞ্চরণ করুক বা না-ই করুক, কিছুতেই ব্যথিত হয় না এবং বিনষ্টও হয় না; অতএব এখন আমরা সকলে এই প্রাণকেই আত্মস্বরূপে আশ্রয় করিব। এইরূপ অবধারণ করিয়া তাহারা সকলে এই প্রাণস্বরূপই হইয়াছিল, অর্থাৎ প্রাণের স্বরূপকেই আত্মস্বরূপ বলিয়া গ্রহণ করত—আমাদের ব্রতগুলি মৃত্যুনিবারণের পক্ষে যথেষ্ট নয়, এইরূপ মনে’ করিয়া প্রাণব্রতই ধারণ করিয়াছিল। ২
যেহেতু অপরাপর সমস্ত ইন্দ্রিয়ই প্রাণরূপে স্বরূপ-পরিগ্রহ করিয়াছিল—প্রাণ- ধৰ্ম্ম স্পন্দন ও স্বীয় ধৰ্ম্ম বস্তুপ্রকাশন, এতদুভয়রূপে প্রকাশিত হইয়াছিল, সেই হেতু এই বাক্প্রভৃতি করণবর্গও প্রাণসংজ্ঞায়—‘প্রাণ’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। প্রাণভিন্ন অন্য কোথাও চলন—স্পন্দন-ব্যাপার দৃষ্ট হয় না; কারণ, যখনই ইন্দ্রিয়ের কোনরূপ ব্যাপার ঘটে, তখনই অগ্রে কোনরূপ স্পন্দন-ক্রিয়া পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি সমস্ত করণের(ইন্দ্রিয়ের) যথোক্ত প্রাণাত্মভাব এবং প্রাণশব্দ-বাচ্যতা অবগত হন, সাধারণ লোকেরা সেই বংশকে সেই বিদ্বানের নামেই অভিহিত করিয়া থাকে অর্থাৎ সেই বিদ্বান্ পুরুষ যে বংশে জন্মগ্রহণ করেন, সেই বংশটি, তাঁহার নামেই পরিচিত হইয়া থাকে—‘অমুকের এই বংশ’ ইত্যাদি, যেমন ‘তাপত্য’ একটি বংশের নাম। যিনি বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণের উক্তপ্রকার প্রাণরূপতা ও প্রাণসংজ্ঞা জানেন,[তাঁহার নামে যে বংশটি পরিচিত হয়], ইহা হইতেছে সেই বিজ্ঞানের ফল। ৩
আরও এক কথা, যে কোন লোক প্রতিপক্ষ হইয়া ইহার সহিত—যথোক্ত প্রাণাত্মদর্শীর সহিত স্পর্দ্ধা করে, নিশ্চয় সে লোকও এই শরীরেই(বর্তমান দেহেই) শুষ্কতা প্রাপ্ত হয়, অল্পে অল্পে শুষ্ক হইয়া অবশেষে মরিয়া যায়, কিন্তু সহসা—কোন পীড়ার উপদ্রব ভোগ না করিয়া কখনই মরে না, অর্থাৎ অত্যন্ত কষ্ট পাইয়া মরে। এই প্রকারে আধ্যাত্মিক প্রাণাত্মদর্শনের কথা বলা হইল; ইহার পরে অধিদৈবত- ভাব জ্ঞাপনার্থ এখানেই উক্ত প্রকার উপাসনার উপসংহার করা হইল ॥ ৭৫ ॥ ২১ ॥
অথাধিদৈবতং জ্বলিষ্যাম্যেবাহমিত্যগ্নিদধ্রে তপ্স্যাম্যহমি- ত্যাদিত্যো ভাস্যাম্যহমিতি চন্দ্রমা এবমন্যা দেবতা যথাদৈবতং স যথৈষাং প্রাণানাং মধ্যমঃ প্রাণ এবমেতাসাং দেবতানাং বায়ুঃ, ম্লোচন্তি হন্যা দেবতা ন বায়ুঃ, সৈষানস্তমিতা দেবতা যদ্বায়ুঃ ॥ ৭৬ ॥ ২২ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(অনন্তরং) অধিদৈবতং(দেবতাৎ অধিকৃত্য প্রবৃত্তং দর্শনম্)[উচ্যতে]—অগ্নিঃ ‘অহং জ্বলিষ্যামি এব’ ইতি ব্রতং দধ্রে(ধৃতবান্); আদিত্যঃ(সূর্য্যঃ) ‘অহং তপ্স্যামি(নিরন্তরং তাপং দাস্যামি)’[এব] ইতি (ব্রতং)[দধ্রে]; চন্দ্রমাঃ ‘অহং ভাষ্যামি(নিরন্তরং প্রকাশিয্যে)’[এব] ইতি(ব্রতং)[দধ্রে]; অন্যাঃ দেবতাঃ(বায়ুপ্রভৃতয়ঃ)[অপি] এবং বাগাদিবৎ যথাদৈবতং(স্বস্বকর্মানুসারেণ)[ব্রতং ধৃতবত্যঃ]। এষাং প্রাণানাং বাগাদীনাং মধ্যে, সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) মধ্যমঃ(মুখ্যঃ) প্রাণঃ যথা(যদ্বৎ মৃত্যুনা অনভিভূতঃ), এবং(তদ্বৎ) এতাসাং দেবতানাং(অগ্নিপ্রভৃতীনাং) মধ্যে বায়ুঃ[অপি মৃত্যুনা অনভিভূতঃ]। হি—(যস্মাৎ) অন্যাঃ দেবতাঃ স্লোচন্তি(অন্তং গচ্ছন্তি,—স্বক- র্ম্মভ্যঃ বিরতা ভবন্তি), বায়ুঃ ন[স্পন্দনাত্মকাৎ স্বকর্ম্মণঃ বিরতঃ ভবতি]; সা এষা দেবতা অনন্তমিতা(অস্তরহিতা), যৎ(যঃ) বায়ুঃ।[দেবতানাং মধ্যে বায়ুরেব কেবলং স্বকর্ম্মসু নিত্যং লব্ধবৃত্তিরিতিভাবঃ] ॥ ৭৬॥ ২২॥
মূলানুবাদ।-অতঃপর অধিদৈবত অর্থাৎ দেবতাবিষয়ক ব্রত মীমাংসিত হইতেছে-অগ্নি ব্রত ধারণ করিল-আমি সর্বদা প্রজ্বলিত হইব; আদিত্য[ব্রত ধারণ করিল]-আমি সর্বদা তাপ দিব; এবং চন্দ্র[ব্রত ধারণ করিল]-আমি সর্বদা প্রকাশ পাইব; অপরাপর দেবতাও এইরূপ এইরূপ করিল। পূর্বোক্ত বাক্প্রভৃতির মধ্যে যেমন একমাত্র মুখ্য প্রাণই কেবল মৃত্যুকর্তৃক আক্রান্ত হয় নাই (অপর সকলেই আক্রান্ত হইয়াছে), তেমনি এই অগ্নিপ্রভৃতি দেবতার মধ্যেও কেবল বায়ুই[মৃত্যুকর্তৃক আক্রান্ত হয় না]; কারণ, অপরাপর সমস্ত দেবতাই অস্তমিত হয় অর্থাৎ নিজ নিজ কৰ্ম্ম করিয়া পরিশ্রান্ত- বিরত হয়, কিন্তু বায়ু সেরূপ হয় না; সেই এই দেবতাই অন্তরহিত- যাহার নাম বায়ু ॥ ৭৬॥ ২২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথানন্তরমধিদৈবতং দেবতাবিষয়ং দর্শনমুচ্যতে। কস্য দেবতাবিশেষস্য ব্রতধারণং শ্রেয় ইতি মীমাংস্যতে। অধ্যাত্মবৎ সর্ব্বম্— জ্বলিষ্যাম্যেবাহমিত্যগ্নির্দধে, তপ্স্যাম্যহমিত্যাদিত্যঃ। ভাষ্যাম্যহমিতি চন্দ্রমাঃ। এবমন্যা দেবতাঃ যথাদৈবতম্। সঃ অধ্যাত্মং বাগাদীনামেষাং প্রাণানাং মধ্যে মধ্যমঃ প্রাণো মৃত্যুনা অনাপ্তঃ স্বকর্ম্মণো ন প্রচ্যাবিতঃ স্বেন প্রাণব্রতেনাভগ্ন- ব্রতো যথা, এবমেতাসামগ্ল্যাদীনাং দেবতানাং বায়ুরপি। ম্লোচন্তি অস্তং যন্তি— স্বকর্ম্মভ্য উপরমন্তে—যথা অধ্যাত্মং বাগাদয়োহন্যা দেবতা অগ্ন্যাদ্যাঃ; ন বায়ুরস্তং যাতি—যথা মধ্যমঃ প্রাণঃ; অতঃ সৈষা অনন্তমিতা দেবতা যদ্বায়ুঃ যোহয়ং বায়ুঃ। এবমধ্যাত্মমধিদৈবং চ মীমাংসিত্বা নির্দ্ধারিতং—প্রাণ-বায়াত্মনোত্র তমভগ্ন- মিতি॥ ৭৬॥ ২২॥
টীকা।—অধ্যাত্মদর্শনমুক্তাহধিদৈবতদর্শনং বক্তু মনন্তরবাক্যমবতারয়তি—অথেতি। তর্হি জ্বলিষ্যামীত্যাদি কিমর্থমিত্যাশঙ্ক্যাহ—কস্যেতি। বদিষ্যামীত্যাদাবুক্তং ব্যাখ্যানমিহাপি দ্রষ্টব্য- মিত্যাহ—অধ্যাত্মবদিতি। যথাদৈবতং স্বং স্বং দেবতাব্যাপারমনতিক্রম্যান্যা দেবতা বিদ্যুদাদ্যা দপ্রিরে ব্রতমিতার্থঃ। স যথেত্যাদি ব্যাচষ্টে—সোহধ্যাত্মমিতি। বায়ুরপি মৃত্যুনাহনাপ্তঃ স্বকর্ম্মণো ন প্রচ্যাবিতঃ স্বেন বায়ুব্রতেনাভগ্নব্রত ইতি শেষঃ। তদেব সাধয়তি—ম্নোচস্তীতি। ব্রাহ্মণোক্তমর্থমুপসংহরতি—এবমিতি। ৭৬। ২২॥
ভাষ্যানুবাদ।—অনন্তর অধিদৈবত অর্থাৎ দেবতা-বিষয়ক দর্শন(উপা- সনা) কথিত হইতেছে। দেবতার মধ্যে কোন দেবতার ব্রত(নিয়ম) গ্রহণ করা শ্রেয়স্কর, তাহা মীমাংসিত(বিচারিত) হইতেছে—
পূর্ব্বোক্ত অধ্যাত্মব্রতের মতই সমস্ত[বুঝিতে হইবে]; আমি কেবলই প্রজ্ঞ- লিত থাকিব, অগ্নি এইরূপ ব্রত ধারণ করিল; আমি নিরন্তর তাপ দিব, আদিত্য এইরূপ ব্রত গ্রহণ করিল; আমি সর্ব্বদা প্রকাশ পাইব, চন্দ্র এইরূপ ব্রত ধারণ করিল। অন্যান্য দেবতাগণও নিজ নিজ কর্মবিষয়ে এইরূপ ব্রত ধারণ করিল। অধ্যাত্ম বাগাদি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে যেমন সেই একমাত্র মুখ্য প্রাণই কেবল মৃত্যু- কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া স্বকর্ম হইতে বিনিবৃত্ত হয় নাই, অর্থাৎ একমাত্র প্রাণই যেরূপ ব্রতপালনে অভগ্নব্রত রহিয়াছে, এই অগ্নি প্রভৃতি দেবতাগণের মধ্যে বায়ুও তেমনি, অর্থাৎ মৃত্যুকর্তৃক আক্রান্ত ও ভগ্নব্রত হয় নাই।
অধ্যাত্ম বাক্ প্রভৃতির ন্যায় অগ্নি প্রভৃতি অন্যান্য দেবতাগণও অস্তগমন করে অর্থাৎ নিজ নিজ কর্ম্ম হইতে বিরত হয়, কিন্তু মুখ্য প্রাণের ন্যায় একমাত্র সেই বায়ু দেবতাই অস্তমিত হয় না; অতএব, এই যে বায়ু, ইহাই একমাত্র অনস্তমিতা দেবতা। এইরূপে অধ্যাত্ম ও অধিদৈবত ব্রতের মীমাংসা প্রদর্শন করিয়া অব-
ধারণ করিলেন যে, প্রাণ ও বায়ুর ব্রতই একমাত্র অভগ্ন আছে,(তদ্ভিন্ন আর সকলের ব্রতই ভগ্ন হইয়াছে) ॥ ৭৬॥ ২২॥
অথৈষ শ্লোকো ভবতি—যতশ্চোদেতি সূর্য্যোহস্তং যত্র চ গচ্ছতীতি, প্রাণাদ্বা এষ উদেতি প্রাণেহস্তমেতি তং দেবাশ্চক্রিরে ধর্ম্মং স এবাদ্য স উ শ্ব ইতি, যদ্বা এতেহমুহ্যধ্রিয়ন্ত তদেবাপ্যদ্য কুর্ব্বন্তি।
তস্মাদেকমেব ব্রতং চরেৎ প্রাণ্যাচ্চৈবাপান্যাচ্চ নেন্মা পাপ্না মৃত্যুরাপ্নুবদিতি, যদ্যু চরেৎ সমাপিপয়িষেত্তেনো এতস্যৈ দেব- তায়ৈ সাযুজ্যং সলোকতাং জয়তি ॥ ৭৭ ॥ ২৩ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(বাক্যারম্ভে)[অস্মিন্ অর্থে] এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) শ্লোকঃ (সংক্ষিপ্তার্থকঃ মন্ত্রঃ) ভবতি—সূর্য্যঃ(অধিদৈবং, অধ্যাত্মং চ চক্ষুঃ) যতঃ(যস্মাৎ বায়োঃ প্রাণাচ্চ) উদেতি(উদগচ্ছতি);[সায়ংসময়ে সুষুপ্তিসময়ে চ] যত্র (যস্মিন্ বায়ৌ, প্রাণে চ) অস্তং গচ্ছতি,(বিলীয়তে) ইতি।
[শ্রুতিঃ স্বয়মেব এতস্যা অর্থমাহ]—এষঃ(সূর্য্যঃ চক্ষুঃ চ) প্রাণাৎ[অধি- দৈবাৎ বায়োঃ চ] উদেতি, প্রাণে[অধিদৈবে বায়ৌ চ] অস্তং চ এতি(অদৃশ্য- তাম্ আপদ্যতে); দেবাঃ(অগ্ন্যাদয়ঃ, বাগাদয়ঃ চ) তৎ(প্রাণং বায়ুং চ) ধৰ্ম্মৎ চক্রিরে(প্রাণব্রতং বায়ুব্রতং চ ধৃতবন্তঃ); সঃ(প্রাণঃ বায়ুঃ চ) এব অদ্য(বর্ত্ত- মানসময়ে)[অনুবর্ত্যতে], সঃ উ(এব) শ্বঃ(আগামিনি দিবসে—ভবিষ্যৎ- কালে চ)[অনুবর্ত্তিষ্যতে দেবৈরিতি শেষঃ] ইতি।
এতে(বাগাদরঃ অগ্ন্যাদয়শ্চ) অমুর্হি(অমুস্মিন্-পুরাকালে) যৎ(প্রাণব্রতং বায়ুব্রতং চ) অধ্রিয়ন্ত(ধৃতবন্তঃ), অদ্য(ইদানীং) অপি কুর্ব্বন্তি(তদ্ অনুসরন্তি) (অদ্যাপি বাগাদয়ঃ অগ্ন্যাদয়শ্চ পূর্ব্বগৃহীতং প্রাণব্রতং বায়ুব্রতং চ ন পরিত্যজন্তী- ত্যর্থঃ)। তস্মাৎ(হেতোঃ)[অন্যোহপি] একম্ এব ব্রতং চরেৎ(পরিপালয়েৎ) প্রাণ্যাৎ(প্রাণব্যাপারং কুৰ্য্যাৎ), অপান্যাৎ চ(অপানব্যাপারং চ কুৰ্য্যাৎ, প্রাণাপান- ব্যাপারবর্জম্ ইন্দ্রিয়ান্তরব্যাপারেষু নানুরক্তো ভবেদিতি ভাবঃ)।[‘নেৎ’শব্দঃ ‘ভীতিসূচকঃ’;][কুতঃ?] মৃত্যুঃ(শ্রমরূপী সন্) মা(মাং) আপ্লুবৎ(প্রাপুয়াৎ) নেৎ;(‘নেৎ’ শব্দো ভীতিসূচকঃ),(যদ্যহং অস্মাৎ ব্রতাৎ ভ্রষ্টঃ স্যাং, তদা মৃত্যুগ্রস্তঃ
ভবেয়ম্—ইতি ভীতঃ সন্ ইতি ভাবঃ] ইতি। উ(বিতর্কে) যদি চরেৎ(ব্রতম্ আরভেত),[তদা] সমাপিপন্নিষেৎ(সমাপয়িতুম্ ইচ্ছেৎ-ন পুনঃ ভগ্নব্রতো ভবেৎ); তেন(ব্রতসমাপনেন) উ এতস্যৈ দেবতায়ৈ(এতস্যাঃ দেবতায়াঃ— প্রাণস্থ্য) সাযুজ্যং(একাত্মভাবং) সলোকতাং(সমানলোকবাসিত্বং বা) জয়তি (বশীকরোতি);[বিজ্ঞানস্য উৎকর্ষে সাযুজ্যং, অপকর্ষে চ সলোকতামিত্যভি- প্রায়ঃ] ৪ ৭৭ ॥ ২৩॥
[ ইতি প্রথমাধ্যায়ে পঞ্চমব্রাহ্মণস্য সরলার্থঃ ॥ ১ ॥ ৫ ॥]
মূলানুবাদ।-উক্ত বিষয়ে এইরূপ একটি শ্লোক আছে- সূর্য্য যাহা হইতে উদিত হন, এবং যাহাতে অস্তমিত হন। ইনি প্রাণহইতে উদিত হন, এবং প্রাণেই অস্তমিত হন; দেবতাগণ তাঁহাকেই ধৰ্ম্ম অর্থাৎ নিজেদের অনুসরণীয় বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন; আজওতিনি, এবং ভবি- ষ্যতেও তিনিই[অনুসৃতওঅনুসরণীয় হইতেছেন ও হইবেন]। এই দেব- গণ পূর্ব্বে যাহা(যে ব্রত) ধারণ করিয়াছিলেন, আজও তাহাই(সেই ব্রতই) পালন করিতেছেন। অতএব একই ব্রত আচরণ করিবে-আমাকে পাপে অভিভূত করিবে-মনে করিয়া কেবল প্রাণাপান-ব্যাপারমাত্র করিবে; আর(ব্রত যদি গ্রহণ করে, তাহা হইলেও অবশ্যই তাহা সমাপন করিবে) তাহা দ্বারা এই দেবতার(বায়ু ও প্রাণদেবতার) সাযুজ্য(সহ- যোগিতা) ও সালোক্য(সমানলোকতা) জয় করিয়া থাকে ॥ ৭৭॥ ২৩ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথৈতস্যৈবার্থস্য প্রকাশক এষ শ্লোকো মন্ত্রো ভবতি। সতশ্চ যস্মাদ বায়োরুদেতি উদগচ্ছতি সূর্য্যঃ, অধ্যাত্মং চ চক্ষুরাত্মনা প্রাণাৎ—অস্তঞ্চ যত্র বায়ৌ প্রাণে চ গচ্ছতি অপরসন্ধ্যাসময়ে স্বাপসময়ে চ পুরু- যস্য,—“তং দেবাঃ”—তং ধর্ম্মং দেবাঃ চক্রিরে ধৃতবস্তো বাগাদয়োহগ্ন্যাদয়শ্চ প্রাণব্রতং বায়ুব্রতং চ পুরা বিচার্য্য। স এব অদ্য ইদানীং শ্বোহপি ভবিষ্যত্যপি কালেহনুবর্ত্ত্যতেহনুবর্ত্তিষ্যতে চ দেবৈরিত্যভিপ্রায়ঃ। তত্রেমং মন্ত্রং সঙ্ক্ষেপতো- ব্যাচষ্টে ব্রাহ্মণম্—“প্রাণাদ্বা এষ সূর্য্য উদেতি প্রাণেহস্তমেতি”। ১
তং দেবাশ্চক্রিরে ধর্ম্মং স এবাদ্য স উ শ্ব ইত্যস্য কোহর্থ ইত্যুচ্যতে—যদ্বৈ এতে ব্রতমমুর্হি অমুস্মিন্ কালে বাগাদয়োহগ্ন্যাদয়শ্চ প্রাণব্রতং বায়ুব্রতং চ অধ্রিয়ন্ত, তদে- বাদ্যাপি কুর্ব্বন্তি অনুবর্তন্তেঽনুবর্তিষ্যন্তে চ ব্রতং তৈরভগ্নমেব। যত্তু, বাগাদি-
ব্রতং অগ্ন্যাদিব্রতং চ, তদ্ভগ্নমেব, তেষামস্তমনকালে স্বাপকালে চ বায়ৌ প্রাণে চ নির্ম্মুক্তিদর্শনাৎ। ২
অথৈতদন্যত্রোক্তম্—“যদা বৈ পুরুষঃ স্বপিতি, প্রাণং তর্হি বাগপ্যেতি, প্রাণং মনঃ, প্রাণং চক্ষুঃ, প্রাণং শ্রোত্রং, যদা প্রবুধ্যতে প্রাণাদেবাধি পুনর্জা- য়ন্ত ইত্যধ্যাত্মম্। অথাধিদৈবতম্—যদা বা অগ্নিরনুগচ্ছতি বায়ুং, তর্হ্যনুদ্বাতি, তস্মাদেনমুদবাসীদিত্যাহুর্বায়ুং হ্যনুদ্বাতি, যদাদিত্যোহস্তমেতি, বায়ুং তর্হি প্রবিশতি, বায়ুৎ চন্দ্রমাঃ, বায়ৌ দিশঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ, বায়োরেবাধি পুনর্জায়ন্তে” ইতি। ৩
যম্মাদেতদেব ব্রতং বাগাদিঘগ্ন্যাদিযু চানুগতং, যদেতদ্বারোশ্চ প্রাণস্য চ পরি- স্পন্দাত্মকত্বং সর্ব্বৈদ্দেবৈরনুবর্ত্যমানং ব্রতম্-তস্মাদন্যোহপ্যেকমের ব্রতং চরেৎ। কিং তৎ? প্রাণ্যাৎ প্রাণনব্যাপারং কুৰ্য্যাৎ, অপান্যাৎ অপাননব্যাপারঞ্চ; ন হি প্রাণাপানব্যাপারস্থ্য প্রাণনাপাননলক্ষণস্য উপরমোহস্তি; তস্মাত্তদেবৈকং ব্রতং চরেৎ হিত্বেন্দ্রিয়ান্তরব্যাপারম্-নেৎ মা মাং পাপ্না মৃত্যুঃ শ্রমরূপী আপ্নবৎ আপ্প- য়াৎ-নেচ্ছব্দঃ পরিভয়ে-যদ্যহমম্মাদ তাৎ প্রচ্যুতঃ স্যাং, গ্রস্ত এবাহং মৃত্যুনা- ইত্যেবং ত্রস্তো ধারয়েৎ প্রাণব্রতমিত্যতিপ্রায়ঃ। যদি কদাচিৎ উ চরেৎ প্রারভেত প্রাণব্রতং, সমাপিপরিষেৎ সমাপয়িতুমিচ্ছেৎ। যদি হি অস্মাদু তাদুপরমেৎ, প্রাণঃ পরিভূতঃ স্যাৎ দেবাশ; তস্মাৎ সমাপয়েদেব। তেন উ তেনানেন ব্রতেন প্রাণা- ত্মপ্রতিপত্যা সর্ব্বভূতেষু-বাগাদয়োহগ্ল্যাদয়শ্চ মদাত্মকা এব, অহং প্রাণ আত্মা সর্ব্বপরিস্পন্দকৃৎ, এবং তেনানেন ব্রতধারণেন এতস্যা এব প্রাণদেবতায়াঃ সাযুজ্যং সযুগ ভাবমেকাত্মত্বং সলোকতাং, সমানলোকতাং বা একস্থানত্বং-বিজ্ঞানমান্দ্যা- পেক্ষ্যমেতৎ-জয়তি প্রাপ্নোতীতি ॥ ৭৭ ॥ ২৩ ॥
টাকা।—ব্রাহ্মণার্থদার্ঘ্যার্থং মন্ত্রমবতার্য্য ব্যাকরোতি—অথেত্যাদিনা। সূর্য্যোহধিদৈবমুদয়- কালে বায়োরুদ্গচ্ছতি, তত্র চাপরসসন্ধ্যাসময়েহস্তং গচ্ছতি। স এব চাধ্যাত্মং প্রবোধসময়ে চক্ষুরাত্মনা প্রাণাদুদেতি, পুরুষস্য স্বাপসময়ে চ তস্মিন্নেবাস্তং গচ্ছতীতি যতশ্চেত্যাদৌ বিভাগঃ। শ্লোকস্যোত্তরার্দ্ধং প্রাণাদিত্যাদিব্রাহ্মণব্যবহিতং শ্লোকে পূর্ণতাজ্ঞাপনার্থং প্রথমং ব্যাচষ্টে—তং দেবা ইতি। ধারণস্য প্রকৃতত্বাৎ সামান্যেন চ বিশেষং লক্ষয়িত্বাহ—ধৃতবস্তু ইতি। স এবেতি ধর্মপরামর্শঃ। তত্রেতি সপ্তমী সংপূর্ণমন্ত্রমধিকরোতি। ইমং মন্ত্রমিতি পূর্ব্বার্দ্ধোক্তিঃ। ১
উত্তরাদ্ধস্য ব্রাহ্মণমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-তমিত্যাদিনা। তৈরভগ্নং দেবৈরভগ্নত্বেন মীমাংসিতং তেহনুগচ্ছন্তীত্যর্থঃ। বিশেষণস্যার্থবত্ত্বং সাধয়তি-যত্ত্বিতি। ২
উক্তং হেতুমগ্নিরহস্যমাশ্রিত্য বিশদয়তি—অখেতি। যথাহেতৃপমার্থোঽধকঃ। অনুগচ্ছতি
শামাতীত্যেতৎ। বায়ুমনু তদধীন এব তস্মিন্ কাল উদ্বাত্যস্তমেতি। উদবাসীদন্তং গত ইত্যর্থঃ ইতিশব্দোহগ্নিরহস্তবাক্যসমাপ্ত্যর্থঃ। ৩
অধ্যাত্মং প্রাণব্রতমধিদৈবং চ বায়ুব্রতমিত্যেকমেব ব্রতং ধার্য্যমিতি। মন্ত্রব্রাহ্মণাভ্যাং প্রতি- পাদ্য তন্মাদিতি ব্যাচষ্টে-যম্মাদিতি। নহি বাগাদয়োঽগ্ন্যাদয়ো বা পরিস্পন্দবিরহিণঃ স্থাতু- মর্হন্তি, তেন প্রাণাদিব্রতং তৈরনুবর্ত্যত এবেত্যর্থঃ। একমেবেতি নিয়মে প্রাণব্যাপারস্যাভগ্নত্বং হেতুমাহ-ন হীতি। তদনুপরমে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। নমু প্রাণনাদ্যভাবে জীবনা- সম্ভবাত্তস্যার্থিকত্বাত্তদনুষ্ঠানমবিধেয়মিত্যাশঙ্ক্যৈবকারলভ্যং নিয়মং দর্শয়তি-হিত্বেতি। নেদিত্যাদিবাক্যস্যাক্ষরার্থমুক্ত। তাৎপর্য্যার্থমাহ-যদ্যহমিতি। প্রাণব্রতস্য সকৃদনুষ্ঠানমাশঙ্ক্য সর্ব্বেন্দ্রিয়ব্যাপারনিবৃত্তিরূপং সংস্থ্যাসমামরণমনুবর্তয়েদিত্যাহ-যদীতি। বিপক্ষে দোষমাহ- যদি হীতি। প্রাণাদিপরিভবপরিহারার্থং নিয়মং নিগময়তি-তস্মাদিতি।
বিদ্যাফলং বক্তুং ভূমিকাং করোতি—তেনেতি। ব্রতমেব বিশিনষ্টি—প্রাণেতি। প্রতি- পত্তিমেব প্রকটয়তি—সর্ব্বভূতেষিতি। সম্প্রতি বিদ্যাফলং কথয়তি—এবমিতি। কথমেকস্মিন্নেব বিজ্ঞানে ফলবিকল্পঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্য বিজ্ঞানপ্রকর্যাপেক্ষং সাযুজ্যং, তন্নিকর্ষাপেক্ষং চ সালোক্য- মিত্যাহ—বিজ্ঞানেতি। ৭৪॥ ২৩॥
ইতি বৃহদারণ্যকভাষ্যটীকায়াং প্রথম্যাধ্যায়ে পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্। ১। ৫।
ভাষ্যানুবাদ।—সংক্ষেপে যথোক্ত অর্থের প্রকাশক এইরূপ একটি শ্লোক আছে। সূর্য্যদেব[আধিদৈবিকরূপে] যাহা হইতে—যে বায়ু হইতে উদিত—উর্দ্ধে উত্থিত হন, এবং আধ্যাত্মিক চক্ষুস্বরূপে প্রাণ হইতে[উদিত হন], (১) আবার অপরসন্ধ্যাসময়ে(সায়ংকালে) ও সুষুপ্তিসময়ে যাহার মধ্যে অর্থাৎ বায়ুতে ও প্রাণেতে অস্তগমন করেন; দেবতাগণ পুরাকালে তাহাকে ধর্ম্ম- রূপে ধারণ করিয়াছিলেন, অর্থাৎ আধ্যাত্মিক বাক্ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় ও আধি- দৈবিক অগ্নিপ্রভৃতি দেবতা বিচারপূর্ব্বক যথাক্রমে বায়ুব্রত ও প্রাণব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন। দেবতাগণ বর্তমান সময়ে তাহার অনুবৃত্তি করিতে- ছেন, এবং ভবিষ্যৎকালেও তাহারই অনুসরণ করিবেন। এই ব্রাহ্মণ(এই
শ্রুতি) নিজেই “প্রাণাদ্বা”, ইত্যাদি বাক্যে উক্ত মন্ত্রের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা করিতেছেন। ১
এখন ‘তং দেবাঃ চক্রিরে ধৰ্ম্মং স এবাদ্য স উ শ্বঃ’ এই মন্ত্রটির অর্থ কি, তাহা বলিতেছেন-এই আধ্যাত্মিক বাক্প্রভৃতি আর আধিদৈবিক অগ্নিপ্রভৃতি দেবতা- গণ পুরাকালে, যে ব্রত-যে বায়ুব্রত ও প্রাণব্রত ধারণ করিয়াছিলেন, আজও তাঁহারা সেই ব্রত পরিপালন করিতেছেন, এবং ভবিষ্যতেও পালন করিবেন, অর্থাৎ কখনও তাঁহাদের ব্রতভঙ্গ হয় নাই ও হইবে না। আর বাগাদি ইন্দ্রিয়ের ও অগ্নিপ্রভৃতি দেবতার নিজস্ব যে ব্রত, তাহা ভগ্ন হইয়াছে; কেননা, অস্তমিত হইবার সময়ে ও সুষুপ্তিকালে তাহাদের ব্রতের(নিরন্তর জ্বলন ও শব্দোচ্চারণ কার্য্যের) নিবৃত্তি দেখিতে পাওয়া যায়। অভিপ্রায় এই যে, অগ্নি প্রভৃতি দেবতা যে, ‘জলিষ্যাম্যেব অহম্’ ইত্যাদি ব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন, অস্তগমনকালে তাঁহা- দের সেই প্রতিজ্ঞানুরূপ কার্য্যশক্তি থাকে না, এবং বাক্ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণও যে, ‘বদিষ্যাম্যেব অহম্’ ইত্যাদি ব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুষুপ্তিসময় উপস্থিত হইলে, তাহাদেরও সেই বাগব্যবহারাদি থাকে না; সমস্তই প্রাণে বিলীন হইয়া যায়; অথচ বায়ু ও প্রাণ যে ব্রত ধারণ করিয়াছিলেন, সে ব্রত আজ পর্যন্তও অক্ষতই রহিয়াছে, এবং সুদূর-ভবিষ্যতেও অব্যাহতই থাকিবে। ২
অন্যত্রও এ কথা উক্ত আছে—‘পুরুষ যখন নিদ্রিত হয়, তখন বাক্ প্রাণকে প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ প্রাণে বিলীন হয়; মনও প্রাণকে প্রাপ্ত হয়, চক্ষুঃ এবং শ্রবণে- ন্দ্রিয়ও প্রাণে অস্তমিত হয়; আবার যখন প্রবুদ্ধ হয়—পুরুষ জাগরিত হয়, তখন প্রাণ হইতেই সমস্ত ইন্দ্রিয় পুনঃ প্রাদুর্ভূত হয়। এই পর্য্যন্ত গেল অধ্যাত্মসম্বন্ধের কথা; অতঃপর অধিদৈবত সম্বন্ধের কথা বলা হইতেছে—অগ্নি যেসময় বায়ুর অনুগমন করে অর্থাৎ বায়ুতে প্রবেশ করে, তখনই অগ্নি অস্তমিত(নির্ব্বাপিত) হয়; সেই জন্যই তাদৃশ অগ্নিকে লক্ষ্য করিয়া লোকে বলিয়া থাকে যে, অগ্নি অস্ত-- মিত হইয়াছে; কারণ, তৎকালে তাহা বায়ুর অনুগত হইয়া থাকে; আবার আদিত্য যখন অস্তমিত হন, তখন তিনিও বায়ুতে প্রবেশ করেন, চন্দ্রও বায়ুতে প্রবেশ করেন, দিক্সমূহও বায়ুর মধ্যে অবস্থিত হয়, পুনর্ব্বার সেই বায়ু হইতেই তাঁহারা প্রাদুর্ভূত হন’ ইতি। ৩
যে হেতু, বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয় ও অগ্নিপ্রভৃতি দেবতার মধ্যে এইরূপ ব্রতই অনুগত রহিয়াছে, অর্থাৎ বায়ু ও প্রাণের যে পরিস্পন্দনাত্মক ব্যাপার, সমস্ত দেবগণ ব্রতরূপে তাহারই অনুসরণ করিতেছেন, সেইহেতু অপর লোকেও একই
ব্রত আচরণ(অনুষ্ঠান) করিবে। সেই ব্রতটি কি? “প্রাণ্যাৎ”-প্রাণন- ব্যাপার করিবে, এবং “অপান্যাৎ” অপানবায়ুর কার্য্য সম্পাদন করিবে, অর্থাৎ কেবল প্রাণ ও অপানের কার্য্য মাত্র করিবে; কারণ, প্রাণের ব্যাপার-প্রাণন (শ্বাসপ্রশ্বাস ত্যাগ করা) ও অপানের কার্য্য-অপানন(মলমুত্রাদির অধোনয়ন করা), এই উভয় প্রকার কার্য্যের কস্মিন্ কালেও নিবৃত্তি হয় না। অতএব অপ- রাপর ইন্দ্রিয়ের ‘ব্যাপার ত্যাগ করিয়া অর্থাৎ তাহাদের ব্যাপারে আসক্ত না হইয়া,-পাপ্মা-শ্রমরূপী মৃত্যু আমাকে আক্রমণ করিবে,-অভিভূত করিবে, এই ভয়ে একই ব্রতের অনুষ্ঠান করিবে। এ কথার অভিপ্রায় এই যে, আমি যদি উক্ত প্রাণব্রত হইতে বিচ্যুত হই, তবে নিশ্চয়ই মৃত্যু আমাকে গ্রাস করিবে, এই ভয়ে ভীত হইয়া প্রাণব্রত গ্রহণ করিবে। আর যদি কখনও প্রাণব্রত ধারণ করে, তবে অবশ্যই তাহার সমাপন করিতে ইচ্ছা করিবে-যত্নবান্ থাকিবে। যদি উক্ত ব্রত হইতে বিরত হয়, তবে নিশ্চয়ই তাহার প্রাণ এবং তদধিষ্ঠাতা দেবতাগণ পরিভূত(মৃত্যুকর্তৃক আক্রান্ত) হয়; অতএব অবশ্যই গৃহীত ব্রত সমাপন করিবে। ৪
এই ব্রত দ্বারা—প্রাণব্রত-গ্রহণের ফলে প্রাণাত্মভাবপ্রাপ্তি হয়, তাহা দ্বারা সর্ব্বভূতে—বাক্প্রভৃতি ও অগ্নিপ্রভৃতি দেবতা নিশ্চয়ই মৎস্বরূপ(আমা হইতে পৃথক্ নহে) এবং আমিই সর্ব্বভূতে পরিস্পন্দনের হেতুভূত, এবংবিধ ব্রতধারণের গুণে তিনি এই প্রাণ-দেবতারই সাযুজ্য—সযুগ্ভাব অর্থাৎ একাত্মভাব কিংবা সলোকতা—সমানলোকে বাস প্রাপ্ত হন;[জ্ঞানের তারতম্যানুসারে উক্তপ্রকার ফলভেদ কথিত হইল] ॥ ৭৭ ॥ ২৩ ॥
প্রথমাধ্যায়ে পঞ্চম ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ১ ॥ ৫ ॥
ত্রয়ং বা ইদং নাম রূপং কৰ্ম্ম, তেষাং নান্নাং বাগিত্যেতদেষা- মুক্থমতো হি সর্ব্বাণি নামান্যত্তিষ্ঠন্তি।
এতদেবাং সামৈতদ্ধি সর্ব্বৈর্নামভিঃ সমমেতদেবাং ব্রহ্মৈতদ্ধি সর্ব্বাণি নামানি বিভর্ত্তি ॥ ৭৮ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—ইদানীং যথোক্তসাধ্য-সাধনাত্মকস্য সর্ব্বস্য জগতঃ ত্রৈবিধ্য- মাহ—“ত্রয়ং বা” ইত্যাদিনা। ইদং(যথোক্তং সর্ব্বমেতৎ) ত্রয়ং বৈ(এব); [কিং তৎ ত্রয়ম্?] নাম(সংজ্ঞাশব্দঃ), রূপং(আকৃতিঃ), কৰ্ম্ম(ক্রিয়া চ); তেষাং নাম্নাং[যং] বাক্ ইতি(শব্দসামান্যং), এতৎ এষাং(নাম্নাং) উকথং (উৎপত্তিস্থানং); হি(যস্মাৎ) অতঃ(নামসামান্যাৎ) সর্ব্বাণি নামানি উত্তি- ষ্ঠন্তি(উৎপদ্যন্তে); এতৎ(শব্দসামান্যং) এষাং(নাম্নাং) সাম; হি(যস্মাৎ) এতৎ সর্ব্বৈঃ নামভিঃ সমম্(সমানম্); এতৎ এষাং ব্রহ্ম(আত্মা); হি(যস্মাৎ) এতৎ সর্ব্বাণি নামানি বিভর্তি(ধারয়তি) ॥৭৮৷১॥
মূলানুবাদ?—পূর্ব্বে সাধ্য-সাধনভাবে যে সপ্তপ্রকার অন্নের কথা বলা হইয়াছে, সে সমস্তই ত্রিবিধ(তিন ভাগে বিভক্ত)— নাম, রূপ ও কর্ম্ম। বাক্ অর্থাৎ সাধারণ শব্দমাত্রই উক্ত নাম- সমূহের উক্তি অর্থাৎ উৎপত্তিস্থান; কারণ সমস্ত নামই এই শব্দসামান্য হইতে সমুদ্ভুত হয়। এই বাক্ই সমস্ত নামের সাম অর্থাৎ সামান্য ভাব; কারণ, এই শব্দসামান্য হইতেছে সমস্ত নামের সমান—এক-ধর্ম্মাক্রান্ত; আর এই শব্দসামান্যই উক্ত নাম- সমূহের ব্রহ্ম অর্থাৎ আত্মা; কারণ, শব্দসামান্যই সমস্ত বিশেষ বিশেষ নামকে ধারণ করিয়া রাখিয়াছে;[কেন না, শব্দাতিরিক্ত নামের কোনও অস্তিত্ব নাই]॥ ৭৮॥ ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যদেতদবিদ্যাবিষয়ত্বেন প্রস্তুতং সাধ্যসাধনলক্ষণং ব্যাকৃতং জগৎ প্রাণাত্মপ্রাপ্ত্যন্তোৎকর্ষবদপি ফলম্, যা চৈতস্য ব্যাকরণাৎ প্রাগবস্থা অব্যাকৃতশব্দবাচ্যা—বৃক্ষবীজবৎ সর্ব্বমেতৎ, ত্রয়ম। কিং তৎ ত্রয়ম? ইত্যুচ্যতে—
নাম রূপং কৰ্ম্ম চেতি অনায্যৈব—ন আত্মা যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাদ ব্রহ্ম; তস্মাদস্মা- দ্বিরজ্যেতেত্যেবমর্থঃ ত্রয়ং বা ইত্যাদ্যারম্ভঃ। ন হ্যস্মাৎ অনাত্মনোঽব্যাবৃত্ত- চিত্তস্যাত্মানমেব লোকম্—অহং ব্রহ্মাস্মীত্যুপাসিতুং বুদ্ধিঃ প্রবর্ত্ততে, বাহ্য- প্রত্যগাত্মপ্রবৃত্ত্যোবিরোধাৎ। তথা চ কাঠকে—
“পরাঙ্কি খানি ব্যতৃণং স্বয়ম্ভূষ্মাৎ পরাঙ্ পশ্যতি নাস্তরাত্মন্।
কশ্চিদ্গৌরবঃ প্রত্যগাত্মানমৈক্ষদাবৃত্তচক্ষুরমৃতত্বমিচ্ছন্॥” ইত্যাদি। ১
কথং পুনরস্য ব্যাকৃতাব্যাকৃতস্য ক্রিয়াকারকফলাত্মনঃ সংসারস্য নামরূপ- কর্মাত্মকতৈব, ন পুনরাত্মত্বম্—ইত্যেতৎ সম্ভাবয়িতুং শক্যত ইতি। অত্রোচ্যতে —তেষাং নাম্নাং যথোপন্যস্তানাং—বাগিতি শব্দসামান্যমুচ্যতে, “যঃ কশ্চ শব্দো বাগেব সা” ইত্যুক্তত্বাৎ বাগিত্যেতস্য শব্দস্য যোহর্থঃ শব্দসামান্যমাত্রম্, এতদেতেষাং নামবিশেষাণামুক্থং কারণম্ উপাদানম্, সৈন্ধবলবণকণানামিব সৈন্ধবাচলঃ; তদাহ—অতো হ্যম্মান্নামসামান্যাৎ সর্ব্বাণি নামানি যজ্ঞদত্তো দেবদ্বত্ত ইত্যেবমাদি- প্রবিভাগানি উত্তিষ্ঠন্তি উৎপদ্যন্তে প্রবিভজ্যন্তে লবণাচলাদিব লবণকণাঃ; কার্য্যঞ্চ ‘কারণেনাব্যতিরিক্তম্। তথা বিশেষাণাঞ্চ সামান্যেহন্তর্ভাবাৎ। ২
কথং সামান্যবিশেষভাব ইতি—এতৎ শব্দসামান্যম্ এষাং নামবিশেষাণাং সাম, সমত্বাৎ সাম সামান্যমিত্যর্থঃ। এতৎ হি যস্মাৎ সর্ব্বৈর্নামভিরাত্মবিশেষৈঃ সমম্। ৩
কিঞ্চ, আত্মলাভিশেযাচ্চ নামবিশেষাণাম্-যস্য চ যম্মাদাত্মলাভো ভবতি, প তেনাপ্রবিভক্তো দৃষ্টঃ, যথা ঘটাদীনাৎ মৃদা। কথং নামবিশেষাণাম্ আত্মলাভো বাচ ইতি? উচ্যতে-যত এতদেষাং বাকশব্দবাচ্যং বস্তু ব্রহ্ম আত্মা, ততো হ্যাত্মলাভো নাম্নাম্, শব্দব্যতিরিক্তস্বরূপানুপপত্তেঃ। তৎ প্রতিপাদয়তি-এতচ্ছব্দ- সামান্যং হি যস্মাচ্ছব্দবিশেষান্ সর্ব্বাণি নামানি বিভর্তি ধারয়তি স্বরূপপ্রদানেন। এবং কার্য্যকারণত্বোপপত্তেঃ সামান্যবিশেষোপপত্তেরাত্মপ্রদানোপপত্তেশ্চ নাম- বিশেষাণাং শব্দমাত্রতা সিদ্ধা। এবমুত্তরয়োরপি সর্ব্বং যোজ্যং যথোক্তম্ ॥ ১৮৷ ১॥
টীকা।—প্রপঞ্চিতস্যাবিশ্বাকার্য্যস্য সঙ্ক্ষেপেণোপসংহারার্থং ব্রাহ্মণান্তরমবতারয়তি—যদেত- দিতি। ফলমপি জ্ঞানকর্ম্মণোরুক্তবিশেষণবদ্ যদেতৎ প্রস্তুতমিতি সম্বন্ধঃ। অব্যাকৃতপ্রক্রিয়ায়া- মুক্তং স্মারয়তি—যা চেতি। ব্যাকৃতাব্যাকৃতস্য জগতঃ সংগৃহীতং রূপমাহ—সর্ব্বমিতি। বাঘনঃ- প্রাণাখ্যং এয়মিতি শঙ্কাং প্রত্যাহ—কিং ভদিত্যাদিনা। কিমর্থঃ পুনরয়মুপসংহার ইত্যাশঙ্ক্যাহ— অনায়ৈবেতি। আত্মশব্দার্থমাহ—যৎসাক্ষাদিতি। অনাত্মত্বেন জগতো হেয়ত্বং তচ্ছবেন পরামৃশ্যতে। বৈরাগ্যমপি কিমর্থমিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন হীতি। অবিরক্তোঽপি কুতুহলিতয়া তন্ত্রাধিকারী স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—বাহ্যেতি। অনাত্মপ্রবণমপ্যাত্মানং প্রত্যায়ারিষ্যত্যাত্মনঃ
সর্ব্বাত্মত্বাৎ, কুতো বিরোধ ইত্যাশঙ্ক্যাহ—তথেতি। কথং তহি প্রত্যগাত্মধীস্তত্রাহ— কশ্চিদিতি।
উপসংহারস্যেবং সফলত্বেহপি সর্ব্বস্থ্য জগতো নামাদিমাত্রত্বং প্রমাণাভাবাদযুক্তমিতি শঙ্কতঃ-কথমিতি। অনুমানৈঃ সম্ভাবনাং দর্শয়তি-অত্রেতি। তত্র তৎকাৰ্য্যত্বহেতুকমনুমান- মাহ-তেষামিতি। বাগিত্যেতদুথমিতি সম্বন্ধঃ। ইন্দ্রিয়ব্যাবৃত্ত্যর্থং বাক্পদার্থমাহ-শব্দেতি। সংগৃহীতমর্থং বিবৃণোতি-যঃ কশ্চেত্যাদিনা। উকথত্বমুপপাদয়িতুমুত্তরং বাক্যমিত্যাহ- তদাহেতি। কার্য্যকারণভাবেহপি কিমায়াতমত আহ-কার্য্যং চেতি। সর্ব্বে নামবিশেষা- স্তন্মাত্রাৎ তত্ত্বতো নভিদ্যন্তে তৎকাৰ্য্যত্বাৎ, যৎ যৎকার্য্যং, তত্ততো ন ভিদ্যতে, যথা মৃদো ঘট ইত্যর্থঃ। সর্ব্বে নামবিশেষান্তৎসামান্যে কল্পিতাঃ প্রত্যেকং তদনুবিদ্ধত্বাদ্রজ্বিদমংশানুবিদ্ধ- লর্পাদিবদিত্যনুমানান্তরমাহ-তথেতি। কাৰ্যাণাং কারণেহন্তর্ভাববদিতি যাবৎ।
উক্তমেব প্রশ্নপূর্ব্বকং প্রপঞ্চয়তি-কথমিত্যাদিনা। সামত্বং সাধয়তি-এতদ্ধীতি। ইতশ্চ নামবিশেষা নামমাত্রেহস্তর্ভবন্তীত্যাহ-কিঞ্চেতি। নামবিশেষাণাং নামমাত্রাদাত্মলাভাত্তম্মাদ- বিশেষাত্তত্রৈবান্তর্ভাব ইত্যক্ষরার্থঃ। সর্ব্বে নামবিশেষাস্তৎসামান্যান্ন পৃথগ্বস্ততঃ সস্তি, তেনাত্মবত্ত্বাৎ, যে যেনাত্মবস্তন্তে ততোহন্যে বস্তুতো ন সন্তি, যথা মৃদাত্মবস্তো ঘটাদয়ো বস্তুতপ্ততোহন্যে ন সন্তীত্যুক্তেহনুমানে ব্যাপ্তিং সাধয়তি-যস্য চেতি। হেতুলাভো ভবতীতি শেষঃ। তত্রৈব যুক্তিমাহ-ততো হীতি। তত্রৈব বাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-তদিত্যাদিনা। তস্মাত্তন্নাত্রাত্তদ্বিশেষাণামাত্মলাভ ইতি বাক্যশেষঃ। প্রথমকণ্ডিকয়া সিদ্ধমর্থমুপসহরতি- এবমিতি। উপপত্তিত্রয়মুত্তরবাক্যদ্বয়েহপি তুল্যমিত্যাদিশতি-এবমুত্তরয়োরিতি। ৭৮।১।
ভাষ্যানুবাদ।—প্রাণাত্মভাবপ্রাপ্তি বা প্রাজাপত্য পদলাভ যাহার সর্ব্বোৎকৃষ্ট ফল, সেই যে, এই সাধ্যসাধনাত্মক অভিব্যক্ত জগৎ বর্ণিত হইয়াছে, এবং আরও যে, বৃক্ষের বীজাবস্থার ন্যায় এই জগতের অভিব্যক্তিরও পূর্ব্ববর্তী অব্যাকৃত শব্দবাচ্য অবস্থা কথিত হইয়াছে, সে সমস্তই এই তিনপ্রকার। সেই তিনটি প্রকার কি কি, তাহা বলা হইতেছে—নাম, রূপ ও কর্ম্ম। এই তিনটিই অনাত্মা, কিন্তু যাহা সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ ব্রহ্মস্বরূপ আত্মা, তৎস্বরূপ নহে, পরন্তু আত্মা হইতে ভিন্ন; অতএব এই সংসার হইতে যাহাতে বিরক্তি(বৈরাগ্য) হইতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে “ত্রয়ং বা ইদম্” ইত্যাদি শ্রুতির আরম্ভ হইয়াছে; কেন না, অনাত্মভূত এই সংসার হইতে যাহার চিত্ত বিরক্ত বা বৈরাগ্যসম্পন্ন না হয়, তাহার পক্ষে কখনই “অহং ব্রহ্মাস্মি”(আমি ব্রহ্ম) এইরূপে আত্ম-লোকের উপাসনায় বুদ্ধি-প্রবৃত্তি হইতে পারে না; কারণ, বাহ্যবিষয়ে অনুবৃত্তি ও প্রত্যগাত্মবিষয়ে প্রবৃত্তি পরস্পর বিরুদ্ধস্বভাব। কঠোপনিষদেও আছে—‘স্বয়ম্ভূ (আদিকর্ত্তা) ইন্দ্রিয়গণকে পরাম্মুখ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন; সেই হেতু জীব “পরাঞ্চি”—বাহ্যপদার্থই দর্শন করিয়া থাকে, অন্তরাত্মাকে দর্শন করে না। অমৃতত্বলাভের ইচ্ছায় যাহার চক্ষু অর্থাৎ জ্ঞানদৃষ্টি আবৃত্ত(পরিবর্ত্তিত—অন্তর্মুখী)
হইয়াছে, এমন কোনও(অতি অল্পসংখ্যক) ধীর ব্যক্তিই প্রত্যক্ আত্মাকে দর্শন করিয়াছেন’ ইত্যাদি। ১
ভাল, ক্রিয়া, কারক ও ফলাত্মক এই ব্যাক্বতাব্যাকৃত অর্থাৎ স্থূলসূক্ষ্মাত্মক সংসার যে, কেবলই নাম, রূপ ও কর্ম্মাত্মক, পরন্তু আত্মস্বরূপ নয়, ইহা কি প্রকারে উপপাদন করা যাইতে পারে? তদুত্তরে বলা হইতেছে-শ্রুতির ‘বাক্’ শব্দে শব্দসামান্য অর্থাৎ সামান্যাকারে শব্দমাত্রই বুঝাইতেছে; কারণ, পূর্ব্বেই বলা হই- য়াছে যে, ‘যাহা কিছু শব্দ, সে সমস্ত বাক্’(বাক্ হইতে পৃথক্ নহে)। ‘বাক্’ শব্দের যাহা অর্থ-সাধারণ শব্দমাত্র, তাহাই এই যথোক্ত বিশেষ বিশেষ নামের (রাম, শ্যাম ইত্যাদি শব্দের) উথ-কারণ-উপাদানস্বরূপ; যেমন সৈন্ধব-পর্বত লবণকণাসমুহের উপাদান(সমষ্টি), তেমনি। এই কথাই বলিতেছেন-যেহেতু, এই নাম-সামান্যাত্মক বাক্ হইতেই সমস্ত বিশেষ নাম-‘দেবদত্ত’ ‘যজ্ঞদত্ত’ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন শব্দসমূহ উত্থিত হয়-উদ্গত হয় অর্থাৎ লবণাচল হইতে লবণকণার ন্যায় বহির্গত হইয়া থাকে, অথচ কার্য্য বা জন্য পদার্থমাত্রই স্ব স্ব কারণ হইতে অতিরিক্ত নয়; সেইরূপ বিশেষ অবস্থামাত্রই সাধারণ পদার্থের অন্তর্নিবিষ্ট, অতিরিক্ত নয়। ২
ভাল, নাম ও বাক্, এতদুভয়ের মধ্যে সামান্য-বিশেষভাবে ঘটে কিরূপে? [তদুত্তরে বলিতেছেন—] এই যে_সামান্য শব্দ—বাক্, ইহাই বিশেষ বিশেষ নামের সাম—সমতা বা সাম্য আছে বলিয়াই সাম অর্থাৎ সমধর্মী। যেহেতু, এই বাক্সামান্যই স্বীয় অবস্থাবিশেষরূপ নাম-সমূহের সহিত সমান;[সেই হেতুই ইহাদের সামান্য-বিশেষভাব সম্ভবপর হয়]। ৩
অপিচ, বিশেষ বিশেষ নামগুলির আত্মলাভে বা অভিব্যক্তিতে বিশেষ বা পার্থক্য না থাকাও ইহার অপর কারণ,—যাহা হইতে যাহার আত্মলাভ বা উৎপত্তি হয়, দেখিতে পাওয়া যায়, সে তাহা হইতে অবিভক্ত বা অপৃথক্; যেমন মৃত্তিকার সহিত ঘট-সমুহের(অভেদ, তেমনি)(১)। বাক্ হইতে বিশেষ বিশেষ
নাম-সমূহের আত্মলাভ হয় কি প্রকারে, এখন তাহা কথিত হইতেছে-যেহেতু বাক্শব্দবাচ্য বাক্ বস্তুটি হইতেছে-এই নাম-সমূহের ব্রহ্ম অর্থাৎ আত্মা, সেই হেতুই বাক্ হইতে নাম-সমূহের আত্মলাভ স্বীকার করিতে হয়; কারণ, কোন নামেরই শব্দাতিরিক্ত স্বরূপ উপপন্ন হয় না। এ কথার উপপাদনার্থ বলিতেছেন- যেহেতু, এই সামান্য শব্দই(বাক্ই) স্বরূপসমর্পণ করিয়া শব্দগুলিকে-সমস্ত নামকে ধারণ করিয়া রাখে;[অতএব সামান্য ও নামবিশেষের মধ্যে সামান্য- বিশেষ ভাব থাকা অসম্ভব হইতেছে না]। এইরূপে কার্য্য-কারণভাবের উপপত্তি হেতু, সামান্য-বিশেষভাবেরও উপপত্তি হেতু এবং উৎপাদকত্ব হেতুও বিশেষ বিশেষ নামগুলির সামান্য-শব্দাত্মকতা সিদ্ধ হইল। এখানে যে সমস্ত কথা বলা হইল, পরবর্তী শ্রুতিদ্বয়ে ইহার সমস্তই যোজনা করিতে হইবে ॥ ৭৮ ॥ ১ ॥
অথ রূপাণাং চক্ষুরিত্যেতদেযামুক্থমতো হি সর্ব্বাণি রূপাণ্যুত্তিষ্ঠন্ত্যেতদেযাৎ সামৈতদ্ধি সর্ব্বৈরূপৈঃ সমমেতদেযাং ব্রহ্মৈতদ্ধি সর্ব্বাণি রূপাণি বিভর্তি ॥ ৭৯ ॥ ২॥
সরলার্থঃ।—অথ(নাম্নো নির্দেশানন্তরং) চক্ষুঃ(চক্ষুগ্রাহ্যং রূপ- সামান্যম্) ইত্যেতৎ এষাং রূপাণাং(শ্বেতপীতাদীনাং) উকথং(উৎপত্তিস্থানং); হি যস্মাৎ, অতঃ(অস্মাৎ—রূপসামান্যাৎ) সর্ব্বাণি রূপাণি(শ্বেতপীতাদিরূপভেদাঃ) উত্তিষ্ঠন্তি(উদগচ্ছন্তি); তথা এতৎ(রূপসামান্যং) এষাং(রূপবিশেষাণাং) সাম(সমত্বং, সাম্যাবস্থা); হি(যস্মাৎ) এতৎ(রূপসামান্যং) সর্ব্বৈঃ রূপৈঃ (শ্বেতপীতাদিভেদৈ:) সমং(সমানং—ঐক্যমাপন্নং); এতৎ(রূপসামান্যং) এষাং(রূপাণাং) ব্রহ্ম(ব্যাপকং—আত্মা)। হি(যস্মাৎ) এতৎ(সামান্য- রূপমেব) সর্ব্বাণি(সর্ব্বান্ রূপভেদান্) বিভর্তি(ধারয়তি);[কার্য্যমাত্রস্যৈব কারণানুপ্রবিষ্টত্বাদিতি ভাবঃ]॥ ৭৯ ॥ ২ ॥
মূলানুবাদ?—এখন নামনির্দেশের পর রূপসম্বন্ধে সাম্য নির্দেশ করিতেছেন—চক্ষুঃ অর্থ—চক্ষুর গ্রাহ্য সাধারণ রূপমাত্র। এই চক্ষুঃ হইতেছে—শ্বেতপীতাদি বিভিন্ন রূপের উকথ উৎপত্তিস্থান; কারণ, এই সামান্য রূপ হইতেই সমস্ত বিশেষ রূপের উৎপত্তি হইয়া থাকে। এই রূপসামান্যই আবার সমস্ত বিশেষ রূপের সাম অর্থাৎ সাম্যাবস্থা বা প্রকৃতি স্বরূপ; কারণ, এই সামান্যরূপই অপর সমস্ত বিশেষ বিশেষ রূপের সহিত সমান—ঐক্যাবস্থা প্রাপ্ত। এই রূপসামান্যই এই সমস্ত
বিশেষ বিশেষ রূপের ব্রহ্ম—ব্যাপক আত্মা; কারণ, স্থূলসূক্ষ্মাদি বিশেষ রূপমাত্রই এই সামান্য রূপ দ্বারা বিধৃত বা ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে॥ ৭৯॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথেদানীং রূপাণাং সিতাসিতপ্রভৃতীনাং—চক্ষু- রিতি চক্ষুব্বিষয়সামান্যং চক্ষুঃশব্দাভিধেয়ং রূপসামান্যং প্রকাশ্যমাত্রমভিধীয়তে। অতো হি সর্ব্বানি রূপাণ্যুত্তিষ্ঠন্তি, এতদেষাং সাম, এতদ্ধি সর্ব্বৈঃ রূপৈঃ সমম্, এত- দেষাং ব্রহ্ম, এতদ্ধি সর্ব্বাণি রূপাণি বিভর্তি ॥ ৭৯ ॥ ২ ॥
টীকা।—তত্র ব্যাখ্যানসাপেক্ষানি পদানি ব্যাকরোতি—অথেত্যাদিনা। নামব্যাখ্যানা- নন্তর্য্যমথশব্দার্থঃ। চক্ষুরুক্থমিতি সম্বন্ধঃ। চক্ষুরিতি চক্ষুঃশব্দাভিধেয়ং চক্ষুর্বিষয়সামান্যমভিধীয়তে, তচ্চ রূপসামান্যং, তদপি প্রকাশ্যমাত্রমিতি যোজনা। ৭৯।২।
ভাষ্যানুবাদ।—অথ শব্দের অর্থ—নামনির্দেশের আনন্তর্য্য; চক্ষুঃ অর্থ—চক্ষুগ্রাহ্য সমস্ত বিষয়—চক্ষুর প্রকাশ্য সামান্য রূপমাত্রই অভিহিত হইতেছে। [ এই চক্ষুই] রূপ-সমুহের অর্থাৎ স্থূলসূক্ষ্মাদি বস্তু ও বর্ণসমুদয়ের[ উক্থ]; কারণ, ইহা হইতেই সমস্ত রূপ উৎপন্ন হয়; ইহা সমুদয় রূপের সাম; যেহেতু ইহা সমস্ত রূপের সমান, এবং ইহাই এই সমস্ত বিশেষ বিশেষ রূপগুলিকে ধারণ করিয়া রহিয়াছে(১)॥ ৭৯॥ ২॥
অথ কর্মণামাত্মেত্যেতদেযামুক্থমতো হি সর্বাণি কর্ম্মাণ্যু- ভিষ্ঠন্ত্যেতদেযাং সামৈতদ্ধি সর্ব্বৈঃ কৰ্ম্মভিঃ সমমেতদেযাং ব্রহ্মৈ- তদ্ধি সর্বাণি কর্মাণি বিভর্তি, তদেতৎ ত্রয়ং সদেকময়মাত্মা একঃ সন্নেতৎ ত্রয়ং তদেতদমৃতং সত্যেন চ্ছন্নং, প্রাণো বা অমৃতং নামরূপে সত্যং তাভ্যাময়ং প্রাণশ্ছন্নঃ ॥ ৮০ ॥ ৩ ॥
ইতি প্রথমাধ্যায়ে ষষ্ঠং ব্রাহ্মণম্ ॥ ১ ॥ ৬ ॥ ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥ ১ ॥ (ব্রাহ্মণক্রমেণ তু তৃতীয়োহধ্যায়ঃ ॥)
সরলার্থঃ।—অথ(অনন্তরং),[দর্শন-চলনাত্মকানাং সর্ব্বকর্মণাং কৰ্ম্ম- সামান্যে অন্তর্ভাব উচ্যতে]—আত্মা ইতি[শরীরমুচ্যতে, শরীরসাধ্যত্বাৎ কৰ্ম্ম- সামান্যাত্মকত্বাচ্চ)। আত্মেতি এতৎ এষাং(লোকসিদ্ধানাং) কৰ্ম্মণাং(দর্শন- শ্রবণাদীনাং স্পন্দনাত্মকানাং চ গমনাদীনাং কৰ্ম্মবিশেষাণাং) উথ্থং(উৎপত্তি- স্থানং); হি(যস্মাৎ) সর্ব্বানি কর্মাণি(কর্মবিশেষাঃ) অতঃ(কর্মসামান্যাত্মকাৎ শরীরাৎ) উত্তিষ্ঠন্তি; এতৎ(সামান্যং) এষাং(কর্মবিশেষাণাং) সাম(সমত্বং); হি(যস্মাৎ) এতৎ সর্ব্বৈঃ কৰ্ম্মভিঃ সমং(বিশেষস্য সামান্যানতিরেকাৎ); এতৎ এষাং(কর্মবিশেষাণাং) ব্রহ্ম(ব্যাপকং—আত্মা.); হি(যস্মাৎ) এতৎ(কৰ্ম্ম- সামান্যং) সর্ব্বাণি কর্মাণি বিভর্তি। এতৎ(যথোক্তং নাম, রূপং, কৰ্ম্ম চ) ত্রয়ং (ত্রিবেণীবৎ অন্যোন্যসংশ্রয়ং) সৎ একং(অভিন্নং) অয়ং আত্মা(দেহপিণ্ডঃ) [নামরূপকৰ্ম্মণাম্ অম্নাত্মকত্বাৎ, দেহস্য চান্নময়ত্বাৎ, দেহে তদৈক্যং সম্পন্নমিতি ভাবঃ]। আত্মা(দেহঃ) উ(অপি) একঃ(সংহতঃ) সন্ এতৎ ত্রয়ং(নামরূপকর্মা- ত্মকং)। এতৎ(বক্ষ্যমাণং) অমৃতং সত্যেন চ্ছন্নং(ব্যাপ্তং);[কিং তৎ অমৃতং, কিংবা সত্যং, তদাহ—] প্রাণঃ(পঞ্চবৃত্ত্যাত্মকঃ) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) অমৃতং(অমৃতঃ শ্রমাত্মকমরণরহিতঃ); নাম-রূপে সত্যং, তাভ্যাং(নামরূপাভ্যাং) অয়ং প্রাণঃ ছন্নঃ(ব্যাপ্তঃ, সমাবৃত ইত্যর্থঃ) ॥ ৮০ ॥ ৩॥
মূলানুবাদ:-[অতঃপর কর্ম্মের সামান্য-বিশেষভাব কথিত হইতেছে-] আত্মা-কর্মসম্পাদনের হেতুভূত শরীর হইতেছে- বিশেষ বিশেষ কর্ম্মের উথ(উৎপত্তির কারণ); কেন না, সমস্ত কৰ্ম্মই ইহা হইতে উৎপন্ন হয়। এই কৰ্ম্মসামান্যাত্মক শরীর হইতেছে এ সমস্তের(বিশেষ বিশেষ কর্ম্মের) সাম অর্থাৎ সাম্যাবস্থাত্মক; কারণ, বিশেষ বিশেষ সমস্ত কর্ম্মের সহিত ইহা সম অর্থাৎ সমান; এই কৰ্ম্ম- সামান্যাত্মক শরীর হইতেছে-সমস্ত বিশেষ বিশেষ কর্ম্মের ব্রহ্ম (ব্যাপক); কারণ, ইহাই অপর সমস্ত কৰ্ম্মকে ধারণ করিয়া আছে। ইহারা তিন হইয়াও এক-(আত্মা দেহস্বরূপ); আত্মাও আবার এক হইয়াও(দেহরূপে ভেদরহিত হইয়াও) এই তিন;[কারণ, দেহ ত অন্নত্রয়েরই বিকার বা পরিণাম]। প্রসিদ্ধ এই অমৃত সত্য দ্বারা
আচ্ছাদিত আছে। পূর্ব্বোক্ত প্রাণই অমৃত(মরণরহিত); নাম ও রূপ হইতেছে—সত্য, সেই নাম ও রূপ দ্বারা এই প্রাণ আচ্ছাদিত বা আবৃত রহিয়াছে ॥ ৮০ ॥ ৩ ॥
ইতি প্রথমাধ্যায়ে ষষ্ঠ ব্রাহ্মণানুবাদ ॥ ১ ॥ ৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথেদানীং সর্ব্বকর্ম্মবিশেষাণাং মননদর্শনাত্মকানাং চলনাত্মকানাং চ ক্রিয়াসামান্যমাত্রেহস্তর্ভাব উচ্যতে। কথম্? সর্ব্বেষাং কর্ম্ম- বিশেষাণাম্, আত্মা শরীরং সামান্যম্ আত্মা—আত্মনঃ কর্ম্ম আত্মেত্যুচ্যতে; আত্মনা হি শরীরেণ কর্ম্ম করোতীত্যুক্তম্, শরীরে চ সর্ব্বং কর্ম্মাভিব্যজ্যতে; অতস্তাৎস্থ্যাৎ তচ্ছব্দং কর্ম্ম—কর্মসামান্যমাত্রং সর্ব্বেষামুক্থমিত্যাদি পূর্ব্ববৎ।
তদেতদ্ যথোক্তং নাম রূপং কৰ্ম্ম ত্রয়ং ইতরেতরাশ্রয়ম্ ইতরেতরাভিব্যক্তি- কারণম্, ইতরেতরপ্রলয়ং সংহতৎ-ত্রিদণ্ডবিষ্টম্ভবৎ সৎ একম্। কেনাত্মনৈকত্বম্- ইত্যুচ্যতে-অয়মাত্মা অয়ং পিণ্ডঃ কার্যকরণাত্মসঙ্ঘাতঃ তথান্নত্রয়ে ব্যাখ্যাতঃ- “এতন্ময়ো বা অয়মাত্মা” ইত্যাদিনা; এতাবদ্ধীদং সর্ব্বং ব্যাকৃতমব্যাকৃতং চ যদুত নাম রূপং কর্মেতি। আত্মা উ একোহয়ং কার্যকরণসঙ্ঘাতঃ সন্ অধ্যাত্মা- ধিভূতাধিদৈবভাবেন ব্যবস্থিতম্ এতদেব ত্রয়ং নাম রূপং কর্মেতি। তদেতদ্বক্ষ্য- মাণম্ অমৃতং সত্যেন চ্ছন্নমিত্যেতস্য বাক্যস্যার্থমাহ-প্রাণো বা অমৃতং করণাত্মকঃ অন্তরুপষ্টন্তক: আত্মভূতোহমৃতোহবিনাশী; নামরূপে সত্যং কাৰ্য্যাত্মকে শরীরা- বস্থে; ক্রিয়াত্মকস্ত প্রাণস্তয়োরুপষ্টন্তকঃ বাহ্যাভ্যাং শরীরাত্মকাভ্যামুপজনাপায়- ধর্মিভ্যাং মর্ত্যাভ্যাং ছন্নোহপ্রকাশীকৃতঃ। এতদেব সংসারসতত্ত্বমবিদ্যাবিষয়ং প্রদর্শিতম্, অত উর্দ্ধং বিদ্যাবিষয় আত্মাধিগন্তব্য ইতি চতুর্থ আরভ্যতে ॥ ৮০॥৩ ॥ ইতি প্রথমাধ্যায়ে ষষ্ঠং ব্রাহ্মণম্ ৷ ১৷৬৷
শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥ ১ ॥
টীকা।—রূপপ্রকরণানন্তর্ষমথেত্যুচ্যতে। ক্রিয়াবিশেষাণাং ক্রিয়ামাত্রেহন্তর্ভাবং প্রশ্নদ্বারা স্ফোরয়তি—কথমিত্যাদিনা। আত্মশব্দেনাত্র শরীরনির্ব্বর্ত্ত্যকর্ম্মগ্রহণে পুরুষবিধব্রাহ্মণশেষমনু- কুলয়তি—আত্মনা হীতি। তত্রৈবোপপত্তিমাহ—শরীরে চেতি। তথাপি কথমাত্মশব্দঃ শরীরনির্ব্বর্ত্ত্যং কর্ম্ম ক্রয়াদিত্যাশঙ্ক্য লক্ষণয়েত্যাহ—অত ইতি।
সক্ষেপস্তাপি সঙ্ক্ষেপান্তরমাহ—তদেতদিতি। তদেতত্রয়ং ত্রিদণ্ডবিষ্টম্ভবৎ সংহতং সদেক- মিতি সম্বন্ধঃ। কথং সংহতত্বমত আহ—ইতরেতরাশ্রয়মিতি। রূপং বিষয়মাশ্রিত্য নামকৰ্ম্মণী সিধ্যতঃ, স্বাতন্ত্র্যেণ নির্বিষয়রোস্তয়োঃ সিদ্ধ্যদর্শনান্নামকৰ্ম্মণী চাশ্রিত্য রূপং সিধ্যতি। ন হি তে
হিত্বা কিঞ্চিদুৎপদ্যত ইত্যর্থঃ। বাচকেন বাচ্যস্য, তেনেতরস্য, তাভ্যাং চ ক্রিয়ায়াঃ, তয়া তয়োর- পেক্ষাদর্শনাদন্যোন্যমভিব্যঞ্জকত্বমাহ—ইতরেতরেতি। সতি নাম্নি রূপসংহারদর্শনাদ্রূপে চ সতি নামসংহারদৃষ্টেঃ সতোশ্চ তয়োঃ কর্মণস্তস্মিংশ্চ সতি তয়োরুপসংহারোপলন্তাদিতরেতরপ্রলয়- মিত্যাহ—ইতরেতরপ্রলয়মিতি। ত্রয়াণামেকত্বং বিরুদ্ধমিতি শঙ্কিত্বা পরিহরতি—কেনেত্যা- দিনা। কথং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতাত্মনা ত্রয়াণামেকত্বং, তত্রাহ—তথেতি। নামরূপকর্মণাং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতমাত্রত্বেহপি ততো ব্যতিরিক্তং সঙ্ঘাতাদন্যৎ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—এতাবদিতি। নামাদিত্রয়স্য সঙ্ঘাতমাত্রত্বে কথং ব্যবহারাসাঙ্কর্য্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ—আত্মেতি। সঙ্ঘাতোহয়মাত্ম- শব্দিতঃ স্বয়মেকোহপি সন্নধ্যাত্মাদিভেদেন স্থিতং ত্রয়মের ভবতীতি ব্যবহারাসাঙ্কর্য্যমিত্যর্থঃ।
একস্মিন্নপি সঙ্ঘাতে কার্য্যকরণরূপেণাবান্তরবিভাগমাহ-তদেতদিতি। আত্মভূতস্তস্যো- পাধিত্বেন স্থিত ইতি যাবৎ। অবিনাশী স্থূলদেহে গচ্ছত্যপি যাবন্মোক্ষং ন গচ্ছতীত্যর্থঃ। সচ্চ ত্যচ্চ সত্ত্যং ভূতপঞ্চকং, তদাত্মকে নামরূপে ইত্যাহ-নামেতি। কারণযাখাত্ম্যং কথয়তি- ক্রিয়াত্মকন্তিতি। পঞ্চীকৃতপঞ্চমহাভূতাত্মকং, তৎকাৰ্য্যং সর্ব্বং সচ্চ ত্যচ্চেতি ব্যুৎপত্তেঃ সত্ত্যং বৈরাজং শরীরং কার্য্যমপঞ্চীকৃতপঞ্চমহাভূততৎকার্য্যাত্মক করণরূপসপ্তদশকলিঙ্গস্য সূত্রাখ্যস্যায়- তনং তস্যৈবাচ্ছাদকং, তৎ খলনাত্মাপি স্কুলদেহচ্ছন্নত্বাদ্বিজ্ঞানং, তেনাপি চ্ছনং প্রত্যগ্ বস্তু সুভরামিতি তজ্ঞানেহবহিতৈর্ভাবমিতি ভাবঃ। ইদানীমবিদ্যাকাৰ্য্যপ্রপঞ্চমুপসংহরতি- এতদিতি। অবিদ্যাবিষয়বিবরণস্থ্য বক্ষ্যমাণোপযোগমুপসংহরতি-অত ইতি। প্রপঞ্চিতে সত্যবিদ্যাবিষয়ে ততো বিরক্তস্যাত্মানং বিবিদিষোস্তজজ্ঞাপনার্থং চতুর্থপ্রমুখঃ সন্দর্ভো ভবিষ্যতি। তস্মাদ্বিদ্যাবিষয় বিবরণমুপযোগীতি ভাবঃ। ৮০।৩।
ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর এখন মনন ও দর্শনাত্মক অর্থাৎ আন্তর ও বাহ্য জ্ঞানেন্দ্রিয়ের ব্যাপারাত্মক এবং কর্ম্মেন্দ্রিয়সাধ্য স্পন্দনাত্মক সমস্ত বিশেষ বিশেষ কর্মের(ক্রিয়ার) শুধু ক্রিয়াসামান্যে অন্তর্ভাব কথিত হইতেছে। তাহা কি প্রকার? আত্মা অর্থ—শরীরসামান্য, কর্ম্মমাত্রই আত্মার্থক ও আত্মসম্পাদ্য; এইজন্য কর্মই ‘আত্মা’ শব্দে অভিহিত হইয়াছে। আত্মা দ্বারাই—শরীর দ্বারাই যে, কর্ম নিষ্পন্ন হয়, এ কথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। বিশেষতঃ কর্ম্মমাত্রই শরীরমধ্যে প্রকাশ পাইয়া থাকে; এই জন্য শরীরে অবস্থান করে বলিয়া শরীরই (আত্মাই) কর্ম—অর্থাৎ সামান্যরূপে কর্মসাধক। ‘উকথ’ ইত্যাদি কথার ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ।
সেই যে, এই নাম, রূপ ও কর্ম্মত্রয়, এই তিনটিই পরস্পর পরস্পরকে আশ্রয় করিয়া অবস্থান করে, পরস্পর পরস্পরের অভিব্যক্তির সাহায্য করে, এবং পরস্পর পরস্পরে বিলয় প্রাপ্ত হইয়া থাকে; ইহারা ত্রিদণ্ডবিষ্টন্তের ন্যায়(১)
সম্মিলিতভাবে অবস্থান করত এক-, কিরূপে ইহাদের একত্ব, তাহা বলা হই- তেছে—এই আত্মা অর্থাৎ কার্য্যকরণভাবাত্মক এই স্থূলদেহ; ইতঃপূর্ব্বে “এত- ন্ময়ো বা অয়মাত্মা” ইত্যাদি বাক্যে সে কথা উক্ত হইয়াছে। এই যে, নাম, রূপ ও কৰ্ম্ম, এই তিনটি লইয়া এই স্থূল সূক্ষ্ম সমস্ত জগৎ,(এতদতিরিক্ত জগতের সত্তা নাই)। সমস্ত দেহেন্দ্রিয়াদিবিশিষ্ট এই আত্মা আবার এক হইয়াও অধ্যাত্ম, অধিভূত ও অধিদৈবতরূপে অবস্থিত এই ত্রিবিধ নাম, রূপ ও কর্মাত্মকই বটে (এতদতিরিক্ত নহে)।
সেই এই আত্মা—পরে যাহার কথা বলা হইবে, সেই অমৃত দ্বারা আবৃত রহিয়াছে। শ্রুতি নিজেই এই বাক্যের অর্থ বলিয়া দিতেছেন; প্রাণই অমৃত অর্থাৎ দেহাভ্যন্তরস্থ দেহবিধারক করণস্বরূপ(দেহরক্ষার সাধন) আত্মস্থানীয় প্রাণ হই- তেছে অমৃত—অবিনাশী বিনাশরহিত; কার্য্য বা উৎপন্ন দেহাবস্থাত্মক নাম ও রূপ হইতেছে ‘সত্য’; সেই নাম ও রূপের উপষ্টন্তক ক্রিয়াস্বভাব প্রাণই জন্ম- মরণশীল বাহ্য পদার্থ(অনাত্মভূত) শরীরাবস্থাপন্ন নাম ও রূপ দ্বারা আবৃত— অপ্রকাশীকৃত অর্থাৎ অদৃশ্য হইয়া রহিয়াছে। অবিদ্যাধিকারে স্থিত সংসারের তত্ত্ব এই পর্য্যন্তই প্রদর্শিত হইল; অতঃপর বিদ্যার বিষয় অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানগম্য আত্মাকে জানিতে হইবে, এই জন্য চতুর্থ অধ্যায় আরব্ধ হইতেছে ॥ ৮০ ॥ ৩ ॥
ইতি প্রথমাধ্যায়ে ষষ্ঠ ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ১ ॥ ৬ ॥ ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদের প্রথম অধ্যায়ে
শঙ্কর-ভাষ্যের অনুবাদ সমাপ্ত ॥ ১ ॥
প্রথমং ব্রাহ্মণম্।
আভাসভাষ্যম্।—‘আত্মেত্যেবোপাসীত’ তদন্বেষণে চ সর্ব্বমন্বিষ্টং স্যাৎ, তদেব চাত্মতত্ত্বং সর্ব্বস্মাৎ প্রেয়স্বাদন্বেষ্টব্যম্—আত্মানমেবাবেদহং ব্রহ্মাস্মীতি —আত্মতত্ত্বমেকং বিদ্যাবিষয়ঃ। যস্তু ভেদদৃষ্টিবিষয়ঃ, সঃ—“অন্যোহসাবন্যোহহম- স্মীতি, ন স বেদ”ইত্যবিদ্যাবিষয়ঃ, “একধৈবানুদ্রষ্টব্যম্” “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি, য ইহ নানেব পশ্যতি” ইত্যেবমাদিভিঃ প্রবিভক্তৌ বিদ্যাবিদ্যাবিষয়ৌ সর্ব্বোপ- নিষৎসু। ১
তত্র চ অবিদ্যাবিষয়ঃ সর্ব্ব এব সাধ্য-সাধনাদিভেদবিশেষবিনিয়োগেন ব্যাখ্যাতঃ—আ তৃতীয়াধ্যায়পরিসমাপ্তেঃ। স চ ব্যাখ্যাতোহবিদ্যাবিষয়ঃ সর্ব্ব এব দ্বিপ্রকারঃ—অন্তঃ প্রাণ উপষ্টন্তকো গৃহস্যেব স্তম্ভাদিলক্ষণঃ প্রকাশকোহমৃতঃ, বাহ্যশ্চ কার্য্যলক্ষণোহপ্রকাশক উপজনাপায়ধর্ম্মকঃ তৃণকুশমৃত্তিকাসমো গৃহস্যেব—সত্যশব্দ- বাচ্যো মর্ত্যঃ; তেনামৃতশব্দবাচ্যঃ প্রাণচ্ছন্ন ইতি চোপসংহৃতম্। ২
স এব চ প্রাণো বাহ্যাধারভেদেঘনেকধা বিস্তৃতঃ। প্রাণ একো দেব ইত্যু- চ্যতে। তস্যৈব বাহ্যঃ পিণ্ড একঃ সাধারণঃ—বিরাডবৈশ্বানর আত্মা পুরুষবিধঃ প্রজাপতিঃ কো হিরণ্যগর্ভঃ—ইত্যাদিভিঃ পিণ্ডপ্রধানৈঃ শব্দৈরাখ্যায়তে সূর্য্যাদি- প্রবিভক্তকরণঃ। একঞ্চানেকঞ্চ ব্রহ্ম এতাবদেব, নাতঃ পরমস্তি, প্রত্যেকঞ্চ শরীরভেদেযু পরিসমাপ্তং চেতনাবৎ কর্তৃ ভোক্তৃ চ—ইত্যবিদ্যাবিষয়মেবাত্ম- ত্বেনোপগতো গার্গ্যো ব্রাহ্মণো বক্তোপস্থাপ্যতে, তদ্বিপরীতাত্মদৃগজাতশত্রুঃ শ্রোতা। ৩
এবং হি যতঃ পূর্ব্বপক্ষসিদ্ধান্তাখ্যায়িকারূপেণ সমর্প্যমাণোহর্থঃ শ্রোতুশ্চিত্তস্য বশমেতি; বিপর্যয়ে হি তর্কশাস্ত্রবৎ কেবলার্থানুগমবাক্যৈঃ সমর্প্যমাণো দুর্বিজ্ঞেয়ঃ স্যাৎ, অত্যন্তসূক্ষ্মত্বাদ্বস্তনঃ। তথা চ কাঠকে-“শ্রবণায়াপি বহুভির্য্যো ন লভ্যঃ” ইত্যাদিবাক্যৈঃ সুসংস্কৃত-দেববুদ্ধিগম্যত্বং সামান্যমাত্রবুদ্ধ্যগম্যত্বং চ সপ্রপঞ্চং দর্শিতম্; “আচার্য্যবান্ পুরুষো বেদ”, “আচার্য্যাদ্ধৈব বিদ্যা” ইতি চ ছান্দোগ্যে; “উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ” ইতি চ গীতাসু; ইহাপি চ শাকল্য- যাজ্ঞবল্ক্যসংবাদেনাতিগহ্বরত্বং মহতা সংরন্তেণ ব্রহ্মণো বক্ষ্যতি; তস্মাৎ শ্লিষ্ট এবাখ্যায়িকারূপেণ পূর্ব্বপক্ষ-সিদ্ধান্তরূপমাপাদ্য বস্তুসমর্পণার্থ আরম্ভ। ৪
আচারবিধ্যুপদেশার্থশ্চ—এবমাচারবতোর্ব্বক্ত-শ্রোত্রোরাখ্যায়িকানুগতোহর্থো- হবগম্যতে। কেবলতর্কবুদ্ধিনিষেধার্থাচাখ্যায়িকা—“নৈষা তর্কেণ মতিরাপনেয়া।” “ন তর্কশাস্ত্রদগ্ধায়” ইতি শ্রুতিস্মৃতিভ্যাম্। শ্রদ্ধা চ ব্রহ্মবিজ্ঞানে পরং সাধন- মিত্যাখ্যায়িকার্থঃ; তথাহি—গার্গ্যাজাতশত্রোরতীব শ্রদ্ধালুতা দৃশ্যতে আখ্যায়ি- কায়াম্; “শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানম্” ইতি চ স্মৃতিঃ। ৫
টীকা।—তৃতীয়েহধ্যায়ে সূত্রিতবিদ্যাবিদ্যয়োরবিদ্যা প্রপঞ্চিতা, সম্প্রতি বিদ্যাং প্রপঞ্চয়িতুং চতুর্থমধ্যায়মারভমাণো বৃত্তং কীর্তয়তি—আত্মেতি। কিমিত্যর্থান্তরেষু সৎস্বাত্মতত্ত্বমেবানু- সন্ধাতব্যং, তত্রাহ—তদন্বেষণে চেতি। তস্যৈবান্ব্বেষ্টব্যত্বে পরপ্রেমাস্পদত্বেন পরমানন্দত্বং হেত্বন্তরমাহ—তদেবেতি। আত্মতত্ত্বজ্ঞানস্য সর্ব্বাপত্তিফলত্বাচ্চ তদেবাশ্বেষ্টব্যমিত্যাহ—আত্মান- মিতি। উক্তয়া পরিপাট্যা সিদ্ধমর্থং সংগৃহ্লাতি—আত্মতত্ত্বমিতি। উক্তমর্থান্তরমনুবদতি— সত্ত্বিতি। সোহবিদ্যাবিদ্যাবিষয় ইতি সম্বন্ধঃ। কথং ভেদদৃষ্টিবিষয়স্যাবিদ্যাবিষয়ত্বং, তত্রাহ— অন্যোহসাবিতি। যো ভেদদৃষ্টিপরঃ, স ন বেদেত্যবিদ্যা তদৃষ্টিমূলং সূত্রিতা, তেন তদ্বিষয়ো ভেদদৃষ্টিবিষয় ইত্যর্থঃ।
কথং যথোক্তৌ বিদ্যাবিদ্যাবিষয়াবসঙ্কীর্ণাববসাতুং শক্যেতে, তত্রাহ-একধেতি। সপ্তান্ন- ব্রাহ্মণে বৃত্তমর্থং কথয়তি-তত্র চেতি। বিদ্যাবিদ্যাবিষয়য়োরিতি যাবৎ। আদিপদং সাধ্য- সাধনান্তরভেদসংগ্রহার্থম্। যথোক্তো ভেদ এব বিশেষঃ। তস্মিন্বিনিয়োগো ব্যবস্থাপনাং, তেনেত্যর্থঃ। উপসংহারব্রাহ্মণান্তে বৃত্তমনুভাষতে-স চেতি। অথবোক্তৌ বিদ্যাবিদ্যাবিষয়ৌ কথমসঙ্কীর্ণে। মন্তব্যাবিত্যাশঙ্ক্যাহ-একধেতি। ১
তত্রোত্তরগ্রন্থস্য বিষয়পরিশেষার্থং পুরুষবিধব্রাহ্মণশেষমারভ্যোক্তং দর্শয়তি-তত্র চেতি। তর্হি সমাপ্তত্বাদবিদ্যাবিষয়স্য কথমবিদুষো গার্গ্যস্য প্রবৃত্তিরিত্যাশঙ্ক্য তদর্থমবাস্তরবিভাগমনু- বদতি-সচেতি। তাবেব প্রকারৌ দর্শয়ন্নাদৌ সূক্ষ্মং শরীরমুপন্যস্যতি-অন্তরিতি। তস্য বাহ্য- করণদ্বারা স্থলেষু বিষয়েষু প্রকাশকত্বমমৃতত্বং চ ব্যুৎপাদিতম্। দ্বিতীয়ং প্রকারমাচক্ষাণঃ স্থূলং শরীরং দর্শয়তি-বাহ্যশ্চেতি। তস্য কয়াহপি বিধয়া সূক্ষ্মদেহং প্রত্যপ্রকাশকত্বাদপ্রকাশকত্বম্। আগমাপানিত্বেনাবহেয়ত্বং সূচয়তি-উপজনেতি। যথা গৃহস্থ্য তৃণাদি বহিরঙ্গং, তথা সূক্ষ্মস্য দেহস্য স্কুলো দেহঃ, তথাহপি তৃণাদি বিনা গৃহস্থ্য ব্যবহারাযোগ্যত্ববৎ তস্যাপি স্কুলদেহং বিনা ন তদ্যযোগ্যত্বমিতি মত্বাহ-তৃণেতি। তস্য পূর্ব্বপ্রকরণান্তে নামরূপে সত্যমিত্যত্র প্রস্তুতত্ব- মস্তীত্যাহ-সত্যেতি। সর্ব্বথা বাধবৈধুর্য্যং সত্যত্বমিতি শঙ্কাং নিরসিতুং বিশিনষ্টি-মর্ত্য ইতি। তস্য কার্য্যং দর্শয়তি-তেনেতি। ২
বৃত্তমনুভাজাতশত্রুব্রাহ্মণমবতারয়তি-স এবেতি। আদিত্যচন্দ্রাদয়ো বাহ্যাধারভেদা অনেকধাত্বমতিষ্ঠা মূর্দ্ধেত্যাদিবক্ষ্যমাণগুণবশাদ্রষ্টব্যম্। কথং তহি তস্যৈকত্বং, তত্রাহ-প্রাণ ইতি। প্রাণস্ত নানাত্বমেকত্বং চোক্তং, তত্রৈকত্বং বিবৃণোতি-তস্যৈবেতি। প্রাণস্যৈব স্বভাব- ভূতোহনাত্মলক্ষণঃ পিণ্ডঃ সমষ্টিরূপো হিরণ্যগর্ভাদিশব্দৈরুপাধিবিষয়ৈস্তত্র তত্র শ্রুতিস্মৃত্যেরুচ্যতে। স চ “অগ্নিমুদ্ধা চক্ষুষী চন্দ্রসূর্য্যো” ইত্যাদিশ্রুতেঃ সূর্যাদিভিঃ প্রবিভক্তৈঃ করণৈরুপেতো
ভবতীত্যর্থঃ। যদ্ ব্রহ্ম সমস্তং ব্যস্তং চ তদিদং হিরণ্যগর্ভমাত্রমেব, ন তস্মাদধিকমস্তীতি হিরণ্যগর্ভং স্তৌতি-একং চেতি। একত্বং বিশদীকৃত্য প্রাণস্য নানাত্বং বিশদয়তি-প্রত্যেকং চেতি। গোত্বাদিসামান্যতুল্যত্বং ব্যাবর্ত্তয়তি-চেতনাবদিতি। কেবলভোক্তৃত্বপক্ষং বারয়তি- কর্ত্রিতি। বক্তা পূর্ব্বপক্ষবাদীতি যাবৎ। তস্মাদমুখ্যাদ্ব্রহ্মণো বিপরীতং মুখ্যং ব্রহ্ম, তস্মিন্নাত্মদৃষ্টিঃ রাজা শ্রোতা সিদ্ধান্তবাদীত্যর্থঃ। কিমিতি বক্তশ্রোতৃরূপাখ্যায়িকা প্রণীয়তে, তত্রাহ-এবং হীতি। এবংশব্দার্থমেব স্ফুটয়তি- পূর্ব্বপক্ষেতি। অতো ভবিতব্যমাখ্যায়িকয়েতি শেষঃ। আখ্যায়িকানঙ্গীকারে দোষমাহ- বিপর্যয়ে হীতি। যথা তর্কশাস্ত্রেণ সমর্প্যমাণোহর্থো জ্ঞাতুং ন শক্যতে, ঔৎপ্রেক্ষিকতর্কাণাং নিরঙ্কুশত্বাৎ; তথা কেবলমর্থোহমুগম্যতে প্রশ্নপ্রতিবচনভাবরহিতৈর্য্যর্বাক্যৈস্তৈঃ সমর্প্যমাণোহপি দুর্বিজ্ঞেয়োহর্থঃ স্যাৎ, যদ্যাখ্যায়িকা নানুশ্রীয়তে, তেন সা সুখপ্রতিপত্ত্যর্থমনুসর্তব্যেত্যর্থঃ। কুতো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বং, তত্রাহ-অত্যন্তেতি। যথোক্তস্য বস্তুনো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বে শ্রুতিস্মৃতিসংবাদং দর্শয়তি- তথা চেতি। সুসংস্কৃতা পরিশুদ্ধা দেববুদ্ধিঃ সাত্বিকী বুদ্ধিঃ। সামান্যমাত্রবুদ্ধিস্তামসী রাজসী চ বৃদ্ধিঃ। অতিগহ্বরত্বমত্যন্তগম্ভীরত্বম্। সংরম্ভস্তাৎপর্য্যম্। ব্রহ্মণো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বে ফলিতমাহ- তন্মাদিতি।
আখ্যায়িকায়াঃ সুখপ্রতিপত্ত্যর্থত্বমুক্তাহর্থান্তরমাহ-আচারেতি। উত্তমাদধমেন প্রণি- পাতোপসদনাদিদ্বারা বিদ্যা গ্রাহ্যা, অধমাত্তু উত্তমেন তদ্বাতিরেকেণ শ্রদ্ধাদিমাত্রেণ সা লভোত্যাচারপ্রকারজ্ঞাপনার্থশ্চায়মারভ্য ইত্যর্থঃ। আখ্যায়িকায়া যথোক্তেহর্থেহন্বিতত্বং কথয়তি- এবমিতি। বক্তৃশ্রোত্রোর্মধ্যে যথোক্তাচারবতা শ্রোত্রা বিদ্যা লব্ধব্যা। বক্তা চ তাদৃশেন সোপদেষ্টব্যেতোষোহর্থোহস্যামাখ্যায়িকায়ামনুগতো গম্যতে। তম্মাদাচারবিশেষং দর্শয়িতুমেষা- খ্যায়িকা যুক্তেত্যর্থঃ। আগমানুসারিগুরুসম্প্রদায়াদের তত্ত্বধীর্নভ্যতে। যস্ত কেবলস্তর্কস্তদ্বশান্নৈষা বুদ্ধিঃ সিধ্যতি। তথা চ কেবলতর্কপ্রযুক্তা তত্ত্ববুদ্ধিরিতি সম্ভাবনানিষেধার্থাখ্যায়িকেতি পক্ষান্তর- মাহ-কেবলতি। কেবলেন তর্কেণ তত্ত্ববুদ্ধিন সিধ্যতীত্যত্র শ্রুতিস্মৃতী দর্শয়তি-নৈষেতি। মতিং দদ্যাদিতি শেষঃ। প্রকারান্তরেণাখ্যায়িকামবতার্য্য তত্রাখ্যায়িকানুগুণ্যং দর্শয়তি-তথা হীতি। শ্রদ্ধা ব্রহ্মজ্ঞানে পরমং সাধনমিত্যত্র ভগবতোহপি সম্মতিমাহ-শ্রদ্ধাবানিতি।
আভাসভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বাধ্যায়ে বলা হইয়াছে যে, “আত্মা ইত্যেব উপাসীত”(আত্মারূপেই উপাসনা করিবে), একমাত্র তদন্ত্বেষণেই সর্ব্ববিষয়ের অন্বেষণ সিদ্ধ হইতে পারে; আর সর্ব্বাপেক্ষা প্রিয়তম বলিয়া সেই আত্মতত্ত্বেরই অন্বেষণ করা উচিত; এবং সেই আত্মাকেই ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’(‘আমি সেই ব্রহ্ম- স্বরূপ’) বুদ্ধিতে অবগত হইবে; এই আত্মতত্ত্বই একমাত্র বিদ্যাবিষয় অর্থাৎ সত্যজ্ঞানের বিষয়ীভূত; আর যাহা কিছু ভেদজ্ঞানের বিষয়, ‘আমি অন্য, এবং আমার উপাস্য অন্য, যে লোক এইরূপ মনে করে, বস্তুতঃ সে লোক[প্রকৃত আত্মাকে] জানে না’ এই শ্রুতি অনুসারে জানা যায় যে, সে সমস্তই অবিদ্যার বিষয় অর্থাৎ অজ্ঞানের অধিকারভুক্ত। বিশেষতঃ ‘একপ্রকারেই জানিবে’ ‘যে
এই ব্রহ্মেতে নানার মত(বিভিন্নের মত) দর্শন করে, সেই ভেদদর্শী লোক মৃত্যুর পর মৃত্যুকে প্রাপ্ত হয়’ ইত্যাদি বাক্যে সমস্ত উপনিষদেই—বিদ্যা ও অবিদ্যার বিষয় দুই ভাগে বিভক্ত হইয়াছে। ১
তন্মধ্যে তৃতীয় অধ্যায়ের শেষপর্যন্ত সাধ্য-সাধনাদিভেদে বিভক্ত বিশেষ বিশেষ অবস্থাগুলির বিনিয়োগপ্রদর্শন দ্বারা অবিদ্যার বিষয় সমস্তই বর্ণিত হই- য়াছে। সেই ব্যাখ্যাত অবিদ্যাবিষয় সমস্তই দুই প্রকার—একটি আন্তর, অপরটি- বাহ্য; তন্মধ্যে প্রাণ হইতেছে—গৃহের বিধারক স্তম্ভাদির ন্যায় দেহের উপষ্টন্তক এবং প্রকাশক ও অমৃতস্বরূপ(মরণরহিত), আর বাহ্য পদার্থটি ‘হইতেছে— গৃহের তৃণ, কুশ ও মৃত্তিকাদির তুল্য এবং উৎপত্তিবিনাশশালী অপ্রকাশস্বভাব’ সত্যপদবাচ্য ও কার্য্যাত্মক মর্ত্যপদার্থ; এই কারণেই পূর্ব্বাধ্যায়ে ‘অমৃত’- শব্দবাচ্য প্রাণকে ছন্ন বা আবৃত বলিয়া প্রকরণের উপসংহার করা হইয়াছে। ২
সেই প্রাণই বাহ্য অধিকরণের(দেহাদির) প্রভেদাবস্থায় বহুপ্রকারে বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে; অথচ সেই প্রাণকেই আবার এক দেবতা বলা হইয়া থাকে। তাহারই বাহ্য পিণ্ডটি(দেহপিণ্ডটি) এক-সর্ব্বসাধারণের সম্পর্কিত, যাহা সূর্য্যাদি দেহাবয়বরূপে বিভক্ত হইয়া(১) বিরাট্, বৈশ্বানর, আত্মা, পুরুষবিধ, প্রজাপতি, ক ও হিরণ্যগর্ভ—ইত্যাদি দেহার্থবোধক শব্দেও অভিহিত হইয়া থাকে; ব্রহ্মের একত্ব ও অনেকত্ব এই পর্য্যন্তই, ইহার অধিক আর কিছু নাই; সেই একই চেতন বস্তু শরীরভেদে পরিসমাপ্ত অর্থাৎ দেহভেদে ভেদ প্রাপ্ত হইয়া কর্তা ও ভোক্তারূপে প্রতীত হইয়া থাকে; সুতরাং উহা অবিদ্যারই অধিকারভুক্ত; অবিদ্যাধিকৃত সেই বস্তুতেই আত্মারূপে কৃতনিশ্চয় গার্গ্যনামক ব্রাহ্মণকে এখানে বক্তারূপে উপন্যস্ত করা হইতেছে এবং তদ্বিপরীত যথার্থ আত্ম-- দর্শী অজ্ঞাতশত্রুনামক রাজাকে শ্রোতারূপে প্রদর্শন করা হইতেছে। ৩
যেহেতু, কোন দুর্জ্ঞেয় বিষয়কে এইরূপে—পূর্ব্বপক্ষ ও সিদ্ধান্তরূপে প্রতি-- পাদন করিলেই তাহাতে সহজে শ্রোতার চিত্ত আকৃষ্ট হইয়া থাকে, পক্ষান্তরে, তর্কশাস্ত্রের ন্যায় কেবলই পদার্থমাত্রবোধক শব্দে নিরূপণ করিলে তাহা
৪৫৯
অতিশয় দুর্বোধ্য হইয়া পড়ে; কারণ, এই আত্মবস্তুটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম অর্থাৎ সহজ- বুদ্ধির অগম্য। দেখ, কঠোপনিষদও—‘বহুলোকে যাহাকে শ্রবণ করিতেও সমর্থ হয় না’ ইত্যাদি বাক্যে এই আত্মবস্তুকে কেবল পরিমার্জিত শুদ্ধবুদ্ধিগম্য এবং সাধারণবুদ্ধিমাত্রেরই অগম্য বলিয়া বিস্তৃতভাবে প্রদর্শন করিয়াছেন। তাহার পর ছান্দোগ্যোপনিষদেও আছে—‘আচার্য্যবান্ পুরুষ তাহাকে জানে’ ‘আচার্য্য হইতে লব্ধ বিদ্যাই উৎকৃষ্টতম’ ইতি; ভগবদগীতাতেও আছে—‘[হে অর্জুন] তত্ত্বদর্শী জ্ঞানিগণ তোমাকে জ্ঞানোপদেশ দিবেন’, বিশেষতঃ এই বৃহদারণ্য- কোপনিষদেও শাকল্যের সহিত যাজ্ঞবল্ক্যের কথোপকথনপ্রসঙ্গে বিশেষ আড়- স্বরের সহিত আত্মার দুজ্ঞেয়ত্ব জ্ঞাপন করিবেন; সেই হেতু গল্পচ্ছলে পূর্ব্ব- পক্ষ ও সিদ্ধান্তপক্ষ কল্পনাপূর্ব্বক ব্রহ্মবস্তুনিরূপণোদ্দেশে যে চেষ্টা, তাহা খুব যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। ৪ বিশেষতঃ আচারবিধির উপদেশ করাও আখ্যায়িকার অপর উদ্দেশ্য, অর্থাৎ কিরূপ গুণসম্পন্ন লোক বক্তা(আচার্য্য) হইবেন, আর কিরূপ গুণসম্পন্ন লোক শ্রোতা হইবেন, এবং কি প্রকারেই বা উপদেশ দিতে হয়, আর কি প্রকারেই বা তাহা গ্রহণ করিতে হয়, ইত্যাদি গুরু-শিষ্যের কর্তব্য উপদেশের জন্যও ঐরূপ আখ্যায়িকার অবতারণা করা আবশ্যক হয়। প্রত্যেক আখ্যায়িকা হইতেই বক্তা ও শ্রোতার অর্থাৎ সদাচারনিষ্ঠ গুরু ও শিষ্যের ঐরূপ আচার জানিতে পারা যায়। তাহার পর, আত্মতত্ত্ব-বিষয়ে শুদ্ধ তর্কবুদ্ধিপ্রয়োগের নিষেধ করাও ঐরূপ আখ্যায়িকার আর একটি উদ্দেশ্য; আখ্যায়িকাসৃষ্টির যে, ইহাও একটি উদ্দেশ্য, তাহা—‘তর্ক দ্বারা(শাস্ত্রনিরপেক্ষ তর্ক দ্বারা) এই মতি অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভ করা যায় না, অথবা অপনীত করা উচিত নহে, তর্ক- শাস্ত্রদ্বারা যাহার হৃদয় দগ্ধ(নীরস) হইয়াছে, তাদৃশ লোককে[তত্ত্বোপদেশ দিবে না], ইত্যাদি শ্রুতি ও স্মৃতি শাস্ত্র হইতেও জানা যায়। আর ব্রহ্মবিজ্ঞান- লাভে শ্রদ্ধাই যে, সর্ব্বোৎকৃষ্ট উপায়, ইহা জ্ঞাপন করাও আখ্যায়িকার আর একটি উদ্দেশ্য। দেখ, এই আখ্যায়িকাটিতেও গার্গ্য ও অজাতশত্রুর যথেষ্ট শ্রদ্ধার পরি- চয় পাওয়া যাইতেছে এবং ‘শ্রদ্ধাবান্ পুরুষ জ্ঞান লাভ করিয়া থাকেন,’ এইরূপ স্মৃতিবাক্যও রহিয়াছে।(১)
(১) তাৎপর্য্য—এখানে আশঙ্কা হইয়াছিল যে, উপনিষদের মধ্যে যে সমস্ত আখ্যায়িকা বা গল্পভাগ সন্নিবেশিত আছে, প্রকৃতপক্ষে সেরূপ কোনও ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল কি না অর্থাৎ আখ্যায়িকার মধ্যে যে সমস্ত বক্তা ও শ্রোতার নামোল্লেখ আছে, তাঁহারা সত্য সত্যই
॥ ওঁম্ ॥ দৃপ্তবালাকিহানূচানো গার্গ্য আস, স হোবাচাজাত- শত্রুং কাশ্যং—ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি, স হোবাচাজাতশত্রুঃ— সহস্রমেতস্যাং বাচি দদ্মো জনকো জনক ইতি বৈ জনা ধাবস্তীতি ॥ ৮১ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—অনুচানঃ(বচনসমর্থঃ বক্তা) দৃপ্তবালাকিঃ(দৃপ্তঃ— গর্বিতঃ বলাকায়া অপত্যম্—বালাকিঃ) গার্গ্যঃ(গর্গগোত্রীয়ঃ) আস(বভূব) হ (ঐতিহ্যে); সঃ(গার্গ্যঃ) হ(কিল) কাশ্যৎ(কাশিরাজং) অজাতশত্রুং(তন্নাম- ধেয়ং রাজানং) উবাচ(উক্তবান্)—তে(তুভ্যং) ব্রহ্ম ব্রবাণি(কথয়ামি) ইতি। সঃ(এবমভিহিতঃ) অজাতশত্রুঃ[গার্গ্যং] উবাচ হ—এতস্যাৎ বাচি(‘ব্রহ্ম তে ব্রবাণি’ ইতি বচননিমিত্তং) সহস্রং(গবাং সহস্রং) দদ্মঃ[তুভ্যমিতি শেষঃ]; (‘জনকঃ জনকঃ’ ইতি পদদ্বয়েন বাক্যদ্বয়ং সূচিতম্); বৈ(প্রসিদ্ধৌ) জনকঃ [শ্রোতা], জনকঃ[দাতা] ইতি[কৃত্বা] জনাঃ(শুশ্রূষবঃ, বিবক্ষরঃ, প্রতি- গ্রহীতারশ্চ) অভিধাবন্তি(জনকম্ অভ্যাগচ্ছন্তি),[তদ্বৎ’ ময্যপি সম্ভাবনং ন্যায্যমিতি ভাবঃ] ৮১॥ ১॥
মূলাসুবাদঃ—গর্বিতস্বভাব গর্গবংশীয় বালাকি নামে একজন বক্তা ছিলেন; তিনি কাশিরাজ অজাতশত্রুর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন—তোমাকে ব্রহ্মতত্ত্ব বলিব। অজাতশত্রু বলিলেন, তোমাকে এই কথাতেই আমি সহস্র[গো] দান করিতেছি।[বক্তা, শ্রোতা ও
প্রতিগ্রহীতা] লোকেরা ‘জনক জনক’ বলিয়া ধাবিত হয়;[সুতরাং আমাতেও সে সমস্ত গুণের সদ্ভাব মনে করা অসঙ্গত হইবে না]॥৮১॥১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্র পূর্ব্বপক্ষবাদী অবিদ্যা-ব্রহ্মবিৎ দৃপ্তবালাকিঃ— দৃপ্তঃ গর্বিতঃ অসম্যগ্ব্রহ্মবিত্তাদেব, বলাকায়া অপত্যং বালাকিঃ, দৃপ্তশ্চাসৌ বালাকিশ্চেতি দৃপ্তবালাকিঃ। হ-শব্দ ঐতিহ্যার্থ আখ্যায়িকায়াম্; অনুচানোহনু- বচনসমর্থো বক্তা বাগ্মী, গার্গ্যঃ গোত্রতঃ, আস বভূব ক্বচিৎ কালবিশেষে। সহ উবাচ অজাতশত্রুং অজাতশত্রুনামানং কাশ্যং কাশিরাজম্ অভিগম্য—ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি—ব্রহ্ম তে তুভ্যং ব্রবাণি কথয়ানি। স এবমুক্তোহজাতশত্রুরুবাচ—সহস্রং গবাং দদ্মঃ এতস্যাং বাচি—যাং মাং প্রত্যবোচঃ—ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি, তাবন্মাত্র- মেব গোসহস্রপ্রদানে নিমিত্তমিত্যভিপ্রায়ঃ।
সাক্ষাদ্ব্রহ্মকথনমেব নিমিত্তং কম্মান্নাপেক্ষ্যতে সহস্রদানে, ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি ইয়মেব তু বাক্ নিমিত্তমপেক্ষ্যতে? ইতি; উচ্যতে—যতঃ শ্রুতিরেব রাজ্ঞোহভি- প্রায়মাহ—জনকো দাতা, জনকঃ শ্রোতেতি চ এতস্মিন্ বাক্যদ্বয়ে পদদ্বয়মভ্যস্যতে —জনকো জনক ইতি। বৈশব্দঃ প্রসিদ্ধাবদ্যোতনার্থঃ, জনকো দিৎসুঃ, জনকঃ শুশ্রূষুরিতি ব্রহ্ম শুশ্রুষবো বিবক্ষবঃ প্রতিজিঘৃক্ষবশ জনা ধাবন্তি অভিগচ্ছন্তি; তস্মাত্তৎ সর্ব্বং ময্যপি সম্ভাবিতবানসীতি ॥ ৮১ ॥ ১ ॥
টীকা।—আখ্যায়িকার্থে বহুধা স্থিতে তদক্ষরাণি ব্যাচষ্টে—তত্রেত্যাদিনা। পূর্ব্বপক্ষবাদিত্বে, হেতুমাহ—অবিদ্যাবিষয়েতি। গর্ব্বিতত্বে হেতুমাহ—অসম্যষিতি। ইয়মেবতু বাঙ্নিমিত্তমিত্য- ত্রাপি কস্মাদিত্যনুষজ্যতে। অতো ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি বাগেব সহস্রদানে নিমিত্তমিতি শেষঃ। শ্রুতিং ব্যাচষ্টে—জনক ইতি। প্রসিদ্ধং জনকস্য দাতৃত্বাদি, তদবদ্যোতকো বৈ নিপাত ইতি যাবৎ। বাক্যার্থমাহ—জনকো দিৎসুরিত্যাদিনা। সম্ভাবিতবানসীতি প্রাগুক্তং বাগ্মাত্রং সহস্রদানে নিমিত্তমিতি শেষঃ। তস্মান্ মুগ্ধপ্রসিদ্ধ্যতিক্রমণাদিতি যাবৎ। তৎ সর্ব্বং দাতৃত্বাদি- কমিত্যর্থঃ। ইতি শব্দোহভিপ্রায়সমাপ্ত্যর্থঃ॥ ৮১ ॥১॥
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বপক্ষবাদী(অসত্য-পক্ষাবলম্বী) দৃপ্ত-বালাকি— যথার্থ ব্রহ্মজ্ঞান না থাকায় দৃপ্ত—গর্ব্বান্বিত(অভিমানী) ও বলাকানাম্নী মাতার পুত্র—বালাকি। দৃপ্ত অথচ বালাকি—দৃপ্তবালাকি,[কর্মধারয় সমাস]। গর্গগোত্রিয় বলিয়া গার্গ্য নামে প্রসিদ্ধ একজন অনুচান—অনুবচনসমর্থ অর্থাৎ বক্তা—বাগ্মা ছিলেন। ‘হ’ শব্দটি ঐতিহ্যসূচক;[সুতরাং বুঝিতে হইবে যে] কোন এক সময়ে তিনি প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। তিনি কাশ্য—কাশীরাজ অজ্ঞাতশত্রুর নিকট উপ- স্থিত হইয়া তাঁহাকে বলিয়াছিলেন—আমি তোমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিব। সেই
অজাতশত্রু এইরূপে অভিহিত হইয়া তাহাকে বলিলেন—এই কথায়ই আমি তোমাকে সহস্র গো দান করিব, যে কথা তুমি আমার প্রতি বলিয়াছ—“ব্রহ্ম তে ব্রহ্মাণীতি”,[সেই কথাতেই]। রাজার অভিপ্রায় এই যে, এই কথাটিই সহস্র গো-দানের নিমিত্ত বা উপযুক্ত কারণ।
ভাল, সাক্ষাৎ ব্রহ্মোপদেশকেই সহস্র গো-দানের নিমিত্ত বলিয়া কল্পনা কর না কেন?—‘তোমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিব’ শুধু এই কথাটিকেই সহস্রগোদানের কারণ বলিতেছ কেন? হাঁ, বলা হইতেছে—যেহেতু স্বয়ংশ্রুতিই রাজার এইরূপ অভি- প্রায় প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন—জনক দাতা, জনক শ্রোতা, এইরূপ দুইটি বাক্যকে লক্ষ্য করিয়া ‘জনকঃ’ ‘জনকঃ’ এই দুইটিমাত্র পদ বলা হইয়াছে; [বস্তুতঃ এই দুইটি শব্দে দাতৃত্ব ও শ্রোতৃত্ব বোধক ঐরূপ দুইটিবাক্য বুঝিয়া লইতে হইবে]। বৈ শব্দটি প্রসিদ্ধিদ্যোতক; জনক দান করিতে ইচ্ছুক ও শ্রবণ করিতে ইচ্ছুক, এই জন্য ব্রহ্মতত্ত্ব শুশ্রূষু ও বিষক্ষু(বলিতে ইচ্ছুক) এবং প্রতি- গ্রহেচ্ছু লোকসমূহ তদভিমুখে ধাবমান হয়; অতএব সে সমস্ত গুণ আমাতেও সম্ভাবিত আছে মনে করিয়াছ;[কাজেই ঐরূপ বাক্য শ্রবণমাত্রে সহস্রদান করা অজাতশত্রুর পক্ষে সম্ভবপর হইয়াছে]॥ ৮১ ॥ ১ ॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবাসাবাদিত্যে পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি; স হোবাচাহজাতজক্রর্মা মৈতস্মিন্ সংবদিষ্ঠাঃ, অতিষ্ঠাঃ সর্বেষাং ভূতানাং মূদ্ধা রাজেতি বা অহমেতমুপাস- ইতি; স য এতমেবমুপাস্তেহতিষ্ঠাঃ সর্বেষাং ভূতানাং মূদ্ধা রাজা ভবতি ॥ ৮২॥ ২॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ(উক্তবান্) হ—যঃ এব অসৌ(দূরতো নিরীক্ষ্যমাণঃ) আদিত্যে(সূর্য্যমণ্ডলে অবস্থিতঃ) পুরুষঃ, অহং এতম্ (আদিত্যমধ্যস্থৎ) পুরুষং এব ব্রহ্ম(ব্রহ্মবুদ্ধ্যা) উপাসে(আরাধয়ামি) ইতি; সঃ(এবমুক্তঃ) অজাতশত্রুঃ হ(ঐতিহ্যে) উবাচ—এতস্মিন্(আদিত্যপুরুষে) (মাং প্রতি) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ(সংবাদৎ—ব্রহ্মবুদ্ধিং মা কাষীঃ);[যতঃ] অহং বৈ এতং(আদিত্যপুরুষং) সর্ব্বেষাং ভূতানাং অতিষ্ঠাঃ(সর্ব্বোত্তমঃ) মূর্দ্ধা(শিরঃ) রাজা(দীপ্তিমান্) ইতি(এবং অতিষ্ঠাদিগুণবিশিষ্টত্বেন) উপাসে ইতি। সঃ যঃ(যঃ কশ্চিৎ) এতম্ এবং(অতিষ্ঠত্বাদিগুণবিশিষ্টং) উপাস্তে,[সঃ উপাসকঃ] সর্ব্বেষাং ভূতানাং অতিষ্ঠাঃ মূর্দ্ধা রাজা ভবতি[বিজ্ঞানফলমেতদিত্যর্থঃ] ॥ ৮২ ॥ ২॥
মূলানুবাদ?—সেই গার্গ্য অজাতশত্রুকে বলিলেন, এই যে অদিত্যমণ্ডল-মধ্যবর্তী পুরুষ, আমি ইহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করি। সেই অজাতশত্রু বলিলেন—না-না এরূপ ব্রহ্মবিষয়ে আমার সহিত সংবাদ করিও না, অর্থাৎ আমার নিকট এই আদিত্য-পুরুষকে ব্রহ্ম বলিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিও না; কারণ, আমি ইহাকে সর্ব্বভূতের অতিষ্ঠা(উপরিস্থিত) মস্তক ও রাজা(দীপ্তিমান্) বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। অপরও যে কোন লোক ইহাকে অতিষ্ঠাদি-গুণযুক্ত বলিয়া উপাসনা করে, সে ব্যক্তিও সর্ব্বভূতের অতিষ্ঠা মস্তক ও রাজা হন ॥ ৮২ ॥ ২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—এবং রাজানং শুশ্রূষুমভিমুখীভূতৎ স হ উবাচ গার্গ্যঃ—য এবাসৌ আদিত্যে চক্ষুষি চৈকোহভিমানী চক্ষুর্ধারেণেহ হৃদি প্রবিষ্টঃ, অহং ভোক্তা কর্তা চেত্যবস্থিতঃ,—এতমেবাহং ব্রহ্ম পশ্যামি অস্মিন্ কার্য্যকরণ- -সঙ্ঘাতে উপাসে। তস্মাৎ তমহং পুরুষং ব্রহ্ম তুভ্যং ব্রবীমি উপাস্বেতি। স এবমুক্তঃ প্রত্যুবাচ অজ্ঞাতশত্রুঃ—মা মামেতি হস্তেন বিনিবারয়ন্—এতস্মিন্ ব্রহ্মণি বিজ্ঞেয়ে মা সংবধিষ্ঠাঃ; মামেত্যাবাধনার্থং দ্বিব্বচনম্,—এবং সমানে বিজ্ঞান- বিষয়ে আবয়োঃ, অস্মান্ অবিজ্ঞানবত ইব দর্শয়তা বাধিতাঃ স্যামঃ; অতো মা সংবধিষ্ঠাঃ মা সংবাদং কার্ষীরস্মিন্ ব্রহ্মণি; অন্যচ্চেৎ জানাসি, তদ্ ব্রহ্ম বক্তু- মর্হসি; ন তু যন্ময়া জ্ঞায়ত এব। অথ চেৎ মন্যসে—জানীষে ত্বং ব্রহ্মমাত্রম্, ন তু তদ্বিশেষণোপাসনফলানীতি; তন্ন মন্তব্যম্; যতঃ সর্ব্বমেতদহং জানে, যদ্ ব্রবীষি। কথম্? অতিষ্ঠাঃ অতীত্য সর্ব্বাণি ভূতানি তিষ্ঠতীতি অতিষ্ঠাঃ, সর্ব্বেষাং চ ভূতানাং মুর্দ্ধা শিরঃ রাজেতি বৈ রাজা দীপ্তিগুণোপেতত্বাৎ, এতৈর্বিশেষণৈ- ব্বিশিষ্টমেতদ্ ব্রহ্ম অস্মিন্ কার্য্যকরণসংঘাতে কর্তৃ ভোক্তৃ চেতি অহমেতমুপাসে ইতি; ফলমপ্যেবং বিশিষ্টোপাসকস্য—সঃ যঃ এতমেবমুপাস্তে, অতিষ্ঠাঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মুর্দ্ধা রাজা ভবতি; যথাগুণোপাসনমেব হি ফলম্, “তং যথাযথোপাসতে, তদেব ভবতি ইতি শ্রুতেঃ ॥ ৮২ ॥ ২ ॥
টাকা।—হৃদি প্রবিষ্টো ভোক্তাহহমিত্যাদি প্রত্যক্ষং প্রমাণয়তি—অহমিতি। দৃষ্টিফলং নৈয়স্তর্য্যাভ্যাসং দর্শয়তি—উপাস ইতি। ভাবতা মম কিমায়াতং, তদাহ—তস্মাদিতি। মা মেতি প্রতীকমাদায়াভ্যাসস্যার্থমাহ—মা মামেতীতি। বিনিবারয়ন্ প্রত্যুবাচেতি সম্বন্ধঃ। একস্য মাঙো নিবারকত্বমপরস্য সংবাদেন সঙ্গতিরিতি বিভাগে সম্ভবতি কুতো দ্বিব্বচনমিত্যা- শঙ্ক্যাহ—মা মেত্যাবাধনার্থমিতি। তদেব স্ফুটয়তি—এবমিতি। ত্বদুক্তেন প্রকারেণ যো
বিজ্ঞানবিষয়োহর্থস্তস্মিন্নাবয়োর্বিজ্ঞানসাম্যাদেব সমানেহপি বিজ্ঞানবত্ত্বে সত্যস্মানবিজ্ঞানবত ইব স্বীকৃত্য তমেবার্থমম্মান্ প্রত্যুপদেশেন জ্ঞাপয়তা ভবতা বয়ং বাধিতাঃ স্যাম ইতি যোজনা। তথাপি গার্গ্যস্য কথমীযদ্বাধনং, তত্রাহ—অত ইতি।
অতিষ্ঠাঃ সর্ব্বেষামিত্যদি বাক্যং শঙ্কাদ্বারাহবতার্য্য ব্যাকরোতি—অথেত্যাদিনা। এতং পুরুষমিতি শেষঃ। ইতিশব্দো গুণোপান্তিসমাপ্ত্যর্থঃ। পূর্ব্বোক্তরীত্যা ত্রিভিগুণৈর্বিশিষ্টং ব্রহ্ম, তদুপাসকস্য ফলমপি জানামীত্যুক্ত্বা ফলবাক্যমুপাদত্তে—স য ইতি। কিমিতি যথোক্তং ফলমুচ্যতে, তত্রাহ—যথেতি। ৮২।২।
ভাষ্যানুবাদ।—এইরূপে রাজা শ্রবণেচ্ছায় অভিমুখীভূত হইলে পর, পূর্ব্বোক্ত গার্গ্য তাহাকে বলিলেন—এই যে আদিত্য ও চক্ষুর অভিমানী একটি পুরুষ, যিনি চক্ষু দ্বারা হৃদয়াভ্যন্তরে প্রবেশপূর্ব্বক কর্তা ভোক্তা ও অনুভবিতারূপে বর্তমান আছেন; আমি ইহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানি এবং কার্য্যকরণ-সমষ্টিভূত এই শরীর মধ্যে আমি ইহারই উপাসনা করিয়া থাকি। অতএব আমি তোমাকে বলিতেছি—তুমিও ব্রহ্মবুদ্ধিতে সেই পুরুষের উপাসনা কর। সেই অজাতশত্রু এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রত্যুত্তরে বলিলেন—না-না—হস্তদ্বারা নিবারণ করত বলিলেন—এরূপ ব্রহ্মবিষয়ে জ্ঞানলাভের জন্য সংবাদ করিও না। অত্যন্ত নিষেধ জ্ঞাপনের জন্য ‘মা’ শব্দটির দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে। অভিপ্রায় এই যে, বক্তব্য বিষয়টি যখন আমাদের উভয়েরই বিজ্ঞাত, তখন আমাদিগকে যদি একটা মূর্খের মত বুঝাইতে চেষ্টা কর, তাহা হইলে নিশ্চয়ই বিড়ম্বিত হইব; অতএব এ বিষয়ে আর সংবাদ করিও না, অর্থাৎ এতাদৃশ ব্রহ্মবিষয়ে আর কথা বলিও না। যদি তুমি আর কিছু জান, তাহা হইলে সেই ব্রহ্মই বলিতে পার; কিন্তু যাহা আমার জানাই রহিয়াছে, তাহা আর বলিও না।
আর যদি তুমি মনে করিয়া থাক যে, আমি কেবল ব্রহ্মমাত্রই জানি, কিন্তু বিশেষগুণযোগে তাঁহার উপাসনা ও উপাসনার ফল জানি না; না,-তাহাও তোমার মনে করা উচিত হয় না; কারণ, তুমি যাহা বলিতেছ, তাহার সমস্তই আমি জানি। কি প্রকার?[বলিতেছি-] ইহা হইতেছে সর্ব্বভূতের অতিষ্ঠা মস্তক ও রাজা স্বরূপ; সর্ব্বভূতকে অতিক্রম করিয়া অবস্থান করে বলিয়া অতিষ্ঠা এবং দীপ্তিগুণ থাকায় রাজা(প্রকাশমান)। এই সমুদয় বিশেষগুণবিশিষ্ট এই ব্রহ্মকে আমি এই দেহমধ্যে কর্তা ও ভোক্তারূপে উপাসনা করিয়া থাকি। এবং- বিধ গুণবিশেষযোগে যিনি উপাসনা করেন, তাহার ফলও এইরূপই হইয়া থাকে, -যে কোন ব্যক্তি ইহাকে যথোক্ত প্রকারে উপাসনা করেন, তিনি নিজেও সর্ব্বভূতের অতিষ্ঠা শিরঃ ও রাজা হন; কেননা, যেরূপ গুণযোগে উপাসনা করা
হয়, ফলও তদনুরূপই হয়; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন—‘তাহাকে যে যে ভাবে উপাসনা করে, সেইরূপই ফল হইয়া থাকে’ ॥ ৮২ ॥ ২ ॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবাসৌ চন্দ্রে পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি; স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবদিষ্ঠাঃ, বৃহন্ পাণ্ডরবাসাঃ সোমো রাজেতি বা অহমেতমুপাস ইতি; স য এতমেবমুপাস্তেহহরহর্হ সুতঃ প্রসুতো ভবতি, নাস্যান্নং ক্ষীয়তে ॥ ৮৩॥ ৩॥
সরলার্থঃ।—[এবমুক্তঃ] সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অসৌ চন্দ্রে[অব- স্থিতঃ] পুরুষঃ, অহং এতং(চন্দ্রমণ্ডলস্থং পুরুষম্) এব ব্রহ্ম(ব্রহ্মবুদ্ধ্যা) উপাসে (উপাসিতবান্ অস্মি) ইতি;[এবমভিহিতঃ], সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ— এতস্মিন্(চন্দ্রস্থ-পুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ(সংবাদং মা কার্ষীঃ); অহং এতৎ (ত্বদুক্তং পুরুষং) বৃহন্(মহান্) পাণ্ডুরবাসা:(পাণ্ডরং শুভ্রং জলং, জলময়- শরীরত্বাৎ চন্দ্রাভিমানিপুরুষস্য; বাসঃ বস্ত্রং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), সোমঃ রাজা (দীপ্তিমান্ চন্দ্রঃ) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ(অন্যোহপি কশ্চিৎ) এতৎ (চন্দ্রাভিমানিনং পুরুষং) এবং(বৃহত্ত্বাদিগুণবিশিষ্টং) উপাস্তে, অন্য(উপাসকস্য) অহরহঃ(প্রত্যহং) সুতঃ(যজ্ঞে সোমঃ অভিসুতঃ) প্রসুতঃ(বিকৃতি- যাগেষু চ প্রকর্ষেণ সুতঃ) ভবতি;(প্রকৃতি-বিকৃতিযাগানুষ্ঠানসামর্থ্যমস্য সম্পদ্যতে ইতি ভাবঃ)। অন্য অন্নং ন ক্ষীয়তে(অক্ষয়মস্যার্নং ভবতী- ত্যর্থঃ) ॥ ৮৩॥৩॥
মূলানুবাদ?—[অজাতশত্রু এইরূপ বলিলে পর] গার্গ্য পুনশ্চ তাহাকে বলিলেন—এই যে, চন্দ্রে পুরুষ(চন্দ্রাভিমানী প্রাণ- পুরুষ), আমি ইহাকেই ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করিয়া থাকি।[এই কথা শ্রবণ করিয়া] অজাতশত্রু বলিলেন—না না—এরূপ কথা বলিও না; আমি ইহাকে বৃহন্[মহৎ] পাণ্ডরবাসাঃ[জলরূপ শুক্লবস্ত্রে আবৃত] সোম ও রাজা(দীপ্তিমান্ চন্দ্র) বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে লোক ইহাকে এইরূপে উপাসনা করে, প্রত্যহ তাহার সুত ও প্রস্তুত নিষ্পন্ন হয়, অর্থাৎ প্রকৃতি ও বিকৃতিসংজ্ঞক যাগে নিত্য সোমাভিষব করিবার সামর্থ্য হয়; কখনও তাহার অন্নক্ষয় হয় না॥ ৮৩॥ ৩॥
৩০
শাঙ্করভাষ্যম্।—সংবাদেনাদিত্যব্রহ্মণি প্রত্যাখ্যাতে অজ্ঞাতশত্রুণা, চন্দ্রমসি ব্রহ্মান্তরং প্রতিপেদে গার্গ্যঃ। য এবাসৌ চন্দ্রে মনসি চৈকঃ পুরুষঃ ভোক্তা কর্তা চেতি পূর্ব্ববদ্বিশেষণম্। বৃহন্ মহান্, পাণ্ডরং শুক্লং বাসো যস্য, সোহয়ং পাণ্ডরবাসাঃ, অপৃশরীরত্বাৎ চন্দ্রাভিমানিনঃ প্রাণস্য। সোমো রাজা চন্দ্রঃ, যশ্চান্নভূতোহভিষূয়তে লতাত্মকো যজ্ঞে, তমেকীকৃত্য এতমেবাহৎ ব্রহ্মোপাসে। যথোক্তগুণং য উপান্তে তস্যাহরহঃ সুতঃ সোমোহভিযুতো ভবতি যজ্ঞে, প্রসূতঃ প্রকৃষ্টং সুতরাং সুতো ভবতি বিকারে—উভয়বিধযজ্ঞানুষ্ঠানসামর্থ্যং ভবতীত্যর্থঃ; অন্নং চাস্য ন ক্ষীয়ত অন্নাত্মকোপাসকস্য ॥ ৮৩ ॥ ৩ ॥
টাকা।—মনসি চেতি চকারাদ বুদ্ধৌ চেত্যর্থঃ। য একঃ পুরুষস্তমেবাহং ব্রহ্মোপাসে, ত্বং চেখমুপাস্বেত্যুক্তে মা মেত্যাদিনা প্রত্যুবাচেত্যাহ—ইতি পূর্ব্ববদিতি। ভানুমণ্ডলতো দ্বিগুণং চন্দ্রমণ্ডলমিতি প্রসিদ্ধিমাশ্রিত্যাহ—মহানিতি। কথং পাণ্ডরং বাসশ্চন্দ্রাভিমানিনঃ প্রাণস্য সম্ভবতীত্যাশঙ্ক্যাহ—অপশরীত্বাদিতি। পুরুষো হি শরীরেণ বাসসেব বেষ্টিতো ভবতি, পাণ্ডরত্বং চাপাং প্রসিদ্ধম্, আপো বাসঃ প্রাণস্তেতি চ শ্রুতিরতো যুক্তং প্রাণস্য পাণ্ডরবাসত্ত্বমিত্যর্থঃ। ন কেবলং সোমশব্দেন চন্দ্রমা গৃহ্যতে, কিং তু লতাপি, সমাননামধৰ্ম্মত্বাদিত্যাহ—যশ্চেতি। তং চন্দ্রমসং লতাত্মকং বুদ্ধিনিষ্ঠং চ পুরুষমেকীকৃত্যাহংগ্রহেণোপাস্তিরিত্যর্থঃ। সম্প্রপ্রত্যুপান্তিফলমাহ— যথোক্তেতি। যজ্ঞশব্দেন প্রকৃতিরুক্তা। বিকারশব্দেন বিকৃতয়ো গৃহ্যন্তে। যথোক্তোপাসকস্য প্রকৃতিবিকৃত্যনুষ্ঠানসামর্থ্যং লীলয়া লভ্যমিত্যর্থঃ অম্নাক্ষয়স্যোপাসনানুসারিত্বাদুপপন্নত্বমভি- প্রেত্যোপাসকং বিশিনষ্টি—অম্লাত্মকেতি। ৮৩। ৩।
ভাষ্যানুবাদ।—কথোপকথনক্রমে অজাতশত্রু পূর্ব্বোক্ত আদিত্য- ব্রহ্মের প্রত্যাখ্যান করিলে পর, গার্গ্য পুনশ্চ চন্দ্রমধ্যে অন্যবিধ ব্রহ্ম প্রতিপন্ন হইলেন। তিনি বলিলেন—চন্দ্রে ও মনোমধ্যে অধিষ্ঠিত এই যে, একটি পুরুষ পূর্ব্ববৎ কর্তৃত্ব ভোক্তৃত্বাদি গুণবিশেষবিশিষ্ট। বৃহন্—মহৎ, পাণ্ডর—শুক্লবর্ণ, বাসঃ—আচ্ছাদন যাহার, তিনি পাণ্ডরবাসাঃ; জল হইতেছে চন্দ্রাভিমানী প্রাণের
৪৬৭
শরীর;[এই জন্য প্রাণকে ‘পাণ্ডরবাসা’ বলা হইয়াছে]; সোম রাজা(দীপ্তি- মান্) চন্দ্র; যে সোম লতা যজ্ঞে অভিসুত(সংস্কৃত) হইয়া থাকে, তাহার সহিত এক করিয়া অর্থাৎ সোমলতা ও সোমনামক চন্দ্র, এই উভয়কেই এক অভিন্নরূপে গ্রহণ করিয়া আমি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করিয়া থাকি। যে ব্যক্তি যথোক্ত গুণ- সম্পন্ন উক্ত পুরুষের উপাসনা করে, প্রত্যহ তাহার যজ্ঞে সোমলতা অভিষিক্ত হয়, এবং বিকৃতি যজ্ঞেও উত্তমরূপে সোমাভিষব সুসম্পন্ন হয়, অর্থাৎ প্রকৃতি ও বিকৃতি উভয়বিধ যজ্ঞানুষ্ঠানেই তাহার শক্তিলাভ হইয়া থাকে; সেই অন্নাত্মক ব্রহ্মোপাসকের অন্ন কখনও ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না৷ ৮৩॥ ৩॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবাসৌ বিদ্যুতি পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি, স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবদিষ্ঠা- স্তেজস্বীতি বা অহমেতমুপাস ইতি; স য এতমেবমুপাস্তে তেজস্বীহ ভবতি, তেজস্বিনী হাস্য প্রজা ভবতি ॥ ৮৪ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—[পুনশ্চ] সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অসৌ বিদ্যুতি (বিদ্যুদভিমানী) পুরুষঃ, অহং এতং(পুরুষং) এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্(বিদ্যুৎপুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহম্ এতৎ ‘তেজস্বী’ ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতৎ এবম্ উপাস্তে, সঃ তেজস্বী হ ভবতি; অন্য প্রজা:(সন্ততিঃ) তেজস্বিনী হ.[এব] ভবতি,[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥ ৮৪ ॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ?—গার্য্য পুনশ্চ বলিলেন—এই যে, বিদ্যুদভিমানী পুরুষ, আমি ইহাকেই ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করি। অজাতশত্রু বলিলেন—না—না—এরূপ কথা বলিও না; আমি ইহাকে ‘তেজস্বী’ বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে লোক এইরূপে ইহার উপাসনা করেন, তিনি নিজেও তেজস্বী হন ॥ ৮৪ ॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা বিদ্যুতি ত্বচি হৃদয়ে চৈকা দেবতা; তেজস্বীতি বিশেষণম্; তস্যাস্তৎ ফলম্—তেজস্বী হ ভবতি তেজস্বিনী হাস্য প্রজা ভবতি। বিদ্যুতাং বহুত্বস্যাঙ্গীকরণাদাত্মনি প্রজায়াং চ ফলবাহুল্যম্ ॥ ৮৪ ॥ ৪ ॥
টীকা।—সংবাদদোষেণ চন্দ্রে ব্রহ্মণ্যপি প্রত্যাখ্যাতে ব্রহ্মান্তরমাহ—তথেতি। কথমেক- মুপাসনমনেকফলমিত্যাশঙ্ক্যাহ—বিদ্যুতামিতি। ৮৪। ৪।
ভাষ্যানুবাদ।—সেইরূপ বিদ্যুতে—হৃদয়ে এবং ত্বকেও একই দেবতা
অবস্থিত। ‘তেজস্বী’ পদটি পুরুষের বিশেষণ। উক্ত উপাসনার ফল এই যে, তিনি তেজস্বী হন, এবং তাঁহার প্রজাও(সন্তানও) তেজস্বী হইয়া থাকে। এখানে, বিদ্যুতের বহুত্ব স্বীকার করায় তদুপাসনার ফলস্বরূপ আত্মাতে অর্থাৎ উপাসকে এবং তৎসন্তানেও ভিন্ন ভিন্ন ফল উক্ত হইল ॥ ৮৪ ॥ ৪ ॥ ৯৪
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়মাকাশে পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি, স হোবাচাজাতশত্রুর্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ; পূর্ণমপ্রবর্তীতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে, পূর্য্যতে প্রজয়া পশুভিঃ, নাস্যাম্মাল্লোকাৎ প্রজোদ্বর্ত্ততে ॥ ৮৫ ॥ ৫॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্য্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং আকাশে পুরুষঃ, অহং এতম্ এব ব্রহ্ম(ব্রহ্মত্বেন) উপাসে ইতি। সঃ অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্ (আকাশপুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহং এতৎ পূর্ণং(ব্যাপি) অপ্রবর্ত্তি (অক্রিয়ং) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতৎ(আকাশপুরুষং) এবং উপাস্তে,[সঃ উপাসকঃ] প্রজয়া(সন্তানেন) পশুভিঃ[চ] পূর্য্যতে(পূর্ণো ভবতি); অন্য(উপাসকস্য) প্রজা অস্মাৎ লোকাৎ ন উদ্বর্ত্ততে(ন বিচ্ছির্যতে ইত্যর্থঃ) ॥ ৮৫॥ ৫ ॥
মূলানুবাদ।—সেই গার্গ্য বলিলেন—এই যে,আকাশাভিমানী পুরুষ, আমি ইহাকে ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করি। সেই অজাতশত্রু বলিলেন—না—না—আমাকে ইহা বলিবেন না; আমি ইহাকে ব্যাপক ও নিষ্ক্রিয় বলিয়া উপাসনা করি। যে লোক এইরূপে ইহার উপাসনা করে, সে লোক কখনও সন্তান ও পশুসম্পদে হীন হয় না, এবং এজগতে কখনও তাহার সন্তান-বিচ্ছেদ হয় না ॥ ৮৫ ॥ ৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা আকাশে হ্যাকাশে হৃদয়ে চৈকা দেবতা; পূর্ণম্ অপ্রবর্ত্তি চেতি বিশেষণদ্বয়ম্। পূর্ণত্ববিশেষণফলমিদম্—পূর্য্যতে প্রজয়া পশুভিঃ; অপ্রবর্ত্তিবিশেষণফলম্—নাস্য অস্মাল্লোকাৎ প্রজা উদ্বর্ত্তত ইতি, প্রজা সন্তানাবিচ্ছিত্তিঃ ॥ ৮৫ ॥ ৫ ॥
টীকা।—অপ্রবর্ত্তিতমপ্রবর্ত্তকত্বমক্রিয়াবত্ত্বং বা। ৮৫। ৫।
ভাষ্যানুবাদ।—সেইরূপ আকাশে অর্থাৎ হৃদয়াকাশে ও হৃদয়ে একই দেবতা; পূর্ণ(ব্যাপক) ও অপ্রবর্ত্তি(নিশ্চল), এই দুইটি তাহার বিশেষণ। পূর্ণত্ববিশেষণবিশিষ্টরূপে উপাসনার ফল—প্রজা ও পশুগণে পূর্ণ থাকা; আর অপ্র-
৪৬৯
বর্তি-বিশেষণযোগে উপাসনার ফল—ইহলোক হইতে তাহার সন্তান বিচ্ছিন্ন না হওয়া; না, অর্থাৎ তাহার বংশলোপ হয় না ॥৮৫৷৷৫॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়ং বায়ৌ পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি; স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ, ইন্দ্রো বৈকুণ্ঠোহপরাজিতা সেনেতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে, জিষ্ণুরূপরাজিষ্ণুর্ভবত্যন্য তস্ত্যজায়ী ॥৮৬৷৷৬৷৷
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং বায়ৌ(বায়ুভিমানী পুরুষঃ), অহং এতম্ এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি; সঃ(এবমুক্তঃ) অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্(বায়ুপুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহং এতং(বায়ু-পুরুষৎ) ইন্দ্রঃ (পরমৈশ্বর্য্যবান্) বৈকুণ্ঠঃ(কুণ্ঠারহিতঃ—অপ্রতিহতশক্তিঃ) অপরাজিতা(ন পরৈ: জিতপূর্ব্বা) সেনা(সমষ্টিভূতা) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবম্ উপাস্তে;[সঃ] জিষ্ণুঃ(জয়শীলঃ) অপরাজিষ্ণুঃ(বিজেতৃরহিতঃ) অন্যতস্ত্যজায়ী (অন্যতস্ত্যানাং অন্যতঃ আগতানাং শত্রূণাং জয়শীলঃ চ) ভবতি ॥৮৬৷৷৬৷৷
মূলানুবাদ।-সেই গার্গ্য পুনশ্চ বলিলেন-এই যে, বায়ু- অভিমানী পুরুষ, ইহাকেই আমি ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করিয়া থাকি; অজাতশত্রু বলিলেন-না-না-এবিষয়ে কথা বলিবেন না; আমি ইহাকে ইন্দ্র(পরমৈশ্বর্য্যশালী) বৈকুণ্ঠ(অপ্রতিহতশক্তি) ও অন্যের অপরাজিতা সেনা(সমষ্টিভূত) বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। অন্যও যে লোক উক্তপ্রকারে ইহার উপাসনা করে, সে লোকও জয়শীল, পরের অপরাজেয় এবং শত্রুজয়ী হয় ॥ ৮৬ ॥ ৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা বায়ৌ প্রাণে হৃদি চৈকা দেবতা; তস্যা বিশেষণম্—ইন্দ্রঃ পরমেশ্বরঃ, বৈকুণ্ঠঃ অপ্রসহ্যঃ, ন পরৈর্জিতপূর্বা অপরাজিতা, সেনা—মরুতাং গণত্বপ্রসিদ্ধেঃ। উপাসনফলমপি—জিষ্ণুহ জয়নশীলঃ, অপরা- জিষ্ণুঃ ন চ পরৈর্জিতস্বভাবো ভবতি, অন্যতস্ত্যজায়ী অন্যতস্ত্যানাং সপত্নানাং জয়নশীলো ভবতি ॥৮৬৷৷৬৷৷
টীকা।—কথমেকস্মিন্ বায়াবপরাজিতা সেনেতি গুণঃ সম্ভবতি, তত্রাহ—মরুতামিতি। বিশেষণত্রয়স্য ফলত্রয়ং ক্রমেণ ব্যুৎপাদয়তি—জিষ্ণুরিত্যাদিনা। অন্যতস্ত্যানামন্যতো মাতৃতো জাতানাম্। ৮৬। ৬।
ভাষ্যানুবাদ।—সেইরূপ বায়ুতে—প্রাণেতে এবং হৃদয়মধ্যেও একই
দেবতা; তাহার বিশেষণ—ইন্দ্র অর্থাৎ পরমেশ্বর(উৎকৃষ্ট ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন), বৈকুণ্ঠ অর্থাৎ অপরের অনভিভবনীয় এবং অপরাজিতা অর্থাৎ শত্রু যাহাকে কখনও জয় করিতে পারে না, এমন সেনা; কারণ, বায়ুর গণত্ব(সমষ্টিভাব) প্রসিদ্ধ আছে,[তন্নিবন্ধন বায়ুসমষ্টিকে সেনা বলা হইয়াছে]। উপাসনারও ফল এই যে, তিনি জিষ্ণু অর্থাৎ জয়শীল, অপরাজিষ্ণু—অন্যকর্তৃক অপরাজেয়— পরাজিত হইবার অযোগ্য, এবং অন্যতস্ত্যজায়ী—অন্যতস্ত্যের—শত্রুগণের জয়- কারী হন ॥৮৬৷৷৬৷৷
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়মগ্নৌ পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি; স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ; বিষাসহিরিতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে, বিষাসহির্হ ভবতি, বিষাসহির্হাস্য প্রজা ভবতি ॥ ৮৭ ॥ ৭ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ম্ অগ্নৌ পুরুষঃ, অহং এতম্ এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্(অগ্ন্যুভিমানিনি পুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহম্ এতং বিষাসহিঃ(অগ্নৌ যৎ হবিঃ বিষ্যতে ক্ষিপ্যতে, তৎ ভস্মীকরণেন সহতে ইতি বিষাসহিঃ) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবম্ উপাস্তে, সঃ বিষাসহিঃ ভবতি, অন্য প্রজা(সন্ততিঃ চ) বিষাসহিঃ ভবতি ॥৮৭॥৭॥
মূলানুবাদ?—সেই গার্গ্য বলিলেন—এই যে, অগ্নিস্থ পুরুষ; ইহাকেই আমি ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি; অজাতশত্রু বলিলেন—না না—এ বিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে ‘বিষাসহি’ বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে লোক উক্তপ্রকারে ইহার উপাসনা করেন, তিনি নিজেও বিষাসহি হন, এবং তাঁহার সন্তানও বিষাসহি হয়। ‘বিষাসহি’ অর্থ—অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত হবিঃ প্রভৃতিকে যিনি সহ্য করেন, অর্থাৎ ভস্মীভূত করিয়া থাকেন॥ ৮৭ ॥ ৭ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্।—অগ্নৌ বাচি হৃদি চৈকা দেবতা; তস্যা বিশেষণম্— বিষাসহিঃ মর্ষয়িতা পরেযাম্। অগ্নিবাহুল্যং পূর্ব্ববৎ ॥ ৮৭ ॥ ৭ ॥ টীকা।—যদ্ধবিব্বিষ্যতে ক্ষিপ্যতে, তৎ সর্ব্বং ভস্মীকরণেন সহতে, তেনাগ্নিব্বিষাসহিঃ। যথা পূর্ব্বং বিদ্যুতাং বাহল্যাদাত্মনি প্রজায়াং চ ফলবাহুল্যমুক্তং, তথাত্রাপ্যগ্নীনাং বহুলত্ত্বাদুপা- সকস্তাত্মনি প্রজায়াং দীপ্তাগ্নিত্বং সিধ্যতীত্যাহ—অগ্নীতি। ৮৭। ৭॥
৪৭২
ভাষ্যানুবাদ।—অগ্নিতে বাগিন্দ্রিয়ে ও হৃদয়ে একই দেবতা; তাহার বিশেষণ—‘বিষাসহি’; বিষাসহি অর্থ—পরের প্রতি ক্ষমাশীল। পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও অগ্নির বহুত্ব নিবন্ধন ফলের বাহুল্য উক্ত হইল ॥৮৭॥৭॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়মপ্সু পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মো- পাস ইতি, স হোবাচাজাতশত্রুর্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ, প্রতি- রূপ ইতি বা অহমেতমুপাস-ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে, প্রতি- রূপহৈবৈনমুপগচ্ছতি নাপ্রতিরূপমথো প্রতিরূপোহস্মা- জ্জায়তে ॥ ৮৮ ॥ ৮ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং অপ্সু(জলেষু—জলাভি- মানী) পুরুষঃ, অহং এতম্ এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ— এতস্মিন্(জলাভিমানিনি পুরুষে) মা মা সংবদিষ্ঠাঃ; অহম্ এতৎ প্রতিরূপ ইতি বৈ উপাসে ইতি; সঃ যঃ এতম্ এবম্ উপাস্তে, প্রতিরূপং(অনুকূলং রূপং) এব এনং(উপাসকং) উপগচ্ছতি, অপ্রতিরূপং ন; অথো(অপি) অস্মাৎ (উপাসকাৎ) প্রতিরূপঃ(অনুরূপঃ এব) জায়তে,(ন তু বিরূপঃ) ॥৮৮৷৷৷
মূলানুবাদ?—সেই গার্গ্য বলিলেন—এই যে জলাভিমানী পুরুষ, ইহাকেই আমি ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। অজাতশত্রু বলিলেন—না না, এবিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে প্রতিরূপ[আশ্রয়ানুরূপ] বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। অপরও যে ব্যক্তি এইরূপে ইহার উপাসনা করে, প্রতিরূপ অর্থাৎ অনুকূল বিষয়ই তাহাকে প্রাপ্ত হয়, কখনও অপ্রতিরূপ প্রাপ্ত হয় না, এবং ইহা হইতে অনুকূল বিষয়ই সংঘটিত হয় ॥ ৮৮ ॥ ৮ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অপ্সু রেতসি হৃদি চৈকা দেবতা; তস্যা বিশেষণম্ —প্রতিরূপঃ অনুরূপঃ শ্রুতিস্মৃত্যপ্রতিকূল ইত্যর্থঃ। ফলম্—প্রতিরূপং শ্রুতি- স্মৃতিশাসনানুরূপমেব এনমুপগচ্ছতি প্রাপ্নোতি, ন বিপরীতম্; অন্যচ্চ—অস্মাৎ তথাবিধ এবোপজায়তে ॥৮৮॥৮৷৷
টীকা।—প্রতিরূপত্বং প্রতিকূলত্বমিত্যেতদ্ব্যাবর্ত্তয়তি—অনুরূপ ইতি। অন্যচ্চ ফলমিতি সম্বন্ধঃ। অস্মাদুপাসিতুরিত্যর্থঃ। তথাবিধঃ শ্রুতিস্মৃত্যনুকূল ইতি যাবৎ। ৮৮।৮।
ভাষ্যানুবাদ।—জলে, শুক্রে ও হৃদয়ে একই দেবতা অবস্থিত; তাহার বিশেষণ—প্রতিরূপ; প্রতিরূপ অর্থ—অনুরূপ, অর্থাৎ শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্রের
অবিরোধী। ইহার ফল এই যে, প্রতিরূপ অর্থাৎ শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত শাসনের অনুরূপ ফলই প্রাপ্ত হয়, কখনও বিপরীত প্রাপ্ত হয় না; অধিকন্তু তাহার নিকট হইতে তাদৃশ পুরুষই উৎপন্ন হইয়া থাকে ॥৮৮৷৷
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়মাদর্শে পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি, স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ; রোচিকুরিতি বা অহমেতমুপাস ইতি। স য এতমেবমুপাস্তে, রোচিষ্ণুহ ভবতি, রোচিষ্ণুহাস্য প্রজা ভবতি, অথো যৈঃ সন্নিগচ্ছতি সর্ব্বাৎ স্তানতিরোচতে ॥ ৮৯ ॥ ৯॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং আদর্শে(আদর্শপদং খড়গাদীনামুপলক্ষকম্, তেন দর্পণ-খড়গাদৌ) পুরুষঃ, অহং এতম্ এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্(আদর্শাদ্যভিমানিনি পুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহং পুনঃ এতং রোচিষ্ণুঃ(দীপ্তিস্বভাবঃ) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবম্ উপাস্তে,[সঃ উপাসকঃ] রোচিষ্ণুঃ ভবতি, অন্য প্রজা রোচিষ্ণুঃ ভবতি; অথো(অপি) যৈঃ সহ সংনিগচ্ছতি(সংগতো ভবতি), তান্ সর্ব্বান্ অতিরোচতে(অতীত্য দীপ্যতে সর্ব্বাতিশায়ি-দীপ্তিমান্ ভবতীত্যর্থঃ) ॥৮৯৷৷৯৷৷
মূলানুবাদ?—সেই গার্গ্য বলিলেন—এই যে, দর্পণাদিস্থিত পুরুষ, ইহাকেই আমি ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি; সেই অজাতশত্রু বলিলেন—না না—এই বিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে রোচিষ্ণু(দীপ্তিশীল) বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে ব্যক্তি উক্তপ্রকারে ইহার উপাসনা করিয়া থাকে, সে নিজেও রোচিষ্ণু হইয়া থাকে, এবং তাহার সন্তানও রোচিষ্ণু হয়, অধিকন্তু সে ব্যক্তি যাহাদের সহিত সম্মিলিত হয়, তাহাদের সকলের অপেক্ষা অধিক দীপ্তিসম্পন্ন হয় ॥ ৮৯ ॥ ৯ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—আদর্শে প্রসাদস্বভাবে চান্যত্র খড়্গাদৌ, হাৰ্দ্দে চ সত্ত্বশুদ্ধিস্বাভাব্যে চ একা দেবতা; তস্যা বিশেষণম্—রোচিষ্ণুঃ দীপ্তিস্বভাবঃ; ফলঞ্চ তদেব; রোচনাধারবাহুল্যাৎ ফলবাহুল্যম্ ॥৮৯৷৷
টীকা।—হার্দ্দে চেত্যেতদেব স্পষ্টয়তি-সত্ত্বেতি। সর্ব্বত্রৈকেতি বিশেষণস্য দেবতেতি বিশেষ্যতয়া সম্বধ্যতে। তদেব রোচিষ্ণুত্বমিত্যর্থঃ। ৮৯। ৯।
ভাষ্যানুবাদ।—আদর্শে(দর্পণে) এবং স্বভাবনিৰ্ম্মল খড়্গপ্রভৃতিতে আর বিশুদ্ধ সত্ত্বপ্রধান হৃদয়েও একই দেবতা অবস্থিত; তাহার বিশেষণ— রোচিষ্ণু। রোচিষ্ণু অর্থ—স্বভাবসিদ্ধ দীপ্তিমান্; ফলও তাহার তদনুরূপই; দীপ্তির আশ্রয়বাহুল্য নিবন্ধন উপাসনা-ফলেও বহুত্ব উক্ত হইল ॥ ৮৯ ॥ ৯ ॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়ং যন্তং পশ্চাচ্ছব্দোহনূদেতি, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি, স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবদিষ্ঠাঃ; অসুরিতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে সর্ব্বং হৈবাস্মিল্লোক আয়ুরেতি, নৈনং পুরা কালাৎ প্রাণো জহাতি ॥ ৯০ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যন্তং(গচ্ছন্তং) পুরুষং অনু(লক্ষ্যী- কৃত্য) পশ্চাৎ(পশ্চাদ্ভাগে) যঃ এব অয়ং শব্দঃ উদেতি(উদগচ্ছতি), অহং এতম্(শব্দং) এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্ (যথোক্তে শব্দে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহং পুনঃ এতৎ অসুঃ(প্রাণঃ) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবম্ উপাস্তে,[সঃ উপাসকঃ] অস্মিন্ লোকে সর্ব্বম্ এব আয়ুঃ(সম্পূর্ণম্ আয়ুঃ—বর্ষশতম্) এতি(প্রাপ্নোতি), প্রাণঃ কালাৎ (কর্মফলভোগানুগতাৎ সময়াৎ) পুরা(অগ্রে) এনং(উপাসকং) ন জহাতি (পরিত্যজতি),(নাসৌ অকালে ম্রিয়তে ইত্যর্থঃ) ॥ ৯০॥ ১০॥
মূলানুবাদ?—পুনশ্চ গার্গ্য বলিলেন—মানুষ গমন করি- বার সময় তাহার পশ্চাতে যে, একরকম শব্দ উত্থিত হয়, আমি তাহা- কেই ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করিয়া থাকি; এ কথা শুনিয়া অজাত- শত্রু বলিলেন—না—না—এ বিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে ‘অসু’(প্রাণ) বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে ব্যক্তি এইরূপে ইহার উপাসনা করে, সে ব্যক্তি ইহলোকে সম্পূর্ণ আয়ু লাভ করে, এবং কর্ম্মভোগ শেষ হইবার পূর্ব্বে প্রাণ তাহাকে ত্যাগ করে না॥ ৯০॥ ১০॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যন্তং গচ্ছন্তং য এবায়ং শব্দঃ পশ্চাৎ পৃষ্ঠতোহ- নূদেতি, অধ্যাত্মঞ্চ জীবনহেতুঃ প্রাণঃ, তমেকীকৃত্যাহ; অসুঃ প্রাণঃ, জীবনহেতু- রিতি গুণঃ, তস্য ফলম্ সর্ব্বমায়ুরস্মিন্ লোকে এতীতি—যথোপাত্তং কর্ম্মণা আয়ুঃ,
কর্ম্মফলপরিচ্ছিন্নকালাৎ পুরা পূর্ব্বং রোগাদিভিঃ পীড্যমানমপ্যেনং প্রাণো ন জহাতি ॥ ৯০ ॥ ১০ ॥
টীকা।—আহৈতমেবাহমিত্যাদীতি শেষঃ। তস্য গুণবদুপাসনস্যেত্যর্থঃ। সর্ব্বমায়ুরিত্যে- তদ্ব্যাচষ্টে—যথোপাত্তমিতি। ৯০। ১০।
ভাষ্যানুবাদ।—গমনকারী ব্যক্তির পশ্চাতে যে একরকম শব্দ উত্থিত হয়, সেই শব্দ এবং জীবনের হেতুভূত অধ্যাত্ম প্রাণ, এই উভয়কে এক করিয়া এখানে ‘শব্দ’ বলা হইয়াছে। অসু অর্থ—প্রাণ, ‘জীবনহেতু’ কথাটি তাহার গুণ(বিশেষণ)। ইহলোকে সম্পূর্ণ আয়ু লাভ করা তাহার ফল। প্রাক্তন কর্ম্মানু- সারে যে পরিমাণ আয়ু তাহার নির্দিষ্ট আছে, কর্ম্মফলানুযায়ী সেই পরিমিত আয়ুষ্কালের পূর্ব্বে রোগাদি দ্বারা পীড্যমান হইলেও প্রাণ তাহাকে পরিত্যাগ করে না॥ ৯০॥ ১০॥
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়ং দিক্ষু পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মো- পাস ইতি, স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবদিষ্ঠাঃ, দ্বিতীয়োহনপগ ইতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেব- মুপাস্তে, দ্বিতীয়বান্ হ ভবতি, নাম্মাদগণশ্ছিদ্যতে ॥ ৯১ ॥ ১১ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং দিক্ষু পুরুষঃ, অহং এতম্ (দিগভিমানিপুরুষং) এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ—এত- স্মিন্(দিক্পুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহম্ এতৎ দ্বিতীয়ঃ অনপগঃ(অবিযুক্ত- স্বভাবঃ) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবম্(যথোক্তগুণযোগেন) উপাস্তে,[সঃ] দ্বিতীয়বান্(সদ্বিতীয়ঃ) ভবতি, অস্মাৎ(ইমং প্রাপ্য) গণঃ (স্বগণঃ) ন চ্ছিদ্যতে(বিচ্ছেদং অভাবং ন প্রাপ্নোতি)॥ ৯১ ॥ ১১ ॥
মূলানুবাদ?—সেই গার্গ্য পুনশ্চ বলিলেন—এই যে, দিক্- সমূহে অভিমানী পুরুষ, ইহাকেই আমি ব্রহ্মরূপে উপাসনা করিয়া থাকি। অজাতশত্রু বলিলেন—না—না—এ বিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে দ্বিতীয় ও অনপগ অর্থাৎ অবিযুক্তস্বভাব বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে কোন লোক উক্তপ্রকারে ইহার উপা- সনা করে, সে ব্যক্তিও দ্বিতীয়বান্(সহায়যুক্ত) হয়, কখনও তাহার স্বগণ-বিচ্ছেদ হয় না ॥ ৯১ ॥ ১১ ॥
শৈলকভ্যম্।—বিষ্ণু কর্ণয়োঃ হৃদি চৈকা দেবতা অশ্বিনৌ দেবাব-
৪৭৫
বিযুক্তস্বভাবৌ; গুণস্তস্য দ্বিতীয়বত্ত্বম্, অনপগত্বম্ অবিযুক্ততা চান্যোহন্তম্, দিশামশ্বিনোশ্চৈবংধর্মিত্বাৎ; তদেব চ ফলমুপাসকস্য—গণাবিচ্ছেদো দ্বিতীয়- বত্ত্বঞ্চ ॥৯১৷১১৷
টীকা।—কা পুনরসাবেকা দেবতা, তত্রাহ—অশ্বিনাবিতি। তস্য দেবস্যেতি যাবৎ। যথোক্তং গুণদ্বয়মুপপাদয়তি—দিশামিতি। দ্বিতীয়বত্ত্বং সাধুভৃত্যাদিপরিবৃতত্বম্। ৯১। ১১।
ভাষ্যানুবাদ।—দিক্সমূহে—কর্ণদ্বয়ে ও হৃদয়ে একই দেবতা। সেই দেবতা হইতেছেন অবিযুক্তস্বভাব অশ্বিনী-কুমারদ্বয়। সদ্বিতীয়ভাব ও অনপগত্ব অর্থাৎ পরস্পরের সহিত বিচ্ছিন্ন না হওয়া ইহার গুণ; কারণ, দিক্সমূহ ও অশ্বিনী-কুমারদ্বয়ের ইহাই স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম্ম; উপাসকও তদনুরূপ ফলই লাভ করিয়া থাকেন, কখনও তাহার স্বগণ-বিচ্ছেদ হয় না, এবং সদ্বিতীয়ভাবও নষ্ট হয় না, অর্থাৎ কখনও তাহার সহায়ের অভাব ঘটে না ॥৯১৷৷১১৷৷
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়ং ছায়াময়ঃ পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি। স হোবাচাজাতশত্রুৰ্ম্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ, মৃত্যুরিতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে, সর্ব্বং হৈবাস্মিল্লোক আয়ুরেতি, নৈনং পুরা কালান্মৃত্যুরাগচ্ছতি৷৯২৷৷১২
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং ছায়াময়ঃ পুরুষঃ, অহং এতম্ এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজ্ঞাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্(ছায়াপুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহম্ এতং মৃত্যুঃ ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবং উপাস্তে,[সঃ] অস্মিন্ লোকে(জগতি) সর্ব্বং(সমগ্রং) আয়ুঃ এতি; কালাৎ (কর্ম্মফলভোগাবচ্ছিন্নাৎ কালাৎ) পুরা(অগ্রে) মৃত্যুঃ এনং(উপাসকং) ন আগচ্ছতি(ন প্রাপ্নোতি) ॥৯২॥১২॥
মূলানুবাদ:-গার্য্য পুনরপি বলিলেন-এই যে ছায়াময় (ছায়াভিমানী) পুরুষ, আমি ইহাকেই ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করিয়া থাকি। অজাতশত্রু বলিলেন-না-না, এ বিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে মৃত্যু বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে ব্যক্তি ইহাকে এইরূপে উপাসনা করেন, তিনি ইহলোকে সম্পূর্ণ আয়ুঃ লাভ করেন, কখনও নির্দিষ্ট কালের পূর্ব্বে মৃত্যু ইহাকে আক্রমণ করে না, অর্থাৎ সে ব্যক্তি অকালে মরে না ॥ ৯২ ॥ ১২ ॥
শঙ্করভাষ্যম্।—ছায়ায়াং বাহে তমসি অধ্যাত্মং চাবরণাত্মকে
অজ্ঞানে হৃদি চৈকা দেবতা; তস্যা বিশেষণম্—মৃত্যুঃ; ফলং সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ; নৃত্যোরনাগমনেন রোগাদিপীড়াভাবো বিশেষঃ ॥৯২৷৷১২৷৷
টীকা।—শব্দব্রহ্মোপাসকস্যেব তমোব্রহ্মোপাসকস্যাপি ফলমিত্যাহ—ফলমিতি। ফলভেদা- ভাবে কথমুপাসনভেদঃ স্থাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—মৃত্যোরিতি। ৯২। ১২।
ভাষ্যানুবাদ।—ছায়াতে অর্থাৎ বহিঃস্থিত অন্ধকারে এবং দেহস্থ আবরণাত্মক অজ্ঞানে ও হৃদয়ে একই দেবতা অবস্থিত আছেন; মৃত্যু শব্দটি তাহার বিশেষণ। উপাসনার ফল সমস্তই পূর্ব্ববৎ; কেবল বিশেষ এই যে, মৃত্যুর অনুপস্থিতিতে রোগাদিজনিত পীড়াও তাহার ঘটে না(১) ॥৯২৷৷১২৷৷
স হোবাচ গার্গ্যো য এবায়মাত্মনি পুরুষঃ, এতমেবাহং ব্রহ্মোপাস ইতি। স হোবাচাজাতশত্রুৰ্মা মৈতস্মিন্ সংবধিষ্ঠাঃ, আত্মন্বীতি বা অহমেতমুপাস ইতি, স য এতমেবমুপাস্তে আত্মন্বী হ ভবত্যাত্মম্বিনী হাস্য প্রজা ভবতি, স হ তুষ্ণীমাস গার্গ্যঃ ॥৯৩৷৷১৩৷৷
সরলার্থঃ।—সঃ গার্গ্যঃ উবাচ হ—যঃ এব অয়ং আত্মনি(প্রজাপতৌ) পুরুষঃ, অহৎ এতম্ এব ব্রহ্ম উপাসে ইতি। সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতস্মিন্ (আত্মপুরুষে) মা মা সংবধিষ্ঠাঃ; অহম্ এতম্ আত্মন্বী(আত্মবান্) ইতি বৈ উপাসে ইতি। সঃ যঃ এতম্ এবম্ উপাস্তে,[সঃ] আত্মন্বী(আত্মবান্ বশ্যাত্মা শুদ্ধবুদ্ধিঃ) ভবতি হ;—অস্য প্রজা চ আত্মন্বিনী ভবতি হ। সঃ(গার্গ্যঃ) [এতৎ শ্রুত্বা] তৃষ্ণীম্ আস(অন্যৎ কিঞ্চিৎ বক্তুমশরুবন্ নিঃশব্দো বভূব)। হ-শব্দঃ(ঐতিহ্যে) ॥৯৩৷৷১৩৷৷
মূলানুবাদ।-গার্য্য পুনশ্চ বলিলেন—এই যে আত্মস্থ (বুদ্ধিস্থ) পুরুষ, আমি ইহাকেই ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করিয়া থাকি। অজাতশত্রু বলিলেন—না—না, এ বিষয়ে সংবাদ করিবেন না; আমি ইহাকে আত্মস্বী(আত্মবান্) বলিয়া উপাসনা করিয়া থাকি। যে ব্যক্তি যথোক্ত প্রকারে ইহার উপাসনা করেন, তিনিও আত্মস্বী(প্রশান্তাত্মা
বশীকৃতচিত্ত) হন, এবং তাহার সন্তানও প্রশস্তবুদ্ধিসম্পন্ন হয়। গার্গ্য [ইহার পর] তুষ্ণীভূত হইলেন ॥ ৯৩ ॥ ১৩ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—আত্মনি প্রজাপতৌ বুদ্ধৌ চ হৃদি চৈকা দেবতা; তস্যাঃ আত্মন্বী আত্মবানিতি বিশেষণম্; ফলম্—আত্মন্বী হ—ভবতি আত্মবান্ ভবতি, আত্মন্বিনী হাস্য প্রজা ভবতি, বুদ্ধিবহুলত্বাৎ প্রজায়াং সম্পাদনমিতি বিশেষঃ। স্বয়ং পরিজ্ঞাতত্বেনৈবং ক্রমেণ প্রত্যাখ্যাতেষু ব্রহ্মসু স গার্গ্যঃ ক্ষীণব্রহ্মবিজ্ঞানোহ- প্রতিভাসমানোত্তরস্তূষ্ণীম্ অবাক্শিরা আস ॥৯৩৷৷১৩৷৷
টীকা।—ব্যস্তানি ব্রহ্মাণ্যুপন্যস্য সমস্তং ব্রহ্মোপদিশতি-প্রজাপতাবিতি। আত্মবত্বং বন্যাত্মকত্বম্। ফলস্যাত্মগামিত্বান্ন প্রজায়াং তদভিধানমুচিতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-বুদ্ধীতি। ৯৩। ১৩।
ভাষ্যানুবাদ।—আত্মাতে অর্থাৎ সমষ্টিবুদ্ধিভূত প্রজাপতিতে এবং হৃদয়ে একই দেবতা অধিষ্ঠিত; তাহার বিশেষণ—আত্মনী। আত্মনী অর্থ—আত্মবান্, যাহার আত্মা—বুদ্ধি স্ববশে আসিয়াছে। উপাসনার ফল—উপাসক আত্মনী হয় —আত্মবান্ অর্থাৎ আত্মবশ্য হয়, এবং তাহার সন্তানও আত্মনী হয়। বুদ্ধির সংখ্যাবাহুল্য বশতঃ সন্তানেও আত্মবত্ত্ব ফল সম্পাদন করা অসম্ভব হয় না। গার্গ্য যথোক্তক্রমে যে সমস্ত ব্রহ্মের কথা বলিলেন, তৎসমস্তই অজাতশত্রুর পরিজ্ঞাত থাকায় ক্রমে প্রত্যাখ্যাত হইলে পর, গার্গ্যের ব্রহ্মবিজ্ঞান নিঃশেষ হইয়া গেল; তখন তিনি আর কোনও উত্তর দিতে সমর্থ হইলেন না, এবং অধোমুখ হইয়া চুপ করিয়া রহিলেন ॥৯৩৷৷১৩৷৷
স হোবাচাজাতশক্ররেতাবন্নু ৩ ইতি, এতাবদ্ধীতি, নৈতাবতা বিদিতং ভবতীতি, স হোবাচ গার্গ্য উপ ত্বা যানীতি ॥ ৯৪ ॥ ১৪॥
সরলার্থঃ।—[গার্য্যে তুষ্ণীভূতে সতি] সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ—এতা- বৎ নূ!(এতাবদেব ত্বদীয়ং ব্রহ্মবিজ্ঞানম্!) ইতি;[প্লুতত্বাৎ দৈর্ঘ্যম্]।[এব- মুক্তঃ গার্য্যঃ উবাচ—] এতাবৎ হি(এতাবদেব)[মম ব্রহ্মবিজ্ঞানমিত্যর্থঃ] ইতি।[তৎশ্রুত্বা অজাতশত্রুঃ আহ—] এতাবতা(এতাবন্মাত্রবিজ্ঞানেন) ন বিদিতং(বিজ্ঞাতং) ভবতি[ব্রহ্ম ইতি শেষঃ] ইতি।[এবমুক্তঃ] সঃ গার্য্যঃ উবাচ হ—ত্বা(ত্বাং) উপযানি(শিষ্যত্বেন উপগচ্ছেয়ম্)[অহমিতি শেষঃ] ইতি ॥৯৪॥১৪॥
মূলানুবাদ:-[গার্য্য এইরূপে নির্ব্বাক হইলে পর,] সেই অজাতশত্রু গার্য্যকে বলিলেন—এ পর্য্যন্তই ত! অর্থাৎ তোমার ব্রহ্ম-
বিজ্ঞান এখানেই পরিসমাপ্ত হইল কি?[তদুত্তরে গার্গ্য বলিলেন]- হাঁ, এই পর্য্যন্তই; ইহার অধিক আর আমার জানা নাই। অজাতশত্রু বলিলেন-শুধু এইমাত্র জ্ঞানেই ব্রহ্ম বিজ্ঞাত হয় না, অর্থাৎ তোমার যথোক্তপ্রকার বিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞানে যথেষ্ট নহে। গার্গ্য বলিলেন- আমি শিষ্যভাবে আপনার আশ্রয় লইতে ইচ্ছা করি ॥ ৯৪ ॥ ১৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তং তথাভূতমালক্ষ্য গার্গ্যং স হোবাচ অজাতশত্রুঃ— এতাবৎ নূ ৩ ইতি, কিমেতাবদ্ ব্রহ্ম নির্জ্ঞাতম্? অহোস্বিদধিকমপ্যস্তি? ইতি। ইতর আহ—এতাবদ্ধীতি। নৈতাবতা বিদিতেন ব্রহ্ম বিদিতং ভবতীত্যাহ অজাতশত্রুঃ—কিমর্থং গর্ব্বিতোহসি “ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি”। কিমেতাবদ্বিদিতং বিদিতমেব ন ভবতীত্যুচ্যতে? ন, ফলবদ্বিজ্ঞানশ্রবণাৎ; নচার্থবাদত্বমেব বাক্যা- নামবগন্তুং শক্যম্; অপূর্ব্ববিধানপরাণি হি বাক্যানি প্রত্যুপাসনোপদেশং লক্ষ্যন্তে —অতিষ্ঠাঃ সর্ব্বেষাৎ ভূতানামিত্যাদীনি; তদনুরূপাণি চ ফলানি সর্ব্বত্র শ্রয়ন্তে বিভক্তানি; অর্থবাদত্বে এতদসমঞ্জসম্। কথং তর্হি নৈতাবতা বিদিতং ভবতীতি? নৈষ দোষঃ, অধিকৃতাপেক্ষত্বাৎ—ব্রহ্মোপদেশার্থং হি শুশ্রূষবে অজাতশত্রবে অমুখ্য- ব্রহ্মবিদ্ গার্গ্যঃ প্রবৃত্তঃ; স যুক্ত এব মুখ্যব্রহ্মবিদা অজাতশত্রুণা অমুখ্যব্রহ্মবিদ্ গার্গ্যো বক্তুম্—যন্মুখ্যং ব্রহ্ম বক্তুৎ প্রবৃত্তত্ত্বম্, তন্ন জানীষ ইতি। যদ্যমুখ্যব্রহ্ম- বিজ্ঞানমপি প্রত্যাখ্যায়েত, তদা “এতাবতা” ইতি ন ক্রয়াৎ, ন কিঞ্চিজ্ঞাতং ত্বয়েত্যেবং ক্রয়াৎ। তস্মাত্তবন্তি এতাবন্তি অবিদ্যাবিষয়ে ব্রহ্মাণি; এতাবদ্বিজ্ঞান- দ্বারত্বাচ্চ পরব্রহ্মবিজ্ঞানস্য যুক্তমেব বক্তুম্—নৈতাবতা বিদিতং ভবতীতি। অবিদ্যাবিষয়ে বিজ্ঞেয়ত্বং নামরূপকর্মাত্মকত্বঞ্চৈষাং তৃতীয়েহধ্যায়ে প্রদর্শিতম্। তস্মাৎ “নৈতাবতা বিদিতং ভবতি” ইতি ক্রবতা জ্ঞাতব্যমস্তীতি দর্শিতং ভবতি; তচ্চ অনুপসন্নায় ন বক্তব্যমিত্যাচারবিধিজ্ঞো গার্গ্যঃ স্বয়মেবাহ—উপ ত্বা যানীতি —উপগচ্ছানীতি—ত্বাম্, যথান্যঃ শিষ্যো গুরুম্ ॥৯৪৷১৪৷
টীকা।—বিচারার্থা প্লুতিরিতি কথয়তি—কিমেতাবদিতি। বাক্যার্থং চোদ্যসমাধিভ্যাং স্ফুটয়তি—কিমিত্যাদিনা। আদিত্যাদেরবিদিতত্বনিষেধং প্রতিজ্ঞায় হেতুমাহ—ন ফলবদিতি। নৈতানি বাক্যানি ফলবদ্বিজ্ঞানপরাণ্যর্থবাদত্বাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন চেতি। ফলবত্ত্বাচ্চাপূর্ব্ববিধি- পরাণ্যেতানি বাক্যানীতাহ—তদনুরূপাণীতি। অর্থবাদত্বেহপি তেষামপূর্ব্বার্থত্বং কিং ন স্তাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—অর্থবাদত্ব ইতি। বাক্যানাং ফলবদ্বিজ্ঞানপরত্বমুপেত্য নিষেধবাক্যস্য গতিং পৃচ্ছতি—কথং তহীতি। তস্তানর্থক্যং পরিহরতি—নৈষ দোষ ইতি। অধিকৃতাপেক্ষত্বাদ্বেদন- প্রতিষেধস্তেত্যুক্তং: স্ফুটয়তি—ব্রহ্মেতি। নৈভাবতেত্যবিশেষেণামুখ্যব্রহ্মজ্ঞানমপি নিষিদ্ধমিতি
চেন্নেতাহ-যদীতি। নিষ্কামেন(৭) চেদেতান্যুপাসনানাস্যনুষ্ঠীয়ন্তে, তদৈতেষাং ব্রহ্মজ্ঞানার্থত্বাদমুখ্য- ব্রহ্মজ্ঞাননিষেধমন্তরেণ নিষেধোপপত্তিরিত্যাহ-এতাবদ্বিজ্ঞানেতি। আদিত্যাদিকমেষ মুখ্যং ব্রহ্মেতি নিষেধানর্থক্যং তদবস্তুমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অবিদ্যেতি। আদিত্যাদেরু মুখ্যব্রহ্মত্বাসম্ভবান্নিষেধ- স্যোপপন্নত্বাত্তৎসামর্থ্যসিদ্ধমর্থমুপন্যস্যতি-তস্মাদিতি। উপগমনবাক্যমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-তচ্চেতি।
“অব্রাহ্মণাদধ্যয়নমাপৎকালে বিধীয়তে। অনুব্রজ্যা চ শুশ্রূষা যাবদধ্যয়নং গুরোঃ॥ নাব্রাহ্মণে গুরৌ শিষ্যো বাসমাত্যন্তিকং বসেৎ” ইত্যাদীন্যাচারবিধিশাস্ত্রাণি। ৯৪। ১৪।
ভাষ্যানুবাদ।—সেই অজাতশত্রু উক্ত গার্গ্যকে তাদৃশ অবস্থাপন্ন দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—এতাবৎ নূ ৩! এই পর্য্যন্তই কি তোমার সম্পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞান? অথবা এতদতিরিক্ত আরও কিছু আছে? গার্গ্য বলিলেন—এই পর্য্যন্তই। অজাতশত্রু বলিলেন, শুধু এই পর্য্যন্ত জানিলেই ত ব্রহ্মকে জানা হয় না; তবে কেন ‘আমি তোমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিব’ বলিয়া গর্ব্ব প্রকাশ করিয়া- ছিলে। ভাল, তুমি কি বলিতেছ যে, এই পর্য্যন্ত বিজ্ঞান বিজ্ঞানই নয়? না, সে কথা বলিতেছি না; কেন না; উক্ত বিজ্ঞানসমূহেরও পৃথক্ পৃথক্ ফলশ্রুতি রহিয়াছে; উক্ত ফলবোধক বাক্যগুলিকে অর্থবাদ বা স্তুতিবাদ বলিয়াও গ্রহণ করা যাইতে পারে না; কারণ, প্রত্যেক উপাসনার উপদেশস্থলেই প্রমাণান্তরা- বিজ্ঞাত বিষয়ের উপদেশে বাক্যের তাৎপর্য্য পরিলক্ষিত হইতেছে, যথা— “অতিষ্ঠাঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাম্” ইত্যাদি। উপদেশের অনুরূপ পৃথক্ পৃথক্ ফলো- ল্লেখও সর্ব্বত্রই দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু উক্ত বাক্যগুলিকে ‘অর্থবাদ’ বলিলে এ সমস্ত বিষয় কখনই সুসঙ্গত হইতে পারে না।
ভাল কথা; তাহা হইলে “নৈতাবতা বিদিতং ভবতি” অর্থাৎ শুধু এই পর্য্যন্ত বিজ্ঞানেই ব্রহ্ম বিজ্ঞাত হয় না; এই কথা সঙ্গত হয় কিরূপে? না, ইহাতে দোষ হয় না; কারণ; ইহা হইতেছে অধিকৃত-সাপেক্ষ কথা; অভিপ্রায় এই যে, গার্গ্য নিজে অমুখ্য-ব্রহ্মবিৎ—পরব্রহ্মজ্ঞানরহিত হইয়াও শুশ্রূষু অজ্ঞাতশত্রুকে ব্রহ্মোপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন; কাজেই যথার্থ ব্রহ্মবিদ্যাবিশারদ অজাতশত্রু অমুখ্যব্রহ্ম- বিদ গার্গ্যকে অবশ্যই বলিতে পারেন যে, তুমি আমাকে, যে মুখ্য ব্রহ্মের উপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলে, প্রকৃত পক্ষে তুমি নিজেই তাহা জান না। আর এখানে যদি অমুখ্য ব্রহ্মবিজ্ঞানও প্রত্যাখ্যাত বা নিষিদ্ধ হইত, তাহা হইলে কখনই ‘এতাবতা’ বলিতেন না, পরন্তু তুমি কিছুই জান না, এইরূপই বলিতেন; অতএব বুঝিতে হইবে, গার্গ্য, যে সমস্ত ব্রহ্ম নির্দেশ করিয়াছেন; অবিদ্যাধিকারে সে
সমুদয়ও অবশ্যই ব্রহ্মরূপে পরিগ্রহণীয়, এবং তদ্বিষয়ক বিজ্ঞানও পরব্রহ্মবিজ্ঞান লাভের দ্বার বা উপায় স্বরূপ; সুতরাং শুধু ইহা দ্বারাই ব্রহ্ম-বিজ্ঞান লাভ হয় না বলা যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। বিশেষতঃ এ সমস্তও যে, বিজ্ঞেয় এবং নামরূপ-কর্মাত্মক, তাহা এই বৃহ- দারণ্যকেরই তৃতীয় অধ্যায়ে প্রদর্শন করা হইবে; অতএব ‘এই পর্য্যন্ত বিজ্ঞান- দ্বারা ব্রহ্ম জানা হয় না’ বলিয়া অজাতশত্রু জানাইলেন যে, এতদতিরিক্ত মুখ্য ব্রহ্ম জানিতে বাকী রহিয়াছে। গার্গ্য দেখিলেন যে, অনুপসন্ন অর্থাৎ শিষ্যভাবে উপস্থিত না হইলে তাহাকে ইহা বলা যাইতে পারে না; এই জন্য তিনি নিজেই বলিলেন—অপর শিষ্য যেরূপ গুরুর নিকট উপস্থিত হয়, আমিও তদ্রূপ আপনার নিকট উপস্থিত হইতেছি;[অতএব আমাকে সেই জ্ঞাতব্য ব্রহ্মতত্ত্ব উপদেশ দিন] ॥৯৪৷১৪৷ ১৪৮
স হোবাচাজাতশত্রুঃ প্রতিলোমং চৈতৎ, যদ্ ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয়মুপেয়াদ্—ব্রহ্ম মে বক্ষ্যতীতি, ব্যেব ত্বা জ্ঞপয়িষ্যামীতি, তং পাণাবাদায়োত্তস্থৌ, তৌ হ পুরুষং সুপ্তমাজগ্মতুঃ, তমেতৈ- র্নামভিরামন্ত্রয়াঞ্চক্রে—বৃহন্ পাণ্ডরবাসঃ সোম রাজন্নিতি, স নোত্তস্থৌ, তং পাণিনাপেষং বোধয়াঞ্চকার, স হোত্তস্থৌ ॥৯৫॥১৫॥
সরলার্থঃ।—সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ—প্রতিলোমং(বিপরীতং) চ এতৎ, যৎ ব্রাহ্মণঃ—মে(মহ্যং) ব্রহ্ম বক্ষ্যতি ইতি[কৃত্বা] ক্ষত্রিয়ং উপেয়াৎ (শিষ্যবৃত্ত্যা উপাগচ্ছেৎ);[অতঃ ত্বং আচার্য্য এব তিষ্ঠ; অহং] ত্বা(ত্বাং) জ্ঞপয়িষ্যামি(ব্রহ্ম উপদেক্ষ্যামি) এব ইতি।[এবম্ উক্ত্বা] তং(গার্গ্যং) পাণৌ আদায়(হস্তে ধৃত্বা) উত্তস্থৌ(উত্থিতবান্)।
তৌ(গার্গ্যাজাতশত্রু) সুপ্তং(নিদ্রিতং) পুরুষং আজগ্মতুঃ; তং(সুপ্তং পুরুষং) এতৈঃ বক্ষ্যমাণৈঃ গার্গ্যোক্তৈঃ বৃহত্ত্বাদিনামভিঃ আমন্ত্রয়াৎচক্রে(আকা- রিতবান্)[অজাতশত্রুঃ]—হে বৃহন্ পাণ্ডুরবাসঃ সোম রাজন্ ইতি। সঃ(সুপ্তঃ পুরুষঃ) ন উত্তস্থৌ(ন উত্থিতঃ); পাণিনা আপেষং(আপিষ্য আপিষ্য) বোধয়াং- চকার(বোধিতবান্); সঃ(সুপ্তঃ পুরুষঃ) উত্তস্থৌ হ ॥৯৫৷১৫৷৷
মূলানুবাদ?—সেই অজাতশত্রু বলিলেন—‘ইনি আমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিবেন’ এইরূপ মনে করিয়া ব্রাহ্মণ যে, ক্ষত্রিয়ের নিকট উপস্থিত হয়, ইহা প্রতিলোম অর্থাৎ আচারবিরুদ্ধ।[যাহা হউক], আমি
৪৮১
অবশ্যই তোমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিব। এই কথা বলিয়া তাহাকে হস্তে ধারণপূর্ব্বক উত্থিত হইলেন; তাঁহারা উভয়ে একজন সুপ্ত পুরুষের সমীপে গমন করিলেন। অজাতশত্রু সেই সুপ্ত পুরুষকে গার্যোক্ত ‘হে বৃহন্, পাণ্ডুরবাসঃ, সোম, রাজন্’ ইত্যাদি নামে আহ্বান করিতে লাগলেন, কিন্তু সে জাগরিত হইল না; তখন হস্ত দ্বারা পুনঃ পুনঃ ধাক্কা দিয়া জাগরিত করিলেন, তখন সে উঠিল ॥ ৯৫ ॥ ১৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—স. হোবাচ অজাতশত্রুঃ—প্রতিলোমং বিপরীতঞ্চৈতৎ। কিং তৎ? যৎ ব্রাহ্মণ উত্তমবর্ণ আচার্য্যত্বেহধিকৃতঃ সন্ ক্ষত্রিয়মনাচার্য্যস্বভাবম্ উপেয়াৎ উপগচ্ছেৎ শিষ্যবৃত্ত্যা—ব্রহ্ম মে বক্ষ্যতি ইতি; এতদাচারবিধিশাস্ত্রেযু নিষিদ্ধম্, তস্মাৎ তিষ্ঠ ত্বমাচার্য্য এব সন্; জ্ঞপয়িষ্যাম্যেব ত্বামহম্, যস্মিন্ বিদিতে ব্রহ্ম বিদিতং ভবতি, যত্তন্মুখ্যং ব্রহ্ম বেদ্যম্। তং গার্গ্যং সলজ্জমালক্ষ্য বিস্রম্ভজননায় ‘পাণৌ হস্তে আদায় গৃহীত্বা উত্তস্থৌ উত্থিতবান্। তৌ হ গার্গ্যাজাতশত্রু পুরুষং সুপ্তং রাজগৃহ-প্রদেশে কচিদাজন্মতুঃ আগতৌ। তং চ পুরুষং সুপ্তং প্রাপ্য এতৈর্নামভিঃ—বৃহন্ পাণ্ডুরবাসঃ সোম রাজন্—ইত্যেতৈঃ আমন্ত্রয়াঞ্চক্রে। এবমামন্ত্র্যমাণোহপি স সুপ্তো নোত্তস্থৌ। তমপ্রতিবুধ্যমানং পাণিনা আপেষং আপিষ্যাপিষ্য বোধয়াঞ্চকার প্রতিবোধিতবান্; তেন সহ উত্তস্থৌ। তস্মাদ যো গার্গ্যেণাভিপ্রেতঃ, নাসাবস্মিন্ শরীরে কর্তা ভোক্তা ব্রহ্মেতি। ১
টীকা।—আদিত্যাদিব্রহ্মভ্যো বিশেষমাহ—যস্মিন্নিতি। প্রাণস্য ব্যাপ্রিয়মাণস্যৈব সম্বোধনার্থং প্রযুক্তনামাশ্রবণাদাপেষণাচ্চোখানাত্তস্যাভোক্তৃত্বং সিধ্যতীতি ফলিতমাহ—অম্মাদিতি। ১
শাঙ্করভাষ্যম্।—কথং পুনরিদমবগম্যতে—সুপ্তপুরুষগমন-তৎসম্বোধনানু- খানৈর্গার্গ্যাভিমতস্য ব্রহ্মণোহব্রহ্মত্বং জ্ঞাপিতমিতি’? জাগরিতকালে যো গার্গ্যাভিপ্রেতঃ পুরুষঃ কর্তা ভোক্তা ব্রহ্ম, স সন্নিহিতঃ করণেষু যথা, তথা অজাত- শত্রুভিপ্রেতোহপি তৎস্বামী ভৃত্যেষ্বিব রাজা সন্নিহিত এব; কিন্তু ভৃত্যস্বামিনোঃ গার্গ্যাজাতশত্রুভিপ্রেতয়োঃ যদ্বিবেকাবধারণকারণম্, তৎ সঙ্কীর্ণত্বাদনবধারিত- বিশেষম্,—যৎ দ্রষ্টৃত্বমেব ভোক্তুঃ, ন দৃশ্যত্বম, যচ্চ অভোক্তৃদৃশ্যত্বমেব, ন তু দ্রষ্টৃত্বম্, তচ্চোভয়মিহ সঙ্কীর্ণত্বাদ্বিবিচ্য দর্শয়িতুমশক্যম্, ইতি সুপ্তপুরুষগমনম্। ২
টীকা।—তৌ হ সুপ্তমিত্যাদিসুপ্তপুরুষগত্যুক্তিমাক্ষিপতি—কথমিতি। গার্গ্যকাশ্যাভিম- তয়োরুভয়োরপি জাগরিতে করণেষু সন্নিধানাবিশেষাত্তত্রৈব কিমিতি বিবেকো ন দর্শিত ইত্যর্থঃ। জাগরিতে করণেষু দ্বয়োঃ সন্নিধানেহপি সাঙ্কর্য্যাদ্দুষ্করং বিবেচনমিতি পরিহরতি—জাগরিতেতি।
৩১
ব্রহ্মণস্বাদুর্দ্ধং সশব্দমধ্যাহৃত্য যোজনা। তর্হি স্বামিভৃত্যস্যায়েন ভয়োবিবেকোহপি সুকরঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—কিং দ্বিতি। কিং তদ্বিবেকাবধারণকারণং, তদাহ—যদ্রষ্টত্বমিতি। কথং তদনবধারিতবিশেষমিতি, তদাহ—তচ্চেতি। ইহেতি জাগরিতোক্তিঃ। ২/১০৬
শাঙ্করভাষ্যম্।—ননু সুপ্তেহপি পুরুষে বিশিষ্টৈর্নামভিরামন্ত্রিতো ভোক্তৈব প্রতিপৎস্যতে, নাভোক্তা—ইতি নৈব নির্ণয়ঃ স্যাদিতি। ন, নির্দ্ধারিতবিশেষত্বাদ গার্গ্যাভিপ্রেতস্য—যো হি সত্যেন চ্ছন্নঃ প্রাণ আত্মা অমৃতঃ বাগাদিঘনস্তমিতো নিম্নোচৎসু, যস্যাপঃ শরীরং—পাণ্ডরবাসাঃ যশ্চ অসপত্নত্বাৎ বৃহন্, যশ্চ সোমো রাজা ষোড়শকলঃ, স স্বব্যাপারারূঢ়ো যথানিজ্ঞাত এব অনন্তমিতস্বভাব আস্তে। ন চান্যস্য কস্যচিদ্ব্যাপারস্তস্মিন্ কালে গার্গ্যেণাভিপ্রেয়তে তদ্বিরোধিনঃ; তস্মাৎ স্বনামভিরামন্ত্রিতেন প্রতিবোধ্বব্যম্, ন চ প্রত্যবুধ্যত; তস্মাৎ পারিশেষ্যাৎ গার্গ্যাভিপ্রেতস্যাভোক্তৃত্বম্ ব্রহ্মণঃ। ৩
টীকা।—যদ্যপি জাগরিতং হিত্বা সুপ্তে পুরুষে বিবেকার্থং তয়োরুপগতিস্তত্র চ ভোক্তৈব সম্বোধিতঃ স্বনামভিস্তচ্ছন্দং শ্রোষ্যতি নাচেতনঃ, তথাপি নেষ্টবিবেকসিদ্ধির্গার্গ্যকাস্যাভীষ্টাত্মনোরু- খিতিসংশয়াদিতি শঙ্কতে—নন্বিতি। সংশয়ং নিরাকরোতি—নেত্যাদিনা। বিশেষাবধারণমেব বিশদয়তি—যো হীত্যাদিনা। স্বব্যাপারস্ত মূলশব্দাদিঃ। যথানিজ্ঞাতো যথোক্তৈবিশেষণৈরুপলব্ধং রূপমনতিক্রম্য বর্তমানঃ। প্রাণস্যোক্তবিশেষণবতঃ স্বাপেহবস্থানেহপি তস্য তদা ভোগাভাবঃ, তত্র ভোক্তুন্তরাভ্যুপগমাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন চেতি। তস্যৈব ভোক্তৃত্বে ফলিতমাহ—তস্মাদিতি। অস্ত তস্য প্রাণশব্দশ্রবণং, তত্রাহ—ন চেতি। পরিশেষসিদ্ধমর্থমাহ—তস্মাদিতি। ৩
শাঙ্করভাষ্যম্।—ভোক্তৃস্বভাবশ্চেৎ ভুঞ্জীতৈব স্বং বিষয়ং প্রাপ্তম্; ন হি দগ্ধস্বভাবঃ প্রকাশয়িতৃস্বভাবঃ সন্ বহ্নিঃ তৃণোলপাদি দাহ্যং স্ববিষয়ং প্রাপ্তং ন দহতি, প্রকাশ্যং বা ন প্রকাশয়তি। ন চেৎ দহতি প্রকাশয়তি বা প্রাপ্তং স্বং বিষয়ম্, নাসৌ বহ্নিদগ্ধা প্রকাশয়িতা বেতি নিশ্চয়তে; তথা অসৌ প্রাপ্তশব্দাদি- বিষয়য়োপলব্ধ স্বভাবশ্চেৎ গার্গ্যাভিপ্রেতঃ প্রাণঃ, বৃহন্ পাণ্ডরবাস ইত্যেবমাদিশব্দং স্বং বিষয়মুপলভেত—যথা প্রাপ্তং তৃণোলপাদি বহ্নিদহেৎ প্রকাশয়েচ্চ অব্যভি- চারেণ, তদ্বৎ। তস্মাৎ প্রাপ্তানাং শব্দাদীনাম্ অপ্রতিবোধাদভোক্তৃ স্বভাব ইতি নিশ্চীয়তে; ন হি যস্য যঃ স্বভাবো নিশ্চিতঃ, স তৎ ব্যভিচরতি কদাচিদপি; অতঃ সিদ্ধং প্রাণস্যাভোক্তৃত্বম্। ৪
টাকা।—প্রাণস্যাভোক্তৃত্বং ব্যতিরেকদ্বারা সাধয়তি—ভোকৃস্বভাবশ্চেদিতি। ন চ ভুঙক্তে, তস্মাদভোক্তেতি শেষঃ। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি—ন হীত্যাদিনা। উলপং বালতৃণম্। বিপক্ষে দোষমাহ—ন চেদিতি। উক্তমর্থং সংক্ষিপ্ত্যাহ—যথেত্যাদিনা। প্রাণস্যাভোক্তৃত্বমুক্তমুপসংহরতি— তস্মাদিতি। যদ্যপি প্রাণঃ স্বাপে শব্দাদীন্ন প্রতিবুধ্যতে, তথাপি ভোকৃস্বভাবে। ভবিষ্যতি, নেত্যাহ —ন হীতি। সম্বোধনশব্দাশ্রবণমতঃশব্দার্থঃ। ৪
শাঙ্করভাষ্যম্।—সম্বোধনার্থ-নামবিশেষেণ সম্বন্ধাগ্রহণাদপ্রতিবোধ ইতি চেৎ—স্যাদেতৎ,—যথা বহুঘাসীনেষু স্বনামবিশেষেণ সম্বন্ধাগ্রহণাৎ—মাময়ং সম্বোধয়তীতি শৃণ্বন্নপি সম্বোধ্যমানো বিশেষতো ন প্রতিপদ্যতে; তথেমানি বৃহন্নিত্যেবমাদীনি মম নামানীত্যগৃহীতসম্বন্ধত্বাৎ প্রাণো ন গৃহ্লাতি সম্বোধনার্থং শব্দম্, ন ত্ববিজ্ঞাতৃত্বাদেবেতি চেৎ; ন; দেবতাভ্যুপগমে অগ্রহণানুপপত্তেঃ। যস্য হি চন্দ্রাদ্যভিমানিনী দেবতা অধ্যাত্মং প্রাণো ভোক্তা অভ্যুপগম্যতে, তস্য তয়া সংব্যবহারায় বিশেষনাম্না সম্বন্ধোহবশ্যং গ্রহীতব্যঃ; অন্যথা আহ্বানাদিবিষয়ে সংব্যবহারোহনুপপন্নঃ স্যাৎ। ৫
• টীকা।—তস্য স্বনামাগ্রহণং সম্বন্ধাগ্রহণকৃতং, নানাত্মত্বকৃতমিতি শঙ্কতে—সম্বোধনার্থেতি। শঙ্কামেব বিশদয়তি—স্যাদেতদিত্যাদিনা। দেবতারাঃ সম্বন্ধাগ্রহণমযুক্তং সর্বজ্ঞত্বাদিত্যুত্তরমাহ —ন দেবতেতি। তদেব প্রপঞ্চয়তি—যস্য হীত্যাদিনা। তথেতি গ্রহণকর্তৃনির্দেশঃ। অবশ্যমিতি সূচিতামনুপপত্তিমাহ—অন্যথেতি। আদিপদেন যাগস্তুতিনমস্কারাদি গৃহ্যতে। সংব্যবহারোহভিজ্ঞাভোগপ্রসাদাদিঃ। ৫
শাঙ্করভাষ্যম্।—ব্যতিরিক্তপক্ষেহপি অপ্রতিপত্তেরযুক্তমিতি চেৎ,—যস্য চ প্রাণব্যতিরিক্তো ভোক্তা, তস্যাপি বৃহন্নিত্যাদিনামভিঃ সম্বোধনে বৃহত্ত্বাদিনাম্নাং তদা তদ্বিষয়ত্বাৎ প্রতিপত্তিযুক্তা, ন চ কদাচিদপি বৃহত্ত্বাদিশব্দৈঃ সম্বোধিতঃ প্রতিপদ্যমানো দৃশ্যতে। তস্মাৎ অকারণমভোক্তৃত্বে সম্বোধনাপ্রতিপত্তিরিতি চেৎ; ন, তদ্বতস্তাবন্মাত্রাভিমানানুপপত্তেঃ; যস্য প্রাণব্যতিরিক্তো ভোক্তা, সঃ প্রাণাদি- করণবান্ প্রাণী; তস্য ন প্রাণদেবতামাত্রেইভিমানঃ—যথা হস্তে; তস্মাৎ প্রাণ-নাম- সম্বোধনে কৃৎস্নাবি-মানিনো যুক্তৈবাপ্রতিপত্তিঃ; ন তু প্রাণস্যাসাধারণ-নাম- সংযোগে; দেবতাত্মত্বানভিমানাচ্চ আত্মনঃ। ৬
টাকা। -সম্বোধননামাগ্রহস্তৎকৃতানাত্মত্বদোষশ্চ ত্বদিষ্টাত্মনোহপি তুল্য ইতি শঙ্কতে- ব্যতিরিক্তেতি। সংগৃহীতং চোদ্যং বিবৃণোতি-যস্য চেতি। তদা সুষুপ্তিদশায়াং প্রতিপত্তিযুক্তেতি সম্বন্ধঃ। তদ্বিষয়ত্বাদিত্যতিরিক্তাত্মবিষয়ত্বাদিতি যাবৎ। অস্ত্যেবাতিরিক্তস্যাত্মনঃ সম্বোধনশব্দ- শ্রবণমিতি চেন্নেত্যাহ-নচ কদাচিদিতি। ত্বদিষ্টাত্মন: সম্বোধনশব্দাপ্রতিপত্তাবপিভোক্তৃত্বাঙ্গীকার- স্তচ্ছব্দার্থঃ। অভোক্তৃত্বে প্রাণস্যেতি শেষঃ। যথা হস্তঃ পাদোহঙ্গুলিরিত্যাদি-নামোক্তো মৈত্রো নোত্তিষ্ঠতি, সর্ব্বদেহাভিমানিত্বেন তন্মাত্রানভিমানিত্বাৎ, এবং কাশ্যেষ্টাত্মনঃ সর্ব্বকার্যকরণাভি- মানিত্বাদঙ্গুলিস্থানীয়প্রাণমাত্রে তদভাবাত্তন্নামাগ্রহণং, ন ত্বচেতনত্বাদিতি পরিহরতি-ন তদ্বত ইতি। তদেব স্ফুটরতি-যস্যেতি। প্রাণমাত্রে প্রাণাদিকরণবতোহভিমানাভাবে ফলিতমাহ- তস্মাদিতি। চন্দ্রস্যাপি প্রাণৈকদেশত্বাত্তন্নামভিঃ সম্বোধনে কৃৎস্নাভিমানী স নোত্তিষ্ঠতি। অত্রাপ্য- গুল্যাদিদৃষ্টান্তোপপত্তেরিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন দ্বিতি। গোত্ববৎ তস্য সর্ব্ববস্তুযু সমাপ্তেরহমিতি সর্ব্বত্রাভিমানসম্ভবাচ্চন্দ্রনামোক্তাবধি নাপ্রতিপত্তিযুক্তেত্যর্থঃ। প্রাণবচ্চিদাত্মনোহপি পূর্ণতয়া
সর্ব্বাত্মাভিমানসিদ্ধের্বোধাবোধৌ তুল্যাবিত্যাশঙ্ক্যাহ—দেবতেতি। বিশিষ্টস্যাত্মনো দেবতায়া- মাত্মত্বাভিমানাভাবাদিতরস্য চ কূটস্থজ্ঞপ্তিমাত্রত্বেন তদযোগান্ন তুল্যতেত্যর্থঃ। ৬
শাঙ্করভাষ্যম্।—স্বনাম-প্রয়োগেহপ্যপ্রতিপত্তিদর্শনাদযুক্তমিতি চেৎ,— সুষুপ্তস্য যৎ লৌকিকং দেবদত্তাদি নাম, তেনাপি সম্বোধ্যমানঃ কদাচিৎ ন প্রতিপদ্যতে সুষুপ্তঃ, তথা ভোক্তাপি সন্ প্রাণো ন প্রতিপদ্যত ইতি চেৎ; ন; আত্মপ্রাণয়োঃ সুপ্তাসুপ্তত্ববিশেষোপপত্তেঃ; সুষুপ্তত্বাৎ প্রাণগ্রস্ততয়োপরতকরণ আত্মা স্ব-নাম প্রযুজ্যমানমপি ন প্রতিপদ্যতে; ন তু তৎ অসুপ্তস্য প্রাণস্য ভোক্তৃতে উপরতকরণত্বং সম্বোধনাগ্রহণং বা যুক্তম্। ৭
টাকা। —প্রকারান্তরেণ প্রাণস্যাভোক্তৃত্বং বারয়ন্নাশঙ্কতে—স্বনামেতি। অযুক্তং প্রাণেতরস্য ভোক্তৃত্বমিতি শেষঃ। তদেব বিবৃণোতি—সুষুপ্তস্যেতি। বিশেষং দর্শয়ন্নুত্তরমাহ—নাত্মেতি। কানাভীষ্টাত্মনঃ সুপ্তত্ববিশেষপ্রযুক্তং ফলমাহ—সুষুপ্তত্বাদিতি। প্রাণস্যাপি সংহৃতকরণত্বাৎ স্বনামাগ্রহণমিত্যাশঙ্কা তস্যাসুপ্তত্বকৃতং কার্য্যং কথয়তি। ন ত্বিতি। নহি করণস্বামিনি ব্যাপ্রিয়মাণে করণোপরমঃ সম্ভবতি, তস্য চানুপরতকরণস্থ্য স্বভাবাগ্রহণমযুক্তমিত্যর্থঃ। ৭
শাঙ্করভাষ্যম্।—অপ্রসিদ্ধনামভিঃ সম্বোধনমযুক্তমিতি চেৎ,—সন্তি হি প্রাণবিষয়াণি প্রসিদ্ধানি প্রাণাদিনামানি; তান্যপোহ্য অপ্রসিদ্ধৈর্ব্ব হত্ত্বাদি-নামভিঃ সম্বোধনমযুক্তম্, লৌকিকন্যায়াপোহাৎ; তস্মাত্তোক্তরেব সতঃ প্রাণস্যাপ্রতিপত্তিরিতি চেৎ; ন; দেবতাপ্রত্যাখ্যানার্থত্বাৎ; কেবলসম্বোধনমাত্রাপ্রতিপত্যৈব অসুপ্ত- স্যাধ্যাত্মিকশ্য প্রাণস্যা ভোক্তৃত্বে সিদ্ধে, যৎ চন্দ্রদেবতাবিষয়ৈর্নামভিঃ সম্বোধনম্, তৎ চন্দ্রদেবতা প্রাণোহস্মিন্ শরীরে ভোক্তেতি গার্গ্যস্য বিশেষপ্রতিপত্তিনিরাকরণার্থম্; ন হি তৎ লৌকিকনাম্না সম্বোধনে শক্যং কর্তুম্। প্রাণপ্রত্যাখ্যানেনৈব প্রাণগ্রস্তত্বাৎ করণান্তরাণাং প্রবৃত্ত্যনুপপত্তের্ভোক্ত ত্বাশঙ্কানুপপত্তিঃ; দেবতান্তরাভাবাচ্চ। ৮
টীকা। -প্রাণনামত্বেনাপ্রসিদ্ধনামভিঃ সম্বোধনাৎ তদমুখানম্, নানাত্মত্বাদিতি শঙ্কতে- অপ্রসিদ্ধেতি। তদেব স্পষ্টয়তি-সস্তি হীতি। প্রসিদ্ধমনুদ্য অপ্রসিদ্ধং বিধেয়মিতি লৌকিকো ন্যায়ঃ। অপ্রসিদ্ধসংজ্ঞাভিঃ সম্বোধনস্যাযুক্তত্বে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। চন্দ্রদেবতাম্মিন্ দেহে কর্ত্রী ভোক্তী চাত্মেতি গার্গ্যাভিপ্রায়নিষেধে দেবতানামগ্রহস্য তাৎপর্য্যাৎ তদগ্রহোহর্থবানিতি পরিহরতি-ন দেবতেতি। তদেব প্রপঞ্চয়তি-কেবলেতি। প্রাণাদিনামভিঃ সম্বোধনেহপি তন্নিয়াকরণং কর্ত্তুং শক্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন হীতি। লৌকিকনায়ো দেবতাবিয়ত্বাভাবাদিত্যর্থঃ।
প্রাণহাভোক্তৃত্বেহপি ইন্দ্রিয়াণাং ভোকৃত্বমিতি কেচিৎ, তান্ প্রত্যাহ-প্রাণেতি। প্রাণ- করণচন্দ্রদেবতানামভোক্তৃত্বেহপি দেবতান্তরমত্র ভোক্ত স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-দেবান্তরাভাবাচ্চেতি। ভোক্তৃত্বাশঙ্কানুপপত্তিরিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ৮
শাঙ্করভাষ্যম্।—ননু ‘অতিষ্ঠাঃ’ ইত্যাদ্যাত্মন্বীত্যন্তেন গ্রন্থেন গুণবদ্দেবতা- ভেদস্য দর্শিতত্বাদিতি চেৎ; ন; তস্য প্রাণ এবৈকত্বাভ্যুপগমাৎ সর্ব্বশ্রুতিষু
৪৮৫
অরনাভিনিদর্শনেন, “সত্যেন চ্ছন্নঃ” “প্রাণো বাহমৃতম্” ইতি চ প্রাণবাহ্যস্যান্যস্য অনভ্যুপগমান্তোক্তঃ। “এষ উ হ্যেব সর্ব্বে দেবাঃ, কতম একো দেবঃ? ইতি, প্রাণঃ” ইতি চ সর্ব্বদেবানাং প্রাণএবৈকত্বোপপাদনাচ্চ। ৯
টীকা।—তত্রোপক্রমবিরোধং শঙ্কতে—নন্বিতি। দর্শিতত্বাদ্দেবতান্তরাভাবো নাস্তীতি শেষঃ। স্বতন্ত্রো দেবতাভেদো নাস্তীতি সমাধত্তে—ন তস্যেতি। প্রাণে দেবতাভেদস্যৈক্যে যুক্তিমাহ— অরনাভীতি। ন দেবতান্তরস্য ভোক্তৃত্বং, গার্গ্যস্য স্বপক্ষবিরোধাদিতি শেষঃ। সর্ব্বশ্রুতিধিত্যুক্তং, তাঃ সঙ্ক্ষেপতো দর্শয়তি—এষ ইতি। কতি দেবা যাজ্ঞবল্ক্যেত্যাদিনা সঙ্ক্ষেপবিস্তরাভ্যাং সর্ব্বেষাং দেবানাং প্রাণাত্মন্যেবৈকত্বমুপপাদ্যতে। অতো ন দেবতাভেদোহস্তীত্যাহ—সর্ব্ব- দেবানামিতি। প্রাণাৎ পৃথগ্ভুতস্য দেবস্যাত্মাতিরেকে সত্যসত্ত্বাপত্তেশ্চ প্রাণান্তর্ভাবঃ সর্ব্ব- দেবতাভেদস্যেতি বক্তুং চ-শব্দঃ। ৯ 1918
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা করণভেদেঘনাশঙ্কা, দেহভেদেঘিব স্মৃতিজ্ঞানেচ্ছাদি- প্রতিসন্ধানানুপপত্তেঃ। ন হি অন্যদৃষ্টম্ অন্যঃ স্মরতি জানাতি ইচ্ছাতি প্রতিসন্দধাতি বা; তস্মাৎ ন করণভেদবিষয়া ভোক্তৃত্বাশঙ্কা বিজ্ঞানমাত্রবিষয়া বা কদাচিদপ্যুপপদ্যতে। ১০
টীকা।—করণানামভোক্তৃত্বে হেত্বস্তরমাহ—তথেতি। দেবতাভেদেষিবেতি যাবৎ। অনাশঙ্কা ভোক্তৃত্বস্যেতি শেষঃ। তত্রোদাহরণান্তরমাহ—দেহভেদেধিবেতি। ন হি হস্তাদিষু প্রত্যেকং ভোক্তৃত্বং শক্যতে। তথা শ্রোত্রেণাত্রাদিঘপি ন ভোক্তৃশ্বাসঙ্কা যুক্তা। তেষু স্মৃতিরূপজ্ঞানস্যেচ্ছায়াঃ, যোহহং রূপমদ্রাক্ষং, স শব্দং শূণোমীত্যাদিপ্রতিসন্ধানস্য চাযোগাদিত্যর্থঃ। অনুপপত্তিমেব স্ফুটয়তি—ন হীতি। ক্ষণিকবিজ্ঞানস্য নিরাশ্রয়স্য ভোক্তৃত্বাশঙ্কাহপি প্রতিসন্ধানাসম্ভবাদেব প্রত্যুক্তেত্যাহ—বিজ্ঞানেতি। ১০
শাঙ্করভাষ্যম্।—ননু সঙ্ঘাত এবাস্তু ভোক্তা, কিং ব্যতিরিক্তকল্পনয়েতি। ন; আপেষণে বিশেষদর্শনাৎ; যদি হি প্রাণশরীর-সঙ্ঘাতমাত্রো ভোক্তা স্যাৎ, সঙ্ঘাতমাত্রাবিশেষাৎ সদা আপিষ্টস্য অনাপিষ্টস্য চ প্রতিবোধে বিশেষো ন স্যাৎ; সঙ্ঘাতব্যতিরিক্তে তু পুনর্ভোক্তরি সঙ্ঘাত-সম্বন্ধবিশেষানেকত্বাৎ পেষণাপেষণকৃত- বেদনায়াঃ সুখদুঃখমোহমধ্যমাধমোত্তমকর্মফলভেদোপপত্তেশ্চ বিশেষো যুক্তঃ; ন তু সঙ্ঘাতমাত্রে সম্বন্ধকর্মফলভেদানুপপত্তের্বিশেষো যুক্তঃ। ১১
টীকা। -প্রাণাদীনামনাত্মত্বমুক্ত। স্থূলদেহস্য তদ্বক্তং পূর্ব্বপক্ষয়তি-নন্বিতি। সঙ্ঘাতো ভূতচতুষ্টয়সমাহার: স্থূলো দেহ ইতি যাবৎ। গৌরোহহং পশ্যামীত্যাদিপ্রত্যক্ষেণ তস্যাত্মত্বদৃষ্টেরিতি ভাবঃ। প্রমাণভাবাদতিরিক্তকল্পনা ন যুক্তেত্যাহ-কিং ব্যতিরিক্তেতি। সঙ্ঘাতস্যাত্মত্বং দূষয়তি- নাপেষণ ইতি। বিশেষদর্শনং ব্যতিরেকদ্বারা বিশদয়তি-যদি হীতি। প্রাণেন সহিতং স্কুলং শরীরমেব সঙ্ঘাতস্তন্মাত্রো যদি ভোক্তা স্যাদিতি যোজনা। ত্বৎপক্ষেহপি কথং পেষণাপেষণয়ো- রুত্থানে বিশেষঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-সঙ্ঘাতেতি। তস্য সঙ্ঘাতেন সম্বন্ধবিশেষাঃ স্বকর্মারভ্যত্বা- স্বীয়ত্বস্বপ্রাণপরিপাল্যত্বাদয়ঃ, তেষামনেকত্বাৎ পেষণাপেষণয়োরিন্দ্রিয়োদ্ভবাভিভবকৃতবেদনায়াঃ
স্ফুটত্বাস্ফুটত্বাত্মকো বিশেষো যুক্তঃ, সুখদুঃখমোহানামুত্তমমধ্যমাধমকর্মফলানাং কর্ম্মোদ্ভবাভিভব- কৃতবিশেষসম্ভবাচ্চ যথোক্তো বিশেষঃ সম্ভবতীত্যর্থঃ। পরপক্ষেহপি তথৈব বিশেষঃ স্যাদিত্য- শঙ্ক্যাহ-ন ত্বিতি। নহি তত্র স্বকর্মারভ্যত্বাদয়ঃ সম্বন্ধবিশেষাঃ কৰ্ম্মফলভেদো বা যুচ্যতে, সঙ্ঘাতবাদিনাহতীন্দ্রিয়কৰ্মানঙ্গীকারাৎ। অতঃ সঙ্ঘাতমাত্রে ভোক্তরি প্রতিবোধে বিশেষা- সিদ্ধিরিতার্থঃ। ১১
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা শব্দাদিপটুমান্দ্যাদিকৃতশ্চ। অস্তি চায়ং বিশেষঃ—যস্মাৎ স্পর্শমাত্রেণাপ্রতিবুধ্যমানং পুরুষং সুপ্তং পাণিনা আপেষম্ আপিষ্যাপিষ্য বোধয়াঞ্চকার অজাতশত্রুঃ; তস্মাৎ য আপেষণেন প্রতিবুধে—জ্বলন্নিব স্ফুরন্নিব কুতশ্চিদাগত ইব পিণ্ডঞ্চ পূর্ব্ববিপরীতং বোধচেষ্টাকারবিশেষাদিমত্ত্বেণ আপাদয়ন্, সোহন্যোহস্তি গার্গ্যাভিমতব্রহ্মভ্যো ব্যতিরিক্ত ইতি সিদ্ধম্। ১২
টীকা।—শব্দস্পর্শাদীনাং পটুত্বমতিপটুত্বং মান্দ্যমতিমান্দ্যমিত্যেবমাদিনা কৃতো বিশেষো বোধে দৃশ্যতে, সোহপি সঙ্ঘাতবাদে ন সিধ্যতীত্যাহ—তথেতি। অযুক্ত ইতি যাবৎ। চকারো বিশেষানুকর্ষণার্থঃ। মা তর্হি প্রতিবোধে বিশেষো ভূদিত্যাশঙ্ক্যাহ—অস্তি চেতি। বিশেষদর্শন- ফলমাহ—তস্মাদিতি। আদিশব্দেন গুণাদি গৃহ্যতে। অন্যঃ সঙ্ঘাতাদিতি শেষঃ। ১২
শাঙ্করভাষ্যম্। —সংহতত্বাচ্চ পারার্থ্যোপপত্তিঃ প্রাণস্য। গৃহস্য স্তম্ভাদিবৎ শরীরস্য অন্তরুপষ্টম্বকঃ প্রাণঃ শরীরাদিভিঃ সংহত ইত্যবোচাম। অরনেমিবৎ চ, নাভিস্থানীয়-এতস্মিন্ সর্ব্বমিতি চ; তস্মাদ্গৃহাদিবৎ স্বাবয়বসমুদায়জাতীয়- ব্যতিরিক্তার্থং সংহন্যত ইত্যেবমবগচ্ছাম। ১৩
টাকা। —দেহাদেরনাত্মত্বমুক্ত। প্রাণস্যানাত্মত্বে হেত্বন্তরমাহ—সংহতত্বাচ্চেতি। হেতুং সাধয়তি —গৃহস্থ্যেতি। যথা নেমিররাশ্চ মিথঃ সংহন্যন্তে, তথৈব প্রাণস্য সংহতিরিত্যাহ—অরনেমিবচ্চেতি। কিং চ প্রাণে নাভিস্থানীয়ে সর্ব্বং সমর্পিতমিতি ক্রয়তে, তদ্যুক্তং তস্য সংহতত্বমিত্যাহ—নাভীতি। সংহতত্বফলমাহ—তস্মাদিতি। ১৩
শাঙ্করভাষ্যম্।—স্তম্ভকুড্যতৃণকাষ্ঠাদিগৃহাবয়বানাং স্বাত্মজন্মোপচয়াপচয়- বিনাশ-নামাকৃতি-কার্য্যধৰ্ম্মনিরপেক্ষ-লব্ধসত্তাদি-তদ্বিয়ষদ্রষ্টশ্রোতৃমন্ত, বিজ্ঞাত্রর্থত্বং দৃষ্ট্বা মন্যামহে—তৎসঙ্ঘাতস্য চ—তথা প্রাণাদ্যবয়বানাং তৎসঙ্ঘাতস্য চ- স্বাত্মজন্মোপচয়াপচর-বিনাশ-নামাকৃতিকার্য্যধর্ম্মনিরপেক্ষলব্ধ--সত্তাদি--তদ্বিষয়দ্রষ্টু- শ্রোতৃ-মন্ত-বিজ্ঞাত্রর্থত্বং ভবিতুমর্হতীতি। ১৪
টীকা।—প্রাণস্য গৃহাদিবৎ পারার্থ্যেহপি সংহতশেষিত্বমেষিতব্যং, গৃহাদেস্তথা দর্শনাদিত্যা- শঙ্ক্যাহ—স্তন্তেতি। স্বাত্মনাং স্তম্ভাদীনাং জন্ম চোপচয়শ্চাপচয়শ্চ বিনাশশ্চ নাম চাকৃতিশ্চ কার্য্যং চেত্যেতে ধর্ম্মান্তন্নিরপেক্ষতয়া লব্ধা সত্তা স্ফুরণং চ যেন, স চ তেষু স্তম্ভাদিষু বিষয়েষু দ্রষ্টা চ শ্রোতাচ মন্তা চ বিজ্ঞাতা চ, তদর্থত্বং তেষাং তৎসঙ্ঘাতস্য চ দৃষ্টা প্রাণাদীনামপি তথাত্বং ভবিতুম-- ইতীতিমন্যামহ ইতি সম্বন্ধঃ। প্রাণাদিঃ স্বাতিরিক্তদ্রষ্টৃশেষঃ সংহতত্বাৎ, গৃহাদিবৎ, ইত্যনুমানাৎ
সত্তায়াং তৎ প্রতীতো চ প্রাণাদিবিক্রিয়ানপেক্ষতয়া সিদ্ধো দ্রষ্টা নির্বিকারো যুক্তস্তস্য বিকারবত্ত্বে হেত্বভাবাদিতি ভাবঃ। ১৪
শাঙ্করভাষ্যম্।—দেবতাচেতনাবত্ত্বে সমত্বাৎ গুণভাবাহনুপগম ইতি চেৎ,— প্রাণস্য বিশিষ্টৈ-র্নামভিরামন্ত্রণদর্শনাৎ চেতনাবত্ত্বমভ্যুপগতম্; চেনাবত্ত্বে চ পারার্থ্যোপগমঃ সমত্বাদনুপপন্ন ইতি চেৎ; ন, নিরুপাধিকস্য কেবলস্য বিজিজ্ঞাপয়িষিতত্বাৎ। ১৫
টীকা।—প্রাণদেবতাপারার্থ্যানুমানং ব্যাপ্ত্যন্তরবিরুদ্ধমিতি শঙ্কতে—দৈবতেতি। প্রাণদেবতায়াশ্চনত্বমেব কথমভ্যুপগতং, তত্রাহ—প্রাণস্যেতি। তথাহপি প্রকৃতেহনুমানে কথং ব্যাপ্ত্যন্তরবিরোধস্তত্রাহ—চেতনাবত্ত্বে চেতি। যো যেন সমঃ স তচ্ছেষো ন ভবতি, যথা দীপো দীপান্তরেণ তুল্যো ন তচ্ছেষ ইতি ব্যাপ্তিবিরোধঃ স্যাদিত্যর্থঃ। নায়ং বিরোধঃ সমাধাতব্যঃ, শেষশেষিভাবস্যাত্রাপ্রতিপাদ্যত্বাদিতি পরিহরতি—ন নিরুপাধিকস্যেতি। ১৫
শাঙ্করভাষ্যম্।—ক্রিয়াকারকফলাত্মকতা হি আত্মনো নামরূপোপাধিজনিতা অবিদ্যাধ্যারোপিতা; তন্নিমিত্তো লোকস্য ক্রিয়াকারকফলাভিমানলক্ষণঃ সংসারঃ; স নিরুপাধিকাত্মস্বরূপবিদ্যয়া নিবর্ত্তয়িতব্যঃ—ইতি তৎস্বরূপবিজিজ্ঞাপয়িষয়া উপনিষদারম্ভঃ—“ব্রহ্ম তে ব্রবাণি” “নৈতাবতা বিদিতং ভবতি” ইতি চোপক্রম্য “এতাবদরে খবমৃতত্বম্” ইতি চোপসংহারাৎ; নচ অতোহন্যদন্তরালে বিবক্ষিত- মুক্তং বা অস্তি; তস্মাদনবসরঃ সমত্বাদ্গুণভাবানুপগম ইতি চোদ্যস্য। ১৬
টাকা।—তদেব স্ফুটয়তি—ক্রিয়েত্যাদিনা। উপনিষদারম্ভো নিরুপাধিকং স্বরূপং জ্ঞাপয়িতু- মিত্যত্র গমকমাহ—ব্রহ্মেতি। যে বাব ব্রহ্মণো রূপে মূর্ত্তং চৈবামুর্ত্তং চেত্যাদিদর্শনাদস্যামুপনিষদি সোপাধিকমপি ব্রহ্ম বিবক্ষিতমিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন চেতি। দ্বিত্ববাদস্য কল্পিতবিষয়বস্তান্নেতি নেতীতি নির্বিশেষবস্তুসমর্পণাদতোঽন্যদার্ত্তমিতি চোক্তেরত্র নিরুপাধিকমেব ব্রহ্ম প্রতিপাদ্যমিতি ভাবঃ। শেষশেষিভাবস্যাপ্রতিপাদ্যত্বে ফলিতমাহ—ভস্মাদিতি। ১৬
শাঙ্করভাষ্যম্।—বিশেষবতো হি সোপাধিকস্য সংব্যবহারার্থো গুণগুণিভাবঃ, ন বিপরীতস্য; নিরুপাখ্যো হি বিজিজ্ঞাপয়িষিতঃ সর্ব্বস্যামুপনিষদি, “স এষ নেতি নেতি” ইত্যুপসংহারাৎ। তস্মাদাদিত্যাদিব্রহ্মভ্য এতেভ্যোহবিজ্ঞানময়েভ্যো বিলক্ষণোহন্যোহস্তি বিজ্ঞানময় ইত্যেতৎ সিদ্ধম্ ॥ ৯৫ ॥ ১৭ ॥
টীকা। —কিমর্থং তর্হি শেষশেষিভাবস্তত্র তত্রোক্তস্তত্রাহ—বিশেষবতো হীতি। সোপাধিকস্য শেষশেষিভাবো বিবক্ষিতস্তত্র চ স্বামিভৃত্যন্যায়েন বিশেষসম্ভবাদসিদ্ধং সমত্বমিত্যর্থঃ। ন বিপরীতস্য নিরুপাধিকস্য শেষশেষিত্বমস্তীত্যত্র হেতুমাহ—নিরুপাখ্যো হীতি। শেষশেষিত্বাদ্যশেষবিশেষশূন্য ইত্যর্থঃ। পাণিপেষবাক্যবিচারার্থং সংক্ষিপ্তোপসংহরতি—আদিত্যাদীতি। ৯৫॥১৭॥
ভাষ্যানুবাদ।—সেই অজাতশত্রু বলিলেন—ইহা হইতেছে প্রতিলোম অর্থাৎ সদাচারবিরুদ্ধ। ইহা কি? উত্তম বর্ণ ব্রাহ্মণ আচার্য্য-কার্য্যে অধিকারী হইয়াও যে, স্বভাবতঃ অনাচার্য্য(আচার্য্য কার্য্যে যাহার অধিকার নাই), সেই
ক্ষত্রিয়ের নিকট শিষ্যরূপে ‘ইনি আমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিবেন’ বলিয়া উপস্থিত হওয়া; আচার-বিধায়ক শাস্ত্রে ইহা নিষিদ্ধ হইয়াছে। অতএব তুমি আচার্য্য-রূপেই থাক, আমি নিশ্চয় তোমাকে সেই বিজ্ঞের মুখ্য ব্রহ্মের উপদেশ দিব, যাহা অবগত হইলে সেই বিজ্ঞেয় মুখ্য ব্রহ্মকে জানিতে পারিবে। অজ্ঞাতশত্রু গার্গ্যকে সলজ্জ বুঝিতে পারিয়া তাঁহার আশ্বাসসমুৎপাদনার্থ তাঁহার পাণিতে—হস্তে হস্ত ধারণ- পূর্ব্বক গাত্রোত্থান করিলেন। তাঁহারা উভয়ে গার্গ্য ও অজাতশত্রু মিলিত হইয়া রাজভবনের অংশবিশেষে কোন এক সুপ্ত পুরুষের সমীপে সমাগত হইলেন। সেই সুপ্ত পুরুষের নিকট উপস্থিত হইয়া পূর্ব্বোক্ত বৃহন্, পাণ্ডরবাসঃ, সোম, রাজন্, এই সমস্ত নামে তাহাকে আমন্ত্রণ(আহ্বান) করিলেন; কিন্তু সেই সুপ্ত পুরুষ এই- রূপে আমন্ত্রিত হইয়াও গাত্রোত্থান করিল না। জাগরিত হইতেছে না, দেখিয়া তখন তাহাকে হস্ত দ্বারা বারংবার সঞ্চালন করিয়া বোধিত(জাগরিত) করিলেন; তাহার ফলে সেই সুপ্ত ব্যক্তি গাত্রোত্থান করিল। ইহা হইতে বুঝা গেল যে, গার্গ্য যাহাকে কর্তা ভোক্তা বলিয়া মনে করিয়াছিলেন, প্রকৃতপক্ষে এই দেহমধ্যে তাহা কখনই কর্তা ভোক্তা ও ব্রহ্ম নহে। ১
ভাল, ইহা কি প্রকারে বুঝা যাইতেছে যে, সুপ্ত পুরুষের সমীপে গমন, এবং তাহার সম্বোধন(আহ্বান) ও অনুত্থান দ্বারা গার্গ্যাভিপ্রেত ব্রহ্মের অব্রহ্মত্ব বিজ্ঞাপিত হইল?[উত্তর-] হাঁ, গার্গ্যাভিমত কর্তা ভোক্তা ব্রহ্ম পুরুষ যেরূপ জাগ্রদবস্থায় ইন্দ্রিয়বর্গের সহিত সম্মিলিত, অজাতশত্রুর অভিপ্রেত করণাধিপতি আত্মাও তদ্রূপ। রাজা যেমন ভৃত্যবর্গের সন্নিহিত থাকে, তেমনি আত্মাও করণ- সন্নিহিত থাকে সত্য; কিন্তু সে অবস্থায় গার্গ্যাভিপ্রেত ভৃত্যস্থানীয় আর অজ্ঞাত- শত্রুর অভিপ্রেত স্বামিস্থানীয় আত্মার যে-কারণে বিবেক বা পার্থক্য অবধারণ করা যাইতে পারে, তাহা স্থির করা যায় না; কারণ, তদবস্থায় আত্মা ইন্দ্রিয়বর্গের সহিত সংকীর্ণ বা পরস্পর সম্মিলিত হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, ভোক্তার যে দ্রষ্টৃত্ব ভিন্ন কখনও দৃশ্যত্ব নাই, আর অভোক্তারও যে, কেবল দৃশ্যত্ব ব্যতীত দ্রষ্টৃত্ব নাই, এই উভয়ই জাগ্রদবস্থায় পরস্পর সম্মিলিত থাকায় পৃথক্ করিয়া প্রদর্শন করা অসম্ভব হয়; এই জন্য তাহাদের সুপ্ত পুরুষসমীপে গমন করা আবশ্যক হইয়াছে। ২
ভাল কথা, সুপ্ত পুরুষের নিকট বিশেষ বিশেষ নামে যাহার আহ্বান করা হইয়াছে; তাহাকে যে ভোক্তা বলিয়াই বুঝিতে হইবে, অভোক্তা বলিয়া নহে, এরূপ ত নির্ণয় হইতেছে না? না,—এরূপ আশঙ্কাও হইতে পারে না; কারণ,
ইহা দ্বারা গার্গ্যের অভিপ্রেত আত্মার স্বরূপগত বিশেষ ধর্মও অবধারিত হইয়াছে, —যাহা পূর্ব্বোক্ত সত্য-সমাবৃত প্রাণ আত্মা ও অমৃতশব্দবাচ্য, এবং বাপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়বর্গ অস্তমিত বা নির্ব্যাপার হইলেও যাহা অনস্তমিত বা সব্যাপার থাকে, পাণ্ডরবাসঃ(শ্বেতবস্ত্র পরিহিত), জল যাহার শরীর, অসপত্ন বা নিঃশত্রু বলিয়া যাহা বৃহৎ, এবং যাহা ষোড়শ-কলাবিশিষ্ট সোমরাজ চন্দ্রস্বরূপ(দীপ্তিমান্), তাহা ত স্বীয় ব্যাপার সম্পাদনে ব্যাপৃত থাকিয়াও পূর্ব্ববিজ্ঞানানুসারে অনস্তমিত- ভাবেই বিদ্যমান আছে। সে সময়ে গার্গ্য যে, তদ্বিরুদ্ধ অন্য কাহারও ব্যাপার -বা ক্রিয়ানুষ্ঠানকে লক্ষ্য করিয়াছেন, তাহাও নহে; অতএব গার্গ্যাভিপ্রেত আত্মাই যদি দেহস্বামী হইত, তাহা হইলে, তাহার নাম ধরিয়া আহ্বান করায় নিশ্চয়ই তাহার জাগরিত হওয়া উচিত ছিল; অথচ তাহাতেও সে জাগরিত হয় নাই; অতএব বুঝা যাইতেছে যে, গার্গ্যের অভিপ্রেত ব্রহ্ম কখনই ভোক্তা নহে। ৩
গার্গ্যাভিপ্রেত ব্রহ্ম যদি স্বভাবতই ভোক্তা হইত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নিজের উপস্থিত বিষয় ভোগ করিত, অর্থাৎ ঐ সমস্ত নামে আহূত হইয়া অবশ্যই জাগরিত হইত; কেন না, স্বভাবতঃ দ্বাহ ও প্রকাশকারী অগ্নি আপনার দাহ্য তৃণাদি বস্তু প্রাপ্ত হইয়াও দগ্ধ করে না, কিংবা প্রকাশ্য বিষয়কে লাভ করিয়াও প্রকাশ করে না, এরূপ ত কখনও দেখিতে পাওয়া যায় না; পক্ষান্তরে, অগ্নি যদি স্ব-বিষয় প্রাপ্ত হইয়াও দগ্ধ না করে, কিংবা প্রকাশ না করে, তাহা হইলে অবশ্যই নিশ্চিত হয় যে, অগ্নি দাহকও নহে এবং প্রকাশকও নহে; সেইরূপ, উপস্থিত শব্দাদি বিষয় ভোগ করাই যদি গার্গ্যাভিমত প্রাণের স্বভাব হইত, তাহা হইলে নিজের উপভোগ্য(শ্রবণযোগ্য) বিষয় ‘বৃহন্ পাণ্ডরবাসঃ’ ইত্যাদি শব্দগুলিকে অবশ্যই উপলব্ধি করিত; বহ্নি যেরূপ উপস্থিত তৃণাদি বিষয়কে দগ্ধ ও প্রকাশ করিয়া থাকে, কখনও তাহার ব্যতিক্রম করে না, তদ্রূপ। অতএব উপস্থিত শব্দাদি বিষয় গ্রহণ না করায় নিশ্চয় হইতেছে যে, গার্গ্যাভিমত প্রাণ স্বভাবসিদ্ধ ভোক্তা নহে; কেননা, যাহার যাহা স্বভাব বলিয়া অবধারিত, সে কখনও আপনার সেই স্বভাব অতিক্রম করে না, বা করিতে পারে না; অতএব ইহা হইতেও গার্গ্যাভিপ্রেত প্রাণের অভোক্তৃত্বই সিদ্ধ হইল। ৪
যদি বল, সম্বোধনার্থ প্রযুক্ত নামগুলির সহিত সম্বন্ধ না হওয়ায় সুপ্ত পুরুষের নিদ্রা ভঙ্গ হয় নাই,[কিন্তু তাহার অভোক্তৃত্ব নিবন্ধন নহে]; অভিপ্রায় এই যে, যেমন একত্র উপবিষ্ট বহুলোকের মধ্যে কোন এক জনের নাম ধরিয়া ডাকিলেও
‘এ ব্যক্তি আমাকে ডাকিতেছে’ এইরূপ সম্বন্ধ গ্রহণ করিতে না পারায়[বুঝিতে না পারায়] সম্বোধ্যমান ব্যক্তি সেই শব্দ শুনিয়াও আপনার সম্বোধন বলিয়া বুঝিতে পারে না, তেমনি এখানেও ‘বৃহন্ পাণ্ডরবাসঃ’ প্রভৃতি নামগুলি আমার অর্থাৎ এইসমস্ত নামে আমায় সম্বোধন করিতেছে, এইরূপ বুঝিতে না পারায়, প্রাণ [প্রকৃত ভোক্তা হইয়াও] সম্বোধনার্থের অগ্রহণপ্রযুক্ত ঐ সমস্ত শব্দ গ্রহণ করে নাই, কিন্তু সে যে বিজ্ঞাতা নয় বলিয়াই গ্রহণ করে নাই, তাহা নহে; এ কথা যদি বল, তদুত্তরে বলি, না—তাহাও বলিতে পার না; কারণ, দেবত্বস্বীকার করায় নাম- গ্রহণের অভাব হইতেই পারে না; অর্থাৎ যাহার মতে চন্দ্রমণ্ডলাদির অভিমানী দেবতাবিশেষই অধ্যাত্মপ্রাণরূপে ভোক্তা বলিয়া স্বীকৃত হয়, তাহার মতে ত ব্যবহার নির্ব্বাহের জন্য সেই সেই দেবতার সহিতই বিশেষ বিশেষ নামের সম্বন্ধ স্বীকার করিতে হইবে; তাহা না হইলে আহ্বানাদি বিষয়ে লোকব্যবহারই অনুপপন্ন হইয়া পড়ে। ৫
আপত্তি হইতে পারে যে, ব্যতিরিক্ত পক্ষেও[প্রাণাতিরিক্ত ভোক্তা স্বীকার পক্ষেও] সম্বোধন-নামের অগ্রহণ যুক্তিবিরুদ্ধ হইতেছে-যে অজাতশত্রুর মতে প্রাণাতিরিক্ত পদার্থই ভোক্তা, তাহার মতেও ‘বৃহন্’ প্রভৃতি নামে সম্বোধন করি- বার পর, সেই ভোক্তৃবিষয়েই প্রযুক্ত ‘বৃহন্’ প্রভৃতি নাম উপলব্ধি করা ত উচিত ছিল; অথচ উক্ত ‘বৃহন্’ প্রভৃতি নামে সম্বোধন করিলে কখনও তাহা উপলব্ধি করিতে দেখা যায় না; অতএব সম্বোধন-শব্দ গ্রহণ না করা কখনই প্রাণের অভোক্তৃত্বের কারণ(জ্ঞাপক) হইতে পারে না। না-এরূপ আপত্তিও হইতে পারে না; কারণ, সর্ব্বাভিমানীর একদেশে(শুধু প্রাণমাত্রে) অভিমান থাকা কখনই সঙ্গত হয় না, অর্থাৎ অজাতশত্রু যাহাকে ভোক্তা বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন, সেই আত্মা হইতেছে প্রাণপ্রভৃতি সমস্ত দেহোপকরণের স্বামী-প্রাণী; কেবল প্রাণ- দেবতামাত্রে তাহার মমত্বাভিমান নাই; যেমন দেহাবয়ব হস্তমাত্রে দেহীর অভি- মান হয় না, তেমনি; এই জন্যই কেবল প্রাণনামে সম্বোধন করায় সর্ব্বাভিমানী আত্মার উপলব্ধি না হওয়া যুক্তিসঙ্গতই হইয়াছে; কিন্তু গার্গ্যাভিমত প্রাণের অসাধারণ বা মুখ্য নাম উচ্চারণেও জাগরিত না হওয়া কিছুতেই সঙ্গত হইতেছে না; বিশেষতঃ আত্মার দেবত্বাভিমান না থাকাও এ পক্ষে অযৌক্তিকতার অপর কারণ। ৬
যদি বল, নিজের নাম ধরিয়া ডাকিলেও যখন সময় সময় অপ্রতিবোধ বা জাগরিত না হওয়া দেখিতে পাওয়া যায়, তখন উক্তপ্রকার আপত্তি করা সঙ্গত
হইতেছে না। অভিপ্রায় এই যে, লোকপ্রসিদ্ধ যে, দেবদত্ত প্রভৃতি নাম, সে সমস্ত নাম ধরিয়া সম্বোধন করিলেও সময়বিশেষে সম্বোধ্যমান সুষুপ্ত ব্যক্তি যেরূপ প্রতি- বুদ্ধ হয় না, তদ্রূপ প্রাণ ভোক্তা হইয়াও স্বীয় সম্বোধন-শব্দ শুনিতে না পারায় অপ্রতিবুদ্ধ থাকিতে পারে? না,-এ কথাও হইতে পারে না; কারণ, আত্মা ও প্রাণের সুপ্তত্ব ও অসুপ্তত্বরূপ বৈলক্ষণ্য নিবন্ধনই পার্থক্য হইয়া থাকে, অর্থাৎ সুষুপ্তিসময়ে আত্মার ভোগোপকরণ ইন্দ্রিয়বর্গ সমস্তই প্রাণশক্তিদ্বারা কবলীকৃত হইয়া পড়ে; সুতরাং তৎকালে স্বীয় নাম উচ্চারিত হইলেও আত্মার পক্ষে তাহা গ্রহণ না করাই সম্ভবপর হয়; কিন্তু প্রাণের যখন সুষুপ্তি নাই, অথচ তখন সেই প্রাণই যদি ভোক্তা হয়, তাহা হইলে তাহার করণ-বিরতি কিংবা সম্বোধন শ্রবণ না করা কখনই যুক্তিযুক্ত হইতে পারে না। ৭
যদি বল, অপ্রসিদ্ধ নামে সম্বোধন করাটা যুক্তিসঙ্গত হয় নাই; অর্থাৎ প্রাণ- বাচক প্রাণপ্রভৃতি বহুতর নাম বিদ্যমান সত্ত্বেও সে সমস্ত প্রসিদ্ধ নাম পরিত্যাগ করিয়া ‘বৃহন্’ প্রভৃতি অপ্রসিদ্ধ নামে সম্বোধন করাটা যুক্তিসঙ্গত হয় নাই; কারণ, ইহাতে লোকপ্রসিদ্ধ নিয়ম পরিত্যাগ করা হইয়াছে; অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, প্রাণ ভোক্তা হইলেও এই কারণেই তাহার জাগরণ হয় নাই। না, একথাও হইতে পারে না; কারণ, গার্গ্যাভিমত চন্দ্রাদি দেবতার কর্তৃত্বাদি প্রত্যা- খ্যান করাই এই বাক্যের উদ্দেশ্য। অভিপ্রায় এই যে, সম্বোধন-শব্দের অশ্রবণেই আধ্যাত্মিক প্রাণের অভোক্তৃত্ব সিদ্ধ হইয়াছিল, তথাপি যে, চন্দ্র-দেবতাবাচক ঐ সকল নামে সম্বোধন করা হইয়াছে, তাহার একমাত্র তাৎপর্য্য এই যে, দেহে গার্গ্যাভিপ্রেত চন্দ্র-দেবতার ভোক্তৃত্ব নিরাকরণ করা; তাহা ত আর লোকপ্রসিদ্ধ প্রাণবাচক নামে সম্বোধন করিলে সুসম্পন্ন হইত না। এইরূপে প্রাণের ভোক্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করাতেই প্রাণগ্রস্ত অর্থাৎ প্রাণে বিলীন অপরাপর করণবর্গেরও ভোক্তৃত্বসম্ভাবনা পরিহৃত হইল; বিশেষতঃ চন্দ্রদেবতাভিন্ন অপর কোনও দেবতার ভোক্তৃত্ব স্বীকৃত না হওয়াতেও এ পক্ষে ভোক্তৃত্ব ব্যবস্থা উপপন্ন হইতেছে না। ৮
যদি বল, শ্রুতিবাক্যে যখন ‘অতিষ্ঠাঃ’ হইতে ‘আত্মন্বী’ পর্য্যন্ত বিশেষ বিশেষ গুণসম্পন্ন দেবতাবিশেষ প্রদর্শিত হইয়াছে, তখন অন্য দেবতারই বা ভোক্তৃত্ব সম্ভাবনা নাই কেন? না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, ‘অর-নাভির’ (রথচক্রগত শলাকাধার রন্ধ্রের) দৃষ্টান্ত দ্বারা সমস্ত শ্রুতিতে, প্রাণেই সমস্ত দেবতার একীভাব(বিলয়) স্বীকার করা হইয়াছে। বিশেষতঃ ‘সত্যদ্বারা আবৃত” এবং ‘প্রাণই একমাত্র অমৃত(মরণরহিত)’ ইত্যাদি শ্রুতিতেও প্রাণাতিরিক্ত
কোনও ভোক্তার সম্ভাব স্বীকৃত হয় নাই। ‘ইহাই সর্ব্বদেবতাস্বরূপ। সেই একটি দেবতা কে?—প্রাণ’, এই শ্রুতিতেও প্রাণেই সর্ব্বদেবতার একত্ব বা অভেদ উপপাদিত হইয়াছে। ৯
এইরূপ বিভিন্ন দেহের ন্যায় অপরাপর ইন্দ্রিয়াদিতেও ভোক্তৃত্বাশঙ্কা হইতে পারে না; কেন না, তাহা হইলে স্মরণ, জ্ঞান ও ইচ্ছাপ্রভৃতির অনুসন্ধানই হইতে পারে না(১); কারণ, অন্যের দৃষ্ট পদার্থ অন্যে কখনও স্মরণ, উপলব্ধি, কিংবা তদ্বিষয়ে ইচ্ছা বা অনুসন্ধান করিতে সমর্থ হয় না; অতএব চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয় কিংবা ক্ষণিক জ্ঞান সম্বন্ধেও ভোক্তৃত্বাশঙ্কা উৎপন্ন হইতে পারে না। ১০
ভাল, তাহা হইলে দৃশ্যমান দেহ-সঙ্ঘাতই ভোক্তা হউক? অতিরিক্ত ভোক্তা কল্পনা করিবার প্রয়োজন কি? না; যেহেতু আপেষণে(হস্তদ্বারা সঞ্চালনে) বিশেষ বা পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায়। যদি এই প্রাণ ও শরীর- সমষ্টিই ভোক্তা হইত, তাহা হইলে যখন তাহার কোন অবস্থাতেই বৈলক্ষণ্য নাই, তখন পাণিপেষণ করুক বা নাই করুক, জাগরণ সম্বন্ধে কখনই বৈলক্ষণ্য হইতে পারে না; কিন্তু ভোক্তা যদি দেহসঙ্ঘাতের অতিরিক্ত হয়, তাহা হইলেই সেই ভোক্তার সহিত সঙ্ঘাতের সম্বন্ধগত বৈচিত্র্য থাকায় পেষণ ও অপেষণজনিত বেদনানুভবের, সুখদুঃখানুভূতির ও মোহের উত্তমাধমভাবনিবন্ধন এবং কর্মফলেরও প্রভেদবশতঃ ঐরূপ বোধগত বৈচিত্র্য উৎপন্ন হইতে পারে; পক্ষান্তরে শুধু দেহ- সঙ্ঘাতের সহিত শব্দাদির সম্বন্ধ ও কর্মফলের প্রভেদ হওয়া অসম্ভব বলিয়াই জাগরণগত ঐ প্রকার প্রভেদ হওয়া যুক্তিযুক্ত হয় না। ১১
এইরূপ, শব্দাদির মৃদুতীব্রত্বাদিজনিত প্রভেদও বর্তমান রহিয়াছে—যেহেতু শুধু স্পর্শমাত্রে অপ্রতিবুদ্ধ সুপ্ত পুরুষকে অজাতশত্রু হস্তদ্বারা বারংবার আঘাত
(১) তাৎপর্য্য—ভিন্ন ভিন্ন দেহাবচ্ছিন্ন বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে যেরূপ একের দৃষ্ট পদার্থে অপরে স্মরণ বা ইচ্ছা করিতে পারে না, তদ্রূপ চক্ষুঃপ্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়কে কর্তা ভোক্তা বলিলেও, এক ইন্দ্রিয়ের অনুভূত বিষয় অপর ইন্দ্রিয় দ্বারা কখনই স্মরণীয় বা স্পৃহণীয় হইতে পারে না। মনে কর, একব্যক্তি প্রথমে যে চক্ষুদ্বারা যাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছে, ঘটনাক্রমে সেই চক্ষু নষ্ট হইয়া গেলে, সে আর সেই পূর্ব্বদৃষ্ট বস্তুটি স্মরণ করিতে পারে না; অথচ সকল দেশে ও সকল কালে সকলেই সেরূপ বস্তুর স্মরণ করিয়া থাকে। এইরূপে প্রত্যক্ষবিরুদ্ধ হয় বলিয়া ইন্দ্রিয়গণকে কর্তা ভোক্তা বলা যায় না; পরন্তু ইন্দ্রিয়ের অতীত নিত্য স্থির কোন একটি পদার্থকেই আত্মা বলিতে হয়। কাজেই গার্গ্যাভিমত কোন পদার্থই আত্মশ্রেণীভুক্ত হইতে পারিল না। এইরূপে বৌদ্ধসম্মত ক্ষণিক বিজ্ঞানকে কর্তা ভোক্তা বলিয়া স্বীকার করিলেও স্মরণাদি কার্য্যের অনুপপত্তি দোষ উপস্থিত হয়।
৪১৩
করিয়া জাগরিত করিয়াছিলেন, সেই হেতুই বুঝিতে হইবে যে, যাহা হস্তসঞ্চালনের ফলে প্রতিবুদ্ধ হইয়াছিল—যেন প্রজ্বলিত হইয়া, যেন স্ফুরিত হইয়া, অথবা অন্য কোনও প্রদেশ হইতে সমাগত হইয়া এবং যেন বোধ, চেষ্টা ও আকারাদিগত বৈচিত্র্য-সমাবেশ দ্বারা দেহটিকে পূর্ব্ববিপরীত(অচেতনায়মান দেহকে চেতনা- বিশিষ্ট) করিয়াই যেন জাগরিত হইয়াছিল, গার্গ্যাভিমত ব্রহ্মসমূহ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ তাদৃশ একটি ভোক্তার অস্তিত্ব সিদ্ধ হইল। ১২
অপিচ, সংহতত্ব নিবন্ধনও গার্গ্যাভিমত প্রাণের পরার্থত্ব বা পরাধীনত্ব উপপন্ন হইতেছে। গৃহের বিধারক স্তম্ভাদির ন্যায় শরীরধারক অভ্যন্তরস্থ প্রাণও যে, শরীরাদির সহিত সংহত বা সম্মিলিত, একথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। ইহার সংহতত্বপক্ষে ‘অর-নাভি’ এবং আরও দৃষ্টান্ত আছে; কারণ, শ্রুতিও বলিয়াছেন ‘রথচক্রের নাভিস্থানীয় এই প্রাণেই সমস্ত নিহিত আছে’। অতএব ইহা হইতে আমরা এইরূপই বুঝিতেছি যে, গৃহাদি যেরূপ নিজের অবয়বভূত অংশসমূহের অতিরিক্ত অপর কাহারও জন্য সংহত হইয়া থাকে, তদ্রূপ প্রাণও স্বীয় অবয়ব- সমুদয়ের অতিরিক্ত পৃথগ্ভূত অপর কোনও বস্তুর জন্য সম্মিলিত হইয়াছে। ১৩
স্তম্ভ, কুড্য(ভিত্তি), তৃণ ও কাষ্ঠ প্রভৃতি গৃহাবয়ব সমূহের জন্ম, বৃদ্ধি, অপচয়। (বিনাশ), নাম, আকৃতি, কার্য্য ও ধর্ম্মের(স্বভাব বা গুণাদির) অপেক্ষা না করিয়া যাহারা জন্মস্থিতি প্রভৃতি লাভ করিয়া থাকে, দেখিতে পাওয়া যায়, সেই গৃহাদি- সংহত পদার্থগুলিও তাদৃশ দ্রষ্টা, শ্রোতা ও অনুভবিতার উদ্দেশ্যেই স্থিতিলাভ করিয়া থাকে। এতদ্দর্শনে আমরা যেরূপ মনে করি, সেই গৃহাবয়বসমূহের অবস্থাও- তদনুরূপ; সেইপ্রকার প্রাণাদির অবয়বসমূহের এবং তৎসমষ্টিভূত পদার্থেরও এত- দতিরিক্ত এমন কোনও এক অসংহত পদার্থের উদ্দেশ্যে সংহত হওয়াই সমীচীন, ইহাদের জন্ম-নাশাদির সহিত তাহার কোনও সম্বন্ধ নাই(১)। ১৪
যদি বল, দেবতার চৈতন্য স্বীকার করিলে গুণগত সাম্য থাকায় তাহাদের
মধ্যে আর গুণভাব অর্থাৎ অন্যের প্রতি ভোগসাধনতা উপপন্ন হইতে পারে না। অভিপ্রায় এই যে, বিশেষ বিশেষ নাম ধরিয়া সম্বোধন করায় নিশ্চয়ই প্রাণের চেতনাবত্ত্ব(সচেতনভাব) স্বীকার করা হইয়াছে; যখন সচেতনত্বই স্বীকৃত হইয়াছে, তখন বলিতে হইবে যে, প্রাণদেবতার ন্যায় সকল দেবতাই তুল্যগুণ- সম্পন্ন—চেতন; সুতরাং উহাদের পরার্থত্ব সঙ্গত হইতে পারে না; না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, উপাধি-রহিত শুদ্ধ আত্মতত্ত্ব জ্ঞাপন করাই এখানে শ্রুতির অভিপ্রেত, গুণপ্রধানভাব নহে। ১৫
আত্মার যে, ক্রিয়া, কারক ও ফলাত্মকতা অর্থাৎ ক্রিয়াপ্রভৃতির সহিত আত্মার যে সম্বন্ধ, তাহা হইতেছে নাম-রূপাত্মক উপাধিজনিত; কাজেই সে সমস্ত অবিদ্যা দ্বারা আরোপিত এবং সেই অধ্যারোপই জীবগণের ক্রিয়া-কারক- ফলাভিমানাত্মক সংসারের একমাত্র কারণ। সর্ব্বোপাধিবিনির্ম্মুক্ত আত্মতত্ত্ব- বিজ্ঞানদ্বারা তাহার নিবৃত্তি সাধন করিতে হইবে; সেই উদ্দেশ্যেই এই উপনিষদের প্রারম্ভ হইয়াছে; কেন না, ‘আমি তোমাকে ব্রহ্মতত্ত্ব বলিব’ এবং ‘শুধু ইহাতেই ব্রহ্ম বিজ্ঞাত হন না’ এইরূপ বাক্যোপক্রম করিয়া উপসংহারে বলা হইয়াছে যে, ‘অরে অমৃতত্ব বা মুক্তির স্বরূপ এই পর্য্যন্তই’। উক্ত উপক্রম ও উপসংহারের মধ্যে যে, অন্য কোনও বিষয় বিবক্ষিত(শ্রুতির অভিপ্রেত) বা উক্ত আছে, তাহাও নহে; অতএব শক্তি-সাম্য নিবন্ধন গুণভাব বা পরার্থত্ব উপপন্ন হয় না; হয় -না বলিয়াই কোনরূপ আপত্তি উত্থাপন করিবারও সুযোগ ঘটিতেছে না। ১৬
বিশেষ-ধর্মসম্পন্ন সোপাধিক বস্তুরই লোক-ব্যবহার-নিষ্পত্তির জন্য গুণগুণি- ভাব(অঙ্গাঙ্গিভাব) হইয়া থাকে, কিন্তু তদ্বিপরীত—নিরুপাধিকের পক্ষে তাহা সম্ভবপর হয় না; অথবা সমস্ত উপনিষদের মধ্যে নিত্য নিরুপাখ্য অর্থাৎ নিব্বিশেষ ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদন করাই শ্রুতির অভিপ্রেত; কারণ, উপসংহারে ইহা ‘সেই আত্মা নহে’ ইত্যাদি বাক্যে নির্বিশেষের কথাই উল্লিখিত হইয়াছে। অতএব অবিজ্ঞানময়(জড়স্বভাব) যথোক্ত আদিত্যাদি ব্রহ্ম হইতে সম্পূর্ণ বিপরীত অন্য বিজ্ঞানময় আত্মারই অস্তিত্ব প্রমাণিত হইল ॥ ৯৫ ॥ ১৫ ॥
৪১৫
স হোবাচাজাতশত্রুর্যত্রৈষ এতৎ সুপ্তোহভূৎ য এষ বিজ্ঞান- ময়ঃ পুরুষঃ, কৈষ তদাভূৎ, কুত এতদাগাদিতি, তদু হ ন মেনে গার্গ্যঃ ॥ ৯৬ ॥ ১৬ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ অজাতশত্রুঃ উবাচ হ—যঃ এষঃ বিজ্ঞানময়ঃ(বিজ্ঞানং বুদ্ধিঃ, তৎপ্রধানত্বাৎ পুরুষঃ বিজ্ঞানময় উচ্যতে) পুরুষঃ, এষঃ যত্র (যস্মিন্ কালে) এতৎ(স্বপনং যথা স্যাৎ তথা) সুপ্তঃ অভূৎ, এষঃ তদা (তস্মিন্ স্বপ্নকালে) ক(কুত্র) অভূৎ(আসীৎ)? কুতঃ(কস্মাৎ স্থানাৎ বা) এতৎ(জাগরণং যথা স্যাৎ, তথা) আগাৎ(আগতঃ)? ইতি। [এবমুক্তঃ] গার্গ্যঃ তৎ(অজাতশত্রুপৃষ্টং) উ ন মেনে(ন জ্ঞাতবান্) হ (কিল)॥ ৯৬॥ ১৬॥
মূলানুবাদ:-অজাতশত্রু গার্গ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন- এই যে বিজ্ঞানময়-বুদ্ধিপ্রধান পুরুষ(আত্মা), ইনি যে সময় এইরূপে নিদ্রিত ছিলেন, তখন কোথায় ছিলেন; এবং কোথা হইতেই বা এইরূপে আসিলেন? গার্গ্য কিন্তু অজাতশত্রুর জিজ্ঞাসিত এই ‘বিষয় বুঝিতে পারিলেন না ॥ ৯৬ ॥ ১৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—স এবমজাতশত্রুব্যতিরিক্তাত্মাস্তিত্বং প্রতিপাদ্য গার্গ্যমুবাচ—যত্র যস্মিন্ কালে এষঃ বিজ্ঞানময়ঃ পুরুষঃ এতৎ স্বপনং সুপ্তঃ অভূৎ প্রাক্ পাণিপেষ-প্রতিবোধাৎ; বিজ্ঞানং—বিজ্ঞায়তেহনেনেত্যন্তঃকরণং বুদ্ধি- রুচ্যতে; তন্ময়ঃ তৎ-প্রায়ো বিজ্ঞানময়ঃ। কিং পুনস্তৎপ্রায়ত্বম্? তস্মিন্ন পলভ্যত্বম্, তেন চোপলভ্যত্বম্, উপলব্ধ ত্বং চ। ১.
কথং পুনর্ময়টোহনেকার্থত্বে প্রায়ার্থ তৈবাবগম্যতে? “স বা অয়মাত্মা ব্রহ্ম বিজ্ঞানময়ো মনোময়ঃ” ইত্যেবমাদৌ প্রায়ার্থ এব প্রয়োগদর্শনাৎ, পরবিজ্ঞান- বিকারত্বস্যা প্রসিদ্ধত্বাদ, “য এষ বিজ্ঞানময়ঃ” ইতি চ প্রসিদ্ধবদনুবাদাদ অবয়বোপ- মার্থয়োশ্চাত্রাসম্ভবাৎ পারিশেষ্যাৎ প্রায়ার্থতৈব; তস্মাৎ সঙ্কল্পবিকল্পাদ্যাত্মকমন্তঃ- করণম্, তন্ময় ইত্যেতৎ; পুরুষঃ পুরি শয়নাৎ। ২
কৈষ তদা অভূদিতি প্রশ্নঃ স্বভাববিজিজ্ঞাপয়িষয়া, —প্রাক্ প্রতিবোধাৎ ক্রিয়া- কারকফলবিপরীতস্বভাব আত্মেতি কাৰ্য্যাভাবেন দিদর্শয়িষিতম্। ন হি প্রাক্ প্রতিবোধাৎ কর্মাদি-কার্য্যং সুখাদি কিঞ্চন গৃহ্যতে; তস্মাদকৰ্ম্মপ্রযুক্তত্বাৎ তথাস্বা- ভাব্যমেবাত্মনোহবগম্যতে—যস্মিন্ স্বাভাব্যেহভূৎ, যতশ্চ স্বাভাব্যাৎ প্রচ্যুতঃ
সংসারী স্বভাববিলক্ষণ ইতি—এতদ্বিবক্ষয়া পৃচ্ছতি গার্গ্যং প্রতিভান-রহিতং বুদ্ধিভ্যুৎপাদনায়। ৩
‘কৈষ তদাহভূৎ কুত এতদাগাৎ’ ইত্যেতদুভয়ং গার্য্যেণৈব প্রষ্টব্যমাসীৎ;- তথাপি গার্য্যেণ ন পৃষ্টমিতি নোদাস্তে অজাতশত্রুঃ; বোধয়িতব্য এবেতি প্রবর্ত্ততে, জ্ঞাপয়িষ্যাম্যেরেতি প্রতিজ্ঞাতত্বাৎ। এবমসৌ ব্যুৎপাদ্যমানোহপি গার্য্যঃ-যত্রৈষ আত্মাভূৎ প্রাক্ প্রতিবোধাৎ, যতশ্চ এতদাগমনমাগাৎ-তদুভয়ং ন ব্যুৎপেদে বক্তৃৎ বা প্রষ্টুং বা-গার্য্যো হ ন মেনে ন জ্ঞাতবান্ ॥ ৯৬॥ ১৬॥
টাকা। -বৃত্তমনুদানন্তরগ্রন্থমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-স এবমিত্যাদিনা। এতৎ স্বপনং যথা ভবতি তপেতি যাবৎ। যত্রেত্যুক্তং কালং বিশিনষ্টি-প্রাগিতি। তদা কাভূদিতি সম্বন্ধঃ। বিজ্ঞানময় ইত্যত্র বিজ্ঞানং পরং ব্রহ্ম, তদ্বিকারো জীবস্তেন বিকারার্থে ময়ড়িতি কেচিৎ, তন্নিরাকরোতি- বিজ্ঞানমিতি। অন্তঃকরণপ্রায়ত্বমাত্মনো ন প্রকল্প্যতে, তস্যাসঙ্গস্য তেনাসম্বন্ধাদিত্যাক্ষিপতি- কিং পুনরিতি। অসঙ্গস্যাপাবিদ্যং বুদ্ধ্যাদিসম্বন্ধমুপেত্য পরিহরতি-তস্মিন্নিতি। তৎসাক্ষিত্বাচ্চ- তৎপ্রায়ত্বমিত্যাহ-উপলব্ধ ত্বং চেতি। ১
নিয়ামকাভাবং শঙ্কিত্বা পরিহরতি-কথমিত্যাদিনা। একস্মিন্নেব বাক্যে পৃথিবীময় ইত্যাদৌ প্রায়ার্থত্বোপলম্ভাবিজ্ঞানময় ইত্যত্রাপি তদর্থত্বমেব ময়টো নিশ্চিতমিত্যুক্তম্, ইদানীং জীবস্য পরমাত্মরূপবিজ্ঞানবিকারত্বস্য শ্রুতিমৃত্যের প্রসিদ্ধত্বাচ্চ প্রায়ার্থত্বমেবেত্যাহ-পরেতি। অপ্রসিদ্ধমপি বিজ্ঞানবিকারত্বং শ্রুতিবশাদিষ্যতামিত্যাশঙ্ক্যাহ-য এব ইতি। য এষ বিজ্ঞানময় ইত্যত্র বিজ্ঞানময়স্যৈব ইতি প্রসিদ্ধবদনুবাদাদপ্রসিদ্ধবিজ্ঞানবিকারত্বং সর্বনামশ্রুতিবিরুদ্ধ- মিত্যর্থঃ। জীবো ব্রহ্মাবয়বস্তৎসদৃশো বা, তদর্থো ময়ডিত্যাশঙ্ক্যাহ-অবয়বেতি। ব্রহ্মণো নিরবয়বত্বশ্রুতেস্তস্যৈব জীবরূপেণ প্রবেশশ্রবণাচ্চ প্রকৃতে বাক্যে ময়টোহবয়বাদ্যর্থাযোগান্নি- বিষয়ত্বাসম্ভবাচ্চ পারিশেষ্যাৎ পূর্ব্বোক্তা প্রায়ার্থতৈব তস্য প্রত্যেতব্যেত্যর্থঃ। বিজ্ঞানময়- পদার্থমুপসংহরতি-তন্মাদিতি। ২
যত্রেত্যাদি ব্যাখ্যায় বাক্যশেষমবতার্য্য তাৎপৰ্য্যমাহ-কৈষ ইতি। স্বরূপজ্ঞাপনার্থং প্রশ্ন- প্রবৃত্তিরিত্যেতৎ প্রকটয়তি-প্রাগিতি। কার্য্যাকারেণেত্যুক্তং ব্যনক্তি-ন হীতি। তন্মাদি- ভ্যস্তার্থমাহ-অকর্মপ্রযুক্তত্বাদিতি। কিং তথাম্বাভাব্যমিতি, তদাহ-যস্মিন্নিতি। দ্বিতীয়- প্রশ্নার্থং সংক্ষিপ্তপতি-যতশ্চেতি। ৩
উক্তেহর্থে প্রশ্নস্বরমুখাপরতি—এতদিতি। তথাস্বাভাব্যমেবেতি সম্বন্ধঃ। এতদিত্যধিকরণ- মপাদানং চ গৃহ্যতে। কিমিতি তং প্রত্যুভয়ং পৃচ্ছ্যতে? স্বকীয়াং প্রতিজ্ঞাং নির্ব্বোঢুমিত্যভি- প্রেত্যাহ—বুদ্ধীতি। ননু শিষ্যত্বাদগার্য্যেণৈব প্রষ্টব্যং, স চেদজ্ঞত্বান্ন পৃচ্ছতি, তর্হি রাজ্ঞস্তস্মিন্নৌ- দাসীন্যমেব যুক্তং, তত্রাহ—ইত্যেতদুভয়মিতি। তদু ইত্যাদি ব্যাকরোতি—এবমিতি। এতদাগমনং যথা ভবতি, তথেতি যাবৎ। তত্র ক্রিয়াপদয়োর্যধাক্রমং বক্তৃং প্রষ্টুং বেত্যাভ্যাং সম্বন্ধঃ। ১৬। ১৬।
ভাষ্যমুবাদ।—অঘাতক এইরূপে প্রাণাতিরিক আহার অস্তিত্ব প্রতি-
৪৬৭
পাদন করিয়া গার্গ্যকে বলিলেন—এই বিজ্ঞানময় পুরুষ যে সময়ে—পাণিপেষণে জাগরিত হইবার পূর্ব্বে এইরূপে নিদ্রিত ছিল, সে সময়ে এই পুরুষ কোথায় ছিল? বিজ্ঞান-শব্দে এখানে জ্ঞানসাধন অন্তঃকরণ—বুদ্ধি অভিহিত হইয়াছে; বিজ্ঞানময় অর্থ—তৎপ্রায় অর্থাৎ প্রায় তৎস্বরূপ। ভাল, ‘তৎপ্রায়’(বিজ্ঞানপ্রায়) কথার অর্থ কি?[উত্তর—] বুদ্ধিতে উপলব্ধ্য, বুদ্ধি দ্বারা উপলভ্য(উপলব্ধির বিষয়) এবং যাহাকে বুদ্ধি দ্বারা জানা যায়, ও যাহা বুদ্ধির সাহায্যে বিজ্ঞেয় বিষয় অবগত হয়,(তাহা), এই জন্য পুরুষকে বিজ্ঞানপ্রায়(বিজ্ঞানময়) বলা হয়। ১
জিজ্ঞাসা করি, “ময়ট্” প্রত্যয়ের বহু অর্থ সত্ত্বেও এখানে ‘প্রায়ার্থ’ গ্রহণ করা হইতেছে কেন?(১)[উত্তর—] যেহেতু ‘সেই এই ব্রহ্মরূপ আত্মা বিজ্ঞানময় ও মনোময়’ ইত্যাদি শ্রুতিতে প্রায়ার্থেই ময়ট্ প্রত্যয়ের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়; এবং পরবিজ্ঞানস্বরূপ আত্মার বিকার বা পরিণামও প্রসিদ্ধ নাই। বিশেষতঃ এখানে প্রসিদ্ধার্থবোধকের মত করিয়া এই ‘বিজ্ঞানময়’ শব্দটির ব্যবহার করায় এবং ‘অবয়ব’ ও ‘উপমা’ অর্থেরও এখানে সম্ভাবনা না থাকায়, ফলেফলে অবশিষ্ট প্রায়ার্থেরই গ্রহণ করিতে হইবে। অতএব বুঝিতে হইবে যে, বিজ্ঞান অর্থ সংকল্পবিকল্পধৰ্ম্মক অন্তঃকরণ; আত্মা তন্ময় বলিয়া ‘বিজ্ঞানময়’ পদ- বাচ্য। সেই আত্মাই আবার পুরে(বুদ্ধিতে) শয়ন(অবস্থান) করে বলিয়া ‘পুরুষ’ শব্দেও অভিহিত হইয়া থাকে। ২
সে সময় এই পুরুষ কোথায় ছিল? এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য—আত্মার প্রকৃত স্বরূপটি জ্ঞাপন করা,—জাগরণের পূর্ব্বে কোনপ্রকার কার্য্য না থাকায় আত্মা যে, ক্রিয়া কারক ও ফলের বিপরীতস্বভাব, তাহাও প্রদর্শন করা, ইহাই উক্ত প্রশ্নের অভিপ্রেত অর্থ; কেননা, জাগরণের পূর্ব্বে ক্রিয়াফল সুখদুঃখাদি কোন কিছুই লক্ষিত হয় না; অতএব কর্ম্ম-প্রযুক্ত বা কর্ম্মাধীন নয় বলিয়া, উহাই আত্মার প্রকৃত স্বভাব বলিয়া বুঝা যাইতেছে। তৎকালে যেরূপ স্বভাবে ছিল, এবং যেরূপ স্বভাব হইতে প্রচ্যুত হইয়া নিজের বিপরীত-স্বভাব সংসারধর্ম্ম-সম্পন্ন হইয়াছে,
૩૨
তাহা বুঝাইবার জন্যই, অপ্রতিভ গার্গ্যের প্রকৃত জ্ঞানোৎপাদনার্থ এই বাক্যের অবতারণা করিতেছেন। ৩
“ক এষ তদা অভূৎ?” এবং “কুতঃ এতদাগাৎ?” এই দুইটি প্রশ্ন করা গার্য্যেরই উচিত ছিল সত্য, কিন্তু গার্য্য তাহা করেন নাই; তথাপি অজাতশত্রু উপেক্ষা করিলেন না; এ বিষয়টি গার্য্যকে অবশ্যই বুঝাইতে হইবে, এই বিবে- চনায় তিনি নিজেই বুঝাইতে প্রবৃত্ত হইলেন; কারণ, অজাতশত্রু প্রতিজ্ঞা করিয়া- ছিলেন—আমি অবশ্যই তোমাকে বুঝাইয়া দিব; তদনুসারে তিনি নিজেই সে কার্য্যে প্রবৃত্ত হইলেন। অজাতশত্রু এইরূপ বুঝাইয়া দিলেও গার্য্য বুঝিতে পারি- লেন না যে, এই পুরুষ জাগরণের পূর্ব্বে কোথায় ছিল, এবং কোথা হইতেই বা আসিল,—এই দুইটি বিষয় জিজ্ঞাসা করিতে কিংবা প্রকাশ করিয়া বলিতে গার্য্যের বুদ্ধিস্ফূর্ত্তি হইল না ৷ ৯৬৷ ১৬৷
স হোবাচাজাতশত্রুর্যত্রৈষ এতৎ সুপ্তোহভূদ্ য এষ বিজ্ঞান- ময়ঃ পুরুষঃ, তদেষাং প্রাণানাং বিজ্ঞানেন বিজ্ঞানমাদায় য এষো- হন্তহৃদয় আকাশস্তস্মিঙ্গেতে, তানি যদা গৃহাত্যথ হৈতৎ পুরুষঃ স্বপিতি নাম, তগৃহীত এব প্রাণো ভবতি গৃহীতা বাক্ গৃহীতং চক্ষুগৃহীতশ্রোত্রং গৃহীতং মনঃ ॥ ৯৭ ॥ ১৭ ॥
সরলার্থঃ।—[ প্রতিজ্ঞাতার্থপ্রবোধনায়] সঃ অজাতশত্রুঃ[গার্গ্যং] উবাচ হ—যঃ এষঃ বিজ্ঞানময়ঃ পুরুষঃ(জীবঃ),[সঃ] এষঃ যত্র(যস্মিন্ কালে) -এতৎ(স্বপনং যথা স্যাৎ, তথা) সুপ্তঃ অভূৎ, তৎ(তদা)[এষঃ] বিজ্ঞানেন (অন্তঃকরণাধীন-বিশেষজ্ঞানেন সহ) এষাং প্রাণানাং(বাক্প্রভৃতীনাং) বিজ্ঞানং (স্বস্ববিষয়গ্রহণসামর্থ্যং) আদায়(গৃহীত্বা) যঃ এষঃ অন্তহৃদয়ে(হৃদয়মধ্যে) আকাশঃ(আকাশস্বভাবঃ পরঃ আত্মা), তস্মিন্(পরমাত্মনি) শেতে(বর্ত্ততে); যদা(যস্মিন্ কালে) তানি(বাগাদিবিজ্ঞানানি) গৃহ্লাতি(আদত্তে), অথ (তদা) হ(এব) পুরুষঃ এতৎ(যথা স্যাৎ, তথা) স্বপিতি নাম(স্বং রূপং অপীতি প্রাপ্নোতি ইতি ব্যুৎপত্যা স্বপিতি-নাম্না প্রসিদ্ধো ভবতি)। তৎ(তদা স্বাপকালে) প্রাণঃ(ঘ্রাণেন্দ্রিয়ং) গৃহীতঃ(উপসংহৃতঃ) এব ভবতি, তথা বাক্ গৃহীতা, চক্ষুঃ গৃহীতং, শ্রোত্রং গৃহীতম্, মনঃ[চ] গৃহীতং[ভবতীতি শেষঃ। তেদা সর্ব্বেন্দ্রিয়-ব্যাপারোপরমঃ ভবতীতি ভাবঃ] ॥ ৯৭ ॥ ১৭ ॥
মূলানুবাদ।—অজাতশত্রু নিজেই গার্গ্যকে বলিলেন—এই
৪১৯
বিজ্ঞানময় পুরুষ, যে সময়ে এতদবস্থায় সুপ্ত ছিল, সে সময়ে এই পুরুষ অন্তঃকরণোৎপন্ন বিশেষজ্ঞানের সহিত বাগাদি ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান গ্রহণ করত, এই যে, হৃদয়-মধ্যবর্তী আকাশ-পদবাচ্য পরমাত্মা, তন্মধ্যে অবস্থান করে। এই পুরুষ যে সময়ে সেই বিজ্ঞানসমুদয় গ্রহণ করে, সে সময়ে সে এইরূপে স্বীয় রূপ প্রাপ্ত হয় বলিয়া স্বপিতি নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সে সময়ে পুরুষকর্তৃক নিশ্চয়ই প্রাণ[ঘ্রাণেন্দ্রিয়] গৃহীত হয়, বাগিন্দ্রিয় গৃহীত হয়, চক্ষু গৃহীত হয়, শ্রবণেন্দ্রিয় গৃহীত হয়, এবং মনও গৃহীত হয় ॥ ৯৭ ॥ ১৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচ অজাতশত্রুঃ বিবিক্ষিতার্থসমর্পণায়। যত্রৈষ এতৎ সুপ্তোহভূৎ য এষ বিজ্ঞানময়ঃ পুরুষঃ,—“কৈষ তদা অভূৎ, কুত এত- দাগাৎ ইতি যদপৃচ্ছাম, তৎ শৃণু উচ্যমানম্—যত্রৈষ এতৎ সুপ্তোহভূৎ, তদা তস্মিন্ কালে এষাং বাগাদীনাং প্রাণানাং বিজ্ঞানেন অন্তঃকরণগতাভিব্যক্তবিশেষবিজ্ঞা- নেন উপাধিস্বভাবজনিতেন আদায় বিজ্ঞানং বাগাদীনাং স্বস্ববিষয়গতসামর্থ্যং গৃহীত্বা, য এষঃ অন্তৰ্ম্মধ্যে হৃদয়ে হৃদয়স্য আকাশঃ—যঃ আকাশশব্দেন পর এব স্ব আত্মোচ্যতে, তস্মিন্ স্বে আত্মন্যাকাশে শেতে স্বাভাবিকেহসাংসারিকে; ন কেবল আকাশ এব, শ্রুত্যন্তরসামর্থ্যাৎ—“সতা সোম্য তদা সম্পন্নো ভবতি” ইতি। লিঙ্গোপাধি-সম্বন্ধকৃতং বিশেষাত্মস্বরূপমুৎসৃজ্য অবিশেষে স্বাভাবিকে আত্মন্যেব কেবল বর্ত্তত ইত্যভিপ্রায়ঃ। ১
যদা শরীরেন্দ্রিয়াধ্যক্ষতামুৎসৃজতি, তদা অসৌ স্বাত্মনি বর্ত্তত ইতি কথমব- গম্যতে? নাম-প্রসিদ্ধ্যা; কাসৌ নামপ্রসিদ্ধিরিত্যাহ—তানি বাগাদিবিজ্ঞানানি যদা যস্মিন্ কালে গৃহ্নাতি আদত্তে, অথ তদা হ এতৎ পুরুষঃ স্বপিতিনাম এতন্নাম অস্য পুরুষস্য তদা প্রসিদ্ধং ভবতি; গৌণমেবাস্য নাম ভবতি,—স্বমেবা- ত্মানমপীতি অপিগচ্ছতীতি স্বপিতীত্যুচ্যতে। ২
সত্যং স্বপিতীতিনাম-প্রসিদ্ধ্যা আত্মনঃ সংসারধর্ম-বিলক্ষণং রূপমবগম্যতে, নতু অত্র যুক্তিরস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ—তৎ তত্র স্বাপকালে গৃহীত এব প্রাণো ভবতি, প্রাণ ইতি ঘ্রাণেন্দ্রিয়ম্, বাগাদিপ্রকরণাং; বাগাদিসম্বন্ধে হি সতি তদুপাধিত্বাদস্য সংসারধৰ্ম্মিত্বং লক্ষ্যতে; বাগাদয়শ্চোপসংহৃতা এব তদা তেন; কথম্? গৃহীতা বাক্, গৃহীতং চক্ষুঃ, গৃহীতং শ্রোত্রং, গৃহীতং মনঃ; তস্মাদুপসংহৃতেষু বাগাদিষু ক্রিয়াকারক-ফলাত্মতাভাবাৎ স্বাত্মস্থ এবাত্মা ভবতীত্যবগম্যতে ॥ ৯৭ ॥ ১৭ ॥
টাকা। -কুটস্থচিদেকরসোহয়মাত্মা তত্র ক্রিয়াকারকফলব্যবহারো বস্তুতো নাস্তীতি বিবক্ষিতোংর্থঃ, তস্য প্রকটীকরণার্থং প্রস্তুতং প্রশ্নদ্বয়মনুবদতি-যত্রেতি। উপাধিরন্তঃকরণং, তস্য স্বভাবগুডুপাদানমজ্ঞানং, তেন জনিতমন্তঃকরণগতমভিব্যক্তং বিশেষবিজ্ঞানং চৈতন্যাভাসলক্ষণং, তেন করণেনেত্যর্থঃ। বাগাদীনাং স্বস্ববিষয়গতং প্রতিনিয়তং প্রকাশনসামর্থ্যং বিজ্ঞানমিত্যর্থঃ। য এযোহস্তরিতি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে-মধ্য ইতি। আকাশশব্দস্য ভূতাকাশবিষয়ত্বমাশঙ্ক্যা- কাশোহর্থান্তরত্বাদিব্যপদেশাদিতি ন্যায়েনাহ-আকাশশব্দেনেতি। সদ্রূপে ব্রহ্মণ্যের সুষুপ্তস্য শয়নং ভূতাকাশে তু ন ভবতীত্যত্র ছান্দোগ্যশ্রুতিসম্মতিমাহ-শ্রুত্যন্তরেতি। কীদৃগত্র শয়নং বিবক্ষিতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-লিঙ্গেতি। স্বাপাধিকারে স্বাভাবিকত্বমবিদ্যামাত্রসংমিশ্রিতত্বং ‘সতি সম্পদ্য ন বিদুঃ’ ইত্যাদিশ্রুতেরিতি দ্রষ্টব্যম্। ১
তানি যদেত্যাদিবাকমাকাঙ্ক্ষাপূর্বকমাদত্তে-যদেত্যাদিনা। বিজ্ঞানানি তৎসাধনা- নীত্যেতৎ। পুরুষ ইতি প্রথমা ষষ্ঠ্যর্থে, অতো বক্ষ্যতি-অস্য পুরুষস্যেতি। অশ্বকর্ণাদিনায়ো বিশেষমাহ-গৌণমেবেতি। গৌণত্বং ব্যুৎপাদয়তি-স্বমেবেতি। নায়োহর্থব্যভিচারস্যাপি দৃষ্টদ্বান্ন তদ্বশাৎ স্বাপে স্বরূপাবস্থানমিতি শঙ্কামনুদ্য তদ্গৃহীত এবেত্যাদি বাক্যমুখাপ্য ব্যাচষ্টে- সত্যমিত্যাদিনা। কা পুনরাত্মনঃ স্বাপাবস্থায়ামসংসারিস্বরূপেহবস্থান মিত্যত্র যুক্তিরিহোক্তা ভবতি, তত্রাহ-বাগাদীতি। তদা সুষুপ্ত্যবস্থায়াং তেনাত্মনা চৈতন্যাভাসেন হেতুনেত্যর্থঃ। স্বাপে করণোপসংহারং বিবৃণোতি-কথমিত্যাদিনা। তদুপসংহারফলং কথয়তি-তস্মা- দিতি। ৯৭। ১৭।
ভাষ্যানুবাদ।—সেই অজাতশত্রু নিজের অভিপ্রেতার্থ প্রকাশনার্থ বলিলেন, এই বিজ্ঞানময় পুরুষ যে সময়ে এইরূপে সুপ্ত ছিল, ‘সে সময় এই পুরুষ কোথায় ছিল, এবং কোথা হইতে আসিল’? এই কথা যে, জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, তাহার উত্তর শ্রবণ কর; আমি বলিতেছি—যে সময় এই পুরুষ সুপ্ত ছিল, সে সময় বিজ্ঞানের সহিত অর্থাৎ অন্তঃকরণে বিষয়াভিব্যক্তিজনিত বিশেষজ্ঞানের সহিত বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণের বিজ্ঞান(বিষয়-গ্রহণে সামর্থ্য) গ্রহণ করিয়া, হৃদয়ের অভ্যন্তরে—মধ্যে এই যে আকাশ—আপনার স্বাভাবিক অসংসারী আত্মা, সেই আকাশে শয়ন(অবস্থান) করে। কেবল যে, আকাশেই শয়ন করে, তাহা নহে, পরন্তু ‘হে সোম্য সে সময় সৎস্বরূপ পরমাত্মার সহিত সম্পন্ন—একীভাবাপন্ন হয়’ এই শ্রুতিবাক্যানুসারে বুঝা যায় যে, লিঙ্গশরীররূপ উপাধির(১) সহিত সম্বন্ধ- নিবন্ধন আত্মার যে সবিশেষভাব ঘটিয়াছিল, তখন তাহা পরিত্যাগ করিয়া আপ- নার স্বভাবসিদ্ধ নির্বিশেষ বিশুদ্ধভাবেই অবস্থান করে। এখানে ‘আকাশ’ শব্দে স্বস্বরূপ পরমাত্মা অভিহিত হইয়াছে।।১
(১) তাৎপর্য্য—“পঞ্চপ্রাণ-মনোবুদ্ধিদশেন্দ্রিয়সমন্বিতম্। শরীরং সপ্তদশভিঃ সূক্ষ্মং তৎ লিঙ্গমুচ্যতে।” ইহার অর্থ—পঞ্চ প্রাণ(প্রাণ, অপান, সমান, ব্যান, উদান), মন, বুদ্ধি, পঞ্চ
৫০১
ভাল কথা, এই পুরুষ যে সময় শরীর ও ইন্দ্রিয়সমূহের অধ্যক্ষতা বা পরি- চালকতা পরিত্যাগ করে, সে সময় জীব যে, স্বীয় আত্মাতে মিলিত হয়, ইহা জানা যায় কিসে? হাঁ, নামপ্রসিদ্ধি অনুসারে। সেই প্রসিদ্ধ নামটি কি, তাহা বলিতেছেন—পুরুষ যে সময়ে সেই বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের বিজ্ঞান সমূহ সংগ্রহ করে—আপনাতে উপসংহার করে, তখন পুরুষের ‘স্বপিতি’ নাম হয়, অর্থাৎ তখন পুরুষ এই ‘স্বপিতি’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। ইহার এই নামটি নিশ্চয়ই গৌণ—যোগার্থ- মূলক; কেন না, সে সময় নিজেরই প্রকৃত স্বরূপ স্ব—আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে; এই জন্য তাহাকে ‘স্বপিতি’ বলা হয়[স্ব+অপীতি=স্বপিতি; পৃষোদরাদি নিয়মে ‘অ’ লোপ ও ঈকার হ্রস্ব]। ২
ভাল ‘স্বপিতি’ এইরূপ নামপ্রসিদ্ধি অনুসারে তৎকালে আত্মার যে সংসারধৰ্ম্ম- বিলক্ষণ অর্থাৎ অসংসারী স্বরূপ লাভ হয়, ইহা জানা যায় সত্য, কিন্তু এবিষয়ে ত কোনও যুক্তি দেখা যায় না, এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—সেই সুষুপ্তি সময়ে প্রাণ নিশ্চয়ই গৃহীত হয়(শক্তিহীন হয়)। বাগাদি ইন্দ্রিয়ের প্রকরণে পঠিত হওয়ায় এখানে ‘প্রাণ’ অর্থ—ঘ্রাণেন্দ্রিয়; প্রকৃত পক্ষে বাগাদি ইন্দ্রিয়ের সহিত সম্বন্ধ নিবন্ধনই আত্মার সংসারধর্ম প্রকাশ পাইয়া থাকে; সুষুপ্তি সময়ে সেই বাগাদি ইন্দ্রিয়গণ পুরুষকর্তৃক উপসংহৃত হইয়া থাকে। কি প্রকারে? না, বাগিন্দ্রিয় গৃহীত হয়, চক্ষু গৃহীত হয়, শ্রোত্র গৃহীত হয়, এবং মনও গৃহীত হয়। অতএব বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়নিচয় গৃহীত হওয়ায় ক্রিয়া কারক ও ফলাত্মক ব্যবহারও তখন থাকে না; কাজেই তখন পুরুষ স্বীয় আত্মস্বরূপে অবস্থিত হয় বুঝা যাইতেছে ॥ ৯৭॥ ১৭॥
স যত্রৈতৎ স্বপ্নয়া চরতি তে হাস্য লোকাস্তদুতেব মহারাজো ভবত্যুতেব মহাব্রাহ্মণ উতেবোচ্চাবচং নিগচ্ছতি, স যথা মহা- রাজো জানপদান্ গৃহীত্বা স্বে জনপদে যথাকামং পরিবর্ত্তেত, এবমেবৈষ এতৎ প্রাণান্ গৃহীত্বা স্বে শরীরে যথাকামং পরি- বর্ত্ততে ॥ ৯৮ ॥ ১৮ ॥
সরলার্থঃ।—[ ইদানীং স্বপ্নাবস্থায়া বিশেষং দর্শয়িতুমাহ—স যত্রেতি]। সঃ
(বিজ্ঞানময়ঃ পুরুষঃ) যত্র(যস্মিন্ কালে) স্বপ্নয়া(দর্শনাত্মিকয়া স্বপ্নবৃত্ত্যা চরতি(ব্যবহারতি), তৎ(তদা) অন্য(পুরুষস্য) হতে(জাগ্রদনুভবগোচরাঃ) লোকাঃ(ভোগাঃ, কৰ্ম্মফলানি)[যথা-] উত(অপি) মহারাজ ইব ভবতি, উত মহাব্রাহ্মণঃ(শ্রেষ্ঠব্রাহ্মণঃ) ইব ভবতি, তথা উত(অপি) উচ্চাবচং(উচ্চং উন্নতং-দেবাদিভাবং, অবচৎ অপকৃষ্টং পশ্বাদিভাবং) ইব চ নিগচ্ছতি(প্রাপ্নোতি)। [অত্র ইব-শব্দপ্রয়োগাৎ স্বপ্নদৃশ্য-মহারাজাদিভাবানাং মিথ্যাত্বং দর্শিতম্]। সঃ (প্রসিদ্ধঃ) মহারাজঃ যথা জানপদান(জনপদে রাষ্ট্রে ভবান্ ভোগান্) গৃহীত্বা (আদায়) স্বে(স্বকীয়ে) জনপদে(স্বাধিকৃতপ্রদেশে) যথাকামং(ইচ্ছানু- রূপং) পরিবর্ত্তেত(পরিভ্রমতি), এবং(তথা) এব এষঃ(স্বপ্নদর্শী পুরুষঃ) প্রাণান্(বাগাদীন্) গৃহীত্বা(জাগরিতস্থানেভ্যঃ প্রত্যাহৃত্য) স্বে(স্বকর্মলন্ধে) শরীরে যথাকামং পরিবর্ত্ততে;[স্বপ্লাবস্থায়াং বাগাদিকরণানাং ব্যাপারোপরমেহপি অন্তঃকরণং সব্যাপারমেব বর্ততে, সুষুপ্তৌ তু অন্তঃকরণস্যাপি ব্যাপারোপরম ইতি বিভেদঃ] ॥ ৯৮ ॥ ১৮॥
মূলানুবাদ।—সম্প্রতি, সুষুপ্তি ও স্বপ্নাবস্থার প্রভেদ প্রদর্শন করিতেছেন,—সেই বিজ্ঞানময় পুরুষ যে সময়ে[স্বপ্নাবস্থায়] বিচরণ করে, সে সময় তাহার জাগ্রদনুভূত ভোগস্থানগুলি উপসংহৃত হয়। যেমন—সে যেন মহারাজই হয়, যেন শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণই হয়, অথবা যেন উত্তমাধম ভোগ্য বিষয়ই প্রাপ্ত হয়। লোকপ্রসিদ্ধ মহারাজ যেরূপ রাষ্ট্রীয় ভোগ্য বস্তু সংগ্রহ করিয়া স্বীয় জনপদে যথেচ্ছ পরিভ্রমণ করেন, তদ্রূপ এই বিজ্ঞানময় পুরুষও নিজের বাগাদি ইন্দ্রিয়গণকে জাগরিত স্থান হইতে সংগৃহীত করিয়া স্বকর্মার্জিত শরীরের মধ্যে বিচরণ করিয়া থাকে। স্বপ্নাবস্থায় বাগাদি ইন্দ্রিয়ের কার্য্য স্থগিত থাকিলেও অন্তঃ- করণের কার্য্য চলিতে থাকে, কিন্তু সুষুপ্তি সময়ে সেই অন্তঃকরণের কার্য্যও স্থগিত হইয়া যায়। ইহাই উভয় অবস্থার প্রভেদ ॥ ৯৮ ॥ ১৮ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ননু দর্শনলক্ষণায়াং স্বপ্নাবস্থায়াং কার্য্যকরণবিয়োগেহপি সংসারধম্মিত্বমস্য দৃশ্যতে—যথা চ জাগরিতে সুখী দুঃখী বন্ধুবিযুক্তঃ শোচতি মুহতে চ; তস্মাৎ শোকমোহধর্মবানেবায়ম্; নাস্য শোকমোহাদয়শ্চ কার্য্যকরণসংযোগজনিত-ভ্রান্ত্যা অধ্যারোপিতা ইতি। ন, মৃষাত্বাৎ—সঃ প্রকৃত আত্মা যত্র যস্মিন্ কালে দর্শনলক্ষণয়া স্বপ্নুয়া স্বপ্নবৃত্ত্যা চরতি বর্ত্ততে,
৫০৩
তদা তে হ অন্য লোকাঃ কর্মফলানি-, কে তে? তৎ তত্র উত অপি মহারাজ ইব ভবতি; সোহয়ং মহারাজত্বমিবাস্য লোকঃ, ন মহারাজত্বমেব জাগরিত ইব; তথা মহাব্রাহ্মণ ইব; উত অপি, উচ্চাবচং-উচ্চঞ্চ দেবত্বাদি, অবচঞ্চ তির্য্যত্বাদি, উচ্চমিব অবচমিব চ নিগচ্ছতি; মৃষৈব মহারাজত্বাদয়োহস্য লোকাঃ, ইবশব্দ- প্রয়োগাৎ ব্যভিচারদর্শনাচ্চ; তস্মান্ন বন্ধুবিয়োগাদিজনিত-শোকমোহাদিভিঃ স্বপ্নে সম্বধ্যতএব। ১
ননু চ যথা জাগরিতে জাগ্রংকালাব্যভিচারিণো লোকাঃ, এবং স্বপ্নেহপি তে অস্য মহারাজত্বাদয়ো লোকাঃ স্বপ্নকালভাবিনঃ স্বপ্নকালাব্যভিচারিণ আত্মভূতা এব, ন তু অবিদ্যাধ্যারোপিতা ইতি,-নমু চ জাগ্রৎকার্য্যকরণাত্মত্বং দেবতাত্মত্বঞ্চ অবিদ্যাধ্যারোপিতম্, ন পরমার্থতঃ, ইতি ব্যতিরিক্তবিজ্ঞানময়াত্মপ্রদর্শনেন প্রদর্শিতম্; তৎ কথং দৃষ্টান্তত্বেন স্বপ্নলোকস্য, মৃত ইবোজ্জীবিষ্যন্ প্রাদুর্ভবিষ্যতি? সত্যম্, বিজ্ঞানময়ে ব্যতিরিক্তে কার্য্যকরণদেবতাত্মত্ব প্রদর্শনমবিদ্যাধ্যারোপিতম্- শুক্তিকায়ামিব রজতত্বদর্শনম্-ইত্যেতৎ সিধ্যতি ব্যতিরিক্তাত্মাস্তিত্বপ্রদর্শন- ন্যায়েনৈব; ন তু তদ্বিশুদ্ধিপরতয়ৈব ন্যায় উক্তঃ, ইতি-অসন্নপি দৃষ্টান্তো জাগ্রৎ- কার্য্যকরণদেবতাত্মত্বদর্শনলক্ষণঃ পুনরুদ্ভাব্যতে; সর্ব্বো হি ন্যায়ঃ কঞ্চিদ্বিশেষ- মপেক্ষ্যমাণোহপুনরুক্তীভবতি। ২/৭৭৭
ন তাবৎ স্বপ্নে অনুভূতমহারাজত্বাদয়ো লোকা আত্মভূতা আত্মনোহন্যস্য জাগ্রৎপ্রতিবিম্বভূতস্য লোকস্য দর্শনাৎ; মহারাজ এব তাবৎ ব্যস্তসুপ্তাসু প্রকৃতিষু পর্য্যঙ্কে শয়ানঃ স্বপ্নান্ পশ্যন্নুপসংহৃতকরণঃ পুনরুপগতপ্রকৃতিং মহারাজমিবাত্মানং জাগরিত ইব পশ্যতি—যাত্রাগতং ভুঞ্জানমিব চ ভোগান্। ন চ তস্য মহারাজস্য পর্য্যঙ্কে শয়নাৎ দ্বিতীয়োহন্যঃ প্রকৃত্যুপেতো বিষয়ে পর্যটন্নহনি লোকে প্রসিদ্ধো- হস্তি, যমসৌ সুপ্তঃ পশ্যতি। ন চোপসংহৃতকরণস্য রূপাদিমতো দর্শনমুপপদ্যতে; ন চ দেহে দেহান্তরস্য ততুল্যস্য সম্ভবোহস্তি, দেহস্থস্যৈব হি স্বপ্নদর্শনম্। ৩
ননু পর্য্যঙ্কে শয়ানঃ পথি প্রবৃত্তমাত্মানং পশ্যতি, ন বহিঃ স্বপ্নান্ পশ্যতীত্যেত- দাহ-সঃ মহারাজঃ জানপদান্ জনপদে ভবান্ রাজ্যোপকরণভূতান্ ভৃত্যানন্যাংশ গৃহীত্বা উপাদায় স্বে আত্মীয়ে এব জয়াদিনোপার্জিতে জনপদে যথাকামং-যো যঃ কামোহস্য যথাকামম্-ইচ্ছাতো যথা পরিবর্ততে ইত্যর্থঃ; এবমেব এষ বিজ্ঞান- ময়ঃ। এতদিতি ক্রিয়াবিশেষণম্, প্রাণান্ গৃহীত্বা জাগরিতস্থানেভ্য উপসংহৃত্য স্বে শরীরে স্ব এব দেহে ন বহিঃ, যথাকামং পরিবর্ততে-কামকৰ্ম্মভ্যামুদ্ভাসিতাঃ পূর্ব্বানুভূতবস্তুসদৃশীর্ব্বাসনা অনুভবতীত্যর্থঃ। তস্মাৎ স্বপ্নে মৃষাধ্যারোপিতা এবাত্ম-
ভূতত্বেন লোকা অবিদ্যমানা এব সন্তঃ; তথা জাগরিতেহপীতি প্রত্যেতব্যম্। তস্মাদ্বিশুদ্ধোহক্রিয়াকারকফলাত্মকো বিজ্ঞানময় ইত্যেতৎ সিদ্ধম্। যস্মাদৃশ্যন্তে দ্রষ্টুর্বিষয়ভূতাঃ ক্রিয়াকারকফলাত্মকাঃ কার্য্যকরণলক্ষণা লোকাঃ, তথা স্বপ্নেহপি; তস্মাদন্যোহসৌ দৃশ্যেভ্যঃ স্বপ্নজাগরিতলোকেভ্যো দ্রষ্টা বিজ্ঞানময়ো বিশুদ্ধঃ ॥ ৯৮ ॥ ১৮ ॥
টীকা।—অন্বয়ব্যতিরেকাভ্যাং বাগাদ্যুপাধিকমাত্মনঃ সংসারিত্বমুক্তং, তত্র ব্যতিরেকাসিদ্ধি- মাশঙ্কতে—নন্বিতি। ব্যতিরেকাসিদ্ধৌ ফলিতমাহ—তস্মাদিতি। স্বপ্নস্য রজ্জুসর্পবন্মিথ্যাত্বেন বস্তুধর্ম্মহাভাবান্নাত্মনঃ সংসারিত্বমিত্যুত্তরমাহ—ন মৃষাত্বাদিতি। তদুপপাদয়ন্নাদৌ স যত্রেত্যা- দীন্যক্ষরাণি যোজয়তি—স প্রকৃত ইত্যাদিনা। অথাত্র স্বপ্নস্বভাবো নিৰ্দ্দিশ্যতে, ন তস্য মিথ্যাত্বং কথ্যতে, তত্রাহ—মৃষৈবেতি। স্বপ্নে দৃষ্টানাং মহারাজত্বাদীনাং জাগ্রত্যনুবৃত্তিরাহিত্যং ব্যভিচার- দর্শনম্। স্বপ্নস্থ্য মিথ্যাত্বে সিদ্ধমর্থমাহ—তস্মাদিতি। ১
বিমতা লোকা ন মিথ্যা তৎকালাব্যভিচারিত্বাজ্জাগ্রলোকবদিতি শঙ্কতে-ননু চ যথেতি। সাধ্যবৈকল্যং বক্তুং সিদ্ধান্তী পাণিপেষবাক্যোক্তং স্মারয়তি-ননু চেতি। জাগ্রল্লোকস্য মিথ্যাত্বে ফলিতমাহ-তৎ কথমিতি। প্রাদুর্ভাবে জাগ্রল্লোকস্য কর্তৃত্বঃ প্রাকরণিকমেষ্টব্যম্। তত্র পূর্ব্ববাদী দৃষ্টান্তং সাধয়তি-সত্যমিত্যাদিনা। অন্বয়ব্যতিরেকাখ্যো ন্যায়ঃ। দেহদ্বয়স্যাত্মনশ্চ বিবেকমাত্রং প্রাগুক্তং, ন তু প্রাধান্যেনাত্মনঃ শুদ্ধিরুক্তেতি বিভাগমঙ্গীকৃত্য বস্তুতোহসন্তমপি দৃষ্টান্তং সন্তং কৃত্বা তেন স্বপ্নসত্যত্বমাশঙ্কা তন্নিরাসেনাত্যন্তিকী শুদ্ধিরাত্মনঃ স্বপ্নবাক্যেনোচ্যতে। তথা চ জাগ্রতোহপি তথা মিথ্যাত্বাদাত্মৈকরসঃ শুদ্ধঃ স্যাদিত্যাশয়বানাহ-ইত্যসন্নপীতি। পাণিপেষবাক্যে জাগ্রস্মিখ্যাত্বোক্ত্যাহর্থা দুক্তা শুদ্ধিরত্রাপি সৈৰোচ্যতে চেৎ, পুনরুক্তিরিতা- শঙ্ক্যাহ-সর্ব্বো হীতি। যৎকিঞ্চিৎ-সামান্যাৎ পৌনরুক্ত্যং সর্বত্র তুল্যম্। অবান্তরভেদাদ- পৌনরুক্ত্যং প্রকৃতেহপি সমং, পূর্ব্বত্র শুদ্ধিদ্বারস্থার্থিকত্বাদিহ বাচনিকত্বাদিতি ভাবঃ। ২
জাগ্রদ্দৃষ্টান্তেন স্বপ্নসত্যত্বচোদ্যসম্ভবাদ্বাচাস্তস্য সমাধিরিতি পূর্ববাদিমুখেনোক্ত। সমাধিমধুনা কথয়তি-ন তাবদিতি। বিমতা ন দ্রষ্টুরাত্মানো ধর্ম্মা বা তদ্দশ্যত্বাদ ঘটাদিবদিত্যর্থঃ। কিঞ্চ, স্বপ্নদৃষ্টানাং জাগ্রদ্দৃষ্টাদর্থান্তরত্বেন দৃষ্টেমিথ্যাত্বমিত্যাহ-মহারাজ ইতি। তেষাং জাগ্রদ্দষ্টা- দর্থান্তরত্বমসিদ্ধমিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। প্রমাণসামগ্রাভাবাচ্চ স্বপ্নস্য মিথ্যাত্বমিত্যাহ-ন চেতি। যোগ্যদেশাভাবাচ্চ তস্মিখ্যাত্বমিত্যাহ-ন চেতি। দেহাদ্বহিরের স্বপ্নদৃষ্ট্যঙ্গীকারাদ- যোগ্যদেশসিদ্ধিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-দেহস্থস্যেতি। ৩
এতদেব সাধয়িতুং শঙ্কতে-নম্বিতি। তত্র স যথেত্যাদিবাক্যমুত্তরত্বেনাবতার্য্য ব্যাচষ্টে- ন বহিরিত্যাদিনা। যথাকামং তং তং কামমনতিক্রম্যেত্যর্থঃ। এতদিতি ক্রিয়ায়া গ্রহণস্য বিশেষণম্, এতদ্গ্রহণং যথা ভবতি তথেত্যর্থঃ। পরিবর্তনমেব বিবৃণোতি-কামেতি। যোগ্য- দেশাভাবে সিদ্ধে সিদ্ধমর্থং দর্শয়তি-তস্মাদিতি। স্বপ্নস্য মিথ্যাত্বে তদ্দৃষ্টান্তত্বেন জড়ত্বাদিহেতুনা জাগরিতস্যাপি তথাত্বং শক্যং নিশ্চেতুমিত্যাহ-তথেতি। দ্বয়োমিথ্যাত্বে প্রতীচো বিশুদ্ধিঃ সিদ্ধেত্যুপসংহরতি-তস্মাদিতি। অক্রিয়াকারকফলাত্মক ইতি বিশেষণং সমর্থয়তে-যন্মা-
দিতি। জাগরিতং দৃষ্টান্তীকৃত্য দাষ্টান্তিকমাহ—তথেতি। দ্রষ্টদৃশ্যভাবে সিদ্ধে ফলিতমাহ— তস্মাদিতি। অন্যত্বফলং কথয়তি—বিশুদ্ধ ইতি। ৯৮। ১৮।
ভাষ্যানুবাদ।—পুরুষ জাগ্রদবস্থায় যেমন সুখী দুঃখী হয়, এবং বন্ধু- বিযুক্ত হইয়া শোক-মোহান্বিত হয়, ঠিক তেমনি বিষয়ানুভূতিযুক্ত স্বপ্নাবস্থায়ও দেহেন্দ্রিয়াদির ব্যাপার বিরত থাকিলেও সংসারধর্ম্ম সুখদুঃখাদির সম্বন্ধ অব্যাহতই দেখিতে পাওয়া যায়; অতএব শোক মোহাদি ধর্ম্মই পুরুষের স্বাভাবিক, উক্ত শোক-মোহাদি ও সুখদুঃখাদি ধর্ম্মগুলি কখনই দেহেন্দ্রিয়-সংযোগজনিত ভ্রান্তি- মূলক নহে। না, একথাও হইতে পারে না; যেহেতু পুরুষের ঐজাতীয় সুখ- দুঃখাদি ধর্ম্মগুলি মিথ্যা অসত্য;—এই আলোচ্য আত্মা যে সময়ে স্বপ্নবৃত্তি অব- লম্বনপূর্ব্বক অবস্থান করে, তখন তাহার সেই সমস্ত লোক কর্ম্মফল,—সে সমস্ত লোক কি কি?[তাহা বলিতেছেন] সেখানে যেন মহারাজই হয়; সেই এই মহারাজত্বই যেন তাহার লোক—কর্ম্মফল; বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু জাগ্রদবস্থার ন্যায় ঠিক মহারাজত্বই হয় না। সেইরূপ যেন মহাব্রাহ্মণই(শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণই)[হয়], এবং উচ্চাবচ—উচ্চ দেবত্ব প্রভৃতি, আর অবচ অপকৃষ্ট পশুপক্ষিপ্রভৃতিভাব; এই উচ্চা- বচভাবই যেন প্রাপ্ত হয়। ইহার এই মহারাজত্বাদি লোকসমূহ নিশ্চয়ই মিথ্যা; কারণ, এখানে ইব-শব্দের প্রয়োগ রহিয়াছে এবং ব্যভিচারও দৃষ্ট হইতেছে, অর্থাৎ স্বপ্নদৃষ্ট কোন পদার্থই জাগরণের সময়ে বর্তমান থাকে না বা অনুভূত হয় না। অতএব বুঝিতে হইবে, আত্মা স্বপ্নাবস্থায় যথার্থই বন্ধুবিয়োগাদি- জনিত শোক-মোহাদি ধর্ম্মের সহিত সম্বদ্ধ হয় না। ১
এখন আপত্তি হইতেছে যে, জাগ্রৎকালে দৃশ্যমান লোকসমূহ যেরূপ জাগ্রৎকালাব্যভিচারী অর্থাৎ যতক্ষণ জাগ্রদবস্থা, ততক্ষণ মাত্র স্থায়ী, ঠিক তদ্রূপ স্বপ্নকালে দৃশ্যমান মহারাজত্বাদি লোকসমূহও স্বপ্নকালভাবী(স্বপ্নকালমাত্র স্থায়ী) হয়, এবং স্বপ্নসময়ে তাহার ব্যভিচারও(অসত্যতাও) দৃষ্ট হয় না; সুতরাং সে সমস্ত তাহার আত্মভূতই(স্বাভাবিকই) বটে, কিন্তু কখনই অবিদ্যা- পরিকল্পিত মিথ্যা হইতে পারে না। বিশেষতঃ জাগ্রৎকালীন কার্য্যকারণভাব- সম্বন্ধ ও দেবতাত্মত্ব—উভয়ই যে, অবিদ্যা-পরিকল্পিত অপারমার্থিক, ইহা ত পাণিপেষণ দ্বারা প্রাণাদির অতিরিক্ত বিজ্ঞানময় আত্মার স্বরূপপ্রদর্শনেই প্রদর্শিত হইয়াছে, তবে মৃতসঞ্জীবনের ন্যায় কেবল দৃষ্টান্তের সহায়তায় তাহার আর পুনরুত্থান হইবে কি প্রকারে? হাঁ, এ কথা সত্য বটে, কিন্তু শুক্তিতে রজত- প্রতীতির ন্যায় প্রাণাদি-ব্যতিরিক্ত বিজ্ঞানময় আত্মাতেও যে, কার্য্যকরণ—
দেহেন্দ্রিয়াদির সম্বন্ধ এবং দেবতাত্মভাব প্রদর্শন, প্রাণাদি-ব্যতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব-প্রদর্শক যুক্তিদ্বারাই তাহাও প্রমাণিত হইয়াছে সত্য, কিন্তু আত্মার বিশুদ্ধ স্বরূপপ্রদর্শনের জন্য সেখানে কোন যুক্তির উল্লেখ করা হয় নাই; এই জন্যই জাগ্রৎ- কালীন কার্য্যকরণসম্বন্ধ ও দেবতাত্মভাব-প্রদর্শনাত্মক দৃষ্টান্তটি অসত্য হইলেও এখানে তাহার পুনরুদ্ভাবন করা আবশ্যক হইতেছে; কেননা, সমস্ত যুক্তিই অতি সামান্য মাত্র বিশেষভাবে প্রযুক্ত হইলেও পুনরুক্তি দোষ হইতে বিনির্ম্মুক্ত হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, পূর্ব্বে কেবল স্থূল সূক্ষ্ম দেহদ্বয় হইতে আত্মার বিবেক বা পার্থক্যমাত্র প্রতিপাদিত হইয়াছে, এবং বস্তুটিকেও সত্যবৎ ধরিয়া লইয়া তাহার দৃষ্টান্তে স্বপ্নদৃশ্যেরও সত্যতা প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। ২
[প্রকৃত, কথা এই যে,] স্বপ্নসময়ে অনুভূত মহারাজত্বপ্রভৃতি বিষয়গুলি যে, যথার্থই আত্মভূত অর্থাৎ আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম, তাহা নহে; কারণ, তৎ- কালে যাহা যাহা দৃষ্ট হইয়া থাকে, তৎসমস্তই আত্মা হইতে ভিন্ন—জাগ্রদনুভূত পদার্থের প্রতিবিম্ব বা অনুরূপ মাত্র; নিজের অমাত্যাদি প্রকৃতিবর্গ যে সময়ে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে নিদ্রিত রহিয়াছে, ঠিক সেই সময়ে প্রকৃত মহারাজই ইন্দ্রিয়- ব্যাপারবিহীন অবস্থায় পর্য্যঙ্কে শয়ান থাকিয়া স্বপ্নদর্শন করত আপনাকে জাগ্রৎ- কালের ন্যায় সম্মুখস্থিত অমাত্যগণে পরিবেষ্টিত এবং উৎসবে উপস্থিত হইয়া বিবিধ বিষয় ভোগ করিতেছেন—দেখিতে পান; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু পর্য্যঙ্কে শয়ান সেই মহারাজ হইতে স্বতন্ত্র, ভোগস্থানে পর্য্যটনকারী অমাত্যাদিসমন্বিত দ্বিতীয় মহা- রাজের অস্তিত্ব দিবাভাগে(স্বপ্নভিন্ন সময়ে) প্রসিদ্ধই নাই, যাহাকে তিনি স্বপ্নাবস্থায় দর্শন করিবেন; বিশেষতঃ যাহার ইন্দ্রিয়সমূহ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রহি- য়াছে, তাহার পক্ষে রূপাদিসম্পন্ন বস্তু-দর্শন করা কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। আর একই দেহের মধ্যে যে, তত্তুল্য অপর দেহেরও সদ্ভাব সম্ভব হয়, তাহাও নহে; কেননা, স্বপ্নদর্শন দেহস্থ ব্যক্তিরই হইয়া থাকে। ৩
আশঙ্কা হইতেছে যে, পর্য্যঙ্কে শয়ান ব্যক্তিই ত আপনাকে পথে(দেহের বাহিরে) বর্তমান দেখিয়া থাকে? তদুত্তরে বলিতেছেন যে, না, বাহিরে স্বপ্ন- দর্শন করে না,-সেই প্রসিদ্ধ মহারাজ যেমন জানপদ-জনপদোৎপন্ন(দেশজাত) রাজভোগ্য ভৃত্য ও অন্যান্য বস্তুনিচয় গ্রহণ করিয়া জয়াদিলব্ধ স্বীয় জনপদের মধ্যেই(রাজ্যমধ্যেই) যথাকাম-যেমন যেমন কামনা হয়, তদনুসারেই অবস্থান করেন, ঠিক তেমনি এই বিজ্ঞানময় আত্মাও এইরূপে প্রাণসমূহকে গ্রহণ করিয়া-জাগ্রদবস্থা হইতে আহরণ করিয়া স্বীয় শরীরমধ্যেই ইচ্ছানুসারে অব-
স্থান করে, অর্থাৎ পূর্ব্বতন কাম ও কর্মানুসারে সমুদ্ভূত পূর্ব্বানুভূত বস্তুর অনুরূপ বাসনারাশি অনুভব করিয়া থাকে, কিন্তু বাহিরে কিছুই অনুভব করে না। অত- এব স্বপ্নে যে সমস্ত বিষয় অনুভূত হয়, সে সমস্তই প্রকৃতপক্ষে বিদ্যমান না থাকায় আত্মধর্মরূপে মিথ্যা আরোপিত হয় মাত্র; জাগ্রদবস্থায়ও সেইরূপই বুঝিতে হইবে। অতএব বিজ্ঞানময় আত্মা যে, স্বভাবশুদ্ধ এবং ক্রিয়া কারক ও ফল- সম্বন্ধরহিত, ইহা প্রমাণিত হইতেছে। যে হেতু দ্রষ্টার বিষয়ীভূত(দৃশ্য পদার্থ) ক্রিয়া কারক ও ফলাত্মক কার্য্য-কারণভাববিশিষ্ট লোকসমূহই স্বপ্নে ও জাগ্রদবস্থায় দৃষ্ট হইয়া থাকে, সেই হেতু স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থায় দৃষ্ট লোকসমূহ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ দ্রষ্টা বিজ্ঞানময় আত্মা বিশুদ্ধ অর্থাৎ স্বপ্ন ও জাগ্রদবস্থায় অনুভূত বিষয়ের সহিত অসম্বদ্ধ ॥ ৯৮ ॥ ১৮ ॥
আভাসভাষ্যম্।—দর্শনবৃত্তৌ স্বপ্নে বাসনারাশেদৃশ্যত্বাদ অতদ্ধর্ম্মতেতি বিশুদ্ধতা অবগতা আত্মনঃ; তত্র “যথাকামং পরিবর্ত্ততে” ইতি কামবশাৎ পরিবর্ত্তনমুক্তম্; দ্রষ্টুর্দৃশ্যসম্বন্ধশ্চ অস্য স্বাভাবিকঃ—ইত্যশুদ্ধতা শঙ্ক্যতে; অতস্তদ্বিশুদ্ধ্যর্থমাহ—
আভাসভাষ্যের অনুবাদ।—বিষয়দর্শনাত্মক স্বপ্নাবস্থায় বাসনা বা জাগ্রৎকালীন সংস্কার দৃষ্ট হয় বলিয়া ঐ স্বপ্নধর্ম্মের সহিত আত্মার অসম্বন্ধ ও বিশুদ্ধতা জানা গিয়াছে, এবং ‘যথাকামং পরিবর্ত্ততে’ এই কথায় সে অবস্থায় বাসনানুরূপ পরিবর্তন কথিত হইয়াছে; অতএব স্বপ্নদর্শীর সেই দৃশ্যসম্বন্ধ স্বাভা- বিক বলিয়া আশঙ্কা হইতে পারে, তন্নিরাসার্থ বলিতেছেন—
অথ যদা সুষুপ্তো ভবতি যদা ন কস্যচন বেদ, হিতা নাম নাড্যো দ্বাসপ্ততিঃ সহস্রাণি হৃদয়াৎ পুরীততমভিপ্রতিষ্ঠন্তে; তাভিঃ প্রত্যবসৃপ্য পুরীততি শেতে, স যথা কুমারো বা মহারাজো বা মহাব্রাহ্মণো বা অতিঘ্নীমানন্দস্য গত্বা শয়ীতৈবমেবৈষ এতচ্ছেতে ॥ ৯৯ ॥ ১৯ ॥
সরলার্থঃ।—অথ যদা(যস্মিন্ কালে)[পুরুষঃ] সুষুপ্তঃ ভবতি, যদা কস্যচন(শব্দাদেঃ কস্যাপি কিঞ্চন) ন বেদ(বিজানাতি),[তদা]—[যাঃ] দ্বাসপ্ততিঃ সহস্রাণি(দ্বাসপ্ততিসহস্রসংখ্যাকাঃ) হিতাঃ নাম(হিতাখ্যাঃ) নাড্যঃ হৃদয়াৎ(হৃৎপিণ্ডাৎ) পুরীততং(হৃদয়বেষ্টনম্—তদুপলক্ষিতং দেহং) অভি- (লক্ষ্যীকৃত্য) প্রতিষ্ঠন্তে(প্রস্থিতাঃ—নির্মতাঃ), তাভিঃ(নাড়ীভিঃ) প্রত্যবসৃপ্য
(শরীরং ব্যাপ্য) পুরীততি(শরীরে) শেতে(বর্ত্ততে); সঃ(সুষুপ্তঃ) যথা কুমারঃ বা মহারাজঃ বা মহাব্রাহ্মণঃ বা আনন্দস্য অতিঘ্নীং(অতিশায়িনীম্ অবস্থাং) গত্বা(প্রাপ্য) শয়ীত(অবতিষ্ঠেত), এবমেব(তদ্বৎ এব) এষঃ(বিজ্ঞানময়ঃ) এতৎ(শয়নং যথা স্যাৎ তথা)[সর্ব্বসংসারধর্মান্ অতীত্য] শেতে(বর্ত্ততে ইত্যর্থঃ) ॥ ৯৯ ॥ ১৯ ॥
মূলানুবাদ?—এই বিজ্ঞানময় পুরুষ যে সময়ে সুষুপ্ত হয়, যে সময় কোন বিষয়ে কিছু জ্ঞান থাকে না,[সে সময়ে], হিতানামক যে বাহাত্তর হাজার নাড়ী হৃৎপিণ্ড হইতে নির্গত হইয়া পুরীততে— হৃদয়বেষ্টনে অর্থাৎ তদ্বিশিষ্ট শরীরাভিমুখে বহির্গত হইয়াছে, সেই সমস্ত নাড়ীদ্বারা নির্গত হইয়া সমস্ত শরীরে পরিব্যাপ্ত হইয়া অবস্থান করে। পূর্ব্বপ্রদর্শিত সেই কুমার কিংবা মহারাজ অথবা শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ যেমন(স্বপ্নদশায়) আনন্দের উৎকর্ষ প্রাপ্ত হইয়া থাকে, এই বিজ্ঞানময়ও ঠিক সেইরূপে শয়ন করে(অবস্থান করে) ॥ ৯৯ ॥ ১৯ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ যদা সুষুপ্তো ভবতি—যদা স্বপ্ন্যয়া চরতি, তদাপ্যয়ং বিশুদ্ধ এব; অথ পুনর্যদা হিত্বা দর্শনবৃত্তিং স্বপ্নম্, যদা যস্মিন্ কালে সুষুপ্তঃ সুষ্ঠু সুপ্তঃ সম্প্রসাদং স্বাভাবিকং গতঃ ভবতি—সলিলমিব অন্যসম্বন্ধকালুষ্যং হিত্বা স্বাভাবেন প্রসীদতি।
কদা সুষুপ্তে। ভবতি? যদা যস্মিন্ কালে, ন কস্যচন ন কিঞ্চনেত্যর্থঃ; বেদ বিজানাতি; কস্যচন বা শব্দাদেঃ সম্বন্ধি বস্তুন্তরং কিঞ্চন ন বেদ—ইত্যধ্যাহার্য্যম্; পূর্ব্বন্তু ন্যায্যম্, সুপ্তে তু বিশেষবিজ্ঞানাভাবস্য বিবক্ষিতত্বাৎ। ১
এবং তাবদ্বিশেষবিজ্ঞানাভাবে সুষুপ্তো ভবতীত্যুক্তম্; কেন পুনঃ ক্রমেণ সুষুপ্তো ভবতীত্যুচ্যতে-হিতাঃ নাম হিতা-ইত্যেবংনাম্যো নাড্যঃ শিরাঃ দেহস্যান্নরসবিপরিণামভূতাঃ, তাশ্চ দ্বাসপ্ততিঃ সহস্রাণি-দ্বে সহস্রে অধিকে সপ্ততিশ্চ সহস্রাণি-তাঃ দ্বাসপ্ততিঃ সহস্রাণি; হৃদয়াৎ-হৃদয়ং নাম মাংসপিণ্ডঃ, তস্মাৎ মাংসপিণ্ডাৎ পুণ্ডরীকাকারাৎ, পুরীততৎ হৃদয়পরিবেষ্টনমাচক্ষতে-তদুপ- -লক্ষিতং শরীরমিহ পুরীতচ্ছব্দেনাভিপ্রেতং-পুরীততমভিপ্রতিষ্ঠন্তইতি-শরীরং কৃৎস্নং ব্যাপ্নবত্যঃ অশ্বথপর্ণরাজয় ইব বহির্মুখ্যঃ প্রবৃত্তা ইত্যর্থঃ। ২
তত্র বুদ্ধেরন্তঃকরণস্থ্য হৃদয়ং স্থানম্; তত্রস্থ-বুদ্ধিতন্ত্রাণি চেতরাণি বাহ্যানি করণানি; তেন বুদ্ধিঃ কর্মবশাৎ শ্রোত্রাদীনি তাভির্নাড়ীভিঃ মৎস্যজালবৎ কর্ণ-
শঙ্কুল্যাদিস্থানেভ্যঃ প্রসারয়তি; প্রসার্য্য চাধিতিষ্ঠতি জাগরিতকালে; তাং বিজ্ঞান- ময়োহভিব্যক্তস্বাত্মচৈতন্যাবভাসতয়া ব্যাপ্নোতি; সঙ্কোচনকালে চ তস্যা অনুসঙ্কু- চতি; সোহস্য বিজ্ঞানময়স্য স্বাপঃ; জাগ্রদ্বিকাসানুভবো ভোগঃ(১); বুদ্ধ্যুপাধি- স্বভাবানুবিধায়ী হি সঃ, চন্দ্রাদিপ্রতিবিম্ব ইব জলাদুনুবিধায়ী। তস্মাৎ তস্যা বুদ্ধের্জাগ্রদ্বিষয়ায়াঃ তাভিঃ নাড়ীভিঃ প্রত্যবসর্পণমনু প্রত্যবসপ্য পুরীততি শরীরে শেতে তিষ্ঠতি—তপ্তমিব লোহপিণ্ডম্ অবিশেষেণ সংব্যাপ্য অগ্নিবৎ শরীরং সংব্যাপ্য বর্তত ইত্যর্থঃ। স্বাভাবিক এব স্বাত্মনি বর্তমানোহপি কর্ম্মানুগত- বুদ্ধ্যনুরৃত্তিত্বাৎ পুরীততি শেতে ইত্যুচ্যতে। ন হি সুষুপ্তিকালে শরীর- সম্বন্ধোহস্তি; “তীর্ণো হি তদা সর্ব্বাঙ্কোকান্ হৃদয়স্য” ইতি হি বক্ষ্যতি। ৩ ✓
সর্ব্বসংসারদুঃখবিযুক্তেয়মবস্থেত্যত্র দৃষ্টান্তঃ,-স যথা কুমারো বা অত্যন্তবালো বা, মহারাজো বা অত্যন্তবশ্যপ্রকৃতিঃ যথোক্তকৃৎ, মহাব্রাহ্মণো বা অত্যন্তপরিপক্ক- বিদ্যাবিনয়সম্পন্নঃ, অতিঘ্নীম্-অতিশয়েন দুঃখং হস্তীত্যতিঘ্নী আনন্দস্যাবস্থা,. তাং প্রাপ্য গত্বা শয়ীত অবতিষ্ঠেত। এষাঞ্চ কুমারাদীনাং স্বভাবস্থানাং সুখং নিরতিশয়ং প্রসিদ্ধৎ লোকে; বিক্রিয়মাণানাং হি তেষাং দুঃখম্, ন স্বভাবতঃ;. তেন তেষাং স্বাভাবিক্যবস্থা দৃষ্টান্তত্বেনোপাদীয়তে, প্রসিদ্ধত্বাৎ; ন তেষাৎ স্বাপ এবাভিপ্রেতঃ, স্বাপস্য দাষ্টান্তিকত্বেন বিবক্ষিতত্বাৎ বিশেষাভাবাচ্চ; বিশেষে হি সতি দৃষ্টান্ত-দাষ্টান্তিকভেদঃ স্যাৎ; তস্মান্ন তেষাং স্বাপো দৃষ্টান্তঃ,-এবমেব, যথায়ং দৃষ্টান্তঃ, এষ বিজ্ঞানময় এতৎ শয়নং শেতে ইতি-এতচ্ছব্দ: ক্রিয়াবিশে- ষণার্থঃ,-এবময়ং স্বাভাবিকে স্বে আত্মনি সর্ব্বসংসারধৰ্মাতীতো বর্ত্ততে স্বাপ-- কালে ইতি ৷ ৯৯ ॥ ১৯ ॥
টীকা।—বৃত্তানুবাদপূর্ব্বকমুত্তর শ্রুতিনিরস্যামাশঙ্কামাহ—দর্শনবৃত্তাবিত্যাদিনা। তত্রেতি স্বপ্নোক্তিঃ। কামাদিসম্বন্ধশ্চকারার্থঃ। নিবর্ত্যশঙ্কাসদ্ভাবান্নিবর্ত্তকানন্তরশ্রুতিপ্রবৃত্তিং প্রতি- জানীতে—অত ইতি। স্বপ্নেহপি শুদ্ধিরুক্তা, কিং সুষুপ্তিগ্রহেণেত্যাশঙ্ক্যাহ—যদেতি। গতো ভবতি, তদা সুতরামস্য শুদ্ধিঃ সিধ্যতীতি শেষঃ। তমেব সুষুপ্তিকালং প্রশ্নপূর্ব্বকং প্রকটয়তি— কদেতি। বিকল্পং ব্যাবর্ত্তয়তি—পূর্ব্বং ত্বিতি। ১
বৃত্তমনুদ্য প্রশ্নপূর্ব্বকং সুষুপ্তিগতিপ্রকারং দর্শয়তি—এবং তাবদিতি। হিতফলপ্রাপ্তি- নিমিত্তত্বান্নাড্যো হিতা উচ্যন্তে। তাসাং দেহসম্বদ্ধানামন্বয়ব্যতিরেকাভ্যামন্নরসবিকারত্বমাহ— অন্নেতি। তাসামের মধ্যমসংখ্যাং কথয়তি—তাশ্চেতি। তাসাং চ হৃদয়সম্বন্ধিনীনাং ততো নির্গত্য দেহব্যাপ্যা বহির্মুখত্বমাহ—হৃদয়াদিতি। ২
তাভিরিত্যাদি ব্যাকর্তুং ভূমিকাং করোতি-তত্রেতি। শরীরং সপ্তম্যর্থঃ। শরীরে করণানাং বুদ্ধিতত্ত্বত্বে কিং স্যাত্তদাহ-তেনেতি। তথাপি জীবস্য কিমায়াতমিত্যাশঙ্ক্যাহ- তাং বিজ্ঞানময় ইতি। ভোগশব্দো জাগরবিষয়ঃ। বুদ্ধিবিকারমনুভবন্নাত্মা জাগর্তীত্যুচ্যতে, তৎসঙ্কোচং চানুভবন্ স্বপিতীত্যত্র হেতুমাহ-বুদ্ধীতি। বুদ্ধ্যনুবিধায়িত্বং পরামৃশ্য তাভিরিত্যাদি ব্যাচষ্টে-তস্মাদিতি। প্রত্যবসর্পণং ব্যাবর্তনম্। পদার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ-তপ্তমিবেতি। কৰ্ম্মত্বে দেহস্য কর্তৃত্বে চাত্মনো দৃষ্টান্তদ্বয়ম্। হৃদয়াকাশে ব্রহ্মণি শেতে বিজ্ঞানাত্মেত্যুক্ত। পুরীততি শয়নমাচক্ষাণস্থ্য পূর্ব্বাপরবিরোধঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-স্বাভাবিক ইতি। ঔপচারিকমিদং বচনমিত্যত্র হেতুমাহ-ন হীতি। ৩
ইয়মবস্থেতি প্রকৃতা সুষুপ্তিরুচ্যতে। উক্তেষু দৃষ্টান্তেষু বিবক্ষিতমংশং দর্শয়তি-এষাং চেতি। দুঃখমপি তেষাং প্রসিদ্ধমিত্যাশঙ্ক্যাহ-বিক্রিয়মাণানাং হীতি। কুমারাদিস্বাপস্যৈব দৃষ্টান্তত্বং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন তেষামিতি। তৎস্বাপস্য দৃষ্টান্তত্বমস্মৎস্বাপস্য দাষ্টান্তিকত্বমিতি বিভাগমাশঙ্ক্যাহ-বিশেষাভাবাদিতি। কৈষ তদাহভূদিতি প্রশ্নস্যোত্তরমুপপাদিতমুপসংহরতি- এবমিতি। ৯৯।১৯।
ভাষ্যানুবাদ।—অতএব বলা হইতেছে যে, জীব যে সময় সুষুপ্ত হয়—যখন স্বপ্নদর্শনে অবস্থিত হয়, তখনও এই বিজ্ঞানময় পুরুষ বিশুদ্ধই থাকে; তাহার পর যখন দর্শনাত্মক স্বপ্নাবস্থা পরিত্যাগ করিয়া সুষুপ্ত—সম্যরূপে সুপ্ত হয়— সম্প্রসাদরূপ স্বভাব প্রাপ্ত হয়, তখনও জল যেরূপ দ্রব্যান্তর-সংযোগজ কলুষতা পরিত্যাগ করিয়া স্বীয় স্বচ্ছতা লাভে প্রসন্ন(নির্ম্মল) হয়, তদ্রূপ প্রসন্ন হয়। ভাল, জীব কোন্ সময়ে সুষুপ্ত হয়?—যে সময়ে কাহারও অর্থাৎ কিছুও জানে না; অথবা শব্দাদিবিষয়-সম্পর্কিত অন্য কোনও কিছু জানে না;—এই অংশটুকু অধ্যা- হার বা পূরণ করিয়া লইতে হইবে।’ এই উভয় প্রকার ব্যাখ্যার মধ্যে প্রথমোক্ত ব্যাখ্যাই ন্যায্য; কারণ, এখানে সর্ব্বপ্রকার বিশেষ-বিজ্ঞানের অভাব প্রতিপাদন করাই শ্রুতির অভিপ্রেত। ১
এই কথা বলা হইতেছে যে, যে সময় কোনপ্রকার বিশেষবিজ্ঞান থাকে না, বিজ্ঞানময় আত্মা তখনই সুষুপ্ত হয়। কি প্রকারে সুষুপ্ত হয়, এখন তাহা বলা হইতেছে-দৈহিক অন্ন-রসের পরিণামভূত ‘হিতা’ নামে প্রসিদ্ধ কতকগুলি নাড়ী(শিরা) আছে; সেই নাড়ীর সংখ্যা দ্বাসপ্ততি সহস্র-দুই হাজার অধিক সত্তর হাজার। সেই বাহাত্তর হাজার নাড়ী হৃদয় হইতে পুরীতৎনাড়ীর অভিমুখে গিয়াছে। হৃদয় অর্থ-মাংসখণ্ডবিশেষ; সেই মাংসখণ্ডটি পদ্মের সদৃশ। হৃদয়-বেষ্টন মাংসখণ্ডকে ‘পুরীতৎ’ বলে; এখানে কিন্তু সেই পুরীতৎবিশিষ্ট দেহই পুরীতৎ-শব্দের অভিপ্রেত অর্থ। ‘পুরীততের দিকে নির্গত হইয়াছে’ কথার অর্থ
এই যে, অশ্বত্থপত্র যেরূপ শিরাজালে বেষ্টিত, তদ্রূপ ঐ নাড়ীসমূহও সমস্ত শরীর ব্যাপিয়া বহির্দিকে প্রসূত হইয়াছে। ২
শরীরাভ্যন্তরস্থ সেই হৃদয় হইল বুদ্ধির-অন্তঃকরণের স্থান বা আশ্রয়; অপরা- পর ইন্দ্রিয়গণ তত্রত্য বৃদ্ধির অধীন; সেই হেতু ঐ বুদ্ধিই শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়গণকে মৎস্য-জালের ন্যায় ওত-প্রোতভাবাপন্ন উক্ত নাড়ীসমূহ দ্বারা কর্ণশঙ্কুলি(কর্ণছিদ্র) প্রভৃতি ইন্দ্রিয়স্থানে প্রসারণ করিয়া থাকে, এবং প্রসারণ করিয়া নিজেই জাগ্রৎ- কালে ঐ সমস্ত ইন্দ্রিয়ে অধিষ্ঠান করে অর্থাৎ পরিচালনাদি কার্য্যে কর্তৃত্ব করে। বিজ্ঞানময় আত্মা আবার স্বীয় অভিব্যক্ত চৈতন্য দ্বারা সেই বুদ্ধিকে ব্যাপিয়া থাকে, অর্থাৎ বুদ্ধিকে উদ্ভাসিত করিয়া রাখে। সেই বুদ্ধি যখন সঙ্কোচিত হয়, তখন বিজ্ঞানময়ও যেন সঙ্কোচদশাই প্রাপ্ত হয়। সেই সঙ্কোচ-দশাই বিজ্ঞানময় আত্মার স্বপ্নদশা; আর জাগ্রৎকালীন যে চৈতন্য-বিকাশাত্মক অনুভব, তাহাই তাহার ভোগ অর্থাৎ জাগরণ দশা; কেন না, চন্দ্রাদির প্রতিবিম্ব যেমন জলানুসারী হইয়া থাকে, তেমনি বিজ্ঞানময় আত্মাও বৃদ্ধির সমান স্বভাব প্রাপ্ত হইয়া থাকে,[সুতরাং বুদ্ধির সঙ্কোচ ও বিকাশানুসারে তাহারও সঙ্কোচ-বিকাসাদি প্রাপ্তি যুক্তিযুক্তই বটে।] সেই হেতুই জাগ্রৎকালে বুদ্ধি যখন পূর্ব্বোক্ত নাড়ীসমূহ দ্বারা প্রাণে সমর্পিত হয়, তখন বিজ্ঞানময়ও তদনুসারে সর্বশরীরে অধিষ্ঠান করে; তপ্তলৌহের অগ্নি যেরূপ সমস্ত লৌহখণ্ডে ব্যাপ্ত হইয়া অবস্থান করে, তেমনি বিজ্ঞানময়ও তখন সর্ব্বতোভাবে সর্বশরীর ব্যাপিয়া তাহাতে অবস্থান করিতে থাকে। যদিও আত্মা সর্ব্বদাই স্বস্বরূপে অবস্থিত আছে সত্য, তথাপি প্রাক্তন কর্মানুযায়ী বুদ্ধি- বৃত্তির অনুগামী হয় বলিয়া পুরীতৎনাড়ীতে(শরীরে) অবস্থান করে-বলা হইয়া থাকে মাত্র; কারণ, সুষুপ্তিকালে আত্মার পূর্ব্বের ন্যায় শরীরসম্বন্ধ বিদ্যমান থাকে না(১)। স্বয়ং শ্রুতিই পরে বলিবেন যে, ‘সেই সময়ে(সুষুপ্তি সময়ে) হৃদয়ের সর্ববিধ দুঃখ অতিক্রম করিয়া থাকে‘। ৩
শাস্ত্রে আছে, সুষুপ্তি সময়ে এই জড়দেহের সমস্তই কারণশরীর অজ্ঞানে যাইয়া বিলীন হয়, এমন কি, তাঁহার দৃশ্যমান স্থূল দেহও তখন থাকে না; অপরলোকে যে, সুষুপ্তের স্থূলদেহ দর্শন করিয়া থাকে, তাহা তাহাদের ভ্রান্তিমাত্র; জীব সে সময়ে তমোগুণে অভিভূত হইয়া কৰ্ম্ম সহযোগে কেবল আনন্দময় অবস্থা অনুভব করিতে থাকে; আবার প্রাক্তন কর্ম্মের প্রেরণায় -পরিচালিত হইয়া সেই জীবই আবার ক্রমে স্বপ্ন ও জাগরণ অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া থাকে।
এই সুষুপ্তি অবস্থা যে, সর্ব্বপ্রকার সাংসারিক অবস্থা হইতে স্বতন্ত্র, তদ্বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, প্রসিদ্ধ কুমার অর্থাৎ অত্যন্ত বালক, অথবা সর্ব্বস্বামী এবং স্বেচ্ছা- কারী মহারাজ, কিংবা অতিশয় পরিপক্কতাপ্রাপ্ত বিদ্যা-বিনয়াদিগুণসম্পন্ন শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ যেরূপ অতিঘ্নী—দুঃখের অতিশয় নিবৃত্তিসাধক আনন্দাবস্থা(সুখাবস্থা) প্রাপ্ত হইয়া শয়ন করে—অবস্থান করে। প্রকৃতিস্থ উক্ত কুমারপ্রভৃতির সর্বাধিক সুখসমৃদ্ধি জগতে সুপ্রসিদ্ধ; তাহারা যখন স্বাভাবিক অবস্থা হইতে প্রচ্যুত হয়,. তখনই তাহাদের দুঃখ উপস্থিত হয়, নচেৎ হয় না; এই জন্য তাহাদের স্বভাবসিদ্ধ অবস্থাকেই সুষুপ্তির দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণ করা হইতেছে; কারণ, তাহাদের সুখাবস্থা জগতে সুপ্রসিদ্ধ; কিন্তু তাহাদের সুষুপ্তি অবস্থাটিমাত্র দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণ করা শ্রুতির অভিপ্রেত নহে; কারণ, সুষুপ্তি অবস্থাটিকে দাষ্টান্তিকরূপে প্রতিপাদন করাই শ্রুতির অভিপ্রেত; বিশেষতঃ সুষুপ্তিবিষয়ে সাধারণের সঙ্গে উহাদের কিছুমাত্র বিশেষ বা পার্থক্যও নাই; যাহাতে আংশিক কিছু বিশেষ থাকে,. তাহাই দৃষ্টান্তরূপে পরিগৃহীত হইয়া থাকে,(অবিশেষ পদার্থ হয় না); অতএব তাহাদের সুষুপ্তি-দশা কখনই ইহার দৃষ্টান্ত হইতে পারে না। যেরূপ দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইল, ঠিক সেইরূপ বিজ্ঞানময় আত্মাও এইরূপে শয়ন করে—অবস্থান করে, অর্থাৎ উক্ত দৃষ্টান্তের ন্যায় বিজ্ঞানময় আত্মাও নিদ্রাসময়ে সর্ব্ববিধ সংসার- ধৰ্ম্ম অতিক্রমপূর্ব্বক স্বীয় আত্মস্বরূপে অবস্থান করে ৷ ৯৯ ॥ ১৯ ॥
আভাসভাষ্যম্।—কৈষ তদাভূদিত্যস্য প্রশ্নস্য প্রতিবচনমুক্তম্; অনেন চ প্রশ্ননির্ণয়েন বিজ্ঞানময়স্য স্বভাবতো বিশুদ্ধিরসংসারিত্বঞ্চোক্তম্। কুত এতদাগাদিত্যস্য প্রশ্নস্যাপাকরণার্থ আরম্ভঃ। ননু যস্মিন্ গ্রামে নগরে বা যো- ভবতি, সোহনত্র গচ্ছন্ তত এব গ্রামাৎ নগরাদ্বা গচ্ছতি, নান্যতঃ; তথাসতি “কৈষ তদাভূৎ” ইত্যেতাবানেবাস্তু প্রশ্নঃ; যত্রাভূৎ, তত এবাগমনং প্রসিদ্ধং স্যাৎ, নান্যতঃ, ইতি “কুত এতদাগাৎ” ইতি প্রশ্নো নিরর্থক এব। কিং শ্রুতিরুপাল- ভ্যতে ভবতা? ন; কিং তর্হি? দ্বিতীয়স্য প্রশ্নস্যার্থান্তরং শ্রোতুমিচ্ছামি; অত আনর্থক্যং চোদয়ামি। ১
এবং তর্হি “কুতঃ” ইত্যপাদানার্থতা ন গৃহ্যতে; অপাদানার্থত্বে হি পুনরুক্ততা, নান্যার্থত্বে; অস্তু তর্হি নিমিত্তার্থঃ প্রশ্নঃ-কুত এতদাগাৎ-কিন্নিমিত্তমিহাগমন- মিতি। ন নিমিত্তার্থতাপি, প্রতিবচনবৈরূপ্যাৎ; আত্মনশ্চ সর্ব্বস্য জগতোহগ্নি- বিস্ফুলিঙ্গাদিবদুৎপত্তিঃ প্রতিবচনে ক্রয়তে; ন হি বিস্ফুলিঙ্গানাং বিদ্রবণে অগ্নি-- নিমিত্তম্; অপাদানমেব তু সঃ; তথা পরমাত্মা বিজ্ঞানময়স্যাত্মনোঽপাদানত্বেন।
৫:৩
শ্রয়তে—“অস্মাদাত্মনঃ” ইত্যেতস্মিন্ বাক্যে; তস্মাৎ প্রতিবচনবৈলোম্যাৎ “কুতঃ” ইতি প্রশ্নস্য নিমিত্তার্থতা ন শক্যতে বর্ণয়িতুম্। ২।১০
ননু অপাদানপক্ষেহপি পুনরুক্ততাদোষঃ স্থিত এব। নৈষ দোষঃ, প্রশ্নাভ্যা- মাত্মনি ক্রিয়াকারকফলাত্মতাপোহস্য বিবক্ষিতত্বাৎ। ইহ হি বিদ্যাবিদ্যাবিষয়া- বুপন্যস্তৌ,-“আত্মেত্যেবোপাসীত”, “আত্মানমেবাবেৎ”, “আত্মানমেব লোকমুপা- সীত” ইতি বিদ্যাবিষয়ঃ; তথা অবিদ্যাবিষয়শ্চ পাঙক্তং কৰ্ম্ম তৎফলঞ্চান্নত্রয়ং নাম- রূপকর্ম্মাত্মকমিতি। তত্রাবিদ্যাবিষয়ে বক্তব্যং সর্ব্বমুক্তম্। বিদ্যাবিষয়স্ত আত্মা কেবল উপন্যন্তঃ, ন নির্ণীতঃ; তন্নির্ণয়ায় চ “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি” ইতি প্রক্রান্তম্, “জ্ঞপয়িষ্যামি” ইতি চ। অতস্তদ্ ব্রহ্ম বিদ্যাবিষয়ভূতং জ্ঞাপয়িতব্যং যাথাত্ম্যতঃ। তস্য চ যাথাত্ম্যৎ ক্রিয়াকারকফলভেদশূন্যম্ অত্যন্তবিশুদ্ধমদ্বৈতম্-ইত্যেতদ্বিব- ক্ষিতম্; অতস্তদনুরূপৌ প্রশ্নাবুখাপ্যেতে শ্রুত্যা-“কৈষ তদাভূৎ, কুত এতদা- গাৎ” ইতি। ৩
তত্র-যত্র ভবতি, তদধিকরণম্; যদ্ভবতি, তদধিকর্তব্যম্; তয়োশ্চাধি- করণাধিকর্তব্যয়োর্ভেদো দৃষ্টো লোকে। যথা-যত আগচ্ছতি তদপাদানম্, য আগচ্ছতি স কর্তা তম্মাদন্যো দৃষ্টঃ। অন্যথা আত্মা কাপ্যভূদন্যস্মিন্নন্যঃ, কুতশ্চি- দাগাৎ অন্যম্মাদন্যঃ-কেনচিস্তিয়েন সাধনান্তরেণ-ইত্যেবং লোকবৎ প্রাপ্তা বুদ্ধিঃ, সা প্রতিবচনেন নিবর্ত্তয়িতব্যেতি। নায়মাত্মা অন্যঃ অন্যত্রাভূৎ, অন্যো বা অন্যম্মাদাগতঃ, সাধনান্তরং বা আত্মন্যস্তি; কিং তর্হি? স্বাত্মন্যেবাভূৎ- “স্বমাত্মানমপীতো ভবতি” “সতা সোম্য তদা সম্পন্নো ভবতি” “প্রাজ্ঞেনাত্মনা সংপরিষক্তঃ” “পর আত্মনি সংপ্রতিষ্ঠতে” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ; অতএব নান্যঃ অন্যম্মাদাগচ্ছতি; তৎ শ্রুত্যৈব প্রদর্শ্যতে-“অস্মাদাত্মনঃ” ইতি, আত্মব্যতি- রেকেণ বস্তুন্তরাভাবাৎ। নন্বস্তি প্রাণাদি আত্মব্যতিরিক্তং বস্তুন্তরম্; ন; প্রাণাদেস্তত এব নিষ্পত্তেঃ। তৎ কথম্? ইত্যুচ্যতে টীকা।—স যথেত্যাদেঃ সঙ্গতিং বক্তুং বৃত্তং সঙ্কীর্তয়তি—কৈষ ইতি। কিং পুনরাদ্যপ্রশ্ন- নির্ণয়েন ফলতি? ত্বংপদার্থশুদ্ধিরিত্যাহ—অনেনেতি। শুদ্ধিদ্বারা ব্রহ্মত্বং চ তস্যোক্তমিত্যাহ— অসংসারিত্বং চেতি। উত্তরগ্রন্থস্য তাৎপর্য্যমাহ—কুত ইতি। পূর্ব্বেণোত্তরস্য গতার্থত্বং শঙ্কতে— নন্বিতি। স্থিতাবধেরেব নির্দ্ধারিতত্বাদাগত্যবধেনির্দিধারয়িষয়া প্রশ্নে প্রতিবচনং সাবকাশ- মিত্যাশঙ্ক্যাহ—তথা সতীতি। অপৌরুষেয়ী শ্রুতিরশেষদোষশূন্যত্বাদনতিশঙ্কনীয়েতি সিদ্ধান্তী গুঢ়াভিসন্ধিরাহ—কিং শ্রুতিরিতি। ন শ্রুতিরাক্ষিপ্যতে, নির্দোষত্বাদিতি পূর্ব্ববাদ্যাহ—নেতি। শ্রুতেরনাক্ষেপত্বে ত্বদীয়ং চোদ্যং নিরবকাশমিত্যাহ—কিং তহীতি। তস্য সাবকাশত্বং পূর্ব্ববাদী সাধয়তি—দ্বিতীয়স্যেতি। ১
পূর্ববাদিন্যপাদানাদর্থান্তরে পঞ্চম্যাঃ শুশ্রূষমাণে সত্যেকদেশী ব্রবীতি-এবং তহীতি। কথমন্যার্থত্বং, তদাহ-অস্তিতি। তর্হি তস্যামপাদানার্থত্বেন পুনরুক্তত্বাবস্থায়ামিত্যর্থঃ। এক- দেশিনং পূর্ব্ববাদী দূষয়তি-নেতি। অপাদানার্থতাবদিত্যপেরর্থঃ। তদেব স্ফুটয়তি- আত্মনশ্চেতি। জগতঃ সর্ব্বস্য চেতনস্যাচেতনস্য চেতি বক্তুং চশব্দঃ। ২
তহি ভবত্বপাদানার্থা পঞ্চমীত্যাশঙ্ক্য পূর্ব্ববাদী পূর্ব্বোক্তং স্মারয়তি-নন্বিতি। সর্ব্বাবিদ্যা- তজ্জনিমুক্তং প্রত্যগদ্বয়ং ব্রহ্ম প্রশ্নদ্বয়ব্যাজেন প্রতিপিপাদয়িষিতমিতি ন পুনরুক্তিরিতি সিদ্ধান্তী স্বাভিসন্ধিমুঘাটয়তি-নৈষ দোষ ইতি। যথোক্তং বস্তু প্রশাভ্যাং বিবক্ষিতমিতি কুতো জ্ঞাত- মিত্যাশঙ্ক্য তদ্বক্তুং তার্তীয়মর্থমনুবদতি-ইহ হীতি। বিদ্যাবিষয়নির্ণয়স্য কর্তব্যত্বমত্র ন প্রতি- ভাতীত্যাশঙ্ক্যাহ-তন্নির্ণয়ায় চেতি। অন্যথা প্রক্রমভঙ্গঃ স্যাদিতি ভাবঃ। কিং তদ্য্যাথাত্ম্যং, তদাহ-তস্য চেতি। ৩
কথং যথোক্তযাথাত্ম্যব্যাখ্যানোপযোগিত্বং প্রশ্নয়োরিত্যাশঙ্ক্য তয়োঃ শ্রৌতমর্থমাহ-তত্রেতি। প্রশ্নপ্রবৃত্তিমুক্তা, প্রতিবচনপ্রবৃত্তিমাহ-সেতি। নিবর্ত্তয়িতব্যোতি তৎপ্রবৃত্তিরিতি শেষঃ। সম্প্রতি প্রতিবচনয়োস্তাৎপর্য্যমাহ-নায়মিতি। স্বাত্মন্যেবাভূদিত্যত্র প্রমাণমাহ-স্বাত্মান- মিতি। সুষুপ্তৌ স্বাত্মন্যেব স্থিতিরতঃশব্দার্থঃ। প্রবোধদশায়ামাত্মন এবাগমনাদপাদানত্বমিত্যত্র মানত্বেনানন্তরশ্রুতিমুখাপয়তি-তৎ শ্রুত্যৈবেতি। স্থিত্যাগত্যোরাত্মন এবাবধিত্বমিত্যত্রোপ- পত্তিমাহ-আত্মেতি।
আভাসভাষ্যানুবাদ।—‘এই বিজ্ঞানময় আত্মা তৎকালে কোথায় ছিল?’ এই প্রশ্নের প্রত্যুত্তর বলা হইয়াছে; এবং সেই প্রশ্নার্থ নিরূপণ দ্বারাই বিজ্ঞানময় আত্মার বিশুদ্ধি ও অসংসারিত্ব উভয়ই বলা হইয়াছে। অতঃপর ‘কোথা হইতে এইরূপে আসিল?’ এই প্রশ্নের উত্তরপ্রদানের উদ্দেশ্যে শ্রুতির অবতারণা হইতেছে। এখন শঙ্কা হইতেছে এই যে, যে লোক যে গ্রামে বা যে নগরে বাস করে, সে লোক অন্যত্র যাইবার সময় সেই গ্রাম বা সেই নগর হইতেই প্রস্থান করিয়া থাকে, কিন্তু অন্য স্থান হইতে করে না; ইহাই যখন লোকসিদ্ধ নিয়ম, তখন “কৈষ তদাভূৎ” এই একটি মাত্র প্রশ্নই হওয়া উচিত; কেননা, যেখানে থাকে, সেখান হইতে আগমনই প্রসিদ্ধ, অন্য স্থান হইতে নহে; সুতরাং “কুত এতদা- গাৎ”(‘কোথা হইতে এইরূপে আসিল’) এই প্রশ্নটি নিশ্চয়ই নিরর্থক হইতেছে। ভাল, তবে কি তুমি শ্রুতির উপরেও অভিযোগ করিতেছ? না—তাহা নহে; তবে কি না, দ্বিতীয় প্রশ্নের অন্যপ্রকার অর্থ শুনিতে ইচ্ছা করি; এই জন্যই আনর্থক্য দোষের উত্থাপন করিতেছি। ১
তাহা হইলে বলিতেছি, এখানে ‘কুতঃ’ পদের অর্থ অপাদান নহে, অর্থাৎ (কোথা হইতে—এরূপ অপাদানার্থতা) গ্রহণ করা হইতেছে না; কারণ, অপাদান-অর্থ গ্রহণ করিলে পুনরুক্তি দোষ ঘটে, কিন্তু অন্যপ্রকার অর্থ
গ্রহণ করিলে আর সে দোষ ঘটে না। আচ্ছা, তাহা হইলে, এখানে ‘কিসের জন্য আগমন’ এইরূপ নিমিত্তার্থেই প্রশ্ন হউক? না—নিমিত্তার্থতাও হইতে পারে না; কারণ, প্রতিবচন অন্যরূপ দেখা যায়। প্রতিবচনে দেখা যায় যে, অগ্নিস্ফুলিঙ্গাদির ন্যায় আত্মা হইতেই সমস্ত জগতের উৎপত্তি হইয়াছে; অথচ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ-জননে অগ্নি কখনই নিমিত্ত কারণ নহে; পরন্তু অগ্নি তাহার উপাদান কারণ; সেইরূপ পরমাত্মা যে, বিজ্ঞানময় আত্মার অপাদান, এ কথা “অস্মাদাত্মনঃ”(এই আত্মা হইতে) এই শ্রুতিতেও দ্রুত হইতেছে। অতএব প্রতিবচনের সহিত সাম্য না থাকায় “কুতঃ?” এই প্রশ্নের নিমিত্তার্থত্ব ব্যাখ্যা করিতে পারা যায় না। ২
ভাল কথা, অপাদানপক্ষেও পুনরুক্তি দোষ ত আছেই; না-এপক্ষে সে দোষ হয় না; কারণ, আত্মাতে আরোপিত ক্রিয়া-কারক-ফলাত্মক ভাব দূরীকরণ করাই প্রশ্নদ্বয়ের অভিপ্রেত অর্থ। এখানে দুইটি বিষয় উল্লিখিত হইয়াছে, একটি বিদ্যার বিষয়, অপরটি অবিদ্যার বিষয়; তন্মধ্যে ‘আত্মা বলিয়াই উপাসনা করিবে’ ‘আত্মাকেই জানিবে’ ‘আত্মস্বরূপ লোকেরই উপাসনা করিবে’ এ সমস্ত হইল বিদ্যাবিষয়ের কথা, আর পূর্ব্বোক্ত পাঙ্ক্ত কৰ্ম্ম ও তৎফল নামরূপ-কর্মাত্মক অন্য সমস্ত হইল অবিদ্যার বিষয়। ইহার মধ্যে অবিদ্যাধিকারে বক্তব্য বিষয় সমস্তই বলা হইয়াছে; আর বিদ্যার বিষয়(বিজ্ঞেয়) আত্মার কেবল উল্লেখ মাত্র করা হইয়াছে, কিন্তু নির্ণয় করা হয় নাই। সেই আত্মার স্বরূপনির্ণয়ের জন্যই “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি”(আমি তোমাকে ব্রহ্মোপদেশ দিব) এবং “জ্ঞপয়িষ্যামি” (বুঝাইব) এই কথার উপক্রম করা হইয়াছে। অতএব বিদ্যার বিষয়ীভূত সেই ব্রহ্মই এখানে যথাযথরূপে বিজ্ঞাপনীয়, আর ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপটি যে, ক্রিয়া, কারক ও ফলাত্মক ভেদশূন্য অত্যন্ত বিশুদ্ধ অদ্বৈত, তৎপ্রতিপাদনই শ্রুতির অভি- প্রেত; সেই জন্যই শ্রুতি সেই অভিপ্রায়ানুযায়ী দুইটি প্রশ্নের উত্থাপন করিতেছেন -“ক এষ তদা অভূৎ, কুত এতদাগাৎ” ইতি। ৩
তন্মধ্যে বিশেষ এই যে, যাহাতে থাকে, তাহা অধিকরণ, আর যাহা থাকে, তাহা হয় অধিকর্তব্য বা আধেয়; এই অধিকরণ ও অধিকর্তব্য(আধেয়) পদার্থ দুইটির ভেদ বা পার্থক্য সর্ব্বত্রই দেখিতে পাওয়া যায়। এই প্রকার যাহা হইতে আইসে বা বহির্গত হয়, তাহা অপাদান, আর যাহা আইসে, তাহা হয় কর্তা। কর্তাকেও অপাদান হইতে ভিন্নই দেখিতে পাওয়া যায়। এইরূপ লোকব্যবহার দৃষ্টে মনে হইতে পারিত যে, অন্য—অধিকরণ হইতে ভিন্ন আত্মা কোথাও ছিল,
এবং অপর কোনও সাধনের সাহায্যে অন্য কোনও স্থান হইতে অন্য আত্মাই আসিয়াছে। সেই আশঙ্কাই প্রত্যুত্তর দ্বারা নিবারণ করিতে হইবে;[এই জন্য এখানে বলা হইতেছে যে,] এই আত্মা অন্য বা পৃথক্ বস্তু নহে, অন্যত্রও ছিল না, বা অন্য আত্মা যে, অন্য স্থান হইতে আসিয়াছে, তাহাও নহে, এবং আত্মার এই আগমনে অন্য কোন সাধনও নাই,(যাহা দ্বারা আত্মার সেরূপ হইতে আগমন হইতে পারে); তবে কিনা, “স্বমাত্মানমপীতো ভবতি” “সতা সোম্য তদা সম্পন্নো ভবতি” ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, আত্মা তখনও আপনাতেই ছিল; অন্য কোন স্থান হইতে আইসেও নাই, এবং “অস্মাৎ আত্মনঃ” এই শ্রুতিও বলি-. তেছে যে, আত্মার অতিরিক্ত স্বতন্ত্র কোনও বস্তু নাই। কেন?—আত্মাতিরিক্ত প্রাণপ্রভৃতি আরও ত অনেক বস্তু রহিয়াছে? না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, প্রাণাদি বস্তুগুলি এই আত্মা হইতেই প্রাদুর্ভূত হইয়াছে,[অতএব প্রাণ- প্রভৃতি কোন বস্তুই আত্মা হইতে স্বতন্ত্র পৃথক্ পদার্থ নহে]। তাহা কিপ্রকার? বলা হইতেছে— স যথোর্ণনাভিস্তন্তুনোচ্চরেদ্ যথাগ্নেঃ ক্ষুদ্রা বিস্ফুলিঙ্গা ব্যুচ্চরন্ত্যেবমেবাস্মাদাত্মনঃ সর্ব্বে প্রাণাঃ সর্ব্বে লোকাঃ সর্ব্বে দেবাঃ সর্ব্বাণি ভূতানি ব্যুচ্চরন্তি, তস্যোপনিষৎ সত্যস্য সত্যমিতি, প্রাণা বৈ সত্যং তেষামেষ সত্যম্ ॥ ১০০ ॥ ২০ ॥ ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়স্য প্রথমং ব্রাহ্মণম্ ॥ ২ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—[প্রস্তুতম্ অর্থং দৃষ্টান্তেন দ্রঢ়য়িতুমাহ—“সঃ যথা” ইতি।] সঃ(প্রসিদ্ধঃ) উর্ণনাভিঃ(লূতাকীটঃ) যথা তন্তুনা(স্বপ্রসূতেন সূত্রেণ) উচ্চরেৎ (ঊর্দ্ধং গচ্ছেৎ), অগ্নেঃ(বহ্নেঃ সকাশাৎ) যথা ক্ষুদ্রাঃ বিস্ফুলিঙ্গাঃ(বহ্নিকণাঃ) ব্যুচ্চরন্তি(বিবিধাকারেণ প্রসর্পন্তি), এবমেব(উক্তদৃষ্টান্তদ্বয়বদেব) অস্মাৎ (বিজ্ঞানময়স্য প্রতিবোধপ্রাক্কালীনাৎ সৎস্বরূপাৎ) সর্ব্বে প্রাণাঃ(বাক্প্রভৃতয়ঃ) সর্ব্বে লোকাঃ(স্বর্গাদয়ঃ) সর্ব্বে দেবাঃ(প্রাণাধিষ্ঠাতারঃ লোকাধিষ্ঠাতারশ্চ অগ্নি- প্রভৃতয়ঃ), সর্ব্বাণি ভূতানি(ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানি) ব্যুচ্চরন্তি(নানাকারেণ প্রাদু- র্ভবন্তি), তস্য অন্য(সর্ব্বকারণভূতস্য ব্রহ্মণঃ) উপনিষৎ(রহস্যং নাম)—সত্যস্য, সত্যম্ ইতি।[কিমিদং সত্যং নাম? তদাহ] প্রাণাঃ বৈ(এব) সত্যং(সত্য- নামানঃ); এষঃ(আত্মা) তেষাং সত্যম্(সত্যতাপাদক ইত্যর্থঃ) ॥২০০॥২০॥
মূলানুবাদ।—উক্ত বিষয়ের দৃঢ়তা সম্পাদনার্থ দৃষ্টান্ত
৫১৭
প্রদর্শন করিতেছেন;—প্রসিদ্ধ ঊর্ণনাভি(মাকড়শা) যেমন স্বশরীরোৎপন্ন সূত্র দ্বারা উর্দ্ধে গমন করে, এবং অগ্নি হইতে যেরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গসমূহ চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হয়, ঠিক তদ্রূপ এই আত্মা হইতেও—বিজ্ঞানময় আত্মা জাগরিত হইবার পূর্ব্বপর্যন্ত, যে আত্মা স্বস্বরূপে অবস্থান করে, সেই আত্মা হইতেও সমস্ত প্রাণ, শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়বর্গ, সমস্ত লোক—ভোগস্থান স্বর্গাদি, সমস্ত দেবতা—ইন্দ্রিয় ও ভোগস্থানের অধিপতিগণ এবং সমস্ত ভূত(প্রাণিগণ) নানাকারে—দেব, তির্য্যক্ ও মনুষ্যাদিরূপে উত্থিত হয়। সেই আত্মার রহস্য নাম হইতেছে—সত্যের সত্য; প্রাণসমূহ সত্য, এই আত্মা সে সমুদায়েরও সত্য, অর্থাৎ সত্যতা-সম্পাদক ॥ ১০০ ॥ ২০ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্র দৃষ্টান্তঃ,—যথা লোকে উর্ণনাভিঃ লূতাকীটঃ এক এব প্রসিদ্ধঃ সন্ স্বাত্মাপ্রবিভক্তেন তন্তুনা উচ্চরেৎ উদগচ্ছেৎ; নচাস্তি তস্যো- দগমনে স্বতোহতিরিক্তং কারকান্তরম্; যথা চ একরূপাদেকম্মাদগ্নেঃ ক্ষুদ্রা অল্পা বিস্ফুলিঙ্গাঃ ত্রুটরঃ অগ্নবয়বাঃ ব্যুচ্চরন্তি বিবিধং নানা বা উচ্চরন্তি। যথেমৌ দৃষ্টান্তৌ কারকভেদাভাবেহপি প্রবৃত্তিং দর্শয়তঃ, প্রাক্ প্রবৃত্তেশ্ব স্বভাবতঃ একত্বম্, এবমেব অস্মাদাত্মনঃ বিজ্ঞানময়স্য প্রাক্ প্রতিবোধাদ যৎ স্বরূপম্, তস্মাদিত্যর্থঃ। সর্ব্বে প্রাণা বাগাদয়ঃ সর্ব্বে লোকাঃ—সর্ব্বাণি কর্মফলানি, সর্ব্বে দেবাঃ প্রাণ- লোকাধিষ্ঠাতারঃ অগ্ন্যাদয়ঃ, সর্ব্বাণি ভূতানি ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানি প্রাণিজাতানি— ‘সর্ব্বে এত আত্মানঃ’ ইত্যস্মিন্ পাঠে উপাধিসম্পর্কজনিতপ্রবুদ্ধ্যমানবিশেষাত্মান ইত্যর্থঃ; ব্যুচ্চরন্তি। ১
টীকা।—বস্তুন্তরাভাবস্যাসিদ্ধিং শঙ্কিত্বা দূষরতি—নন্বিত্যাদিনা। ক্রিয়াবতো মৃদাদের্ঘটা- দ্যুৎপত্তিদর্শনাদ্ব্রহ্মণোহক্রিয়ত্বাত্ততো ন প্রাণাদ্যুৎপত্তিরিতি শঙ্কতে—তৎ কথমিতি। সৃষ্টৈর্মায়া- ময়ত্বমাশ্রিত্য শ্রুত্যা পরিহরতি—উচ্যত ইতি। স্বাত্মাপ্রবিভক্তেনেত্যুক্তমন্বয়ং ব্যতিরেকদ্বারা স্ফোরয়তি—ন চেতি। অসহায়স্য কারণত্বে দৃষ্টান্তমুক্ত। কূটস্থস্য তদ্ভাবে দৃষ্টান্তমাহ—যথা চেতি। মাধ্যন্দিনশ্রুতিমাশ্রিত্যাহ—সর্ব্ব এত ইতি। ১
যস্মাদাত্মনঃ স্থাবর-জঙ্গমং জগদিদম্ অগ্নিস্ফুলিঙ্গবদ্ ব্যুচ্চরত্যনিশম্, যস্মিন্নেব চ প্রলীয়তে জলবুদ্বুদবৎ, যদাত্মকং চ বর্ত্ততে স্থিতিকালে, তস্যাস্য আত্মনঃ ব্রহ্মণ উপনিষৎ—উপ—সমীপং নিগময়তীত্যভিধায়কঃ শব্দ উপনিষদিত্যুচ্যতে,—শাস্ত্র- প্রামাণ্যাদেতচ্ছব্দগতো বিশেষোহবসীয়তে—উপনিগমরিতৃত্বং নাম। কাসাবুপ- নিষৎ? ইত্যাহ—সত্যস্য সত্যমিতি। সা হি সর্ব্বত্র চোপনিষৎ অলৌকিকার্থত্বাৎ
, দুর্বিজ্ঞেয়ার্থা, ইতি তদর্থমাচষ্টে—প্রাণা বৈ সত্যম্, তেষামেষ সত্যমিতি। এতস্যৈব বাক্যস্য ব্যাখ্যানায়োত্তরং ব্রাহ্মণদ্বয়ং ভবিষ্যতি ॥ ২
তস্যেত্যাদ্যবতার্য্য ব্যাচষ্টে-যম্মাদিত্যাদিনা। ননু প্রত্যগ্ভূতস্য ব্রহ্মণো বাচকেষু শব্দান্তরেঘপি সৎসু কিমিত্যেতচ্ছব্দবিষয়মাদরণং ক্রিয়তে, তত্রাহ-শাস্ত্রেতি। ব্রাহ্মণবাক্যার্থো- হপি কথং নিশ্চয়তামিত্যাশঙ্ক্যাহ-এতস্যেতি। ২
ভবতু তাবদুপনিষদ্ব্যাখ্যানায় উত্তরং ব্রাহ্মণদ্বয়ম্; তস্যোপনিষদিত্যুক্তম্; তত্র ন জানীমঃ কিং প্রকৃতস্যাত্মনো বিজ্ঞানময়স্য পাণিপেষণোত্থিতস্য সংসারিণঃ শব্দাদিভুজ ইয়মুপনিষৎ? আহোস্বিৎ অসংসারিণঃ কস্যচিৎ? কিঞ্চাতঃ? যদি সংসারিণঃ, তদা সংসার্য্যেব বিজ্ঞেয়ঃ; তদ্বিজ্ঞানাদেব সর্ব্বপ্রাপ্তিঃ, স এব ব্রহ্মশব্দ- বাচ্যঃ, তদ্বিদ্যৈব ব্রহ্মবিদ্যেতি; অথ অসংসারিণঃ, তদা তদ্বিষয়া বিদ্যা ব্রহ্মবিদ্যা, তস্মাচ্চ ব্রহ্মবিজ্ঞানাৎ সর্ব্বভাবাপত্তিঃ; সর্বমেতচ্ছাস্ত্রপ্রামাণ্যাদ্ভবিষ্যতি; কিন্তু অস্মিন্ পক্ষে “আত্মেত্যেবোপাসীত” “আত্মানমেবাবেৎ-অহং ব্রহ্মাস্মি” ইতি পর- ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপাদিকাঃ শ্রুতয়ঃ কুপ্যেরন্, সংসারিণশ্চান্যস্যাভাবে উপদেশানর্থ- ক্যাৎ। যত এবং পণ্ডিতানামপ্যেতৎ মহামোহস্থানম্ অনুক্তপ্রতিবচনপ্রশ্ন- বিষয়ম্, অতো যথাশক্তি ব্রহ্মবিদ্যা প্রতিপাদকবাক্যেষু ব্রহ্মবিজিজ্ঞাসুনাং বুদ্ধিব্যুৎ- পাদনায় বিচারয়িষ্যামঃ। ৩
উক্তমঙ্গীকৃত্য বিশেষাদৃষ্ট্যা সংশয়ানো বিচারং প্রস্তৌতি-ভবত্বিতি। সন্দিগ্ধং সপ্রয়োজনং চ বিচার্য্যমিতি ন্যায়েন সন্দেহমুক্ত। বিচারপ্রযোজকং প্রয়োজনং পৃচ্ছতি-কিং চাত ইতি। কম্মিপক্ষে কিং ফলতীতি পৃষ্টে প্রথমপক্ষমনুদ্য তস্মিন্ ফলমাহ-যদীতি। যদ্বিজ্ঞানান্মুক্তিস্তস্যৈব জ্ঞেরতা, ন জীবস্থেত্যাশঙ্ক্যাহ-তদ্বিজ্ঞানাদিতি। ব্রহ্মজ্ঞানাদেব সা, ন সংসারিজ্ঞানাদিত্যা- শঙ্ক্যাহ-স এবেতি। যদ্বিদ্যা ব্রহ্মবিদ্যা, তদেব ব্রহ্ম, ন সংসারীত্যাশঙ্ক্যাহ-তদ্বিদ্যৈবেতি। আদ্যকল্লীয়ফলসমাপ্তাবিতি-শব্দঃ। পক্ষান্তরমনুদ্য তস্মিন্ ফলমাহ-অথেত্যাদিনা! কিমত্র নিয়ামকমিত্যাশঙ্কা ব্রহ্ম বা ইদমিত্যাদি শাস্ত্রমিত্যাহ-সর্ব্বমেতদিতি। ব্রহ্মোপনিষৎপক্ষে শাস্ত্রপ্রামাণ্যাৎ সর্ব্বং সমঞ্জসং চেত্তথৈবাস্ত, কিং বিচারেণেত্যাশঙ্কা জীবব্রহ্মণোর্ভেদোহভেদো বেতি বিকল্প্যাদে দোষমাহ-কিস্তিতি। অভেদপক্ষং দুষয়তি-সংসারিণশ্চেতি। উপদেশানর্থ- ক্যাডভেদপক্ষানুপপত্তিরিতি শেষঃ। বিশেষানুপলন্তস্য সংশয়হেতুত্বমনুবদতি-যত ইতি। পক্ষদ্বয়ে ফলপ্রতীটিং পরামৃশতি-এবমিতি। অন্বয়ব্যতিরেককৌশলং পাণ্ডিত্যম্। এত- দিতৈকাত্ম্যোক্তিঃ। মহত্ত্বং মোহস্য বিচারোত্থনির্ণয়ং বিনাহমুচ্ছিন্নম্, তস্য স্থানমালম্বনং। কেনাপি নোক্তং প্রতিবচনং যস্য-কিং তদৈকাত্ম্যমিতি প্রশ্নস্থ, তস্য বিষয়ভূতমিতি যাবৎ। ন হি যেন কেনচিদৈকাত্ম্যং প্রষ্টুং প্রতিবক্তুং বা শক্যতে। ‘শ্রবণায়াপি বহুভির্ষো ন লভ্যঃ’ ইত্যাদিশ্রুতেরিত্যর্থঃ। বিচারপ্রযোজকমুক্ত। তৎকাৰ্য্যং বিচারমুপসংহরতি-অত ইতি। ৩ ন তাবৎ অসংসারী পরঃ—পাণিপেষণপ্রতিবোধিতাং শব্দাদিভূজোহবস্থান্তর-
বিশিষ্টাৎ, উৎপত্তিশ্রুতেঃ। ন প্রশাসিতা অশনায়াদিবর্জিতঃ পরো বিদ্যতে; কস্মাৎ? যস্মাৎ ‘ব্রহ্ম জ্ঞপয়িষ্যামি’ ইতি প্রতিজ্ঞায়, সুপ্তং পুরুষং পাণিপেষং‘বোধ- য়িত্বা, তং শব্দাদিভোক্তৃত্ববিশিষ্টং দর্শয়িত্বা, তস্যৈব স্বপ্নদ্বারেণ সুষুপ্ত্যাখ্যমবস্থা- স্তরমুন্নীয়, তস্মাদেবাত্মনঃ সুষুপ্তাবস্থাবিশিষ্টাদ অগ্নিবিস্ফুলিঙ্গোর্ণনাভিদৃষ্টান্তাভ্যাম উৎপত্তিং দর্শয়তি শ্রুতিঃ-“এবমেবাস্মাৎ” ইত্যাদিনা। ন চান্যো জগদুৎপত্তি- কারণমন্তরালে শ্রুতোহস্তি, বিজ্ঞানময়স্যৈব হি প্রকরণম্। ৪
সংশয়াদিনা বিচারকার্য্যতামবতার্য্য পূর্ব্বপক্ষয়তি-ন তাবদিতি। জগৎকর্তা হীশ্বরো বিবক্ষ্যতে, প্রকৃতে চ সুষুপ্তিবিশিষ্টাজ্জীবাজ্জগজ্জন্মোচ্যতে, তস্মাদীশ্বরো জীবাদতিরিক্তো নাস্তীত্যর্থঃ। তদেব প্রপঞ্চয়তি-নেত্যাদিনা। প্রকৃতেহপি জীবে জগৎকারণত্বমীশ্বরস্যৈবাত্র শ্রুতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। তত্র প্রকরণবিরোধং হেতুমাহ-বিজ্ঞানেতি। ৪
সমানপ্রকরণে চ শ্রুত্যন্তরে কৌষীতকিনাম্ আদিত্যাদি-পুরুষান্ প্রস্তুত্য “স হোবাচ, যো বৈ বালাকে, এতেষাং পুরুষাণাং কর্তা, যস্য চৈতৎ কৰ্ম্ম, স বৈ বেদিতব্যঃ” ইতি প্রবুদ্ধস্যৈব বিজ্ঞানময়স্য বেদিতব্যতাং দর্শয়তি, নার্থান্তরস্য। তথা চ “আত্মনস্ত কামায় সর্ব্বং প্রিয়ং ভবতি” ইত্যুক্তা, য এবাত্মা প্রিয়ঃ প্রসিদ্ধঃ, তস্যৈব দ্রষ্টব্য-শ্রোতব্য-মন্তব্য-নিদিধ্যাসিতব্যতাং দর্শয়তি। তথা চ বিদ্যোপন্যাস- কালে “আত্মেত্যেবোপাসীত”, “তদেতৎ প্রেয়ঃ পুত্রাৎ প্রেয়ো বিত্তাৎ”, “তদাত্মা- নমেবাবেদহং ব্রহ্মাশ্মীতি” এবমাদিবাক্যানামানুলোম্যং স্যাৎ পরাভাবে। বক্ষ্যতি চ—“আত্মানং চেদ্বিজানীয়াদয়মস্মীতি পুরুষঃ” ইতি। ৫
শ্রুতান্তরবশাদপি জীব এবাত্র জগৎকর্তেত্যাহ-সমানপ্রকরণে চেতি। শ্রুতান্তরস্য চ জীববিষয়ত্বং জগদ্বাচিত্বাধিকরণপূর্ব্বপক্ষন্যায়েন দ্রষ্টব্যম্। বাক্যশেষবশাদপি জীবস্যৈব বেদিতব্যত্বং বাক্যান্বয়াধিকরণপূর্ব্বপক্ষন্যায়েন দর্শয়তি-তথা চেতি। জীবাতিরিক্তস্য পরস্য বেদিতব্যস্যাভাবে পূর্ব্বোত্তরবাক্যানা(ণা)মানুকূল্যং হেত্বন্তরমাহ-তথাচেত্যাদিনা। ৫
সর্ব্ববেদান্তেষু চ প্রত্যগাত্মবেদ্যতৈব প্রদর্শ্যতে অহমিতি, ন বহির্বেদ্যতা শব্দাদিবৎ প্রদর্শ্যতে—অসৌ ব্রহ্মেতি। তথা কৌষীতকিনামের “ন বাচং বি- জিজ্ঞাসীত, বক্তারং বিদ্যাৎ” ইত্যাদিনা বাগাদিকরণৈর্ব্যাপৃতস্য কর্ত্তুরেব বেদি- তব্যতাং দর্শয়তি। ৬
ইতশ্চ জীবস্যৈব বেদ্যতেত্যাহ—সর্ব্বেতি। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ—তথেতি। স বৈ বেদিতব্য ইত্যত্র ন স্পষ্টং জীবস্য বেদিতব্যত্বমিহ তু স্পষ্টমিতি ভেদঃ। ৬
অবস্থান্তরবিশিষ্টোহসংসারীতি চেৎ—অথাপি স্যাৎ, যো জাগরিতে শব্দাদিভুগ্ বিজ্ঞানময়ঃ, স এব সুষুপ্তাখ্যমবস্থান্তরং গতঃ অসংসারী পরঃ প্রশাসিতা অন্যঃ স্যাদিতি চেৎ; ন, অদৃষ্টত্বাৎ; নহ্যেবংধৰ্ম্মকঃ পদার্থো দৃষ্টোহন্যত্র বৈনাশিক-
‘সিদ্ধান্তাৎ। নহি, লোকে গৌঃ তিষ্ঠন্ গচ্ছন্ বা গৌর্ভবতি, শয়ানস্ত অশ্বাদি- জাত্যন্তরমিতি। ন্যায়াচ্চ—যদ্ধর্ম্মকো যঃ পদার্থঃ প্রমাণেনাবগতো ভবতি, স দেশকালাবস্থান্তরেষপি তদ্ধর্ম্মক এব ভবতি; স চেৎ তদ্ধর্ম্মকত্বং ব্যভিচরতি, সর্ব্বঃ প্রমাণব্যবহারো লুপ্যেত। তথাচ ন্যায়বিদঃ সাংখ্য-মীমাংসকাদয়ঃ অসংসারিণো- হভাবং যুক্তিশতৈঃ প্রতিপাদয়ন্তি। ৭॥
স্বাপাবস্থাজ্জীবাজ্জগজন্মশ্রুতেস্তস্যৈব বেদ্যত্বদৃষ্টেশ্চ জগদ্ধেতুরীশ্বরো বেদান্তবেদ্যো নাস্তীত্যুক্তে সেম্বরবাদী চোদয়তি-অবস্থান্তরেতি। চোদ্যমেব বিবৃণোতি-অথাপীতি। উক্তোপপত্তি- সত্ত্বেহপীতি যাবৎ। নাবস্থাভেদাদ্বস্তভেদন্তধাহননুভবাদপরাদ্ধান্তাচ্চেতি পরিহরতি-ন দৃষ্টত্বাদিতি। অবস্থাভেদাদ্বস্তভেদাভাবং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-স হীতি। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ- স্যায়াচ্চেতি। জাগরাদিবিশিষ্টস্যৈব স্বাপবৈশিষ্ট্যাত্তস্য সংসারিত্বান্নেশ্বরোহস্তীত্যুক্ত। তদভাবে বাদিসম্মতিমাহ-তথা চেতি। আদিশব্দো লোকায়তাদি-সমস্তনিরীশ্বরবাদিসংগ্রহার্থঃ-যুক্তি- শতৈরিতি। তস্য দেহিত্বেহম্মদাদিতুল্যত্বাত্তদভাবে মুক্তবজ্জগৎকর্তৃত্বাযোগাজ্জীবানামেবাদৃষ্টদ্বারা তৎকর্তৃত্বসম্ভবাত্তস্যাকিঞ্চিৎকরত্বমিত্যাদিভিরিত্যর্থঃ। ৭
সংসারিণোহপি জগদুৎপত্তিস্থিতিলয়-ক্রিয়াকর্তৃত্ববিজ্ঞানস্যাভাবাদযুক্তমিতি চেৎ; যৎ মহতা প্রপঞ্চেন স্থাপিতং ভবতা, শব্দাদিভুক্ সংসার্য্যেবাবস্থান্তরবিশিষ্টো জগত ইহ কর্তেতি, তদসৎ; যতো জগদুৎপত্তিস্থিতিলয়ক্রিয়াকর্তৃত্ববিজ্ঞানশক্তিসাধনা- ভাবঃ সর্ব্বলোকপ্রত্যক্ষঃ সংসারিণঃ; স কথমম্মদাদিঃ সংসারী মনসাপি চিন্তয়িতুম- শক্যং পৃথিব্যাদিবিন্যাসবিশিষ্টং জগৎ নিৰ্ম্মিণুয়াৎ? অতোহযুক্তমিতি চেৎ; ন, শাস্ত্রাৎ; শাস্ত্রং সংসারিণঃ “এবমেবাস্মাদাত্মনঃ” ইতি জগদুৎপত্যাদি দর্শয়তি; তস্মাৎ সর্ব্বং শ্রদ্ধেয়মিতি স্যাদয়মেকঃ পক্ষঃ। ৮
জীবো জগজ্জন্মাদিহেতুর্ন ভবতি তত্রাসমর্থত্বাৎ, পাষাণবৎ, তচ্চ সংসারিত্বাদিতি শঙ্কতে— সংসারিণোহপীতি। ঈশ্বরস্যৈবেত্যপেরর্থঃ। অযুক্তং প্রাণাদিকর্তৃত্বমিতি শেষঃ। সংগ্রহবাক্যং বিবৃণোতি—যন্মহতেত্যাদিনা। কালাত্যয়াপদেশেন দূষয়তি—ন শাস্ত্রাদিতি। নিরীশ্বরবাদ- মুপসংহরতি—তস্মাদিতি। ৮
“যঃ সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিদ্” “যোহশনায়াপিপাসে অত্যেতি” “অসঙ্গো নহি সজ্যতে”, “এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে” “যঃ সর্ব্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্নন্তর্যাম্যমৃতঃ” “সমস্তান্ পুরুষান্ নিরুহ্যাত্যক্রামৎ” “স বা এষ মহানজ আত্মা” “এষ সেতুর্বিধরণঃ” “সর্ব্বস্থ্য বশী সর্ব্বশ্যেশানঃ” “য আত্মা অপহতপাপ্যা বিজরো বিমৃত্যুঃ” “তৎ তেজোহসৃজত” “আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীৎ” “ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন বাহ্যঃ” ইত্যাদিশ্রুতি- শতেভ্যঃ—স্মৃতেশ্চ “অহং সর্ব্বশ্য প্রভবো মত্তঃ সর্ব্বং প্রবর্ত্ততে” ইতি—পরোহস্তা- সংসারী, শ্রুতিস্মৃতিন্যায়েভ্যশ্চ, স চ কারণং জগতঃ। ৯
৫২১
সেশ্বরবাদমুখাপয়তি—যঃ সর্ব্বজ্ঞ ইত্যাদিনা। তান্ পৃথিব্যাদ্যভিমানিনুঃ পুরুষান্নিরুহ্যোৎপাদ্য যোহতিক্রান্তবান্, স এষ সর্ব্ববিশেষশূন্য ইতি যাবৎ। উদাহৃতাঃ শ্রুতয়ঃ স্মৃতয়শ্চ। ন্যায়স্তু— বিচিত্রং কার্য্যং বিশিষ্টজ্ঞানবৎপূর্ব্বকং, প্রাসাদাদৌ তথোপলন্তাদিত্যাদিঃ। ৯
ননু “এবমেবাম্মাদাত্মনঃ” ইতি সংসারিণ এবোৎপত্তিং দর্শয়তীত্যুক্তম্; ন, “য এষোহন্তহৃদয় আকাশঃ” ইতি পরস্য প্রকৃতত্বাৎ “অস্মাদাত্মনঃ” ইতি যুক্তঃ ‘পরস্যৈব পরামর্শঃ। “কৈষ তদাহভূৎ” ইত্যস্য প্রশ্নস্য। প্রতিবচনত্বেনাকাশ-শব্দবাচ্যঃ ‘পর আত্মোক্ত:-’য এষোহন্তহৃদয় আকাশস্তস্মিঙ্গেতে’ ইতি; “সতা সোম্য তদা ‘সম্পয়ো ভবতি”, “অহরহর্গচ্ছন্ত্য এতং ব্রহ্মলোকং ন বিন্দন্তি”, “প্রাজ্ঞেনাত্মনা ‘সংপরিঘক্তঃ”, “পর আত্মনি সম্প্রতিষ্ঠতে” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ আকাশশব্দঃ পর আত্মেতি নিশ্চীয়তে। “দহরোহস্মিন্নন্তরাকাশঃ” ইতি প্রস্তুত্য তস্মিন্নেবাত্মশব্দ- যোগাচ্চ-প্রকৃত এব পর আত্মা, তস্মাদযুক্তম্ “এবমেবাম্মাদাত্মনঃ” ইতি মাত্মন এব সৃষ্টিরিতি; সংসারিণঃ সৃষ্টিস্থিতিসংহারজ্ঞানসামর্থ্যাভাবং চাবোচাম। ১০
প্রকরণমনুসৃত্য জীবস্য প্রাণাদিকারণত্বমুক্তং স্মারয়তি-নন্বিতি। নেদং জীবস্য প্রকরণ- ‘মিতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। প্রতিবচনস্থাকাশশব্দস্য পরবিষয়ত্বমসিদ্ধমিত্যাশঙ্ক্যাহ-কৈষ ইতি। ইতশ্চাকাশশব্দস্য পরমাত্মবিষয়তেত্যাহ-দহরোইস্মিন্নিতি। য আত্মাহপহতপাপ্যে ত্যাত্ম- শব্দপ্রয়োগঃ। প্রতিবচনে পরস্যাকাশশব্দবাচ্যত্বে ফলিতমাহ-প্রকৃত এবেতি। তস্য প্রকৃতত্বে লব্ধমর্থমাহ-তস্মাদিতি। ইতশ্চ পরম্মাদেব প্রাণাদিসৃষ্টিরিত্যাহ-সংসারিণ ইতি। যৎ মহতা প্রপঞ্চেনেত্যাদাবিতি শেষঃ। ১০
অত্র চ “আত্মেত্যেবোপাসীত”, “আত্মানমেবাবেদহং ব্রহ্মাস্মি” ইতি ব্রহ্মবিদ্যা প্রস্তুতা; ব্রহ্মবিষয়ঞ্চ ব্রহ্মবিজ্ঞানমিতি, “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি” ইতি “ব্রহ্ম জ্ঞপরিষ্যামি” ইতি প্রারব্ধম্। তত্রেদানীমসংসারি ব্রহ্ম জগতঃ কারণমশনায়াদ্যতীতং নিত্য- শুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাবম্, তদ্বিপরীতশ্চ সংসারী; তস্মাদহং ব্রহ্মাস্মীতি ন গৃহ্নীয়াৎ। পরং হি দেবমীশানং নিকৃষ্টঃ সংসারী আত্মত্বেন স্মরন্ কথং ন দোষভাক্ স্যাৎ? তস্মা- ন্নাহং ব্রহ্মাস্মীতি যুক্তম্। ১১
অস্তীশ্বরো জগৎকারণং ব্রহ্ম, তদেব জীবস্য স্বরূপং, তস্যেয়মুপনিষদিতি সিদ্ধান্তমাশঙ্ক্য ‘দূষয়তি-অত্র চেতি। তৃতায়োহধ্যায়ঃ সপ্তম্যর্থঃ। কা পুনঃ সা ব্রহ্মবিদ্যেতি, তত্রাহ-ব্রহ্ম- বিষয়ং চেতি। ইতি ব্রহ্মবিদাং প্রসিদ্ধমিতি শেষঃ। চতুর্থে ব্রহ্মবিদ্যা প্রস্তুতেত্যাহ-ব্রহ্মেতি। সত্যমস্তি প্রস্তুতা ব্রহ্মবিদ্যা, সা জীববিদ্যাহপি ভবতি, জীবব্রহ্মণোরভেদাদিত্যাশঙ্ক্যাহ- ‘তত্রেতি। ব্রহ্মবিদ্যায়াং প্রস্তুতায়ামিতি যাবৎ। ইদানীং ন গৃহ্নীয়াদিতি সম্বন্ধঃ। মিথোবিরুদ্ধত্ব- প্রতীত্যবস্থায়ামিত্যেতৎ। অন্যোন্যবিরুদ্ধত্বং তচ্ছব্দার্থঃ। বিপক্ষে দোষমাহ-পরমিতি। ১১
তস্মাৎ পুষ্পোদকাঞ্জলিস্তুতিনমস্কারবলুপহারস্বাধ্যায়ধ্যানযোগাদিভিঃ আরিব-
ধরিষেত। আরাধনেন বিদিত্বা সর্ব্বেশিতৃ ব্রহ্ম, ভবতি; ন পুনরসংসারি ব্রহ্ম সংসার্য্যাত্মত্বেন চিন্তয়েৎ—অগ্নিমিব শীতত্বেন, আকাশমিব মূর্ত্তিমত্ত্বেন। ব্রহ্মাত্মত্ব- প্রতিপাদকমপি শাস্ত্রম্ অর্থবাদো ভবিষ্যতি। সর্ব্বতর্কশাস্ত্রলোকন্যায়ৈশ্চৈব- মবিরোধঃ স্যাৎ। ১২ ২১-১১
কথং তহীস্বরে মতিং কুৰ্য্যাদিত্যাশঙ্ক্য, স্বামিত্বেনেত্যাহ-তস্মাদিতি। আদিপদং প্রদক্ষিণাদিসংগ্রহার্থম্। ঐকাত্ম্যশাস্ত্রাদাত্মমতিরেব ব্রহ্মণি কর্তব্যেত্যাশঙ্ক্যাহ-ন পুনরিতি। কা তর্হি শাস্ত্রগতিস্তত্রাহ-ব্রহ্মেতি। মুখ্যার্থত্বসম্ভবে কিমিত্যর্থবাদতেত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্ব্বেতি। সংসারিত্বাসংসারিত্বাদিনা মিথো বিরুদ্ধয়োর্জীবেশ্বরয়োঃ শীতোষ্ণবদৈক্যানুপপত্তির্ন্যায়ঃ। ১২
ন, মন্ত্র-ব্রাহ্মণবাদেভ্যস্তস্যৈব প্রবেশশ্রবণাৎ, “পুরশ্চক্রে” ইতি প্রকৃত্য “পুরঃ পুরুষ আবিশৎ” ইতি, “রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব, তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায়”, “সর্ব্বানি রূপাণি বিচিত্য ধীরো নামানি কৃত্বাভিবদন্ যদাস্তে” ইতি সর্ব্বশাখাসু সহস্রশো মন্ত্রবাদাঃ সৃষ্টিকর্ত্তুরেবাসংসারিণঃ শরীরপ্রবেশং দর্শয়ন্তি; তথা ব্রাহ্মণ- বাদাঃ-“তৎ সৃষ্টা তদেবানুপ্রাবিশৎ”, “স এতমেব সীমানং বিদার্য্যৈতয়া দ্বারা প্রাপদ্যত”, “সেয়ং দেবতা-ইমাস্তিস্রো দেবতা অনেন জীবেনাত্মনাহনুপ্রবিশ্য”, “এষ সর্ব্বেষু ভূতেষু গূঢ়োত্মা ন প্রকাশতে” ইত্যাদ্যাঃ। সর্ব্বশ্রুতিযু ব্রহ্মণ্যাত্ম- শব্দপ্রয়োগাৎ আত্মশব্দস্য চ প্রত্যগাত্মাভিধায়কত্বাৎ, “এষ সর্বভূতান্তরাত্মা” ইতি চ শ্রুতেঃ পরমাত্ম-ব্যতিরেকেণ সংসারিণোহভাবাৎ “একমেবাদ্বিতীয়ম্”, “ব্রহ্মৈ- বেদম্”, “আত্মৈবেদম্” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যো যুক্তমেব “অহং ব্রহ্মাস্মি” ইত্যেবাব- ধারয়িতুম্। ১৩
বিজ্ঞানাত্মবিষয়ত্বং তটস্থেশ্বরবিষয়ত্বং চোপনিষদো নিবারয়ন্ পরিহরতি-নেত্যাদিনা। পরস্যৈব প্রবেশবাদী মন্ত্রব্রাহ্মণবাদানুদাহরতি-পুর ইত্যাদিনা। যত্ত্বহং ব্রহ্মেতি ন গৃহ্নীয়াদিতি, তত্রাহ-সর্ব্বশ্রুতিষু চেতি। ১৩
যদৈবং স্থিতঃ শাস্ত্রার্থঃ, তদা পরমাত্মনঃ সংসারিত্বম্; তথা চ সতি শাস্ত্রান- র্থক্যম্, অসংসারিত্বে চোপদেশানর্থক্যৎ স্পষ্টো দোষঃ প্রাপ্তঃ। যদি তাবৎ পরমাত্মা সর্ব্বভূতান্তরাত্মা, সর্ব্বশরীর-সম্পর্কজনিতদুঃখান্যনুভবতীতি স্পষ্টং পরস্য সংসারিত্বং প্রাপ্তম্; তথাচ পরস্যাসংসারিত্ব-প্রতিপাদিকাঃ শ্রুতয়ঃ কুপ্যেরন্, স্মৃতয়শ্চ, সর্ব্বে চ ন্যায়াঃ। অথ কথঞ্চিৎ প্রাণশরীরসম্বন্ধজৈদুঃখৈঃ ন সম্বধ্যত- ইতি শক্যং প্রতিপাদয়িতুম্, পরমাত্মনঃ সাধ্য-পরিহার্য্যাভাবাৎ উপদেশানর্থক্য- দোষো ন শক্যতে নিবারয়িতুম্। ১৪
শাস্ত্রীয়মপ্যেকত্বমনিষ্টপ্রসঙ্গান্ন স্বীকর্তব্যমিতি শঙ্কতে-যদেতি। পরস্য সংসারিত্বে তদ- সংসারিত্বশাস্ত্রানর্থক্যং ফলিতমাহ-তথা চেতি। সংসারিণোহনন্যস্যাপি পরস্ত্যাসংসারিত্বে,
সংসারিত্বাভিমতোহপ্যসংসারীত্যুপদেশানর্থক্যং, তং বিনৈব মুক্তিসিদ্ধিরিতি দোষান্তরমাহ— অসংসারিত্বে চেতি। তত্রান্তং দোষং বিবৃণোতি—যদি ভাবদিতি। ‘ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন- বাহ্যঃ’ ইত্যাদ্যাঃ শ্রুতয়ঃ। ‘যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে’ ইত্যাদ্যাঃ স্মৃতয়ঃ। কূটস্থাসঙ্গত্বাদয়ো ন্যায়াঃ। দ্বিতীয়ং দোষং প্রসঙ্গমাপাদ্য প্রকটয়তি—অথেত্যাদিনা। ১৪
অত্র কেচিৎ পরিহারমাচক্ষতে,—পরমাত্মা ন সাক্ষাদ ভূতেষনুপ্রবিষ্টঃ স্বেন, রূপেণ; কিং তর্হি? বিকারভাবমাপন্নো বিজ্ঞানাত্মত্বং প্রতিপেদে। স চ বিজ্ঞা- নাত্মা পরমাদন্যঃ অনন্যশ্চ; যেনান্যঃ, তেন সংসারিত্বসম্বন্ধী, যেনানন্যঃ, তেন অহং ব্রহ্মেতি ধারণার্হঃ; এবং সর্ব্বমবিরুদ্ধং ভবিষ্যতীতি। ১৫
দোষদ্বয়ে স্বযূথ্যসমাধিমুখাপরতি—অত্রেতি। কথং তর্হি তস্য কার্য্যে প্রবিষ্টস্য জীবত্বং, তত্রাহ—কিং তহীতি। জীবস্য ব্রহ্মবিকারত্বেহপি ততো ভেদান্নাহং ব্রহ্মেতি ধীঃ, অভেদে- ব্রহ্মণোহপি সংসারিতেত্যাশঙ্ক্যাহ—স চেতি। তথাপি কথং শঙ্কিতদোষাভাবস্তত্রাহ— যেনেতি। এবমিতি ভিন্নাভিন্নত্বপরামর্শঃ। সর্ব্বমিত্যুপদেশাদিনিৰ্দ্দেশঃ। ১৫
তত্র বিজ্ঞানাত্মনো বিকারপক্ষে এতা গতয়ঃ—পৃথিবীদ্রব্যবদনেকদ্রব্যস- মাহারস্য সাবয়বস্য পরমাত্মন একদেশবিপরিণামো বিজ্ঞানাত্মা ঘটাদিবৎ; পূর্ব্ব- সংস্থানাবস্থস্য বা পরস্যৈকদেশো বিক্রিয়তে, কেশোষরাদিবৎ; সর্ব্ব এব বা পরঃ পরিণমেৎ, ক্ষীরাদিবৎ। তত্র সমানজাতীয়ানেকদ্রব্যসমূহস্য কশ্চিদ্ দ্রব্যবিশেষো বিজ্ঞানাত্মত্বং প্রতিপদ্যতে যদা, তদা সমানজাতীয়ত্বাদেকত্বমুপচরিতমেব, ন তু পরমার্থতঃ; তথা চ সতি সিদ্ধান্তবিরোধঃ। ১৬ ✓৯৭॥
একদেশিমতং নিরাকর্তুং বিকল্পরতি-তত্রেতি। এতা গতয় ইত্যেতে পক্ষা বক্ষ্যমাণাঃ: সম্ভবন্তি, ন গত্যন্তরমিত্যর্থঃ। যথা পৃথিবীশব্দিতং দ্রব্যমনেকাবয়বসমুদায়স্তথা ভূত-- ভৌতিকাত্মকানে কদ্রবাসমুদায়ঃ সাবয়বঃ পরমাত্মা, তস্যৈকদেশশ্চৈতনলক্ষণস্তদ্বিকারো জীবঃ,. পৃথিব্যেকদেশমৃদ্ধিকারঘটশরাবাদিবদিত্যেকঃ কল্পঃ। যথা ভূমেরুষরাদিদেশো নখকেশাদির্ব্বা পুরুষস্থ্য বিকারস্তথাবয়বিনঃ পরস্যৈকদেশবিকারো জীব ইতি দ্বিতীয়ঃ কল্পঃ। যথা ক্ষীরং স্বর্ণং বা সর্বাত্মনা দধিরুকাদিরূপেণ পরিণমতে, তথা কৃৎস্ন এব পরো জীবভাবেন পরিণমেদিতি কল্লাস্তরম্। তত্রান্তমনুদ্য দূষয়তি-তত্রেত্যাদিনা। নানাদ্রব্যাণাং সমাহারো বা তানি: বান্যোন্যাপেক্ষাণি পরশ্চেৎ, ন তস্যৈক্যং স্যাৎ, ন হি বহুনাং মুখ্যমৈক্যং; ন চ সমুদায়াপরপর্য্যাস্য: সমুদারিভ্যো ভেদাভেদাভ্যাং দুর্ভণত্বেন কল্পিতত্বাদিত্যর্থঃ। তর্হি সমাহারস্য ব্রহ্মণো মুখ্যমৈক্যং মা ভূৎ, তত্রাহ-তথা চেতি। ন হি তন্নানাত্বং কন্যাপি সম্মতমিতি ভাবঃ। ১৬
অথ নিত্যাযুতসিদ্ধাবয়বানুগতোহবয়বী পর আত্মা, তস্য তদবস্থস্যৈকদেশো; বিজ্ঞানাত্মা সংসারী; তদাপি সর্ব্বাবয়বানুগতত্বাদবয়বিন এব অবয়বগতো দোষো গুণো বা, ইতি বিজ্ঞানাত্মনঃ সংসারিত্বদোষেণ পর এবাত্মা সম্বধ্যতে, ইতীয়মপ্য-- নিষ্টা কল্পনা। ক্ষীরবৎ সর্ব্বপরিণামপক্ষে সর্ব্বশ্রুতিস্মৃতিকোপঃ, স চানিষ্টঃ। ১৭
দ্বিতীয়মনুদ্য নিরাকরোতি—অথেত্যাদিনা। সর্ব্বদৈব পৃথগবস্থিতেষবয়বেষু জীবেধনুস্যত- শ্চেতনোহবয়বী পরশ্চেৎ, তহি যথা প্রত্যবয়বং মলসংসর্গে দেহস্য মলিনত্বং, তথা পরস্য জীবগতৈ- দুঃখৈহহন্দঃখং স্যাদিতি প্রথমকল্পনাবস্থিতীয়াপি কল্পনা ন যুক্তেত্যর্থঃ। তৃতীয়ং প্রত্যাহ— ক্ষীরবদিতি। ‘ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিৎ’ ইত্যাদ্যাঃ শ্রুতয়ঃ। ‘ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ’ ইত্যাদ্যাঃ স্মৃতয়ঃ। শ্রুত্যাদিকোপন্যেষ্টত্বমাশঙ্ক্য বৈদিকং প্রত্যাহ—সচেতি। ১৭
“নিষ্ক্রয়ং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং”, “দিব্যো হ্যমূর্ত্তঃ পুরুষঃ স বাহ্যাভ্যন্তরো হজঃ”, “আকাশবং সর্ব্বগতশ্চ নিত্যঃ”, “স বা এব মহানজ আত্মাজরোহমরোহমৃতঃ”, “ন ‘জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ”, “অব্যক্তোহয়ম্” ইত্যাদিশ্রুতি-স্মৃতি-ন্যায়বিরুদ্ধা এতে সর্ব্বে পক্ষাঃ। অচলস্য পরমাত্মন একদেশপক্ষে বিজ্ঞানাত্মনঃ কর্মফল-দেশ-সংসরণানু- পপত্তিঃ, পরস্য বা সংসারিত্বমিত্যুক্তম্। ১৮
শ্রুতিস্মৃতী বিবেচয়ন্ পক্ষত্রয়সাধারণং দূষণমাহ—নিষ্কলমিত্যাদিনা। কূটস্থস্য নিরবয়বস্য কাৎস্থ্যৈকদেশাভ্যাং পরিণামাসম্ভবো ন্যায়ঃ। জীবস্য পরমাত্মৈকদেশত্বে দোষান্তরমাহ— ‘অচলস্তেতি। একদেশস্যৈকদেশিব্যতিরেকেণাভাবাজ্জীবস্য স্বর্গাদিষু গত্যনুপপত্তিরিত্যুক্তম্, ‘অন্যথা পরস্যাপি গতিঃ স্যাৎ; ন হি পটাবয়বেষু চলৎসু পটো ন চলতীত্যাহ—পরস্য বেতি। ‘উক্তং যদি তাবৎ পরমাত্মেত্যাদাবিতি শেষঃ। ১৮
পরস্যৈকদেশোহগ্নিবিস্ফুলিঙ্গবৎ স্ফুটিতো বিজ্ঞানাত্মা সংসরতীতি চেৎ, তথাপি পরস্যাবয়ব-স্ফুটনেন ক্ষতপ্রাপ্তিঃ, তৎসংসরণে ১ পরমাত্ম-প্রদেশান্তরাবয়বব্যূহে চ্ছিদ্রতা প্রাপ্তিরব্রণত্ববাক্য-বিরোধশ্চ; আত্মাবয়বভূতস্য বিজ্ঞানাত্মনঃ সংসরণে পরমাত্ম-শূন্যপ্রদেশাভাবাদবয়বান্তর-নোদনব্যূহনাভ্যাং হৃদয়শূলেনের পরমাত্মনো দুঃখিত্বপ্রাপ্তিঃ। ১৯
জীবস্য সংসারিত্বেহপি পরস্য তন্নাস্তীতি শঙ্কতে-পরস্যেতি। পরস্য নিরবয়বত্বশ্রুতেরবয়ব- স্ফুটতানুপপত্তিং মন্থানো দূষয়তি-তথাপীতি। যত্র পরস্যাবয়বঃ স্ফুটতি, তত্র তস্য ক্ষতং ‘প্রাপ্নোতি, তদীয়াবয়বসংসরণে চ পরমাত্মনঃ প্রদেশান্তরেহবয়বানাং ব্যুহে সত্যুপচয়ঃ স্যাৎ, তথা “চ পরস্যাবয়বা যতো নির্গচ্ছন্তি তত্র চ্ছিদ্রতাপ্রাপ্তিঃ, যত্র চ তে গচ্ছন্তি তত্রোপচয়ঃ স্যাদিত্য- কায়মব্রণমস্থূলমনন্বহ্রস্বমিত্যাদিবাক্যবিরোধো ভবেদিত্যর্থঃ। পরস্যৈকদেশো বিজ্ঞানাত্মেতি পক্ষে দুঃণিত্বমপি তস্য দুর্ব্বারমাপতেদিতি দোষান্তরমাহ-আত্মাবয়বেতি। ১৯
অগ্নিবিস্ফুলিঙ্গাদিদৃষ্টান্তশ্রুতেন দোষ ইতি চেৎ; ন, শ্রুতেজ্ঞাপকত্বাৎ- -ন শাস্ত্রং পদার্থানন্যথাকর্তুং প্রবৃত্তম্, কিং তর্হি? যথাভূতানামজ্ঞাতানাং জ্ঞাপনে। কিংচাতঃ? শৃণু-অতো যদ্ভবতি; যথাভূতা মূর্তামূর্তাদিপদার্থধৰ্ম্মা লোকে প্রসিদ্ধাঃ; তদ্দৃষ্টান্তোপাদানেন তদবিরোধ্যের বস্তুন্তরং জ্ঞাপয়িতুৎ প্রবৃত্তং শাস্ত্রং, ন লৌকিকবস্তু-বিরোধজ্ঞাপনায় লৌকিকমেব দৃষ্টান্তমুপাদত্তে; উপাদীয়মানোইপি *দৃষ্টান্তোহনর্থকঃ স্যাৎ, দাষ্টান্তিকাসঙ্গতেঃ; নহি অগ্নিঃ শীতঃ, আদিত্যো ন তপ-
ভীতি বা দৃষ্টান্তশতেনাপি প্রতিপাদয়িতুং শক্যম্, প্রমাণান্তরেণ অন্যথাধিগাতত্বাদ্- বস্তুনঃ। ২০
মৃল্লোহবিস্ফুলিঙ্গদৃষ্টান্তশ্রুতিবশাৎ পরস্ত্যাবয়বা জীবাঃ সিধ্যন্তীত্যতো জীবানাং পরৈকদেশত্বে- নোক্তো দোষোহবতরতি, যুক্ত্যপেক্ষয়া শ্রুতের্ব্বলবত্ত্বাদিতি শঙ্কতে-অগ্নিবিস্ফুলিঙ্গাদীতি। শাস্ত্রার্থো যুক্তিবিরুদ্ধো ন সিধ্যতীতি দূষয়তি-ন শ্রুতেরিতি। নঞর্থং বিবৃণোতি-ন শাস্ত্র-- মিতি। হেতুভাগমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকং বিভজতে-কিং তহীতি। স্মৃত্যাদিব্যাবৃত্ত্যর্থমজ্ঞাতানা মিত্যুক্তম্। অস্তু শাস্ত্রমজ্ঞাতার্থজ্ঞাপকং, তথাপি পরস্য নাস্তি সাবয়বত্বমিত্যত্র কিমায়াতমিতি পৃচ্ছতি-কিং চাত ইতি। শাস্ত্রস্য যথোক্তস্বভাবত্বে যৎ পরস্য নিরবয়বত্বং ফলতি, তদুচ্যমানং - সমাহিতেন শ্রোতব্যমিত্যাহ-শৃণ্বিতি। তত্র প্রথমং লোকবিরোধেন শাস্ত্রপ্রবৃত্তিং দর্শয়তি- যথেতি। আদিপদেন ভাবাভাবাদি গৃহ্যতে। পদার্থেষেব ভোক্তৃপারতন্ত্র্যাদ্ধৰ্ম্মশব্দস্তেষাং লোক- প্রসিদ্ধপদার্থানাং দৃষ্টান্তানামুপন্যাসেনেতি যাবৎ। তদবিরোধি লোকপ্রসিদ্ধপদার্থাবিরোধী- ত্যর্থঃ। বস্তুস্তরং নিরবয়বাদি দাষ্টান্তিকম্। তদবিরোধ্যেবেত্যেবকারস্থ ব্যাবর্ত্যমাহ-ন- লৌকিকেতি। বিপক্ষে দোষমাহ-উপাদীয়মানোইপীতি। সামান্যেনোক্তমর্থং দৃষ্টান্তবিশেষ- নিবিষ্টতরা স্পষ্টয়তি-ন হীতি। অগ্নেরুকত্বমাদিত্যস্য তাপকত্বমন্যখেত্যুচ্যতে। ২০
ন চ প্রমাণং প্রমাণান্তরেণ বিরুধ্যতে; প্রমাণান্তরাবিষয়মেব হি প্রমাণান্তরং- জ্ঞাপয়তি। ন চ লৌকিকপদ-পদার্থাশ্রয়ণব্যতিরেকেণ আগমনেন শক্যমজ্ঞাতং. বস্ত্বন্তরমবগময়িতুম্; তস্মাৎ প্রসিদ্ধন্যায়মনুসরতা ন শক্যা পরমাত্মনঃ সাবয়বাং- শাংশিত্বকল্পনা পরমার্থতঃ প্রতিপাদয়িতুম্। ২১
ননু লৌকিকং প্রমাণং লৌকিকপদার্থাবিরুদ্ধমেব স্বার্থং সমর্পয়তি, বৈদিকং পুনরপৌরুষেয়ং তদ্বিরুদ্ধমপি স্বার্থং প্রমাপয়েদলৌকিকবিষয়ত্বাদত আহ-ন চেতি। নমু শ্রুতেরজ্ঞাতজ্ঞাপকত্বে লোকানপেক্ষত্বাত্তদ্বিরোধেহপি কা হানিস্তত্রাহ-ন চেতি। লোকাবগতসামর্থ্যঃ শব্দো বেদেহপি বোধক ইতি ন্যায়াত্তদনপেক্ষা শ্রুতির্নাজ্ঞাতং জ্ঞাপয়িতুমলমিত্যর্থঃ। শাস্ত্রস্য লোকানু-- সারিত্বে সিদ্ধে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। প্রসিদ্ধো ন্যায়ো লৌকিকো দৃষ্টান্তঃ।’ ন হি নিত্যস্থাকাশাদেঃ সাবয়বত্বং, পরশ্চ নিত্যোহভ্যুপগতঃ, তন্ন তস্য সাবয়বত্বেনাংশাশিত্বকল্পনা। বস্তুতঃ সম্ভবতি লোকবিরোধাদিত্যর্থঃ। ২১ “ক্ষুদ্রা বিস্ফুলিঙ্গাঃ” “মমৈবাংশঃ” ইতি চ ক্রয়তে স্মর্য্যতে চেতি। ন, একত্ব-- প্রত্যয়ার্থপরত্বাৎ; অগ্নেহি বিস্ফুলিঙ্গোহগ্নিরেব, ইত্যেকত্বপ্রত্যয়ার্হো দৃষ্টো লোকে;- তথা চ অংশঃ অংশিনৈকত্বপ্রত্যয়ার্হঃ। তত্রৈবং সতি বিজ্ঞানাত্মনঃ পরমাত্ম- বিকারাংশত্ববাচকাঃ শব্দাঃ পরমাত্মৈকত্ব-প্রত্যয়াভিধিৎসবঃ। ২২
জীবস্য পরাংশত্বানঙ্গীকারে শ্রুতিমৃত্যোর্গতির্ব্বক্তব্যেতি শঙ্কতে-ক্ষুদ্রা ইতি। তয়োর্গতি-- মাহ-নেত্যাদিনা। বিক্ষুলিঙ্গে দর্শিতং ন্যায়ং সর্ব্বত্রাংশমাত্রেহতিদিশতি-তথা চেতি। দৃষ্টান্তে যথোক্তনীত্যা স্থিতে দাষ্টান্তিকমাহ-তত্রেতি। পরমাত্মনা সহ জীবস্যৈকত্ববিষয়ং- প্রত্যয়মাধাতুমিচ্ছস্তীতি তথোক্তাঃ। ২২
উপক্রমোপসংহারাভ্যাঞ্চ,-সব্বাসু হি উপনিষৎসু পূর্ব্বমেকত্বং প্রতিজ্ঞায় ‘দৃষ্টান্তৈহেতুভিশ্চ পরমাত্মনো বিকারাংশাদিত্বং জগতঃ প্রতিপাদ্য পুনরেকত্ব- মুপসংহরতি; তদ্যথা ইহৈব তাৎৎ-“ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মা” ইতি প্রতিজ্ঞায় উৎপত্তিস্থিতিলয়হেতুদৃষ্টান্তৈর্ব্বিকারবিকারিত্বাদ্যেকত্বপ্রত্যয়হেতুন্ প্রতিপাদ্য “অনন্ত- ‘রমবাহ্যম্” “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” ইত্যুপসংহরিষ্যতি; তস্মাদুপক্রমোপসংহারাভ্যাম্ ‘অয়মর্থো নিশ্চয়তে-পরমাত্মৈকত্ব-প্রত্যয়-দ্রঢ়িয়ে উৎপত্তিস্থিতিলয়প্রতিপাদকানি বাক্যানীতি; অন্যপা বাক্যভেদপ্রসদাচ্চ। ২৩
তেষামেকত্বপ্রতায়াবতারহেতুত্বে হেত্বন্তরং সংগৃহ্নাতি-উপক্রমেতি। তদেব স্ফুটয়তি- সর্ব্বানু হীতি। উক্তমর্থমুসহরণনিষ্ঠতয়া বিভজতে-তদ্যথেতি। ইহোতি প্রকৃতোপনিষদুক্তিঃ। আদিশব্দেনাংশাংশিত্বাদি গৃহ্যতে। বিবৃতং সংগ্রহবাক্যমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। তেষাং স্বার্থ- নিষ্ঠত্বে দোষং বদন্নেকত্বপ্রতায়ার্থত্বে হেত্বন্তরমাহ-অন্যথেতি। ২৩
সর্ব্বোপনিষৎসু বিজ্ঞানাত্মনঃ পরমাত্মনৈকত্বপ্রত্যয়ো বিধীয়তে—ইত্যবিপ্রতি- পত্তিঃ সর্ব্বেধামুপনিষদ্বাদিনাম্। তদ্বিধ্যেকবাক্যযোগে চ সম্ভবতি উৎপত্যাদি- বাক্যানাং বাক্যান্তরত্বকল্পনায়াৎ ন প্রমাণমস্তি; ফলান্তরঞ্চ কল্পয়িতব্যং স্যাৎ; তস্মাদুৎপত্যাদিশ্রুতয় আত্মৈকত্বপ্রতিপাদনপরাঃ। ২৪
‘সম্ভবতোকবাক্যত্বে বাকাভেদশ্চ নেষ্যতে’ ইতি ন্যায়েনোক্তং প্রপঞ্চয়তি-সর্ব্বোপনিষৎ- স্থিতি। কিঞ্চ, তেষাং স্বার্থনিষ্ঠত্বে শ্রুতফলাভাবাৎ ফলান্তরং কল্পনীয়ম্। ন চৈকত্বপ্রত্যয়- বিষয়তয়া তৎফলে নিরাকাঙ্ক্ষেষু তেষু তৎকল্পনা যুক্তা, দৃষ্টে সত্যদৃষ্টকল্পনানবকাশাদিত্যাহ- ফলান্তরং চেতি। উৎপত্ত্যাদিশ্রুতীনাং স্বার্থনিষ্ঠত্বাসম্ভবে ফলিতমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ২৪
অত্র চ সম্প্রদায়বিদ আখ্যায়িকাং সম্প্রচক্ষতে-কশ্চিৎ কিল রাজপুত্রো জাতমাত্র এব মাতাপিতৃভ্যামপবিদ্ধো ব্যাধগৃহে সংবর্দ্ধিতঃ; সোহমুষ্য বংশ্যতা- মজানন্ ব্যাধজাতিপ্রত্যয়ো ব্যাধজাতিকৰ্ম্মাণ্যেবানুবর্ততে, ন রাজাস্মীতি রাজ- জাতিকৰ্ম্মাণ্যনুবর্ততে। যদা পুনঃ কশ্চিৎ পরমকারুণিকো রাজপুত্রস্য রাজশ্রী- প্রাপ্তিযোগ্যতাং জানন্ অমুষ্য পুত্রতাং বোধয়তি-ন ত্বং ব্যাধঃ, অমুষ্য রাজ্ঞঃ পুত্রঃ কথঞ্চিদ্ব্যাধস্য গৃহমনুপ্রবিষ্ট ইতি। স এবং বোধিতস্ত্যক্তা ব্যাধজাতিপ্রত্যর- কর্মাণি পিতৃপৈতামহীমাত্মনঃ পদবীমনুবর্ততে-রাজাহমস্মীতি। তথা কিল অয়ৎ পরম্মাদগ্নিবিস্ফুলিঙ্গাদিবৎ তজ্জাতিরেব বিভক্ত ইহ দেহেন্দ্রিয়াদিগহনে প্রবিষ্টঃ অসংসারী সন্ দেহেন্দ্রিয়াদিসংসারধর্মমনুবর্ততে-দেহেন্দ্রিয়সঙ্ঘাতোহস্মি, কৃশঃ স্থূলঃ সুখী দুঃখীতি-পরমাত্মতামজানন্নাত্মনঃ। ‘ন ত্বম্ এতদাত্মকঃ, পরমেব ব্রহ্বাসি অসংসারী’ ইতি প্রতিবোধিত আচার্য্যেণ, হিত্বৈষণাত্রয়ানুবৃত্তিং ব্রহ্মৈবাস্মীতি প্রতিপদ্যতে। ২৫
তত্ত্বমস্যাদিবাক্যমৈক্যপরঃ তচ্ছেবং সৃষ্ট্যাদিবাক্যমিতুত্তেহর্থে দ্রবিড়াচাৰ্য্যসম্মতিমাহ-অত্র চেভি। তত্র দৃষ্টান্তরূপামাখ্যায়িকাং প্রণয়তি-কশ্চিদিতি। জাতমাত্রে প্রাগবস্থায়ামের রাজাহম্মীত্যভিমানাভিব্যক্তেরিত্যর্থঃ। তাভ্যাং তৎপরিত্যাগে নিমিত্তবিশেষস্ত্যানিশ্চিতত্বদ্যোত- নার্থং কিলেত্যুক্তম্। ব্যাধজাতিপ্রত্যয়ন্তৎপ্রযুক্তো ব্যাধোহম্মীত্যভিমানো যস্য, স তথা। ব্যাধজাতিকর্মাণি তৎপ্রযুক্তানি মাংসক্রয়ণাদীনি। রাজাহম্মীত্যভিমানপূর্ব্বকং তজ্জাতি- প্রযুক্তানি পরিপালনাদীনি কর্মাণি অজ্ঞানং তৎকার্য্যং চোক্তা জ্ঞানং তৎফলং চ দর্শয়তি-যদেত্যাদিনা। বোধনপ্রকারমভিনয়তি-ন ত্বমিতি। কথং তহি শবরবেশ্ম- ‘প্রবেশস্তত্রাহ-কথঞ্চিদিতি। রাজাহম্মীত্যভিমানপূর্ব্বকমাত্মনঃ পিতৃপৈতামহীং পদবীমনু- বর্তত ইতি সম্বন্ধঃ। দাষ্টান্তিকরূপামাখ্যায়িকামাচষ্টে-তথেতি। জীবস্য পরস্মাদ্বিভাগে নিমিত্তমজ্ঞানং তৎকার্য্যং চ প্রসিদ্ধমিতি ঘ্যোতয়িতুং কিলেত্যুক্তম্। তজ্জাতিস্তৎস্বভাবো বস্তুতঃ পরমাত্মৈবেতি যাবৎ। ইহেত্যপরোক্ষানুভবগম্যতোক্তিঃ। গহনং গম্ভীরং বনম্। সংসার- ধর্মানুবর্তনে হেতুমাহ-পরমাত্মতামিতি। উক্তাবিদ্যাতৎকার্য্যবিরোধিনীং ব্রহ্মাত্মবিদ্যাং লম্ভয়তি-ন ত্বমিতি। ২৫
অত্র রাজপুত্রশ্য রাজপ্রত্যয়বদ্ ব্রহ্মপ্রত্যয়ো দৃঢ়ীভবতি—‘বিস্ফুলিঙ্গবদেব ত্বং ‘পরস্মাদ ব্রহ্মণো ভ্রষ্ট ইত্যুক্তে, বিস্ফুলিঙ্গস্য প্রাগগ্নেভ্রংশাদগ্ন্যেকত্বদর্শনাৎ। তস্মাদেকত্বপ্রত্যয়দার্ঢ্যায় সুবর্ণমণিলোহাগ্নিবিস্ফুলিঙ্গদৃষ্টান্তাঃ, নোৎপত্যাদিভেদ- প্রতিপাদনপরাঃ। সৈন্ধবঘনবৎ প্রজ্ঞপ্ত্যেকরসনৈরন্তর্য্যাবধারণাৎ “একধৈবানু- দ্রষ্টব্যম্” ইতি চ। যদি চ ব্রহ্মণশ্চিত্রপটবদ্ বৃক্ষসমুদ্রাদিবচ্চ উৎপত্ত্যাদ্যনেকধর্ম্ম- বিচিত্রতা বিজিগ্রাহয়িষিতা, একরসং সৈন্ধবঘনবদনন্তরমবাহ্যম্—ইতি নোপ- সমহরিষ্যৎ, “একধৈবানুদ্রষ্টব্যম্” ইতি চ ন প্রাযোক্ষ্যত, “য ইহ নানের পশ্যতি” ইতি নিন্দাবচনং চ। ২৬
রাজপুত্রস্য রাজাহম্মীতি প্রত্যয়বদ্বাক্যাদোধিকারিণি ব্রহ্মাশ্মীতি প্রত্যয়শ্চেৎ, কৃতং বিস্ফুলিঙ্গাদিদৃষ্টান্তশ্রুত্যেত্যাশঙ্ক্যাহ-অত্রেতি। তথাপি কথং ব্রহ্মপ্রত্যয়দাঢ্যং, তত্রাহ- বিস্ফুলিঙ্গস্যেতি। দৃষ্টান্তেষেকত্বদর্শনং তন্মাদিতি পরামৃষ্টম্। উৎপত্ত্যাদিভেদে নাস্তি শাস্ত্র- তাৎপর্য্যমিত্যত্র হেত্বন্তরমাহ-সৈন্ধবেতি। চকারোহবধারণাদিতি পদমনুকর্ষতি। সংগৃহীতমর্থং বিবৃণোতি-যদি চেত্যাদিনা। নিন্দাবচনং চ ন প্রাযোক্ষ্যতেতি সম্বন্ধঃ। ২৬
তস্মাদেকরূপৈকত্বপ্রত্যয়-দার্ট্যায়ৈব সর্ব্ববেদান্তেষু উৎপত্তিস্থিতিলয়াদিকল্পনা, ন তৎপ্রত্যরকরণায়। ন চ নিরবয়বস্য পরমাত্মনোহসংসারিণঃ সংসার্য্যেক- দেশকল্পনা ন্যায্য্যা, স্বতোহদেশত্বাৎ পরমাত্মনঃ। অদেশস্য পরস্যৈকদেশ- সংসারিত্বকল্পনায়াং পর এব সংসারীতি কল্পিতং ভবেৎ। ২৭
একত্বস্যাবধারণফলমাহ-তস্মাদিতি। একত্বস্য ভেদসহত্বং বারয়িতুমেকরূপবিশেষণম্। ‘আদিশব্দেন প্রবেশনিয়মনে গৃহ্যেতে। ন তৎপ্রত্যয়করণায়েতাত্র তচ্ছব্দেনোৎপত্ত্যাদিভেদো
বিষক্ষিতঃ। কিঞ্চ, পরন্তৈকদেশো বিজ্ঞানান্বেত্যত্র তদেকদেশঃ স্বাভাবিকো বা স্থালৌপাধিকে; বেতি বিকল্প্যাভং দূষয়তি-ন চেতি। বিপক্ষে দোষমাহ-অদেশস্তেতি। ২০
অথ পরোপাধিকৃত একদেশঃ পরন্ত ঘটকরকাদ্যাকাশবৎ; ন তদা তত্র বিবেকিনাং পরমাত্মৈকদেশঃ পৃথক্ সংব্যবহারভাগিতি বুদ্ধিরুৎপদ্যতে। অবিবে- কিনাং বিবেকিনাঞ্চোপচরিতা বুদ্ধিদৃষ্টেতি চেৎ; ন, অবিবেকিনাং মিথ্যাবুদ্ধিত্বাৎ- বিবেকিনাং চ সংব্যবহারমাত্রাবলম্বনার্থত্বাৎ-যথা কৃষ্ণো রক্তশ্চাকাশ ইতি বিবে- কিনামপি কদাচিৎ কৃষ্ণতা রক্ততা চাকাশস্য সংব্যবহারমাত্রাবলম্বার্থত্বৎ প্রতি- পদ্যতে ইতি, ন পরমার্থতঃ কৃষ্ণো রক্তো বা আকাশো ভবিতুমর্হতি। অতো ন- পণ্ডিতৈত্রহ্মস্বরূপপ্রতিপত্তিবিষয়ে ব্রহ্মণোহংশাংশ্যেকদেশৈকদেশিবিকারবিকারিত্ব-- কল্পনা কাৰ্য্যা, সর্ব্বকল্পনাপনয়নার্থসারপরত্বাৎ সর্ব্বোপনিষদাম্। অতো হিত্বা সর্ব্ব- কল্পনামাকাশস্যেব নির্বিশেষতা প্রতিপত্তব্যা-“আকাশবং সর্ব্বগতশ্চ নিত্যঃ”, “ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন বাহ্যঃ” ইত্যাদিশ্রুতিশতেভ্যঃ। ২৮ ২৩”
দ্বিতীয়মুখাপয়তি-অখেতি। একদেশস্তৌপাধিকত্বপক্ষে পরস্মিন্ বিবেকবতাং তদখণ্ডত্ব- বুদ্ধিভাজাং তদেকদেশো বস্তুতঃ পৃথগভূত্বা ব্যবহারালম্বনমিতি নৈব বুদ্ধির্জায়তে ঔপাধিকস্ত স্ফটিকলৌহিত্যবন্মিথ্যাত্বাদিত্যুত্তরমাহ-ন তদেতি। ননু জীবে কর্ত্তাহং ভোক্তাহমিতি পরিচ্ছিন্নধীঃ সর্ব্বেযামুপলভ্যতে। সা চ তস্য বস্তুতোহপরিচ্ছিন্নব্রহ্মমাত্রত্বান্মঞ্চক্রোশনধীবদুপ- চরিভা। তমাদুভয়েষামুক্তাত্মবুদ্ধিদর্শনাৎ পরমাকৈকদেশত্বং জীবস্য দুর্ব্বারমিতি চোদয়তি- অবিবেকিনামিতি। তত্রাবিবেকিনাং যথোক্তা বুদ্ধিরূপচরিতা ন ভবত্যতস্মিংস্তদ্বুদ্ধিত্বেনা- বিদাত্বাদিতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। তথাপি বিবেকিনামীদৃশী ধীরুপচরিতেভি চেৎ, ভত্রাহ-বিবেকিনাং চেতি। তেষাং সংব্যবহারোহভিজ্ঞাভিবদনাত্মকস্তাবন্মাত্রস্যালম্বনমাভাস-- ভূতোহর্থস্তদ্বিষয়ত্বাত্তদবুদ্ধেরপি মিথ্যাবুদ্ধিত্বাদুপচরিতত্বাসিদ্ধিরিত্যর্থঃ।
বিবেকিনামবিবেকিনাং চাত্মনি পরিচ্ছিন্নধীরুপলন্ধেত্যেবতা ন তস্য বস্তুতো ব্রহ্মাংশত্বাদি- সিধ্যতীত্যেতদ্ দৃষ্টান্তেন সাধয়তি—যণেতি। অবিবেকিনামিবেত্যপেরথঃ। ব্রহ্মণি বস্তুতোহং- শাদিকল্পনা ন কর্তব্যেতি দাষ্টান্তিকমুপসংহরতি—অত ইতি। অংশাংশিনোর্ব্বিশদীকরণ-- মেকদেশৈকদেশীতি। অতঃশব্দোপাত্তমের হেতুং স্ফুটয়তি—সর্ব্বকল্পনেতি। সর্ব্বাসাং কল্পনা-- নামপনয়নমেবার্থঃ সারত্বেনাভীষ্টঃ, তৎপরত্বাদুপনিষদাং, তদেকসমধিগম্যে ব্রহ্মণি ন কদাচিদপি। কল্পনাহস্তীত্যর্থঃ। উপনিষদাং নির্বিকল্পবস্তুপরত্বে ফলিতমাহ—অতো হিত্বেতি। ২৮
ন আত্মানং ব্রহ্মবিলক্ষণং কল্পয়েৎ—উষ্ণাত্মক ইবাগ্নৌ শীতৈকদেশম্, প্রকাশাত্মকে বা সবিতরি তমএকদেশম্, সর্ব্বকল্পনাপনয়নার্থসারপরত্বাৎ, সর্ব্বোপনিষদাম্। তস্মাৎ নামরূপোপাধিনিমিত্তা এব আত্মন্যসংসারধম্মিণি সর্ব্বে ব্যবহারাঃ—“রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব।” “সর্ব্বাণি রূপানি বিচিত্য, ধীরঃ, নামানি কৃত্বাভিবদন্ যদাস্তে” ইত্যেবমাদিমন্ত্রবর্ণেভ্যঃ, ন স্বত আত্মনঃ
৫২৯
সংসারিম্; অলক্তকাদ্যপাধিসংযোগজনিত-রক্তস্ফটিকাদিবুদ্ধিবদ্ ভ্রান্তমেব, ন পরমার্থতঃ। ২৯
ব্রহ্মণো নির্বিশেষত্বেহপ্যাত্মনস্তদেকদেশস্য সবিশেষত্বং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-নাম্মান- মিতি। আত্মা নির্বিশেষশ্চেৎ, কথং তস্মিন্ ব্যবহারত্রয়মিত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। আত্মনি সর্ব্বো ব্যবহারো নামরূপোপাধিপ্রযুক্ত ইত্যত্র প্রমাণমাহ-রূপং রূপমিতি। অসংসারধর্মিণীত্যুক্তং বিশেষণং বিশদয়তি-ন স্বত ইতি। ২৯
“ধ্যায়তীব লেলায়তীব”, “ন কৰ্ম্মণা বর্দ্ধতে নো কনীয়ান্।” “ন কৰ্ম্মণা লিপ্যতে পাপকেন”, “সমং সর্ব্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্।” “শুনি চৈব শ্বপাকে চ” ইত্যাদিশ্রুতিস্মৃতিন্যায়েভ্যঃ পরমাত্মনোহসংসারিতৈব; অত একদেশঃ বিকারঃ শক্তির্ব্বা বিজ্ঞানাত্মা অন্যো বেতি বিকল্পয়িতুং নিরবয়বত্বাভ্যুপগমে বিশে- যতো ন শক্যতে। অংশাদিশ্রুতিস্মৃতিবাদাশ্চৈকত্বার্থাঃ, ন তু ভেদপ্রতিপাদকাঃ, বিবক্ষিতার্থৈকবাক্যযোগাদিত্যবোচাম। ৩০
ভ্রান্ত্যা সংসারিত্বমাত্মনীত্যত্র মানমাহ—ধ্যায়তীতি। কূটস্থত্বাসঙ্গত্বাদিঃ ন্যায়ঃ। পরমাত্মনঃ সাংশত্বপক্ষো নিরাকৃতঃ। ননু তস্য নিরংশত্বেহপি কুতো জীবস্য তন্মাত্রত্বং? তদেকদেশত্বাদি- সংভবাৎ, অত আহ—একদেশ ইতি। কথং তহি ‘পাদোহস্য বিশ্বা ভূতানি’ ‘মমৈবাংশো জীবলোকে’ ‘অংশো নানাব্যপদেশাৎ।’ ‘সর্ব্ব এত আত্মানো ব্যুচ্চরন্তি’ ইতি শ্রুতিস্মৃতি- বাদান্তত্রাহ—অংশাদীতি। ৩০
সর্ব্বোপনিষদাৎ পরমাত্মৈকত্বজ্ঞাপনপরত্বে, অথ কিমর্থং তৎপ্রতিকুলোহর্থো বিজ্ঞানাত্মভেদঃ পরিকল্প্যতে? ইতি, কর্মকাণ্ডপ্রামাণ্যবিরোধপরিহারায়েত্যেকে; কর্মপ্রতিপাদকানি হি বাক্যানি অনেকক্রিয়া-কারক-ফলভোক্তৃকর্ত্রাশ্রয়াণি, বিজ্ঞা- নাত্মভেদাভাবে হি অসংসারিণ এব পরমাত্মন একত্বে, কথমিষ্টফলাসু ক্রিয়াসু প্রবর্ত্তয়েয়ুঃ? অনিষ্টফলাভ্যো বা ক্রিয়াভ্যো নিবর্ত্তয়েয়ুঃ? কস্য বা বদ্ধস্য মোক্ষা- য়োপনিষদারভ্যেত? অপি চ পরমাত্মৈকত্ববাদিপক্ষে কথং পরমাত্মৈকত্বোপদেশঃ? কথং বা তদুপদেশগ্রহণফলম্? বদ্ধস্য হি বন্ধনাশায়োপদেশঃ, তদভাবে উপ- নিষচ্ছাস্ত্রং নির্বিষয়মেব। ৩১
ন্যায়াগমাভ্যাং জীবেশ্বরয়োরংশাশিত্বাদিকল্পনাং নিরাকৃত্য বেদান্তানামৈক্যপরত্বে স্থিতে সতি দ্বৈতাসিদ্ধিঃ ফলতি, ইত্যাহ—সর্ব্বোপনিষদামিতি। একত্বজ্ঞানস্য সনিদানদ্বৈতধ্বংসিত্ব- মথশব্দার্থঃ। প্রকৃতং জ্ঞানং তৎপদেন পরামৃশ্যতে। ইত্যদ্বৈতমেব তত্ত্বমিতি শেষঃ। কিমর্থ- মিতি প্রশ্নং মন্থানো দ্বৈতিনাং মতমুখাপয়তি—কর্ম্মকাণ্ডেতি। বেদান্তানামৈক্যপরত্বেইপি কথং তৎপ্রামাণ্যবিরোধপ্রসঙ্গস্তত্রাহ—কর্ম্মেতি। তথাপি কথং বিরোধাবকাশঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ— বিজ্ঞানাত্মেতি।
কেবনাট্যৈককর্ম্মকাণ্ডবিরোধমুক্ত। তত্রৈব জ্ঞানকাণ্ডবিরোধমাহ—কস্য বেত্তি। পরন্তু
নিত্যমুক্তত্বাদন্যস্ত স্বতঃ পরতো বা বন্ধস্থাভাবাচ্ছিয়াভাবতয়া চাধিকার্য্যভাবাদুপনিষদারন্তাসিদ্ধি- রিত্যর্থঃ। কর্মকাণ্ডস্য কাণ্ডান্তরস্থ চ প্রামাণ্যানুপপত্তিবিজ্ঞানাত্মাদিভেদং কল্পয়তীত্যর্থা- পত্তিদ্বয়মুক্তং, তত্র দ্বিতীয়ামর্থাপত্তিং প্রপঞ্চয়তি—অপি চেতি। কা পুনরুপদেশস্যানু- পপত্তিস্তত্রাহ—বন্ধস্তেতি। তদভাব ইত্যত্র তচ্ছব্দো বদ্ধমধিকরোতি। নির্বিষয়ং নিরধিকারম্। কিংচ, যদ্যর্থাপত্তিস্বয়মুক্তরা বিষয়োত্তিষ্ঠতি, তর্হি ভেদস্য দুর্নিরূপত্বাৎ কথং কর্ম্মকাণ্ডং প্রমাণমিতি যদ্ ব্রহ্মবাদিনা কৰ্ম্মবাদী চোদ্যতে, তম্ ব্রহ্মবাদস্য কৰ্ম্মবাদেন তুল্যম্; ব্রহ্মবাদেহপি শিষ্যশাসি- ত্রাদিভেদাভাবে কথমুপনিষৎপ্রামাণ্যমিত্যাক্ষেপ্তং সুকরত্বাৎ, যশ্চোপনিষদাং প্রতীয়মানং শিষ্যশাসিত্রাদিভেদমাশ্রিত্য প্রামাণ্যমিতি পরিহারঃ, স কর্ম্মকাণ্ডস্যাপি সমানঃ। ৩১/১১৫
এবং তহি উপনিষদ্বাদিপক্ষস্য কর্মকাণ্ডবাদিপক্ষেণ চোদ্য-পরিহারয়োঃ সমানঃ পন্থাঃ—যেন ভেদাভাবে কর্মকাণ্ডং নিরালম্বনমাত্মানং ন লভতে প্রামাণ্যং প্রতি, তথোপনিষদপি। এবং তহি, যস্য প্রামাণ্যে স্বার্থবিঘাতো নাস্তি, তস্যৈব কৰ্ম্ম- কাণ্ডস্যাস্ত প্রামাণ্যম্; উপনিষদাং তু প্রামাণ্যকল্পনায়াং স্বার্থবিঘাতো ভবেৎ— ইতি মাভূৎ প্রামাণ্যম্। ন হি কর্মকাণ্ডং প্রমাণং সদপ্রমাণং ভবিতুমর্হতি; ন হি প্রদীপঃ প্রকাশ্যং প্রকাশয়তি, ন প্রকাশয়তি চ ইতি। ৩২
ভত্রাপি প্রাতীতিকভেদমাদায় প্রামাণ্যস্য সুপ্রতিপন্নত্বাৎ; ন চ ভেদপ্রতীতির্ভান্তির্ব্বাধাভা- বাদিত্যভিপ্রেত্যাহ-এবং তহীতি। চোদ্যসাম্যং বিবণোতি-যেনেতি। ইতি চোদ্যসাম্যাৎ পরিহারস্যাপি সাম্যমিতি শেষঃ। ননু কৰ্ম্মকাণ্ডং ভেদপরং ব্রহ্মকাণ্ডমভেদপরং প্রতিভাতি; ন চ বস্তুনি বিকল্পঃ সম্ভবভ্যতোহন্যতরস্যাপ্রামাণ্যমত আহ-এবং তহীতি। তুল্যমুপনিষদামপি স্বার্থবিঘাতকত্বমিত্যাপস্ক্যাহ-উপনিষদামিতি। স্বার্থ: শব্দশক্তিবশাৎ প্রতীয়মানঃ সৃষ্ট্যাদিভেদঃ। যর্তুচ্যতে কর্মকাণ্ডস্য ব্যবহারিকং প্রামাণ্যং ন তাত্ত্বিকং; তাত্ত্বিকস্ত কাণ্ডান্তরস্যেতি, তত্রাহ-ন হীতি। যদ্ধি প্রামাণ্যস্য ব্যবহারিকত্বং, তদেব তস্য তাত্ত্বিকত্বং, ন হি প্রমাণং তত্ত্বং চ নাবেদয়তি ব্যাঘাতাদিতাভিপ্রেত্য দৃষ্টান্তমাহ-ন হীতি। স্বার্থবিঘাতাৎ কর্মকাণ্ডবিরোধাচ্চোপনিষদাম- প্রামাণ্যমিত্যুক্তমুপসংহর্তু মিতিশব্দঃ। ৩২
প্রত্যক্ষাদিপ্রমাণবিপ্রতিষেধাচ্চ-ন কেবলমুপনিষদো ব্রহ্মৈকত্বং প্রতিপাদ- য়ন্ত্যঃ স্বার্থবিঘাতং কর্মকাণ্ডুপ্রামাণ্যবিঘাতঞ্চ কুর্ব্বত্তি, প্রত্যক্ষাদিনিশ্চিতভেদ- প্রতিপত্ত্যর্থৈঃ প্রমাণৈশ্চ বিরুদ্ধ্যন্তে; তস্মাদপ্রামাণ্যমেবোপনিষদাম্, অন্যার্থতা বা অস্ত; ন ত্বেব ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপত্ত্যর্থতা। ৩৩
উপনিষদপ্রামাণ্যে হেত্বন্তরমাহ—প্রত্যক্ষাদীতি। প্রত্যক্ষাদীনি নিশ্চিতানি ভেদপ্রতি- পত্যর্থানি প্রমাণানি, তৈরিতি বিগ্রহঃ। অধ্যয়নবিধ্যুপপাদিতানাং কুতস্তাসামপ্রামাণ্যমিত্যা- শঙ্ক্যাহ—অন্যার্থতা বেতি। ৩৩
ন, উক্তোত্তরত্বাৎ। প্রমাণস্য হি প্রমাণত্বমপ্রমাণত্বং বা প্রমোৎপাদনানুং- পাদননিমিত্তম্, অন্যথা চেৎ, স্তম্ভাদীনাং প্রামাণ্যপ্রসঙ্গাৎ শব্দাদৌ প্রমেয়ে।
৫৩১
কিং চাতঃ? যদি তাবদুপনিষদো ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপত্তি-প্রমাং কুর্ব্বন্তি, কথমপ্রমাণং ভবেষুঃ? ন কুর্ব্বন্ত্যেবেতি চেৎ—যথাগ্নিঃ শীতম্ ইতি; স ভবানেবং বদন্ বক্তব্যঃ—উপনিষৎপ্রামাণ্যপ্রতিষেধার্থং ভবতো বাক্যমুপনিষৎপ্রামাণ্যপ্রতিষেধং কিং ন করোত্যেব, অগ্নির্ব্বা রূপপ্রকাশম্? অথ করোতি, যদি করোতি ভবতু তদা প্রতিষেধার্থং প্রমাণং ভবদ্বাক্যম্, অগ্নিশ্চ রূপপ্রকাশকো ভবেৎ; প্রতিষেধ- বাক্যপ্রামাণ্যে ভবত্যেবোপনিষদাং প্রামাণ্যম্; অত্র ভবন্তো ক্রুবস্তু কঃ পরি- হার ইতি। ৩৪
সিদ্ধান্তয়তি-নেত্যাদিনা। তদেব স্ফুটয়িতুং সামান্যন্যায়মাহ-প্রমাণস্যেতি। স্বার্থে প্রমোৎপাদকত্বাভাবেহপি প্রামাণ্যমিচ্ছন্তং প্রত্যাহ-অন্যথেতি। যথোক্তপ্রযোজকপ্রযুক্তং প্রামাণ্যমপ্রামাণ্যং বেত্যেতস্মিন্ পক্ষে কিং ফলতীতি পৃচ্ছতি-কিঞ্চেতি। তত্র কিমুপনিষদঃ স্বার্থং বোধয়ন্তি ন বেতি বিকল্প্য আদ্যমনূদ্য দুষয়তি-যদি তাবদিতি। দ্বিতীয়মুখাপ্য নিরাকরোতি-নেত্যাদিনা। অগ্নির্ষথা শীতং ন করোতি, তথোপনিষদোহপি ব্রহ্মৈকত্বে প্রমাং ন কুর্ব্বন্তীতি বদন্তং প্রতি প্রতিবন্ধিগ্রহে। ন যুক্তোহনুভববিরোধাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদীতি। তর্হি স্বার্থে প্রমিতিরনকত্বাদ্বাক্যস্য প্রামাণ্যং স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-প্রতিষেধেতি। উপনিষদ্- প্রামাণ্যে ভবদ্বাক্যাপ্রামাণ্যং, তৎপ্রামাণ্যে তপনিষৎপ্রামাণ্যং দুর্ব্বারমিতি সাম্যে প্রাপ্তে ব্যবস্থাপক: সমাধিব্বক্তব্য ইত্যাহ-অত্রেতি। ৩৪
নম্বত্র প্রত্যক্ষা মদ্বাক্যে উপনিষৎপ্রামাণ্যপ্রাতিষেধার্থপ্রতিপত্তিঃ, অগ্নৌ চ রূপ- প্রকাশনপ্রতিপত্তিঃ প্রমা; কস্তর্হি ভবতঃ প্রদ্বেষো ব্রহ্মৈকত্বপ্রত্যয়ে—প্রমাং প্রত্যক্ষাং কুর্ব্বতীষু উপনিষৎসু উপলভ্যমানাসু? প্রতিষেধানুপপত্তেঃ। শোক- মোহাদিনিবৃত্তিশ্চ প্রত্যক্ষং ফলং ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপত্তিপারম্পর্য্যজনিতমিত্যবোচাম। তস্মাদুক্তোত্তরত্বাদুপনিষদং প্রতি অপ্রামাণ্যশঙ্কা তাবন্নাস্তি। ৩৫ ১১২
উক্তমেবার্থং চোদ্যসমাধিভ্যাং বিশদয়তি-নন্বিত্যাদিনা। প্রতিষেধমঙ্গীকৃত্যোক্তা যথোক্তো- পনিষদুপলন্তে সতি তস্য নিরবকাশত্বাৎ প্রদ্বেষানুপপত্তিরিত্যাহ-প্রতিষেধেতি। উপনিষদুখায়া ধিরো বৈফল্যাত্তাসামমানতেত্যাশঙ্ক্যাহ-শোকেতি। একত্বপ্রতিপত্তিস্তাবদাপাতেন জায়তে, সা চ বিচারং প্রযুজ্য মননাদি দ্বারা দৃঢ়ীভবতি। সা পুনরশেষং শোকাদিকমপনয়তীতি পারম্পর্য্যজনিতং ফলমিতি দ্রষ্টব্যম্। স্বার্থে প্রমাজনকত্বাদুপনিষদাং প্রামাণ্যমিত্যুক্তমুপ- সংহরতি-তস্মাদিতি। ৩৫
যচ্চোক্তং স্বার্থবিঘাতকরত্বাদপ্রামাণ্যমিতি; তদপি ন, তদর্থপ্রতিপত্তের্ব্বাধকা- ভাবাৎ। ন হি উপনিষদ্যো ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ম্, নৈব চ,-ইতি প্রতিপত্তিরস্তি -যথা অগ্নিরুষ্ণঃ শীতশ্চেত্যস্মাদাক্যাৎ বিরুদ্ধার্থদ্বয়প্রতিপত্তিঃ। অভ্যুপগম্য চৈতদবোচাম; ন তু বাক্যপ্রামাণ্যসময়ে এষ ন্যায়ঃ-যদুত একস্য বাক্যস্যানে- কার্থত্বম্; সতি চানেকার্থত্বে স্বার্থশ্চ স্যাৎ, তদ্বিঘাতকৃচ্চ বিরুদ্ধোহন্যোহর্থঃ।-ন
যেতৎ বাক্যপ্রমাণকানাং বিরুদ্ধবিরুদ্ধৈকং বাক্যমনেকমর্থং প্রতিপাদয়তীত্যেতৎ সময়ঃ; অর্থৈকত্বাদি একবাক্যতা। ৩৬
প্রামাণ্যহেতুসম্ভাবাদুপনিষদাং প্রামাণ্যং প্রতিপান্ত তদপ্রামাণ্যং পরোক্তমনুবদতি- যচ্চোক্তমিতি। কথং হি তাসাং স্বার্থবিঘাতকত্বং? কিং তাভ্যো ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ং নৈব চেতি প্রতিপত্তিরুৎপদ্যতে, কিং বা কাশ্চিদ্ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপত্তিমস্যাশ্চোপনিষদস্তৎপ্রতিষেধং কুর্ব্বন্তীতি বিকল্প্যাদ্যং দূষয়তি-তদপি নেতি। তদেব প্রপঞ্চয়তি-ন হীতি। একস্য বাক্য- স্তানেকার্থত্বমঙ্গীকৃত্য বৈধর্ম্মোদাহরণমুক্তমিত্যাহ-অভ্যুপগম্যেতি। তস্যাঙ্গীকারবাদত্বে হেতু- মাহ-ন দ্বিতি। উক্তমর্থং ব্যতিরেকদ্বারা বিবৃণোতি-সতি চেতি। ভবত্বেকন্য বাক্য- স্তানেকার্থত্বং, নেত্যাহ-ন দ্বিতি। কস্তর্হি তেষাং সময়স্তত্রাহ-অর্থৈকত্বাদিতি। তদুক্তং প্রথমে তন্ত্রে-অর্থৈকত্বাদেকং বাক্যং সাকাঙ্ক্ষং চেদ্বিভাগঃ স্তাদিতি। ৩৬
ন চ কানিচিদুপনিষদ্বাক্যানি ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিষেধং কুর্ব্বন্তি। যতু লৌকিকং বাক্যম্—অগ্নিরুষ্ণঃ শীতশ্চেতি, ন তত্রৈকবাক্যতা, তদেকদেশস্য প্রমাণান্তর- বিষয়ানুবাদিত্বাৎ—অগ্নিঃ শীত ইত্যেতদেকং বাক্যম্; অগ্নিরুষ্ণ ইতি তু প্রমাণান্ত- রামুভবস্মারকম্, ন তু স্বয়মর্থাববোধকম্; অতো ন অগ্নিঃ শীতলঃ ইত্যনেনৈক- বাক্যতা, প্রমাণান্তরানুভবস্মারণেনৈবোপক্ষীণত্বাৎ। যতু বিরুদ্ধার্থপ্রতিপাদক- মিদৎ বাক্যমিতি মন্যতে, তৎ শীতোষ্ণপদাভ্যাম্ অগ্নিপদসামাধিকরণ্যপ্রয়োগ- নিমিত্তা ভ্রান্তিঃ; ন ত্বেবৈকস্য বাক্যস্যানেকার্থত্বং লৌকিকস্য বৈদিকস্য বা। ৩৭
দ্বিতীয়ং দূষয়তি-ন চেতি। একস্য বাক্যস্যানেকার্থত্বং লোকে দৃষ্টমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যত্তিতি। তদেকদেশস্যেত্যাদিবাক্যং বিবৃণোতি-অগ্নিরিতি। অনুবাদকবোধকভাগয়োরেকবাক্যত্বা- ভাবং ফলিতমাহ-অত ইতি। হেত্বর্থমুক্তমেব স্ফুটয়তি-প্রমাণান্তরেতি। শীতঃ শৈশিরো- হগ্নিরিত্যেতদ্বোধকমেব চেম্বাক্যং, কথং তহি তত্র লোকস্য বিরুদ্ধার্থধীরিত্যাশঙ্ক্যাহ-যত্তিতি। ৩৭
যচ্চোক্তং—কর্মকাণ্ডপ্রামাণ্য-বিঘাতকৃদুপনিষদ্বাক্যমিতি; তন্ন, অন্যার্থত্বাৎ। ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপাদনপরা হি উপনিষদঃ ন ইষ্টার্থপ্রাপ্তৌ সাধনোপদেশং, তস্মিন্ বা পুরুষনিয়োগং বারয়ন্তি, অনেকার্থত্বানুপপত্তেরেব। ন চ কর্মকাণ্ডবাক্যানাং স্বার্থে প্রমা নোৎপদ্যতে; অসাধারণে চেৎ স্বার্থে প্রমাম্ উৎপাদয়তি বাক্যম্, কুতোহন্যেন বিরোধঃ স্যাৎ। ৩৮ 1A/12
স্বার্থবিধাতকত্বাদপ্রামাণ্যমুপনিষদামিত্যেতন্নিরাকৃত্য চোদ্যাত্তরমনুঘ নিরাকরোতি- যচ্চেত্যাদিনা। তস্মিন্নিতীষ্টার্থপ্রাপকসাধনোক্তিঃ। ননুপনিষদ্বাক্যং ব্রহ্মাত্মৈকত্বং সাক্ষাৎপ্রতি- পাদয়দ অর্থাৎ কৰ্ম্মকাণ্ডপ্রামাণ্যবিঘাতকমিতি চেৎ, তত্র তদপ্রামাণ্যমনুৎপত্তিলক্ষণং বিপৰ্য্যাস- লক্ষণং বেতি বিকল্পাদ্যমনুঘ্য দূষয়তি-ন চেতি। বিদিতপদ-তদর্থসঙ্গতের্ব্বাক্যার্থন্যায়বিদস্তদর্থেযু প্রমোৎপত্তিদর্শনাদিত্যর্থঃ। স্বার্থে প্রমামুৎপাদয়দপি বাক্যং মানান্তরবিরোধাদপ্রমাণমিত্যা- শঙ্ক্যাহ-অসাধারণে চেদিতি। স্বগোচরশূরত্বাৎ প্রমাণানামিত্যর্থঃ। ৩৮
ব্রহ্মৈকত্বে নির্বিষয়ত্বাৎ প্রমা নোৎপদ্যত এবেতি চেৎ; ন, প্রত্যক্ষত্বাৎ প্রমায়াঃ। “দর্শপূর্ণমাসাভ্যাং স্বর্গকামো যজেত।” “ব্রাহ্মণো ন হন্তব্যঃ” ইত্যেব- মাদিবাক্যেভ্যঃ প্রত্যক্ষা প্রমা জায়মানা, সা নৈব ভবিষ্যতি, যদ্যুপনিষদো ব্রহ্মৈকত্বং বোধয়িষ্যন্তীত্যনুমানম্। ন চানুমানং প্রত্যক্ষবিরোধে প্রামাণ্যৎ লভতে; তম্মাদস- দেবৈতদগীয়তে—প্রমৈব নোৎপদ্যত ইতি। ৩৯
বিমতঃ ন প্রমোৎপাদকং প্রমাণাপহৃতবিষয়ত্বাদনুষ্কাগ্নিবাক্যবদিতি শঙ্কতে-ব্রহ্মেতি। প্রত্যক্ষবিরোধাদনুমানমনবকাশমিতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। ৩৯
অপি চ, যথাপ্রাপ্তস্যৈবাবিদ্যা-প্রত্যুপস্থাপিতস্য ক্রিয়াকারকফলস্যাশ্রয়ণেন ইষ্টানিষ্টপ্রাপ্তিপরিহারোপায়সামান্যে প্রবৃত্তস্য তদ্বিশেষমজানতস্তদাচক্ষাণা শ্রুতিঃ ক্রিয়াকারকফলভেদস্য লোকপ্রসিদ্ধস্য সত্যতামসত্যতাং বা নাচষ্টে, ন চ বারয়তি, ইষ্টানিষ্টফলপ্রাপ্তিপরিহারোপায়বিধিপরত্বাৎ। ৪০
ইতল্ড কর্মকাণ্ডস্য নাপ্রামাণ্যমিতি বদন্, দ্বিতীয়ং প্রত্যাহ—অপি চেতি। যথাপ্রাপ্ত- স্থেত্যস্থৈব ব্যাখ্যানমবিদ্যাপ্রত্যুপস্থাপিতস্যেভি। সাধ্যসাধনসম্বন্ধবোধকস্য কর্মকাণ্ডস্য ন বিপর্য্যাসাঃ, মিথ্যার্থত্বেহপি তস্যার্থক্রিয়াকারিত্বসামর্থ্যানপহারাৎ প্রামাণ্যোপপত্তেরিতি ভাবঃ। ৪০
যথা কাম্যেযু প্রবৃত্তা শ্রুতিঃ কামানাং মিথ্যাজ্ঞানপ্রভবত্বে সত্যপি যথাপ্রাপ্তা- নেব কামানুপাদায় তৎসাধনান্যের বিধত্তে, ন তু—কামাং মিথ্যাজ্ঞানপ্রভবত্বা- দনর্থরূপত্বঞ্চেতি ন বিদধাতি; তথা নিত্যাগ্নিহোত্রাদিশাস্ত্রমপি মিথ্যাজ্ঞানপ্রভবং ক্রিয়াকারকভেদং যথাপ্রাপ্তমেবাদায় ইষ্টবিশেষপ্রাপ্তিম্ অনিষ্টবিশেষপরিহারৎ বা কিমপি প্রয়োজনং পশ্যৎ অগ্নিহোত্রাদীনি কর্মাণি বিধত্তে, ন অবিদ্যাগোচরা- সদ্বস্তবিষয়মিতি ন প্রবর্ত্ততে,—যথা কাম্যেষু। ন চ পুরুষা ন প্রবর্ত্তেরন্ অবিদ্যাবন্তঃ, দৃষ্টত্বাৎ,—যথা কামিনঃ। বিদ্যাবতামেব কর্মাধিকার ইতি চেৎ; ন, ব্রহ্মৈকত্ববিদ্যায়াৎ কর্মাধিকারবিরোধস্যোক্তত্বাৎ। এতেন ব্রহ্মৈকত্বে নির্ব্বি- ষয়ত্বাদুপদেশেন তদ্গ্রহণফলাভাবদোষ-পরিহার উক্তো বেদিতব্যঃ। ৪১
ননু কর্মকাণ্ডস্য মিথ্যার্থত্বে মিথ্যাজ্ঞানপ্রভবত্বাদনর্থনিষ্ঠত্বেনাপ্রবর্তকত্বাদপ্রামাণ্যমত আহ- যথেতি। বিমতমপ্রমাণং মিথ্যার্থত্বাদ্বিপ্রলম্ভকবাক্যবদিত্যাশঙ্ক্য ব্যভিচারমাহ-যথা কাম্যে- দ্বিতি। অগ্নিহোত্রাদিষু কামোষু কৰ্ম্মসু মিথ্যাজ্ঞানজনিতং মিথ্যাভূতং কামমুপাদায় শাস্ত্র- প্রবৃত্তিবন্নিত্যেঘপি তেষু সাধনমসদেবাদায় শাস্ত্রং প্রবর্ততাং, তথাপি বুদ্ধিমন্তো ন প্রবত্তিষ্যন্তে, বেদান্তেভ্যস্তস্মিখ্যাত্বাবগমাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি।
অবিদ্যাবতাং কৰ্ম্মসু প্রবৃত্তিমাক্ষিপতি-বিদ্যাবতামেবেতি। দ্রব্যদেবতাদিজ্ঞানং বা ব্রহ্মৈকত্বজ্ঞানং বা কৰ্ম্মসু প্রবর্তকমিতি বিকল্পাদ্যমঙ্গীকৃত্য দ্বিতীয়ং দূষয়তি-নেত্যাদিনা। কৰ্ম্ম-
কাণ্ডপ্রামাণ্যপদ্ধিতির্য্যাত্মার্থপত্তিঃ নিরাকৃত্য দ্বিতীয়ার্থপত্তিমতিদেশেন নিরাকরোতি— এতেঽপি। কর্ম্মকাণ্ডস্যং প্রতি সার্থকত্বোপপাদনেনেতি যাবৎ। ৪১
পুরুষেচ্ছারাগাদিবৈচিত্র্যাচ্চ-অনেকা হি পুরুষাণাং ইচ্ছা রাগাদয়শ্চ দোষা বিচিত্রাঃ; ততশ্চ বাহ্যবিষয়-রাগাদ্যপহৃতচেতসো নশাস্ত্রং নিবর্ত্তয়িতুং শক্তম্; নাপি স্বভাবতো বাহ্যবিষয়বিরক্তচেতসো বিষয়েষু প্রবর্ত্তয়িতুং শক্তম্; কিন্তু শাস্ত্রাদেতা- বদেব ভবতি-ইদমিষ্টসাধনমিদম্ অনিষ্টসাধনমিতি সাধ্যসাধনসম্বন্ধবিশেষাভি- ব্যক্তিঃ-প্রদীপাদিবৎ তমসি রূপাদিজ্ঞানম্; ন তু শাস্ত্রংভৃত্যানিব বলাৎ নিবর্ত্তয়তি নিয়োজয়তি বা; দৃশ্যন্তে হি পুরুষা রাগাদিগৌরবাৎ শাস্ত্রমপ্যতিক্রামন্তঃ। তস্মাৎ পুরুষমতিবৈচিত্র্যমপেক্ষা সাধ্যসাধনসম্বন্ধবিশেষান্ অনেকধোপদিশতি। ৪২./i৬৷৷
ননু কর্মকাণ্ডং সম্বন্ধং বোধয়ৎপ্রবৃত্ত্যাদিপরমতো রাগাদিবশাত্তদযোগাচ্ছাস্ত্রীয়প্রবৃত্ত্যাদি- বিষয়স্য দ্বৈতস্য সত্যত্বমন্যথা তদ্বিষয়ত্বানুপপত্তিরিত্যর্থাপত্ত্যন্তরমায়াতমিতি, তত্রাহ-পুরুষে- চ্ছেতি। ন প্রবৃত্তিনিবৃত্তী শাস্ত্রবশাদিতি শেষঃ। তদেব স্ফুটয়তি-অনেকা হীতি। শাস্ত্রস্যা- কারকত্বাৎ প্রবর্তকত্বাদ্যভাবমুক্ত। তত্রৈব যুক্ত্যন্তরমাহ-দৃশ্যন্তে হীতি। তর্হি শাস্ত্রস্য কিং কৃত্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। ৪২
তত্র পুরুষাঃ স্বয়মেব যথারুচি সাধনবিশেষেষু প্রবর্তন্তে, শাস্ত্রন্তু সবিতৃ- প্রদীপাদিবদুদান্ত এব। তথা কস্যচিৎ পরোহপি পুরুষার্থঃ অপুরুষার্থবদবভাসতে; যস্য যথাবভাসঃ, স তথারূপং পুরুষার্থং পশ্যতি; তদনুরূপাণি সাধনাম্যুপাদিৎসতে। তথা চার্থবাদোহপি—“ত্রয়াঃ প্রাজাপত্যাঃ প্রজাপতৌ পিতরি ব্রহ্মচর্য্যমুষুঃ” ইত্যাদিঃ। তস্মাৎ ন ব্রহ্মৈকত্বং জ্ঞাপয়িষ্যন্তো বেদান্তা বিধিশাস্ত্রস্য বাধকাঃ। ‘ন চ বিধিশাস্ত্রমেতাবতা নিব্বিষয়ং স্যাৎ, নাপি উক্তকারকাদিভেদং বিধিশাস্ত্রম্ উপ- নিষদাং ব্রহ্মৈকত্বং প্রতি প্রামাণ্যং নিবর্ত্তয়তি; স্ববিষয়শূরাণি হি প্রমাণানি শ্রোত্রাদিবৎ। ৪৩
তত্র সম্বন্ধবিশেষোপদেশে সতীতি যাবৎ। যথারুচি পুরুষাণাং প্রবৃত্তিশ্চেৎ পরমপুরুষার্থং কৈবল্যমুদ্দিশ্য সমাগজ্ঞানসিদ্ধয়ে তদুপায়শ্রবণাদিষু সংহ্যাসপুব্বিকা প্রবৃত্তিঃ বুদ্ধিপূর্ব্বকারিণা- মুচিতেত্যাশঙ্ক্যাহ—তথেতি। রাগাদিবৈচিত্র্যানুসারেণেতি যাবৎ। উক্তং হি—
‘অপি বৃন্দাবনে শুষে মৃগালত্বং স ইচ্ছতি।
নতু নির্ব্বিষয়ং মোক্ষং গচ্ছতি গৌতম‘। ইত্যাদি।
তর্হি কথং পুরুষার্থবিবেকসিদ্ধিস্তত্রাহ—যস্যেতি। পুরুষার্থদর্শনকার্য্যমাহ—তদনুরূপাণীতি। স্বাভিপ্রায়ানুসারেণ পুরুষাণাং পুরুষার্থপ্রতিপত্তিরিত্যত্র গমকমাহ—তথা চেতি। যথা দকারত্রয়ে প্রজাপতিনোক্তে দেবাদয়ঃ স্বাভিপ্রায়েণ দমাদ্যর্থত্রয়ং জগৃহস্তথা স্বাভিপ্রায়বশাদেব পুরুষাণাং পুরুষার্থপ্রতিপত্তিরিত্যর্থবাদতোহবগতমিত্যর্থঃ। পূর্ব্বোত্তরকাণ্ডওয়োর বিরোধমুপসংহরতি—তস্মা- দিতি। একস্ত বাক্যস্য অর্থত্বাযোগাদিতি যাবৎ।
৫৩৫
অর্থাদ্বাধকত্বমাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। এতাবতা বেদান্তানাং ব্রহ্মৈকত্বজ্ঞাপকত্বমাত্রেণেত্যর্থঃ। বেদান্তানামবাধকত্বেহপি কর্মকাণ্ডস্য তৎপ্রামাণ্যনিবর্ত্তকত্বমস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-নাপীতি। ৪৩
তত্র পণ্ডিতম্মন্যাঃ কেচিৎ স্বচিত্তবশাৎ সর্ব্বং প্রমাণমিতরেতরবিরুদ্ধং মন্যন্তে তথা প্রত্যক্ষাদিবিরোধমপি চোদয়ন্তি ব্রহ্মৈকত্বে,-শব্দাদয়ঃ কিল শ্রোত্রাদিবিষয়া ভিন্নাঃ প্রত্যক্ষত উপলভ্যন্তে; ব্রহ্মৈকত্বং ব্রুবতাং প্রত্যক্ষবিরোধঃ স্যাৎ; তথা শ্রোত্রাদিভিঃ শব্দাদ্যপলব্ধার: কর্তারশ ধর্মাধর্ময়োঃ প্রতিশরীরং ভিন্না অনুমীয়ন্তে সংসারিণঃ; তত্র ব্রহ্মৈকত্বং ব্রুবতামনুমানবিরোধশ্চ। তথাচ আগম-বিরোধং বদন্তি-“গ্রামকামো যজেত”, “পশুকামো যজেত”, “স্বর্গকামো যজেত” ইত্যেব- মাদিবাক্যেভ্যঃ গ্রামপশুস্বর্গাদিকামাস্তৎসাধনাদ্যনুষ্ঠাতারশ ভিন্না অবগম্যন্তে। ৪৪
স্বপক্ষে সর্ব্ববিরোধনিরাসদ্বারা স্বার্থে বেদান্তানাং প্রামাণ্যমুক্তং; সংপ্রতি তার্কিকপক্ষ- মুখাপয়তি—তত্রেতি। ঐক্যে শাস্ত্রগম্যে স্বীকৃতে সতীতি যাবৎ। সর্ব্বপ্রমাণমিত্যাগমবাক্যং প্রত্যক্ষাদি চেত্যর্থঃ। কথমৈক্যাবেদকমাগমবাক্যং প্রত্যক্ষাদিনা বিরুধ্যতে, তত্রাহ—তথেতি। যথা ব্রহ্মৈকত্বে প্রবৃত্তস্য শাস্ত্রস্য প্রত্যক্ষাদিবিরোধং মন্যন্তে, তথা তমস্মান্ প্রতি চোদয়স্ত্যপীতি যোজনা।
তত্র প্রত্যক্ষবিরোধং প্রকটয়তি—শব্দাদয় ইতি। সংপ্রত্যনুমানবিরোধমাহ—তথেতি। স্বদেহসমবেতচেষ্টাতুল্যচেষ্টা দেহান্তরে দৃষ্টা, সা চ প্রযত্নবৎপূর্ব্বিকা বিশিষ্টচেষ্টাত্বাৎ সংমত- বদিত্যনুমানবিরুদ্ধমদ্বৈতশাস্ত্রমিত্যর্থঃ। তত্রৈব প্রমাণান্তরবিরোধমাহ—তথা চেতি। ৪৪
অত্রোচ্যতে-তে তু কুতর্কদূষিতান্তঃকরণা ব্রাহ্মণাদিবর্ণাপসদা অনুকম্পনীয়াঃ -আগমার্থবিচ্ছিন্নসম্প্রদায়বুদ্ধয় ইতি। কথম্? শ্রোত্রাদিদ্বারৈঃ শব্দাদিভিঃ প্রত্যক্ষত উপলভ্যমানৈরহ্মণ একত্বং বিরুধ্যতে-ইতি বদন্তো বক্তব্যাঃ-কিং শব্দাদীনাং ভেদেনাকাশৈকত্বং বিরুধ্যতে? ইতি। অথ ন বিরুধ্যতে; ন তর্হি প্রত্যক্ষবিরোধঃ। ৪৫
মানত্রয়বিরোধাৎ ন ব্রহ্মৈক্যমিতি প্রাপ্তে প্রত্যাহ-তে তু কুতর্কেতি। ইতি দুষ্যতা তেষামিতি শেষঃ। দ্বৈতগ্রাহিপ্রমাণবিরুদ্ধমদ্বৈতমিতি বদতাং কথং শোচ্যতেতি পৃচ্ছতি- কথমিতি। তত্র ব্রহ্মৈকত্বে প্রত্যক্ষবিরোধং পরিহরতি--শ্রোত্রাদীতি। তথাত্বে তদেকত্বা-- ভ্যুপগমবিরোধঃ স্যাদিতি শেষঃ। যথা সর্বভূতস্থমেকমাকাশমিত্যত্র ন শব্দাদিভেদগ্রাহি- প্রত্যক্ষবিরোধস্তথৈকং ব্রহ্মেত্যত্রাপি ন তদ্বিরোধোহস্তীত্যাহ-অথেতি। তস্য কল্পিতভেদ-- বিষয়ত্বাদিতি ভাবঃ। ৪৫
যচ্চোক্তম্ প্রতিশরীরং শব্দাদ্যপলদ্বারো ধর্ম্মাধর্ম্ময়োশ্চ কর্ত্তারো ভিন্না অনু- মীয়ন্তে; তথাচ, ব্রহ্মৈকত্বে অনুমানবিরোধঃ—ইতি ভিন্নাঃ কৈরনুমীয়ন্তইতি প্রষ্টব্যাঃ। ৪৬
অনুমানবিরোধং পরোক্তমনুবদতি—যচ্ছেতি। যা চেষ্টা সা প্রবঞ্চ্যপূর্ব্বিকর্ত্তব্যভাবতা,
নাত্মভেদঃ, স্বপ্রযত্নপূর্ব্বকত্বস্থাপি সম্ভবাৎ, অনুপলব্ধিবিরোধে ত্বনুমানস্যৈবানুখানাৎ, স্বদেহচেষ্টায়াঃ স্বপ্রযত্নপূর্ব্বকত্ববৎ পরদেহচেষ্টায়ান্তদ্যত্বপূর্ব্বকত্বে চাদাবেব স্বপরভেদঃ সিয্যেৎ, সচ নাধ্যক্ষাৎ পরস্যানধ্যক্ষত্বান্নানুমানাদন্যোন্তাশ্রয়াদিত্যাশয়বানাহ-ভিন্না ইতি। ৪৬
অথ যদি ক্রয়ুঃ—সর্ব্বৈরস্মাভিরনুমানকুশলৈরিতি! কে যুয়মনুমানকুশলাঃ? ইত্যেবং পৃষ্টানাং কিমুত্তরম্? শরীরেন্দ্রিয়মনআত্মসু চ প্রত্যেকমনুমানকৌশল- প্রত্যাখ্যানে, শরীরেন্দ্রিয়মনঃসাধনা আত্মানো বয়মনুমানকুশলাঃ, অনেককারক- সাধ্যত্বাৎ ক্রিয়াণাম্—ইতি চেৎ। ৪৭
দোষান্তরাভিধিৎসয়া শঙ্করতি—অপেতি। অস্মদর্থং পৃচ্ছতি—কে যূয়মিতি। সহি স্কুল- দেহো বা করণজাতং বা দেহদ্বয়াদন্যো বা। নাভৌ, ভয়োরচেতনত্বাদনুমাতৃত্বাযোগাৎ। ন তৃতীয়স্তস্যাবিকারিত্বাদিতি ভাবঃ। কিংশবদ্য প্রশ্নার্থতাং মত্বা পূর্ব্ববাদ্যাহ—শরীরেতি। আত্মা দেহাদিবহুসাধনবিশিষ্টোহনুমাতা ক্রিয়াণামনেককারকসাধ্যত্বাদেবং বিশিষ্টাত্মকর্তৃকানুমানাৎ প্রতিদেহমাত্মভেদধীরিত্যর্থঃ। ৪৭ এবং তর্হি অনুমানকৌশলে ভবতামনেকত্বপ্রসঙ্গঃ। অনেককারকসাধ্যা হি ক্রিয়েতি ভবস্তিরেবাভ্যুপগতম্। তত্রানুমানং চ ক্রিয়া, সা শরীরেন্দ্রিয়মন-আত্ম- সাধনৈঃ কারকৈরাত্মকর্তৃকা নির্ব্বর্ত্যতে—ইত্যেতৎ প্রতিজ্ঞাতম্। তত্র ‘বয়মনু- মানকুশলাঃ’ ইত্যেবং বদস্তিঃ শরীরেন্দ্রিয়মনঃসাধনা আত্মানঃ প্রত্যেকং বয়মনেকে —ইত্যভ্যুপগতং স্যাৎ; অহো অনুমানকৌশলং দর্শিতমপুচ্ছশৃঙ্গৈস্তার্কিক- বলীবর্দৈঃ! যো হি আত্মানমেব ন জানাতি, স কথং মূঢ়স্তদগতং ভেদমভেদং বা জানীয়াৎ। ৪৮ aA142
বিশিষ্টস্যাত্মনোঽনুমানকর্তৃত্বে ক্রিয়াণামনেককারকসাধ্যত্বাদিতি হেতুশ্চেত্তদা তব দেহা- দেশ্চৈককস্যাপানেকত্বং স্যাদিত্যুত্তরমাহ—এবং তহীতি। তদেব বিবৃণোতি অনেকেতি। আত্মনো দেহাদীনাং চানুমানকারকাণাং প্রত্যেকমবান্তরক্রিয়া অস্তি, বহ্ন্যাদিষু তথা দর্শনাৎ, তথা চাত্মনোহবান্তরক্রিয়া কিভাবেকারকসাধ্যা? কিং বা ন? আদ্যেহপ্যাত্মাতিরিক্তানেককারক- সাধ্যা? কিং বা তদনতিরিক্ত-তৎসাধ্যা বা? নাদ্যোহনবস্থানাৎ। দ্বিতীয়ে ত্বাত্মনোহনেকত্বাপত্তে- র্নৈরাত্ম্যং স্যাৎ, ন চাবান্তরক্রিয়া নানেককারকসাধ্যা, প্রধানক্রিয়ায়ামপি তথাত্বপ্রসঙ্গাৎ,। এতেন দেহাদিঘপি কারকত্বংপ্রত্যুক্তমিতি ভাবঃ। যত্ত্বাত্মাহহক্সপ্রতিযোগিকভেদবান্ বস্তুত্বাৎ, ঘটবদিতি। তত্রাত্মা প্রতিপন্নোঽপ্রতিপন্নো বেতি বিকল্প্য দ্বিতীয়ং প্রত্যাহ—যো হীতি। ৪৮
তত্র কিমনুমিনোতি? কেন বা লিঙ্গেন? ন হি আত্মনঃ স্বতো ভেদপ্রতি- পাদকং কিঞ্চিৎ লিঙ্গমস্তি, যেন লিঙ্গেনাত্মভেদং সাধয়েৎ। যানি লিঙ্গানি আত্ম- ভেদসাধনায় নামরূপবত্তি উপন্যস্যন্তি, তানি নামরূপগতানি উপাধয় এবাত্মনঃ— ঘটকরকাপবারকভূচ্ছিদ্রাণীবাকাশস্য। যদা আকাশস্য ভেদলিঙ্গং পশ্যতি, তদা আত্মনোহপি ভেদলিঙ্গং লভেত সঃ; ন হ্যাত্মনঃ পরতো বিশেষমভ্যুপগচ্ছন্তি-
স্বার্থিকশতৈরপি ভেদলিঙ্গমাত্মনো দর্শয়িতুং শক্যতে; স্বতস্তু দূরাদপনীতমেব, অবিষয়ত্বাদাত্মনঃ। ৪১
প্রতিপন্নত্বপক্ষেহপি ভেদেনাভেদেন বা তৎপ্রতিপত্তিঃ? উভয়থাহপি নানুমানপ্রবৃত্তিরিত্যাহ -তত্রেতি। ইতশ্চাত্মভেদানুমানামুত্থানমিত্যাহ-কেনেতি। কিংশব্দস্যাক্ষেপার্থত্বং স্ফুটয়তি- -ন হীতি। জন্মাদীনাং প্রতিনিয়মাদিলিঙ্গবশাদাত্মভেদঃ সেৎস্যতি চেন্নেত্যাহ-যানীতি। আত্মনঃ সজাতীয়ভেদে লিঙ্গাভাবং দৃষ্টান্তেন সাধয়তি-যদেতি। কিংচৌপাধিকো বা স্বাভাবিকো বা আত্মভেদঃ সাধ্যতে, নাদ্যঃ, সিদ্ধসাধ্যত্বাদিত্যভিপ্রেত্যাহ-ন হীতি। ন দ্বিতীয় ইত্যাহ-স্বতত্ত্বিতি। ৪৯
যদ্যৎ পর আত্মধর্মত্বেনাত্যুপগচ্ছতি, তস্য তস্য নামরূপাত্মকত্বাভ্যুপগমাৎ, নামরূপাভ্যাং চ আত্মনোহন্যত্বাভ্যুপগমাৎ, “আকাশো বৈ নামরূপয়ো- নির্ব্বহিতা, তে যদন্তরা, তদ্ ব্রহ্ম” ইতি শ্রুতেঃ, “নাম-রূপে ব্যাকরবাণি” ইতি চ। উৎপত্তিপ্রলয়াত্মকে হি নামরূপে, তদ্বিলক্ষণৎ চ ব্রহ্ম, অতঃ অনুমানশ্যৈবা- বিষয়ত্বাৎ কুতোহনুমানবিরোধঃ। এতেন আগমবিরোধঃ প্রত্যুক্তঃ। ৫০
আত্মা দ্রব্যত্বাতিরিক্তাপরজাতীয়োহশ্রাবণবিশেষগুণবত্ত্বাদ ঘটবদিত্যনুমানান্তরমাশঙ্ক্যান্যতরা- সিদ্ধিং দর্শয়তি—যদ্যদিতি। তাভ্যামাত্মনোহন্যত্বাভ্যুপগমে মানমুপন্যস্যতি—আকাশ ইতি। তত্রৈবোপপত্তিমাহ—উৎপত্তীতি। অনুমানাবিরোধমুপসংহরতি—অত ইতি। আগমবিরোধ- মুক্তস্যায়াতিদেশেন নিরাকরোতি—এতেনেতি। ঔপাধিকভেদাশ্রয়ত্বেন ব্যবহারস্যোপপন্নত্বোপ- -দর্শনেনেতি যাবৎ। ৫০
যদুক্তং ব্রহ্মৈকত্বে যস্মৈ উপদেশঃ, যস্য চোপদেশগ্রহণফলম্, তদভাবাদেকত্বো- পদেশানর্থক্যমিতি; তদপি ন; অনেককারকসাধ্যত্বাৎ ক্রিয়াণাং কশ্চোদ্যো ভবতি? একস্মিন্ ব্রহ্মণি নিরুপাধিকে নোপদেশঃ, নোপদেষ্টা, ন চোপদেশগ্রহণ- -ফলম্; তস্মাদুপনিষদাঞ্চ আনর্থক্যমিত্যেতদভ্যুপগতমেব। অথ অনেককারক- বিষয়ানর্থক্যৎ চোদ্যতে; ন, স্বতোহভ্যুপগমবিরোধাদাত্মবাদিনাম্। ৫১
প্রত্যক্ষানুমানাগমৈরদ্বৈতস্যাবিরোধেহপি স্যাদ্বিরোধোহর্থাপত্ত্যেতি চেৎ, অত আহ-যদুক্ত- মিতি। উপদেশো যস্মৈ ক্রিয়তে, যস্য চোপদেশগ্রহণপ্রযুক্তং ফলং, তয়োব্র হ্মৈকত্বে সত্যুপদেশা- -নর্থক্য মিত্যনুবাদার্থঃ। কিং ক্রিয়াণামনেককারকসাধ্যত্বাদেবং চোদ্যতে? কিং বা ব্রহ্মণো নিত্য- মুক্তত্বাৎ? ইতি বিকল্প্যাদ্যং দুষয়তি-তদপীতি। তাসামনে ককারকসাধ্যত্বস্য প্রত্যুদস্তত্বাদিতি ভাবঃ। যদি ব্রহ্মণো’ নিত্যমুক্তত্বাভিপ্রায়েণোপদেশানর্থক্যং চোদ্যতে, তত্র নিত্যমুক্তে ব্রহ্মণি ‘জ্ঞাতেহজ্ঞাতে বা তদানর্থক্যং চোদ্যতে ইতি বিকল্প্যাদ্যমঙ্গীকরোতি-একস্মিন্নিতি। দ্বিতীয়- -মুখাপরতি-অথেতি। উপদেশস্তাবদনেকেষাং সাধ্যতয়া বিষয়স্তদানর্থক্যমজ্ঞাতে নিত্যমুক্তে ব্রহ্মণি চোদ্যতে চেদিত্যর্থঃ। সর্ব্বৈরাত্মবাদিভিরুপদেশস্যাজ্ঞানার্থমিষ্টত্বাত্তদ্বিরোধাদজ্ঞাতে ব্রহ্মণি ‘তদানর্থক্য-চোদ্যমনুপপন্নমিত্যাহ-ন স্বত ইতি। ৫১
তস্মাৎ তার্কিক-চাটভটরাজাপ্রবেশ্যম্ অভয়ং দুর্গমিদম্ অল্পবুদ্ধ্যগম্যং শাস্ত্র- গুরুপ্রসাদরহিতৈশ। “কস্তৎ মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি”, “দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং পুরা”, “নৈষা তর্কেণ মতিরাপনেয়া”-বরপ্রসাদলভ্যত্ব-শ্রুতিস্মৃতি- বাদেভ্যশ্চ, “তদেজতি তন্নৈজতি তদ্দূরে তদন্তিকে” ইত্যাদিবিরুদ্ধধর্মসমবায়িত্ব- প্রকাশক-মন্ত্রবর্ণেভ্যশ্চ। গীতাসু চ-“মৎস্থানি সর্ব্বভূতানি” ইত্যাদি; তস্মাৎ পরব্রহ্মব্যতিরেকেণ সংসারী নাম নান্যদ্বত্ত্বন্তরমস্তি। তস্মাৎ সুষ্ঠুচ্যতে-“ব্রহ্ম বা ইদমগ্র আসীৎ, তদাত্মানমেবাবেৎ-অহং ব্রহ্মাস্মীতি”, “নান্যদতোহস্তি দ্রষ্ট নান্যদতোহস্তি শ্রোতৃ” ইত্যাদিশ্রুতিশতেভ্যঃ। তস্মাৎ পরস্যৈব ব্রহ্মণঃ সত্যশ্য সত্যং নাম উপনিষৎ পরা ॥ ১০০॥ ২০॥
অদ্বৈতে বিরোধান্তরাভাবেহপি তার্কিকসময়বিরোধোহস্তীভ্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। প্রমাণ- বিরোধাভাবস্তচ্ছন্দার্থঃ। আর্য্যমর্যাদাং ভিন্দানাশ্চাটা বিবক্ষ্যন্তে, ভটান্ত সেবকা মিথ্যাভাষিণঃ,. তেষাং সর্ব্বেষাং রাজানন্তার্কিকাস্তৈরপ্রবেশ্যমনাক্রমণীয়মিদং ব্রহ্মাত্মৈকত্বমিতি যাবৎ। শাস্ত্রাদি- প্রসাদশূন্যেরগম্যত্বে প্রমাণমাহ-কস্তুমিতি। দেবতাদের্ব্বরপ্রসাদেন লভ্যমিত্যত্র শ্রুতিস্মৃতি-- বাদাঃ সন্তি, তেভ্যশ্চ শাস্ত্রাদিপ্রসাদহীনৈরলভ্যং তত্ত্বমিতি নিশ্চিতমিত্যর্থঃ। শাস্ত্রাদিপ্রসাদ- বতামেব তত্ত্বং সুগমমিত্যত্র শ্রৌতং স্মার্ত্তং চ লিঙ্গান্তরং দর্শয়তি-তদেজতীতি। ব্রহ্মণোহ- দ্বিতীয়ত্বে সর্ব্বপ্রকারবিরোধাভাবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। সংসারিণো ব্রহ্মণোহর্থান্তরত্বাভাবে শ্রুতীনামানুকূল্যং দর্শয়তি-তস্মাদিতি। অদ্বৈতে শ্রুতিসিদ্ধে বিচারনিষ্পন্নমর্থমুপসংহরতি- তস্মাৎ পরস্যেতি। ১০০। ২০।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বে যাহা বলা হইল, তদ্বিষয়ে লোকপ্রসিদ্ধ দৃষ্টান্ত এইঃ—সেই ঊর্ণনাভি—লৃতাকীট(মাকড়শা) যেমন এক হইয়াও আপনার অপৃথগ্ভূত সূত্র দ্বারা উপরে উঠে, অথচ তাহার উর্দ্ধগমনে আপনার অতিরিক্ত- অপর কোনও সহায় অপেক্ষা করে না, এবং একই প্রকার অগ্নি হইতে যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু বিস্ফুলিঙ্গ অর্থাৎ ছোট ছোট বহু অগ্নিকণা বহুবিধভাবে অথবা অনেকা-- কারে বহির্গত হয়। উক্ত দৃষ্টান্ত দুইটি যেমন কারকের(ক্রিয়াসাধনের) অভেদেও- প্রবৃত্তি বা ক্রিয়াগত পার্থক্য প্রদর্শন করিতেছে, অথচ কার্য্যারম্ভের পূর্ব্বে একত্ব বা অভিন্নভাবই বুঝাইতেছে, ঠিক তেমনি এই আত্মা হইতেও, জাগরিত হইবার পূর্ব্বে বিজ্ঞানময় আত্মার যাহা স্বরূপ, সেই স্বরূপ হইতে সমস্ত প্রাণ(বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়), সমস্ত লোক(কর্মফলাত্মক ভূ-প্রভৃতি স্থান), সমস্ত দেবতা—প্রাণ ও লোকের অধিপতি অগ্নি প্রভৃতি এবং সমস্ত ভূত(ব্রহ্মাদি তৃণপর্য্যন্ত) নিঃসৃত হয়। [কোন কোন পুস্তকে “সর্ব্বাণি ভূতানি” স্থানে “সর্ব্ব এত আত্মানঃ” পাঠ আছে,
তাহার অর্থ এই যে, উপাধিসম্বন্ধ বশতঃ যাহারা জাগরিত হইয়া থাকে, সেই সমস্ত’ আত্মা(শুদ্ধ আত্মা নহে); সেই সমস্ত আত্মাই নির্গত হয়]। ১
স্থাবর-জঙ্গমাত্মক এই জগৎ যাহা হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় নিরন্তর নির্গত হয়, বিনাশকালেও জলবুদ্বুদের ন্যায় যাঁহাতে বিলীন হয়, স্থিতিকালেও যৎস্বরূপে অবস্থান করে; সেই এই আত্মার উপনিষৎ—উপ অর্থ সমীপ; আত্ম-সমীপে লইয়া যায় বলিয়া তদ্বাচক শব্দকে “উপনিষৎ” বলা হইয়া থাকে। তদ্বাচক উপনিষদ্ শব্দের যে, ঐরূপ বিশেষার্থ বুঝাইবার ক্ষমতা আছে, তাহা শাস্ত্র-প্রামাণ্য হইতে অবধারিত হইয়া থাকে। সেই উপনিষদটি কি, তাহা বলিতেছেন—‘সত্যস্য সত্যম্’(সত্যেরও সত্য অর্থাৎ সত্যতা-বিধায়ক)। উপনিষৎ-শব্দটি অলৌকিক (লোকব্যবহারের অতীত); সুতরাং উহার অর্থও দুর্ব্বিজ্ঞেয়; এই জন্য স্বয়ং শ্রুতিই উহার অর্থ প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন—প্রাণসমূহ হইতেছে—সত্য, আত্মা আবার সে সমুদয়েরও সত্য। পরবর্তী বাক্যদ্বয় ইহারই ব্যাখ্যারূপে উল্লিখিত হইবে। ২
আচ্ছা, উপনিষৎ-ব্যাখ্যার জন্য পরবর্তী বাক্যদ্বয় আরব্ধ হয়, হউক; এখানে কেবল “তস্য উপনিষদ্”(তাহার উপনিষৎ) এই কথামাত্র আছে; কিন্তু- আমরা বুঝিতেছি না যে, এই উপনিষৎ কি প্রস্তাবিত বিজ্ঞানময় আত্মার?— যিনি পাণিপেষণে উত্থিত এবং শব্দাদি বিষয়োপভোক্তা সংসারী, তাঁহার নাম? অথবা অপর কোনও অসংসারীর নাম? ভাল, ইহা জানাতেই বা ফল কি?[হাঁ, ফল এই যে,] যদি সংসারীর উপনিষৎ হয়, তবে সংসারীই বিজ্ঞেয় হইবে; তাহার জ্ঞানেই সর্ব্বার্থ লাভ হইবে, তিনিই ব্রহ্ম-শব্দবাচ্য হইবেন; এবং তদ্বিষরক বিদ্যা বা জ্ঞানই ব্রহ্মবিদ্যা বলিয়া গণ্য হইবে; আর এই উপনিষৎ যদি অসংসারীর হয়, তাহা হইলে তদ্বিষয়ক বিদ্যাই ব্রহ্মবিদ্যা হইবে,- এবং তাদৃশ ব্রহ্মবিজ্ঞানেই সর্ব্বার্থ সাধিত হইবে। অবশ্য, শাস্ত্র-প্রামাণ্যের বলেই যথোক্ত বিষয়গুলি নিরূপিত হইবে,(কিছুই অসম্ভব হইবে না);.. কিন্তু এই পক্ষে অর্থাৎ জীব ও ব্রহ্মের ভেদপক্ষে দোষ এই যে, ‘তাহাকে আত্মা বলিয়াই উপাসনা করিবে’ ‘আমি ব্রহ্মস্বরূপ ইত্যাকারে, আত্মাকেই উপলব্ধি করিয়াছিলেন’ জীব ও পরব্রহ্মের অভেদবোধক এইজাতীয় শ্রুতিসমূহ বিরুদ্ধ হইয়া পড়ে;[আর অভেদপক্ষেও দোষ এই যে,] ব্রহ্ম ভিন্ন অন্য সংসারী যদি না থাকে, তাহা হইলে উপদেশই নিরর্থক হইয়া পড়ে;[কারণ, অভেদ- হইলে, কে কাহাকে উপদেশ দিবে?]। যেহেতু প্রশ্নবিষয়ে(জিজ্ঞাসিত বিষয়ে),
কোন প্রকার উত্তর প্রদত্ত হয় নাই, সেই হেতুই এই স্থানটি পণ্ডিতগণেরও মহা- মোহকর স্থান অর্থাৎ বিশেষ ভ্রান্তিজনক; অতএব ব্রহ্মবিদ্যা-প্রতিপাদক শ্রুতি- বাক্যে ব্রহ্মজিজ্ঞাসু ব্যক্তিদিগের যথার্থ বোধ সমুৎপাদনার্থ যথাশক্তি বিচার করিব। ৩
এখানে অসংসারী পরমাত্মা ইহার অর্থ নহে; কারণ, পাণিপেষণে জাগরিত ও শব্দাদিবিষয়োপভোক্তা স্বতন্ত্র অবস্থাবিশিষ্ট আত্মা হইতে তাহার উৎপত্তির উল্লেখ রহিয়াছে। ভোজনাদিবিষয়ে স্পৃহাশূন্য অপর কেহ যে, প্রশাসিতা বা সর্ব্ব- শাসনকর্তা আছে, তাহাও নহে; কারণ, যেহেতু ‘আমি তোমাকে ব্রহ্মতত্ত্ব জ্ঞাপন করিব’ এইরূপ প্রতিজ্ঞার পর সুপ্ত পুরুষসমীপে গমন, শব্দাদিবিষয়ের উপভোক্তা সেই পুরুষের স্বরূপ প্রদর্শন, এবং স্বপ্নাবস্থা প্রদর্শন দ্বারা অনুমানের সাহায্যে সেই পুরুষের সম্বন্ধেই সুষুপ্তিনামক অবস্থাটিও অবধান করিয়া শ্রুতি নিজেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও ঊর্ণনাভির দৃষ্টান্ত দ্বারা সুষুপ্তি-অবস্থাবিশিষ্ট সেই আত্মা হইতেই জগতের উৎপত্তি প্রদর্শন করিতেছেন-“এবমেব অস্মাৎ” ইত্যাদি। এই প্রকরণের মধ্যে কোথাও অন্য কোনও জগদুৎপত্তি-কারণের উল্লেখ দেখা যায় না; কেননা, এটা হইতেছে-বিজ্ঞানময়েরই প্রকরণ। ৪
বিশেষতঃ কৌষীতকী উপনিষদে তুল্যপ্রকরণে(অর্থাৎ ইহারই অনুরূপ প্রকরণে) আদিত্যাদি পুরুষের প্রস্তাবের পর ‘তিনি বলিলেন-হে বালাকি, যিনি এই আদিত্যাদি পুরুষের কর্তা, এবং এই জগৎ যাহার কর্ম, তাহাকে জানিবে’ ইত্যাদি বাক্যে প্রবুদ্ধ বা নিদ্রোত্থিত বিজ্ঞানময়কেই বিজ্ঞেয় বলিয়া প্রতিপাদন করিয়াছেন, কিন্তু অন্য কোনও পদার্থের বিজ্ঞেয়তা প্রতিপাদন করেন নাই। এই প্রকার[এই উপনিষদেরই অন্যত্র] ‘আত্মতৃপ্তির জন্যই সমস্ত বস্তু প্রিয় হইয়া থাকে’ এই কথা বলিয়া প্রিয়রূপে প্রসিদ্ধ আত্মাকেই দ্রষ্টব্য, শ্রোতব্য, মন্তব্য ও নিদিধ্যাসিতব্য বলিয়া প্রদর্শন করা হইবে। এইরূপ হইলেই এতৎপ্রকরণীয় বিদ্যার প্রারম্ভে যে, ‘আত্মা বলিয়াই উপাসনা করিবে, সেই এই আত্মা পুত্র ও বিত্ত অপেক্ষাও অধিক প্রিয়’ ‘আমি ব্রহ্ম-ইত্যাকারে সেই আত্মাকেই অবগত হইয়াছিলেন’ ইত্যাদি যে সমস্ত বাক্য আছে, পরমাত্মার অভাবপক্ষেও সে সমস্ত -বাক্য অনুলোম বা অনুকূল হইতে পারে। পরেও বলিবেন-‘পুরুষ যদি আপ- -নাকে বুঝিতে পারে যে, আমি হইতেছি-এই প্রকার(সর্ব্বপ্রকার দোষ- ‘বর্জিত)’ ইত্যাদি। ৫
বিশেষতঃ সমস্ত বেদান্তশাস্ত্রে অহঙ্কারেই পরমাত্মার বিজ্ঞেয়ত্ব প্রদর্শিত
হইয়া থাকে, কিন্তু কোথাও শব্দাদি বাহ্য পদার্থের ন্যায় ‘ইহা ব্রহ্ম’ ইত্যাকারে বিজ্ঞেয়তা প্রদর্শিত হয় না। দেখ, কৌষীতকীয় শ্রুতিতেও ‘বাক্যকে জানিবে না, কিন্তু বক্তাকে জানিবে’ ইত্যাদি বাক্যে বাক্ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ে ব্যাপৃত কর্তারই বিজ্ঞেয়তা প্রদর্শন করা হইয়াছে। ৬
পক্ষান্তরে যদি বল, ইহা অবস্থান্তরবিশিষ্ট সংসারীও হইতে পারে, অর্থাৎ জাগ্রদবস্থায় যে বিজ্ঞানময় আত্মা শব্দাদি-বিষয় উপভোগ করে, সেই বিজ্ঞানময়ই সুষুপ্তিরূপ অবস্থান্তর প্রাপ্ত হইয়া সংসারধর্মবর্জিত(অসংসারী) অন্যরূপ— পরমেশ্বর হয়। না, এ কথাও বলিতে পার না; কারণ, সেরূপভাব কোথাও দৃষ্ট হয় না, অর্থাৎ বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধদিগের সিদ্ধান্তভিন্ন অন্য কোথাও এরূপ সিদ্ধান্ত দেখিতে পাওয়া যায় না যে, গো যখন গমন করে বা দাঁড়াইয়া থাকে, তখনই সে গো-পদবাচ্য হয়, আর শয়ন করিলেই সে অশ্বাদিজাতীয় অন্য পদার্থ হইয়া যায়। ন্যায় বা যুক্তিও ইহার সমর্থক। কারণ, প্রমাণ দ্বারা যে বস্তুর যেরূপ ধর্ম্ম বা স্বভাব নির্দ্ধারিত হয়, দেশ, কাল ও অবস্থাভেদেও তাহার সেই ধর্ম্মই অক্ষুণ্ণ থাকে,(কখনও অন্যথা হয় না)। বস্তুগুলি যদি তাদৃশ স্বাভাবিক ধর্ম্ম-- সম্বন্ধও পরিত্যাগ করিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই সর্ব্বপ্রকার প্রমাণ-প্রমেয়ব্যবহার বিলুপ্ত হইয়া যাইত। যুক্তিবিশারদ সাংখ্যবাদী এবং মীমাংসকগণও শত শত যুক্তির সাহায্যে অসংসারী(সংসারধর্মরহিত) আত্মার সদ্ভাব সমর্থন করিয়া থাকেন। ৭
যদি বল, সংসারী আত্মার পক্ষেও যখন জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও লয়াদি কার্য্যের কর্তৃত্ব সম্ভব হয় না, তখন সে পক্ষও ত যুক্তিযুক্ত হইতেছে না। অভিপ্রায় এই যে, তুমি বিশেষ প্রয়াস সহকারে যে, শব্দাদি বিষয়োপভোক্তা ও সুষুপ্তিরূপ অবস্থান্তরগত সংসারী আত্মা হইতে জগতের উৎপত্তি সিদ্ধান্ত স্থাপন করিয়াছ, তাহাও সমীচীন হইতেছে না; কেননা, সংসারী আত্মার যে, এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সম্পাদন করিবার উপযুক্ত জ্ঞান, শক্তি ও সাধনসম্পদ্ নাই, ইহা সর্ব্বলোকের প্রত্যক্ষসিদ্ধ; সুতরাং আমাদের সেই সংসারী আত্মা-যাহার নির্মাণকৌশল মনে মনেও চিন্তা করিয়া স্থির করা যায় না, বিচিত্র সন্নিবেশ- সম্পন্ন সেই পৃথিব্যাদি জগতের নির্মাণ কিরূপে করিবে? অতএব এই পক্ষটি যুক্তিসম্মত নহে, একথা যদি বল;[আমরা বলি,] না-ইহা অযুক্ত হয় না; কারণ, শাস্ত্রই এ বিষয়ে প্রমাণ; “এবমেব অস্মাদাত্মনঃ” ইত্যাদি শাস্ত্রেই সংসারী আত্মা হইতে জগতের উৎপত্তিপ্রভৃতি প্রতিপাদিত হইয়াছে। অতএব সমস্ত
কথাই শ্রদ্ধেয় ও সঙ্গত হইতেছে; সুতরাং উক্তপ্রকারেও আর একটি পক্ষ (সিদ্ধান্ত পক্ষ) হইতে পারে। ৮
তাহার পর ‘যিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্ববিৎ অর্থাৎ সামান্য ও বিশেষভাবে সমস্ত বিষয় জানেন’, ‘যিনি ক্ষুধা-পিপাসা অতিক্রম করিয়াছেন’, ‘তিনি অসঙ্গ, অতএব কোথাও আসক্ত হন না’ ‘এই অক্ষরের(ব্রহ্মের) শাসনে’ ‘যিনি সমস্ত ভূতে অব- স্থিত অন্তর্যামী অমৃতস্বরূপ’ ‘সেই যিনি সমস্ত পুরুষকে(জীবকে) অভিভবপূর্ব্বক অতিক্রম করিয়াছেন’ ‘তিনিই এই মহান্ অজ আত্মা’ ‘ইনিই সর্ব্বলোক-বিধারক সেতু’, ‘তিনি জরা-মরণবর্জিত নিষ্পাপ আত্মা’, ‘তিনি তেজ সৃষ্টি করিলেন’, ‘সৃষ্টির পূর্ব্বে এই জগৎ এক আত্মারূপেই বিদ্যমান ছিল’ ‘সর্ব্বধর্মাতীত তিনি জাগতিক দুঃখে লিপ্ত হন না’ ইত্যাদি শত শত শ্রুতি হইতে এবং ‘আমিই সকলের উৎ- পত্তির কারণ, আমা হইতেই সমস্ত প্রাদুর্ভূত হয়’ ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্র হইতে এবং তদনুকূল যুক্তি হইতেও জানা যায় যে, সংসারীর অতিরিক্ত একজন পরামাত্মা আছেন, তিনিই জগতের মূল কারণ। ৯
এখন আপত্তি হইতেছে যে, “এবমেব অস্মাদাত্মনঃ” এই শ্রুতি অনুসারে সংসারী আত্মা হইতেই জগতের উৎপত্তির কথা পূর্ব্বে বলা হইয়াছে;[এখন আবার তদ্বিরুদ্ধ কথা বলা হইতেছে কেন?], না সেরূপ কথা বলা হয় নাই; কারণ, ‘এই যে, হৃদয়মধ্যবর্তী আকাশ’ এইবাক্যে আকাশ-শব্দে পরমাত্মার প্রস্তাব থাকায় উক্ত বাক্যেও সেই পরমাত্মারই পরামর্শ(সম্বন্ধ রক্ষা) করা যুক্তিসঙ্গত। ‘এই বিজ্ঞানময় তখন কোথায় ছিল?’ এই প্রশ্নের উত্তরেও আকাশ-শব্দবাচ্য পরমাত্মারই উল্লেখ করা হইয়াছে; যথা-‘এই যে, হৃদয়মধ্যস্থ আকাশ, তিনি তন্মধ্যে অবস্থান করেন’ ইতি। পরমাত্মাও যে, আকাশ-শব্দের একটি অর্থ, তাহাও-‘হে সোম্য, তখন সৎব্রহ্মের সহিত মিলিত হয়’, ‘এই প্রাণিগণ প্রত্যহ এই ব্রহ্মলোকে গমন করিয়াও তাহাকে লাভ করে না’, ‘প্রাজ্ঞ পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হইয়া, পরমাত্মাতে অবস্থান করে’ ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা অবধারিত হই- তেছে। কারণ, ‘ইহার অভ্যন্তরে যে ক্ষুদ্র আকাশ আছে’ এইরূপ উপক্রমের পর, সেই আকাশেই আবার আত্ম-শব্দের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়। অতএব বুঝিতে হইবে যে, পরমাত্মাই এখানে প্রস্তাবিত; সুতরাং “এবমেবাম্মাদাত্মনঃ” এই স্থানে পরমাত্মা হইতে সৃষ্টি নির্দেশ হওয়াই যুক্তিযুক্ত; আর সংসারী আত্মার যে, সৃষ্টি স্থিতি ও সংসার সম্বন্ধে জ্ঞান ও সামর্থ্য নাই, এ কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। ১০
৫৪৩
‘বিশেষতঃ এখানেও ব্রহ্মবিদ্যার প্রস্তাব রহিয়াছে; যথা—’আত্মা বলিয়াই উপা- সনা করিবে’, ‘আমি ব্রহ্মস্বরূপ—এইরূপেই আত্মাকে উপলব্ধি করিয়াছিলেন‘। ব্রহ্মবিজ্ঞান অর্থ—ব্রহ্মবিষয়ক জ্ঞান; ‘আমি তোমাকে ব্রহ্মতত্ত্বোপদেশ দিব’ এবং ‘আমি তোমাকে ব্রহ্ম বুঝাইব’ ইত্যাদি বাক্যে সেই ব্রহ্মবিজ্ঞানেরই কথা আরব্ধ হইয়াছে। এখন বিবেচ্য বিষয় হইতেছে এই যে, জগৎকারণ ব্রহ্ম হইতেছেন অসংসারী, অশনায়াদি-ধর্মাতীত এবং নিত্যশুদ্ধ বুদ্ধ ও মুক্তস্বভাব; আর সংসারী জীব হইতেছে ঠিক তাহার বিপরীত; সুতরাং ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’(আমি ব্রহ্ম) বাক্যে কখনই তাহা গ্রহণ করা যাইতে পারে না; কেন না, অপকৃষ্ট সংসারী জীব, স্বপ্রকাশ সর্ব্বেশ্বর পরমেশ্বরকে আপনার অভিন্ন আত্মারূপে গ্রহণ করিলে, সে অপরাধী হইবে না কেন? অতএব ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’(আমি ব্রহ্ম) ইত্যাকার বুদ্ধি বা উপাসনা করা উচিত নহে। ১১
অতএব পুষ্প-জলাঞ্জলি, স্তুতি, নমস্কার, উপহারপ্রদান, নামজপ, ধ্যান ও যোগাদি দ্বারাই ভগবদারাধনার ইচ্ছা করিবে; কিন্তু অগ্নিকে শীতলরূপে অথবা আকাশকে মূর্ত্তিমান্ সাকাররূপে চিন্তা করার ন্যায় অসংসারী পরমাত্মাকে কখনই সংসারী জীবের সহিত অভিন্নরূপে চিন্তা করিবে না। সংসারী, আত্মা ও ব্রহ্মের একত্ব চিন্তাপ্রতিপাদক শাস্ত্রগুলিকে ‘অর্থবাদ’(প্রশংসাবাক্য) বলিয়াই গ্রহণ করিতে হইবে(১)। এইরূপ সিদ্ধান্ত স্থির হইলেই সমস্ত তর্ক- শাস্ত্র, লোকব্যবহার ও যুক্তির সহিত অবিরোধ স্থাপন হইতে পারে। ১২
না—এরূপ কথা হইতে পারে না; কেন না, মন্ত্র ও ব্রাহ্মণবাক্য হইতে
জানা যায় যে, সেই পরমাত্মাই জীবরূপে দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছেন-প্রথমতঃ: ‘প্রথমে দ্বিপদসৃষ্টি’ এইরূপ উপক্রম করিয়া ‘পুরুষ সেই সমুদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন’, ‘প্রত্যেক রূপের অনুরূপ হইয়াছিলেন, তাহাই তাহার প্রকাশ-- যোগ্য রূপ’, ‘ধীর(ব্রহ্ম) দৃশ্যমান সমস্ত রূপ নির্মাণ করিয়া সে সমুদয়ের বিশেষ বিশেষ নাম প্রদানপূর্ব্বক সেই সেই নামে ব্যবহার করতঃ তন্মধ্যে. অবস্থান করেন’ ইত্যাদি সর্ব্বশাখীয় সহস্র সহস্র মন্ত্র ও অর্থবাদবাক্য অসংসারী সৃষ্টিকর্তারই শরীরমধ্যে প্রবেশের কথা প্রকাশ করিতেছে। সেইরূপ ‘তিনি ভূতত্রয় সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন’, ‘তিনি এই সীমা অতিক্রম- পূর্ব্বক ইহা দ্বারা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন’, ‘সই দেবতা(পরব্রহ্ম ইচ্ছা করিলেন-) আমি এই জীবাত্মারূপে এই তিনটি দেবতার(অগ্নি, জল ও পৃথিবীর) মধ্যে প্রবেশ করিয়া[নাম ও রূপ প্রকটিত করিব,]’ এই পরমাত্মা সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে। গূঢ় বা প্রচ্ছন্নভাবে আছেন, সেইজন্য প্রকাশ পান না’, ইত্যাদি ব্রাহ্মণভাগও: পরমাত্মারই জীবদেহে প্রবেশ প্রতিপাদন করিতেছে। বিশেষতঃ সমস্ত শ্রুতিতে ব্রহ্মেতেই আত্ম-শব্দের প্রয়োগ থাকায়, সেই আত্মা-শব্দই আবার প্রত্যগাত্মা জীবেরও বাচক হওয়ায় এবং ‘ইনিই সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা’ এইরূপ স্পষ্ট শ্রুতিবাক্য থাকায় জানা যায় যে, পরমাত্মার অতিরিক্ত সংসারী বলিয়া কোন পদার্থ নাই; এবং ‘নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয়’ ‘এ জগৎ ব্রহ্মই’ ‘এ জগৎ আত্মস্বরূপই’ ইত্যাদি শ্রুতি অনুসারেও আত্মার ব্রহ্মস্বরূপতা অবধারণ করা যুক্তিসঙ্গত হইতেছে। ১৩
ভাল কথা, এইরূপই যখন শাস্ত্রসিদ্ধান্ত নির্ণীত হইল, তখন সংসারিত্ব বা ‘জীবভাবও পরমাত্মারই বুঝিতে হইবে; তাহা হইলে ত শাস্ত্রের কথা বিরুদ্ধ হইয়া পড়ে;[কারণ, শাস্ত্রে পরমাত্মার অসংসারিত্বই বর্ণিত আছে।] আর. আত্মা যদি অসংসারী হয়, তাহা হইলেও শাস্ত্রোপদেশের আনর্থক্যদোষ স্পষ্টরূপেই প্রতিভাত হয়;[কারণ, অসংসারী আত্মার সম্বন্ধে আর বিধিনিষেধ সম্ভব হয়. না।] সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা পরমাত্মা যদি দেহসমূহের সহিত সংসৃষ্ট থাকার দরুণই দৈহিক দুঃখ অনুভব করেন বল, তাহা হইলেও তাহার সংসারিত্ব ধৰ্ম্ম স্পষ্টই স্বীকার করা হয়; অথচ সেরূপ হইলে পরমাত্মার অসংসারিত্ববোধক সমস্ত শ্রুতি,. স্মৃতি, ন্যায় ও যুক্তি বিরুদ্ধ হইয়া পড়ে। ‘আর যদি বা প্রাণ ও শরীরসম্বন্ধজ দুঃখের সহিত আত্মার কথঞ্চিৎ অসম্বন্ধও প্রতিপাদন করিতে পার, তাহা হইলেও পরমাত্মার পক্ষে গ্রাহ্য ও পরিত্যাজ্য কিছু না থাকায় উপদেশের আনর্থক্যরূপ যে দোষ, কিছুতেই তাহার বারণ করিতে পার না। ১৪
এ আপত্তির পরিহার উপলক্ষে কেহ কেহ এইরূপ বলিয়া থাকেন যে, পরমাত্মা যে, সাক্ষাৎসম্বন্ধে স্বীয়রূপেই ভূতগণের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হন, তাহা নহে; তবে কি না, পরমেশ্বরই বিকৃতাবস্থা প্রাপ্ত হইয়া জীবভাব গ্রহণ করেন; সেই জীব পরমাত্মা হইতে ভিন্নও বটে, অভিন্নও বটে। যে ভাবে ভিন্ন, সেই ভাবেই তাহার সংসারিত্ব(সুখদুঃখাদি সম্বন্ধ), আর যে ভাবে পরমাত্মার সহিত অভিন্ন, সেই ভাবেই ‘অহং ব্রহ্ম’ বলিয়া গ্রহণাই হন; এইরূপ বলিলে সমস্ত কথাই অবিরুদ্ধ হইতে পারে, ইত্যাদি। ১৫
উক্ত সিদ্ধান্তে-বিজ্ঞানাত্মা জীবের বিকারিত্বপক্ষে এই কয়টি পন্থা অব- লম্বিত হইতে পারে-দ্রব্যপদার্থ পৃথিবী যেরূপ বহুদ্রব্যের সমাহার বা সমষ্টিভূত সাবয়ব, তেমনি পরমাত্মাও বহু দ্রব্যের সমষ্টিভূত একটি সাবয়ব দ্রব্যপদার্থ। পৃথিবীর আংশিক পরিণাম ঘটাদির ন্যায় তাঁহারও একাংশমাত্রের পরিণাম জীবাত্মা; অথবা কেশ ও উষরাদিভূমি যেরূপ নিজে পূর্বাবস্থায় অবস্থান করিলেও, তাহার একাংশমাত্র বিকৃত বা রূপান্তরিত হয়, তদ্রূপ স্বাভাবিক অবস্থায় বর্তমান পরমাত্মারও একদেশমাত্র বিকার প্রাপ্ত হয়; অথবা দুগ্ধ প্রভৃতি বস্তু যেরূপ সর্ব্বাংশেই দধ্যাদি-আকারে পরিণত হয়, তদ্রূপ পরমাত্মাও সর্ব্বাঙ্গীণ- ভাবেই জীবরূপে পরিণত হয়। উক্ত পক্ষত্রয়ের মধ্যে, যদি সজাতীয় বহুবিধ দ্রব্যবিশিষ্ট পরমাত্মার অংশবিশেষ জীবভাব প্রাপ্ত হয় বল; তাহা হইলে, অবশ্যই বলিতে হইবে যে, সমানজাতীয় বহুবিধ দ্রব্য বিদ্যমান থাকায় পরমাত্মার একত্ব- বোধক কথাটি নিশ্চয়ই উপচরিত বা গৌণার্থবোধক, কখনই উহা পারমার্থিক বা মুখ্যার্থে প্রযুক্ত হয় নাই। এরূপ হইলে নিশ্চয়ই শ্রুতিসিদ্ধান্ত বিরুদ্ধ হইয়া পড়ে। ১৬
যদি বল, পরমাত্মা হইতেছেন—সর্ব্বদাই অযুত-সিদ্ধ অবয়ব-সমন্বিত—অবয়বী (১); সুতরাং তিনি স্বীয় স্বাভাবিক অবস্থা পরিত্যাগ না করিলেও তাঁহার
একদেশ সংসারী জীবাকার ধারণ করিতে পারে; তাহা হইলেও অবয়বী যখন সমস্ত অবয়বে অনুগত বা অনুস্যুত, এবং অবয়বীই যখন অবয়বের দোষগুণভাগী, তখন জীবাত্মার সংসারিত্ব দোষ পরমাত্মাতেও অবশ্যই সংক্রামিত হইতে পারে; অতএব উক্তপ্রকার কল্পনাও অনিষ্ট অর্থাৎ স্বার্থসিদ্ধির প্রতিকূল। আর দুগ্ধের ন্যায় সর্ব্বতোভাবে পরিণামপক্ষেও সমস্ত শ্রুতি ও স্মৃতিবাক্যের সহিত বিরোধ উপস্থিত হয়। ১৭
‘তিনি নিরংশ নিষ্ক্রিয় ও শান্তস্বভাব’, ‘স্বপ্রকাশ অমূর্ত্ত ও জন্মরহিত পুরুষ (পরমাত্মা) বাহিরে ভিতরে অবস্থিত’, ‘আকাশের ন্যায় সর্ব্বব্যাপী ও নিত্য’ ‘সেই এই আত্মা মহান্(ব্যাপক), জন্মরহিত, অজর, অমর ও অমৃত’ ‘কখনও জন্মে না বা মরে না’ ‘এই আত্মা অব্যক্ত’ ইত্যাদি শ্রুতি, স্মৃতি ও যুক্তি সমস্তই এ পক্ষে বিরুদ্ধ হয়। আর অচল বা গতিহীন পরমাত্মার একদেশ জীবাত্মা, এই পক্ষেও জীবাত্মার কর্ম্মফলভোগোপযোগী প্রদেশে গমন করা সম্ভবপর হয় না; আর গতিসম্ভব হইলেও যে, পরমাত্মারই সংসারিত্ব সম্ভাবনা হয়, এ কথা ত পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। ১৮
যদি বল, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় পরমাত্মারই একাংশ বিজ্ঞানাত্মারূপে(জীব- ভাবে) সংসারী হয়; তাহা হইলেও পরমাত্মার অবয়ব বা অংশবিশেষ স্ফুটিত হওয়ায়, তাহার সেই অংশে ত ক্ষত উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। আর সেই স্ফুটিত অংশই যদি অন্যত্র চলিয়া যায়, তাহা হইলেও পরমাত্মার অপরাপর অংশবিশেষে নিশ্চয়ই ছিদ্র(গর্ত) উপস্থিত হইতে পারে, অধিকন্তু পরমাত্মার অব্রণত্ব(ক্ষতশূন্যতা)-বোধক শ্রুতিবাক্যেরও বিরোধ হইয়া পড়ে। বিশেষতঃ পরমাত্মার অংশস্বরূপ বিজ্ঞানাত্মার সংসরণ বা নিঃসরণ স্বীকার করিলে, সর্ব্বব্যাপী পরমাত্মারহিত কোনও স্থান বা প্রদেশ না থাকায়, ফলতঃ নিজের মধ্যেই অপর অবয়বের নিঃসরণ ও প্রবেশ হইলে, উহা ত হৃদয়ে শূল বিদ্ধ হইলে যেরূপ বেদনা হয়, পরমাত্মারও ঠিক তদ্রূপই বেদনা উপস্থিত হওয়া সম্ভবপর। ১৯
যদি বল, শ্রুতিতে যখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের দৃষ্টান্ত রহিয়াছে, তখন এ আপত্তি সঙ্গত ‘হইতে পারে না; না, সে কথাও হইতে পারে না; কারণ, শ্রুতি কেবল জ্ঞাপক মাত্র, অর্থাৎ কোন শাস্ত্রই কোন পদার্থকে রূপান্তরিত করিতে পারে না, পরন্তু যে বস্তু যেরূপ, তাহার সেই রূপটিকেই কেবল যথাযথভাবে জ্ঞাপন করিয়া দেয় মাত্র, কিন্তু বস্তুগত কোন শক্তি বা স্বভাবের বিপর্যয় ঘটায় না। ভাল, তাহাতেই বা কি হইল? হ্যাঁ, ইহাতে যাহা হইল, তাহা বলিতেছি; শ্রবণ কর,—সাবয়ব বা
৫৪৭
নিরবয়ব যে সমস্ত পদার্থ যেরূপ ধর্মসম্পন্ন বলিয়া জগতে প্রসিদ্ধ, সে সমুদায়ের দৃষ্টান্ত-প্রদর্শনদ্বারা তদনুরূপ অপর কোনও বস্তু প্রতিপাদন করাই শাস্ত্রের উদ্দেশ্য; সুতরাং শাস্ত্র কখনই কেবলই বিরোধ-জ্ঞাপনের জন্য কোনও লোকসিদ্ধ দৃষ্টান্তের উল্লেখ করিতে পারে না; আর যদি তাদৃশ দৃষ্টান্তেরও উল্লেখ করে, তাহা হইলেও সেরূপ দৃষ্টান্ত নিশ্চয়ই নিরর্থক হয়; কারণ, দাষ্টান্তিকে—যাহার জন্য দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হয়, তাহার পক্ষে ঐরূপ দৃষ্টান্তের কোনই উপযোগিতা থাকিতে পারে না; কেন না, শত শত দৃষ্টান্ত দ্বারাও অগ্নির শীতলতা বা আদিত্যের অতাপ- করতা প্রতিপাদন করিতে পারা যায় না; কারণ, প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ দ্বারা অগ্নি ও আদিত্যাদি বস্তুর অন্যপ্রকার স্বভাবই প্রমাণিত হইয়া থাকে। ২০
আরও এক কথা, এক প্রমাণ কখনই অপর প্রমাণের বিরোধী হয় না বা হইতে পারে না; বরং অপর প্রমাণের যাহা অবিষয় অর্থাৎ অপর প্রমাণের দ্বারা যাহা প্রমাণিত হয় না; সেইরূপ বিষয়ই জ্ঞাপন করিয়া থাকে মাত্র। বিশেষতঃ শাস্ত্রপ্রমাণ কখনই লোকসিদ্ধ-বিষয়ের সাহায্য না লইয়া অবিজ্ঞাত কোনও অলৌকিক বস্তু জ্ঞাপন করিতে সমর্থ হয় না; এই জন্য লৌকিক নিয়মের অনুসরণ করা হয় মাত্র, কিন্তু কেবলই লোক-প্রসিদ্ধ নিয়মের অনুসরণ করিয়া কেহই পরমাত্মার সাবয়বত্ব বা অংশাংশিভাব কল্পনা করিতে সমর্থ হয় না। ২১
যদি বল, ‘যেমন অগ্নির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ-সমূহ’ ইত্যাদি শ্রুতিতে এবং ‘জগতে আমারই অংশ জীবভূত’ ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্রেও[জীবকে পরমাত্মারই অংশ বলা হইয়াছে; সুতরাং উহা অবিজ্ঞাত কিসে?]; না—এ কথাও বলা চলে না; কারণ,[জীব ও পরমাত্মার] একত্ব বা অভেদ-প্রতিপাদনেই ঐ সমস্ত শ্রুতি- স্মৃতির তাৎপর্য্য; কেন না, অগ্নির স্ফুলিঙ্গ প্রকৃতপক্ষে অগ্নিই বটে, অগ্নি হইতে পৃথক্ নহে; সুতরাং জগতে অগ্নি ও তাহার স্ফুলিঙ্গ এক অভিন্ন বলিয়াই ব্যবহারের যোগ্য; অতএব অংশমাত্রই অংশের সহিত একত্ব-ব্যবহারযোগ্য। এতদনুসারে বুঝিতে হইবে, যে সমস্ত শব্দ প্রমাণ জীবাত্মাকে পরমাত্মার বিকার বা অংশ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছে, প্রকৃতপক্ষে সে সমস্ত শব্দই জীবের সহিত পরমাত্মার একত্ব-প্রতীতিমাত্রের বিধায়ক। ২২
বাক্যের উপক্রম উপসংহারও ইহার অপর সমর্থক,—সমস্ত উপনিষদেই প্রথমে একত্ব(ব্রহ্মের অদ্বিতীয়তা) প্রতিজ্ঞা করিয়া,(প্রতিজ্ঞা—প্রকৃত বিষয়ের নির্দেশ) দৃষ্টান্ত ও যুক্তিদ্বারা সমস্ত জগৎকে পরমাত্মার বিকার ও অংশাদিভাবে প্রতিপাদন করত উপসংহারকালে পুনশ্চ সেই একত্বের কথাই বলিয়াছেন, উদাহরণ যথা—
এখানেই প্রথমে ‘এই সমস্ত জগৎই আত্মস্বরূপ’ এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া, জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও লয়ের সম্বন্ধে বহু দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়া, কারণ সম্বন্ধেও— বিকার ও বিকারীর অর্থাৎ কার্য্য ও কারণের একত্বপ্রতীতির অনুকূলে বহুবিধ কারণ প্রদর্শন করিয়া উপসংহারস্থলে বলিয়াছেন যে, ‘ব্রহ্ম কোন বস্তুরই ভিতরে বা বাহিরে নাই’ ‘এই আত্মাই ব্রহ্ম’ ইত্যাদি। ২৩
অতএব বাক্যের প্রারম্ভ ও উপসংহার হইতে এই সিদ্ধান্তই অবধারিত হইতেছে যে, জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়-প্রতিপাদক বাক্যগুলি কেবল পরমাত্ম-জ্ঞানের দৃঢ়তাস্থাপনের জন্যই প্রযুক্ত হইয়াছে; এরূপ স্বীকার না করিলে বাক্যভেদ হই- বার সম্ভাবনা হয়।[একটি বাক্যের দুইপ্রকার অর্থ করাকে বাক্যভেদ বলে]। ২৪
এ বিষয়ে উপনিষৎ-সম্প্রদায়বিশারদগণ একটি আখ্যায়িকা(গল্প) বলিয়া থাকেন। তাহা এইরূপ,-কোন এক রাজপুত্র জন্মের পরই পিতামাতাকর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া ব্যাধভবনে পরিপালিত ও পরিবন্ধিত হইয়াছিল। বংশ- পরিচয় না জানা থাকায় সে আপনাকে ব্যাধজাতীয় মনে করিয়া ব্যাধ- জাত্যুচিত কৰ্ম্ম ও আচারানুষ্ঠান করিতে লাগিল, কিন্তু ‘আমি রাজা বা রাজপুত্র’ এইরূপ মনে করিয়া কখনও রাজোচিত কর্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইল না। যখন কোন এক পরম দয়ালু মহাপুরুষ সেই রাজপুত্রের রাজ্যসম্পদ্ পাইবার সম্ভাবনা বুঝিতে পারিয়া, তাহাকে তাহার রাজপুত্রত্ব জ্ঞাপনের জন্য বলিলেন-‘তুমি ব্যাধজাতি নও, তুমি অমুক রাজার পুত্র; কোন কারণে ব্যাধগৃহে প্রবেশ করিয়াছ মাত্র ইত্যাদি‘। সে তখন এইরূপ প্রবোধ লাভ করিয়া তৎক্ষণাৎ আপনার ব্যাধজাতীয় জ্ঞান ও তদুচিত কর্মানুষ্ঠানপ্রভৃতি সমস্ত পরিত্যাগপূর্ব্বক আপনাকে রাজা মনে করিয়া আপনার পিতৃপিতামহাদির আচার ও রীতি পদ্ধতির অনুসরণ করিতে লাগিল। ঠিক সেইরূপ এই জীবাত্মাও অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় পরমাত্মার তুল্যস্বভাব হইয়াও পরমাত্মা হইতে বিভক্ত হওয়ায় এই দেহেন্দ্রিয়াদিময় অরণ্যে প্রবেশ করাতে, নিজে সংসার- ধর্মবিবর্জিত হইয়াও দেহেন্দ্রিয়াদিগত সংসার-ধর্মের অনুবৃত্তি করিয়া থাকে,- আপনার পরমাত্মভাব জানা না থাকায় আপনাকে দেহেন্দ্রিয়াত্মক কৃশ স্থূল সুখী দুঃখী বলিয়া অভিমান করিয়া থাকে, কিন্তু যখন সে আচার্য্যের নিকট হইতে ‘তুমি এই দেহেন্দ্রিয়াত্মক নও, তুমি সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ।’ এইরূপ সম্যক্ জ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ হয়, তখনই সে আপনার জীবভাব ও পুত্র বিত্ত ও স্বর্গাদি-বিষয়ক কামনা পরিত্যাগপূর্ব্বক ‘আমি ব্রহ্ম’ ইত্যাকার ব্রহ্মাত্মভাব প্রাপ্ত হয়। ২৫
৫৪৯
উক্ত দৃষ্টান্তস্থলে রাজপুত্রের রাজত্ববুদ্ধির ন্যায় ‘তুমিও অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় পরব্রহ্ম হইতে বহির্গত হইয়াছ’, এই কথা শ্রবণমাত্র জীবেরও ব্রহ্মবুদ্ধি দৃঢ়তর হইয়া থাকে; কারণ, অগ্নি হইতে বহির্গমনের পূর্ব্বে স্ফুলিঙ্গ ও অগ্নির একত্ব বা অভিন্নভাব প্রত্যক্ষদৃষ্ট; সুতরাং অসন্দিগ্ধ; অতএব শাস্ত্রে যে, সুবর্ণ, মণি, লৌহ ও স্ফুলিঙ্গের দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইয়াছে, বুঝিতে হইবে, জীব-ব্রহ্মের অভেদবুদ্ধির দৃঢ়তাসম্পাদনই তাহার মুখ্য উদ্দেশ্য; কিন্তু উৎপত্তি প্রভৃতি দ্বারা ভেদপ্রতিপাদন করা তাঁহার উদ্দেশ্য নহে। সৈন্ধবপিণ্ড যেরূপ সর্ব্বতোভাবে লবণরসে পূর্ণ, তদ্রূপ আত্মাও একমাত্র জ্ঞানস্বরূপ—চৈতন্যমাত্র, এইরূপ অবধারণ করিতে হইবে। কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন,—‘তাঁহাকে একরূপেই দর্শন করিতে হইবে‘। চিত্রপটের ন্যায় এবং বৃক্ষ ও সমুদ্রাদির ন্যায় ব্রহ্মের সম্বন্ধেও যদি উৎপত্তি-বিনাশাদি বহু ধৰ্ম্ম প্রতিপাদন করাই ঐসকল শ্রুতির অভিপ্রেত হইত, তাহা হইলে কখনই উপসংহারস্থলে আত্মাকে সৈন্ধবখণ্ডের ন্যায় ভিতরে বাহিরে সর্ব্বত্র একরস(জ্ঞানরূপ) বলিতেন না, এবং ‘একরূপেই দর্শন করিতে হইবে’ এরূপ বাক্যেরও প্রয়োগ করিতেন না; আর ‘যে লোক এই ব্রহ্মেতে নানাভাবের মত দর্শন করে’ ইত্যাদি নিন্দাবাক্যও নির্দেশ করিতেন না। ২৬
অতএব বুঝিতে হইবে যে, একমাত্র একত্বপ্রত্যয়ের দৃঢ়তা-সম্পাদনের জন্যই উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়াদি কল্পিত হইয়াছে, কিন্তু সেরূপেই জানিবার উদ্দেশ্যে নহে। তাহার পর, সংসারী জীবাত্মাকে নিরবয়ব ও অসংসারী পরমাত্মার এক- দেশ বা অংশ বলিয়া কল্পনা করাটা যুক্তিযুক্তও হয় না; কারণ, পরমাত্মা স্বভাবতঃই অ-দেশ অর্থাৎ অবয়ববিহীন; পক্ষান্তরে অদেশ(নিরবয়ব) পরমাত্মার একদেশে সংসারিত্ব কল্পনা করিলে প্রকৃতপক্ষে পরমাত্মারই সংসারিত্ব কল্পিত হইয়া পড়ে; [ অতএব এরূপ কল্পনা কখনই সঙ্গত হইতে পারে না]। ২৭
যদি বল, ঘট-করকাদি উপাধিকৃত আকাশৈকদেশের ন্যায় পরমাত্মারও স্বতন্ত্র উপাধি দ্বারা একদেশ কল্পিত হইতে পারে? না, তাহা হইলেও বিবেকী লোক- দিগের নিকট কখনই পরমাত্মার একদেশ(জীব) পৃথক্ বলিয়া প্রতীত হইতে পারে না। যদি বল, বিবেকী অবিবেকী সকলেরই ত ঔপচারিক জ্ঞান (গৌণার্থবিষয়ক জ্ঞান) হইতে দেখা যায়; না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, তাদৃশ স্থলেও অবিবেকী অজ্ঞলোকদিগের বুদ্ধি ভ্রান্তিময়—মিথ্যা, আর বিবেকী লোকদিগের বুদ্ধি হয়—কেবল ব্যবহার-নিষ্পাদক মাত্র(সত্য নহে); উদাহরণ—যেমন নীরূপ আকাশও সময়বিশেষে বিবেকী লোকদিগের নিকটও
কৃষ্ণ বা রক্তবর্ণ বলিয়া প্রতীত হয় সত্য; বুঝিতে হইবে যে, আকাশের তাদৃশ কৃষ্ণতা ও রক্ততা কেবল ব্যবহারিক দশায় সত্তা লাভ করিয়া থাকে মাত্র; কিন্তু আকাশ কখনও সত্য সত্যই তাহাদের নিকট কৃষ্ণ বা রক্তবর্ণ বলিয়া সত্যতা-বুদ্ধি সমুৎপাদনে সমর্থ হয় না। অতএব যাহারা পণ্ডিত, তাহাদের সম্বন্ধে ব্রহ্মস্বরূপনিরূপণের জন্য ব্রহ্মের অংশাংশিভাব, বিকার-বিকারিভাব বা একদেশ-একদেশিত্ব কল্পনা করা উচিত হয় না; কারণ, সর্ব্বপ্রকার কল্পনার নিরসন করাই সমস্ত উপনিষদের সার মৰ্ম্ম। অতএব সর্ব্বপ্রকার কল্পনা পরিত্যাগপূর্ব্বক আকাশের ন্যায় ব্রহ্মেরও নির্বিশেষভাবই গ্রহণ করিতে হইবে; কারণ, শত শত শ্রুতি বলিতেছেন—‘তিনি আকাশের ন্যায় সর্ব্বগত ও সর্ব্ববাহ্য পরমাত্মা শোকদুঃখে লিপ্ত হন না’ ইত্যাদি। ২৮
অপিচ, উষ্ণস্বভাব অগ্নির একদেশে শীতত্ব কল্পনার ন্যায়, অথবা প্রকাশশীল সূর্য্যের একাংশে অন্ধকার কল্পনার ন্যায় জীবাত্মাকেও কখনই ব্রহ্মবিলক্ষণ অর্থাৎ ব্রহ্মের বিপরীত স্বভাবসম্পন্ন বলিয়া কল্পনা করিবে না; কারণ, সর্ব্বপ্রকার ভেদ- কল্পনার অপনয়নেই সমস্ত উপনিষৎশাস্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য্য। অতএব সংসার- ধৰ্ম্মবিবর্জিত আত্মাতে যে সমুদয় ভেদব্যবহার, তৎসমস্তই নাম-রূপাত্মক উপাধি- সম্বন্ধজনিত,(স্বাভাবিক নহে); কারণ, ‘ব্রহ্ম প্রত্যেক রূপের(আকৃতিবিশিষ্ট পদার্থের) অনুরূপ হইয়াছেন’, ‘ধীর(বিবেকী) পরমেশ্বর সমস্ত রূপ(আকৃতি) নির্মাণ করিয়া এবং সে সমুদায়ের নামকরণপূর্ব্বক সেই সমস্ত নামে সম্বোধন করিয়া অবস্থান করিতেছেন’, এবংবিধ বহু মন্ত্র হইতে জানা যায় যে, পরমাত্মার সংসারিত্ব ধৰ্ম্ম স্বাভাবিক নহে, পরন্তু অলক্তকাদি(আলতা প্রভৃতি) উপাধি-সংযুক্ত স্ফটিকে লৌহিত্য-প্রতীতির ন্যায় আত্মার সংসারিত্ব-বুদ্ধিও ভ্রমাত্মকই বটে, পারমার্থিক নহে। ২৯
‘তিনি যেন ধ্যানই করেন, ক্রিয়াই করেন’, ‘কোন কৰ্ম্ম দ্বারা বৃদ্ধিও পান না, অথবা কমিয়াও যান না’, ‘পাপকর্ম্মে লিপ্ত হন না’, ‘তিনি সর্ব্বভূতে সমানভাবে অবস্থিত’, ‘কুকুর এবং শ্বপাক চাণ্ডালে[সমদর্শী]’ ইত্যাদি শ্রুতি, স্মৃতি ও যুক্তি হইতে পরমাত্মার অসংসারিত্বই প্রমাণিত হইতেছে। অতএব ব্রহ্মকে যখন নিরবয়ব বলিয়াই স্বীকার করিতে হইবে, তখন বিজ্ঞানাত্মা জীবকে তাহার একদেশ, বিকার, শক্তি কিংবা অন্য কিছু বলিয়া কল্পনা করা যাইতে পারে না। অংশাদি- ভাবপ্রকাশক শ্রুতি ও স্মৃতি বাক্যগুলির প্রধান উদ্দেশ্য হইতেছে—জীব-ব্রহ্মের একত্ব প্রতিপাদন করা, কিন্তু ভেদপ্রতিপাদন করা নহে; কারণ, তাহা হইলেই
৫৫১
শ্রুতির অভিপ্রেত অর্থে একবাক্যতা(একরূপতা) রক্ষা পাইতে পারে, এ কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। ৩০
ভাল কথা, পরমাত্মা-পরব্রহ্মের একত্ব জ্ঞাপন করাই যদি সমস্ত উপনিষদের অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে তদ্বিরুদ্ধ অর্থ-বিজ্ঞানাত্মভেদ কল্পনা করিবার প্রয়ো- জন কি?-ইহার উত্তরে কেহ কেহ বলেন,-কর্মকাণ্ডের(কৰ্ম্মপ্রতিপাদক শাস্ত্রের) প্রামাণ্য ও অবিরোধ রক্ষা করাই উহার প্রয়োজন; কারণ, কৰ্ম্মপ্রতিপাদক বাক্য- গুলি প্রধানতঃ বহুবিধ ক্রিয়া, কারক, কর্মফল, ভোক্তা ও কর্তার অপেক্ষিত; সুতরাং জীব না থাকিলে, পক্ষান্তরে অসংসারী পরমাত্মার একত্ব হইলে, সেগুলি কিপ্রকারে লোকের অভীষ্ট ফলসাধক কর্মানুষ্ঠানের বিধান করিতে পারে? অর্থাৎ জীবাত্মার যদি ভেদই না থাকে, আর যদি অসংসারী পরমাত্মাই একমাত্র সত্য পদার্থ হন, তাহা হইলে ক্রিয়াকারকাদি ভেদসাপেক্ষ কর্মকাণ্ডের কোনই সার্থকতা থাকে না, এবং অনিষ্ট-ফলসাধক কৰ্ম্ম হইতেও লোকদিগকে বারণ করিতে সমর্থ হইতে পারে না; আর কোন বদ্ধ জীবের জন্যই মোহচ্ছেদক উপনিষদেরও অবতারণা হইতে পারে না। অধিকন্তু পরমাত্মার একত্ববাদীর পক্ষে পরমাত্মার একত্বোপদেশই বা কিরূপে হইতে পারে? আর সেই একত্বোপদেশের ফলই বা কি হইবে? কেন না, বদ্ধ ব্যক্তিরই বন্ধননাশের জন্য উপদেশের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেই বন্ধনই যদি না থাকে, তাহা হইলে সমস্ত উপনিষৎশাস্ত্রই ত নির্বিষয় বা নিরর্থক হইয়া পড়ে। ৩১
অতএব পূর্ব্বোক্ত সিদ্ধান্ত স্থির হইলেই কর্মকাণ্ডবাদী পক্ষের সহিত উপনিষদ্বাদী পক্ষেরও বিরোধ-পরিহারের পথ বা উপায় সমান হইতে পারে। ভেদ না থাকিলে কর্মকাণ্ড যেমন নির্বিষয়ত্ব হেতু প্রামাণ্য লাভ করিতে পারে না, উপনিষদের পক্ষেও তাহা সমান। আচ্ছা, এইরূপই যদি হয়, তাহা হইলে যাহার প্রামাণ্য স্বীকার করিলে অন্য কাহারও স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটে না, সেই কর্মকাণ্ডেরই প্রামাণ্য হউক; উপনিষৎসমূহের প্রামাণ্য স্বীকার করিলে, যখন স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটে, তখন উপনিষৎ-সমুহেরই বরং অপ্রামাণ্য হউক। বিশেষতঃ বৈদিক কর্মকাণ্ড (বেদের কর্মভাগ) প্রথমে প্রমাণরূপে পরিগৃহীত হইয়া কখনই আবার অপ্রমাণ- রূপে পরিগণিত হইতে পারে না; কেন না, প্রদীপ নিজের প্রকাশ্য বস্তুকে কখনও প্রকাশ করে, আবার কখনও করে না, এরূপ ত হইতে পারে না; অতএব উপনিষদপেক্ষা কর্মকাণ্ডেরই প্রামাণ্য হওয়া সম্পূর্ণ উচিত। ৩২
বিশেষতঃ প্রত্যক্ষাদি প্রমাণবিরোধও এ পক্ষে অপর কারণ; উপনিষৎ-
শাস্ত্রগুলি ব্রহ্মৈকত্ব প্রতিপাদন করিয়া কেবল যে, কর্মকাণ্ডেরই প্রামাণ্য ব্যাঘাত করিতেছে, তাহা নহে, পরন্তু যে সমস্ত প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের সাহায্যে দৃঢ়তর ভেদ- প্রতীতি হইয়া থাকে, সেই সমস্ত প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের সঙ্গেও বিরুদ্ধ হইতেছে। অতএব উপনিষৎ-সমূহেরই অপ্রামাণ্য অথবা অন্যপ্রকার অর্থ হয় হউক, কিন্তু ব্রহ্মৈকত্ব প্রতিপাদন করাই যে, উহাদের অর্থ নয়, ইহা নিশ্চিত। ৩৩
না-এ কথাও হইতে পারে না; কারণ, ইহার উত্তর পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে। অভীষ্ট প্রমাণের যে, প্রামাণ্য বা অপ্রামাণ্য, যথার্থ জ্ঞানের উৎপাদন ও অনুৎ- পাদনই তাহার একমাত্র কারণ, অর্থাৎ যে প্রমাণ প্রমা-যথার্থ জ্ঞান জন্মায়, তাহাই প্রমাণ, আর যে প্রমাণ প্রমা-যথার্থ জ্ঞান জন্মায় না, তাহাই অপ্রমাণ; ইহা না হইলে শব্দাদি প্রমেয় বিষয়ে স্তম্ভ প্রভৃতি জড়বস্তুও প্রমাণমধ্যে পরিগণিত হইতে পারিত। আচ্ছা, ইহাতেই বা ফল কি?[ফল এই যে,] উপনিষৎ-সমূহ যদি ব্রহ্মৈকত্ব বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান সমুৎপাদনই করে, তবে তাহা অপ্রমাণ হইবে কেন? যদি বল, না-যথার্থ জ্ঞান সমুৎপাদন করে না, যেমন-‘অগ্নি শীতল’ এই কথায় যথার্থ জ্ঞান জন্মায় না, তেমনি। এরূপ বলিলে, তোমাকে আমি জিজ্ঞাসা করি যে, উপনিষদের প্রামাণ্য-নিষেধার্থ তুমি, যে বাক্যের প্রয়োগ করিতেছ,(‘উপনিষৎ প্রমাণ নয়’ বলিতেছ,) সে বাক্যও কি নিশ্চয়ই উপনিষদের প্রামাণ্য-নিষেধক হইতেছে না? অথবা অগ্নি কি স্বপ্রকাশ্য রূপাদি প্রকাশ করে না? অর্থাৎ অগ্নি যেমন নিয়তই রূপ প্রকাশ করে, তেমনি তোমার বাক্যও নিশ্চয়ই উপনিষদের প্রামাণ্য-নিষেধ করিতেছে; অতএব তোমার বাক্যও নিশ্চয়ই প্রমাণ;[তবেই হইল,] তোমার নিষেধক বাক্য যদি প্রমাণ হয়, তবে উপনিষৎ শাস্ত্রেরই বা প্রামাণ্য না হইবে কেন? অবশ্যই প্রামাণ্য হইবে; অতএব মহাশয়েরাই বলুন যে, ইহার পরিহার বা মীমাংসা ইহা ভিন্ন আর কি হইতে পারে? । ৩৪
এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, আমার বাক্য হইতে যে, উপনিষদের প্রামাণ্য-প্রতি- যেধের বোধ, এবং অগ্নির যে, রূপ-প্রকাশকত্বজ্ঞান, ঐ উভয়ই প্রত্যক্ষসিদ্ধ; সুতরাং তাহা প্রমাণ। ভাল কথা, তাহা হইলে ব্রহ্মৈকত্বপ্রতীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষপ্রমা- সমুৎপাদক উপনিষৎ-সমূহের উপর তোমার এত বিদ্বেষ কেন? শোকমোহাদি অনর্থনিবৃত্তি যে, ব্রহ্মাত্মৈকত্বজ্ঞানের প্রত্যক্ষসিদ্ধ ফল, এ কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। অতএব এ প্রশ্নের উত্তর পূর্ব্বেই প্রদত্ত হওয়ায় পুনরায় আর উপনিষদের অপ্রামাণ্য শঙ্কা করিতে পার না। ৩৫
আরও যে, বলা হইয়াছে—স্বার্থব্যাঘাতকর(উপনিষদ্ নিজেই নিজের)
৫৫৩
স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটায়) বলিয়া উপনিষদ্ শাস্ত্র প্রমাণ হইতে পারে না; না, তাহাও হইতে পারে না; কারণ, উপনিষদশাস্ত্র যে-অর্থ প্রতিপাদন করিতেছে, তাহার ব্যাঘাতক বা অসত্যতাবোধক অপর কোনও প্রমাণ দেখিতে পাওয়া যায় না। ‘অগ্নি উষ্ণও বটে, শীতলও বটে’ এই বাক্য হইতে যেমন বিরুদ্ধ দুইটি(শীতোষ্ণত্ব) অর্থের বোধ হইয়া থাকে,[সুতরাং ঐ বাক্য অপ্রমাণ হয়]; উপনিষদশাস্ত্র ত সেরূপ একবার ‘ব্রহ্ম নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয়’, আবার ‘নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয় নহে’, এই প্রকার বিরুদ্ধার্থ প্রতিপাদন করিতেছে না;[অতএব উপনিষদশাস্ত্র অপ্রমাণ হইবে কেন?] তাহার পর, আমরা এই একই বাক্যের যে, অনেক অর্থ স্বীকার করিয়াছি, প্রকৃতপক্ষে তাহা হইতেছে-‘অভ্যুপগমবাদ’ মাত্র(১); কিন্তু বাক্যের প্রামাণ্য নিরূপণের সময়ে সে নিয়ম-একই বাক্যের অনেকার্থত্ব কখনই গ্রাহ্য হইতে পারে না। অনেকার্থত্ব হইলেই স্বার্থবোধকত্ব ও স্বার্থ- বিঘাতকত্ব-এইরূপ পরস্পর-বিরুদ্ধ আর একটি অর্থ হইতে পারে সত্য, কিন্তু যাঁহারা বাক্যের প্রামাণ্য স্বীকার করেন, তাঁহাদের সিদ্ধান্ত হইতেছে এই যে, একই বাক্য কখনও বিরুদ্ধ ও অবিরুদ্ধ-অনেকার্থ প্রতিপাদন করে না বা করিতে পারে না; কারণ, অর্থের একত্ব হইলেই একবাক্যতা হয়,(কিন্তু অনেকার্থত্ব পক্ষে সেই একবাক্যতার সম্ভব হয় না, পরন্তু বাক্যভেদই উপস্থিত হয়)। ৩৬
আর উপনিষদের মধ্যেও যে, কোন কোন বাক্য ব্রহ্মৈকত্ব নিষেধ করিতেছে, এরূপ ত দেখিতে পাওয়া যায় না। তবে ‘অগ্নি শীতল ও উষ্ণ’ এইরূপ যে লৌকিক বাক্য আছে, সেখানে ত একবাক্যতা(একার্থে সমন্বয়) কখনই হয় না; কারণ, ঐ বাক্যের একদেশ যে, ‘উষ্ণত্ব’, তাহা ত প্রত্যক্ষগ্রাহ্য; [সুতরাং ঐ অংশটুকু প্রসিদ্ধের অনুবাদ মাত্র]; অতএব ‘অগ্নি শীতল’ এই একটি মাত্র বাক্যই যথার্থ; ‘অগ্নি উষ্ণ’ অংশটি কেবল প্রমাণান্তরানুভূত বিষয়ের স্মারক মাত্র, কিন্তু স্বার্থবোধক নহে; কাজেই ‘অগ্নি শীতল’ এই অংশের সহিত উহার একবাক্যতা হইতে পারে না; প্রত্যক্ষানুভূত উষ্ণতার স্মরণ
করাইয়াই উহা চরিতার্থতা লাভ করে। কেহ যদি এই বাক্যটিকে বিরুদ্ধার্থ- প্রতিপাদক বলিয়া মনে করে, তাহা ভ্রান্তিমাত্র; ‘শীত’ ও ‘উষ্ণ’ পদদ্বয়ের সহিত অগ্নি-শব্দের সামানাধিকরণ্য-প্রয়োগই(সমানবিভক্তিযুক্ত বিশেষণ-বিশেষ্যভাবই) ঐরূপ ভ্রান্তি-সমুৎপাদনের কারণ; কিন্তু ইহা সুনিশ্চিত যে, লৌকিক বা বৈদিক প্রয়োগের কোথাও একটি বাক্য অনেকার্থবোধক হয় না। ৩৭
আরও যে আপত্তি হইয়াছিল—উপনিষদ্শাস্ত্রগুলি কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য হানি করিতেছে;(২) তাহাও নয়; কারণ, উপনিষদের অর্থ বা তাৎপর্য্য অন্য- প্রকার অর্থে,(কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য-বিঘাতে নহে)। ব্রহ্মৈকত্বপ্রতিপাদনেই সমস্ত উপনিষদের তাৎপর্য্য; কিন্তু কোন উপনিষদই পুরুষের অভীষ্ট বিষয়প্রাপ্তির উপযোগী সাধনোপদেশের কিংবা তদ্বিষয়ে লোকনিয়োগের কোন বাধা দিতেছে না; কেন না, তাহা হইলে উপনিষদ্বাক্যেরও সেই অনেকার্থতা দোষ ঘটে; অথচ তাহা কখনই যুক্তিসঙ্গত হয় না। আর কর্মকাণ্ডের বাক্যগুলি যে, নিজ নিজ অর্থ বিষয়ে প্রমা—যথার্থজ্ঞান সমুৎপাদন করে না, তাহাও নহে; অসাধারণ বিষয়ে—যাহা অন্য বাক্যের বিষয় নয়, সেরূপ অর্থবিষয়ে যদি প্রমা সমুৎপাদন করে, তাহা হইলেই বা অন্য বাক্যের সহিত তাহার বিরোধ হইবে কেন?। ৩৮
যদি বল, অদ্বৈতব্রহ্মবাদে নিযোজ্যাদি বিষয় থাকে না বলিয়াই ঐ সকল বাক্য প্রমা সমুৎপাদন করিতে পারে না; না, এ কথাও বলা চলে না; কারণ, “স্বর্গাভিলাষী পুরুষ দর্শপূর্ণমাস যাগ করিবে” “ব্রাহ্মণ-বধ করিবে না” ইত্যাদি বাক্য হইতে যে, প্রমা জ্ঞান জন্মিতেছে, ইহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ; আর উপনিষৎ শাস্ত্র ব্রহ্মৈকত্ব প্রতিপাদন করায় প্রমা জ্ঞান জন্মিবে না, এ কথাটা হইতেছে অনুমানমাত্র; কিন্তু প্রত্যক্ষবিরুদ্ধ অনুমান ত প্রামাণ্য লাভ করিতে পারে না; অতএব উপনিষদের প্রামাণ্য স্বীকার করিলে যে, কর্মকাণ্ডীয় বাক্যের প্রমা জ্ঞান সমুৎপাদনে অসামর্থ্য কীর্ত্তন করা হইয়াছে, তাহা যুক্তিসম্মত হয় নাই। ৩৯
(২) তাৎপর্য্য—কর্মকাণ্ডে আছে—জীবগণ ধর্ম্মকর্ম্ম করে ফলের জন্য; কর্ম্মোৎপাদিত সেই ফল—কর্মকর্তা জীবগণ ভোগ করিয়া আনন্দলাভ করে, এইরূপ পাপকর্ম্মের ফলে দুঃখ ভোগ করে; এই জাতীয় ভেদবুদ্ধি লইয়াই কর্মকাণ্ডের আবির্ভাব; আর উপনিষৎ বলিতেছেন, না—জীবগণ কর্ত্তাও নয়, ভোক্তাও নয়; জীবগণ নিত্য নির্ব্বিকার ব্রহ্মস্বরূপ; একমাত্র ব্রহ্মই সত্য পদার্থ, তিনিই জীবরূপে ভিন্নবৎ প্রতীয়মান হইতেছেন মাত্র; প্রকৃত পক্ষে জীবগণ ব্রহ্ম হইতে স্বতন্ত্র পদার্থ নয়। অতএব কর্মকাণ্ডীয় দ্বৈতবাদের সহিত অদ্বৈতবোধক উপনিষদের বিরোধ ঘটিতেছে।
৫৫৫
আরো এক কথা, যে সমস্ত লোক অবিদ্যাপ্রসূত যথাদৃষ্ট ক্রিয়া, কারক, ও’ ফলের উপর নির্ভর করিয়া ইষ্টপ্রাপ্তি ও অনিষ্ট-পরিহারের উপায় বা সাধন অবলম্বন করে, অথচ তদ্বিষয়ে বিশেষ কোন তত্ত্বই জানে না, তাহাদের জন্য ক্রিয়াফলাদি- বিধায়ক শ্রুতি কখনই লোকপ্রসিদ্ধ ক্রিয়া-কারকাদি বিভাগের সত্যতা বা অসত্যতা প্রতিপাদন করিতেছে না, কিংবা নিষেধও করিতেছে না; কেননা, ইষ্টপ্রাপ্তি ও’ অনিষ্ট-পরিহারের উপায়বিধানেই ঐ সকল শ্রুতির তাৎপর্য্য,(কিন্তু সত্যাসত্যতা নিরূপণ বিষয়ে নহে)। ৪০
কাম্য বিষয়গুলি মিথ্যাজ্ঞানপ্রসূত হইলেও তদ্বিধায়ক শ্রুতি যেমন কেবলই লোকপ্রসিদ্ধি অনুসারে সেই সকল কাম্য-বিষয় অবলম্বন করিয়া—তদুদ্দেশ্যেই উপযুক্ত সাধনের বিধান করিয়া থাকে, কিন্তু কাম্যবিষয়গুলি মিথ্যাজ্ঞানমূলক বলিয়া সেগুলির অনর্থকরত্ব প্রতিপাদন করে না, অথবা তদ্বিধানেও বিরত থাকে না; তেমনি নিত্য অগ্নিহোত্রাদি-বিষয়ক শাস্ত্রও প্রসিদ্ধি অনুসারেই মিথ্যাজ্ঞান- মূলক লোকপ্রসিদ্ধ ক্রিয়া কারকাদি বিভাগ অবলম্বনপূর্ব্বক ইষ্টপ্রাপ্তি বা অনিষ্ট- পরিহাররূপ কোন একটি প্রয়োজন লক্ষ্য করিয়া অগ্নিহোত্রাদি কর্মগুলির বিধান করিয়া থাকে, কিন্তু ‘এ সমস্তই অবিদ্যাধিকারস্থিত অসৎ’ ইহা মনে করিয়া কখনই তদ্বিধানে ক্ষান্ত থাকে না; কাম্য-কর্ম-বিধি ইহার দৃষ্টান্তস্থল। আর অবিদ্যাশালী লোকেরা যে, ইহাতে প্রবৃত্ত হইবে না, তাহাও নহে; কারণ, কামনাশীল পুরুষেরা যেমন কাম্যকর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়, তেমনি ইহাতেও তাহা- দিগকে প্রবৃত্ত দেখা যায়। যদি বল, কেবল বিদ্বান্ লোকদিগেরই কর্ম্মেতে অধিকার; না—সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, ব্রহ্মৈকত্ববিদ্যা যে, কর্মাধিকারবিরোধী, এ কথা পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে। ব্রহ্মৈকত্ব পক্ষে উপদেশের বিষয়(ক্রিয়াকারকাদি) না থাকায় উপদেশ গ্রহণ হইতে পারে না বলিয়া যে, উপদেশের নিষ্ফলত্ব দোষ উত্থাপিত হইয়াছিল, কথিত যুক্তিতে সে আপত্তিরও পরিহার সিদ্ধ হইল বুঝিতে হইবে। ৪১
এ পক্ষে কর্মানুষ্ঠাতা পুরুষদিগের ইচ্ছা ও অনুরাগাদিগত বৈচিত্র্যও অপর হেতু। লোকদিগের ইচ্ছা ও অনুরাগ অনেকপ্রকার এবং বিচিত্র; সুতরাং বাহ্য বিষয়ে যাহাদের হৃদয় নিতান্ত অনুরক্ত, শাস্ত্র কিছুতেই তাহাদিগকে সেই সকল বিষয় হইতে বিরত করিতে সমর্থ হয় না; আর যাহাদের চিত্ত স্বভাবতঃই বাহ্যবিষয় হইতে বিরক্ত, তাহাদিগকেও বাহ্যবিষয়ে নিয়োজিত করিতে সমর্থ হয় না; কিন্তু শাস্ত্র হইতে এইমাত্র সিদ্ধ হয় যে, প্রদীপাদি আলোক যেরূপ অন্ধকার-মধ্যস্থ বস্তু
বিষয়ে জ্ঞানমাত্র জন্মাইরা দেয়, সেইরূপ—‘ইহা ইষ্টসাধন, উহা অনিষ্টসাধন’— এইরূপে সাধ্যসাধন-বিষয়ক সম্বন্ধ প্রকাশ করিয়া দেয় মাত্র, কিন্তু লোকে ভৃত্য- প্রভৃতিকে যেমন বলপূর্ব্বক নিয়োগ করে, শাস্ত্র কখনই সেরূপ কাহাকেও কোন বিষয়ে প্রবৃত্তও করে না, বা নিবৃত্তও করে না; কেননা, দেখিতে পাওয়া যায়— বহুলোক অনুরাগের আধিক্যবশতঃ শাস্ত্রবিধিও অতিক্রম করিয়া চলে। সেই হেতু সাধারণ লোকের বুদ্ধি-বৈচিত্র্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াই কর্ম্মশাস্ত্র নানাপ্রকার ক্রিয়াবিধি উপদেশ করিয়া থাকে। ৪২
শাস্ত্র কেবল সাধ্যসাধনভাবমাত্র প্রতিপাদন করে, অর্থাৎ যাহা দ্বারা যাহা হইতে পারে, কেবল তাহাই বুঝাইয়া দেয়, পরে অজ্ঞ লোকেরা নিজ নিজ রুচি অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; সূর্য্য ও প্রদীপপ্রভৃতির ন্যায় শাস্ত্রও সে বিষয়ে উদাসীনই থাকে, অর্থাৎ কাহাকেও প্রবর্তিত বা নিবর্তিত করে না। ব্যক্তিবিশেষের নিকট পরমপুরুষার্থ মুক্তিও অপুরুষার্থ-পুরুষের অপ্রার্থনীয় বলিয়া প্রতিভাত হয়। যাহার যেরূপ প্রতীতি, সে তদনুরূপই পুরুষার্থ মনে করিয়া থাকে, এবং তদনুকূল সাধনসমূহই গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করে। এতদনুরূপ অর্থবাদও আছে-‘প্রজাপতির সন্তানত্রয় প্রজাপতির নিকট ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনপূর্ব্বক বাস করিয়াছিলেন’ ইত্যাদি। অতএব বলিতে হইবে যে, বেদান্তশাস্ত্র ব্রহ্মৈকত্ব প্রতিপাদন করিলেও, উহা বিধিশাস্ত্রের বাধক হয় না। বিশেষতঃ শুধু এই ব্রহ্মৈকত্ব প্রতিপাদন করাতেই বিধিশাস্ত্র একেবারে নির্বিষয় হইতে পারে না, এবং ক্রিয়াকারকাদি ভেদ প্রতিপাদন করে বলিয়া বিধিশাস্ত্রও ব্রহ্মৈকত্ব-বিষয়ে উপনিষদের প্রামাণ্য নিবারণ করে না; কেননা, শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ের ন্যায় প্রমাণসমূহও নিজ নিজ বিষয়েই প্রমাণ বা সার্থক,(বিষয়ান্তরে -নহে)। ৪৩
এ বিষয়ে কোন কোন পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তি মনে করেন যে, সমস্ত প্রমাণই প্রমাতার চিত্তবৃত্তি অনুসারে পরস্পর বিরুদ্ধ; সুতরাং ব্রহ্মৈকত্বপক্ষেও প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের মধ্যে বিরোধ উপস্থাপিত করে,-শব্দস্পর্শাদি বিভিন্ন বিষয়গুলি যে, শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়, ইহা প্রত্যক্ষ হইতেই বুঝা যায়; কিন্তু যাঁহারা ব্রহ্মৈকত্ব বা ব্রহ্মবাদ বলিয়া থাকেন, তাঁহাদের মতে সর্ব্বত্রই প্রত্যক্ষ-বিরোধ সম্ভা- বিত হয় এবং শরীরভেদে শব্দাদি বিষয়ের অনুভবিতা ও ধর্মাধর্মের অনুষ্ঠাতা সংসারী আত্মাও ভিন্ন ভিন্নই অনুমিত হয়; সুতরাং সেখানেও ব্রহ্মৈকত্ববাদীর পক্ষে অনুমানবিরোধ উপস্থিত হইতে পারে। এইপ্রকার তাঁহারা আগম-বিরোধেরও
৫৫৭.
উল্লেখ করিয়া থাকেন; যথা—‘গ্রামাভিলাষী যজ্ঞ করিবে’, ‘পশুকামী যজ্ঞ করিবে’, ‘স্বর্গকামী যজ্ঞ করিবে’, ইত্যাদি শাস্ত্রবাক্য হইতে জানিতে পারা যায় যে, গ্রাম, পশু ও স্বর্গ প্রভৃতি কাম্য বস্তু এবং তৎপ্রাপ্তির উপায়ভূত যজ্ঞাদিক্রিয়ার অনুষ্ঠাতৃগণও ভিন্ন ভিন্ন—এক নহে, অতএব ব্রহ্মৈকত্ববাদ অপ্রমাণ। ৪৪
উক্ত আপত্তির উত্তর প্রদত্ত হইতেছে—কুতর্ক-কলুষিতচিত্ত ব্রাহ্মণাদি বর্ণাপশদ (ব্রাহ্মণাদি বর্ণের কলঙ্কস্বরূপ) যে সমস্ত লোক এইরূপ আপত্তি করিয়া থাকে, তাহারা নিশ্চয়ই দয়ার পাত্র; কারণ, তাহারা বেদার্থনিরূপণে সম্প্রদায়পরম্পরা-- গত বিশুদ্ধবুদ্ধিলাভে বঞ্চিত আছে।[তাহারা দয়ার পাত্র] কেন? [বলিতেছি—] শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধিগোচর শব্দাদি বিষয়ের স্থলে প্রমাণের সহিত ব্রহ্মের একত্ববাদ বিরুদ্ধ হইতেছে—যাঁহারা বলেন, তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারে যে, শব্দাদি বিষয়গুলি ভিন্ন ভিন্ন বলিয়া আকাশের একত্ব বিরুদ্ধ হয় কি? যদি বিরুদ্ধ না হয়, তবে আলোচ্য বিষয়েও প্রত্যক্ষ-বিরোধ হয় না স্বীকার করিতে হইবে;[কারণ, উভয় পক্ষেই যুক্তি সমান]। ৪৫
আরও যে বলা হইয়াছে—ভিন্ন ভিন্ন শরীরে শব্দাদি বিষয়ের উপলব্ধিকর্তা ও ধর্মাধর্মের অনুষ্ঠাতা আত্মা পৃথক্ পৃথক্ বলিয়া অনুমিত হইয়া থাকে; সুতরাং ব্রহ্মের একত্বপক্ষে সেই অনুমানের বিরোধ উপস্থিত হয়। এখন তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, কর্তার প্রভেদ অনুমান করে কাহারা? যদি বলেন—অনু- মান কুশল আমরা সকলে[ অনুমান করিয়া থাকি]। জিজ্ঞাসা করি, অনুমানবিদ্যা- বিশারদ তোমরা কাহারা? এ কথার উত্তর কি? যদি বল, শরীর, ইন্দ্রিয়, মন ও আত্মা, ইহাদের প্রত্যেকগত কর্তৃত্ব যখন যুক্তি দ্বারা খণ্ডিত হইয়াছে, তখন শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন প্রভৃতি যাহার সাধন বা ভোগোপকরণ, তাহাই আত্ম-পদবাচ্য, এবং সেই আত্মাই হইতেছি—অনুমানকুশল আমরা; কারণ, ক্রিয়ামাত্রই বহুকারকসাধ্য অর্থাৎ অনেক কারকের সাহায্য ব্যতীত কোন ক্রিয়াই নিষ্পন্ন হয় না, অতএব শরীরেন্দ্রিয়াদি সহকৃত আত্মাই ‘আমরা’ কথার অর্থ। ৪৭
ভাল, তোমাদের অনুমানকৌশল এই প্রকার হইলে ত তোমাদের(আত্মার) বহুত্ব স্বীকার করিতে হয়! কারণ, ক্রিয়া যে, অনেক-কারকসাধ্য, ইহা ত তোমাদিগেরই অঙ্গীকৃত কথা; অনুমানও ক্রিয়া; সেই ক্রিয়াও যে, শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন প্রভৃতি সাধনের সাহায্যে আত্মাকর্তৃক সম্পাদিত হইয়া থাকে, ইহা পূর্ব্বেই স্বীকৃত হইয়াছে; অতএব ‘আমরা অনুমানকুশল’ বলিলে, শরীর,,
ইন্দ্রিয় ও মনোরূপ সাধনবিশিষ্ট আত্ম-পদবাচ্য প্রত্যেক আত্মার বহুত্ব স্বীকৃত হইয়া পড়ে; অহো! তার্কিক-বলীবর্দ্দকর্তৃক কি চমৎকার অনুমানকৌশল উদ্ভাবিত হইয়াছে! যে অজ্ঞ আপনাকেই জানে না, সে আবার কি প্রকারে সেই আত্মগত ভেদাভেদ চিন্তা করিতে সমর্থ হইবে?। ৪৮
তাহার পর কথা হইতেছে যে, কোন্ হেতু দ্বারা কিসের অনুমান করিবে?— আত্মার ত স্বতঃসিদ্ধ ভেদপ্রতিপাদক এমন কোনও লিঙ্গ বা জ্ঞাপক চিহ্ন নাই, যাহা দ্বারা আত্মভেদ অনুমান করিতে পারা যায়; আর আত্মভেদ-প্রতিপাদনার্থ নামরূপাত্মক যে সমস্ত হেতুর উপন্যাস করা হইয়া থাকে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলি আকাশের উপাধি ঘটপটাদির ন্যায় কেবলই নামরূপগত; সেগুলি ত আত্মার উপাধি ভিন্ন আর কিছুই নহে। সে, যেদিন আকাশেরও ভেদসাধক হেতু প্রদর্শন করিতে পারিবে, সেইদিন আত্মারও ভেদগ্রাহক হেতু প্রদর্শন করিতে সমর্থ হইবে। অভিপ্রায় এই যে, ঘটপটাদি উপাধি দ্বারা যেমন অখণ্ড আকাশের ভেদ বা বিভাগ সিদ্ধ হয় না, তেমনি নামরূপাত্মক দেহেন্দ্রিয়াদি-উপাধি দ্বারা অখণ্ড আত্মারও ভেদ প্রমাণিত হয় না; কেন না, আত্মার ঔপাধিক ভেদবাদী শত শত তার্কিক একত্রিত হইলেও আত্মার ভেদগ্রাহক কোনপ্রকার লিঙ্গ বা হেতু প্রদর্শন করিতে সমর্থ হইবে না; সুতরাং আত্মার যে, স্বতঃসিদ্ধ ভেদসাধক কোনও লিঙ্গানুসন্ধান, তাহা ত নিশ্চয়ই সুদূরপরাহত; কারণ, আত্মা হইতেছে স্বরূপতঃ বিষয় অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের অগম্য। ৪৯
প্রতিপক্ষদল যাহা কিছু আত্ম-ধৰ্ম্ম বলিয়া কল্পনা করিয়া থাকেন, তৎসমস্তই নামরূপাত্মক বলিয়া স্বীকৃত হওয়ায় এবং ‘আকাশই(আকাশ-শব্দবাচ্য ব্রহ্মই) নাম ও রূপের(নামরূপাত্মক জগতের) নির্বাহক; সেই নাম ও রূপ যাঁহার মধ্যে অবস্থিত, তিনি ব্রহ্ম’ এই শ্রুতি অনুসারে নাম-রূপ হইতে আত্মার পার্থক্য স্বীকৃত হওয়ায়, অধিকন্তু ‘আমি নাম ও রূপ প্রকটিত করিব’ এই শ্রুতিতে নাম ও রূপের উৎপত্তি-বিনাশ এবং আত্মার তদ্বৈলক্ষণ্য প্রতিপাদিত হওয়ায় আত্মার সম্বন্ধে অনুমানেরই সম্ভাবনা নিরস্ত হইয়াছে; সুতরাং তদ্বিষয়ে অনুমান- বিরোধের সম্ভাবনাই বা কোথায়? ইহা দ্বারা অর্থাৎ আত্মার অবিষয়ত্ব প্রতিপাদন করায় তৎসম্বন্ধে আশঙ্কিত আগমবিরোধও পরিহৃত হইল। ৫০
আরও যে, আপত্তি করা হইয়াছে—ব্রহ্মৈকত্ব স্বীকার করিলে, যাহার উদ্দেশ্যে উপদেশ এবং সেই উপদেশের যাহা ফল, সেই দুইই না থাকায় ব্রহ্মৈ- কত্বোপদেশ অনর্থক হইবে। না—সে আপত্তিও হইতে পারে না; কারণ, ক্রিয়া-
মাত্রই যখন বহু কারকসাধ্য, তখন কেইবা উক্তপ্রকার অনুযোগের ভাগী হইবে? সর্ব্বোপাধিবিবর্জিত ব্রহ্মৈকত্বপক্ষে বস্তুতঃ উপদেষ্টা, উপদেশ ও উপদেশের ফল, কিছুই নাই; সেই হেতু উপনিষৎ-সমুহেরও যে আনর্থক্য, তাহা ত স্বীকৃতই বটে। যদি বল, অনেককারকসাধ্য উপদেশেরই আনর্থক্য উত্থাপিত হইতেছে, (উপদেশমাত্রের আনর্থক্য নহে); তাহাও আপত্তিযোগ্য হয় না; কারণ, দেহা- দির অতিরিক্ত আত্মাস্তিত্ব সর্ববাদিসম্মত। সকলেই যখন আত্মজ্ঞানার্থ উপদেশের আবশ্যকতা অঙ্গীকার করিয়া থাকে,[সুতরাং তোমাদেরও তাহা অঙ্গীকৃতই আছে]; অতএব উক্ত আপত্তিটি অঙ্গীকৃত-বিরুদ্ধ অর্থাৎ তোমরাও যাহা অঙ্গীকার করিয়া থাক, ঐ কথা তাহার বিরুদ্ধ হইতেছে। ৫১
অতএব ‘আমি ভিন্ন আর কে সেই মদামদ(মত্তও বটে অমত্তও বটে, এমন) দেবকে(ব্রহ্মকে) জানিতে সমর্থ হয়’, ‘দেবগণও এই আত্মতত্ত্ববিষয়ে সন্দেহ করিয়া থাকেন’, ‘শুধু তর্ক দ্বারা এই আত্মবিজ্ঞান লাভ করা যায় না’ ইত্যাদি- দেবলব্ধ বর ও অনুগ্রহের বলে আত্মবোধ-প্রতিপাদক শ্রুতি ও স্মৃতি শাস্ত্র হইতে, এবং ‘তিনি স্পন্দন করেন, আবার তিনি স্পন্দন করেনও না, তিনি দূরে আছেন, এবং তিনি নিকটে আছেন’ ইত্যাদি বিরুদ্ধধর্মসম্বন্ধবোধক মন্ত্রবাক্য হইতেও জানা যায় যে, সর্বভয়নিবারক সেই দুর্গটি(ব্রহ্মাদ্বৈতবাদ) বাক্পটুপ্রবর তার্কিক- গণের প্রবেশের অযোগ্য; মন্দমতি জনের অলভ্য এবং যাহারা শাস্ত্র ও গুরু- প্রসাদলাভে বঞ্চিত, তাহাদেরও অগম্য। ভগবদগীতাতেও আছে-‘সমস্ত ভূত আমাতে অবস্থিত[অথচ আমি কিছুতেই নাই’] ইত্যাদি। অতএব বুঝিতে হইবে যে, পরব্রহ্মাতিরিক্ত সংসারী জীব বলিয়া স্বতন্ত্র কোন পদার্থই নাই; অতএব ইহা খুব সঙ্গত কথাই বলা হইতেছে যে, ‘অগ্রে এই জগৎ একমাত্র ব্রহ্ম- রূপ ছিল, সেই ব্রহ্ম আবার আপনাকে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বলিয়া অবগত হইয়া- ছিলেন। ‘এতদতিরিক্ত অন্য দ্রষ্টা নাই, অন্য শ্রোতা নাই’ ইত্যাদি শত শত শ্রুতি হইতেও এ কথা সমর্থিত হইতেছে। অতএব ‘সত্যস্য সত্যম্’ এইটি পর- ব্রহ্মেরই পরা উপনিষৎ অর্থাৎ পরম রহস্য নাম ॥ ১০০ ॥ ২০ ॥
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথম ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ২ ॥ ১ ॥
—:0:—
আভাসভাষ্যম্।—“ব্রহ্ম জ্ঞপয়িষ্যামি” ইতি প্রস্তুতম্; তত্র যতো জগজ্জাতম্, যন্ময়ম্, যস্মিংশ্চ লীয়তে, তদেকং ব্রহ্ম—ইতি জ্ঞাপিতম্। কিমাত্মকং পুনস্তজ্জগৎ জায়তে লীয়তে চ পঞ্চভূতাত্মকম্? ভূতানি চ নামরূপাত্মকানি; নামরূপে সত্যমিত্যপি হ্যুক্তম্; তস্য সত্যস্য পঞ্চভূতাত্মকস্য সত্যং ব্রহ্ম। কথং পুনর্ভূতানি সত্যম্—ইতি মূর্তামূর্ত্তব্রাহ্মণম্।
মূর্তামূর্তভূতাত্মকত্বাৎ কার্যকরণাত্মকানি ভূতানি প্রাণা অপি সত্যম্। তেষাং কার্য্যকরণাত্মকানাং ভূতানাং সত্যত্বনিদ্দিধারয়িষয়া ব্রাহ্মণদ্বয়মারভ্যতে, সৈব উপনিষদ্ব্যাখ্যা। কার্য্য-করণসত্যত্বাবধারণদ্বারেণ হি সত্যস্য সত্যং ব্রহ্ম অবধার্য্যতে। অত্রোক্তং “প্রাণা বৈ সত্যং, তেষামেষ সত্যম্” ইতি। তত্র কে প্রাণাঃ, কিয়ত্যো বা প্রাণবিষয়া উপনিষদঃ কা ইতি চ—ব্রহ্মোপনিষৎপ্রসঙ্গেন করণানাং প্রাণানাং স্বরূপমবধায়তি—পথিগতকূপারামাদ্যবধারণবৎ।
টীকা। -বৃত্তবর্তিষ্যমাণয়োঃ সঙ্গতিং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি-ব্রহ্মেতি। ব্রহ্ম তে ব্রবাণীতি প্রক্রম্য ‘ব্যেব ত্বা জ্ঞপয়িষ্যামি’ ইতি প্রতিজ্ঞায় জগতো জন্মাদয়ো যতঃ, তদদ্বিতীয়ং ব্রহ্মেতি ব্যাখ্যাতমিত্যর্থঃ। জন্মাদিবিষয়স্য জগতঃ স্বরূপং পৃচ্ছতি-কিমাত্মকমিতি। বিপ্রতিপত্তিনিরা- সার্থং তৎস্বরূপমাহ-পঞ্চেতি। কথং তর্হি নামরূপকর্মাত্মকং জগদিত্যুক্তং, তত্রাহ-ভূতানীতি। তত্র গমকমাহ-নামরূপে ইতি। ভূতানাং সত্যত্বে কথং ব্রহ্মণঃ সত্যত্ববাচোযুক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ- তস্থেতি। ভৎসত্যমিত্যবধারণাদ্বাধ্যেযু ভূতেষু সত্যত্বাসিদ্ধিরিতি শঙ্কয়িত্বা সমাধত্তে-কথমিত্যা- দিনা। সচ্চ ত্যচ্চ সত্যমিতি ব্যুৎপত্যা ভূতানি সত্যশব্দবাচ্যানি বিবক্ষ্যন্তে চেৎ, কথং তর্হি কার্য্যকরণসঙ্ঘাতন্য প্রাণানাং চ সত্যত্বমুক্তং, তত্রাহ-মূর্তেতি। যথোক্তভূতরূপত্বাৎ কার্য্য- করণানাং তদ্যত্মকানি ভূতানি সত্যানীত্যঙ্গীকারাৎ কার্যকরণানাং সত্যত্বং, প্রাণা অপি তদাত্মকাঃ সত্যশব্দবাচ্যা ভবন্তীতি প্রাণা বৈ সত্যমিত্যবিরুদ্ধমিত্যর্থঃ। এবং পাতনিকাং কৃত্বোত্তরব্রাহ্মণদ্বয়স্য বিষয়মাহ-তেষামিতি। উপনিষদ্ব্যাখ্যানায় ব্রাহ্মণদ্বয় মিত্যুক্তিবিরুদ্ধ- মেতদিত্যাশঙ্ক্যাহ-সৈবেতি। কার্যকরণাত্মকানাং ভূতানাং স্বরূপনির্ধারণেনৈবোপনিষদ্- ব্যাপ্যেত্যত্র হেতুমাহ-কার্য্যেতি। ব্রাহ্মণদ্বয়মবমবতার্য্য শিশুব্রাহ্মণস্যাবান্তরসঙ্গতিমাহ- অত্রেত্যাদিনা। উপনিষদঃ কাঃ কিয়ত্যো বেত্যুপসংখ্যাতব্যমিত্যাকাঙ্ক্ষায়ামিতি শেষঃ। ব্রহ্ম চেদবধারয়িতুমিষ্টং, তর্হি তদেবাবধার্যতাং, কিমিতি মধ্যে করণস্বরূপমবধার্য্যতে, তত্রাহ- পথীতি।
৫৬১
আভাসভাষ্যের অনুবাদ।—অতীত ব্রাহ্মণে প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে যে, আমি তোমাকে ‘ব্রহ্মতত্ত্ব জ্ঞাপন করিব’, তন্মধ্যে, জগৎ যাহা হইতে জন্মিয়াছে, যাহাতে বর্তমান আছে এবং স্বরূপতও যদাত্মক, এবং পরিশেষেও যাহাতে বিলীন হইবে, তাহাই ব্রহ্ম—ইহাও বিজ্ঞাপিত হইয়াছে। এখন জিজ্ঞাসা হইতেছে যে, সেই জগৎ কিরূপ উপাদানে গঠিত হইয়া জন্ম লাভ করে এবং বিলীন হয়? অর্থাৎ সেই জায়মান ও লীয়মান জগতের স্বরূপটা কি প্রকার? [উত্তর—] পঞ্চভূতাত্মক, অর্থাৎ সেই জগৎ পঞ্চভূতে রচিত। সেই পঞ্চভূতই নামরূপাত্মক। পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে যে, নাম ও রূপ ‘সত্য’ নামে কথিত। পঞ্চভূতাত্মক সেই সত্যেরও. সত্য হইতেছেন—পরব্রহ্ম। পঞ্চভূতই বা কেন ‘সত্য’ নামে অভিহিত হয়, তন্নেরূপণার্থ এই ‘মূর্তামূর্ত’ নামক দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ আরব্ধ হইতেছে।
উক্ত পঞ্চভূতই মূর্ত ও অমূর্ত অর্থাৎ স্থূল ও সূক্ষ্ম, এবং কার্য্যাকারে(দেহরূপে) ও করণরূপে(ইন্দ্রিয়ভাবে) পরিণত হইয়া প্রাণনামে অভিহিত হয়, সেই প্রাণসমূহও ‘সত্য’। অতঃপর কার্যকরণাত্মক সেই ভূতসমূহের সত্যতা অবধারণের জন্য পরবর্তী ব্রাহ্মণদ্বয় আরব্ধ হইতেছে; ইহাই ‘সত্য’-উপনিষদের ব্যাখ্যাস্বরূপ; কেননা, কার্যকরণের সত্যতানিরূপণেই ‘সত্যস্য সত্যম্’—ব্রহ্মও অবধারিত হয়। এখানেই কথিত হইয়াছে যে, প্রাণসমূহই সত্য, এই আত্মা আবার সে সমুদায়েরও সত্য। পথিক যেমন পথ চলিতে চলিতে সমীপবর্তী কূপ ও উদ্যানাদি দর্শন করিয়া থাকে, তেমনি এখানেও ব্রহ্মোপনিষৎ নিরূপণ-প্রসঙ্গে সেই প্রাণটি কে, প্রাণের উপনিষদই বা কতগুলি এবং উহার স্বরূপই বা কিরূপ—এইরূপে দেহোপকরণীভূত প্রাণসমূহের স্বরূপ অবধারণ করিতেছেন।
যো হ বৈ শিশু ণ্ সাধানং সপ্রত্যাধানং সঙ্কুণং সদামং বেদ, সপ্ত হ দ্বিষতো ভ্রাতৃব্যানবরুণদ্ধি। অয়ং বাব শিশুর্যোহয়ং মধ্যমঃ প্রাণস্তস্যেদমেবাধানমিদং প্রত্যাধানং প্রাণঃ স্থূণান্নং দাম ॥ ১০১ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—যঃ হ বৈ শিশুং(ইতরকরণবৎ বিষয়েষু অব্যাপৃতত্বাৎ শিশু- মিব লিঙ্গাত্মকং প্রাণম্), সাধারণং(আধীয়তে অস্মিন্—ইতি আধানং অধিষ্ঠানভূতং স্থূলশরীরং, তেন সহিতং), সপ্রত্যাধানং(প্রত্যাধানং শিরঃ, তেন সহিতম্), সস্তুণং (সূণা বন্ধনকীলং, তেন সহিতম্), সদামং(দাম্না বন্ধন-রজ্জা অন্নেণ সহিতং) বেদ
(বিজানাতি),[সঃ বিজ্ঞাতা] সপ্ত(সপ্তসংখ্যকান) দ্বিষতঃ(দ্বেষকারিণঃ) ভ্রাতৃব্যান্(শত্রুস্থানীয়ানি শীর্ষণ্যানি-চক্ষুঃ-শ্রোত্রঘ্রাণমুখাখ্যানি করণানি) অবরুণদ্ধি (পরাভবতি বশীকরোতীত্যর্থঃ)।[শ্রুতিঃ স্বয়মেব শিশুপ্রভৃতীন্ ব্যাচষ্টে-] অয়ং বাব(প্রসিদ্ধৌ) শিশুঃ(বৎসঃ);[কঃ?] যঃ অয়ং(অনুভূয়মানঃ) মধ্যমঃ (শরীরমধ্যস্থঃ) প্রাণঃ,[ইতর-করণবৎ ভোগাসক্তিবিরহাৎ তস্য শিশুভাবঃ বিবক্ষিতঃ]; তস্য(মধ্যমপ্রাণস্য) ইদমেব(দৃশ্যমানং শরীরমেব) আধানং (অধিষ্ঠানং), ইদং(শিরঃ) প্রত্যাধানং(প্রদেশবিশেষে রক্ষণীয়ত্বাৎ); প্রাণঃ (শরীরধারকঃ পঞ্চবৃত্তিঃ বায়ুঃ) স্থূণা(কীলং), অন্নং(ভুক্তং দ্রব্যং) দাম(বন্ধন- রজ্জুঃ, অন্নাভাবে শরীর-স্থিত্যসম্ভবাৎ অন্নস্য দামত্বমিতি ভাবঃ)।[যঃ খলু ইথং বৎসমিব লিঙ্গাত্মকং প্রাণং বেদ, তস্য যথোক্তং ফলং নিষ্পদ্যতে ইত্যাশয়:] ॥১০১৷৷১৷৷
মূলানুবাদ।-যিনি শিশুকে আধানের-আশ্রয়ের সহিত, প্রত্যাধানের সহিত, স্থূণার সহিত এবং দামের-রজ্জুর সহিত জানেন, তাঁহার অপকারী সপ্তপ্রকার ভ্রাতৃব্য অর্থাৎ শত্রুস্থানীয় চক্ষুঃ কর্ণ শ্রোত্র প্রভৃতি মস্তকস্থ ইন্দ্রিয়গণ পরাভূত(বশীভূত) হয়।[শ্রুতি নিজেই শিশুপ্রভৃতি শব্দের অর্থ প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন-] ইহাই শিশুপদবাচ্য, যাহা এই মধ্যম অর্থাৎ দেহমধ্যবর্তী প্রাণ; সেই সূক্ষ্মাত্মক প্রাণই এখানে শিশুপদবাচ্য বৎস। ইহাই অর্থাৎ দৃশ্যমান এই শরীরই তাহার আধান-আশ্রয়স্থান; ইহা-মস্তক তাহার প্রত্যাধান, [প্রত্যাধান অর্থ-নানাদিকে রক্ষিত শয্যোপকরণ।] প্রাণ অর্থাৎ প্রাণাপানাদি পঞ্চবিধ ব্যাপারবিশিষ্ট প্রাণবায়ু তাহার স্থূণা(খুঁটি), ‘অন্ন অর্থাৎ ভুক্ত দ্রব্য তাহার দাম-বন্ধনরজ্জু।[করণসমষ্টিরূপ দেহকে যে লোক উক্তপ্রকার বৎসস্বরূপ চিন্তা করে, তাহার চক্ষুঃ- প্রভৃতি ইন্দ্রিয়নিচয় বশীভূত হয়] ॥ ১০১॥১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যো হ বৈ শিশুং সাধারণং সপ্রত্যাধানং সঙ্গুণং সদামৎ বেদ, তস্যেদং ফলম্। কিন্তুং? সপ্ত—সপ্তসঙ্খ্যকান্ হ দ্বিষতো দ্বেষ-কর্ত্তৃন্ ভ্রাতৃব্যান্ —ভ্রাতৃব্যা হি দ্বিবিধা ভবন্তি—দ্বিষন্তঃ অদ্বিষন্তশ্চ; তত্র দ্বিষস্তো যে ভ্রাতৃব্যাঃ, তান্ দ্বিষতো ভ্রাতৃব্যান্ অবরুণদ্ধি; সপ্ত যে শীর্ষণ্যাঃ প্রাণাঃ বিষয়োপলব্ধিদ্বারাণি, তৎপ্রভবা বিষয়রাগাঃ সহজত্বাদ ভ্রাতৃব্যাঃ; তে হি অন্য স্বাত্মস্থাং দৃষ্টিং বিষয়- বিষয়াং কুর্ব্বন্তি; তেন তে দ্বেষ্টারো ভ্রাতৃব্যাঃ, প্রত্যগাত্মেক্ষণপ্রতিষেধকরত্বাৎ
৫৬৩
কাঠকে চোক্তম্—“পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভূস্তস্মাৎ পরাঙ্ পশ্যতি নান্তরাত্মন্” ইত্যাদি। তত্র যঃ শিশ্বাদীন বেদ—তেষাং যাথাত্ম্যমবধারয়তি, স এতান্ ভ্রাতৃবান্ অবরুণদ্ধি অপাবৃণোতি বিনাশয়তি। ১॥
তস্মৈ ফলশ্রবণেনাভিমুখীভূতায়াহ অয়ং বাব শিশুঃ। কোহসৌ? যোহয়ং মধ্যমঃ প্রাণঃ-শরীরমধ্যে যঃ প্রাণো লিঙ্গাত্মা, যঃ পঞ্চধা শরীরমাবিষ্টঃ-বৃহন্ পাণ্ডরবাসঃ সোম রাজন্-ইত্যুক্তঃ, যস্মিন্ বাষ্মনঃপ্রভৃতীনি করণানি বিষক্তানি- পড়ীশশঙ্কুনিদর্শনাৎ; স এষ শিশুরিব, বিষয়েঘিতরকরণবদপটুত্বাৎ। শিশুঃ সাধান- মিত্যুক্তম্, কিং পুনস্তস্য শিশোর্ব্বৎসস্থানীয়স্য করণাত্মনঃ আধানম্? তস্য ইদমেব শরীরম্ আধানং কার্য্যাত্মকম্, আধীয়তেহস্মিন্নিত্যাধানম্; তস্য হি শিশোঃ প্রাণস্য ইদং শরীরমধিষ্ঠানম্; অস্মিন্ হি করণান্যধিষ্ঠিতানি লব্ধাত্মকাম্যুপলব্ধিদ্বারাণি ভবন্তি, ন তু প্রাণমাত্রে বিষক্তানি; তথা হি দর্শিতমজাতশত্রুণা-উপসং হৃতেযু করণেযু বিজ্ঞানময়ো নোপলভ্যতে; শরীর-দেশব্যূঢ়েষু তু করণেষু বিজ্ঞানময় উপলভ্যমান উপলভ্যতে; তচ্চ দর্শিতং পাণিপেষণপ্রতিবোধনেন। ২॥
ইদং প্রত্যাধানং শিরঃ, প্রদেশবিশেষেষু প্রতি-প্রতি আধীয়ত ইতি প্রত্যাধা- নম্, প্রাণঃ স্থূণা অন্নপানজনিতা শক্তিঃ-প্রাণো বলমিতি পর্যায়ঃ; বলাবষ্টন্তো হি প্রাণোহস্মিন্ শরীরে “স যত্রায়মাত্মাবল্যৎ নেত্য সম্মোহমিব” ইতি দর্শনাৎ,-যথা বৎসঃ স্থূণাবষ্টন্তঃ, এবম্। শরীরপক্ষপাতী বায়ুঃ প্রাণঃ স্থূণেতি কেচিৎ। ৩॥
অন্নং দাম-অন্নং হি ভুক্তং ত্রেধা পরিণমতে; যঃ স্থূলঃ পরিণামঃ, স এতদ্দয়ং ভূত্বা ইমামপ্যেতি-মুত্রঞ্চ পুরীষঞ্চ; যো মধ্যমো রসঃ সারঃ, স রসঃ লোহিতাদি- ক্রমেণ স্বকার্য্যং শরীরং সপ্তধাতুকম্ উপচিনোতি, স্বযোন্যন্নাগমে হি শরীরমুপ- চীরতে, অন্নময়ত্বাৎ; বিপর্যয়েহপক্ষীয়তে পততি; যস্তু অণিষ্ঠো রসঃ-অমৃতম্ উর্ক প্রভাব ইতি চ কথ্যতে; স নাভেরূর্দ্ধং হৃদয়দেশমাগত্য, হৃদয়াদ্বিপ্রসূতেষু দ্বাসপ্ততিনাড়ীসহস্রেযু অনুপ্রবিশ্য, যত্তৎকরণসঙ্ঘাতরূপং লিঙ্গৎ শিশু-সংজ্ঞকং, তস্য শরীরে স্থিতিকারণং ভবতি বলমুপজনয়ৎ স্থূণাখ্যম্; তেনান্নমুভয়তঃপাশবৎ সদামবৎ প্রাণশরীরয়োনিবন্ধনং ভবতি ॥১০১৷৷১৷৷
টীকা। -ব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমুক্ত। তদক্ষরাণি যোজয়তি-যো হেত্যাদিনা। বিশেষণস্যার্থবত্ত্বার্থং ভ্রাতৃব্যান্ ভিনত্তি-ভ্রাতৃব্যা হীতি। কে পুনরত্র ভ্রাতৃব্যা বিবক্ষ্যন্তে, তত্রাহ-সপ্তেতি। কথং শ্রোত্রাদীনাং সপ্তত্বং, দ্বারভেদাদিত্যাহ-বিষয়েতি। কথং তেষাং ভ্রাতৃব্যত্বমিত্যাশঙ্ক্য বিষয়া- ভিলাষদ্বারেণেত্যাহ-তৎপ্রভবা ইতি। তথাপি কথং তেষাং দ্বেষ্টত্বমত আহ-তে হীতি। অথেন্দ্রিয়াণি বিষয়বিষয়াং দৃষ্টিং কুর্ব্বন্ত্যেবাত্মবিদ্বয়ামপি তাং করিষ্যতি, তন্ন যথোক্তভ্রাতৃব্যত্বং তেষামিতি, তত্রাহ-প্রত্যগিতি। ইন্দ্রিয়াণি বিষয়প্রবণানি তত্রৈব দৃষ্টিহেতবো ন প্রত্যগাত্মনী-
ত্যত্র প্রমাণমাহ-কাঠকে চেতি। ফলোক্তিমুপসংহরতি-তত্রেতি। উক্তবিশেষণেষু ভ্রাতৃব্যেযু সিদ্ধেষিতি যাবৎ। ১
প্রাণে বাগাদীনাং বিষক্তত্বে হেতুমাহ-পড়ীশেতি। যথা জাত্যো হয়শ্চতুরোহপি পাদ- বন্ধনকীলান্ পর্যায়েণোৎপাট্যোৎক্রামতি, তথা প্রাণাঃ-বাগাদীনীতি নিদর্শনবশাৎ প্রাণে বিষক্তানি বাগাদীনি সিদ্ধানীত্যর্থঃ। শরীরস্য প্রাণং প্রত্যাধানত্বং সাধয়তি-তস্য হীতি। শরীরস্যাধিষ্ঠানত্বং স্ফুটয়তি-অস্মিন্ হীতি। প্রাণমাত্রে বিষক্তানি করণানি নোপলব্ধিদ্বারাণীত্যত্র প্রমাণমাহ-তথা হীতি। দেহাধিষ্ঠানে প্রাণে বিষক্তানি তান্যুপলব্ধিদ্বারাণীত্যত্রানুভবমনু- কুলয়তি-শরীরেতি। তত্রৈবাজাতশক্রব্রাহ্মণসংবাদং দর্শয়তি-তচ্চেতি। শরীরাশ্রিতে প্রাণে বাগাদিষু বিষক্তেষুপলব্ধ রুপলভ্যমানত্বমিতি যাবৎ। ২
প্রত্যাধানত্বং শিরসো ব্যুৎপাদয়তি-প্রদেশেতি। বলপর্যায়স্য প্রাণস্য স্থূণাত্বং সমর্থয়তে- বলেতি। অয়ং মুমুর্ষুরাত্মা যস্মিন্ কালে দেহমবলভাবং নীত্বা সম্মোহমিব প্রতিপদ্যতে, তদোৎ- ক্রামতীতি ষষ্ঠে দর্শনাদিতি যাবৎ। বলাবষ্টন্তোহস্মিন্ দেহে প্রাণ ইত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ-যথেতি। ভর্তৃপ্রপঞ্চপক্ষং দর্শয়তি-শরীরেতি। উক্তং হি প্রাণ ইত্যুচ্ছাসনিশ্বাসকর্মা বায়ুঃ শারীর: শরীর- পক্ষপাতী গৃহ্যতে। এতস্যাং স্থূণায়াং শিশুঃ প্রাণঃ করণদেবতা লিঙ্গপক্ষপাতী গৃহ্যতে। স দেবঃ প্রাণ এতস্মিন্ বাহ্যে প্রাণে বদ্ধ ইতি। তদ্ব্যাখ্যাতুং ভূমিকাং করোতি-অন্নং হীতি। ত্বগস্থমাংস- মেদোমজ্জাস্থিশুক্রেভ্যঃ সপ্তভ্যো ধাতুভ্যো জাতং সাতধাতুকম্। তথাপি কথমন্নস্য দামত্বং, তদাহ-তেনেতি। ১০১।১।
ভাষ্যানুবাদ।—যে লোক শিশুকে(বৎসস্থানীয় সূক্ষ্ম প্রাণকে) আধানের সহিত, প্রত্যাখ্যানের সহিত, স্থূণার সহিত এবং দামের সহিত জানেন, তাঁহার এইরূপ ফল হয়। সেই ফল কিরূপ?[বলা হইতেছে]—তিনি সপ্ত- সংখ্যক(সাতটি) দ্বেষকারী ভ্রাতৃব্যকে(শত্রুকে) অবরুদ্ধ করেন—পরাজিত করেন। ভ্রাতৃব্য(শত্রু) সাধারণতঃ দুই প্রকার—দ্বেষকারী এবং দ্বেষহীন; তন্মধ্যে দ্বেষকারী যে সমস্ত ভ্রাতৃব্য, তিনি তাহাদিগকেই পরাভূত করিয়া থাকেন। শীর্ষণ্য অর্থাৎ মস্তকস্থ যে সাতটি প্রাণ শব্দাদি বিষয়ানুভূতির দ্বার, এবং তজ্জনিত যে, বিবিধ বিষয়ে অনুরাগ; সহজ বা সঙ্গে সঙ্গে জাত বলিয়া তাহারাই এখানে ভ্রাতৃব্য শব্দে অভিহিত হইয়াছে। কারণ, তাহারাই উপাসকের আত্মবিষয়ক জ্ঞানদৃষ্টিকে ‘বিষয়াভিমুখে নিয়োজিত করিয়া থাকে; সেই হেতু প্রত্যগাত্মদর্শনের প্রতিবন্ধ ঘটায় বলিয়াই তাহারা দ্বেষকারী(অনিষ্টকারী) ভ্রাতৃব্যমধ্যে গণ্য (১)। কঠোপনিষদেও সে কথা উক্ত আছে। যথা—‘স্বয়ম্ভু(পরমেশ্বর)
(১) তাৎপর্য্য—শত্রু সাধারণতঃ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত; এক সহজ, অপর কৃত্রিম। তন্মধ্যে যাহারা জন্মাধীন শত্রুমধ্যে গণা, তাহারা সহজ শত্রু, যেমন—দায়াদগণ, আর যাহারা অনিষ্ট- সাধন করিয়া কার্য্যতঃ শত্রু হয়, তাহারা কৃত্রিম শত্রু। সহজ শত্রুগণও অনিষ্টকারী না হইতে
৫৬৫
ইন্দ্রিয়গণকে পরাম্মুখ অর্থাৎ বহির্মুখ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই হেতু জীব বাহ্য বস্তুই দর্শন করে, কিন্তু অন্তরাত্মাকে দর্শন করে না’ ইত্যাদি। যে ব্যক্তি উক্ত শিশুপ্রভৃতিকে জানেন—উহাদের প্রকৃত স্বভাব অবধারণ করিতে পারেন, তিনি নিজের ভ্রাতৃব্যগণকে(শত্রুগণকে) অবরুদ্ধ করেন—অপাবৃত করেন অর্থাৎ বিনষ্ট করেন। ১
যথোক্ত ফল শ্রবণে অভিমুখীভূত শিষ্যকে[শিশু প্রভৃতি কথার অর্থ] বলিতেছেন-ইহাই শিশু বলিয়া প্রসিদ্ধ; ইহা কি? যাহা এই মধ্যম প্রাণ;- শরীরমধ্যে যাহা লিঙ্গাত্মক প্রাণ, যাহা[প্রাণাপানাদি] পাঁচ ভাগে বিভক্ত হইয়া শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট এবং ‘বৃহন্ পাণ্ডরবাসঃ সোম রাজন্’ বলিয়া যাহা উক্ত হইয়াছে। পরবর্তী ‘পড্বীশ-শঙ্কু’র দৃষ্টান্তানুসারেও জানা যায় যে, চক্ষুপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়নিচয় যাহার আয়ত্ত, এখানে তাহাই এই শিশু অর্থাৎ শিশুর সদৃশ বলিয়া শিশু উক্ত হইয়াছে; কারণ, অপরাপর ইন্দ্রিয়ের ন্যায় ইহার বিষয়াসক্তি প্রবল নহে। শ্রুতিতে শিশুকে ‘সাধান’ বলা হইয়াছে। বৎসস্থানীয় করণাত্মক সেই শিশুর ‘আধান’ বস্তুটি কি?[উত্তর-] ইহাই-কার্য্যাত্মক(২) এই শরীরই তাহার আধান; আধান অর্থ-যাহাতে আহিত(রক্ষিত) হয়; এই শরীরই সেই প্রাণরূপী শিশুর অধিষ্ঠান -আশ্রয়; কারণ, ইন্দ্রিয়গণ এই শরীরমধ্যে অবস্থান করিয়াই আত্মলাভে সমর্থ-বিষয়োপলব্ধির দ্বার বা উপায়ভূত হয়, কিন্তু কেবলই ইন্দ্রিয়সাধনে থাকিয়া সমর্থ হয় না। দেখ, অজাতশত্রুও তাহা প্রদর্শন করিয়াছেন-‘সুষুপ্তিকালে ইন্দ্রিয়নিচয় শরীর হইতে সমাহৃত হইলে পর বিজ্ঞানময় জীবের কোন উপলব্ধি হয় না, কিন্তু ইন্দ্রিয়গণ শরীরস্থ হইলে পর বিজ্ঞানময় আত্মাকে বিষয়ানুভূতি করিতে দেখা যায়’; এ কথা ত পাণিপেষণজনিত প্রতিবোধন-ব্যাপারেই প্রকাশিত হইয়াছে। ২
পারে, কিন্তু তথাপি তাহারা ভ্রাতৃব্য সংজ্ঞা হইতে বিমুক্ত হইতে পারে না; এইজন্য শ্রুতি শুধু ‘ভ্রাতৃব্য’ বলিয়াই নিশ্চিন্ত হইলেন না, ‘দ্বিষতঃ’ বলিলেন। ইহা দ্বারা বুঝাইলেন যে, চক্ষু, কর্ণ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গুলি কেবল সহজ শত্রু নহে, পরন্তু কৃত্রিম শত্রুও বটে; সুতরাং উহাদের পরাভব করা নিতান্ত আবশ্যক।
(২) এই দেহসংঘাতকে কার্য্য ও করণভেদে বিভক্ত করা হইয়াছে। তন্মধ্যে জীবের ভোগসাধন ইন্দ্রিয় প্রভৃতিকে বলা হয় “করণ”, আর তদ্ভিন্ন অংশগুলিকে বলা হয় “কার্য্য”। ফল কথা, কাৰ্য্যাত্মক বলিলে স্থূল দেহটিমাত্র বুঝায়, “করণ” বলিলে ইন্দ্রিয়প্রভৃতি সাধন- নিচয়কে বুঝায়।
এই শির(মস্তক) তাহার প্রত্যাধান। অংশবিশেষে সংস্থিত(স্থাপিত) বলিয়া শিরকে প্রত্যাধান বলা হয়। প্রাণ অর্থাৎ অন্নপানাদিজনিত শক্তি তাহার স্থূণা(বন্ধনাধার খুঁটী); প্রাণ ও বল একপর্যায়ভুক্ত অর্থাৎ সমানার্থক শব্দ; কেননা, প্রাণই হইতেছে এই শরীরে বলের উদ্দীপক; কারণ,[এই অভিপ্রারেই ষষ্ঠ অধ্যায়ে উক্ত হইয়াছে যে,] ‘এই আত্মা যে সময় অবল্য অর্থাৎ বলহীনভাব প্রাপ্ত করাইয়া সম্মোহ—অচেতন ভাবই যেন[প্রাপ্ত হয়]’ ইতি। তদ্দর্শনে বুঝা যায় যে, গবাদি পশুশাবক যেরূপ খুঁটায় ভর করিয়া থাকে, প্রাণও তদ্রূপ বলাবষ্টব্ধ হইয়া থাকে। কেহ কেহ বলেন—এখানে স্থূণা অর্থ শরীরবর্তী প্রাণ-বায়ু। ৩.
অন্ন তাহার দাম,—ভুক্ত অন্ন তিন ভাগে পরিণত হয়; তন্মধ্যে যাহা স্থূল পরিণাম, তাহা দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া—মুত্র ও বিষ্ঠারূপে পৃথিবীতে পতিত হয়; যাহা মধ্যম ভাগ—রস, সেই রসই ক্রমশঃ রক্তপ্রভৃতিরূপে পরিণত হইয়া স্বকার্য্য সপ্তধাতুময় শরীরের উপচয় বা বৃদ্ধি সম্পাদন করিয়া থাকে; কেননা, শরীর অন্নময়(অন্নের পরিণাম) বলিয়া স্বীয় উপাদান অন্নপ্রাপ্তিতে বৃদ্ধিলাভ করিয়া থাকে, আবার অন্নের অভাবে ক্রমশঃ ক্ষীণ হইয়া বিনষ্ট হয়; আর বাহা সূক্ষ্মতম রস, অমৃত, উর্ক ও প্রভাব বা শক্তি বলিয়া যাহা কথিত, তাহা নাভিমণ্ডলের উপরিস্থিত হৃদয়প্রদেশে আসিয়া, হৃদয় হইতে ইতস্ততঃ বিস্তৃত দ্বাসপ্ততিসহস্রসংখ্যক(৭২০০০) নাড়ীর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়, তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া এই যে, করণসমষ্টিরূপ শিশুনামক লিঙ্গদেহ, তাহার বলাধান করত শরীরমধ্যে অবস্থিতির হেতু হইয়া থাকে, অর্থাৎ শিশুরূপে কল্পিত সূক্ষ্ম শরীরকে এই স্কুলদেহে রক্ষা করে বলিয়া উহার নাম “হৃণা”; সেই কারণে, উভয়দিকে পাশযুক্ত(বন্ধন- যুক্ত) বৎস-বন্ধনের রজ্জুর ন্যায় এই অন্নও প্রাণ এবং শরীরের বন্ধন-সাধন হইয়া থাকে ॥ ১০১ ॥ ১ ॥ ২A/A/৪৫
আভাসভাষ্যম্।—ইদানীং তস্যৈব শিশোঃ প্রত্যাহারে উষ্ম চক্ষুধি কাশ্চনোপনিষদ উচ্যতে,—
আভাসভাষ্যানুবাদ।—এখন প্রত্যাহারে নিহিত সেই শিশুরই চক্ষুবিষয়ে কতকগুলি উপনিষদ্(রহস্য নাম) কথিত হইতেছে—
তমেতাঃ সপ্তাক্ষিতয় উপতিষ্ঠন্তে, তদ্ যা ইমা অক্ষন্ লোহিন্যো রাজয়স্তাভিরেন রুদ্রোহন্বায়তঃ, অথ যা অক্ষন্নাপস্তাভিঃ পর্জন্যঃ, যা কনীনকা তয়াদিত্যো যৎ কৃষ্ণং তেনাগ্নির্যচ্ছুকং তেনেন্দ্রো-
৫৬৭
হধরয়ৈনং বর্ত্তন্যা পৃথিব্যন্বায়ত্তা দ্যৌরুত্তরয়া, নাস্যান্নং ক্ষীয়তে য এবং বেদ ॥ ১০২ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।—[ইদানীং তস্যৈব শিশোঃ চক্ষুষি কাশ্চনোপনিষদ উচ্যন্তে— ‘তমেতাঃ’ ইত্যাদি।] এতাঃ(বক্ষ্যমাণাঃ) সপ্ত অক্ষিতয়ঃ(ক্ষয়নিবারকাঃ দেবাঃ) তং(চক্ষুষি নিহিতং করণাত্মকং প্রাণং) উপতিষ্ঠন্তে(আরাধরন্তি)।[কাস্তা অক্ষিতয়ঃ? ইত্যাহ—] তৎ(তত্র) অক্ষন্(অক্ষিণি) যাঃ ইমাঃ(দৃশ্যমানাঃ) লোহিন্যঃ(লোহিতাঃ) রাজয়ঃ(রেখাঃ), তাভিঃ(লোহিতরেখাভিঃ দ্বারা) রুদ্রঃ(তদাখ্যো দেবঃ) এনং(মধ্যমং প্রাণং) অন্বায়ত্তঃ(অনুগতঃ সন্) [উপতিষ্ঠতে]; অথ(অপি) অক্ষন্(অক্ষিণি) যাঃ আপঃ(ধূমাদিসংযোগেন অভিব্যজ্যমানানি জলানি), তাভিঃ(অস্তিঃ দ্বারা) পর্জন্যঃ(মেঘদেবতা) [অন্বায়ত্তঃ সন্ এনং উপতিষ্ঠতে ইতি সর্ব্বত্রান্বয়ঃ]। যা কনীনকা(দৃক্শক্তিঃ, অক্ষিতারকা বা) তয়া(দ্বারভূতয়া) আদিত্যঃ; যৎ কৃষ্ণং(চাক্ষুষং কৃষ্ণরূপং), তেন(দ্বারভূতেন) অগ্নিঃ; যৎ শুক্লং(চাক্ষুষং শুক্লরূপং), তেন (দ্বারভূতেন) ইন্দ্রঃ; অধরয়া বর্তন্যা(নিম্নপদ্মণা দ্বারা) পৃথিবী এনং অন্বায়ত্তা সতী[উপতিষ্ঠতে], উত্তরয়া(ঊর্দ্ধবর্ত্তন্যা) ‘দ্যৌঃ[এনম্ অন্বায়ত্তা সতী উপ- তিষ্ঠতে]। যঃ এবধ বেদ, অস্য(বিদুষঃ) অন্নং ন ক্ষীয়তে(স অক্ষয্যান্নো ভবতীতি ভাবঃ)॥ ১০২॥২॥
মূলানুবাদ?—অক্ষিতি অর্থাৎ ক্ষয় না হইবার হেতুভূত এই সাতটি দেবতা সেই অন্নসম্বদ্ধ প্রাণের উপাসনা করিয়া থাকেন।[কে কে, তাহা বলিতেছেন—] চক্ষুর মধ্যে যে, এই সমস্ত লোহিতবর্ণ রেখা আছে, সে সমস্ত দ্বারা রুদ্রদেব ইহার অনুগত থাকিয়া[আরাধনা করেন]; আর চক্ষুর মধ্যে, যে সমস্ত জল আছে, তদ্দ্বারা পর্জন্যদেব অনুগত থাকিয়া[উপাসনা করেন], চক্ষুর যে কনীনকা অর্থাৎ দর্শনশক্তি বা তারকা, তাহা দ্বারা আদিত্য, চক্ষুর যে কৃষ্ণ রূপ, তাহা দ্বারা অগ্নিদেব, যাহা শুক্লরূপ, তাহা দ্বারা ইন্দ্র, চক্ষুর নিম্ন পক্ষম দ্বারা পৃথিবী এবং ঊর্দ্ধপক্ষম দ্বারা দ্যুলোকদেবতা ইহার অনুগত থাকিয়া আরাধনা করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি এই উপাসনা-তত্ত্ব জানে, কখনও তাহার অন্নক্ষয় হয় না॥ ১০২॥ ২॥
শৈত্যভাষ্যম্।—তমেতাঃ সপ্ত অক্ষিতয় উপতিষ্ঠন্তে,—তং করণাত্মকং
প্রাণং শরীরে অন্নবন্ধনৎ চক্ষুষ্যূঢ়ৎ, এতা বক্ষ্যমাণাঃ সপ্ত সপ্তসংখ্যকা অক্ষিতয়ঃ অক্ষিতিহেতুত্বাৎ, উপতিষ্ঠন্তে। যদ্যপি মন্ত্রকরণে তিষ্ঠতিরুপপূর্ব্ব আত্মনেপদী ভবতি, ইহাপি সপ্ত দেবতাভিধানানি মন্ত্রস্থানীয়ানি করণানি; তিষ্ঠতেরতো- হত্রাপি আত্মনেপদং ন বিরুদ্ধম্। কাস্তা অক্ষিতয় ইত্যুচ্যন্তে-তৎ তত্র যা ইমাঃ প্রসিদ্ধা অক্ষন্ অক্ষিণি লোহিন্যো লোহিতা রাজয়ো রেখাঃ, তাভিদ্বারভূতাভিরেতং মধ্যমং প্রাণং রদ্র অন্বায়ত্তঃ অনুগতঃ। অথ যাঃ অক্ষন্ অক্ষিণি আপঃ ধূমাদি- সংযোগেন অভিব্যজ্যমানাঃ, তাভিঃ অস্তিদ্বারভূতাভিঃ পর্জন্যো দেবতাত্মা অন্বায়ত্তঃ অনুগত উপতিষ্ঠত ইত্যর্থঃ। সচান্নভূতোহক্ষিতিঃ প্রাণস্য, “পর্জন্যে বর্ষতি আনন্দিনঃ প্রাণা ভবন্তি” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ।
যা কনীনকা দৃশক্তিঃ, তয়া কনীনকয়া দ্বারেণ আদিত্যঃ মধ্যমং প্রাণমুপ- তিষ্ঠতে; যৎ কৃষ্ণং চক্ষুষি, তেনৈনম্ অগ্নিরুপতিষ্ঠতে; যৎ শুক্লং চক্ষুষি, তেনেন্দ্রঃ; অধরয়া বর্তন্যা পদ্মণা এনং পৃথিবী অন্বায়ত্তা, অধরত্বসামান্যাৎ। দ্যৌঃ উত্তরয়া, উর্দ্ধত্বসামান্যাৎ। এতাঃ সপ্ত অন্নভূতাঃ প্রাণস্য সন্ততমুপতিষ্ঠন্তে—ইত্যেবং যো বেদ, তস্যৈতৎ ফলম্—নাস্যান্নং ক্ষীয়তে, য এবং বেদ ॥১০২৷৷২৷৷
টাকা।—যো হ বৈ শিশুমিত্যাদৌ সূত্রিতশিষ্বাদিপদার্থান্ ব্যাখ্যায়ানন্তরসন্দর্ভস্য তাৎপর্য্যং দর্শয়ন্নুত্তরবাক্যমুপাদায় ব্যাকরোতি—ইদানীমিত্যাদিনা। ননু যত্র মন্ত্রেণোপস্থানং ক্রিয়তে, তত্রৈবোপপূর্ব্বস্য তিষ্ঠতেরাত্মনেপদং ভবতি। উক্তং হি—উপান্মন্ত্রকরণে’[পা সু ১। ৩। ২৫] ইতি; দৃশ্যতে চাদিত্যং গায়ত্রোপতিষ্ঠত ইতি। ন চাত্র মন্ত্রেণ কিঞ্চিৎ ক্রিয়তে, কিন্তুন্নাক্ষয়হেতুত্বাৎ প্রাণস্য সপ্তাক্ষিতয় ইত্যুপনিষদো বিবক্ষান্তে, তত্রাহ—যদ্য- পীতি। মন্ত্রেণ কস্যচিদনুষ্ঠানস্য করণে বিবক্ষিতে তিষ্ঠতিরুপপূর্ব্বো যদ্যপ্যাত্মনেপদী ভবতি, তথাপাত্র সপ্ত রুদ্রাদিদেবতানামানি মন্ত্রবদবস্থিতানি, তৈশ্চ করণান্যুপাসনানুষ্ঠানা- ম্নত্র ক্রিয়ন্তে; অতস্তিষ্ঠতেরুপপূর্ব্বস্যাত্মনেপদমবিরুদ্ধমিতি যোজনা। লোহিতরেখাভী- রুদ্রস্য প্রাণং প্রত্যনুগতেরনন্তরমিত্যথশব্দার্থঃ। পর্জন্যস্যান্নদ্বারা প্রাণাক্ষয়হেতুত্বে প্রমাণ- মাহ—পর্জন্য ইতি। কথং পুনরেতেষাং প্রাণং প্রত্যক্ষিতিত্বং সর্বেষাং সিধ্যতি, তত্রাহ— এতা ইতি। সংপ্রত্যুপাস্তিফলমাহ—ইত্যেবমিতি। ১০২।২।
ভাষ্যানুবাদ।—“তম্ এতাঃ সপ্ত অক্ষিতয়ঃ উপতিষ্ঠন্তে” ইতি। বক্ষ্য- মাণ সপ্তসংখ্যক এই অক্ষিতি—ক্ষয়নিবারক দেবগণ, শরীরে অন্ন-বন্ধনে আবদ্ধ এবং চক্ষুতে নিহিত সেই করণাত্মক প্রাণের উপাসনা করিয়া থাকেন। যদিও মন্ত্রপূর্ব্বক উপাসনা অর্থেই উপপূর্ব্বক “স্থা” ধাতুর উত্তর আত্মনেপদ হয় সত্য; তথাপি এখানেও উক্ত সাতটি দেবতার নাম মন্ত্রস্থানীয় করণস্বরূপ হইয়াছে; সেইহেতু এখানেও ‘স্থা’ ধাতুর উত্তর আত্মনেপদ(উপতিষ্ঠন্তে) হওয়া
৫৬৯
‘অসঙ্গত হয় নাই। সেই ‘অক্ষিতি’ দেবতা কাহারা, তাহা বলা হইতেছে— সেই চক্ষুর মধ্যে এই যে, প্রসিদ্ধ লোহিনী অর্থাৎ লোহিতবর্ণ রাজি— রেখাসমূহ, সে সমুদয় দ্বারা রুদ্রদেব ইহাতে অনুগত বা সম্বদ্ধ থাকিয়া এই মধ্যম প্রাণের উপাসনা করিয়া থাকেন; এবং চক্ষুর মধ্যে যে জল—যাহা ধূমাদি- সংযোগে প্রকাশ পাইয়া থাকে, সেই জল দ্বারা পর্জন্যদেব(মেঘাধিষ্ঠাত্রী দেবতা) অনুগত থাকিয়া উপাসনা করেন; এই পর্জন্যই প্রাণের অন্নস্বরূপ অক্ষিতি; কারণ, অপর শ্রুতিতে আছে—পর্জন্য বারি বর্ষণ করিলে প্রাণ আন- ন্দিত হয় ইত্যাদি।
চক্ষুর যে কনীনকা—দর্শনশক্তি, সেই কনীনকা দ্বারা[ তাহাতে অনুগত থাকিয়া] আদিত্যদেব শরীরমধ্যস্থ প্রাণের উপাসনা করেন; চক্ষুর যে কৃষ্ণ রূপ, তাহা দ্বারা অগ্নিদেব ইহার উপাসনা করেন, আর চক্ষুতে যে শুক্ল রূপ আছে, তদ্দ্বারা ইন্দ্র[ উপাসনা করেন]; অধরা বর্তনী—চক্ষুর নিম্ন পক্ষ দ্বারা পৃথিবী ইহাতে অনুগত থাকিয়া উপাসনা করেন; কেননা, চক্ষুর নিম্ন পক্ষ ও পৃথিবী, উভয়েরই নিম্নত্বধর্ম্ম সমান; ঊর্দ্ধস্থ পক্ষ দ্বারা দ্যুলোকদেবতা[ উপাসনা করিয়া থাকেন]। এই সাতটি অক্ষিতি—প্রাণরক্ষার হেতুভূত পদার্থ সর্ব্বদা ইহার উপাসনা করিয়া থাকেন, যিনি এবম্প্রকার জ্ঞানলাভ করেন; তাঁহার এই ফল হয় যে, কখনও তাঁহার অন্নক্ষয় হয় না, অর্থাৎ অন্নাভাব ঘটে না ॥ ১০২ ॥ ২ ॥
তদেষ শ্লোকো ভবতি—অর্ব্বাগ্বলশ্চমস ঊর্দ্ধবুধ্রস্তস্মিন্ যশো নিহিতং বিশ্বরূপম্, তস্যাসত ঋষয়ঃ সপ্ত তীরে বাগষ্টমী ব্রহ্মণা সম্বিদানেতি। অর্ব্বাগ্বলশ্চমস ঊর্দ্ধবুধ্র ইতীদং তচ্ছিরঃ, এষ হ্যর্ব্বাগ্বলশ্চমস ঊর্দ্ধবুধ্রস্তস্মিন্ যশো নিহিতং বিশ্বরূপমিতি, প্রাণা বৈ যশো বিশ্বরূপং প্রাণানেতদাহ। তস্যাসত ঋষয়ঃ সপ্ত তীর ইতি, প্রাণা বা ঋষয়ঃ প্রাণানেতদাহ, বাগষ্টমী ব্রহ্মণা সম্বিদা- নেতি, বাগ্যষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিত্তে ॥ ১০৩ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ।—তৎ(তত্র বিষয়ে) এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) শ্লোকঃ(সঙ্ক্রি- প্তার্থকঃ মন্ত্রঃ) ভবতি—“অর্ব্বাগবিলশ্চমসঃ” ইত্যাদিঃ। অর্ব্বাগবিলঃ(অধোগর্ত্তঃ) ঊর্দ্ধবুধ্নঃ(উপরিভাগে বক্রঃ স্থুলো বা) চমসঃ(দব্বীসদৃশঃ সোমাধারঃ পাত্রবিশেষঃ) [অস্তি], তস্মিন্(চমসে) বিশ্বরূপং(সর্ব্ববিধং) যশঃ নিহিতং(রক্ষিতং অস্তি), তস্য(চমসস্য) তীরে সপ্ত ঋষয়ঃ(ইন্দ্রিয়রূপাঃ) আসতে(বর্তন্তে);
ব্রহ্মণা সংবিদানা(ব্রহ্মণা সহ সংবাদং কুর্ব্বতী তদ্বিষয়মালোচয়ন্তী) বাক্(বাগি- ন্দ্রিয়ং) অষ্টমী[তত্র আস্তে] ইতি।[অথ শ্রুতিঃ স্বয়মেব মন্ত্রার্থমাহ-অর্ব্বাগ- বিলঃ চমসঃ ঊর্দ্ধবুধঃ ইতি যদুক্তম্, ইদৎ শিরঃ]-তৎ(স চমসঃ); হি(যস্মাৎ) এষঃ(শিরঃ পদার্থঃ) অর্ব্বাগবিল:(অর্ব্বাচি অধোভাগে মুখগহ্বরাত্মকং বিলং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), উর্দ্ধবুধঃ(উর্দ্ধে উপরিভাগে বুধঃ স্থূলাত্মকঃ) চমসঃ(চমসা- কৃতিশ্চ)। তস্মিন্ যশো নিহিতং বিশ্বরূপম্-ইত্যেতৎ(মন্ত্রবাক্যং) প্রাণান্ আহ-বৈ(যতঃ) প্রাণাঃ(শ্রোত্রাদীনি ইন্দ্রিয়াণি বায়বশ) বিশ্বরূপং(ব্যাপকং) যশঃ(যশঃকারণম্)। তস্য আসতে ঋষয়ঃ সপ্ত তীরে-ইত্যেতৎ[মন্ত্রবাক্যং অপি] প্রাণান্(যথোক্তলক্ষণান্) আহ(কথয়তি); বৈ(যতঃ) প্রাণাঃ (শ্রোত্রাদীনি বায়বশ) ঋষয়ঃ(ঋষিপদবাচ্যাঃ); বাক্ হি অষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিদানা ইতি; অষ্টমী(শ্রোত্রাদি-সপ্তাপেক্ষয়া অষ্টমী) বাক্ হি(এব) ব্রহ্মণা সংবিত্তে(সংবাদং তৎপ্রকাশনরূপং করোতি; অতঃ ব্রহ্মণা সংবিদানা বাগিত্যর্থঃ) ॥ ১০৩॥ ৩॥
মূলানুবাদ?—পূর্ব্বোক্ত বিষয়ে এইরূপ একটি শ্লোক— সংক্ষিপ্তার্থক বাক্য আছে। যথা—“অর্বাগবিলশ্চমসঃ” ইত্যাদি “সংবিদানা” পর্য্যন্ত। অধোভাগে বা নিম্নপ্রদেশে যাহার গর্ত্ত আছে, তাহা অর্বাগবিল, আর ঊর্দ্ধভাগ যাহার বুধ অর্থাৎ গোলাকার উচ্চ, তাহা ঊর্দ্ধবুর; চমস অর্থ—সোমাধার পাত্রবিশেষ(হাতার মত); সেই চমসের মধ্যে নানাবিধ যশঃ নিহিত আছে; তাহার তীরে (পার্শ্বে) সপ্ত ঋষি এবং ব্রহ্ম-সংবাদকারিণী অষ্টমী বাক্[বাগিন্দ্রিয়] অবস্থান করে ইতি।
ইহার মধ্যে অর্বাগবিল ও ঊর্দ্ধবুর চমস হইতেছে এই শির(মস্তক); কারণ, ইহাই অধোভাগে মুখ-গহ্বরবিশিষ্ট এবং উপরিভাগে গোলাকৃতি চমসের সদৃশ। ‘তাহাতে বিশ্বরূপ যশ নিহিত আছে’ এই মন্ত্রবাক্যটি প্রাণের কথা বলিতেছেন; কারণ, প্রাণই নানাবিধ যশঃ অর্থাৎ যশের কারণ। ‘তাহার তীরে সপ্ত ঋষি বাস করিতেছেন’ এই মন্ত্রও ইন্দ্রিয়ের কথাই বলিতেছেন; কারণ, ইন্দ্রিয়সমূহই সপ্ত ঋষিরূপে প্রসিদ্ধ; সুতরাং এখানে ইন্দ্রিয়ের বিষয়ই বুঝিতে হইবে। ‘অষ্টমী বাক্ ব্রহ্মের সহিত
৫৭১
সংবাদকারিণী’ মন্ত্রটি বলিতেছেন—পূর্ব্বাপেক্ষা অষ্টম বাগিন্দ্রিয়ই ব্রহ্মের সহিত সংবাদ করিয়া থাকে, অর্থাৎ বাগিন্দ্রিয়দ্বারা ব্রহ্মবিষয়ক আলাপ সম্পন্ন হইয়া থাকে; অতএব বাগিন্দ্রিয়টি ‘ব্রহ্ম-সংবিদানা’ ॥ ১৭৩ ॥ ৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তৎ তত্র এতস্মিন্নর্থে এষ শ্লোকঃ মন্ত্রো ভবতি— অর্ব্বাগবিলশ্চমস ইত্যাদিঃ। তত্র মন্ত্রার্থমাচষ্টে শ্রুতিঃ—অর্ব্বাগবিলশ্চমস ঊর্দ্ধবুধ্র, ইতি। কঃ পুনরসৌ অর্ব্বাগবিলশ্চমস ঊর্দ্ধবুধ্রঃ? ইদং তৎ—শিরঃ, চমসাকারং হি তৎ; কথম্? এষ হি অর্ব্বাগবিলঃ, মুখস্য বিলরূপত্বাৎ, শিরসো বুধ্রাকারত্বাৎ ঊর্দ্ধবুধ্রঃ। তস্মিন্ যশো নিহিতং বিশ্বরূপমিতি—যথা সোমঃ চমসে, এবং তস্মিন্ শিরসি বিশ্বরূপং নানারূপং নিহিতং স্থিতং ভবতি। কিং পুনস্তৎ? যশঃ— প্রাণা বৈ যশো বিশ্বরূপম্, প্রাণাঃ শ্রোত্রাদয়ঃ বায়বশ্চ মরুতঃ সপ্তধা তেষু প্রসূতা যশঃ ইত্যেতদ্বাহ মন্ত্রঃ, শব্দাদিজ্ঞানহেতুত্বাৎ। তস্যাসত ঋষয়ঃ সপ্ত তীর ইতি— প্রাণাঃ পরিস্পন্দাত্মকাঃ, ত এব চ ঋষয়ঃ, প্রাণানেতদাহ মন্ত্রঃ। বাগষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিদানেতি—ব্রহ্মণা সংবাদং কুর্ব্বন্তী অষ্টমী ভবতি; তদ্ধেতুমাহ—বাগ্হি অষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিত্তে ইতি ॥ ১০৩॥৩॥
টীকা।—রুদ্রাদিশব্দানাং দেবতাবিষয়ত্বান্মন্ত্রস্যাপি তদ্বিষয়তেত্যাশঙ্ক্য চক্ষুষি রুদ্রাদি- গণস্যোক্তত্বাদিন্দ্রিয়সম্বন্ধাত্তস্য করণগ্রামত্বপ্রতীতেস্তদ্বিষয়ঃ শ্লোকো ন প্রসিদ্ধদেবতাবিষয় ইত্যভিপ্রেত্যাহ—তৎ তত্রেতি। মন্ত্রস্য ব্যাখ্যানসাপেক্ষত্বং তত্রেত্যুচ্যতে। শিরসশ্চমসাকারত্বম- স্পষ্টমিত্যাশঙ্ক্য সমাধত্তে—কথমিত্যাদিনা। বাগষ্টমীত্যযুক্তং, তস্যাঃ সপ্তমত্বেনোক্তত্বাৎ, ন চৈকস্যা দ্বিত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ—ব্রহ্মণেতি। শব্দরাশিব্রহ্ম, তেন সম্বাদঃ সংসর্গন্তং গচ্ছন্তী শব্দরাশি-- মুচ্চারয়ন্তী বাগষ্টমী স্যাদিতি যাবৎ। তথাপি সপ্তমত্বং বিহায় কথমষ্টমত্বং, তত্রাহ—তদ্ধেতু- মিতি। বক্তৃত্বাতৃত্বভেদেন দ্বিধা বাগিষ্টা, তত্র বক্তৃত্বেনাষ্টমী, সপ্তমী চাত্ত্বেনেত্যবিরোধঃ। রসনা ভূপলব্ধিহেতুরিতি ভাবঃ॥ ১০৩॥ ৩॥
ভাষ্যানুবাদ।—এ বিষয়ে এইরূপ একটি শ্লোক অর্থাৎ মন্ত্র আছে— “অর্ব্বাগ্বলঃ চমসঃ” ইত্যাদি। শ্রুতি নিজেই মন্ত্রের অর্থ প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন—“অর্ব্বাগ্বলঃ চমসঃ ঊর্দ্ধবুদ্ধঃ” ইতি। এই অর্ব্বাগ্বল—অধো- ভাগে গর্ত্ত-বিশিষ্ট, এবং ঊর্দ্ধবুদ্ধ অর্থাৎ উপরের দিকে বর্ত্তুলাকার চমসটি কি? [উত্তর—] এই মস্তক হইতেছে সেই চমস; কারণ, মস্তক স্বভাবতঃই চমসের সদৃশ। কি প্রকারে? যেহেতু, মুখটি গর্ত্তাকার বলিয়া ইহা অর্ব্বাগ্বল, এবং মস্তকটি বুধ্নাকার(বর্ত্তুলাকার) বলিয়া ঊর্দ্ধবুদ্ধও বটে। ‘তাহাতে বিশ্বরূপ যশঃ নিহিত আছে’ ইহার অর্থ—চমসে যেমন সোম থাকে, তেমনি এই মস্তকেও বিশ্বরূপ অর্থাৎ নানাবিধ রূপ নিহিত(অবস্থিত) আছে। সেই যশঃ কি? প্রাণ-
সমুহই বিশ্বরূপ যশঃ। মন্ত্র বলিতেছেন যে, প্রাণ অর্থাৎ শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় ও বায়ুসমূহ যশোরূপে মস্তকের মধ্যে নিহিত রহিয়াছে; কেন না, উহারাই শব্দাদি উপলব্ধির উপায় স্বরূপ। ‘তাহার তীরে সপ্ত ঋষি অবস্থান করেন’ ইহার অর্থ-স্পন্দনশীল প্রাণই এখানে ঋষি-পদবাচ্য; উক্ত মন্ত্রে সেই প্রাণের বিষয়ই বলা হইয়াছে। ‘ব্রহ্মের সহিত সংবাদকারিণী বাক্ তাহাদের অষ্টমী’ ইহার অর্থ-ব্রহ্মের সহিত সংবাদ করে-ব্রহ্মতত্ত্ব প্রকাশ করে বলিয়া বাগিন্দ্রিয় তাহাদের অষ্টম; এ কথার সমর্থক হেতু বলিতেছেন-যেহেতু অষ্টসংখ্যার পুরক-অষ্টম বাগিন্দ্রিয়ই ব্রহ্মের সহিত সমানভাবে জ্ঞানদান করিয়া থাকে,[অতএব বাগিন্দ্রিয়ই অষ্টমী](১)॥ ১০৩॥৩॥৮৯
ইমাবেব গোতম-ভরদ্বাজাবয়মেব গোতমোহয়ং ভরদ্বাজঃ, ইমাবেব বিশ্বামিত্র-জমদগ্নী, অয়মেব বিশ্বামিত্রঃ অয়ং জমদগ্নিঃ, ইমাবেব বসিষ্ঠ-কশ্যপাবয়মেব বসিষ্ঠঃ অয়ং কশ্যপো বাগেবাত্রি- র্ব্বাচা হ্যন্নমদ্যতেহত্তির্বৈ নামৈতদ্ যদত্রিরিতি, সর্ব্বস্যাত্তা ভবতি সর্ব্বমস্যান্নং ভবতি য এবং বেদ ॥ ১০৪ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—[ ইদানীং তানেব সপ্ত ঋষীন্ বিভজ্য দর্শয়িতুমাহ—“ইমাবেব” ইত্যাদি]। ইমৌ(নিৰ্দ্দিশ্যমানৌ কর্ণো) এব(নিশ্চয়ে) গোতম-ভরদ্বাজৌ। [কৌ তৌ? ইত্যাহ—] অয়ং(দক্ষিণঃ কর্ণঃ) এব গোতমঃ(তদাখ্য-ঋষি- স্থানীয়ঃ), অয়ং(বামঃ কর্ণঃ) ভরদ্বাজঃ(ভরদ্বাজাখ্য-ঋষিস্থানীয়);[চক্ষু- দ্বয়ং দর্শয়ন্ আহ—] ইমৌ এব বিশ্বামিত্র-জমদগ্নী; অয়ং(ইদং দক্ষিণৎ চক্ষুঃ) এব বিশ্বামিত্রঃ, অয়ং(ইদং বামং চক্ষুঃ) এব জমদগ্নিঃ;[নাসিকাদ্বয়ং দর্শয়ন্ আহ—] ইমৌ এব বসিষ্ঠ-কশ্যপৌ—অয়ং(দক্ষিণঃ নাসাপুটঃ) এব বসিষ্ঠঃ, অয়ং
(১) তাৎপর্য্য—পূর্ব্ব তৃতীয় শ্রুতিতে বাক্কে অষ্টমী বলা হইয়াছে; এখানে আবার ভাব্যকার বাক্কে সপ্তম বলিয়া উল্লেখ করিলেন। ইহার মীমাংসা এইরূপ—চক্ষুঃ-শ্রোত্রাদি অপেক্ষা করিয়া বাগিন্দ্রিয় যদিও সপ্তম হউক, তথাপি তাহাকে অষ্টম বলিবার উদ্দেশ্য এই যে, বাগিন্দ্রিয়ের দুইটি কার্য্য—(১) অন্নভক্ষণ করা,(২) শব্দব্রহ্ম উচ্চারণ করা; তন্মধ্যে অন্ন- ভক্ষণের কর্তৃত্ব ধরিয়া বাক্কে সপ্তম বলা হইয়াছে, আর শব্দোচ্চারণশক্তি ধরিয়া তাহাকেই তৃতীয় শ্রুতিতে অষ্টম বলা হইয়াছে। অতএব উল্লিখিত ধর্মদ্বয় অনুসারে অষ্টমত্ব নির্দেশ করা অসঙ্গত হইতেছে না।
৫৭৩
(বামনাসাপুটঃ) এব কশ্যপঃ; বাক্ বাগিন্দ্রিয়ং এব অত্রিঃ; হি(যস্মাৎ) বাচা এব অম্লং অদ্যতে;(তস্মাদেব বাক্ অত্রিঃ), যৎ ‘অত্রিঃ’ ইতি নাম, এতৎ বৈ- (এব) অধিঃ হ(প্রসিদ্ধম্, অধিঃ অদনকর্তা এব সন্ অত্রিরিত্যুচ্যতে ইতি ভাবঃ)। যঃ এবং বেদ(জানাতি),[সঃ বিদ্বান্] সর্ব্বস্য(অন্নস্য) অত্তা (ভোক্তা) ভবতি, সর্ব্বং চ অন্য(বিদুষঃ) অন্নং ভবতি(ভোগ্যত্বম্ আপদ্যতে; ন পুনরয়মন্যস্য ভোগ্যতাং লভতে ইত্যর্থঃ)॥ ১০৪ ॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ।-[অতঃপর পূর্বোক্ত সপ্ত ঋষিদের নাম ও স্বরূপ প্রদর্শিত হইতেছে-] এই দুইটিই গোতম ও ভরদ্বাজ; তন্মধ্যে এই দক্ষিণ কর্ণই গোতম ও বামকর্ণই ভরদ্বাজ ঋষি। এই দুইটিই বিশ্বামিত্র ও জমদগ্নি ঋষি; তন্মধ্যে এই দক্ষিণ চক্ষুই বিশ্বামিত্র, এবং এই বাম চক্ষুই জমদগ্নি। এই দুইটিই বসিষ্ঠ ও কশ্যপ ঋষি; তন্মধ্যে এই দক্ষিণ নাসাপুট বসিষ্ঠ ও বাম নাসাপুট কশ্যপ; আর বাগিন্দ্রিয়ঃ হইতেছে-অত্রি ঋষি; কারণ, লোকে বাগিন্দ্রিয়ের সাহায্যেই অন্ন-- ভোগ করিয়া থাকে। এই যে, অত্রি নাম, ইহা বস্তুতঃ-‘অত্তি’ নামেরই রূপান্তর মাত্র। যিনি এইরূপে ঋষিতত্ত্ব জানেন, তিনি সর্ববিধ অন্ন-- ভোগের অধিকারী হন, সমস্তই তাহার অন্ন হয় ॥ ১০৪॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—কে পুনস্তস্য চমসস্য তীরে আসতে ঋষয়ঃ ইতি? ইমাবেব গোতম-ভরদ্বাজৌ কর্ণেী—অয়মেব গোতমঃ, অয়ং ভরদ্বাজঃ—দক্ষিণশ্চো- ত্তরশ, বিপর্যয়েণ বা। তথা চক্ষুষী উপদিশন্নুবাচ—ইমাবেব বিশ্বামিত্র-জমদগ্নী,- দক্ষিণং বিশ্বামিত্রঃ, উত্তরং জমদগ্নিঃ, বিপর্যয়েণ বা। ইমাবেব বসিষ্ঠ-কশ্যপৌ— নাসিকে উপদিশন্নুবাচ; দক্ষিণঃ পুটো ভবতি বসিষ্ঠঃ, উত্তরঃ কশ্যপঃ, পূর্ব্ববদ্বা। বাগেব অত্রিঃ, অদনক্রিয়াযোগাৎ সপ্তমঃ; বাচা হি অন্নম্ অদ্যতে; তস্মাদত্তির্হ বৈ প্রসিদ্ধং নামৈতৎ—অত্ত্বত্বাদত্রিরিতি, অত্তিরেব সন্ যদত্রিকুচ্যতে পরোক্ষেণ।
সর্ব্বস্যৈতস্যান্নজাতস্য প্রাণস্য অত্রিনির্বচন-বিজ্ঞানাৎ অত্তা ভবতি, অত্তৈব ভবতি, নামুষ্মিন্নন্যেন পুনঃ প্রত্যদ্যতে ইত্যেতদুক্তং ভবতি—সর্ব্বমস্যান্নং ভবতীতি। ব এবমেতদ্যথোক্তং প্রাণযাথাত্ম্যং বেদ, স এবং মধ্যমঃ প্রাণোঃ
ভূত্বা আধান-প্রত্যাধানগতো ভোক্তেব ভবতি, ন ভোজ্যম্; ভোজ্যাদ্ব্যাবর্ত্তত- ইত্যর্থঃ ॥ ১০৪ ॥ ৪ ॥
ইতি দ্বিতীয়োঽধ্যায়ঃ দ্বিতীয়-ব্রাহ্মণভাষ্যম্ ॥ ২ ॥ ২ ॥
টীকা।—বিপর্যয়েণ বেত্যেতৎ পূর্ব্ববদিত্যুচ্যতে। অত্রিঃ সপ্তম ইতি সম্বন্ধঃ। অত্রিত্বে হেতুরদনক্রিয়াযোগাদিতি। হেতুং সাধয়তি—বাচা হীতি। সাধ্যমর্থং নিগময়তি—তস্মাদিতি। তর্হি কথমত্রিরিতি ব্যপদিশ্যতে, অত আহ—অতিরেবেতি। প্রাণস্য যদন্নজাতমেতস্য সর্ব্বস্তাত্তা ভবত্যত্রিনির্ব্বচনবিজ্ঞানাদিতি সম্বন্ধঃ। সর্ব্বমস্যেত্যাদিবাক্যমর্থোক্তিপূর্ব্বকং প্রকটয়তি—অত্তৈবেতি। ন কেবলমত্রিনির্ব্বচনবিজ্ঞানকৃতমেতৎ ফলং, কিন্তু প্রাণযায্যবেদন- প্রযুক্তমিত্যাহ—য এবমিতি। ২০৪।৪।
ভাষ্যানুবাদ।—কোন্ কোন্ ঋষি সেই চমসের তীরে বাস করেন, এখন তাহা বলিতেছেন—এই কর্ণ দুইটিই গোতম ও ভরদ্বাজ; তন্মধ্যে এই দক্ষিণ কর্ণই গোতম, আর বাম কর্ণই ভরদ্বাজ, অথবা ইহার বিপরীতভাবেও ধরা যাইতে পারে, অর্থাৎ বাম কর্ণও গোতম হইতে পারে, এবং দক্ষিণ কর্ণও ভরদ্বাজরূপে কল্পিত হইতে পারে। সেইরূপ চক্ষুদ্বয় প্রদর্শন করত বলিলেন— এই দুইটিই বিশ্বামিত্র ও জমদগ্নি ঋষি; তন্মধ্যে দক্ষিণ চক্ষু বিশ্বামিত্র, আর বাম চক্ষু জমদগ্নি; বিপরীতভাবেও ধরা যাইতে পারে। নাসিকাদ্বয় প্রদর্শন করত বলিলেন—এই দুইটিই বসিষ্ঠ ও কশ্যপ; তন্মধ্যে দক্ষিণ নাসাপুট বসিষ্ঠ, আর বাম নাসাপুট কশ্যপ; এখানেও দক্ষিণ বামের কোন নিয়ম নাই। অদন—ভক্ষণ ক্রিয়ার সহিত সম্বন্ধ আছে বলিয়া বাগিন্দ্রিয়ই ইহাদের সপ্তম ঋষি। অত্রি একজন ঋষি; অদনকর্তা বলিয়া তাঁহার এই ‘অত্তি’ নাম প্রসিদ্ধ; প্রকৃত নাম ‘অত্তি’ হইলেও ‘অত্রি’ শব্দে প্রকারান্তরে তাহার সেই নাম অভিহিত হইয়াছে।
এই ‘অত্রি’ নামের প্রকৃতার্থ বিজ্ঞানের ফল এই যে, বিজ্ঞাতা এই সর্ব্বপ্রকার প্রাণভোজ্য অন্নের ভোক্তা হন; সমস্তই ইহার অন্ন(ভোগ্য) হয়। ইহা দ্বারা বলা হইল যে, পরলোকেও সে কেবল ভোক্তাই হয়, কিন্তু অপর কেহ তাহাকে ভোগ করিতে সমর্থ হয় না। যিনি যথোক্ত প্রকার প্রাণতত্ত্ব জানেন, তিনি এইরূপে দেহস্থ প্রাণভাব প্রাপ্ত হইয়া এবং আধানস্বরূপ দেহে ও প্রত্যাধানরূপ শিরে অবস্থিতি করত কেবল ভোক্তার হন, কিন্তু অপরের ভোজ্য হন না, অর্থাৎ তাঁহার ভোজ্যভাব নিবৃত্ত হইয়া যায়।
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয় ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ২ ॥ ২ ॥
দ্বে বাব ব্রহ্মণো রূপে মূর্ত্তঞ্চৈবামূর্ত্তঞ্চ মর্ত্যঞ্চামৃতঞ্চ স্থিতঞ্চ যচ্চ সচ্চ ত্যচ্চ ॥ ১০৫ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—বাব(প্রসিদ্ধৌ), ব্রহ্মণঃ দ্বে রূপে প্রসিদ্ধে—মূর্ত্তং(মূর্ত্তি- বিশিষ্টং পরিচ্ছিন্নং) চ, অমূর্ত্তং(মূর্ত্তিরহিতম্ অপরিচ্ছিন্নং) এব চ; তথা মর্ত্যং(মরণশীলং) চ, অমৃতং(অমরণশীলং) চ; তথা স্থিতং(গতিরহিতং) চ, যৎ(গচ্ছৎ) চ, ‘সৎ(বিদ্যমানং) চ, ত্যৎ(সর্ব্বদা পরোক্ষং) চ॥ ১০৫॥১॥
মূলানুবাদ?—ব্রহ্মের দুইটি রূপ প্রসিদ্ধ,—একটি মূর্ত্ত (মূর্ত্তিসম্পন্ন পরিচ্ছিন্ন), অপরটি অমূর্ত্ত; একটি মর্ত্য(মরণশীল), অপরটি অমৃতস্বভাব, একটি স্থিত—গতিহীন, অপরটি যৎ(গমনশীল), এবং একটি সৎ(বিদ্যমান), অপরটি ত্যৎ(সর্বসময়ে পরোক্ষ)॥ ১০৫॥ ১
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্র প্রাণা বৈ সত্যমিত্যুক্তম্। যাঃ প্রাণানামুপ- নিষদঃ, তাঃ ব্রহ্মোপনিষংপ্রসঙ্গেন ব্যাখ্যাতাঃ—“এতে তে প্রাণাঃ” ইতি চ। তে কিমাত্মকাঃ, কথং বা তেষাৎ সত্যত্বম্—ইতি চ বক্তব্যমিতি পঞ্চভূতানাং সত্যানাং কার্য্য-করণাত্মকানাং স্বরূপাবধারণার্থাদিং ব্রাহ্মণমারভ্যতে—যদুপাধি- বিশেষাপনয়দ্বারেণ “নেতি নেতি” ইতি ব্রহ্মণঃ সত্যত্বং নিদ্দিধারয়িষিতম্। ১
তত্র দ্বিরূপং ব্রহ্ম পঞ্চভূতজনিতকার্য্যকরণসম্বদ্ধং মূর্তামূর্তাখ্যং মর্ত্যামৃত- স্বভাবং তজ্জনিতবাসনারূপঞ্চ সর্ব্বজ্ঞং সর্ব্বশক্তি সোপাখ্যং ভবতি; ক্রিয়াকারক- ফলাত্মকঞ্চ সর্ব্বব্যবহারাস্পদম্। তদেব ব্রহ্ম বিগতসর্ব্বোপাধিবিশেষং সম্যগ- দর্শনবিষয়ম্ অজমজরমমৃতমভয়ম্, বাষ্মনসয়োরপ্যবিষয়ম্ অদ্বৈতত্বাৎ “নেতি নেতি” ইতি নিৰ্দ্দিশ্যতে। তত্র যদপোহদ্বারেণ “নেতি নেতি” ইতি নির্দিশ্যতে ব্রহ্ম, তে এতে দ্বে বাব-বাব-শব্দোহবধারণার্থঃ-দ্বে এবেত্যর্থঃ, ব্রহ্মণঃ পরমাত্মনঃ রূপে,-রূপ্যতে যাভ্যাম্ অরূপং পরম্ ব্রহ্ম অবিদ্যাধ্যারোপ্য- মাণাভ্যাম্। ২
কে তে দ্বে? মূর্তং চৈব মূর্তমেব চ; তথা অমুর্তঞ্চ অমুর্তমেব চেত্যর্থঃ। অন্তর্ণীতস্বাত্মবিশেষণে মূর্তামূর্তে দ্বে এবেত্যবধার্য্যেতে। কানি পুনস্তানি বিশে-
যণানি মূর্তামূর্তয়োরিতি? উচ্যন্তে-মর্ত্যং চ, মর্ত্যং মরণধৰ্ম্মি, অমৃতঞ্চ তদ্বি-- পরীতম্; স্থিতং পরিচ্ছিন্নং গতিপূর্ব্বকং বৎ স্থাসু; যচ্চ-বাতীতি যৎ-ব্যাপি অপরিচ্ছিন্নং স্থিত-বিপরীতম্; সচ্চ-সদিত্যন্যেভ্যো বিশেষ্যমাণাসাধারণধৰ্ম্ম- বিশেষবৎ, ত্যচ্চ-তদ্বিপরীতম্, ত্যদিত্যেব সর্ব্বদা পরোক্ষাভিধানাইম্ ॥ ১০৫॥ ১ ॥
টীকা।—সম্বন্ধং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি—তত্রেতি। অজাতশত্রুব্রাহ্মণাবসানং সপ্তম্যর্থঃ। উপনিষদঃ রুদ্রাদ্যভিধানাদি। চকারাদুক্তমিত্যনুষঙ্গঃ। উত্তরব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমাহ—তে কিমাত্মকা ইতি। ব্রহ্মণো নির্ধারণীয়ত্বাৎ কিমিতি ভূতানাং সতত্ত্বং নির্দ্ধার্য্যতে? তত্রাহ—যদুপাধীতি। তেষামুপাধিভূতানাং স্বরূপাবধারণার্থং ব্রাহ্মণমিতি সম্বন্ধঃ। সত্যস্য সত্যমিত্যত্র ষষ্ঠ্যন্তসত্য- শব্দিতং হেয়ং, প্রথমান্তসত্যশব্দিতমাদেরয়ং, তয়োরাদ্যস্বরূপোক্ত্যর্থমপেত্যতঃ প্রাক্তনং বাক্যং, তদুর্দ্ধম্ আব্রাহ্মণসমাপ্তেরায়েয়নিরূপণার্থমিতি সমুদায়ার্থঃ। ১
সবিশেষমেব ব্রহ্ম ন নির্বিশেষমিতি কেচিৎ, তান্নিরাকর্তুং বিভজতে-তত্রেতি। ব্রাহ্মণার্থে পূর্ব্বোক্তরীত্যা স্থিতে সতীতি যাবৎ। ‘যে বাব’ ইত্যাদিশ্রুতেঃ সোপাধিকং ব্রহ্মরূপং বিবৃণোতি- পঞ্চভূতেতি। শব্দপ্রত্যয়বিষয়ত্বং সোপাখ্যত্বম্; নিরুপাধিকং ব্রহ্মরূপং দর্শয়তি-তদেবেতি। এবং ভূমিকামারচয্যাক্সরাণি ব্যাকরোতি-তত্রেত্যাদিনা। দ্বৈরূপে সতীতি যাবৎ। ২
অমূর্ত্তং চেত্যত্র চকারাদেবকারানুষক্তিঃ। বিবক্ষিতব্রহ্মণো রূপদ্বয়মবধারিতং চেৎ, মর্ত্যত্বাদীনি বক্ষ্যমাণবিশেষণান্যবধারণবিরোধাদযুক্তানীত্যাশঙ্ক্যাহ—অন্তর্ণীতেতি। মূর্তামূর্ত্তয়োরন্তর্ভাবিতানি স্বাত্মনি যানি বিশেষণানি, তান্তাকাঙ্ক্ষাদ্বারা দর্শয়তি—কানি পুনরিত্যাদিনা। যৎ গতিপূর্ব্বকং স্বাসু, তৎ পরিচ্ছিন্নং স্থিতমিতি যোজনা। বিশেষ্যমাণত্বং প্রত্যক্ষেণোপলভ্যমানত্বম্॥ ১০৫॥১॥,
ভাষ্যানুবাদ।—ইতঃপূর্ব্বে প্রাণকে ‘সত্য’ বলা হইয়াছে; তাহার পর, প্রাণ-সমূহের যে সমস্ত উপনিষৎ বা রহস্যাত্মক নাম আছে, ব্রহ্মোপনিষৎ- বর্ণনাপ্রসঙ্গে সে সমস্তও ব্যাখ্যাত হইয়াছে—“এতে তে প্রাণাঃ” ইতি। সেই প্রাণ-সমূহের স্বরূপ কি প্রকার, এবং তাহাদের সত্যতাই বা কি প্রকারে উপপন্ন হয়, তাহা বলা আবশ্যক হইয়াছে; এই জন্য এখানে, যে উপাধি নিরসনপূর্ব্বক ‘নেতি নেতি’ করিয়া ব্রহ্মের প্রকৃত তত্ত্ব নিরূপণ করা শ্রুতির অভিপ্রেত, আরোপিত কার্য্য-করণভাবে(দেহেন্দ্রিয়রূপে) পরিণত সেই সত্য- সংজ্ঞক পঞ্চভূতের স্বরূপাবধারণার্থ এই তৃতীয় ব্রাহ্মণ আরব্ধ হইতেছে—
ব্রহ্মের দুইটি রূপ; তন্মধ্যে একটি রূপ মূর্তনামে প্রসিদ্ধ—মরণশীল এবং পঞ্চ- ভূতজনিত দেহেন্দ্রিয়সম্বদ্ধ, আর অপর রূপটি অমূর্ত্ত-নামক অমরণশীল এবং মূর্ত্ত- বাসনাত্মক; তিনিই সর্ব্বজ্ঞ সর্ব্বশক্তি ও সোপাখ্য অর্থাৎ শব্দগম্য বা বর্ণনার যোগ্য হন, এবং ক্রিয়া কারক ও ফলাত্মক সর্ব্ববিধ ব্যবহারের গোচরীভূত হন; তত্ত্বজ্ঞানের বিষয়ীভূত সেই ব্রহ্মই আবার উপাধিকৃত সর্ব্বপ্রকার বৈচিত্র্যবিহীন;
-৫৭৭
জরামরণবজ্জিত ও সর্ব্বভয়নিস্তারক এবং বাক্য-মনেরও অগোচর হন; অদ্বৈত বা নির্বিশেষ বলিয়া তিনিই ‘নেতি নেতি’ বাক্যে নির্দিষ্ট হইয়াছেন। তাহাতেও আবার এখানে বিশেষ এই যে, ‘নেতি নেতি’ কথায় যাহা যাহা পরিত্যাগ করিয়া শুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপ নির্দেশ করিতে হইবে, ইহাই সেই দুইটি পরিত্যাজ্য বিষয়। ‘বাব’ শব্দের অর্থ—অবধারণ বা নিশ্চয়; সুতরাং অর্থ হইতেছে যে, ব্রহ্মের পারমার্থিক রূপ কেবল দুইটি,(কম বেশী নহে)। অরূপ(নিরাকার) ব্রহ্মও অবিদ্যাসমারোপিত যে দুইটি বস্তু দ্বারা রূপিত—প্রকটীকৃত হন, এখানে তাহারই নাম—রূপ। সেই দুইটি রূপ কি কি?—মূর্ত ও অমূর্ত। ‘এব’ শব্দে অবধারিত হইতেছে যে, এতদন্তর্ভূত বিশেষণসম্পন্ন রূপ মূর্তামূর্তভেদে কেবলই দুইটি,(ইহার অধিকও নয়, কমও নয়)। মূর্ত ও অমূর্ত রূপ দুইটির পৃথক্ পৃথক্ সেই বিশেষণগুলি কি কি, তাহা বলা হইতেছে—মর্ত্য ও অমৃত, স্থিত ও যৎ, এবং সৎ ও ত্যৎ। তন্মধ্যে মর্ত্য অর্থ—মরণশীল; অমৃত অর্থ—মর্ত্যের বিপরীত—মরণরহিত; স্থিত অর্থ—পরিচ্ছিন্ন—যাহা গমন করিয়া স্থিতি লাভ করে, আর যৎ অর্থ—যাহা গমন করে, তাহাই যং—ব্যাপক অপরিচ্ছিন্ন—ঠিক স্থিতের বিপরীতস্বভাব; সৎ অর্থ—অপর সমস্ত পদার্থে যাহা নাই, এরূপ অসাধারণ গুণযুক্ত; আর ত্যৎ অর্থ—সতের বিপরীত, অর্থাৎ যিনি সর্ব্বদাই ‘ত্যৎ’ বলিয়া পরোক্ষভাবে ব্যবহার- যোগ্য,(তাহা ত্যৎ) ॥ ১০৫ ॥ ১ ॥ ৪৭৮
তদেতমূর্ত্তং যদন্যদ্বায়োশ্চান্তরিক্ষাচ্চৈতন্মর্ত্যমেতৎ স্থিত- মেতৎ সৎ, তস্যৈতস্য মূর্ত্তস্যৈতস্য মর্ত্যস্যৈতস্য স্থিতস্যৈতস্য সত এষ রসো য এষ তপতি, সতো হোষ রসঃ ॥ ১০৬ ॥ ২॥
সরলার্থঃ।—[ যৎ পূর্ব্বং বিশেষণচতুষ্টয়বিশিষ্টং মূর্ত্তং অমূর্ত্তং চ প্রোক্তং, তয়োর্ব্বিশেষণানি বিভজ্য দর্শয়তি—“তদেতৎ” ইত্যাদিনা।]
তৎ(পূর্ব্বোক্তং) মূর্ত্তং(মূর্তরূপম্) এতৎ।[এতৎ কিম্?] বায়োঃ চ অন্তরিক্ষাৎ চ যৎ অন্যৎ(ভিন্নং ভূতত্রয়ম্), এতৎ(ভূতত্রয়াত্মকং রূপং) মর্ত্যং (মরণধৰ্ম্মকং), এতৎ স্থিতং, এতৎ সৎ,[এতৎ সর্ব্বং প্রাগেব কৃতব্যাখ্যানম্]; তস্য এতস্য মূর্ত্তস্য, এতস্য মর্ত্যস্য, এতস্য স্থিতস্য, এতস্য সতঃ এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) রসঃ(সারঃ), যঃ এষঃ(সূর্য্যঃ) তপতি(তাপং দদাতি); হি(যতঃ) এষঃ (সূর্য্যঃ) সতঃ(সদ্রূপস্য ভূতত্রয়স্য) রসঃ(সারঃ) ॥ ১০৬॥২॥
মূলানুবাদ।—তাহাই এই মূর্ত্তরূপ, যাহা বায়ু ও আকাশ
হইতে ভিন্ন, অর্থাৎ বায়ু ও আকাশ ভিন্ন পৃথিব্যাদি ভূতত্রয় হইতেছে —ব্রহ্মের মূর্ত্ত রূপ। এই ভূতত্রয়াত্মক মূর্ত্ত রূপই মর্ত্য(মরণশীল), ইহাই স্থিত এবং ইহাই সৎ; এই মূর্ত্যের, এই মর্ত্যের, এই স্থিতের এবং এই সতের ইনিই রস অর্থাৎ সার পদার্থ, যিনি এই তাপ দিতেছেন; কারণ, এই সূর্য্যই হইতেছেন সতের—পৃথিব্যাদি ভূতত্রয়ের রস বা সারভূত ॥ ১০৬ ॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্র চতুষ্টয়বিশেষণবিশিষ্টং মূর্ত্তং, তথা অমূর্ত্তঞ্চ। তত্র কানি মূর্ত্তবিশেষণানি, কানি চেতরাণীতি বিভজ্যন্তে। তদেতৎ মূর্ত্তং—মূর্ছিতা- বয়বম্ ইতরেতরানুপ্রবিষ্টাবয়বং ঘনং সংহতমিত্যর্থঃ। কিং তৎ? যদন্যৎ; কম্মাদন্যৎ? বায়োশ্চ অন্তরিক্ষাচ্চ ভূতদ্বয়াৎ—পরিশেষাৎ পৃথিব্যাদিভূতত্রয়ম্; এতমর্ত্ত্যম্—যদেতৎ মূর্ত্তাখ্যং ভূতত্রয়ম্, ইদং মর্ত্ত্যং মরণধৰ্ম্মি। কম্মাৎ? যস্মাৎ স্থিতমেতৎ; পরিচ্ছিন্নং হি অর্থান্তরেণ সম্প্রযুজ্যমানং বিরুধ্যতে—যথা ঘটঃ স্তম্ভকুড্যাদিনা; তথা মূর্ত্তং, স্থিতং পরিচ্ছিন্নমর্থান্তরসম্বন্ধি, ততোহর্থান্তরবিরোধাৎ মর্ত্ত্যম্; এতৎ সৎ বিশেষ্যমাণাসাধারণধর্মবৎ; তস্মাদ্ধি পরিচ্ছিন্নম্, পরিচ্ছিন্নত্বাৎ মর্ত্ত্যম্, অতো মুর্ত্তম্; মুর্ত্তত্বাদ্বা মর্ত্ত্যৎ, মর্ত্ত্যত্বাৎ স্থিতম্, স্থিতত্বাৎ সৎ; অতোহন্যোদ্যা- ব্যভিচারাৎ চতুর্ণাং ধর্ম্মাণাং যথেষ্টং বিশেষণবিশেষ্যভাবো হেতু-হেতুমদ্ভাবশ্চ দর্শয়িতব্যঃ। সর্ব্বথাপি তু ভূতত্রয়ং চতুষ্টয়বিশেষণবিশিষ্টং মূর্ত্তং রূপং ব্রহ্মণঃ। ১
তত্র চতুর্ণামেকস্মিন্ গৃহীতে বিশেষণে ইতরদ্ গৃহীতমেব বিশেষণম্, ইত্যাহ —তস্যৈতস্য মূর্ত্তস্য, এতস্য মর্ত্যস্য, এতস্য স্থিতস্য, এতস্য সতঃ—চতুষ্টয়বিশেষণস্য ভূতত্রয়স্যেত্যর্থঃ—এষ রসঃ সার ইত্যর্থঃ। ত্রয়াণাৎ হি ভূতানাং সারিষ্ঠঃ সবিতা; এতৎসারাণি ত্রীণি ভূতানি, যত এতৎকৃতবিভজ্যমানরূপবিশেষণানি ভবন্তি। আধিদৈবিকস্য কার্য্যস্যৈতদ্ রূপম্—যৎ সবিতা—যদেতন্মণ্ডলং তপতি; সতো ভূতত্রয়স্য হি যম্মাদেষ রস ইত্যেতদ্ গৃহ্যতে; মূর্তো হ্যেসবিতা তপতি, সারিষ্ঠশ্চ। যতু আধিদৈবিকং করণং মণ্ডলস্যাভ্যন্তরম্, তদ্ বক্ষ্যামঃ ॥ ১০৬॥২॥ টীকা।—তত্রেতি নির্ধারণাখা সপ্তমী, তত্র প্রত্যেকং মূর্তামূর্তচতুষ্টয়বিশেষণবত্ত্বে সতীতি যাবৎ। কথং স্থিতত্বে মর্ত্যত্বং, তত্রাহ—পরিচ্ছিন্নং হীতি। তদেব দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি—যথেত্যা- দিনা। অতো মর্ত্যত্বাৎ মূর্তমিতি শেষঃ। মূর্তত্বমর্ত্যত্বয়োরন্যোন্যহেতুহেতুমস্তাবং দ্যোতয়িতুং বা-শব্দঃ। কথং পুনশ্চতুর্ষু বিশেষণবিশেষ্যভাবো হেতু-হেতুমস্তাবশ্চ নিশ্চেতবাস্তত্রাহ— অন্যোন্যেতি। রূপরূপিভাবস্যাপি ব্যবস্থাভাবমাশঙ্ক্যাহ—সর্ব্বথাপীতি। তৈলচক্ষুষ রস ইত্যেব বক্বো, কিমিতি মূর্চ্ছস্যেত্যাদিনা বিশেষচতুষ্টয়মনুষ্ঠাতে? তত্রাহ—
তত্রেতি। সারত্বং সাধয়তি-এয়াণাং হীতি। তত্র প্রতিজ্ঞামনুদ্য হেতুমাহ-এতদিতি। এতেন সবিতৃমওলেন কৃতানি বিভজ্যমানান্যসঙ্কীর্ণানি কৃষ্ণং শুক্লং লোহিতমিত্যেতানি রূপাণি বিশেষণানি যেষাং পৃথিব্যপ্তেজসাং, তানি তথা। ততো ভূতত্রয়কার্যমধ্যে সবিতৃমণ্ডলস্য প্রাধান্যমিত্যর্থঃ। এষ তপতীত্যস্যার্থমাহ-আধিদৈবিকস্যেতি। হেতুবাক্যমাদায় তস্য তাৎপর্য্যমাহ-সত ইতি। মণ্ডলমেবৈতচ্ছব্দার্থঃ। মণ্ডলপরিগ্রহে হেতুমাহ-মুর্তো হীতি। মূর্তগ্রহণস্যোপলক্ষণত্বাচ্চতুর্ণামন্বয়ো হেত্বর্থঃ। অতশ্চ মণ্ডলাত্মা সবিতা ভূতত্রয়কার্যমধ্যে ভবতি প্রধানং; কার্যকরণয়োরৈকরূপ্যস্যৌৎসর্গিকত্বাদিত্যাহ-সারিষ্ঠশ্চেতি। মণ্ডলং চেদাধিদৈবিকং কাৰ্য্যং, কিং পুনস্তথাবিধং করণমিতি? তদাহ-যত্ত্বিতি। ১০৬।২।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বোক্ত মূর্ত্ত ও অমূর্ত্ত উভয়ই চারিটি বিশেষণে বিশিষ্ট; তন্মধ্যে কোন্গুলি মূর্ত্তির বিশেষণ, আর কোন্গুলি অমূর্ত্তির বিশেষণ, তাহা বিভাগ করিয়া দিতেছেন। ইহা হইতেছে সেই মূর্ত্ত—যাহা অবয়বে উপচিত—পরস্পর সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ আকৃতিসম্পন্ন সংহত পদার্থ। তাহা কি? যাহা অন্য; কিসের অন্য? বায়ু ও আকাশ এই ভূতদ্বয় হইতে অন্য, অর্থাৎ আকাশ ও বায়ু বাদ দিয়া অবশিষ্ট ভূতত্রয়—পৃথিবী, জল ও তেজ। ইহা মর্ত্য—এই যে মূর্ত্তসংজ্ঞক ভূতত্রয়, ইহারা মর্ত্য —মরণশীল; কারণ? যেহেতু ইহারা স্থিত ও পরিচ্ছিন্ন বা পরিমিত। পরিচ্ছিন্ন বস্তুমাত্রই অপর পরিচ্ছিন্ন বস্তুদ্বারা বাধা প্রাপ্ত হইয়া থাকে; যেমন একটি ঘট স্তম্ভ- প্রভৃতি অপর পদার্থ দ্বারা[বাধা প্রাপ্ত হয়], তেমনি মূর্ত্ত পদার্থও। যেহেতু ইহা স্থিত অর্থাৎ পরিচ্ছিন্ন, সেই হেতু অপর সর্ব্বপদার্থের সহিত বিরুদ্ধ; বিরুদ্ধ বলিয়াই মর্ত্য(বিনাশশীল)। ইহাই সৎ অর্থাৎ যাহা অন্যত্র নাই, ঈদৃশ গুণবিশেষযুক্ত; সেই হেতুই পরিচ্ছিন্ন; পরিচ্ছিন্ন বলিয়াই মর্ত্য; এই জন্যই উহারা মূর্ত্ত; অথবা মূর্ত্ত বলিয়াই মর্ত্য, মর্ত্যত্বহেতু স্থিত, স্থিতত্ব নিবন্ধন সৎ। অতএব পরস্পর পরস্পরের সহিত নিয়ত সম্বন্ধ থাকায় উক্ত মূর্ত্তাদি চারিটি বিশেষণের বিশেষণ- বিশেষ্যভাব ও হেতু-হেতুমদ্ভাব(সাধ্য-সাধনভাব) ইচ্ছানুসারেও গ্রহণ করিতে পারা যায়। যথোক্ত চারি প্রকার বিশেষণবিশিষ্ট উক্ত ভূতত্রয়ই ব্রহ্মের মূর্ত্ত রূপ।
উক্ত বিশেষণ চতুষ্টয়ের মধ্যে, যে কোন একটি বিশেষণ গ্রহণ করিলেই অপর বিশেষণগুলি গ্রহণ করা হয়, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন-সেই এই মূর্তের, এই মর্ত্যের, এই স্থিতের, এই সতের, অর্থাৎ চতুর্বিধ বিশেষণ-বিশিষ্ট উক্ত ভূতত্রয়ের ইহা(সূর্য্য) হইতেছে-রস অর্থাৎ সার; কেননা, সূর্য্যদেবই ভূতত্রয়ের সারতম পদার্থ। আধিদৈবিক দেহাকারে পরিণত কার্য্যের ইহাই যথার্থ স্বরূপ- যিনি এই সবিতা(সূর্য্যমণ্ডল); যিনি এই সৌরমণ্ডলরূপে তাপ দিতেছেন; কারণ, এই মণ্ডলাধিষ্ঠাতাই সতের-ভূতত্রয়ের রস বলিয়া পরিগৃহীত হইয়া
থাকেন; কারণ, মূর্ত্তরূপ এই সূর্য্যই তাপ দিতেছেন এবং সকলের শ্রেষ্ঠতম পদার্থও বটে। আর যাহা আধিদৈবিক করণ—মণ্ডলের মধ্যবর্তী, তাহার কথা পরে বলিব ॥ ১০৬॥ ২॥
অথামূর্ত্তং—বায়ুশ্চান্তরিক্ষং চৈতদমৃতমেতদ্ যদেতৎ ত্যৎ, তস্যৈতস্যামূর্ত্তস্যৈতস্যামৃতস্যৈতস্য যত এতস্য ত্যস্যৈষ রসো য এষ এতস্মিন্ মণ্ডলে পুরুষস্ত্যস্য হোষ রস ইত্যধিদৈবতম্ ॥ ১০৭ ॥ ৩॥
সরলার্থঃ।—অথ(অতঃপরম্) অমূর্ত্তং(রূপম্)[উচ্যতে]—বায়ুশ্চ অন্তরিক্ষং চ[অমূর্ত্তং রূপম্]; এতৎ(বায়ুরিক্ষাত্মকং ভূতদ্বয়ং) অমৃতং (অমরণধর্ম্মকম্), এতৎ যৎ, এতৎ ত্যৎ। তস্য(পূর্ব্বোক্তস্য) এতস্য অমূর্ত্তস্য, এতস্য অমৃতস্য, এতস্য যতঃ, এতস্য ত্যস্য এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) রসঃ।[কঃ?] যঃ এষঃ এতস্মিন্ মণ্ডলে(সূর্য্যমণ্ডলে অধিষ্ঠিতঃ) পুরুষঃ। হি(যস্মাৎ) ত্যস্য(সর্ব্বদা পরোক্ষভূতস্য অমূর্ত্তস্য) এষঃ(মণ্ডলাধিষ্ঠিতঃ পুরুষঃ) রসঃ(সারভূতঃ), ইতি অধিদৈবতং(দেবতাত্মকং রূপমিত্যর্থঃ)। ১০৭॥৩॥
মূলানুবাদ?—অতঃপর ব্রহ্মের অমূর্ত্ত রূপ কথিত হইতেছে —বায়ু ও আকাশ[ব্রহ্মের অমূর্ত্ত রূপ]। ইহাই অমৃত(অবিনাশী) ইহাই যৎ, ইহাই ত্যৎ(সর্ব্বদা পরোক্ষাত্মক)। সেই এই অমূর্ত্তের—এই অমৃতের—এই যতের এবং এই ত্যতের ইহা হইতেছে রস অর্থাৎ সারভূত পদার্থ, যাহা এই সূর্য্যমণ্ডলে অধিষ্ঠিত পুরুষ(দেবতা)। ইহাই ‘ত্যৎ’-সংজ্ঞক রূপের রস; ইহা হইতেছে—অধিদৈবত অর্থাৎ মণ্ডলাধি- ষ্ঠাতৃদেবতাত্মক রূপ॥ ১০৭॥৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথামূর্ত্তম্—অথ অধুনা অমূর্ত্তমুচ্যতে—বায়ুশ্চ অন্ত- রিক্ষং চ—যৎ পরিশেষিতং ভূতদ্বয়ম্, এতদমৃতম্ অমূর্ত্তত্বাৎ, অস্থিতম্ অতোহবিরুধ্য- মানং কেনচিৎ, অমৃতম্ অমরণধর্ম্মি; এতৎ যৎ স্থিতবিপরীতং, ব্যাপি অপরি- চ্ছিন্নম্; যস্মাদ এতদ্ অন্যেভ্যোঽপ্রবিভজ্যমানবিশেষম্, অতঃ ত্যৎ, ত্যদিতি পরোক্ষাভিধানাইমেব পূর্ব্ববৎ। ১
তস্যৈতস্য অমূর্ত্তস্য এতস্যামৃতস্য এতস্য যতঃ এতস্য ত্যস্য-চতুষ্টয়বিশেষণ- শ্যামূর্ত্তস্য এষ’ রসঃ। কোহসৌ? স্ব এষ এতস্মিন্ মণ্ডলে পুরুষঃ-করণাত্মকো হিরণ্যগর্ভঃ প্রাণ ইত্যভিধীয়তে যঃ, স এষঃ অমূর্ত্তস্য ভূতদ্বয়স্য রসঃ পূর্ব্ববৎ সারিষ্ঠঃ।
৫৮১
এতৎ-পুরুষসারঞ্চ অমূর্ত্তং ভূতদ্বয়ম্—হৈরণ্যগর্ভলিঙ্গারম্ভায় হি ভূতদ্বয়াভিব্যক্তি- রব্যাকৃতাৎ; তস্মাৎ তাদর্থ্যাৎ তৎসারং ভূতদ্বয়ম্। ত্যস্য হোষ রসঃ—যস্মাদ যো মণ্ডলস্থঃ পুরুষো মণ্ডলবৎ ন গৃহ্যতে সারশ্চ ভূতদ্বয়স্য, তস্মাদস্তি মণ্ডলস্থস্য পুরুষস্য ভূতদ্বয়স্য চ সাধর্ম্যম্। তস্মাদযুক্তং প্রসিদ্ধবদ্ধেতুপাদানম্—‘ত্যস্য হোষ রসঃ’ ইতি। ২
রসঃ কারণং হিরণ্যগর্ভং-বিজ্ঞানাত্মা চেতন ইতি কেচিৎ। তত্র চ কিল হিরণ্য- গর্ভবিজ্ঞানাত্মনঃ কৰ্ম্ম বায়ুন্তরিক্ষয়োঃ প্রয়োক্ত; তৎকৰ্ম্ম বাযুন্তরিক্ষাধারং সৎ অন্যেষাৎ ভূতানাং প্রয়োক্ত ভবতি; তেন স্বকর্মণা বায়ুন্তরিক্ষয়োঃ প্রয়োক্তেতি তয়োঃ রসঃ কারণমুচ্যত ইতি। তন্ন, মূর্তরসেন অতুল্যত্বাৎ; মূর্তস্য তু ভূতত্রয়স্য রসঃ মুর্তমেব মণ্ডলং দৃষ্টং ভূতত্রয়-সমানজাতীরম্, ন চেতনঃ; তথা অমুর্তয়োরপি ভূতয়োস্তৎসমানজাতীয়েনৈব অমুর্তরসেন যুক্তং ভবিতুম্; বাক্যপ্রবৃত্তেস্তল্যত্বাৎ,- যথা হি মূর্তামূর্তে চতুষ্টয়ধৰ্ম্মবতী বিভজ্যেতে, তথা রস-রসবতোরপি মূর্তামূর্তয়ো- স্তুল্যেনৈব ন্যায়েন যুক্তো বিভাগঃ; ন চার্দ্ধবৈশসম্। ৩
মূর্তরসেহপি মণ্ডলাধিপশ্চেতনো বিবক্ষ্যত ইতি চেৎ, অত্যল্পমিদমুচ্যতে, সর্ব্বত্রৈব তু মূর্তামূর্তয়োব্রহ্মরূপেণ বিবক্ষিতত্বাৎ। পুরুষশব্দোহচেতনোহনুপপন্ন ইতি চেৎ; ন, পক্ষপুচ্ছাদিবিশিষ্টস্যৈব লিঙ্গস্য পুরুষশব্দদর্শনাৎ, “ন বা ইত্থং সন্তঃ শক্ষ্যামঃ প্রজাঃ প্রজনয়িতুম্, ইমান্ সপ্ত পুরুষানেকং পুরুষং করবামেতি, ত- ‘এতান্ সপ্ত পুরুষানেকং পুরুষমকুর্ব্বন্” ইত্যাদৌ অন্নরসময়াদিষু চ শ্রুত্যন্তরেষু পুরুষশব্দপ্রয়োগাৎ। ইত্যধিদৈবতমিতি উক্তোপসংহারঃ অধ্যাত্মবিভাগো- ক্ত্যর্থঃ ॥ ১০৭ ॥ ৩॥
টীকা।—আধিদৈবিকং মূর্ত্তমভিধায় তাদৃগেবামূর্ত্তং প্রতীকোপাদানপূর্ব্বকং স্ফুটয়তি— অথেত্যাদিনা। অমূর্ত্তমুভয়ত্র হেতুত্বেন সংবধ্যতে। অপরিচ্ছিন্নত্বমবিরোধে হেতুঃ। অমূর্ত্তত্বা- দীনাং মিথো বিশেষণবিশেষ্যভাবো হেতুহেতুমদ্ভাবশ্চ যথেষ্টং দ্রষ্টব্যঃ, ইত্যাহ—পূর্ব্ববদিতি। পুনরুক্তিরপি পূর্ব্ববৎ। ১
য এব ইত্যাদি প্রতীকগ্রহণং, তস্য ব্যাখ্যানং করণাত্মক ইত্যাদি। যথা ভূতত্রয়স্য মণ্ডলং সারিষ্ঠমুক্তং, তদ্বদিত্যাহ-পূর্ববদিতি। সারিষ্ঠত্বমনুদ্য হেতুমাহ-এতদিতি। তাদর্থ্যাদ্ভূতদ্বয়স্য। ভূতত্রয়োপসর্জনস্য স্বয়ং প্রধানস্য হিরণ্যগর্ভাবস্তার্থত্বাদিতি যাবৎ। ভূতদ্বয়ং ভূতত্রয়োপসর্জন- মিতি শেষঃ। হেতুমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-তস্য হীতি। পুরুষশব্দাদুপরিষ্টাৎ সশব্দো দ্রষ্টব্যঃ। অমূর্ত্তত্বাদিবিশেষণচতুষ্টয়বৈশিষ্ট্যং সাধর্ম্যম্। তৎফলমাহ-তস্মাদিতি। ২
স্বমতমুক্ত। ভর্তৃপ্রপঞ্চমতমাহ-রস ইতি। ত্যস্য ইত্যাদৌ রসশব্দেন ভূতদ্বয়কারণমুক্তং, ন চ তচ্চেতনাদন্যৎ, ন চ জীবঃ; তথাহসামর্থ্যাৎ, নাপি পরং কৌটস্থ্যাৎ। তস্মাচ্চেতনঃ
সূত্রক্ষেত্রজ্ঞস্তথেত্যর্থঃ। সোহপি কথং ভূতদ্বয়কারণমত আহ-তত্রেতি। পরকীয়পক্ষঃ সপ্তমার্থঃ। তৎকর্মণস্তত্রাসাধারণ্যমসম্পতিপন্নমিত্যভিপ্রেত্য কিলেত্যুক্তম্। যথাহুঃ-যো হেতস্মিন্মণ্ডলে বিজ্ঞানাত্মৈষ খল্ববিদ্যাকৰ্ম্মপূর্ব্বপ্রজ্ঞাপরিষ্কৃতো বিজ্ঞানাত্মত্বমাপদ্যতে, তদেতৎ- কর্মরূপং বিজ্ঞানাত্মনস্তদ্বাযুস্তরিক্ষপ্রযোক্ত ভবতীতি। ননু হিরণ্যগর্ভদেহস্য পঞ্চভূতাত্মকত্বাদ- ভূতদ্বয়োৎপত্তাবপীতরভূতোৎপত্তিং বিনা কুতোহস্য ভোগঃ সিধ্যত্যত আহ-তৎকর্মেতি। বায়ুস্তরিক্ষাধারং তদ্রূপং পরিণতমিতি যাবৎ। বায়ুন্তরিক্ষয়োর্ভূতত্রয়োপসর্জনয়োরিতি শেষঃ। প্রয়োক্তা হিরণ্যগর্ভবিজ্ঞানাত্মা।
নিরাকরোতি-তন্নেতি। কথং মূর্তরসেন সহ যথোক্তামূর্তরসস্যাতুল্যতেত্যাশঙ্ক্যাহ-মূর্ত- স্যেতি। অমূর্তশ্চাসৌ রসশ্চেত্যমূর্তরসন্তেনেতি যাবৎ। অমূর্তরসস্য চেতনত্বে তু রসয়োর্বৈজাত্যং স্যাদিতি ভাবঃ। অস্তু তয়োর্বৈজাত্যং, নেত্যাহ-যথা হীতি। মূর্তং মর্ত্যং স্থিতং সদিতি মূর্তস্য ধর্মচতুষ্টয়ম্, অমূর্তমমৃতং ব্যাপি ত্যদিত্যমূর্তস্থ বিভজনমসঙ্কীর্ণত্বেন প্রদর্শনং, যথা রসবতো- মূর্তামূর্তয়োস্তুল্যত্বমুক্তং, তথা রসয়োরপি তয়োত্তল্যেনৈব প্রকারেণ প্রদর্শনমুচিতং, নত্বমূর্তরস- শ্চেতনো মূর্তরসন্তচেতন ইতি যুক্তো বিভাগঃ, অর্দ্ধজরতীয়স্যাপ্রামাণিকত্বাদিত্যাহ-তথেতি। ৩
অর্দ্ধবৈশসং পরিহর্তুং শঙ্কতে-অমূর্তরসোহপীতি। অমূর্তরসবমূর্তরসশব্দেনাপি চেতনস্যৈব ব্রহ্মণো মণ্ডলাপন্নস্থ্য গ্রহণমিত্যেতদ দূষয়তি-অত্যল্পমিতি। মণ্ডলস্য চেতনকার্য্যতয়া চেতনত্বে সর্ব্বস্থ্য তৎকাৰ্য্যতয়া তন্মাত্রত্বাদ্রসয়োশ্চেতনতেভি বিশেষণানর্থক্যমিত্যর্থঃ। মণ্ডলাধারস্থ্য চেতনত্বং পুরুষশব্দশ্রুতিবশাদেষ্টব্যমিতি শঙ্কতে-পুরুষশব্দ ইতি। অনুপপত্তিং পরিহরতি-নেত্যাদিনা। তদেব ব্যাকরোতি-ন বা ইতি। ইখং বিভক্তাঃ সন্তো নৈব শক্ষ্যামো ব্যবহারং প্রজনয়িতু- মিত্যালোচ্য ত্বচক্ষুঃশ্রোত্রজিহ্বাঘ্রাণবাঘ্ননোরূপান্ ইমান্ সপ্ত পুরুষানেকং পুরুষং সংহতং লিঙ্গং করবামেতি চ নিশ্চিত্যামী প্রাণাঃ সপ্ত পুরুষানুক্তানেকং পুরুষং লিঙ্গাত্মানং কৃতবস্ত ইত্যর্থঃ। আদিশব্দেন লৌকিকমপি দর্শনং সংগৃহ্যতে। শ্রুত্যন্তরং তৈত্তিরীয়কম্। পুরুষশব্দপ্রয়োগঃ “স বা এষ পুরুষোন্মরসময়ঃ” ইত্যাদিঃ। পরকীয়ং ব্যাখ্যানং প্রত্যাখ্যান প্রকৃতং শ্রুতিব্যাখ্যান- মনুবর্তয়তি-ইত্যধিদৈবতমিতি। ১০৭।৩।
ভাষ্যানুবাদ।—“অথ অমূর্তম্”—এখন অমূর্ত রূপের কথা বলা হইতেছে —বায়ু ও অন্তরিক্ষ(আকাশ) এই যে দুইটি ভূত অবশিষ্ট রহিয়াছে, ইহারা অমৃত; যেহেতু, ইহারা অমূর্ত; এবং ইহারাই অবস্থিত অর্থাৎ কোথাও অবস্থিত নয়—সাবয়ব নয়; এই কারণে কাহারো সঙ্গে বিরুদ্ধ হয় না; এখানে অমৃত অর্থ —যাহা মরণশীল নয়। ইহা যৎ, অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত ‘স্থিতের’ বিপরীত—ব্যাপক— অপরিচ্ছিন্ন; যেহেতু ইহা যৎ, অর্থাৎ অন্যান্য পদার্থ হইতে ইহার বৈশিষ্ট্য পৃথক্ করিয়া ধরা যায় না, সেই হেতুই ইহা ত্যৎ; ‘ত্যৎ’ অর্থ যাহা সর্ব্বদাই পরোক্ষ বা ইন্দ্রিয়ের অগোচররূপে উল্লেখযোগ্য; এ কথা পূর্ব্বেও বলা হইয়াছে। ১
সেই এই অমূর্ত্তের—এই অমৃতের—এই ‘যতের’ ‘ত্যতের’ অর্থাৎ উক্ত প্রকার
৫৮৩
চতুর্বিধ বিশেষণবিশিষ্ট অমূর্তের ইহাই রস(সার)। ইহা কি? যাহা এই দৃশ্য- মান সৌরমণ্ডলস্থ পুরুষ—যাহা করণস্বরূপ(কার্য্যস্বরূপ নহে), হিরণ্যগর্ভ ও প্রাণ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। এই মণ্ডলস্থ সেই পুরুষই পূর্ব্ববৎ অমূর্ত ভূত- দ্বয়ের রস অর্থাৎ সারতম পদার্থ। অমূর্ত ভূত দুইটি আবার এই মণ্ডলাধিষ্ঠিত পুরুষের সারভূত; কারণ, হিরণ্যগর্ভের সূক্ষ্ম শরীর-নির্মাণের জন্যই অব্যাকৃত প্রকৃতি হইতে উক্ত ভূতদ্বয়ের অভিব্যক্তি বা আবির্ভাব হইয়া থাকে; সেই হেতু পুরুষার্থ সিদ্ধির জন্য আবির্ভূত বলিয়া এই ভূতদ্বয় তাহার সার। ইহাই ‘ত্যতের’ (নিত্য পরোক্ষের) রস বা সারভূত,—যিনি এই মণ্ডলস্থ পুরুষ। যেহেতু এই মণ্ডলস্থ পুরুষ মণ্ডলের ন্যায় প্রত্যক্ষগোচর হন না, অথচ ভূতদ্বয়ের সারভূতও বটে, সেই হেতু মণ্ডলস্থ পুরুষে উক্ত ভূতদ্বয়ের সাধর্ম্য বা ধর্মগত সাম্য আছে। অতএব ‘যেহেতু ইহা ত্যতের রস’ এইরূপ প্রসিদ্ধবৎ হেতুর উপন্যাস করা যুক্তি- সঙ্গতই হইয়াছে। ২
এস্থলে ভর্তৃপ্রপঞ্চ প্রভৃতি কেহ কেহ বলেন-রস অর্থ-কারণ, তাহাই হিরণ্য- গর্ভের আত্মা-চেতন পদার্থ। এপক্ষে হিরণ্যগর্ভাভিমানী বিজ্ঞানাত্মার, ক্রিয়াই বায়ু ও অন্তরিক্ষের প্রযোজক বা প্রেরক; তাহার সেই ক্রিয়াই বায়ু ও অন্তরিক্ষে থাকিয়া অর্থাৎ প্রথমে উৎপন্ন হইয়া অপরাপর ভূতে ক্রিয়া সমুৎপাদন করিয়া থাকে; সেইজন্য হিরণ্যগর্ভাভিমানী আত্মা স্বীয় কৰ্ম্ম দ্বারা বায়ু ও অন্তরিক্ষের প্রেরণা করেন বলিয়া তদুভয়ের রস-কারণ বলিয়া অভিহিত হন। তাঁহাদের এইরূপ কল্পনা সঙ্গত হয় না। কেননা, তাহা হইলে পূর্ব্বোক্ত মূর্ত-রসের সহিত ইহার কিছুমাত্র সাম্য থাকে না। সেখানে মূর্ত(আকৃতিবিশিষ্ট) সৌরমণ্ডলকে মূর্ত ভূতত্রয়ের রস বলিয়া কল্পনা করা হইয়াছে; সেই মণ্ডল ও ভূতত্রয় উভয়ই এক- জাতীয়-মূর্ত ও জড় পদার্থ; কিন্তু কেহই চেতন নহে; অতএব তদনুসারে অমূর্ত ভূতদ্বয়ের সম্বন্ধেও তৎসজাতীয় অমূর্ত পদার্থই রসরূপে কল্পিত হওয়া উচিত, কিন্তু তদ্বিজাতীয় চেতন পদার্থ ঐরূপে কল্পিত হওয়া সঙ্গত হয় না; কারণ, এরূপ না হইলে বাক্য-ব্যবহারেরও সমতা রক্ষা পায় না। পূর্ব্বে মূর্ত ও অমূর্তকে যে নিয়মে চতুর্বিধ গুণযোগে বিভক্ত করা হইয়াছে, তেমনি রস এবং রসবানেরও ঠিক সেই নিয়মেই বিভাগ করা যুক্তিযুক্ত হয়, কিন্তু “অর্দ্ধবৈশস” ন্যায় অর্থাৎ অর্দ্ধেক ত্যাগ করা আর অর্দ্ধেক রক্ষা করা সম্ভবপর হয় না(১)। ৩
যদি বল, পূর্ব্বে মণ্ডলকে যে, মূর্তরসরূপে কল্পনা করা হইয়াছে, সেখানেও মণ্ডলস্থ চেতনের প্রতিপাদন করাই শ্রুতির অভিপ্রেত; না, সেকথাও অতি অকিঞ্চিৎকর; কারণ, শ্রুতির সর্ব্বত্রই মূর্ত ও অমূর্ত পদার্থমাত্রকে ব্রহ্মরূপে প্রতি- পাদন করাই শ্রুতির অভিপ্রেত; সুতরাং এখানে আর বিশেষ বলিবার কি আছে? যদি বল, পুরুষ-শব্দটি অচেতনে প্রযোজ্য হইতে পারে না; না—তাহাও বলিতে পার না; কারণ, পক্ষ ও পুচ্ছাদিবিশিষ্ট লিঙ্গদেহ সম্বন্ধেও পুরুষ-শব্দের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়; যথা—‘আমরা এইরূপে পৃথক্ পৃথক্ থাকিয়া প্রজাসমুৎ- পাদনে সমর্থ হইতেছি না, অতএব এই সাতটি পুরুষকে(চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়কে) এক’ পুরুষ করিব। এইরূপ আলোচনার পর তাহারা এই সাতটি পুরুষকে(ত্বক্, চক্ষু, শ্রোত্র, জিহ্বা, ঘ্রাণ, বাক্ ও মনকে) এক পুরুষে অর্থাৎ একটি লিঙ্গশরীরে পরিণত করিল ইত্যাদি শ্রুতিতে এবং অপরাপর শ্রুতিতেও কেবল অন্ন-রসের পরিণতিভূত দেহেও পুরুষ-শব্দের প্রয়োগ দৃষ্ট হয়। “ইতি অধিদৈবতম্” বলিয়া উপসংহার করিবার উদ্দেশ্য এই যে, অতঃপর যে, কেবল আধ্যাত্মিক বিভাগের কথাই বলা হইবে, তাহা জ্ঞাপন করা ॥ ১০৭ ॥ ৩॥
অথাধ্যাত্মম্—ইদমেব মূর্ত্তং যদন্যৎ প্রাণাচ্চ যশ্চায়মন্তরাত্ম- ন্নাকাশঃ, এতন্মর্ত্যমেতৎ স্থিতমেতৎ সৎ, তস্যৈতস্য মূর্ত্তস্যৈতস্য মর্ত্যস্যৈতস্য স্থিতস্যৈতস্য সত এষ রসো যচ্চক্ষুঃ, সতো হোষ রসঃ ॥ ১০৮ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(অতঃপরম্) অধ্যাত্মং(আত্মানং—দেহম্ অধিকৃত্য প্রবৃত্তম্)[রূপম্ উচ্যতে]—ইদং(বক্ষ্যমাণম্) এব(নিশ্চয়ে) মূর্ত্তং(মূর্ত্তাখ্যং রূপম্)।[কিং তৎ?] যৎ চ প্রাণাৎ(প্রাণবায়োঃ) অন্যৎ, যশ্চ অয়ং অন্তরাত্মন্ (অন্তরাত্মনি—দেহাভ্যন্তরে) আকাশঃ(নভঃ),[তস্মাদন্যৎ শরীরোপাদানভূতং ভূতত্রয়ম্]। এতৎ(প্রাণাকাশভিন্নং ভূতত্রয়ং) মর্ত্যম্, এতৎ স্থিতম্, এতৎ সৎ। তস্য এতস্য মূর্ত্তস্য, এতস্য মর্ত্যস্য, এতস্য স্থিতস্য, এতস্য সতঃ এষঃ রসঃ(সারভূতঃ)
—যৎ চক্ষুঃ; হি(যস্মাৎ) এষঃ(এতৎ চক্ষুঃ) সতঃ(সৎসংজ্ঞকস্য মূর্ত্তস্য) রসঃ সারঃ;[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥ ১০৮॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ:-অতঃপর অধ্যাত্ম-দেহ-সম্বন্ধী[মূর্ত্ত-রূপ. কথিত হইতেছে]-ইহাই মূর্ত্ত রূপ-যাহা প্রাণবায়ু ও দেহাভ্যন্তরস্থ আকাশ হইতে ভিন্ন-দেহোৎপাদক ভূতত্রয়। ইহাই মর্ত্য, ইহাই স্থিত, ইহাই সৎ; সেই এই মূর্ত্যের সেই এই মর্ত্যের সেই এই স্থিতের এবং সেই এই সতের ইহাই রস অর্থাৎ সারভূত, যাহার নাম চক্ষুঃ’; কারণ, ইহাই অধ্যাত্ম সতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বস্তু ॥ ১০৮॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ অধুনা অধ্যাত্মং মূর্তামূর্ত্তয়োর্বিভাগ উচ্যতে— কিং তৎ মূর্ত্তম্? ইদমেব; কিঞ্চেদম্? যদন্যৎ প্রাণাচ্চ বায়োঃ, যশ্চায়ম্ অন্তঃ অভ্যন্তরে আত্মন্ আত্মন্যাকাশঃ খং, শরীরস্থশ্চ যঃ প্রাণঃ—এতদ্দৃয়ং বর্জ্জয়িত্বা যদন্যৎ শরীরারম্ভকং ভূতত্রয়ম্, এতন্মর্ত্যমিত্যাদি সমানমন্যৎ পূর্ব্বেণ।
এতস্য সতো হোষ রসঃ—যচ্চক্ষুরিতি; আধ্যাত্মিকস্য শরীরারম্ভকস্য কার্য্যস্যৈষ রসঃ—সারঃ; তেন হি সারেণ সারবদিদং শরীরং সমস্তম্,—যথা অধিদৈবতমা- দিত্যমণ্ডলেন; প্রাথম্যাচ্চ—চক্ষুষী এব প্রথমে সম্ভবত ইতি, “তেজো রসো নিরবর্ত্ততাগ্নিঃ” ইতি লিঙ্গাৎ; তৈজসংহি চক্ষুঃ; এতৎসারমাধ্যাত্মিকং ভূতত্রয়ম্; সতো হোষ রস ইতি মূর্ত্তত্ব-সারত্বে হেত্বর্থঃ ॥ ১০৮ ॥ ৪ ॥
টীকা।—চক্ষুষো রসত্বং প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বকং প্রকটয়তি—আধ্যাত্মিকস্যেত্যাদিনা। চক্ষুষঃ সারত্বে শরীরাবয়বেষু প্রাথমিকং হেত্বন্তরমাহ—প্রাথম্যাচ্চেতি। তত্র প্রমাণমাহ—চক্ষুষী এবেতি। সম্ভবতো জায়মানস্য জন্তোশ্চক্ষুষী এব প্রথমে প্রধানে সম্ভবতো জায়েতে। “শশ্বদ্ধ বৈ রেতসঃ সিক্তস্য চক্ষুষী এব প্রথমে সম্ভবতঃ” ইতি হি ব্রাহ্মণমিত্যর্থঃ। চক্ষুষঃ সারত্বে হেত্বন্তরমাহ—তেজ ইতি। শরীরমাত্রস্যাবিশেষেণ নিষ্পাদকং, তত্র সর্ব্বত্র সন্নিহিতমপি তেজো বিশেষতশ্চক্ষুষি স্থিতম্। “আদিত্যশ্চক্ষুর্তৃত্বাহক্ষিণী প্রাবিশৎ” ইতি শ্রুতেঃ। অতস্তেজঃশব্দপর্যায়-রসশব্দস্য চক্ষুষি প্রবৃত্তিরবিরুদ্ধেতি ভাবঃ। ইতশ্চ তেজঃশব্দপর্যায়ো রসশব্দশ্চক্ষুষি সম্ভবতীত্যাহ— তৈজসং হীতি। প্রতিজ্ঞার্থমুপসংহরতি—এতৎসারমিতি। হেতুমবতার্য্য তস্যার্থমাহ—সতো হীতি। চক্ষুষো মূর্তত্বান্ মূর্তভূতত্রয়কার্য্যত্বং যুক্তং, সাধর্ম্যাদ্দেহাবয়বেষু প্রাধান্যাচ্চ তস্যাধ্যাত্মিকভূতত্রয়সারত্বসিদ্ধিরিত্যর্থঃ। ১০৮।৪।
ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর মূর্ত্ত ও অমূর্ত্তের আধ্যাত্মিক বিভাগ কথিত হইতেছে, অর্থাৎ দেহমধ্যে মূর্ত্তামূর্ত্তবিভাগ কি প্রকার, তাহা বর্ণিত হইতেছে— সেই অধ্যাত্ম মূর্ত্ত বস্তুটি কি? ইহাই। ইহাই বা কি?[উত্তর—] এই যে, প্রাণ-
বায়ু এবং এই যে, দেহাভ্যন্তরস্থ অবকাশাত্মক আকাশ, এই দুইয়ের অন্য অর্থাৎ দেহস্থ আকাশ ও প্রাণরূপী বায়ুর অতিরিক্ত অবশিষ্ট যে শরীরোপাদানভূত- ভূতত্রয়(পৃথিবী, জল ও তেজ), ইহাই মর্ত্য রূপ, ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ।
এই সতের অর্থাৎ সৎ-নামক মূর্তের ইহাই হইতেছে রস—যাহা চক্ষুঃ। এই চক্ষুই শরীরোৎপাদক আধ্যাত্মিক ভূতত্রয়ের সার বা উৎকৃষ্ট ভাগ; কারণ, অধিদৈবত ভূতত্রয় যেমন আদিত্যমণ্ডল দ্বারা সারবান্, তেমনি এই চক্ষুঃ-- স্বরূপ সারবস্তু দ্বারাই এই সমস্ত শরীর সারবান্। চক্ষুর প্রথমোৎপন্নত্বও সারত্বের অপর কারণ; ‘সারভূত তেজ অগ্নিরূপে নিষ্পন্ন হইল’ ইত্যাদি শ্রৌত বাক্যানুসারে জানা যায় যে, তেজই সর্ব্বপ্রথমে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিল; চক্ষুও তৈজস বা তেজো-- ময়; কাজেই ইহাকে আধ্যাত্মিক ভূতত্রয়ের সার বলা যাইতে পারে। “সতো হি: এব রসঃ” কথাটি মূর্তত্ব ও সারত্বের হেতুরূপে উপন্যস্ত হইয়াছে ॥ ১০৮ ॥ ৪ ॥
অথামূর্ত্তম্—প্রাণশ্চ যশ্চায়মন্তরাত্মন্নাকাশ এতদমৃতমেতদ্ যদেতত্ত্যৎ, তস্যৈতস্যামূর্ত্তস্যৈতস্যামৃতস্যৈতস্য যত এতস্য ত্যস্যৈষ, রসো যোহয়ং দক্ষিণেহক্ষন্ পুরুষস্ত্যস্য হোষ রসঃ ॥ ১০৯ ॥ ৫ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(অতঃপরং) অমূর্ত্তং(অমূর্ত্তসংজ্ঞকং রূপম্)[উচ্যতে]—প্রাণঃ (দেহস্থঃ বায়ুঃ), যশ্চ অয়ং অন্তঃ(অভ্যন্তরে) আত্মন্(আত্মনি—দেহে) আকাশঃ, এতৎ(প্রাণাকাশাত্মকং ভূতদ্বয়ং) অমৃতং, এতৎ যৎ, এতৎ ত্যৎ; তস্য এতস্য অমূর্ত্তস্য, এতস্য অমৃতস্য, এতস্য যতঃ, এতস্য ত্যস্য এষঃ রসঃ(সারঃ), যঃ অয়ং দক্ষিণে অক্ষন্ (অক্ষিণি) পুরুষঃ(লিঙ্গাত্মা); হি(যস্মাৎ) এষঃ(দক্ষিণাক্ষিপুরুষঃ) ত্যস্য(যথোক্ত- ভূতদ্বয়স্য) রসঃ(সারঃ),[তস্মাদস্য শ্রেষ্ঠত্বমিতি ভাবঃ] ॥ ১০৯ ॥ ৫ ॥
মূলানুবাদ।—অতঃপর অমূর্ত্ত রূপের কথা বলা হইতেছে— দেহস্থ প্রাণবায়ু এবং যাহা দেহাভ্যন্তরস্থ আকাশ, এই দুইটি ভূত অমৃত, ইহারাই যৎ ও ইহারাই ত্যৎ; এই অমূর্ত্তের, এই অমৃতের, এই যতের এবং এই ত্যতের ইহাই হইতেছে রস(সারভূত), যাহা এই দক্ষিণ অক্ষিস্থ পুরুষ(আত্মা); কারণ, ইনিই এই ত্যতের সারঃ পদার্থ ॥ ১০৯॥ ৫॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথাধূনা অমূর্ত্তমুচ্যতে—যৎ পরিশেষিতং ভূতদ্বয়ং: প্রাণশ্চ যশ্চায়মন্তরাত্মন্নাকাশঃ—এতদমূর্ত্তম্। অন্যৎ পূর্ব্ববৎ। এতস্য ত্যস্য এষ রসঃ সারঃ—যোহয়ং দক্ষিণেহক্ষন্ পুরুষঃ; দক্ষিণেহক্ষন্নিতি বিশেষগ্রহণং শাস্ত্র-
৫৮৭.
প্রত্যক্ষত্বাৎ; লিঙ্গস্য হি দক্ষিণেহক্ষি বিশেষতোহধিষ্টাতৃত্বং শাস্ত্রস্য প্রত্যক্ষম্, সর্ব্বশ্রুতিষু তথা প্রয়োগদর্শনাৎ। ত্যশ্য হোষ রস ইতি পূর্ব্ববৎ বিশেষ- তোহগ্রহণাদমূর্তত্বসারত্বে এব হেত্বর্থঃ ॥ ১০৯ ॥ ৫ ॥
টীকা।—কুতো বিশেষোক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—দক্ষিণ ইতি। শাস্ত্রস্য তেন বা দক্ষিণেইক্ষণি, বিশেষস্য প্রত্যক্ষত্বাদিত্যর্থঃ। দ্বিতীয়ব্যাখ্যানমাশ্রিতা হেত্বর্থং স্ফুটয়তি—লিঙ্গস্যেতি। হেতুমনুষ্য তদর্থং কথয়তি—ত্যস্যেতি। যথা পূর্ব্বত্র চক্ষুষি মূর্ত্তাদিচতুষ্টয়দৃষ্ট্যা তাদৃগভূতত্রয়সারতোক্তা, তথাহত্রাপি লিঙ্গাত্মন্যমূর্ত্তত্বাদিচতুষ্টয়স্য বিশেষেণাগ্রহণাদমূর্ত্তত্বাদিনা সাধর্ম্যাত্তথাবিধভূতদ্বয়সারত্বং, তস্য শরীরে প্রাধান্যাচ্চ তৎসারত্বসিদ্ধিরিত্যর্থঃ। ১০৯।৫।
ভাষ্যানুবাদ।—এখন অমূর্ত্ত রূপ কথিত হইতেছে—অবশিষ্ট যে ভূত- দ্বয়,—যাহা প্রাণ, এবং যাহা দেহাভ্যন্তরস্থিত আকাশ, ইহারা হইতেছে—অমূর্ত্ত রূপ। অন্যান্য অংশের ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ। এই যে দক্ষিণ চক্ষুস্থিত পুরুষ, ইহাই ত্যতের (অমূর্ত্তের) সার। এখানে যে, বিশেষ করিয়া ‘দক্ষিণে অক্ষন্’ বলা হইয়াছে,. শাস্ত্রই তদ্বিষয়ে প্রমাণ; লিঙ্গাত্মার যে, দক্ষিণ চক্ষুতেই বিশেষরূপে অধিষ্ঠান হইয়া থাকে, ইহা শাস্ত্র-প্রমাণসিদ্ধ; কারণ, সমস্ত শ্রুতিতেই ঐরূপ প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়। “ত্যস্য হি এষ রসঃ” ইহার অর্থও পূর্ব্ববৎ। বিশেষরূপে গ্রহণ-- যোগ্য নয় বলিয়া অমূর্ত্ত-সারত্বের হেতু-প্রদর্শনার্থ ঐ বাক্যটি প্রযুক্ত হইয়াছে ৷ ১০৯ ॥ ৫ ॥
তস্য হৈতস্য পুরুষস্য রূপম্—যথা মাহারজনং বাসো যথা পাণ্ড্বিকং যথেন্দ্রগোপো যথাহগ্ন্যচ্চির্যথা পুণ্ডরীকং যথা সকৃদ্বিদ্যুত্তং সকৃদ্বিদ্যুত্তেব হ বা অস্য শ্রীর্ভবতি য এবং বেদ, অথাত আদেশো নেতি নেতি ন হোতস্মাদিতি নেত্যন্যৎ পরমস্ত্যথ নামধেয়ং সত্যস্য সত্যমিতি, প্রাণা বৈ সত্যং তেষামেষ সত্যম্ ॥ ১১০ ॥ ৬ ॥
সরলার্থঃ।—[সম্প্রতি] তস্য(পূর্ব্বোক্তস্য করণাত্মকস্য) এতস্য পুরুষস্য’ রূপং[উচ্যতে—] যথা মাহারজনং(মহারজনং হরিদ্রা, তয়া রঞ্জিতং) বাসঃ(বস্ত্রং), যথা পাণ্ডু(পাণ্ডুবর্ণং) আবিকং(অবিঃ-মেষঃ, তস্য ইদং—আবিকং মেষরোমজং, বস্ত্রং), যথা ইন্দ্রগোপঃ(লোহিতঃ কীটবিশেষঃ), যথা অগ্ন্যর্চ্চিঃ(অগ্নিশিখা), যথা পুণ্ডরীকং(শ্বেতপদ্মং), যথা সকৃদ্বিদ্যুতং(যুগপদ্বিদ্যোতনং সর্ব্বতঃ প্রকা-
শকং),[এবমস্য রূপম্।] সক্বদ্বিদ্যুত্তা ইব(সক্বদ্বিদ্যোতনমিব) হ বৈ অন্য(অক্ষি- পুরুষজ্ঞস্য) শ্রীঃ(রূপং) ভবতি,[কস্য?] যঃ এবং(যথোক্তং রূপং) বেদ, [তস্যৈতৎ ফলমিতি ভাবঃ]।
অথ(সত্যাখ্যব্রহ্মস্বরূপনির্দেশানন্তরং),[যতঃ সত্যস্য সত্যম্ অনিরূপিত- রূপমস্তি], অতঃ(তস্মাৎ হেতোঃ)[তৎস্বরূপং নিদ্দিশ্যতে-] আদেশঃ(ব্রহ্মণঃ নির্দেশঃ ক্রিয়তে)-নেতি নেতি-নহি এতস্মাৎ(সত্যস্য সত্যাৎ পুরুষাৎ) পরং(অধিকং) অন্যৎ(নামরূপাদিকং কিঞ্চিৎ)(অস্তি, নাস্তীত্যর্থঃ, সর্ব্বমেব এতদাত্মকমিতি ভাবঃ)।
অথ(অনন্তরং) নামধেয়ং(ব্রহ্মণঃ বাচকঃ শব্দঃ)[উচ্যতে]—সত্যস্য ‘সত্যম্ ইতি। প্রাণাঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) সত্যং(সত্যশব্দবাচ্যাঃ), এষঃ(অক্ষি- পুরুষঃ) তেষাং(প্রাণানামপি) সত্যম্(সত্যতাধায়কঃ),[অতঃ তস্য ‘সত্যশ্য সত্যম্’ ইতি নাম যুজাতেতরামিতি ভাবঃ] ॥ ১১০ ॥ ৬॥
মূলানুবাদ।—সেই এই অক্ষিপুরুষের রূপটি—যেমন হরিদ্রা- রঞ্জিত বস্ত্র, যেমন পাণ্ডুবর্ণ মেষরোমজ বস্ত্র, যেমন ইন্দ্রগোপ(রক্তবর্ণ কীটবিশেষ), যেমন অগ্নির শিখা, যেমন শ্বেতপদ্ম, এবং যেমন সকৃদ্বিদ্যোতন অর্থাৎ যুগপৎ বহু বিদ্যুৎপ্রকাশ,[তেমনি]। যে ব্যক্তি এইরূপ পুরুষরূপ জানে, তাহারও সকৃদ্বিদ্যোতনের ন্যায় সর্বতঃ প্রকাশময় শ্রী সম্পন্ন হয়।
অতঃপর এই হেতু(যে হেতু, ‘সত্যস্য সত্যং’ ব্রহ্মের রূপটি এ পর্য্যন্ত নিরূপিত হয় নাই, সেই হেতু) ‘নেতি নেতি’(ইহা নহে— ‘ইহা নহে), ইহাই ব্রহ্মের আদেশ অর্থাৎ সেই রূপ। প্রথম ‘নেতি’ অর্থ—ইহা হইতে পর নাই, দ্বিতীয় ‘নেতি’ অর্থ—অপর কিছু নাই, অর্থাৎ ব্রহ্মাতিরিক্ত অপর কিছুই নাই।
অনন্তর ব্রহ্মের অভিধায়ক নাম কথিত হইতেছে—তাঁহার নাম হইতেছে,—‘সত্যস্য সত্যম্’—‘সত্যের সত্য(সত্যেরও সত্যতা- ‘সম্পাদক)’; প্রাণসমূহই সত্য, তিনি সে সমুদয়েরও সত্য ॥ ১১০ ॥ ৬॥
ইতি দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় ব্রাহ্মণব্যাখ্যা ॥ ২ ॥ ৩ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ব্রহ্মণ উপাধিভূতয়োঃ মূর্ত্তামূর্ত্তয়োঃ কার্য্যকরণবিভাগেন অধ্যাত্মাধিদৈবতয়োঃ বিভাগো ব্যাখ্যাতঃ সত্যশব্দবাচ্যয়োঃ। অথেদানীং তস্য
৫৮৯.
হৈতস্য পুরুষস্য করণাত্মনো লিঙ্গস্য রূপং বক্ষ্যামঃ-বাসনাময়ং, মূর্তামূর্তবাসনা- বিজ্ঞানময়-সংযোগজনিতং বিচিত্রং-পটভিত্তিচিত্রবৎ মায়েন্দ্রজালমৃগতৃষ্ণিকোপমং সর্ব্বব্যামোহাস্পদম্-এতাবন্মাত্রমেবাত্মেতি বিজ্ঞানবাদিনো বৈনাশিকা যত্র ভ্রান্তাঃ; এতদেব বাসনারূপৎ পটরূপবদাত্মনো দ্রব্যস্য গুণ ইতি নৈয়ায়িকা বৈশেষিকাশ্চ সম্প্রতিপন্নাঃ; ইদমাত্মার্থং ত্রিগুণং স্বতন্ত্রং প্রধানাশ্রয়ং পুরুষার্থেন হেতুনা প্রবর্তত ইতি সাঙ্খ্যাঃ। ১
টীকা। -তস্য হেত্যাদের বৃত্তানুবাদপূর্ব্বকং সম্বন্ধমাহ-ব্রহ্মণ ইতি। বিভাগে বিশেষঃ। তস্যাধিদৈবং প্রকৃতস্যৈতস্যাধ্যাত্মং সন্নিহিতস্থামূর্তরসভূতান্তঃকরণস্যৈব বাগাদিবাসনেতি বক্তুং তস্যেত্যাদি বাক্যমিতার্থঃ। কথমিদং রূপং লিঙ্গস্য প্রাপ্তমিতি, তদাহ-মূর্তেতি। মূর্তামূর্ত- বাসনাভিবিজ্ঞানময়সংযোগেন চ জনিতং যুদ্ধে রূপমিতি যাবৎ। নেদমাত্মনো রূপং, তস্যৈ- করসস্তানেকরূপত্বানুপপত্তেরিতি বিশিনষ্টি-বিচিত্রমিতি। বাস্তবত্বশঙ্কাং বারয়তি-মায়েতি। বৈচিত্র্যমনুসুত্যানেকোদাহরণম্। অন্তঃকরণস্যৈব রাগাদিবাসনাশ্চেৎ, কথং পুরুষস্তন্ময়ো দৃশ্যতে, তত্রাহ-সর্ব্বেতি। তদেব ব্যাকুর্বন্ বিজ্ঞানবাদিনাং ভ্রান্তিমাহ-এতাবন্মাত্রমিতি। বুদ্ধিমাত্রমেবাহংবৃত্তিবিশিষ্টং স্বরস-ভঙ্গুরং রাগাদিকলুষিতমাত্মা, নান্যঃ স্থায়ী ক্ষণিকো বেতি যত্র তে ভ্রান্তাঃ, তস্য রূপং বক্ষ্যাম ইতি সম্বন্ধঃ। তার্কিকাণামপি বৌদ্ধবদ্ভ্রান্তিমুদ্ভাবয়তি- এতদেবেতি। অন্তঃকরণমেবাহং ধীগ্রাহ্যং রাগাদিধর্মকমাত্মা, তস্য বাসনাময়ং রূপং পটস্য, শৌক্যাবগুণঃ, সচ সংসার ইতি যত্র তার্কিকা ভ্রান্তাঃ, তস্য রূপং বক্ষ্যাম ইতি পূর্ববৎ। সাখ্যানাং ভ্রান্তিমাহ-ইদমিতি। কথমন্য ত্রিগুণত্বাদিকং সিধ্যতি, তত্রাহ-প্রধানাশ্রয়মিতি। কেন প্রকারেণান্তঃকরণমাত্মার্থমিষ্যতে, তত্রাহ-পুরুষার্থেনেতি। নান্তঃকরণমেবাত্মা, কিন্তুন্যঃ সর্ব্ব- গতঃ সর্ববিক্রিয়াশূন্যঃ স্বপ্রকাশঃ, তস্য ভোগাপবর্গানুগুণ্যেন প্রধানাত্মকমন্তঃকরণং তৎসধৰ্ম্মকং প্রবর্তত ইতি যত্র কাপিলা ভ্রাম্যন্তি, তস্য রূপং বক্ষ্যাম ইতি সম্বন্ধঃ। ১
ঔপনিষদম্মন্যা অপি কেচিৎ প্রক্রিয়াং রচয়ন্তি—মূর্তামূর্তরাশিরেকঃ, পরমাত্ম- রাশিরুত্তমঃ, তাভ্যামন্যোহয়ং মধ্যমঃ কিল তৃতীয়ঃ—কর্তা ভোক্তা বিজ্ঞানময়েনা-- জাতশত্রুপ্রতিবোধিতেন সহ বিদ্যাকর্মপূর্ব্বপ্রজ্ঞাসমুদায়ঃ। প্রয়োক্তা কর্মরাশিঃ, প্রযোজ্যঃ পূর্ব্বোক্তো মূর্তামূর্তভূতরাশিঃ সাধনঞ্চেতি। ২
যত্র বিচিত্রা বিপশ্চিতাং ভ্রান্তিস্তদন্তঃকরণং তস্য হেত্যত্রোচ্যতে, নাত্মেতি স্বপক্ষমুক্ত। ভর্তৃ- প্রপঞ্চপক্ষমুখাপয়তি—ঔপনিষদম্মন্যা ইতি। কীদৃশী প্রক্রিয়েত্যুক্তে রাশিত্রয়কল্পনাং বদন্ আদাবধমং রাশিং দর্শয়তি—মুর্ভেতি। উৎকৃষ্টরাশিমাচষ্টে—পরমাত্মেতি। রাশ্যন্তরমাহ— তাভ্যামিতি। তান্যেতানি ত্রীণি বস্তুনি মূর্তামুর্তমাহারজনাদিরূপমাত্মতত্ত্বমিতি পরোক্তিমাশ্রিত্য রাশিত্রয়কল্পনামুক্ত। মধ্যমাধমরাশ্যোবিশেষমাহ—প্রয়োক্তেতি। উৎপাদকত্বং প্রয়োক্তৃত্বম্। কর্মগ্রহণং বিদ্যাপূর্ব্বপ্রজ্ঞয়োরুপলক্ষণম্। সাধনং জ্ঞানকৰ্ম্মকারণং কার্য্যকরণজাতং, তদপি প্রযোজ্যমিত্যাহ—সাধনং চেতি। ইতিশব্দো রাশিত্রয়কল্পনাসমাপ্ত্যর্থঃ। ২
তত্র চ তার্কিকৈঃ সহ সন্ধিং কুর্ব্বন্তি। লিঙ্গাশ্রয়শ্চৈষ কর্মরাশিরিত্যুক্তা, পুনস্ততন্ত্রস্যন্তঃ সাঙ্খ্যত্বভয়াৎ-সর্ব্বঃ কৰ্ম্মরাশিঃ-পুষ্পাশ্রয় ইব গন্ধঃ পুষ্পবিয়োগে- হপি পুটতৈলাশ্রয়ো ভবতি, তদ্বল্লিঙ্গবিয়োগেহপি পরমাত্মৈকদেশমাশ্রয়তি; স পরমাত্মৈকদেশঃ কিলান্যত আগতেন গুণেন কর্মণা সগুণো ভবতি-নির্গুণো- হপি সন্, কর্তা ভোক্তা বধ্যতে মুচ্যতে চ বিজ্ঞানায়া-ইতি বৈশেষিকচিত্তমপ্যনু- সরস্তি। সচ কৰ্ম্মরাশির্ভূতরাশেরাগন্তুকঃ, স্বতো নির্গুণ এব পরমাত্মৈকদেশত্বাৎ, স্বত উত্থিতা অবিদ্যা অনাগন্তকাপি উষরবদনাত্মধৰ্ম্ম:-ইত্যনয়া কল্পনয়া সাঙ্খ্য- চিত্তমনুবর্তন্তে। ৩
পরকীয়কল্পমাত্তরমাহ-তত্রেতি। রাশিত্রয়ে কল্পিতে সতীতি যাবৎ। সন্ধিকরণমেব ‘স্ফোরয়তি-লিঙ্গাশ্রয়শ্চেতি। তত ইত্যুক্তিপরামর্শঃ। সাধ্যত্বভয়াৎ ত্রস্যস্তো বৈশেষিকচিত্ত- মপ্যনুসরস্তীতি সম্বন্ধঃ। কথং তাচ্চত্তানুসরণং, তদুপপাদয়তি-কর্মরাশিরিতি। কথং নির্গুণমাত্মানং কৰ্ম্মরাশিরাশ্রয়তীত্যাশঙ্ক্যাহ-স পরমাত্মৈকদেশ ইতি। অন্যত ইতি কাৰ্য্য- করণাত্মকাদ্ ভূতরাশেরিভি যাবৎ। যদা ভূতরাশিনিষ্ঠং কর্মাদি তদ্দ্বারাত্ম্যাগচ্ছতি, তদা স কর্তৃত্বাদিসংসারমনুভবতীত্যাশঙ্ক্যাহ-স কর্তেতি। স্বতন্তস্থ্য কর্মাদিসম্বন্ধত্বেন সংসারিত্বং স্যাদিতি চেন্নেত্যাহ-স চেতি। নির্গুণ এব বিজ্ঞানাস্মেতি শেষঃ। সাখ্যচিত্তানুসারার্থমেব ‘পরেষাং প্রক্রিয়ান্তরমাহ-স্বত ইতি। নৈসর্গিক্যপ্যবিদ্যা পরম্মাদেবাভিব্যক্তা সতী তদেকদেশং বিকৃত্য তস্মিন্নেবাস্তঃকরণাখ্যে তিষ্ঠতীতি বদন্তোহনাত্মধর্মোহবিস্তেত্যুক্ত্যা সাখ্যচিত্তমপ্যনুসরস্তী- ত্যর্থঃ। অবিস্তা পরম্মাদুৎপন্না চেত্তমবাশ্রয়েন্ন তদেকদেশমিত্যাশঙ্ক্যাহ-উষরবদিতি। যথা পৃথিব্যা জাতোংপ্যুষরদেশস্তদেকদেশমাশ্রয়ত্যেবমবিদ্যা পরম্মাজ্জাতাপি তদেকদেশমাশ্রয়িষ্য- তীত্যর্থঃ। ৩
সর্ব্বমেতৎ তরিকৈঃ সহ সামঞ্জস্যকল্পনয়া রমণীয়ং পশ্যন্তি, নোপনিষৎসিদ্ধান্তং সর্ব্বন্যায়বিরোধঞ্চ পশ্যন্তি। কথম্? উক্তা এব তাবৎ সাবয়বত্বে পরমাত্মনঃ সংসারিত্ব- সব্রণত্ব-কর্মফলদেশ-সংসরণানুপপত্যাদয়ো দোষাঃ। নিত্যভেদে চ বিজ্ঞানাত্মনঃ পরেণৈকত্বানুপপত্তিঃ, লিঙ্গমেব চেৎ পরমাত্মন উপচরিতদেশত্বেন কল্পিতং—ঘট- করকভূচ্ছিদ্রাকাশাদিবৎ, তথা লিঙ্গাবয়োগেহপি পরমাত্মদেশাশ্রয়ণম্ বাসনায়াঃ। ৪
তদেতদ দূষয়িতুমুপক্রমতে-সর্ব্বমেতদিতি। তাকিকৈঃ সহ সন্ধিকরণাদিকমেতৎ সর্ব্ব- মধিকৃত্য সামঞ্জস্যেন পূর্ব্বোক্তানাং কল্পনানামাপাতেন রমণীয়ত্বমনুভবস্তীতি যাবৎ। যথোক্ত- কল্পনানাং শ্রুতিস্থায়ানুসারিত্বাভাবাত্যাজ্যত্বং সূচয়তি-নেত্য!দিনা। কৰ্ম্মদ্বয়ং প্রত্যেকং ক্রিয়াপদেন সম্বধ্যতে। নঞশ্চোভয়ত্রান্বয়ঃ। কথং যথোক্তকল্পনানামাপাতরমণীয়ত্বেন শ্রুতি- -স্থায়বাহ্যত্বমিতি পৃচ্ছতি-কথমিতি। যদুক্তং পরস্যৈকদেশো বিজ্ঞানাত্মেতি, তত্র তদেকদেশত্বং বাস্তবমবাস্তবং বা? প্রথমে স পরম্মাদভিন্নো ভিন্নো বেতি বিকল্প্যাদ্যং দূষয়তি-উক্তা এবেতি। আদিশব্দেন শ্রুতিস্মৃতিবিরোধো গৃহ্যতে। কল্পান্তরং প্রত্যাহ-নিত্যভেদে চেতি। ভেদা-
৫৯১
ভেদয়োবিরুদ্ধত্বাদনুপপত্তিশ্চকারার্থঃ। লিঙ্গোপাধিরাত্মা পরস্যাংশ ইতি কল্পান্তরং শঙ্কতে- লিঙ্গমেবেতি। উপচরিতত্বং কল্পিতত্বম্। লিঙ্গোপাধিনা কল্পিতঃ পরাংশো জীবত্বেত্যুক্তে স্বাপাদৌ লিঙ্গধ্বংসে বাসনা নাত্মনি স্যাল্লিঙ্গাভাবে তদধীনজীবাভাবাৎ, ততশ্চ তদ্বিয়োগেহপি লিঙ্গস্থা বাসনা জীবে তিষ্ঠতীতি প্রক্রিয়ানুপপন্নেতি দূষয়তি-তথেতি। ৪
অবিদ্যায়াশ্চ স্বত উত্থানমুষরবৎ—ইত্যাদিকল্পনা অনুপপন্নৈব। ন চ বাশ্য- দেশব্যতিরেকেণ বাসনায়া বস্তুন্তরসঞ্চরণং মনসাপি কল্পয়িতুং শক্যম্; ন চ শ্রুতয়ো- হনুগচ্ছন্তি “কামঃ সঙ্কল্পো বিচিকিৎসা”, “হৃদয়ে হ্যেব রূপাণি”, “ধ্যায়তীব লেলায়তীব”, “কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ”, “তীর্ণো হি তদা সর্ব্বান্ শোকান্ হৃদয়স্য” ইত্যাদ্যাঃ। ন চাসাং শ্রুতীনাং শ্রুতাদন্যা অর্থান্তরকল্পনা ন্যায্য; আত্মনঃ পরব্রহ্মত্বোপপাদনার্থপরত্বাদাসাম্, এতাবমাত্রার্থোপক্ষয়ত্বাচ্চ সর্ব্বোপনিষদাম্। তস্মাৎ শ্রুত্যর্থকল্পনাহকুশলাঃ সর্ব্ব এবোপনিষদর্থমন্যথা কুর্ব্বন্তি, তথাপি বেদার্থশ্চেৎ স্যাৎ, কামং ভবতু, ন মে দ্বেষঃ। ৫
যৎ তু পরম্মাদবিদ্যায়াঃ সমুখানমিতি, তন্নিরকারোতি-অবিদ্যায়াশ্চেতি। আদি- পদেনানাত্মধৰ্ম্মত্বমবিদ্যায়া গৃহ্যতে। পরম্মাদবিদ্যোৎপত্তৌ তস্যৈব সংসারঃ স্যাৎ, তয়োরৈকাধি- করণ্যাৎ। অতশ্চাবিদ্যায়াং সত্যাং ন মুক্তিঃ, ন চ তস্যাং নষ্টায়াং তৎসিদ্ধিঃ, কারণে স্থিতে কার্য্যস্যাত্যন্তনাশাযোগাৎ; কাৰ্য্যাবিদ্বানাশে তৎকারণপরাভবস্তথা চ মোক্ষিণোহভাবান্ মোক্ষাসিদ্ধিঃ। ন চানাত্মধর্ম্মোহবিদ্যা, বিদ্যায়া অপি তদ্ধর্ম্মত্বপ্রসঙ্গাৎ, তয়োবেকাশ্রয়ত্বাদিতি ভাবঃ। যৎ তু লিঙ্গোপরমে তদ্গতা বাসনাত্মন্যস্তীতি,-তত্রাহ-ন চেতি। পুটকাদৌ তু পুষ্পাদ্যবয়বানামেবানুবৃত্তিরিতি ভাবঃ। ইতশ্চ বাসনায়া জীবাশ্রয়ত্বমসঙ্গতমিত্যাহ-ন চেতি। ননু জীবে সমবায়িকারণে মনঃসংযোগাদসমবায়িকারণাৎ কামাদ্যুৎপত্তিরিত্যুদাহৃতশ্রুতিষু বিবক্ষ্যতে, তত্রাহ-ন চাসামিতি। দৃশ্যমানসংসারমৌপাধিকমভিধায় জীবস্থ্য ব্রহ্মত্বোপপদানে তাৎপর্য্যং শ্রুতীনামুপক্রমোপসংহারৈকরূপ্যাদিভ্যো গম্যতে, তন্নার্থান্তরকল্পনেত্যর্থঃ। ইতশ্চ যথোক্তশ্রুতীনাং নার্থান্তরকল্পনেত্যাহ-এতাবন্মাত্রেতি। সর্ব্বাসামুপনিষদামেকরসেহর্থে পর্য্যবসানং ফলবস্ত্বাদিলিঙ্গেভ্যো গম্যতে, তৎকথমুক্তশ্রুতীনামর্থান্তরকল্পনেত্যর্থঃ। ননুপনিষদা- মৈক্যাদর্থান্তরমপি প্রতিপাদ্যং ব্যাখ্যাতারো বর্ণয়ন্তি, তৎকথমর্থান্তরকল্পনানুপপত্তিরত আহ- তন্মাদিতি। সর্ব্বোপনিষদামৈক্যপরত্বপ্রতিভাসন্তচ্ছন্দার্থঃ। নমু পরৈরুচ্যমানোইপি বেদার্থো ভবত্যেব, কিমিত্যসৌ দ্বেষাদেব ত্যজ্যতে, তত্রাহ-তথাপীতি। ন চার্থান্তরস্য বেদার্থত্বং, তত্র ‘তাৎপর্যলিঙ্গাভাবাদিতি ভাবঃ। ৫
ন চ “দ্বে বাব ব্রহ্মণো রূপে” ইতি রাশিত্রয়পক্ষে সমঞ্জসম্। যদা তু মুর্তামূর্তে তজ্জনিতবাসনাশ্চ মুর্তামূর্তে দ্বে রূপে, ব্রহ্ম চ রূপি তৃতীয়ম্, ন চানুচ্চতুর্থমন্তরালে, তদৈতদনুকূলমবধারণং “দ্বে এব ব্রহ্মণো রূপে” ইতি, অন্যথা ব্রহ্মৈকদেশস্য বিজ্ঞানা- ত্মনো রূপে ইতি কল্প্যম্, পরমাত্মনো বা বিজ্ঞানাত্মদ্বারেণেতি। তদা চ রূপে
এবেতি দ্বিবচনমসমঞ্জসম্ রূপাণীতি বাসনাভিঃ সহ বহুবচনং যুক্ততরং স্যাৎ-দ্বে চ মূর্তামূর্তে বাসনাশ্চ তৃতীয়মিতি। ৬
লিঙ্গবিয়োগেহপি পুংসি বাসনাহস্তীত্যেতন্নিরাকৃত্য রাশিত্রয়কল্পনাং নিরাকরোতি-ন- চেতি। কথং সিদ্ধান্তেহপি বাবশব্দাদিসামঞ্জস্য, তত্রাহ-যদেতি। রাশিত্রয়পক্ষে জীবস্য রূপ- মধ্যেহস্তর্ভাবে নিবেধ্যকোটিনিবেশঃ স্যাৎ, রূপিমধ্যেহস্তর্ভাবে শ্রুতিঃ শিক্ষণীয়ত্যাহ-অন্য- থেতি। ভবত্বেবং শ্রুতেঃ শিক্ষেতি, তত্রাহ-তদেতি। রূপিমধ্যে জীবান্তর্ভাবকল্পনায়ামিতি যাবৎ। ৬
অথ মূর্তামূর্তে এব পরমাত্মনো রূপে, বাসনাস্তু বিজ্ঞানাত্মন ইতি চেৎ; তদা ‘বিজ্ঞানাত্মদ্বারেণ বিক্রিয়মাণস্য পরমাত্মনঃ’ ইতীয়ং বাচোযুক্তিরনর্থিকা স্যাৎ, বাসনায়া অপি বিজ্ঞানাত্মদ্বারত্বস্যাবিশিষ্টত্বাৎ; ন চ বস্তু বস্তুন্তরদ্বারেণ বিক্রিয়তে ইতি মুখ্যয়া বৃত্ত্যা শক্যং কল্পয়িতুম্। ন চ বিজ্ঞানাত্মা পরমাত্মনো বস্তুন্তরম্;. তথা কল্পনায়াং সিদ্ধান্তহানাৎ। তস্মাৎ বেদার্থমুঢ়ানাং স্বচিত্তপ্রভবা এবমাদিকল্পনা অক্ষরবাহ্যাঃ; নহি অক্ষরবাহ্যো বেদার্থঃ বেদার্থোপকারী বা, নিরপেক্ষত্বাদ বেদস্য প্রমাণ্যং প্রতি। তন্মাদ রাশিত্রয়কল্পনা অসমঞ্জসা। ৭
বিষয়ভেদেনোপক্রমাবিরোধং চোদয়তি-অখেতি। ইথং ব্যবস্থায়াং জীবদ্বারা বিক্রিয়মাণস্থ্য- পরস্য রূপে মূর্তামূর্তে ইত্যুক্তিরযুক্তা, বাসনাকর্মাদেরপি তদ্দ্বারা তৎসম্বন্ধাবিশেষাদিতি দূষয়তি-তদেতি। বিজ্ঞানাত্মদ্বারা পরস্য বিক্রিয়মাণত্বমঙ্গীকৃত্যোক্তং, তদেব নাস্তীত্যাহ- ন চেতি। তথাভূতস্যান্থথাভূত্বস্য চ বিক্রিয়ায়া দুরুপপাদত্বাদিত্যর্থঃ। কিঞ্চ, জীবস্য ব্রহ্মণো- বস্তুস্তরত্বমাত্যন্তিকমনাত্যস্তিকং বা? নাদ্য ইত্যাহ-ন চেতি। ন দ্বিতীয়ো ভেদাভেদনিরাসা- দিতি দ্রষ্টব্যম্। পরপক্ষদূষণমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। এবমাদিকল্পনা রাশিত্রয়ং জীবস্য কামাদাশ্রয়ত্বমিত্যাভাঃ। অক্ষরবাহ্যত্বে ফলিতমাহ-ন হীতি। বেদার্থোপকারিত্বাভাবে. হেতুমাহ-নিরপেক্ষত্বাদিতি। বেদার্থত্বাদ্যভাবে সিদ্ধমর্থং কথয়তি-তস্মাদিতি। ৭
“যোহয়ং দক্ষিণেহক্ষন্ পুরুষঃ” ইতি লিঙ্গাত্মা প্রস্তুতঃ অধ্যাত্মে, অধিদৈবে চ- “ষ এষ এতস্মিন্ মণ্ডলে পুরুষঃ” ইতি, “তস্য” ইতি প্রকৃতোপাদানাৎ স এবো- পাদীয়তে—যোহসৌ ত্যস্যামূর্ত্তস্য রসঃ, ন তু বিজ্ঞানময়ঃ। ননু বিজ্ঞানময়স্যৈ- বৈতানি রূপাণি কস্মান্ন ভবন্তি? বিজ্ঞানময়স্যাপি প্রকৃতত্বাৎ, তস্যেতি চ. প্রকৃতো পাদানাৎ। নৈবম্; বিজ্ঞানময়স্য অরূপিত্বেনু বিজিজ্ঞাপয়িষিতত্বাৎ। যদি হি তস্যৈব বিজ্ঞানময়স্য এতানি মাহারজনাদীনি রূপাণি স্যুঃ, তস্যৈব “নেতি নেতি” ইত্যনাখ্যেররূপতয়া আদেশো ন স্যাৎ। ৮
তস্য হেত্যত্র পরকীয়প্রক্রিয়াং প্রত্যাখ্যান স্বমতে তচ্ছব্দার্থমাহ—যোহয়মিতি। প্রকৃতত্বা- লিঙ্গাত্মগ্রহে জীবস্যাপি পাণিপেষবাক্যে তদ্ভাবাত্তস্যৈযাত্র তচ্ছবেন গ্রহঃ স্যাদিতি শঙ্কতে— নন্বিতি। প্রকৃতত্বেহপি তস্য নির্বিশেষব্রহ্মত্বেন জ্ঞাপরিতুমিষ্টত্বান্ন বাসনাময়ং সংসাররূপং
তবতো যুক্তমিতি পরিহরতি-নৈবমিতি। ইতশ্চ জীবস্য ন বাসনারূপিতা, কিন্তু চিত্তস্থে- ত্যাহ-যদি হীতি। নিষেধ্যকোটিপ্রবেশাদিতি ভাবঃ। ৮
‘ননু অন্যস্যৈবাসাবাদেশঃ, ন তু বিজ্ঞানময়স্যেতি-ন, ষষ্ঠান্তে উপসংহারাৎ- “বিজ্ঞাতারমরে কেন বিজানীয়াৎ” ইতি বিজ্ঞানময়ং প্রস্তুত্য “স এষ নেতি নেতি” ইতি, “বিজ্ঞপয়িষ্যামি” ইতি চ প্রতিজ্ঞায়া অর্থবত্ত্বাৎ-যদি চ বিজ্ঞানময়স্যৈব অসংব্যবহার্য্যমাত্মস্বরূপং জ্ঞাপয়িতুমিষ্টং স্যাৎ প্রধ্বস্তসর্ব্বোপাধিবিষয়ম্, তত ইয়ং প্রতিজ্ঞা অর্থবর্তী স্যাৎ,-যেনাসৌ জ্ঞাপিতো জানাত্যাত্মানমেবাহং ব্রহ্মাস্মীতি- শাস্ত্রনিষ্ঠাং প্রাপ্নোতি, ন বিভেতি কুতশ্চন। অথ পুনরন্যো বিজ্ঞানময়ঃ, অন্যঃ ‘নেতি নেতি’ ইতি ব্যপদিশ্যতে, তদা অন্যদদো ব্রহ্ম, অন্যোহহমস্মীতি বিপর্যয়ো গৃহীতঃ স্যাৎ, ন “আত্মানমেবাবেদহং ব্রহ্মাস্মি” ইতি। তস্মাৎ “তস্য হৈতস্য” ইতি লিঙ্গপুরুষস্যৈবৈতানি রূপাণি। ৯
নায়ং জীবস্যাদেশঃ কিন্তু ব্রহ্মণস্তটস্থস্যেতি শঙ্করিত্বা দূষয়তি-নন্বিত্যাদিনা। ষষ্ঠাবসানে বিজ্ঞাতারমরে কেনেত্যাত্মানমুপক্রম্য স এষ নেতি নেত্যাত্মশব্দাত্তস্যৈবাদেশোপসংহারাদিহাপি তস্যৈবাদেশো ন তটস্থস্যেতার্থঃ। ইতশ্চ প্রত্যগর্থস্যৈবায়মাদেশ ইত্যাহ-বিজ্ঞপয়িয্যামীতি। তদেব সমর্থয়তে-যদীতি। কথমেতাবতা প্রতিজ্ঞার্থবত্ত্বং, তদাহ-যেনেতি। জ্ঞানফলং কথয়তি-শাস্ত্রেতি। অন্বয়মুখেনোক্তমর্থং ব্যতিরেকমুখেন সাধয়তি-অথেত্যাদিনা। বিপর্যয়ে গৃহীতে ব্রহ্মকণ্ডিকাবিরোধং দর্শয়তি-নাত্মানমিতি। তচ্ছবেন জীবপরামর্শসম্ভবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। ৯
সত্যস্য চ সত্যে পরমাত্মস্বরূপে বক্তব্যে নিরবশেষং সত্যং বক্তব্যম্; সত্যস্য চ বিশেষরূপাণি বাসনাঃ; তাসামিমানি রূপাণ্যুচ্যন্তে। এতস্য প্রকৃতস্য পুরুষস্থ্য লিঙ্গাত্মনঃ এতানি রূপাণি। কানি তানীত্যুচ্যন্তে,-যথা লোকে, মহারজনং হরিদ্রা, তয়া রক্তং-মাহারজনং যথা বাসো লোকে, এবং শ্র্যাদিবিষয়- সংযোগে তাদৃশং বাসনারূপং রঞ্জনাকারমুৎপদ্যতে চিত্তস্য, যেনাসৌ পুরুষো রক্ত ইত্যুচ্যতে বস্ত্রাদিবৎ; যথা চ লোকে পাণ্ডাবিকং-অবেরিদম্ আবিকম্ ঊর্ণাদি, যথা চ তৎ পাণ্ডুরং ভবতি, তথা অন্যদ্বাসনারূপম্; যথা লোকে ইন্দ্রগোপঃ অত্যন্ত- রক্তো ভবতি, এবমস্য বাসনারূপম্; কচিদ্বিষয়বিশেষাপেক্ষয়া রাগস্য তারতম্যম্, কচিৎ পুরুষচিত্তবৃত্ত্যপেক্ষয়া। যথা চ লোকে অগ্ন্যচিঃ ভাস্বরং ভবতি, তথা কচিৎ কস্যচিদ্বাসনারূপং ভবতি; যথা পুণ্ডরীকং শুক্লম্, তদ্বদপি চ বাসনারূপং কস্য- চিদ্ভবতি; যথা সক্বদ্বিদ্যুতম্-যথা লোকে সকৃদ্বিদ্যোতনং সর্ব্বতঃ প্রকাশকং ভবতি, তথা জ্ঞানপ্রকাশবিবৃদ্ধ্যপেক্ষয়া কস্যচিদ্বাসনারূপমুপজায়তে। ১০
ননু নিম্বু চেদেতানি রূপাণি, কিমিত্যুপস্থ্যতে? পরমাত্মস্বরূপস্যৈব বক্তব্যাৎ, যত
আহ—সত্যস্য চেতি। ইন্দ্রগোপোপমানেন কৌমুস্তস্য গতত্বান্ মহারজনং হরিদ্রেতি ব্যাখ্যাতম্। তত্র লোকপ্রসিদ্ধিং দর্শয়তি—যেনেতি। উর্ণাদীত্যাদিপদং কম্বলাদিগ্রহার্থম্। মনসি বাসনা- বৈচিত্র্যে কিং কারণমিতি, তদাহ—কচিদিতি। চিত্তবৃত্তিশব্দেন সত্ত্বাদিগুণপরিণামো বিবক্ষিতঃ। ১০
নৈষাম্ আদিরস্তো মধ্যং সঙ্খ্যা বা, দেশঃ কালো নিমিত্তং বা অবধার্য্যতে, অসজ্যেয়ত্বাদ্বাসনায়াঃ, বাসনাহেতুনাঞ্চানন্ত্যাৎ। তথা চ বক্ষ্যতি ষষ্ঠে-“ইদম্ময়ঃ অদোময়ঃ” ইত্যাদি। তস্মান্ন স্বরূপসঙ্খ্যাবধারণার্থা দৃষ্টান্তাঃ-‘যথা মাহারজনং বাসঃ’ ইত্যাদয়ঃ; কিন্তুর্হি? প্রকারপ্রদর্শনার্থাঃ-এবংপ্রকারাণি হি বাসনা- রূপানি ইতি। ১১
পরিমিতদৃষ্টান্তোক্ত্যা বাসনানামপি পরিমিতত্বং দৃষ্টান্তদাষ্টান্তিকয়োঃ সাম্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ— নৈষামিতি। তত্র বাক্যশেষং সম্বাদয়তি—তথা চেতি। বাসনানন্ত্যাত্তদীয়পরিমিতিপ্রদর্শনে পরিমিতদৃষ্টান্তপরিগ্রহস্যাতাৎপর্য্যে কুত্র তাৎপর্য্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ—তস্মাদিতি। প্রকারপ্রদর্শন- মেবাভিনয়তি—এবপ্রকারাণীতি। ১১
যতু বাসনারূপমভিহিতমন্তে—সকৃদ্বিদ্যোতনমিবেতি, তৎ কিল হিরণ্যগর্ভস্য অব্যাকৃতাৎ প্রাদুর্ভবতস্তড়িদ্বং সকৃদেব ব্যক্তির্ভবতীতি; তৎ তদীয়ং বাসনারূপং হিরণ্যগর্ভস্য যো বেদ, তস্য সকৃদ্বিদ্যুত্তা ইব। ‘হ বৈ’ ইত্যবধারণার্থৌ; এবমেবাস্য শ্রীঃ খ্যাতির্ভবতীত্যর্থঃ; যথা হিরণ্যগর্ভস্য। এবম্ এতদ্ যথোক্তং বাসনারূপমন্ত্যং যো বেদ। ১২
অন্ত্যবাসনাদিবিশিষ্টসূত্রোপান্তিং ফলবতীং তৎপ্রকর্ষাভিধানপূর্ব্বকমভিদধাতি-যত্তিত্যা- দিনা। ব্যক্তিঃ সর্ব্বস্য বস্তুজাতস্যেতি শেষঃ। তদীয়মিত্যস্য ব্যক্তীকরণং হিরণ্যগর্ভস্যেতি। তদেব স্ফুটয়তি-যথেত্যাদিনা। ১২
এবং নিরবশেষং সত্যস্য স্বরূপমভিধায় যত্তৎ সত্যস্য সত্যমবোচাম, তস্যৈব স্বরূপাবধারণার্থং ব্রাহ্মণমিদমারভ্যতে। অথ অনন্তরং সত্যস্বরূপনির্দেশানন্তরং যৎ সত্যস্য সত্যম্, তদেবাবশিষ্যতে যস্মাৎ, অতস্তস্মাৎ সত্যস্য সত্যং স্বরূপং নিৰ্দ্দেক্ষ্যামঃ। আদেশঃ নির্দেশো ব্রহ্মণঃ। কঃ পুনরসৌ নির্দেশ ইত্যুচ্যতে— নেতি নেতীত্যেবং নির্দেশঃ। ১৩
বৃত্তমনুষ্ঠানন্তরগ্রন্থমবতারয়তি—এবমিত্যাদিনা। তস্যৈব ব্রহ্মণ ইতি সম্বন্ধঃ। কম্মাদনন্তর- মিত্যুক্তে তদ্দর্শন্নরতঃশব্দং চাপেক্ষিতং পূরয়ন্ ব্যাকরোতি—সত্যস্যেতি। ১৩
ননু কথমাভ্যাং নেতি নেতীতি শব্দাভ্যাং সত্যস্য সত্যং নিদ্দিদিক্ষিতমিতি? উচ্যতে—সর্ব্বোপাধিবিশেষাপোহেন। যস্মিন্ন কশ্চিদ্বিশেষোহস্তি—নাম বা রূপং বা কর্ম্ম বা ভেদো বা জাতির্ব্বা গুণো বা, তদ্দ্বারেণ তি শব্দপ্রবৃত্তির্ভবতি; ন
৫৯৫
চৈষাং কশ্চিদ্বিশেষো ব্রহ্মণ্যস্তি; অতো ন নির্দ্দিষ্টং শক্যতে—‘ইদং তৎ’ ইতি, গৌরসৌ স্পন্দতে শুক্লো বিষাণীতি যথা লোকে নিৰ্দ্দিশ্যতে, তথা; অধ্যারোপিত- নামরূপকর্মদ্বারেণ ব্রহ্ম নিৰ্দ্দিশ্যতে—“বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম” “বিজ্ঞানঘন এব ব্রহ্মাত্মা” ইত্যেবমাদিশব্দৈঃ। যদা পুনঃ স্বরূপমেব নিৰ্দ্দিদিক্ষিতং ভবতি নিরস্ত- সর্ব্বোপাধিবিশেষম্, তদা ন শক্যতে কেনচিদপি প্রকারেণ নির্দ্দিষ্টুম্; তদায়- মেবাভ্যুপায়ঃ, যদুত প্রাপ্তনিৰ্দেশ-প্রতিষেধদ্বারেণ “নেতি নেতি” ইতি নির্দেশঃ ।১৪
যথোক্তাদেশস্যাভাবপর্যবসায়িত্বং মম্বানঃ শঙ্কতে-নন্বিতি। নিরবধিকনিষেধাসিদ্ধেস্তদ- বধিত্বেন সত্যস্য সত্যং ব্রহ্ম নির্দ্দেশু মিষ্টমিতি পরিহরতি-উচ্যত ইতি। ব্রহ্মণো বিধিমুখেন নির্দেশে সম্ভাব্যমানে কিমিতি নিষেধমুখেন তন্নিদ্দিশ্যতে, তত্রাহ-যস্মিন্নিতি। তদ্বিধিমুখেন নির্দ্দেষ্টমশক্যমিতি শেষঃ। নামরূপাদ্যভাবেহপি ব্রহ্মণি শব্দপ্রবৃত্তিমাশঙ্ক্যাহ-তদ্দ্বারেণেতি। জাত্যাদীনামন্যতমস্য ব্রহ্মণ্যপি সম্ভবাত্তদ্বারা তত্র শব্দপ্রবৃত্তিঃ স্যাদিতি চেন্নেত্যাহ-ন চেতি। উক্তমর্থং বৈধর্ম্মাদৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়াত-গৌরিতি। যথা জাত্যাদ্যভাবান্ন ব্রহ্মণি শব্দপ্রবৃত্তিরিতি শেষঃ। কথং তর্হি কচিদ্বিধিমুখেন ব্রহ্মোপদিশ্যতে, তত্রাহ-অধ্যারোপিতেতি। বিজ্ঞানা- নন্দাদিবাক্যেযু শবলে গৃহীতশক্তিভিঃ শব্দৈলক্ষ্যতে ব্রহ্মেত্যর্থঃ। নমু লক্ষণামুপেক্ষ্য সাক্ষাদের ব্রহ্ম কিমিতি ন বিবক্ষ্যতে, তত্রাহ-যথা পুনরিতি। নিৰ্দ্দিষ্টং লক্ষণামুপেক্ষ্য সাক্ষাদের বক্ত- মিতি যাবৎ। তত্র শব্দপ্রবৃত্তিনিমিত্তানাং জাত্যাদীনামভাবস্যোক্তত্বাদিত্যর্থঃ। বিধিমুখেন নির্দেশাসম্ভবে ফলিতমাহ-তদেতি। প্রাপ্তো নির্দেশো যস্য বিশেষস্য তৎপ্রতিষেধমুখেনেতি যাবৎ। ১৪
ইদঞ্চ নকারদ্বয়ং বীপ্সাব্যাপ্ত্যর্থম্; যদ্যৎ প্রাপ্তং, তত্তন্নিষিধ্যতে; তথা চ সতি অনিদ্দিষ্টাশঙ্কা ব্রহ্মণঃ পরিহৃতা ভবতি; অন্যথা হি নকারদ্বয়েন প্রকৃত-দ্বয়প্রতিষেধে, যদন্যৎ প্রকৃতাৎ প্রতিষিদ্ধদ্বয়াৎ ব্রহ্ম, তন্ন নির্দিষ্টম্-কীদৃশং নু খলু-ইত্যাশঙ্কা ন নিবর্তিষ্যতে; তথা চানর্থকশ্চ স নির্দেশঃ, পুরুষস্য বিবিদিষায়া অনিবর্তকত্বাৎ; “ব্রহ্ম জ্ঞপরিষ্যামি” ইতি চ বাক্যমপরিসমাপ্তার্থং স্যাৎ। যদা তু সর্ব্বদিক্- কালাদিবিবিদিষা নিবর্তিতা স্যাৎ সর্ব্বোপাধিনিরাকরণদ্বারেণ, তদা সৈন্ধবঘন- বদেকরসং প্রজ্ঞানঘনমনন্তরমবাহ্যং সত্যস্য সত্যম্ অহং ব্রহ্মাস্মীতি সর্ব্বতো নিবর্ততে বিবিদিষা, আত্মন্যেবাবস্থিতা প্রজ্ঞা ভবতি। তস্মাদ্বীপ্সার্থং নেতি নেতীতি নকারদ্বয়ম্। ১৫
এবং ব্রহ্ম নিদ্দিদিক্ষিতং চেদেকেনৈব নঞাহলং, কৃতং দ্বিতীয়েনেত্যাশঙ্ক্যাহ-ইদং চেতি। বীপ্সয়া ব্যাপ্তিঃ সর্ব্ববিষয়সংগ্রহস্তদর্থং নকারদ্বয়মিত্যুক্তমেব ব্যনক্তি-যদ্যদিতি। বিষয়ত্বেন প্রাপ্তং সর্ব্বং ন ব্রহ্মেত্যুক্তে সত্যবিষয়ঃ প্রত্যগাত্মা ব্রহ্মেত্যেকত্বে শাস্ত্রপর্যবসানান্নৈরাকাঙ্ক্ষ্যং শ্রোতুঃ সিধ্যতীত্যাহ-তথা চেতি। ইতিশব্দস্য প্রকৃতপরামর্শিত্বাৎ প্রকৃত মূর্তামূর্তাদেরন্যত্বে ব্রহ্মণো নকারপর্যবসানং কিমিতি নেষ্যতে, তত্রাহ-অন্যথেতি। আশঙ্কানিবৃত্ত্যভাবে দোষ-
মাহ-তথা চেতি। অনর্থকশ্চেতি চকারেণ সমুচ্চিতং দোষান্তরমাহ-ব্রহ্মেতি। উক্তমর্থমন্বয়- মুখেন সমর্থয়তে-যদা তিতি। সর্ব্বোপাধিনিরাসেন তত্র তত্র বিষয়বেদনেচ্ছা যদা নিবর্ত্তিতা, তদা যঃোক্তং প্রত্যগব্রহ্মাহমিতি নিশ্চিত্যাকাঙ্ক্ষা সর্ব্বতো ব্যাবর্ত্ততে, তেন নির্দেশস্য সার্থকত্বং, যদা চোক্তরীত্যা ব্রহ্মাত্মেত্যেব প্রজ্ঞাবহস্থিতা ভবতি, তদা প্রতিজ্ঞাবাক্যমপি পরিসমাপ্ত্যর্থং স্যাদিতি যোজনা। বীপ্সাপক্ষমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ১৫
ননু মহতা যত্নেন পরিকরবন্ধং কৃত্বা কিং যুক্তমেবং নিৰ্দ্দিষ্টং ব্রহ্ম? বাঢ়ম্; কম্মাৎ? ন হি-যস্মাৎ “ইতি ন, ইতি ন-ইত্যেতস্মাৎ ইতি” ইতি ব্যাপ্তব্যপ্রকারা নকারদ্বয়বিষয়া নিৰ্দ্দিশ্যন্তে, যথা ‘গ্রামো গ্রামো রমণীয়ঃ’ ইতি, অন্যৎ পরং নির্দেশনং নাস্তি; তস্মাদয়মের নির্দেশো ব্রহ্মণঃ। যদুক্তম্,-“তস্যোপনিষৎ সত্যস্য সত্যম্” ইতি, এবংপ্রকারেণ সত্যস্য সত্যং তৎ পরং ব্রহ্ম; অতো যুক্তমুক্তং নামধেয়ং ব্রহ্মণঃ; নামৈব নামধেয়ম্; কিং তৎ? সত্যস্য সত্যম্-প্রাণা বৈ সত্যম্, তেষামেষ সত্যমিতি ॥ ১০৮ ॥ ৬॥
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়শ্চ তৃতীয়-ব্রাহ্মণভাষ্যম্ ॥ ২ ॥ ৩ ॥
আদেশস্য প্রক্রমাননুগুণত্বমাশঙ্ক্যানন্তরবাক্যেন পরিহরতি-নাদ্বিত্যাদিনা। ন হীতি প্রতীকোপাদানম্। যম্মাদিত্যস্য হি শব্দার্থস্য তম্মাদিত্যনেন সম্বন্ধঃ। ব্যাপ্তব্যাঃ সংগ্রাহ্যা বিষয়ীকর্তব্যা যে প্রকারাঃ, তে নকারদ্বয়স্য বিষয়াঃ সন্তো নিদ্দিশ্যন্ত ইতি নেতি নেত্যেত- স্মাদিত্যনেন ভাগেনেতি যোজনা। ইতিশব্দাভ্যাং ব্যাপ্তব্যসর্ব্বপ্রকারসংগ্রহে দৃষ্টান্তমাহ- যথেতি। গ্রামো গ্রামো রমণীয় ইত্যুক্তে রাজ্যনিবিষ্টরমণীয়সর্ব্বগ্রামসংগ্রহবৎ প্রবৃত্তেংপীতি- শব্দাভ্যাং বিষয়ভূতসর্ব্বপ্রকারসংগ্রহে নকারাভ্যাং তন্নিষেধসিদ্ধিরিত্যর্থং। যথোক্তান্নিষেধ- রূপান্নির্দেশাদন্যন্নির্দেশনং যস্মাদ ব্রহ্মণো ন পরমস্তি, তন্মাদিত্যুপসংহারঃ। অথেত্যাদি বাক্যং প্রকৃতোপসংহারত্বেন ব্যাচষ্টে-যদুক্তমিত্যাদিনা। ১০৮।৬।
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যটীকায়াং দ্বিতীয়োঽধ্যায়ঃ তৃতীয়ঃ ব্রাহ্মণম্। ২।৩।
ভাষ্যানুবাদ।—কার্য্যরূপে ও করণরূপে বিভক্ত হইয়া অধ্যাত্ম ও অধিদৈবতভাবাপন্ন সত্য-শব্দবাচ্য ব্রহ্মের উপাধিভূত মূর্ত্ত ও অমূর্ত্তরূপের বিভাগ বর্ণিত হইয়াছে; এখন পূর্ব্বোক্ত এই করণাত্মক লিঙ্গদেহাভিমানী পুরুষের স্বরূপ প্রদর্শন করিব—পুরুষের যে রূপটি বাসনাময় এবং মূর্ত্ত ও অমূর্ত্ত পদার্থনিচয়ের বাসনাত্মক বিজ্ঞানের সহযোগে পটগত ও ভিত্তিগত চিত্রের ন্যায় বৈচিত্র্যসম্পন্ন, মায়া ইন্দ্রজাল ও মৃগতৃষ্ণাসদৃশ এবং সর্ব্ববিধ ব্যবহারের আশ্রয়স্বরূপ, ‘ইহাই এক- মাত্র আত্মা’ বলিয়া বৈনাশিক(বিজ্ঞানবাদী) বৌদ্ধগণ(১) যাহাতে আত্মভ্রমে
৫৯৭
পতিত হইয়া থাকে। আবার এই বাসনাত্মক রূপটি বস্ত্রগত শুক্লাদি রূপের ন্যায় দ্রব্য-পদার্থ আত্মার গুণ বলিয়া নৈয়ায়িক ও বৈশেষিকগণ যাহাকে বুঝিয়াছেন; এবং সাংখ্যাচার্য্যগণও যাহাকে—আত্মার ভোগাপবর্গসাধনে প্রবৃত্ত ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির পরিণামভূত একটি স্বতন্ত্র বস্তু বলিয়া মনে করেন। ১
কোন কোন ঔপনিষদম্মন্যও(যাহারা আপনাকে উপনিষৎ-বিদ্যায় অভিজ্ঞ মনে করে, সেই ভর্তৃপ্রপঞ্চপ্রভৃতিও) এইরূপ সিদ্ধান্তপ্রণালী রচনা করিয়া থাকেন যে, মূর্ত ও অমূর্তসমষ্টি একভাগ, পরমাত্মসমষ্টি তাহার অপরভাগ, আর তদুভয়ের অতিরিক্ত তৃতীয় ভাগ হইতেছে—অজাতশত্রু-প্রবোধিত কর্তা ভোক্তা বিজ্ঞানময় আত্মার(জীবের) সহিত সম্মিলিত এবং কর্ম্ম, উপাসনা ও প্রাক্তন জ্ঞান-সংস্কারসমষ্টি। ইহার মধ্যে কর্ম্মরাশি হইতেছে—প্রযোজক বা প্রেরক, আর পূর্ব্বোক্ত মূর্তামূর্তসমষ্টি ও সাধনসমূহ হইতেছে—তাহার প্রযোজ্য(প্রেরণীয়) ইতি। ২
তাঁহারা এইরূপে ত্রিবিধ রাশি কল্পনা করিয়া কর্মরাশিকে লিঙ্গদেহাশ্রিত বলিয়া স্বীকার করতঃ তার্কিকগণের সহিত সন্ধি করিয়া থাকেন(সামঞ্জস্যের চেষ্টা করেন); পরে তাহা হইতেও ভীত হইয়া, পাছে সাংখ্যসিদ্ধান্ত আসিয়া পড়ে, এই ভয়ে আবার বলেন যে, পুষ্পাশ্রিত গন্ধ যেরূপ পুষ্পবিনাশেও যত্নরক্ষিত তৈলে বর্ত- মান থাকে, তদ্রূপ সমস্ত কর্মরাশিও লিঙ্গদেহের বিয়োগে পরমাত্মার একাংশ অব- লম্বন করিয়া বিদ্যমান থাকে। পরমাত্মার সেই অংশটি নিজে নির্গুণ হইলেও আগ-
সাংখ্যাচার্য্যেরা বলেন, আত্মা নির্গুণ ও নিষ্ক্রিয়, আত্মার ভোগ ও মুক্তি এই উভয়বিধ প্রয়ো- জন সম্পাদনের জন্য ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতির বিচিত্র পরিণাম হইয়া থাকে। প্রকৃতির প্রথম পরিণাম—বুদ্ধি। বুদ্ধিই সাক্ষাৎসম্বন্ধে আত্মার ভোগাপবর্গ নির্বাহ করিয়া থাকে।
স্তুক অন্যদীর কর্মসংযোগে সগুণ হইয়া থাকে; সেই বিজ্ঞানময় আত্মাই কর্তা ভোক্তা বদ্ধ ও মুক্ত বলিয়াও পরিচিত হইয়া থাকে; এইরূপে তাঁহারা বৈশেষিক-দর্শনোক্ত সিদ্ধান্তেরও অনুসরণ করেন। তাহার পর আবার বলেন, সেই কৰ্ম্মরাশিও মূর্তা- মূর্ত ভূতরাশি হইতে আসিয়া উপস্থিত হয়—আগন্তুক; কারণ, পরমাত্মার একদেশ বিধায় উহা স্বভাবতঃ বিজ্ঞানময় ও নির্গুণ। ভূমি হইতে জাত ঊষরত্ব(মৃত্তিকার ক্ষারভাব) যেমন ভূমির একাংশমাত্রে আশ্রিত থাকে, তেমনি পরমাত্মা হইতে উৎপন্ন স্বাভাবিক অবিদ্যাও সম্পূর্ণ পরমাত্মাকে আশ্রয় না করিয়া তাঁহার এক- দেশকেই আশ্রয় করিয়া থাকে; সুতরাং অবিদ্যা অবশ্যই আত্ম-ধর্ম্ম হইতে পারে, এইরূপে সাংখ্যবাদীরও চিত্তবৃত্তির অনুসরণ করিয়া থাকেন। ৩
তাঁহারা তার্কিকগণের সহিত সামঞ্জস্য-রক্ষার পক্ষে এ সমস্ত কথাকে অতি রমণীয় বলিয়া মনে করেন, কিন্তু ইহাতে যে, উপনিষদের সিদ্ধান্ত-হানি বা যুক্তি- বিরোধ ঘটে, তাহা দেখিতে পান না। কি প্রকার? পরমাত্মার সাবয়বত্ব স্বীকার করিলে যে, তাহার সংসারিত্ব, সবিকারত্ব এবং কর্মফলানুসারে স্বর্গাদি লোকে গমনাদির অনুপপত্তি বা অসঙ্গতি দোষ ঘটে, এ কথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। বিশেষতঃ পরমাত্মার সহিত জীবের চিরন্তন ভেদ স্বীকার করিলে যে, আর কখনও তদুভয়ের একত্ব সংঘটিত হইতে পারে না, তাহাও মনে করেন না। যদি বল, ঘট ও করকাদি-উপাধিযুক্ত ঘটাকাশাদির ন্যায় লিঙ্গদেহই পরমাত্মার উপচরিত দেশরূপে কল্পিত হইতে পারে; তাহা হইলেও সুষুপ্তি-সময়ে লিঙ্গদেহের বিয়োগ হওয়ায়,[তদুপহিত জীবভাবেরও বিলোপ হইয়া যায়], সুতরাং লিঙ্গদেহস্থ বাসনা পরমাত্মাকেই আশ্রয় করিতে পারে;[তাহা হইলে লিঙ্গদেহবিয়োগের পরে সংস্কাররাশি যে, জীবকে আশ্রয় করিয়া থাকে, তোমাদের এই কথা অসঙ্গত হইয়া পড়ে]। ৪
তাহার পর, ঊষর দেশের ন্যায় অবিদ্যাকেও যে, আত্মা হইতে উৎপন্ন উপাধি- রূপে কল্পনা করা হইয়াছে, সে সমস্ত কল্পনাও কোন রকমেই সঙ্গত হয় না; কারণ, সংস্কার যে, আশ্রয়বস্তু ছাড়িয়া কখনও অপর বস্তুতে সংক্রামিত হইতে পারে, ইহা ত মনে মনেও কল্পনা করা যাইতে পারে না। নিম্নোদ্ধৃত শ্রুতিসমূহও এ কথা সমর্থন করিতেছে না,—‘কাম, সংকল্প, সংশয় প্রভৃতি[মনেরই ধর্ম্ম]’, ‘এ সমস্ত রূপ হৃদয়গতই বটে’, ‘যেন ধ্যানই করে, যেন স্পন্দনই করে’ ‘যে সমস্ত কামনা এই উপাসকের হৃদরাশ্রিত’, ‘তখন হৃদয়ের সমস্ত শোক উত্তীর্ণ হন’ ইত্যাদি। আর উল্লিখিত শ্রুতিগুলির যে, যথাশ্রুত অর্থ ছাড়া অর্থান্তরও কল্পনা
করা যাইতে পারে, তাহাও নহে; কেননা, আত্মার পরব্রহ্মত্ব-প্রতিপাদনেই ঐ সমস্ত শ্রুতির তাৎপর্য্য, এবং সমস্ত উপনিষৎশাস্ত্রও শুধু এই বিষয়টির প্রতিপাদনেই পরিসমাপ্ত হইয়াছে। এই জন্যই, যাহারা শ্রুতির অর্থ নিরূপণে কুশল নয়, তাহারাই উপনিষদের অর্থ বিকৃত করিয়া অন্যপ্রকার কল্পনা করিয়া থাকে; তথাপি সেগুলি যদি বেদানুমোদিত অর্থ হইত, তবে কোন ক্ষতি ছিল না, কারণ, তাহাতে ত আমাদের কোন প্রকার বিদ্বেষ নাই। ৫
বিশেষতঃ পূর্ব্বোক্ত রাশিত্রয়কল্পনার পক্ষে ‘দ্বে বাব ব্রহ্মণো রূপে’ ইত্যাদি, বাক্যও সুসঙ্গত হয় না। যদি মূর্তামূর্ত ভূতদ্বয় ও তজ্জনিত বাসনারাশি, এতৎ- সমষ্টিকে দ্বিবিধ রূপ এবং ব্রহ্মকে উক্ত রূপের আশ্রয়ভূত তৃতীয় রূপ বলিয়া ধরা হয়, এবং মধ্যে এতদতিরিক্ত চতুর্থ কোনও কিছু ধরা না হয়, তাহা হইলেই “দ্বে বাব ব্রহ্মণো রূপে” এইরূপ দ্বিরূপাবধারণ সঙ্গত হইতে পারে; পক্ষান্তরে এ কথা অস্বীকার করিলে ফলতঃ ব্রহ্মের একদেশভূত বিজ্ঞানাত্মা জীবেরই এই দুইটি রূপ কল্পিত হইয়া পড়ে, অথবা বিজ্ঞানাত্মার দ্বিবিধ রূপ হওয়ায়, তদ্দ্বারা পরমাত্মারও রূপদ্বয়ই কল্পিত হইতে পারে। তাহা হইলে ‘নিশ্চয়ই দুইটি রূপ’ এই প্রকার অবধারণ সঙ্গত হইত না, বরং উক্ত বাসনারাশির সহিত মিলিতভাবে বহু রূপ সংঘটিত হওয়ায় ‘রূপানি’ এইরূপ বহুবচন নির্দেশ করাই অপেক্ষাকৃত সমীচীন হইত; মূর্ত ও অমূর্তভেদে দুই, আর বাসনারাশি তাহার তৃতীয় রূপ; [সুতরাং বহুবচন নির্দেশই সঙ্গত হইত]। ৬
যদি বল, মূর্তামূর্ত রূপ দুইটিই পরমাত্মার যথার্থ রূপ, আর বাসনাসমূহ কেবল বিজ্ঞানাত্মা—জীবেরই রূপ, পরমাত্মার নহে; তাহা হইলেও, তোমার ‘বিজ্ঞানাত্মা দ্বারা(জীবরূপে) বিকারভাবাপন্ন ব্রহ্মের’ এরূপ কথা বলা নিরর্থক হইয়া পড়ে; কারণ, বাসনা যেমন বিজ্ঞানাত্মার বিকার সাধন করে, তেমনি তদ্দ্বারা পরমাত্মারও বিকার সমুৎপাদন করিতে পারে; কার্য্যকারণভাবের কিছুমাত্র বৈষম্য নাই। বিশেষতঃ এক বস্তু যে, অপর বস্তুর বিকার দ্বারা সত্য সত্যই বিকৃত হইয়া যায়, এরূপ কল্পনাও কখনই সমীচীন হইতে পারে না। আর জীবাত্মা যে, পরমাত্মা হইতে পৃথক্ একটি স্বতন্ত্র বস্তু, তাহাও নহে; কেননা, সেরূপ কল্পনায় তোমারই সিদ্ধান্তের ব্যাঘাত ঘটে। অতএব বলিতে হইবে যে, যাহারা বেদার্থবিজ্ঞানে বিমূঢ়, তাহারাই এবংবিধ বহুতর অসার কল্পনা করিয়া থাকে; তাহাদের ঐজাতীয় সমস্ত কল্পনাই অক্ষর-বাহ্য অর্থাৎ শব্দার্থবহির্ভূত; আর অক্ষর-বাহ্য কল্পনা কখনই বেদার্থ বা বেদার্থের উপযোগী(পোষক) বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না; কারণ,
স্বতঃপ্রমাণ বেদশাস্ত্র আপনার প্রামাণ্যের জন্য অপর কোনও প্রমাণের অপেক্ষা করে না,(উহা স্বতঃপ্রমাণ); অতএব উক্ত প্রকার রাশিত্রয় কল্পনা করা কখনই সুসঙ্গত হয় না। ৭
[এইরূপে পরকীয় সিদ্ধান্ত খণ্ডন করিয়া এখন স্বমতে ‘তৎ’ পদের অর্থ বলিতেছেন-] ‘যঃ অয়ং দক্ষিণে অক্ষন্ পুরুষঃ’ এই বাক্যে দেহসম্বদ্ধ যে লিঙ্গাত্মা বর্ণিত হইয়াছে, এবং ‘যঃ’ এষঃ এতস্মিন্ মণ্ডলে পুরুষঃ’ এই বাক্যে যে আধি- দৈবিক পুরুষ উক্ত হইয়াছে, এখানে পূর্ব্বোক্ত-পরামর্শী ‘তস্য’ পদের প্রয়োগ থাকায় সেই আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক পুরুষই ‘যোহসৌ তস্য অমূর্ত্তস্য রসঃ’ বাক্যে পরিগৃহীত হইয়াছে, কিন্তু বিজ্ঞানময়(জীবাত্মা) নহে। ভাল কথা, এখানে যখন বিজ্ঞানময় জীবাত্মারও প্রসঙ্গ রহিয়াছে এবং ‘তস্য’ পদেও যখন বর্ণিত বিষয়েরই উল্লেখ করা হইয়াছে, তখন উল্লিখিত রূপগুলি সেই বিজ্ঞানময় আত্মারই রূপ হইবে না কেন? না,-এরূপ হইতে পারে না; কারণ, এখানে বিজ্ঞানময় আত্মার নীরূপভাব জ্ঞাপন করাই শ্রুতির অভিপ্রেত। উক্ত মাহারজ- নাদি রূপগুলি যদি বিজ্ঞানময়েরই যথার্থ রূপ হইত, তাহা হইলে, ‘নেতি নেতি’ বলিয়া তাহাকেই আবার অরূপভাবে উপদেশ করা কখনই সঙ্গত হইত না। ৮
বলিতে পার যে, অন্যের সম্বন্ধেই এই অরূপভাবের উপদেশ, জীবাত্মার সম্বন্ধে নহে। না-সে কথাও সঙ্গত হয় না; কারণ, ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষে ‘অরে মৈত্রেয়ি, বিজ্ঞাতাকে আবার কিসের দ্বারা জানিবে’, এইরূপে বিজ্ঞানময় আত্মার প্রসঙ্গের পর ‘স এব নেতি নেতি’ বাক্যে সেই বিজ্ঞানময় আত্মারই উপসংহার করা হইয়াছে। তাহার পর, “বিজ্ঞপয়িষ্যামি” বলিয়া প্রথমে যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তাহার সার্থকতা রক্ষাও ইহার অপর কারণ; কেন না, এখানে যদি বিজ্ঞানময় আত্মার সংসারধর্মরহিত সর্ব্বোপাধি-বিনির্মুক্ত স্বরূপটি-যাহা জানিলে, শিষ্য ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বলিয়া আত্মাকে বুঝিতে পারেন, শাস্ত্রার্থে দৃঢ় নিষ্ঠা লাভ করিতে পারেন, এবং কোথা হইতেও ভীত না হন, অর্থাৎ সর্বভয়বিনির্মুক্ত হইতে পারেন, সেই রূপটি জ্ঞাপন করাই যদি অভিপ্রেত হয়,-তাহা হইলেই ঐরূপ প্রতিজ্ঞার সাফল্য রক্ষা পাইতে পারে; নচেৎ ঐরূপ প্রতিজ্ঞার কোনও প্রয়োজন থাকে না। আর বিজ্ঞানময় আত্মা যদি পরমাত্মা হইতে স্বতন্ত্র পদার্থ হয় এবং ‘নেতি নেতি’ বাক্যে যদি সেই বিজ্ঞানময় হইতে পৃথক্ আত্মার কথাই উপদিষ্ট হইয়া থাকে, তাহা হইলে উপদেশ-প্রাপ্ত শিষ্য এইরূপই বুঝিত যে, ব্রহ্ম একটি পৃথক্ পদার্থ, এবং আমিও তাঁহা হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র; সুতরাং সে কখনই আপনাকে
৬০১
‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বলিয়া অবগত হইতে পারিত না। অতএব অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, “তস্য হৈতস্য” ইত্যাদি বাক্যে যে সমস্ত রূপ প্রদর্শিত হইয়াছে, সে সমস্ত লিঙ্গ পুরুষেরই রূপ,(জীবাত্মার রূপ নহে)। ৯
বিশেষতঃ সত্যের সত্য পরমাত্মার প্রকৃত স্বরূপ বলিতে হইলে তাহা নিঃশেষ করিয়া বলাই সঙ্গত। ‘সত্যের’ বিশিষ্ট স্বরূপ হইতেছে বাসনা(সংস্কার-সমূহ); উল্লিখিত রূপগুলি সেই বাসনা-সমূহের সম্বন্ধেই উপদিষ্ট হইতেছে। যথোক্ত লিঙ্গ পুরুষের এই যে সমস্ত রূপ, সে সমস্ত রূপ কি কি, তাহা বলা হইতেছে— মহারজন অর্থ—হরিদ্রা, তদ্দ্বারা রঞ্জিত বস্ত্রকে বলে ‘মাহারজন’; জগতে মাহা- রজন বস্ত্র যেরূপ রূপে রঞ্জিত হয়, স্ত্রী প্রভৃতি বিষয়বিশেষের সংযোগে চিত্তেও সেইরূপ রঞ্জনাত্মক বাসনার সমুদ্ভব হয়, যাহার দরুণ সেই ব্যক্তিকে বস্ত্রাদির তুলনায় ‘রক্ত’ বলিয়া নির্দেশ করা হইয়া থাকে; এবং জগতে পাণ্ডুবর্ণ আবিক— অবি অর্থ মেষ, তাহার রোম প্রভৃতিকে বলে ‘আবিক’, তাহা যেমন পাণ্ডুর বর্ণ (শ্বেত রক্তমিশ্রিত ঈষৎ রক্তাভ) হয়, কোন কোন বাসনারও তাদৃশ রূপ হয়; অথবা জগতে ইন্দ্রগোপ(একজাতীয় কীট) যেমন অত্যন্ত রক্তবর্ণ হয়, ইহার বাসনার রূপও কখন কখন সেরূপ সঙ্ঘটিত হয়; কখনও বা বিশেষ বিশেষ বিষয়ের সংযোগানুসারে বাসনাগত রাগের তারতম্যও হইয়া থাকে, কখনও বা গ্রহীতা পুরুষের চিত্তগত বৃত্তিবৈচিত্র্য অনুসারেও রাগের তারতম্য ঘটিয়া থাকে। অগ্নির শিখা যেরূপ ভাস্বর(ঈষৎ রক্তাভ) হয়, সময়বিশেষে কোন কোন লোকের বাসনাও ঠিক সেইরূপ রূপেই প্রাদুর্ভূত হয়; পুণ্ডরীক(শ্বেতপদ্ম) যেরূপ শুক্লবর্ণ, সেরূপও কোন কোন সময়ে বাসনার রূপ হইয়া থাকে; অথবা বিদ্যুৎ যেমন একসঙ্গে সর্ব্বপ্রকাশক হয়, জ্ঞানালোক সমুন্নত থাকিলে, কোন কোন লোকের বাসনাও তেমনই সর্ব্বপ্রকাশক হইয়া থাকে। ১০
বাসনার যত প্রকার রূপ আছে, সে সমুদয়ের আদি, মধ্য, অন্ত, কিংবা সংখ্যা স্থির করা যায় না, এবং দেশ, কাল বা নিমিত্তও(যাহা অবলম্বনে বাসনার ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রকটিত হইয়া থাকে, সেই কারণও) নির্ণয় করা যায় না; কারণ, বাসনারাশি নিজে অসংখ্য, এবং সে সমুদয়ের হেতু বা উৎপত্তির কারণও অনন্ত। এই উপনিষদেরই ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলিবেন—“ইদম্মরঃ অদোময়ঃ” অর্থাৎ এই প্রকার ও অমুকপ্রকার ইত্যাদি। অতএব বুঝিতে হইবে যে, এখানে “যথা মাহারজনং বাসঃ” ইত্যাদি যে সমস্ত দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইয়াছে, সেগুলি বাসনার স্বরূপ বা সংখ্যা নিরূপণের জন্য নহে; তবে কি? না, কেবল প্রকার প্রদর্শনের জন্য
মাত্র, অর্থাৎ বাসনা-সমূহের যে, এই জাতীয় বহু প্রকার রূপ আছে, তাহা জ্ঞাপনের জন্যই উদাহরণস্বরূপে কয়েকটি দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করা হইয়াছে মাত্র। ১১
আর সর্ব্বশেষে যে, সকৃৎ-বিদ্যোতনসাদৃশ্যে বাসনার একটি বিশেষ রূপ প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহাও কেবল, অব্যাকৃত আত্মশক্তি হইতে প্রাদুর্ভূত হিরণ্য- গর্ভের অভিব্যক্তি যে, বিদ্যুদ্বিকাশের ন্যায় যুগপৎ বা একই বারে হইয়া থাকে, তৎপ্রদর্শনার্থ মাত্র। যে ব্যক্তি হিরণ্যগর্ভের তাদৃশ বাসনাময় অভিব্যক্তি অবগত হয়, তাহারও বিদ্যুতের ন্যায় যুগপৎ সর্ব্বাবভাসক জ্ঞান-দীপ্তি প্রকাশ পাইয়া থাকে, অভিপ্রায় এই যে, যে লোক বাসনার শেষোক্ত রূপটি জানে, হিরণ্যগর্ভের’ ন্যায় তাহারও শ্রী অর্থাৎ শোভা ও খ্যাতি বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। শ্রুতির ‘হ’ ও ‘বৈ’ শব্দের অর্থ—অবধারণ। ১২
এইরূপে নিঃশেষ ভাবে সত্যের স্বরূপ নিরূপণ করিয়া ‘সত্যের সত্য’ বলিয়া যাহার নির্দেশ করা হইয়াছে, এখন সেই ব্রহ্মেরই স্বরূপধারণের জন্য এই বাক্যটি আরব্ধ হইতেছে—অথ অর্থ—অনন্তর, অর্থাৎ ‘সত্যে’র স্বরূপধারণের পর, যাহা সেই সত্যেরও সত্য—সত্যতাসম্পাদক, তাহার স্বরূপধারণ করা এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে, সেই হেতু অতঃপর তাহার স্বরূপ নির্দ্দেশ করিব। আদেশ অর্থ—ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দ্দেশ; এই নির্দ্দেশ আবার কিরূপ, তাহা বলিতেছেন— “নেতি নেতি”, অর্থাৎ তাহার সেই রূপ নির্দ্দেশ এই প্রকারই বটে। ১৩
ভাল, যিনি ‘সত্যের সত্য’ ব্রহ্ম, ‘নেতি নেতি’ শব্দে তাঁহার স্বরূপ নির্দেশ করা সম্ভব হইতে পারে কিরূপে? হ্যাঁ, বলা হইতেছে-সর্ব্বপ্রকার উপাধি- নিষেধ দ্বারা তাহা হইতে পারে। যাহাতে নাম, রূপ, কৰ্ম্ম, স্বভাবভেদ, জাতি, গুণ বা রূপ প্রভৃতি কোনও বিশেষ ধর্ম বিদ্যমান আছে, তদ্বিষয়েই সেই সকল নাম-রূপাদি বিশেষ বিশেষ ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া শব্দব্যবহার হইতে পারে, কিন্তু যাহাতে সেই সমুদয় বিশেষ ধৰ্ম্ম আদৌ নাই,[তাহাতে শব্দের প্রবৃত্তি বা ব্যবহার হইবে কিরূপে?] । ব্রহ্মেত উল্লিখিত ধর্ম্মের কোন একটি ধর্মও নাই; সুতরাং ‘শৃঙ্গযুক্ত শুক্লবর্ণ এই গোটি গমন করিতেছে’ বলিয়া যেমন গোর নির্দেশ করা হইয়া থাকে, তেমনি ‘এটি ব্রহ্ম’ বলিয়া কখনই ব্রহ্মের নির্দেশ করিতে পারা যায় না। এই জন্যই ‘ব্রহ্ম বিজ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ’ ‘বিজ্ঞানঘন আত্মাই ব্রহ্ম’ ইত্যাদি শব্দসমূহ ব্রহ্মে নাম, রূপ ও কর্ম্ম সমা- রোপণপূর্ব্বক তাহার সাহায্যেই ব্রহ্মের নির্দেশ করিয়া থাকে। পক্ষান্তরে, যখন তাঁহার সর্ব্বোপাধিবিনির্মুক্ত নির্বিশেষ স্বরূপের নির্দেশ করাই অভিপ্রেত
হয়, তখন ত কোন প্রকারেই তাহা নির্দেশ করিতে পারা যায় না; তখন কেবল ‘আরোপিত ধর্মগুলির প্রতিষেধ দ্বারা ‘নেতি নেতি’ বলিয়া নির্দেশই তাঁহার স্বরূপ-নির্দেশের একমাত্র উপায়। ১৪
‘নেতি নেতি’ বাক্যে ‘ন’ দুইটি বীপ্সার্থে প্রযুক্ত হইয়াছে। বীপ্সা অর্থ- ব্যাপকতা বা সাকল্য; সুতরাং ইহা হইতে বুঝিতে হইবে যে, ব্রহ্মেতে যে সমস্ত বিশেষ ধর্ম্মের প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল, তৎসমস্তই নিষিদ্ধ হইতেছে; তাহার ফলে, উক্ত শ্রুতিতে ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশ করা হয় নাই বলিয়া যে, আশঙ্কা হইয়া- ছিল, তাহাও পরিহৃত হইল; নচেৎ দুই ‘ন’ দ্বারা যদি কেবল দুইটিমাত্র বিষয়ই নিষিদ্ধ হইত, তাহা হইলে, ব্রহ্ম যে, সেই নিষিদ্ধ পদার্থ দুইটির অতিরিক্ত, সম্পূর্ণ পৃথক্ পদার্থ, তাহা অনির্দিষ্টই থাকিয়া যাইত; সুতরাং ‘ব্রহ্ম কি প্রকার’? এই আকাঙ্ক্ষারও কিছুমাত্র নিবৃত্তি হইত না; অতএব জিজ্ঞাসু ব্যক্তির জিজ্ঞাসা-- নিবর্ত্তক নয় বলিয়াই’ ঐরূপ নির্দেশও নিশ্চয়ই নিরর্থক হইয়া পড়িত; এবং “ব্রহ্ম জ্ঞপয়িষ্যামি”(ব্রহ্মোপদেশ দিব) এই প্রতিজ্ঞাবাক্যও অসমাপ্ত থাকিয়া যাইত। সর্ব্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্মের নিষেধের ফলে যখন দিক্কালাদি অব্রহ্ম বস্তু বিষয়ে, জানিবার ইচ্ছা সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্ত হইয়া যায়, তখনই জিজ্ঞাসুর বিবিদিষা(জানি- বার ইচ্ছা) সমূলে নিবৃত্ত হইয়া যায়, এবং তখনই ‘আমি হইতেছি সৈন্ধবপিণ্ডের ন্যায় একরস(একস্বভাব), বাহ্যাভ্যন্তরবিবর্জ্জিত, সত্যের সত্য ব্রহ্মস্বরূপ’ এইরূপ তত্ত্বজ্ঞান আত্মবিষয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। অতএব ‘নেতি নেতি’ এই ‘ন’ দুইটি নিশ্চয়ই বীপ্সার্থক—সর্ব্বনিষেধক, কিন্তু পৃথক্ পৃথক্ বস্তুর নিষেধক নহে। ১৫
ভাল, জিজ্ঞাসা করি, মহা আড়ম্বরের সহিত এত বড় বাক্যের ঘটা করিয়া অবশেষে এইরূপে ব্রহ্ম নির্দেশ করাটা যুক্তিযুক্ত হইল কি? হাঁ, যুক্তিযুক্তই হইল; কারণ? যেহেতু, ‘নেতি নেতি’ বাক্যস্থ ‘ইতি’ শব্দে নকারদ্বয়ের নিষেধ্য বিষয় যতপ্রকার হইতে পারে, তৎসমস্তই সংগৃহীত হইয়াছে; যেমন ‘গ্রামো গ্রামো রমণীয়ঃ’(প্রত্যেক গ্রাম রমণীয়) বলিলে রাজ্যস্থ সমস্ত গ্রামের সর্ব্বপ্রকার রমণীয়তাই বুঝায়, তদ্রূপ এখানেও সর্ব্বপ্রকার নিষেধ্য বিষয়ই গৃহীত হইয়াছে;. এবং যেহেতু, ইহার অতিরিক্ত আর কোন প্রকারে ব্রহ্মের স্বরূপনির্দেশ হইতেই পারে না, সেই হেতু ইহাই ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপনিৰ্দ্দেশ বলিয়া বুঝিতে হইবে। আর ব্রহ্মের যে ‘সত্যস্য সত্যং’ উপনিষৎ(নাম) বলা হইয়াছে, সে সম্বন্ধেও কথা এই যে, যেহেতু, যথোক্তপ্রকারে পরব্রহ্মই সত্যের সত্যরূপে প্রতিপন্ন হইতেছেন, সেই হেতু ব্রহ্মের ঐ প্রকার নামধেয়(নাম) নির্দেশ করা ঠিকই’ হইয়াছে। সেই
সত্যের সত্য কি?[তদুত্তরে বলিতেছেন—] প্রাণসমূহ হইতেছে সত্য, তিনি সে সমুদয়েরও সত্য অর্থাৎ সত্যতাসম্পাদক;[এইজন্য তিনি সত্যেরও সত্য]॥ ১০৬॥৬॥
দ্বিতীয় অধ্যায়ে তৃতীয় ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ২ ॥ ২ ॥
আভাসভাষ্যম্।—আত্মেত্যেবোপাসীত; তদেবৈতস্মিন্ সর্ব্বস্মিন্ পদনীয়মাত্মতত্ত্বম্, যস্মাৎ প্রেয়ঃ পুত্রাদেঃ—ইত্যুপন্যস্তস্য বাক্যস্য ব্যাখ্যানবিষয়ে সম্বন্ধ-প্রয়োজনে অভিহিত—“তদাত্মানমেবাবেদহং ব্রহ্মাশ্মীতি, তস্মাত্তৎ সর্ব্বম- ভবৎ” ইত্যেবং প্রত্যগাত্মা ব্রহ্মবিদ্যায়া বিষয় ইত্যেতদুপন্যস্তম্। অবিদ্যায়াশ্চ বিষয়ঃ অন্যোহসাবদ্যোহহমস্মীতি, “ন স বেদ” ইত্যারভ্য চাতুর্ব্বর্ণ্যপ্রবিভাগাদিনিমিত্ত- পাক্তকৰ্ম্ম-সাধ্যসাধনলক্ষণো বীজাঙ্কুরবদ্ ব্যাকৃতাব্যাকৃতস্বভাবো নামরূপকর্মা- ত্মকঃ সংসারঃ “ত্রয়ং বা ইদং নাম রূপং কৰ্ম্ম” ইত্যুপসংহৃতঃ শাস্ত্রীয় উৎকর্ষলক্ষণো ব্রহ্মলোকান্তঃ, অধোভাবশ্চ স্থাবরান্তোহশাস্ত্রীয়ঃ পূর্ব্বমেব প্রদর্শিতঃ “দ্বয়া হ” ইত্যাদিনা। ১
এতস্মাদবিদ্যাবিষয়াদ্বিরক্তস্যাস্য প্রত্যগাত্মবিষয়ব্রহ্মবিদ্যায়ামধিকারঃ কথং নাম- স্যাৎ—ইতি তৃতীয়েহধ্যায়ে উপসংহৃতঃ সমস্তোহবিদ্যাবিষয়ঃ। চতুর্থে তু ব্রহ্ম- বিদ্যাবিষয়ং প্রত্যগাত্মানং “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি” ইতি “ব্রহ্ম জ্ঞপয়িষ্যামি” ইতি চ- প্রস্তুত্য তদ্ ব্রহ্মৈকমদ্বয়ং সর্ব্ববিশেষশূন্যং ক্রিয়াকারক-ফলস্বভাব-সত্যশব্দবাচ্যাশেষ- ভূতধর্মপ্রতিষেধদ্বারেণ ‘নেতি নেতি’ ইতি জ্ঞাপিতম্। ২
অস্যা ব্রহ্মবিদ্যায়া অঙ্গত্বেন সন্ন্যাসো বিধিৎসিতঃ, জায়াপুত্রবিত্তাদিলক্ষণং পাঙক্তং কর্মাহবিদ্যাবিষয়ং যস্মাৎ নাত্মপ্রাপ্তিসাধনম্; অন্যসাধনং হি অন্যস্মৈ ফল- সাধনায় প্রযুজ্যমানং প্রতিকূলং ভবতি; ন হি বুভুক্ষা-পিপাসানিবৃত্ত্যর্থং ধাবনং গমনং বা সাধনম্; মনুষ্যলোকপিতৃলোকদেবলোকসাধনত্বেন হি পুত্রাদি-সাধনানি শ্রুতানি, নাত্মপ্রাপ্তিসাধনত্বেন, বিশেষিতত্ত্বাচ্চ। ন চ ব্রহ্মবিদো বিহিতানি, কাম্যত্বশ্রবণাৎ-“এতাবান্ বৈ কামঃ” ইতি, ব্রহ্মবিদশ্চাপ্তকামত্বাৎ আপ্তকামস্য কামানুপপত্তেঃ, “যেষাং নোহয়মাত্মাহয়ং লোকঃ” ইতি চ শ্রুতেঃ। ৩
কেচিত্তু ব্রহ্মবিদোহপ্যেষণাসম্বন্ধং বর্ণয়ন্তি; তৈর্বৃহদারণ্যকং ন শ্রুতম্; পুত্রাদ্যেষণানামবিদ্বদ্বিষয়ত্বম্, বিদ্যাবিষয়ে চ-“যেষাং নোহয়মাত্মাহয়ৎ লোকঃ” ইত্যতঃ “কিং প্রজয়া করিষ্যামঃ” ইত্যেষ বিভাগস্তৈর্ন শ্রুতঃ শ্রুত্যা কৃতঃ; সর্ব্ব- ক্রিয়াকারকফলোপমদ্দস্বরূপায়াং চ বিদ্যায়াং সত্যাং সহ কার্য্যেণাবিদ্যায়া অনুৎ- পত্তিলক্ষণশ্চ বিরোধস্তৈর্ন বিজ্ঞাতঃ; ব্যাসবাক্যঞ্চ তৈন শ্রুতম্। কর্মবিদ্যা- স্বরূপয়োর্বিদ্যাবিদ্যাত্মকয়োঃ প্রতিকূলবর্তনং বিরোধঃ।
“যদিদং বেদবচনং—কুরু কৰ্ম্ম ত্যজেতি চ। কাং গতিং বিদ্যয়া যান্তি কাঞ্চ গচ্ছন্তি কৰ্ম্মণা। এতদ্বৈ শ্রোতুমিচ্ছামি, তদ্ভবান্ প্রব্রযীতু মে। এতাবন্যোন্যবৈরূপ্যে বর্তেতে প্রতিকূলতঃ ॥” ইত্যেবং পৃষ্টস্য প্রতিবচনেন— “কর্মণা বধ্যতে জন্তুর্ব্বিষয়া চ বিমুচ্যতে। তস্মাৎ কৰ্ম্ম ন কুর্ব্বস্তি যতয়ঃ পারদর্শিনঃ ॥”
ইত্যেবমাদিবিরোধঃ প্রদর্শিতঃ। ৪
তস্মান্ন সাধনান্তরসহিতা ব্রহ্মবিদ্যা পুরুষার্থসাধনম্, সর্ব্ববিরোধাৎ; সাধন- ‘নিরপেক্ষৈব পুরুষার্থ-সাধনম্—ইতি পারিব্রাজ্যং সর্ব্বসাধন-সন্ন্যাসলক্ষণম্ অঙ্গত্বেন বিধিৎস্যতে; এতাবদেবামৃতত্বসাধনমিত্যবধারণাৎ, ষষ্ঠসমাপ্তৌ লিঙ্গাচ্চ—কর্মী সন্ যাজ্ঞবল্ক্যঃ প্রবব্রাজেতি। ৫
মৈত্রেয্যৈ চ কৰ্ম্মসাধনরহিতায়ৈ সাধনত্বেনামৃতত্বস্য ব্রহ্মবিদ্যোপদেশাৎ, বিত্তনিন্দাবচনাচ্চ; যদি হি অমৃতত্বসাধনং কৰ্ম্ম স্যাৎ, বিত্তসাধ্যং পাঙ্ক্তং কর্মেতি তন্নিন্দাবচনমনিষ্টং স্যাৎ; যদি তু পরিতিত্যাজয়িষিতং কৰ্ম্ম, ততো যুক্তা তৎ- সাধননিন্দা। কৰ্মাধিকারনিমিত্ত-বর্ণাশ্রমাদিপ্রত্যয়োপমদাচ্চ-“ব্রহ্ম তং পরা- দাৎ, ক্ষত্রং তৎ পরাদাৎ” ইত্যাদেঃ। ন হি ব্রহ্মক্ষত্রাদ্যাত্মপ্রত্যয়োপমদ্দে ব্রাহ্মণে- নেদং কর্তব্যং ক্ষত্রিয়েণেদং কর্তব্যমিতি বিষয়াভাবাদাত্মানং লভতে বিধিঃ; বস্যৈব পুরুষস্যোপমদ্দিতঃ প্রত্যয়ো ব্রহ্মক্ষত্রাদ্যাত্মবিষয়ঃ, তস্য তৎপ্রত্যয়সন্ন্যাসাৎ তৎকার্য্যাণাৎ কৰ্ম্মণাৎ কৰ্ম্মসাধনানাঞ্চার্থপ্রাপ্তশ্চ সন্ন্যাসঃ। তস্মাদাত্মজ্ঞানাঙ্গতেন সন্ন্যাস-বিধিৎসয়ৈবাখ্যায়িকেয়মারভ্যতে। ৬
টীকা।—সম্বন্ধাভিধিৎসয়া বৃত্তং কীর্তয়তি—আত্মেত্যেবেতি। কিমিত্যাত্মতত্বমেব জ্ঞাতব্যং, ‘তত্রাহ—তদেবেতি। ইথং সূত্রিতস্য বিদ্যাবিষয়স্য বাক্যস্য ব্যাখ্যানমের বিষয়ঃ, তত্র বিদ্যা সাধনং, সাধ্যা মুক্তিরিতি সম্বন্ধঃ, মুক্তিশ্চ ফলম্, ইত্যেতে তদাত্মানমিত্যাদিনা দর্শিতে, ইত্যাহ— ইত্যুপদ্যস্তস্যেতি। বিদ্যাবিষয়মুক্তং নিগময়তি—এবমিতি। উত্তমর্থান্তরং স্মারয়তি—অবিদ্যায়া- শ্চেতি। অন্যোংসাবিত্যাদারভ্যাবিদ্যায়া বিষয়শ্চ সংসার উপসংহৃতস্ত্রয়মিত্যাদিনেতি সম্বন্ধঃ। সংসারমের বিশিনষ্টি—চাতুর্ব্বর্ণ্যেতি। চাতুর্ব্বর্ণ্যং চাতুরাশ্রম্যমিতি প্রবিভাগাদিনিমিত্তং যস্য ‘পাক্তস্য কর্ম্মণস্তস্য সাধ্যসাধনমিত্যেষমাত্মক ইতি যাবৎ। তন্ত্যানাদিত্বং দর্শয়তি—বীজাঙ্কুর- বদিতি। তমেব ত্রিধা সংক্ষিপতি—নামেতি। সচোৎকর্যাপকর্ষাভ্যাং দ্বিধা ভিদ্যতে, তত্রায়- মুদাহরতি—শাস্ত্রীয় ইতি। উৎকৃষ্টো হি সংসারস্থ্যন্নাত্মভাবঃ শাস্ত্রীয়জ্ঞানকর্মসাধ্য ইত্যর্থঃ। দ্বিতীয়ং কথয়তি—অধোভাবশ্চেতি। নিকৃষ্টঃ সংসারঃ স্বাভাবিকজ্ঞানকর্মসাধ্য ইত্যর্থঃ। ১
৬০৭
কিমিত্যবিদ্যাবিষয়ো ব্যাখ্যাতঃ, ন হি স পুরুষস্যোপযুজ্যতে, তত্রাহ-এতস্মাদিতি। প্রত্যগাত্মৈব বিষ্যস্তস্মিন্ যা ব্রহ্মেতি বিদ্যা, তস্যামিতি যাবৎ। তার্তীয়মনুদ্য চাতুর্থিকমর্থং কথয়তি-চতুর্থে ত্বিতি। ২
এবং বৃত্তমনুষ্যোত্তরব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমাহ-অস্যা ইতি। কিমিতি সংন্যাসো বিধিৎস্যতে, কৰ্ম্মণৈব বিদ্যালাভাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-জায়েতি। অবিদ্যায়া বিষয় এব বিষয়ো যস্যেতি বিগ্রহঃ। তস্মাৎ সংন্যাসো বিধিত্সিত ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ননু প্রকৃতং কৰ্ম্মাবিদ্যাবিষয়মপি কিমিত্যাত্ম- জ্ঞানং তাদর্থোনানুষ্ঠীয়মানং নোপনয়তি, তত্রাহ-অন্যেতি। তদেব দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-ন হীতি। পাক্তস্য কৰ্ম্মণোহন্যসাধনত্বমেব কথমধিগতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-মনুষ্যেতি। সোহয়ং মনুষ্য- লোকঃ পুত্রেণৈব জয্যঃ, ‘কর্মণা পিতৃলোকো বিদ্যয়া দেবলোকঃ’ ইতি বিশেষিতত্বম্। শ্রুতত্বমেব বিশেষিতত্বোক্তিদ্বারা স্ফুটীকৃতমিতি চকারেণ দ্যোত্যতে। নমু ব্রহ্মবিদ্যা স্বফলে বিহিতং কৰ্মাপেক্ষতে শ্রৌতসাধনত্বাদ্দর্শাদিবৎ, তথা চ সমুচ্চয়ান্ন কৰ্ম্মসংন্যাসসিদ্ধিরত আহ-ন চেতি। কৰ্ম্মণাং কাম্যত্বেংপি ব্রহ্মবিদস্তানি কিং ন স্যরিত্যাশঙ্ক্যাহ-ব্রহ্মবিদশ্চেতি। ইতশ্চ তস্য পুত্রাদিসাধনানুপপত্তিরিত্যাহ-যেষামিতি। ৩
সমুচ্চয়পক্ষমনুভাষ্য শ্রুতিবিরোধেন দূষয়তি-কেচিত্তিতি। শ্রুতিবিরোধমেব স্ফোরয়তি- পুত্রাদীতি। অবিদ্বদ্বিষন্নত্বং শ্রুতং, তৎপ্রকরণে তেষামুপদেশাদিতি শেষঃ। কিং প্রজয়া করিষ্যাম ইত্যত আরভ্য যেষাং নোহয়মাত্মাহয়ং লোক ইতি চ বিদ্যাবিষয়ে শ্রুতিরিতি যোজনা। এষ বিভাগঃ শ্রুত্যা কৃতস্তৈঃ সমুচ্চয়বাদিভিন শ্রুত ইতি সম্বন্ধঃ। ন কেবলং শ্রুতিবিরোধাদেব সমুচ্চয়াসিদ্ধিঃ, কিন্তু যুক্তিবিরোধাচ্চেত্যাহ-সর্ব্বেতি। দ্বিতীয়শ্চকারোহবধারণার্থো নঞা সংবধ্যতে। স্মৃতিবিরোধাচ্চ সমুচ্চয়াসিদ্ধিরিত্যাহ-ব্যাসেতি। তত্র প্রথমং পূর্ব্বোক্তং যুক্তি- বিরোধং স্ফুটয়তি-কৰ্ম্মেতি। প্রতিকূলবর্তনং নিবর্ত্যনিবর্তকভাবঃ। সম্প্রতি স্মৃতিবিরোধং স্ফোরয়তি-যদিদমিতি। প্রসিদ্ধং বেদবচনং কুরু কর্ম্মেত্যজ্ঞং প্রতি, যদিদমুপলভ্যতে; বিবেকিনং প্রতি চ ত্যজেতি; তত্র কাং গতিমিত্যাদি: শিষ্যস্য ব্যাসং প্রতি প্রশ্নঃ, তস্য বীজমাহ -এতাবিতি। বিদ্যাকর্মাখ্যাবুপান্নৌ পরস্পরবিরুদ্ধত্বে বর্তেতে, সাভিমানত্ব-নিরভিমানত্বাদি- পুরস্কারেণ প্রাতিকুল্যাৎ, সমুচ্চয়ানুপপত্তের্যথোক্তস্য প্রশ্নস্য সাবকাশত্বমিত্যর্থঃ। ইত্যেবং পৃষ্টস্য ভগবতো ব্যাসস্থ্যেতি শেষঃ। বিরোধো জ্ঞানকৰ্ম্মণোঃ সমুচ্চয়স্যেতি বক্তব্যম্। ৪
সমুচ্চয়ানুপপত্তিমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। কথং তর্হি ব্রহ্মবিদ্যা পুরুষার্থসাধনমিতি, তত্রাহ-সর্ব্ববিরোধাদিতি। সর্ব্বস্য ক্রিয়াকারকফলভেদাত্মকস্য দ্বৈতেন্দ্রজালস্য ব্রহ্মবিদ্যয়া বিরোধাদিতি যাবৎ। একাকিনী ব্রহ্মবিদ্যা মুক্তিহেতুরিতি স্থিতে ফলিতমাহ-ইতি পারি- ব্রাজ্যমিতি। ন কেবলং সংন্যাসস্থ্য শ্রবণাদিপৌষ্কল্যদৃষ্টদ্বারেণ বিদ্যাপরিপাকাঙ্গত্বং শ্রুত্যাদি- বশাদবগম্যতে, কিং তু লিঙ্গাদপীত্যাহ-এতাবদেবেতি। তত্রৈব লিঙ্গান্তরমাহ-ষষ্ঠসমাপ্তা- বিতি। এতচ্চোভয়তঃ সংবধ্যতে। যদি কৰ্ম্মসহিতং জ্ঞানং মুক্তিহেতুস্তদা কিমিতি কর্ম্মিণঃ সতো যাজ্ঞবল্ক্যস্য পারিব্রাজ্যমুচ্যতে? তস্মাৎ তত্ত্যাগস্তদঙ্গত্বেন বিধিৎসিত ইত্যর্থঃ। ৫
তত্রৈব লিঙ্গান্তরমাহ—মৈত্রেয্যৈ চেতি। ন হি মৈত্রেয়ী ভর্তরি ত্যক্তকর্ম্মণি স্বয়ং কর্ম্মাধি- কর্ত্তুমর্হতি, পতিদ্বারমন্তরেণ ভার্য্যায়ান্তদনধিকারাৎ। তথা চ তস্যৈ কৰ্ম্মশূন্যায়ৈ মুক্তেঃ সাধনত্বেন
বিদ্যোপদেশাৎ কৰ্ম্মত্যাগস্তদঙ্গত্বেন ধ্বনিত ইত্যর্থঃ। তত্রৈব হেত্বস্তরমাহ-বিত্তেতি। কিমহং তেন কুৰ্য্যামিতি বিত্তং নিন্দ্যতে। অতশ্চ তৎসাধ্যং কৰ্ম্ম জ্ঞানসহায়ত্বেন মুক্তৌ নোপকরোতী- ভ্যর্থঃ। তদেব বিবৃণোতি-যদি হীতি। তন্নিন্দাবচনমিত্যত্র তচ্ছব্দেন বিত্তমুচ্যতে। ত্বৎপক্ষে বা কণং নিন্দাবচনমিতি, তত্রাহ-যদি দ্বিতি। কিঞ্চ, ব্রাহ্মণোহহং ক্ষত্রিয়োহহমিত্যাদ্যভিমানস্থ্য কৰ্ম্মানুষ্ঠাননিমিত্তন্য নিন্দয়া সর্ব্বমিদমাত্মৈবেতি প্রত্যয়ে শ্রুতেস্তাৎপর্য্যদর্শনাবিদাঙ্গত্বেন সংন্যাসো বিধিৎসিত ইত্যাহ-কর্মাধিকারেতি। ননু জাগ্রতি বিধৌ কৰ্ম্মানুষ্ঠানমশক্যমপহারয়িতুমত- আহ-নহীতি। নমু বর্ণাশ্রমাভিমানবতঃ সংন্যাসোহপীয্যতে, স কথং তদভাবে, তত্রাহ- যস্যৈবেতি। অর্থপ্রাপ্তশ্চেত্যবধারণার্থশ্চকারঃ। প্রযোজকজ্ঞানবতো বৈধসংন্যাসাত্যুপগমাদ বিরোধ ইতি ভাবঃ। আত্মজ্ঞানাঙ্গত্বং সংন্যাসন্ত শ্রুতিস্মৃতিন্যায়সিদ্ধং চেৎ, কিমর্থমিরমাখ্যায়িকা প্রণীয়তে, তত্রাহ-তন্মাদিতি। বিধ্যপেক্ষিতার্থবাদসিদ্ধ্যর্থমাখ্যায়িকেতি ভাবঃ। ৬
আভাসভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বপ্রকরণে বলা হইয়াছে যে, আত্মা বলিয়াই আত্মার উপাসনা করিবে; সেই আত্মাই জগতে একমাত্র পদনীয় বা আশ্রয়স্থান; কারণ, পুত্র-ভার্য্যাপ্রভৃতি প্রিয়পদার্থ অপেক্ষাও উহা অধিকতর প্রিয়; এই কথারই ব্যাখ্যানস্থলে সেই আত্মাকেই ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ রূপে(আমি ব্রহ্মস্বরূপ, এই ভাবে) অবগত হইয়াছিলেন, এবং তাহার ফলে সর্ব্বাত্মভাব লাভ করিয়াছিলেন’ এই বাক্যে উহার সম্বন্ধ এবং প্রয়োজনও অভিহিত হইয়াছে(১), এবং পরমাত্মাই যে, বিদ্যার (ব্রহ্মজ্ঞানের) একমাত্র বিষয়, তাহাও এইরূপে প্রদর্শিত হইয়াছে। আবার যে লোক মনে করে, আমি অন্য, এবং আমার উপাস্য বস্তুও অন্য, প্রকৃতপক্ষে সে লোক জানে না—‘সে অজ্ঞ’, এই হইতে আরম্ভ করিয়া অবিদ্যার বিষয় অর্থাৎ অজ্ঞানা- ধিকারে বীজান্তুরবৎ অনাদিপ্রবৃত্ত ব্রাহ্মণাদি বর্ণভেদসাপেক্ষ পাণ্ডুত্ত কৰ্ম্ম-সাধ্য ব্যক্তাব্যক্তস্বভাব নামরূপ-কর্মাত্মক সংসার,—ইতঃপূর্ব্বে ‘ত্রয়ং বাব নাম রূপং কৰ্ম্ম’ এই শ্রুতিতে যাহার উপসংহার করা হইয়াছে, অবিদ্যার বিষয়ীভূত সেই সংসারের শাস্ত্রানুগত-কর্মানুসারে ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি পর্য্যন্ত উৎকর্ষ, আর অশাস্ত্রীয় কর্মানুসারে স্থাবরভাবপ্রাপ্তি পর্য্যন্ত অপকর্ষ বা অধোগতি হইয়া থাকে; সে কথাও “দ্বরা হ প্রাজাপত্যাঃ” ইত্যাদি শ্রুতিতে পূর্ব্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে। ১
(১) তাৎপর্য্য—কোন বিষয় বুঝিতে বা বুঝাইতে হইলে প্রথমেই বক্তব্য বিষয়, তাহার ফল বা প্রয়োজন এবং সেই বিষয় ও প্রয়োজনের মধ্যে যেরূপ সম্বন্ধ, তাহা প্রতিপাদন করিতে হয়; এই কারণে ভাষ্যকার এখানে সাধারণভাবে বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজনের কথা সূচনা করিয়া দিয়াছেন। এখানে ব্রহ্মবিদ্যা হইতেছে বিষয়, মুক্তি তাহার প্রয়োজন বা ফল; আর বিদ্যা ও মুক্তির মধ্যে সাধ্য-সাধনরূপ সম্বন্ধ, অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা সাধন, মুক্তি তাহার সাধ্য, ব্রহ্ম- বিদ্যা দ্বারা মুক্তিফল লাভ করিতে হয়। “তদাত্মানমেব অবেৎ” ইত্যাদি বাক্যেও এইরূপ সাধ্যসাধনভাবই প্রতিপাদিত হইয়াছে।
৬০৯
উক্তপ্রকার অবিদ্যার বিষয়ীভূত সংসারে যাহার বৈরাগ্যোদয় হইয়াছে, তাহার যাহাতে পরমাত্মবিষয়ক ব্রহ্মবিদ্যালাভ হইতে পারে, তজ্জন্য উপনিষদের প্রথম অধ্যায়োক্ত অবিদ্যার বিষয় সমস্তই তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত হইয়াছে; চতুর্থ অধ্যায়ে(উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ে) “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি” “ব্রহ্ম জ্ঞপয়িষ্যামি” বলিয়া ব্রহ্মবিদ্যার বিষয়ীভূত পরমাত্মার প্রস্তাব করিয়া, সেই নির্বিশেষ এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মকেই আবার ক্রিয়া কারক ও ফলস্বভাব সত্যসংজ্ঞক নিখিল মূর্ত্ত- ধৰ্ম্ম নিষেধপূর্ব্বক “নেতি নেতি” বলিয়া জ্ঞাপন করিয়াছেন। ২
এখন উক্ত ব্রহ্মবিদ্যারই অঙ্গরূপে সন্ন্যাসবিধান করা শ্রুতির অভিপ্রেত; কারণ, অবিদ্যার বিষয়ীভূত পত্নী, পুত্র ও বিত্তাদিসাধ্য পাঙক্ত কর্মগুলি আত্ম- প্রাপ্তির উপায় নয়; অথচ যাহা যে ফল-সাধনে অসমর্থ, সে ফলের জন্য তাহার নিয়োগ করিলেও, তাহা হইতে প্রতিকূল অর্থাৎ অনিষ্ট ফল ভিন্ন, ইষ্টফল হইতে পারে না; কারণ, ধাবন বা গমন কখনই ক্ষুধা-পিপাসার নিবৃত্তি-সাধন হইতে পারে না; পাঙক্তকর্মাঙ্গ পুত্রপ্রভৃতি সাধনগুলিও মনুষ্যলোক, পিতৃলোক ও দেবলোকপ্রাপ্তির উপায়রূপেই বিহিত হইয়াছে; কিন্তু আত্মলাভের উপায়রূপে বিহিত হয় নাই; সুতরাং সে সমুদয় দ্বারা কখনই আত্মলাভ হইতে পারে না; প্রমাণান্তর দ্বারাও এ কথা সমর্থিত হইয়াছে। বিশেষতঃ যথোক্ত সাধনগুলি ব্রহ্ম- বিদ ব্যক্তির জন্য বিহিতও হয় নাই; কারণ, “এতাবান্ বৈ কামঃ”(এই পর্যন্তই কামনার বিষয়); এইরূপে ঐ সকল সাধনের কাম্যত্বই শ্রুত হইয়াছে। ব্রহ্মবিদ্ ব্যক্তি আপ্তকাম(যিনি সমস্ত কাম্য বিষয় প্রাপ্ত হইয়াছেন, সেই) আপ্তকাম পুরুষের ত কোন প্রকার কামনাও সম্ভবপর হয় না; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন— ‘যাহা দ্বারা আমাদের এই আত্মলাভরূপ ফল সিদ্ধ হয় না’ ইত্যাদি। ৩
কেহ কেহ ব্রহ্মবিদ্গণেরও এষণাসম্বন্ধ(কামনাসম্বন্ধ) বর্ণনা করিয়া থাকেন; প্রকৃতপক্ষে তাঁহারা বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ পড়েন ‘নাই। পুত্রাদি কামনা যে, অবিদ্যাধিকারে প্রবৃত্ত, এবং বিদ্যাবিষয়ে যে, তাহার সম্বন্ধই নাই, ইহাযে, ‘যাহাতে আমাদের এই আত্মারূপ লোক লব্ধ হয় না’ এবং ‘আমরা সন্তানদ্বারা কি করিব?’ এই সকল শ্রুতিই বিভাগ করিয়া বলিয়া দিয়াছেন, তাহা তাহারা নিশ্চয়ই শোনে নাই; এবং ক্রিয়া কারক ও ফলাদি সর্ব্ববিধ ভেদনিবর্ত্তক বিদ্যার উদয়ে যে, অবিদ্যা ও তৎকার্য্যোদয়ের অসম্ভাবনারূপ বিরোধ উপস্থিত হয়, তাহাও তাহারা অবগত হয় নাই; অধিক কি, বেদব্যাসের উক্তিটি পর্য্যন্তও তাহারা শ্রবণ করে নাই। [বিরোধ এই যে,] কৰ্ম্ম হইতেছে অবিদ্যাত্মক, আর বিদ্যা হইতেছে জ্ঞানাত্মক;
সুতরাং বিরুদ্ধস্বভাব বিদ্যা ও অবিদ্যা একত্র থাকিতে পারে না;[ব্যাসোক্ত স্মৃতিবাক্য এই যে,] ‘কর্মের অনুষ্ঠান কর, এবং কর্মানুষ্ঠান ত্যাগ কর, এইরূপ পরস্পর বিরুদ্ধ বেদবাক্য দেখিতে পাওয়া যায়; অতএব আপনার নিকট ইহা জানিতে ইচ্ছা করি যে, উক্ত জ্ঞান ও কর্মের স্বরূপ একরূপ নয়; সুতরাং উহারা পরস্পর প্রতিকূলস্বভাব। উহাদের মধ্যে বিদ্যাদ্বারাই বা কিপ্রকার গতি লাভ করে? আর কৰ্ম্ম দ্বারাই বা কিরূপ গতি লাভ করে? আপনি তাহা আমাকে বলুন।’ এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে পর, তদুত্তরে ব্যাসদেব—‘জীব কৰ্ম্ম দ্বারা বদ্ধ হয়, আর বিদ্যাদ্বারা বিমুক্ত হয়; সেই হেতু তত্ত্বদর্শী যতিগণ কর্মানুষ্ঠানে বিরত থাকেন’ ইত্যাদি বাক্যে জ্ঞান ও কর্মের বিরোধ প্রদর্শন করিয়াছেন। ৪
অতএব সর্ব্বতোভাবে বিরুদ্ধ-স্বভাব বলিয়াই ব্রহ্মবিদ্যাকে অপর কোনও সাধন-সহযোগে পুরুষার্থ-সাধন অর্থাৎ মোক্ষলাভের উপায় বলা যাইতে পারে না; পরন্তু কর্মাদি অপর কোনও সাধনের সাহায্য না লইয়াই ব্রহ্মবিদ্যা পুরুষার্থ- সম্পাদন করিয়া থাকে; এই জন্য শ্রুতি সর্ব্ববিধ সাধন-পরিত্যাগরূপ পারিব্রাজ্য বা সন্ন্যাসকেই ব্রহ্মবিদ্যার অঙ্গরূপে নির্দেশ করিয়াছেন(১)। ষষ্ঠাধ্যায়ে ব্রহ্ম- বিদাই মুক্তিলাভের একমাত্র সাধনরূপে অবধারিত হওয়ায় এবং সেই ষষ্ঠাধ্যায়েই কর্মপরায়ণ যাজ্ঞবল্ক্য ঋষির সন্ন্যাস-গ্রহণ হইতেও ইহাই নিশ্চিত হইতেছে যে, সন্ন্যাসই বিদ্যালাভের একমাত্র উপায়, কর্মাদি নহে। ৫
(১) তাৎপর্য্য-সন্ন্যাসের নামান্তর পারিব্রাজ্য। সন্ন্যাস-গ্রহণের বিধি দুই প্রকার,- (১) বিবিদিযা সন্ন্যাস ও(২) বিদ্বৎসন্ন্যাস। প্রথমে ব্রহ্মচর্য্য সমাপ্ত করিয়া ক্রমে গার্হস্থ্য ও বানপ্রস্থ আশ্রমের পর ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের জন্য যে, সন্ন্যাস-গ্রহণ, তাহাকে বলে ‘বিবিদিযা সন্ন্যাস’; আর যাহারা সংসারের অসারতা উপলব্ধি করিয়া তীব্র বৈরাগ্যবশে, যে কোন আশ্রম হইতে সন্ন্যাস গ্রহণ করে, তাহাদের সন্ন্যাসকে বলে ‘বিদ্বৎসন্ন্যাস’। যাহাদের হৃদয়ে তীব্র বৈরাগ্যের সঞ্চার হয় নাই, তাহারা যদি ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য ও বানপ্রস্থ আশ্রম সমাপ্ত না করিয়াই কেবল মানসিক কৌতূহলবশে হঠাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করে, তবে তাহা প্রকৃত সন্ন্যাস বলিয়া পরিগণিত হয় না, পরন্তু সেরূপ সন্ন্যাস গ্রহণ অনিষ্টকরই হইয়া থাকে। যাজ্ঞবল্ক্য বলিয়াছেন “ঋণানি ত্রীণ্যপাকৃত্য মনো মোক্ষে নিবেশয়েৎ। অনপাকৃত্য মোক্ষস্তু সেবমানো ব্রজভ্যধঃ।” অর্থাৎ দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণ পরিশোধ করিয়া মোক্ষপথে মন দিবে, উক্ত ঋণত্রয় পরিশোধ না করিয়া সন্ন্যাস গ্রহণ করিলে লোক অধোগামী হয়। উক্ত উভয়বিধ সন্ন্যাসগ্রহণেই যথাবিধি হোম করিয়া স্বীয় বর্ণাশ্রমাদি চিহ্ন বিসর্জন দিতে হয়; সুতরাং তখন সন্ন্যাসীর বর্ণাশ্রমগত কোন কর্ম্মেই অধিকার থাকে না। তাই এখানে সন্ন্যাস আশ্রমকে সর্ব্ববিধ সাধনত্যাগাত্মক বলা হইয়াছে।
৬১১
বিশেষতঃ কর্মরূপ সাধনশূন্যা মৈত্রেয়ীকে স্বয়ং যাজ্ঞবল্ক্য ঋষিও মুক্তিলাভের উপায়রূপে ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ দিয়াছেন, এবং ধন-সম্পদের নিন্দাও করিয়াছেন; কৰ্ম্ম যদি সত্য সত্যই অমৃতত্বলাভের সাধন হইত, তাহা হইলে, যে বিত্ত দ্বারা পাক্ত কৰ্ম্ম নিষ্পাদন করিতে হয়, সেই বিত্তের নিন্দা করা নিশ্চয়ই তাহার পক্ষে সঙ্গত হইত না; পক্ষান্তরে, কৰ্মত্যাগ করানই যদি তাহার অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলেই কৰ্ম্ম-সাধন বিত্তের ঐরূপ নিন্দাবচন যুক্তিযুক্ত হইতে পারে। তাহার পর, ‘ব্রহ্ম(ব্রাহ্মণত্ব) তাহাকে পরাভূত করে, ক্ষত্রিয়ত্ব তাহাকে পরাভূত করে’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতেও জানা যায় যে, ব্রহ্মবিদ্যা-প্রভাবে কর্মাধিকারের নিমিত্তী- ভূত বর্ণাশ্রমাদি বোধ তখন বিদূরিত হইয়া যায়; আত্মগত ব্রাহ্মণত্ব-ক্ষত্রিয়ত্বাদি বুদ্ধি বিনষ্ট হইয়া গেলে পর, ‘ব্রাহ্মণের ইহা কর্তব্য, ক্ষত্রিয়ের ইহা কর্তব্য’ ইত্যাদি রূপে নিয়োগের পাত্র না থাকায় বর্ণাশ্রমাদিসাপেক্ষ কোন বিধিই কার্য্য করিতে পারে না। যে ব্যক্তির স্বগত ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ত্বাদি জাত্যভিমান বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে, তাহার সেই ব্রাহ্মণত্বাদি অভিমান না থাকায়, সেই অভিমানমূলক যে সমুদয় কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্মসাধন কর্তব্য ছিল, ফলেফলে সে সমুদয়েরও সন্ন্যাস সিদ্ধই হইয়াছে। অতএব সেই আত্মজ্ঞানের অঙ্গরূপে সন্ন্যাসবিধানের জন্য এখন এই আখ্যায়িকার অবতারণা করা হইতেছে,
মৈত্রেয়ীতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্য উদ্যাস্যন্ বা অরেহ- মস্মাৎ স্থানাদস্মি, হন্ত তেহনয়া কাত্যায়ন্যাহন্তং করবা- ণীতি ॥ ১০৭ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—[ ইদানীমাত্মজ্ঞানাঙ্গত্বেন সন্ন্যাসবিধানার্থমিয়মাখ্যায়িকা প্রারভ্যতে—‘মৈত্রেয়ীতি’ ইতি]। যাজ্ঞবল্ক্যঃ(স্বনামপ্রসিদ্ধ ঋষিঃ) হে মৈত্রেয়ি, ইতি উবাচ হ(মৈত্রেয়ীনাম্নীৎ স্বভার্য্যাৎ সম্বোধয়ামাস—) অরে(অয়ি মৈত্রেয়ি), অহং অস্মাৎ স্থানাৎ(গার্হস্থ্যাশ্রমাৎ) উদ্যাস্যন্(ঊর্দ্ধং উৎকৃষ্টং সন্ন্যাসাশ্রমং যাস্যন্) অস্মি(ভবামি, গার্হস্থ্যং ত্যক্তা সন্ন্যাসাশ্রমং গ্রহীতুং কৃতনিশ্চয়োহস্মি ইত্যর্থঃ);[অতঃ] হস্ত(তব সম্মতিং প্রার্থয়ে), অনয়া কাত্যায়ন্যা(কাত্যায়নী- নামধেয়য়া দ্বিতীয়য়া ভার্য্যয়া সহ) তে(তব) অন্তৎ(সপত্নীতয়া যঃ ধনাদিসম্বন্ধ আসীৎ, তস্য বিচ্ছেদং) করবাণি(কর্তৃমিচ্ছামি, সম্পদঃ যুবাভ্যাং বিভজ্য প্রদায় গমিষ্যামীতি ভাবঃ)। ১০৭ ॥ ১॥
মূলানুবাদ।—প্রসিদ্ধ যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি নিজ ভার্য্যা মৈত্রেয়ীকে
সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—অরে মৈত্রেয়ি, আমি এই গৃহস্থাশ্রম হইতে ঊর্দ্ধে যাইতে ইচ্ছা করিতেছি, অর্থাৎ এতদপেক্ষা উৎকৃষ্ট সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণ করিব মনস্থ করিয়াছি; অতএব, সম্মতি প্রার্থনা করিতেছি; এই দ্বিতীয়া ভার্য্যা কাত্যায়নীর সহিত তোমার বিভাগ করিয়া দিতে ইচ্ছা করি, অর্থাৎ তোমাদের উভয়কে ধনসম্পদ্ বিভাগ করিয়া দিতে ইচ্ছা করিতেছি ॥ ১০৭ ॥ ১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—মৈত্রেয়ীতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ,—মৈত্রেয়ীং স্বভার্য্যা- মামন্ত্রিতবান্ যাজ্ঞবল্ক্যো নাম ঋষিঃ। উদ্যাস্যন্ ঊর্দ্ধং যাস্যন্ পারি- ব্রাজ্যাখ্যম্ আশ্রান্তরং বৈ; ‘অরে’ ইতি সম্বোধনম্; অহম্ অস্মাদ গার্হস্থ্যাৎ স্থানাৎ আশ্রমাৎ ঊর্দ্ধং গন্তুমিচ্ছন্ অস্মি ভবামি; অতঃ, হন্ত অনুমতিং প্রার্থয়ামি তে তব। কিঞ্চান্যৎ—তে তব অনয়া দ্বিতীয়য়া ভার্য্যয়া কাত্যায়ন্যা অন্তং বিচ্ছেদং করবাণি—পতিদ্বারেণ যুবয়োৰ্ম্ময়া সংবধ্যমানয়োর্যঃ সম্বন্ধ আসীৎ, তস্য সম্বন্ধস্য বিচ্ছেদৎ করবাণি দ্রব্যবিভাগং কৃত্বা; বিত্তেন সংবিভজ্য যুবাৎ গমিষ্যামি ॥ ১০৭॥ ১॥
টীকা।—ভার্য্যামামন্ত্র্য কিং কৃতবানিতি, তদাহ—উদ্যাস্যন্নিতি। বৈশব্দোহবধারণার্থঃ। আশ্রমান্তরং যাস্যন্নেবাহমস্মীতি সম্বন্ধঃ। যথোক্তেচ্ছানন্তরং ভার্য্যায়াঃ কর্তব্যং দর্শয়তি—অত ইতি। সতি ভার্য্যাদৌ সংন্যাসস্য তদনুজ্ঞাপূর্ব্বকত্বনিয়মাদিতি ভাবঃ। কর্ত্তব্যান্তরং কথয়তি— কিঞ্চেতি। আবয়োর্বিচ্ছেদঃ স্বাভাবিকোহস্তি, কিং তত্র কর্ত্তব্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ—পতিদ্বারেণেতি। ত্বয়ি প্রব্রজিতে স্বয়মেবাবয়োর্বিচ্ছেদো ভবিষ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ—দ্রব্যেতি। বিত্তে তু ন স্ত্রীস্বাতন্ত্র্য- মিতি ভাবঃ। ১০৭।১।
ভাষ্যানুবাদ।—“মৈত্রেয়ীতি হ উবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ” কথার অর্থ—যাজ্ঞ- বন্ধ্যনামক ঋষি স্বীয় ভার্য্যা মৈত্রেয়ীকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিয়াছিলেন;—‘অরে’ শব্দটি মৈত্রেয়ীর সম্বোধনসূচক;[ অরে মৈত্রেয়ি,] আমি এই স্থান হইতে অর্থাৎ গার্হস্থ্যাশ্রম হইতে উপরে যাইতে—উৎকৃষ্ট পারিব্রাজ্যনামক সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক হইয়াছি; হস্ত—[ এ বিষয়ে] তোমার অনুমতি প্রার্থনা করি- তেছি। আরও এক কথা, আমার এই দ্বিতীয়া ভার্য্যা কাত্যায়নীর সহিত তোমার অন্ত—বিচ্ছেদ অর্থাৎ বিভাগ করিয়া দিতে ইচ্ছা করি; আমার সহিত সম্বন্ধ- নিবন্ধন তোমাদের উভয়ের মধ্যে যে সপত্নীত্বরূপ সম্বন্ধ ছিল, ধনসম্পদ্ বিভাগ করিয়া দিয়া সেই সম্বন্ধের বিচ্ছেদ করিতে ইচ্ছা করি; ধনবিভাগ দ্বারা তোমা- দিগকে বিভক্ত করিয়া আমি চলিয়া যাইব ॥ ১০৭॥ ১ ॥
৬১৩
সা হোবাচ মৈত্রেয়ী যনু ম ইয়ং ভগোঃ সর্ব্বা পৃথিবী বিত্তেন পূর্ণা স্যাৎ কথং তেনামৃতা স্যামিতি, নেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—যথৈবোপকরণবতাং জীবিতং তথৈব তে জীবিতং স্যাদমৃতত্বস্য তু নাশাহস্তি বিত্তেনেতি ॥ ১০৮ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।—সা(এবমুক্তা) মৈত্রেয়ী উবাচ—(যাজ্ঞবল্ক্যম্ উক্তবতী) হ(কিল) ভগোঃ(হে ভগবন্,) যৎ(যদি) নু(বিতর্কে) বিত্তেন পূর্ণা(ধন- সহিতা) ইয়ং(অনুভূয়মানা) সর্ব্বা(সম্পূর্ণা) পৃথিবী মে(মম) স্যাৎ(ভবেৎ), [ কথমিতি ক্ষেপে প্রশ্নে বা] তেন(তাদৃশপৃথিবীসম্ভাবেন) অহং অমৃতা(মৃত্যু- রহিতা বিমুক্তা) কথং স্যাম্?(ভবেয়ং কিম্?); যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ(প্রত্যুবাচ) হ—ন ইতি। উপকরণবতাৎ(ভোগসাধনসম্পন্নানাং) জীবিতং(জীবনং) যথা স্যাৎ(লৌকিকসুখবহুলং ভবেৎ), তথৈব(তদ্বদেব) তে(তব অপি) জীবিতং(সুখিতং) স্যাৎ; বিত্তেন(ধনেন, ধনসাধ্যেন বা কর্মণা) তু(পুনঃ) অমৃতত্বস্য(মোক্ষস্য) আশা,(সম্ভাবনাপি) নাস্তি ইতি ॥ ১০৮ ॥ ২ ॥
মূলানুবাদ?—মৈত্রেয়ী এই কথা শুনিয়া যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—ভগবন্, ধনসম্পদে পূর্ণা এই সমস্ত পৃথিবী যদি আমার[হস্তগত] হয়, তবে তাহা দ্বারা আমি মৃত্যুরহিত(মুক্ত) হইতে পারিব কি?[প্রত্যুত্তরে] যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—না; তবে জগতে ভোগোপকরণসম্পন্ন ধনীদিগের জীবন যেরূপ হইয়া থাকে, তোমার জীবনও সেইরূপ(সুখসম্পন্ন) হইতে পারে, কিন্তু বিত্ত বা বিত্তসাধ্য কর্ম্ম দ্বারা অমৃতত্বলাভের আশাও নাই ইতি ॥ ১০৮॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—সা এবমুক্তা হ উবাচ—যৎ যদি, ‘নু’ ইতি বিতর্কে; মে মম ইয়ং পৃথিবী ভগো ভগবন্, সর্ব্বা সাগরপরিক্ষিপ্তা বিত্তেন ধনেন পূর্ণা স্যাৎ—কথম্—ন কথঞ্চনেতি আক্ষেপার্থঃ; প্রশ্নার্থো বা, তেন পৃথিবীপূর্ণ-বিত্ত- সাধ্যেন কর্মণা অগ্নিহোত্রাদিনা অমৃতা কিং স্যাম্? ইতি ব্যবহিতেন সম্বন্ধঃ। প্রত্যুবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। কথমিতি যদি আক্ষেপার্থম্, অনুমোদনং—নেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্য ইতি; প্রশ্নশ্চেৎ—প্রতিবচনার্থম্—নৈব স্যাঃ অমৃতা; কিং তর্হি? যথৈব লোকে উপকরণবতাং সাধনবতাং জীবিতং সুখোপায়ভোগসম্পন্নম্, তথৈব
তদ্বদেব তব জীবিতং স্যাৎ; অমৃতত্বস্য তু ন আশা মনসাপি অস্তি বিত্তেন— বিত্তসাধ্যেন কর্ম্মণেতি ॥ ১০৮ ॥ ২ ॥
টাকা। -মৈত্রেয়ী মোক্ষমেবাপেক্ষমাণা ভর্তারং প্রতানুকূল্যমাত্মনো দর্শয়তি-সৈবমিতি। কর্মসাধ্যস্থ গৃহপ্রাসাদাদিবন্নিত্যত্বানুপপত্তিরাক্ষেপনিদানম্। কথংশবদ্য প্রশ্নার্থত্বপক্ষে বাক্যং যোজয়তি-তেনেতি। কথং তেনেত্যত্র কথংশব্দেন কিমহং তেনেত্যত্রত্যং কিংশব্দমুপাদায় বাক্যং যোজনীয়ম্। বিত্তসাধ্যস্থ কৰ্ম্মণোহমৃতত্বসাধনত্বমাত্রাসিদ্ধৌ তৎপ্রকারপ্রশ্নস্য নিরবকাশত্বা- দিত্যর্থঃ। মুনিরপি ভার্য্যাহৃদয়াভিজ্ঞঃ সন্তুষ্টঃ সন্নাক্ষেপং প্রশ্নং চ প্রতিবদতীত্যাহ-প্রত্যু- বাচেতি। বিত্তেন মমামৃতত্বাভাবে তদকিঞ্চিৎকরমদেয়মিত্যাশঙ্ক্যাহ-কিং তহীতি। ১০৮।২।
ভাষ্যানুবাদ।—[যাজ্ঞবল্ক্য] এইরূপ বলিলে পর, মৈত্রেয়ী তাঁহাকে বলিলেন,—শ্রুতির ‘মু’ শব্দটি বিতর্ক-সূচক। ভগোঃ—হে ভগবন্, যদি সমস্ত অর্থাৎ সাগরপরিবেষ্টিতা ও ধনপূর্ণা এই পৃথিবীও কি কোন প্রকারে আমার [অধিকারভুক্ত] হইতে পারে, কোন প্রকারেই নহে; ইহা হইতেছে ‘কথম্’ শব্দের ‘আক্ষেপার্থ’ পক্ষে,(১) এখানে ‘কথং’ শব্দের প্রশ্নার্থও হইতে পারে;—সে পক্ষে অর্থ হইতেছে এই—পৃথিবীপূর্ণ ধন দ্বারা নিষ্পাদ্য অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্ম দ্বারা আমি অমৃতা হইতে পারিব কি? যাজ্ঞবল্ক্য প্রত্যুত্তরে বলিলেন—।[এখানে বুঝিতে হইবে] ‘কপম্’ শব্দটি যদি আক্ষেপার্থক হয়, তাহা হইলে ‘নেতি হোবাচ যাজ্ঞ- বন্যঃ’ বাক্যটি হইবে অনুমোদনসূচক, আর যদি প্রশ্নার্থক হয়, তাহা হইলে হইবে প্রত্যুত্তর বোধক—নিশ্চয়ই অমৃতা হইবে না; তবে কি না, জগতে উপকরণবান্— সুখসাধনসমন্বিত ধনীদিগের জীবন যেরূপ সুখভোগসম্পন্ন হইয়া থাকে, তোমার জীবনও ঠিক তদ্রূপই হইতে পারে; কিন্তু বিত্ত বা বিত্তসাধ্য কর্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা মনে মনেও অমৃতত্ব লাভের আশা করা যাইতে পারে না॥ ১০৮॥ ২॥
সা হোবাচ মৈত্রেয়ী যেনাহং নামৃতা স্যাং, কিমহং তেন কুৰ্য্যাম্, যদেব ভগবান্ বেদ তদেব মে ক্রহীতি ॥ ১০৯ ॥ ৩ ॥
৬১৫
সরলার্থঃ।—[এবমুক্তা] সা মৈত্রেয়ী উবাচ হ—যেন(বিত্তেন বিত্তসাধ্যেন কর্ম্মণা বা) অমৃতা(মৃত্যুরহিতা) ন স্যাং(ন ভবেয়ম্); তেন বিত্তেন অহং কিং কুৰ্য্যাম্(ন কিমপীতি ভাবঃ)। ভগবান্(পূজনীয়ঃ ভবান্) যৎ এব[অমৃতত্ব- সাধনং] বেদ(জানাতি), তদেব মে(মহ্যং) ব্রূহি(কথয় ইত্যর্থঃ) ॥১০৯৷৷৩৷৷
মূলানুবাদঃ—এই কথা শুনিয়া মৈত্রেয়ী বলিলেন,—যে বিত্ত বা বিত্তসাধ্য কর্ম্ম দ্বারা আমি অমৃতা হইব না, আমি তাহা দ্বারা কি করিব?(তাহাতে আমার কিছুই প্রয়োজন নাই)। আপনি যাহা নিশ্চিতরূপে অমৃতত্বসাধন বলিয়া জানেন, তাহাই আমাকে বলুন॥ ১০৯॥৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—সা হোবাচ মৈত্রেয়ী। এবমুক্তা প্রত্যুবাচ মৈত্রেয়ী— যদ্যেবৎ যেনাহং নামৃতা স্যাম্, কিমহং তেন বিত্তেন কুৰ্য্যাম্? যদেব, ভগবান্ কেবলমমৃতত্বসাধনং বেদ, তদেবামৃতত্বসাধনং মে মহ্যং ক্রহি ॥ ১০৯ ॥ ৩ ॥
টীকা।—বিত্তস্যামৃতত্বসাধনত্বাভাবমধিগম্য তস্মিন্নাস্থাং ভ্যক্ত্বা। মুক্তিসাধনমেবাত্মজ্ঞানমাত্মার্থং দাতুং পতিং নিযুঞ্জানা ক্রতে—সা হেতি। ১০৯।৩।
ভাষ্যানুবাদ।—‘সা হ উবাচ মৈত্রেয়ী’ ইত্যাদি। মৈত্রেয়ী এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রত্যুত্তরে বলিলেন,—এইরূপই যদি হয়, তবে আমি যাহা দ্বারা অমৃতা হইব না, সেই বিত্ত দ্বারা কি করিব? অর্থাৎ বিত্তে আমার কোন প্রয়োজন নাই; পূজনীয় আপনি যাহা শুধু অমৃতত্বলাভের উপায় বলিয়া জানেন, আমাকে সেই অমৃতত্বসাধনই বলুন ॥ ১০৯ ॥ ৩ ॥
স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—প্রিয়া বতারে নঃ সতী প্রিয়ং ভাষসে, এহ্যাস্ব, ব্যাখ্যাস্যামি তে, ব্যাচক্ষাণস্য তু মে নিদিধ্যাসস্বেতি ॥ ১১০ ॥ ৪ ॥
সরল্যার্থঃ।—সঃ(এবমভিহিতঃ) যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ—বত(অনু- কম্পায়াৎ, আহলাদে বা) অরে মৈত্রেয়ি,[ত্বং] নঃ(অস্মাকং) প্রিয়া(প্রীতি- ভাজনং) সতী[ইদানীমপি] প্রিয়ং(মনোহনুকূলং) ভাষসে(কথয়সি); এহি(আগচ্ছ); আস্ব(উপবিশ)[মম সমীপে]; তে(তব)[অভীষ্টম্ অমৃতত্বসাধনম্] ব্যাখ্যাস্যামি(বিস্তরেণ কথয়িষ্যামি)। ব্যাচক্ষাণস্য(ব্যাখ্যানং কুর্ব্বতঃ) মে(মম)[বচনানি] তু নিদিধ্যাসস্ব(অর্থং নিশ্চিত্য ধ্যাতুমিচ্ছ) ইতি ॥ ১১০ ॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ?—[মৈত্রেয়ী এই কথা বলিলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য আহলাদ সহকারে বলিলেন,]—অরে মৈত্রেয়ি, তুমি পূর্ব্বেও আমার প্রিয়া(প্রিয়কারিণী) ছিলে, এখনও আমার মনের মত কথাই বলিতেছ; এস, আমার নিকট উপবেশন কর; আমি তোমার অভীষ্ট বিষয় বিস্তৃতভাবে বলিতেছি; ব্যাখ্যাকালে তুমি আমার কথা স্থিরচিত্তে অবধারণ কর ॥ ১১০ ॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। এবং বিত্তসাধ্যেহমৃতত্ব- সাধনে প্রত্যাখ্যাতে, যাজ্ঞবল্ক্যঃ স্বাভিপ্রায়সম্পত্তৌ তুষ্ট আহ, স হোবাচ—প্রিয়া ইষ্টা, বতেত্যনুকম্প্যাহ—অরে মৈত্রেয়ি, নোহম্মাকং পূর্ব্বমপি প্রিয়া সতী ভবন্তী ইদানীং প্রিয়মেব চিত্তানুকূলং ভাষসে; অতঃ এহি আসস্ব উপবিশ, ব্যাখ্যাস্যামি —যৎ তে তব ইষ্টমমৃতত্বসাধনমাত্মজ্ঞানং কথয়িষ্যামি। ব্যাচক্ষাণস্য তু মে মম ব্যাখ্যানং কুর্ব্বতঃ, নিদিধ্যাসস্ব বাক্যানি অর্থতো নিশ্চয়েন ধ্যাতু- মিচ্ছেতি ॥ ১১০॥ ৪॥
টীকা।—ভার্য্যাপেক্ষিতং মোক্ষোপায়ং বিবক্ষুস্তামাদৌ স্তৌতি—স হেত্যাদিনা। বিত্তেন সাধ্যং কৰ্ম্ম, তস্মিন্নমৃতত্বসাধনে শঙ্কিতে কিমহং তেন কুৰ্য্যামিতি ভার্য্যয়াহপি প্রত্যাখ্যাতে সতীতি যাবৎ। স্বাভিপ্রায়ো ন কৰ্ম্ম মুক্তিহেতুরিতি, তস্য ভার্য্যাদ্বারাহপি সম্পত্তৌ সত্যামিত্যর্থঃ। ১১০।৪।
ভাষ্যানুবাদ।—“স হ উবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ” ইতি। মৈত্রেয়ী এইরূপে বিত্তসাধ্য আপেক্ষিক অমৃতত্বসাধন কৰ্ম্ম প্রত্যাখ্যান করিলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য স্বীয় অভিলাষ সিদ্ধ হওয়ায় পরিতুষ্ট হইয়া বলিলেন—তিনি সদয় হৃদয়ে বলিলেন,— অরে মৈত্রেয়ি, তুমি পূর্ব্বেও আমাদের প্রিয়া অর্থাৎ প্রীতিভাজন ছিলে, এখনও প্রিয়ই—মনের মত কথাই বলিতেছ; অতএব এস, উপবেশন কর,[তোমার অভিলষিত বিষয়] আমি ব্যাখ্যা করিব। ব্যাখ্যাকালে আমার কথাগুলি নিদিধ্যাসন কর—তাহার অর্থ নিশ্চয় করিয়া চিন্তা করিতে ইচ্ছা কর, অর্থাৎ আমার বর্ণিত বিষয় অবধারণ করিয়া তদ্বিষয়ে ধ্যান কর ॥ ১১০॥ ৪॥ A12
স হোবাচ—ন বা অরে পত্যুঃ কামায় পতিঃ প্রিয়ো ভবতি, আত্মনস্তু কামায় পতিঃ প্রিয়ো ভবতি। ন বা অরে জায়ায়ৈ কামায় জায়া প্রিয়া ভবতি, আত্মনস্তু কামায় জায়া প্রিয়া ভবতি। ন বা অরে পুত্রাণাং কামায় পুত্রাঃ প্রিয়া ভবন্তি, আত্মনস্তু
কামায় পুত্রাঃ প্রিয়া ভবন্তি। ন বা অরে বিত্তস্য কামায় বিত্তং প্রিয়ং ভবতি, আত্মনস্ত কামায় বিত্তং প্রিয়ং ভবতি। ন বা অরে ব্রহ্মণঃ কামায় ব্রহ্ম প্রিয়ং ভবতি, আত্মনস্ত কামায় ব্রহ্ম প্রিয়ং ভবতি। ন বা অরে ক্ষত্রস্য কামায় ক্ষত্রং প্রিয়ং ভবতি, আত্মনস্ত কামায় ক্ষত্রং প্রিয়ং ভবতি। ন বা অরে লোকানাং কামায় লোকাঃ প্রিয়া ভবন্তি, আত্মনস্ত কামায় লোকাঃ প্রিয়া ভবন্তি। ন বা অরে দেবানাং কামায় দেবাঃ প্রিয়াঃ ভবন্তি, আত্মনস্ত কামায় দেবাঃ প্রিয়া ভবন্তি। ন বা অরে ভূতানাং কামায় ভূতানি প্রিয়াণি ভবন্তি, আত্মনস্ত কামায় ভূতানি প্রিয়াণি ভবন্তি। ন বা অরে সর্ব্বস্য কামায় সর্ব্বং প্রিয়ং ভবতি, আত্মনস্ত কামায় সর্ব্বং প্রিয়ং ভবতি। আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যো মৈত্রেয়ি; আত্মনো বা অরে দর্শনেন শ্রবণেন মত্যা বিজ্ঞানেনেদং সর্ব্বং বিদিতম্ ॥১১১॥৫৷৷
সরলার্থঃ।—[অমৃতত্বসাধনং বৈরাগ্যমুপদিশন্ আহ—“না বা অরে” ইত্যাদি।] সঃ(যাজ্ঞবল্ক্যঃ) উবাচ হ—অরে মৈত্রেয়ি, পত্যুঃ কামায়(সুখাদি- প্রয়োজনায়) পতিঃ ন বৈ(নৈব) প্রিয়ঃ(প্রীতিভাক্) ভবতি;[কিং তর্হি?] আত্মনঃ তু(এব) কামায়(প্রয়োজনায়)[ভার্য্যায়াঃ] প্রিয়ঃ ভবতি; তথা অরে মৈত্রেয়ি, জায়ায়ৈ(জায়ায়াঃ) কামায় জায়া ন বৈ[পত্যুঃ] প্রিয়া ভবতি; [কিং তর্হি?] আত্মনঃ তু(এব) কামায় জায়া(পত্নী)[পত্যুঃ] প্রিয়া [প্রেমাস্পদং] ভবতি; তথা, অরে মৈত্রেয়ি, পুত্রাণাং কামায় পুত্রাঃ ন বৈ [পিতুঃ] প্রিয়াঃ ভবন্তি, আত্মনঃ তু(এব) কামায় পুত্রাঃ প্রিয়াঃ(প্রীতি- পাত্রাণি) ভবন্তি। তথা, অরে মৈত্রেয়ি, বিত্তস্য(ধনস্য পশ্বাদেঃ) কামায় বিত্তং ন বৈ[ধনিনাং] প্রিয়ং ভবতি; আত্মনঃ তু(এব) কামায় বিত্তং প্রিয়ং ভবতি। তথা, অরে মৈত্রেয়ি, ব্রহ্মণঃ(ব্রাহ্মণস্য) কামায় ব্রহ্ম ন বৈ প্রিয়ং ভবতি,[অপি তু] আত্মনঃ কামায় ব্রহ্ম প্রিয়ং ভবতি। তথা অরে মৈত্রেয়ি, ক্ষত্রস্য(ক্ষত্রিয়স্য) কামায় ক্ষত্রৎন বৈ প্রিয়ং ভবতি[লোকস্য];[অপি তু] আত্মনঃ কামায় প্রিয়ং ভবতি। তথা অরে মৈত্রেয়ি, লোকানাং(স্বর্গাদীনাং) কামায় লোকাঃ ন বৈ প্রিয়াঃ ভবন্তি;[অপিতু] আত্মনঃ তু কামায় লোকাঃ
প্রিয়াঃ ভবন্তি। তথা, অরে মৈত্রেয়ি, দেবানাং কামায় দেবাঃ ন বৈ প্রিয়াঃ ভবন্তি;[অপিতু] আত্মনঃ তু কামায় দেবাঃ প্রিয়া ভবন্তি। তথা অরে মৈত্রেরি, ভূতানাং কামায় ভূতানি(প্রাণিনঃ) ন বৈ প্রিয়াণি ভবন্তি;[অপিতু] আত্মনঃ তু কামার ভূতানি প্রিয়াণি ভবন্তি।[কিং বহুনা,] অরে মৈত্রেয়ি, সর্ব্বস্থ্য কামায় সর্ব্বং ন বৈ প্রিয়ং ভবতি;[অপিতু] আত্মনঃ তু কামায় সর্ব্বং প্রিয়ং ভবতি।[অতঃ] অরে মৈত্রেয়ি, আত্মা বৈ(এব) দ্রষ্টব্যঃ(সাক্ষাৎকর্তব্যঃ); [তদুপায়মাহ-] শ্রোতব্যঃ(শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশতঃ যাথাত্ম্যেন জ্ঞাতব্যঃ); মন্তব্যঃ(যুক্তিভিঃ ব্যবস্থাপ্যঃ); নিদিধ্যাসিতব্যঃ(নিরন্তরং ধ্যাতব্যঃ)। অরে মৈত্রেয়ি, আত্মনঃ দর্শনেন শ্রবণেন মত্যা(মননেন) বিজ্ঞানেন(নিদিধ্যা- সনেন) ইদৎ সর্ব্বং(জগৎ) বিদিতং(বিজ্ঞাতং)[ভবতীতি শেষঃ] ॥১১১॥৫॥
মূলানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য কহিলেন,—অরে মৈত্রেয়ি, পতির প্রীতির জন্য পতি কখনই ভার্য্যার প্রিয় হয় না; পরন্তু আত্ম-প্রীতির জন্যই প্রিয় হয়; সেইরূপ পত্নীর প্রীতির জন্য পত্নী কখনই স্বামীর প্রিয়া হয় না; পরন্তু স্বামীর আত্মপ্রীতির জন্যই পত্নী প্রিয়া হয়; পুত্রের প্রীতির জন্য পুত্র কখনই পিতার প্রিয় হয় না; পরন্তু নিজের প্রীতির জন্যই পুত্র পিতার প্রিয় হইয়া থাকে। সেইরূপ ধনের প্রীতির জন্য ধন কখনও লোকের প্রিয় হয় না; পরন্তু কেবল আত্মপ্রীতির জন্যই ধনসমূহ লোকের প্রিয় হইয়া থাকে; সেইরূপ ব্রাহ্মণের প্রীতির জন্য ব্রাহ্মণ কখনই প্রিয় হয় না; কিন্তু আপনার সুখের জন্যই ব্রাহ্মণ- জাতি লোকের প্রীতিভাজন হইয়া থাকে; এবং ক্ষত্রিয়ের প্রীতির জন্যও ক্ষত্রিয় লোকের প্রিয় হয় না; পরন্তু আপনার প্রীতির জন্যই ক্ষত্রিয়[রাজা] লোকের প্রিয় হইয়া থাকে। এইরূপ স্বর্গাদি লোকের প্রীতির জন্যও স্বর্গাদি লোক-সমূহ কখনই সাধারণের প্রিয় হয় না; পরন্তু আপনার প্রীতির জন্যই স্বর্গাদি লোক প্রিয় হইয়া থাকে; অরে মৈত্রেয়ি, দেবগণের প্রীতির জন্যও দেবগণ কাহারও প্রিয় হয় না; কিন্তু আপনার প্রীতিসাধন বলিয়াই দেবগণ প্রীতিভাজন হইয়া থাকেন; অরে মৈত্রেয়ি, প্রাণিগণের প্রীতির জন্যও প্রাণিগণ কাহারও প্রিয় হয় না; পরন্তু আত্মপ্রীতির জন্যই প্রাণিগণ অপরের প্রিয়
৬১৯
হইয়া থাকে; অধিক কি, অরে মৈত্রেয়ি, অপর কাহারও প্রীতির জন্যই অপর কেহ কখনই অপরের প্রিয় হয় না; পরন্তু আপনার প্রীতির জন্যই সকলে সকলের প্রিয় হইয়া থাকে। অতএব হে মৈত্রেয়ি, সর্বাধিক প্রিয় আত্মাকেই অবশ্য দর্শন করিবে, শাস্ত্র ও আচার্য্যের উপদেশ হইতে তাহার স্বরূপ জানিবে; তর্কদ্বারা তাহার স্বরূপ অবধারণ করিবে; তাহার পর নিঃসংশয়রূপে তাহার স্বরূপ ধ্যান করিবে। অরে মৈত্রেয়ি আত্মার দর্শনে, শ্রবণে, মননে ও নিদিধ্যাসনেই এই সমস্ত জগৎ পরিজ্ঞাত হয় ॥ ১১১॥৫॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচ—অমৃতত্বসাধনং বৈরাগ্যমুপদিদিক্ষুঃ জায়াপতিপুত্রাদিভ্যো বিরাগমুৎপাদয়তি তৎসন্ন্যাসায়। ন বৈ—বৈ-শব্দঃ প্রসিদ্ধস্মরণার্থঃ। প্রসিদ্ধমেব এতৎ লোকে,—পত্যুঃ ভর্তুঃ কামায় প্রয়োজনার জায়ায়াঃ পতিঃ প্রিয়ো ন ভবতি, কিং তর্হি, আত্মনস্তু কামায় প্রয়োজনায়ৈব ভার্য্যায়াঃ পতিঃ প্রিয়ো ভবতি। তথা ন বা অরে জায়ায়ৈ ইত্যাদি সমানমন্যৎ। ন বা অরে পুত্রাণাম্, ন বা অরে বিত্তস্য, ন বা অরে ব্রহ্মণঃ, ন বা অরে ক্ষত্রস্য, ন বা অরে লোকানাম্, ন বা অরে দেবানাম্, ন বা অরে ভূতানাম্, ন বা অরে সর্ব্বস্য। পূর্ব্বং পূর্ব্বং যথাসন্নে প্রীতিসাধনে বচনম্, তত্র তত্র ইষ্টতরত্বাদ্বৈরাগ্যস্য। সর্ব্বগ্রহণম্ উক্তানুজ্ঞার্থম্। তস্মাল্লোকপ্রসিদ্ধমেতৎ—আত্মৈব প্রিয়ঃ, নান্যৎ। তদেতৎ “প্রেয়ঃ পুত্রাৎ” ইত্যুপন্যস্তম্, তস্যৈতৎ বৃত্তিস্থানীয়ং প্রপঞ্চিতম্। তস্মাদাত্ম- প্রীতিসাধনত্বাদ্ গৌণী অন্যত্র প্রীতিরাত্মন্যেব মুখ্যা।
তস্মাৎ আত্মা বৈ অরে দ্রষ্টব্যঃ দর্শনাইঃ, দর্শনবিষয়মাপাদয়িতব্যঃ; শ্রোতব্যঃ পূর্ব্বমাচার্য্যতঃ আগমতশ্চ; পশ্চাৎ মন্তব্যঃ তর্কতঃ; ততো নিদিধ্যাসিতব্যঃ নিশ্চরেন ধ্যাতব্যঃ; এবং হ্যসৌ দৃষ্টো ভবতি শ্রবণমননদিধ্যাসনসাধনৈর্ব্বর্ত্তিতৈঃ;. যদৈকত্বম্ এতান্যুপগতানি, তদা সম্যদর্শনং ব্রহ্মৈকত্ববিষয়ং প্রসীদতি, নান্যথা শ্রবণমাত্রেণ। যদ্ ব্রহ্মক্ষত্রাদি কর্ম্মনিমিত্তং বর্ণাশ্রমাদিলক্ষণম্ আত্মন্যবিদ্যয়া- অধ্যারোপিতপ্রত্যয়বিষয়ং ক্রিয়াকারকফলাত্মক্রম্ অবিদ্যাপ্রত্যয়বিষয়ম্—রজ্জামিব সর্প-প্রত্যয়ঃ, তদুপমর্দ্দার্থমাহ—আত্মনি খলু অরে মৈত্রেয়ি, দৃষ্টে শ্রুতে মতে বিজ্ঞাতে ইদং সর্ব্বং বিদিতং বিজ্ঞাতং ভবতি ॥ ১১১ ॥ ৫ ॥ টীকা।—অমৃতত্বসাধনমাত্মজ্ঞানং বিবক্ষিতং চেৎ, আত্মা বা‘অরে দ্রষ্টব্য ইত্যাদি বক্তব্য,, কমিতি ন বা অরে পত্যুরিত্যাদি বাক্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ—জায়েতি। উবাচ জায়াদীনামাত্মার্থত্বেন- প্রয়ত্বম্, আত্মনশ্চানৌপাধিকপ্রিয়ত্বেন পরমানন্দত্বমিতি শেষঃ। প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—ন বা’
ইতি। কিং তন্নিপাতেন স্মার্য্যতে, তদাহ-প্রসিদ্ধমিতি। যথোক্তে ক্রমে নিয়ামকমাহ- পূর্ব্বং পূর্বমিতি। যদ্যদাসন্নং প্রীতিসাধনং, তত্তদনতিক্রম্য তস্মিন্ বিষয়ে পূর্ব্বং পূর্ব্বং বচনমিতি যোজনা। তত্র হেতুমাহ-তত্রেতি। ন বা অরে সর্বস্যেত্যযুক্তং, প্রত্যাদীনামুক্তত্বাদংশেন পুনরুক্তিপ্রসঙ্গাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্বগ্রহণমিতি। উক্তবদমুক্তানামপি গ্রহণং কর্তব্যং, ন চ সর্ব্বে বিশেষতো গ্রহীতুং শক্যস্তে, তেন সামান্যার্থং সর্বপদমিত্যর্থঃ। সর্বপর্য্যায়েষু সিদ্ধমর্থমুপ- সংহরতি-তস্মাদিতি। নমু তৃতীয়ে প্রিয়ত্বমাত্মন আখ্যাতং, তদেবাত্রাপি কথ্যতে চেৎ, পুনরুক্তিঃ স্যাত্তত্রাহ-তদেভদিতি। অথোপন্যাসবিবরণাভ্যাং প্রীতিরাত্মন্যেবেত্যযুক্তং, পুত্রাদাবপি তদ্দর্শনাদত আহ-তস্মাদিতি। আত্মনো নিরতিশয়শ্রীত্যাস্পদত্বেন পরমানন্দত্ব- মভিধারোত্তরবাক্যমাদার ব্যাচষ্টে-তস্মাদিত্যাদিনা। কথং পুনরিদং দর্শনমুৎপদ্যতে, তত্রাহ- শ্রোতব্য ইতি। শ্রবণাদীনামন্ততমেনাত্মজ্ঞানলাভাৎ কিমিতি সর্বেষামধ্যয়নমিত্যাশঙ্ক্যাহ- এবং হীতি। বিধ্যনুসারিত্বমেবংশব্দার্থঃ। শ্রুতত্বাবিশেষাদ্বিকল্পহেত্বভাবাচ্চ সর্ব্বৈরেবাত্মজ্ঞানং জায়তে চেত্তেষাং সমপ্রধানত্বমাগ্নেয়াদিবদাপতেদিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদেতি। শ্রবণস্থ প্রমাণবিচারত্বেন প্রধানত্বাদঙ্গিত্বং মনননিদিধ্যাসনয়োস্ত তৎকাৰ্য্যপ্রতিবন্ধপ্রধ্বংসিত্বাদঙ্গ মিত্যঙ্গাঙ্গিভাবেন যদা শ্রবণাদীন্যসকৃদনুষ্ঠানেন সমুচ্চিতানি, তদা সামগ্রীপৌস্কল্যাত্তত্ত্বজ্ঞানং ফলশিরস্কং সিধ্যতি। মননাদ্যভাবে শ্রবণমাত্রেণ নৈব তদুপপদ্যতে। মননাদিনা প্রতিবন্ধাপ্রধ্বংসে বাক্যস্য ফল- বজ্ঞানজনকত্বাযোগাদিত্যর্থঃ। পরামর্শবাক্যস্য তাৎপর্য্যমাহ-যদিতাদিনা। কর্মনিমিত্তং ব্রহ্মক্ষত্রাদি, তদেব বর্ণাশ্রমাবস্থাদিরূপমাত্মন্যবিদ্যয়াহধ্যারোপিতস্য প্রত্যয়ো মিথ্যাজ্ঞানং, তস্য বিষয়তয়া স্থিতং ক্রিয়াদাত্মকং তদুপমর্দনার্থমাহেতি সম্বন্ধঃ। অবিদ্যাধ্যারোপিতপ্রত্যয়- বিষয়মিত্যেতদেব ব্যাকরোতি-অবিধেতি। অবিদ্যাজনিতপ্রত্যয়বিষয়ত্বে দৃষ্টান্তমাহ- রজ্জামিতি। ১১১। ৫।
ভাষ্যানুবাদ।—মোক্ষলাভের একমাত্র উপায় বৈরাগ্য; সেই বৈরাগ্যের উপদেশেচ্ছায় যাজ্ঞবল্ক্য-ঋষি স্ত্রী-পুত্রাদি বিষয়ে আসক্তি নিবৃত্তির জন্য প্রথমতঃ বৈরাগ্য-সমুৎপাদনার্থ উপদেশ দিতেছেন। শ্রুতির ‘বৈ’ শব্দটি প্রসিদ্ধিস্মারক; জগতে ইহা প্রসিদ্ধই আছে যে, পতির—স্বামীর কামের জন্য(প্রয়োজনে) স্বামী কখনই পত্নীর প্রিয় হয় না; তবে কি না, আপনার কামের জন্যই পতি পত্নীর প্রিয় হইয়া থাকেন; সেইরূপ, “ন বা অরে জায়ায়াঃ” “ন বা অরে পুত্রাণাং” “ন বা অরে বিত্তস্য” “ন বা অরে ক্ষত্রস্য” “ন বা অরে লোকানাম্” “ন বা অরে দেবানাম্” “ন বা অরে ভূতানাম্” “ন বা অরে সর্ব্বস্য” ইত্যাদি অন্যান্য অংশের অর্থও পূর্ব্বের অনুরূপ। প্রথমে সন্নিহিত প্রীতিসাধনের উল্লেখ করার অভিপ্রায় এই যে, প্রথমেই সে সমুদয় বিষয়ে বৈরাগ্য সমুৎপাদন করা আবশ্যক। উক্ত ও অনুক্ত সমস্ত বিষয়-সংকলনের জন্য শেষে “সর্ব্বস্য” (সকলের) বলা হইয়াছে। অতএব ইহা প্রসিদ্ধ কথা যে, জগতে আত্মাই
৬২১
একমাত্র প্রিয়, অন্য কেহ নহে। পূর্ব্বে যে, “তদেতৎ প্রেরঃ পুত্রাৎ” ইত্যাদি বাক্য উপন্যস্ত হইয়াছে, এই শ্রুতিটি তাহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যাস্থানীর।
অতএব আত্মাতেই মুখ্য প্রীতি; অন্যত্র যে প্রীতি, তাহা আত্মপ্রীতির সাহায্যকারী বলিয়া গৌণ বা অপ্রধান। অতএব আত্মাই দ্রষ্টব্য-সাক্ষাৎকারের উপযুক্ত, অর্থাৎ আত্মবিষয়ক দর্শন সম্পাদন করা আবশ্যক। সেই জন্য শ্রোতব্য- প্রথমে শাস্ত্র ও আচার্য্য হইতে জ্ঞাতব্য; পশ্চাৎ মন্তব্য, অর্থাৎ অনুকূল তর্ক দ্বারা তাহা সমর্থন করিতে হইবে; তাহার পর নিদিধ্যাসিতব্য অর্থাৎ নিঃসংশয়- রূপে তাহাকে ধ্যান করিতে হইবে। এইরূপে শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের সাহায্যে পরিশোধিত হইলে পর, আত্মা প্রত্যক্ষগোচর হইয়া থাকে। যখন উক্ত সাধনগুলি একই ‘আত্মবিষয়ে অনুগতভাবে প্রযুক্ত হয়, তখনই ব্রহ্মৈকত্ব- বিষয়ে সম্যক্ দর্শন উপস্থিত হয়, নচেৎ কেবল শ্রবণমাত্রে হয় না। রজ্জুতে সর্প-ভ্রান্তির ন্যায় আত্মাতেও অবিদ্যা দ্বারা সমারোপিত ভ্রান্তিজ্ঞানমূলক যে, বর্ণাশ্রমাদি-ধর্মসম্পন্ন ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদি বিভাগ, যাহা অবলম্বন করিয়া ক্রিয়াকারক ও ফলসাপেক্ষ কর্মসকল অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে, ভ্রান্তিজ্ঞানের বিষয়ীভূত সেই সমস্ত বিভাগ বিসর্জন করিবার উদ্দেশ্যে বলিতেছেন,-অরে মৈত্রেরি, আত্ম- বিষয়ে দর্শন, শ্রবণ, মনন ও বিজ্ঞান হইলেই দৃশ্যমান সমস্ত জগৎ বিজ্ঞাত হইয়া যায় ৷ ১১১ ॥ ৫ ॥
ব্রহ্ম তং পরাদাদ্ যোহন্যত্রাত্মনো ব্রহ্ম বেদ, ক্ষত্রং তং পরাদাদ যোহন্যত্রাত্মনঃ ক্ষত্রং বেদ, লোকান্তং পরাদুর্যোহন্যত্রা- ত্মনো লোকান্ বেদ, দেবাস্তং পরাদুর্যোহন্যত্রাত্মনো দেবান্ বেদ, ভূতানি তং পরাদুর্যোহন্যত্রাত্মনো ভূতানি বেদ, সর্ব্বং তং পরাদাদ্ যোহন্যত্রাত্মনঃ সর্ব্বং বেদ, ইদং ব্রহ্মেদং ক্ষত্রমিমে লোকা ইমে দেবা ইমানি ভূতানীদৎ সর্ব্বং যদয়মাত্মা ॥১১২৷৬৷৷
সরলার্থঃ।—[ইদানীং সর্ব্বত্রাত্মভাবোপপাদনার্থমাহ—ব্রহ্মেতি।] ব্রহ্ম (ব্রাহ্মণজাতিঃ) তং(জনং) পরাদাৎ(পরাকুৰ্য্যাৎ—পরিভবেৎ),[কম্?] যঃ (জনঃ) আত্মনঃ অন্যত্র(আত্মব্যতিরেকেণেত্যর্থঃ) ব্রহ্ম(ব্রাহ্মণজাতিং) বেদ (জানাতি); তথা ক্ষত্রং(ক্ষত্রিয়জাতিঃ) তং পরাদাৎ, যঃ আত্মনঃ অন্যত্র (ব্রহ্মব্যতিরেকেণেত্যর্থঃ) ক্ষত্রং বেদ; তথা লোকাঃ(কর্মফলানি স্বর্গাদীনি) তং পরাদুঃ, যঃ আত্মনঃ অন্যত্র লোকান্(স্বর্গাদীন্) বেদ; তথা দেবাঃ(লোকেন্দ্রি-):
য়াধিষ্ঠাতারঃ) তং পরাদুঃ, যঃ আত্মনঃ অন্যত্র দেবান্ বেদ; ভূতানি(প্রাণিনঃ) তং পরাদুঃ, যঃ আত্মনঃ অন্যত্র ভূতানি বেদ;[কিং বহুনা,] সর্ব্বং(নিখিলং জগৎ) [এব] তং পরাদাৎ, যঃ আত্মনঃ অন্যত্র সর্ব্বং বেদ: ইদং ব্রহ্ম, ইদং ক্ষত্রং, ইমে লোকাঃ, ইমে দেবাঃ, ইমানি ভূতানি-ইদং সর্ব্বং আত্মৈব,-যৎ(যঃ) অয়ং আত্মা(দ্রষ্টব্য-শ্রোতব্যত্বেন প্রকৃতঃ; তদাত্মকমিদং সর্ব্বং বিজ্ঞেয়মিতি ভাবঃ) ॥ ১১২ ॥ ৬॥
মূলানুবাদ।-এখন সর্বত্র আত্মভাব উপপাদনার্থ বলিতেছেন -ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি তাহাকে পরাস্ত করে(প্রতারিত করে), যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণজাতিকে আত্মা হইতে পৃথক্ বলিয়া জানে; সেইরূপ ক্ষত্রিয়জাতি তাহাকে পরাস্ত করে, যে ব্যক্তি ক্ষত্রিয়কে আত্মার অতিরিক্ত বলিয়া মনে করে, কর্মফলাত্মক স্বর্গাদি লোকসমূহও তাহাকে বঞ্চিত করে, যে ব্যক্তি আত্মার অতিরিক্ত বলিয়া লোকসমূহকে জানে; লোকপাল ও ইন্দ্রিয়-পরিচালক দেবতাগণ তাহাকে বঞ্চিত করে, যে ব্যক্তি দেবতাগণকে আত্মা হইতে অতিরিক্ত বলিয়া মনে করে; প্রাণিগণ তাহাকে পরাভূত করে, যে ব্যক্তি আত্মার, অতিরিক্ত বলিয়া প্রাণিগণকে জানে; অধিক কি, সমস্ত জগৎই তাহাকে বঞ্চিত করে, যে ব্যক্তি সমস্ত জগৎকে আত্মার অতিরিক্ত বলিয়া মনে করে। এই ব্রাহ্মণ, এই ক্ষত্রিয়, এই সমস্ত লোক, এই সমস্ত দেবতা, এই সমস্ত ভূত এবং এই সমস্ত জগৎ সেই আত্মারই স্বরূপ, যে আত্মার কথা দ্রষ্টব্য শ্রোতব্য প্রভৃতি কথায় বলা হইয়াছে ৷ ১১২ ॥ ৬॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ননু কথমন্যস্মিন্ বিদিতেহন্যদ্বিদিতং ভবতি? নৈষ দোষঃ; ন হি আত্মব্যতিরেকেণান্যৎ কিঞ্চিদস্তি; যদ্যস্তি, ন তদ্বিদিতং স্যাৎ; -ন ত্বন্যদস্তি; আত্মৈব তু সর্ব্বম্; তস্মাৎ সর্ব্বমাত্মনি বিদিতে বিদিতং স্যাৎ। কথং পুনরাত্মৈব সর্ব্বামিত্যেতৎ শ্রাবয়তি—
ব্রহ্ম ব্রাহ্মণজাতিস্তৎ পুরুষং পরাদাৎ পরাদধ্যাৎ পরাকুৰ্য্যাৎ, কম্? যোহন্যত্রা- ‘নঃ আত্মস্বরূপব্যতিরেকেণ আত্মৈব ন ভবতি ইয়ং ব্রাহ্মণজাতিরিতি তাৎ যো বেদ, তৎ পরাদধ্যাৎ সা ব্রাহ্মণজাতিরনাত্মস্বরূপেণ মাং পশ্যতীতি; পরমাত্মা হি সর্ব্বেযামাত্মা। তথা ক্ষত্রং ক্ষত্রিয়জাতিঃ, তথা লোকাঃ, দেবাঃ, ভূতানি, সর্ব্বম
‘ইদং ব্রহ্মেতি—যান্যনুক্রান্তানি, তানি সর্ব্বাণি আত্মৈব, যদয়মাত্মা—যোহয়মাত্মা দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্য ইতি প্রকৃতঃ—যম্মাদাত্মনো জায়তে, আত্মন্যেব লীয়তে, আত্ম- ময়ঞ্চ স্থিতিকালে, আত্মব্যতিরেকেণাগ্রহণাৎ, আত্মৈব সর্ব্বম্ ॥ ১১২॥ ৬॥
টীকা।—আত্মনি বিদিতে সর্ব্বং বিদিতমিত্যুক্তমাক্ষিপতি—নন্বিতি। দৃষ্টিবিরোধং নিরাচষ্টে—নৈষ দোষ ইতি। আত্মনি জ্ঞাতে জ্ঞাতমেব সর্ব্বং, ততোহর্থান্তরস্যাভাবাদিত্যুক্ত- মেব স্ফুটয়তি—যদীত্যাদিনা। আকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমুত্তরবাক্যমুদাহৃত্য ব্যাচষ্টে—কথমিত্যাদিনা। পুরুষং বিশেষতো জ্ঞাতুং প্রশ্নমুপন্যস্য প্রতীকং গৃহীত্বা ব্যাকরোতি—কমিত্যাদিনা। পরাকরণে পুরুষস্যাপরাধিত্বং দর্শয়তি—অনাত্মেতি। পরমাত্মাতিরেকেণ দৃশ্যমানামপি ব্রাহ্মণজাতিং স্বস্বরূপেণ পশ্যন্ কথমপরাধী স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—পরমাত্মেতি। ইদং ব্রহ্মেত্যুত্তরবাক্যানুবাদস্তস্য ব্যখ্যানং যান্যমুক্রান্তানীত্যাদি। আত্মৈব সর্ব্বমিত্যেতৎ প্রতিপাদয়তি—যম্মাদিত্যাদিনা। স্থিতিকালে তিষ্ঠতি, তস্মাদাত্মৈব সর্ব্বং তদ্ব্যতিরেকেণাগ্রহণাদিতি যোজনা। ১১২॥৬॥
ভাষ্যানুবাদ।—ভাল, এক বস্তু বিজ্ঞাত হইলে অপর বস্তু বিজ্ঞাত হয় কিরূপে? না—ইহা দোষ হয় না; কেন না, যেহেতু আত্মাতিরিক্ত অন্য কোনও বস্তু নাই; যদি থাকে, তবে অবশ্যই তাহা অবিদিত থাকিতে পারে সত্য, কিন্তু আত্মাতিরিক্ত কিছুই নাই; আত্মাই সমস্ত; সুতরাং আত্মবিজ্ঞানেই সমস্ত বিজ্ঞাত হইতে পারে। আত্মাই যে সর্ব্বাত্মক কি প্রকারে, এখন তাহা বুঝাইয়া বলিতেছেন—
ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি তাহাকে পরাজিত করে; কাহাকে?—যে ব্যক্তি আত্মার অন্যত্র ব্রাহ্মণজাতিকে জানে, অর্থাৎ এই ব্রাহ্মণজাতি কখনই আত্মস্বরূপ হইতে পারে না, এইরূপ যে লোক মনে করে; এ ব্যক্তি অনাত্মস্বরূপে আমাকে দর্শন করিতেছে—বলিয়া সেই ব্রাহ্মণজাতিই সেই ব্যক্তিকে পরাভূত করে; কারণ, পরমাত্মাই যখন সকলের আত্মা,[ তখন সকল পদার্থকে আত্মস্বরূপে দর্শন না করা অপরাধের কারণ হয়]। সেইরূপ ক্ষত্র অর্থাৎ ক্ষত্রিয় জাতি, সেইরূপ লোকসমূহ(স্বর্গ প্রভৃতি), সেইরূপ দেবতাগণ, ভূতগণ, এবং সমস্ত জগৎ। “ইদং ব্রহ্ম” ইত্যাদি পর পর যে সমস্ত বিষয় উক্ত হইয়াছে, সে সমস্ত এই আত্মস্বরূপই বটে—যে আত্মা ‘দ্রষ্টব্য শ্রোতব্য’ প্রভৃতি কথায় প্রস্তাবিত হইয়াছে, সেই আত্মাই বটে’; যেহেতু, সমস্ত জগৎ আত্মা হইতেই উৎপন্ন হয়, আত্মাতেই লীন হয়, এবং স্থিতিকালেও আত্মস্বরূপেই থাকে; কারণ আত্মাতিরিক্ত বলিয়া কোন বস্তুরই জ্ঞান হয় না; সেই হেতু এ সমস্ত আত্মস্বরূপই বটে,(তদতিরিক্ত কিছুই নাই)। ১১২॥৬॥ 1548 স যথা দুন্দুভেইন্যমানস্য ন বাহ্যাঙ্ শব্দাঙ্ শকূয়াদ্
গ্রহণায়, দুন্দুভেস্তু গ্রহণেন দুন্দুভ্যাঘাতস্য বা শব্দো গৃহীতঃ ॥ ১১৩ ॥ ৭ ॥
সরলার্থঃ।—[ ইদানীমাত্মস্বরূপেণ জগদ্গ্রহণে দৃষ্টান্তমবতারয়তি—“স যথা’ ইত্যাদি]। সঃ(দৃষ্টান্তঃ) যথা(যদ্বৎ) দুন্দুভেঃ(তদাখ্যবাদ্যবস্ত্রস্য)- হন্যমানস্য(দণ্ডাদিনা তাড্যমানস্য সতঃ) বাহ্যান্(তদিতরান্) শব্দান গ্রহণায়- (গ্রহীতুং) ন শত্রুয়াৎ[কোহপিঃ জনঃ]; দুন্দুভেঃ দুন্দুভ্যাঘাতস্য(দুন্দুভ্যাঘাতজ- শব্দসামান্যস্য) গ্রহণেন তু(পুনঃ) শব্দঃ(অন্যঃ শব্দঃ) গৃহীতঃ ভবতি;[এবং বা অরে অয়ম্ ইত্যুত্তরদশমশ্রুত্যা সম্বন্ধঃ]॥ ১১৩॥ ৭॥
মূলানুবাদ।—কিরূপে জগৎকে আত্মস্বরূপে গ্রহণ করিতে হয়, তাহার দৃষ্টান্ত বলিতেছেন। সেই দৃষ্টান্তটি হইতেছে এই—যেমন দুন্দুভিবাদ্য বাজাইলে বাহিরের অন্য শব্দ গ্রহণ করা যায় না, অর্থাৎ পৃথক্ বলিয়া ধরা যায় না, পরন্তু দুন্দুভির কিংবা দুন্দুভিশব্দের গ্রহণে অন্য শব্দও গৃহীত হইয়া থাকে, অর্থাৎ অপর যত শব্দই আছে, তৎ- সমস্তই দুন্দুভিশব্দের সহিত মিলিত থাকিয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে প্রতীতি- গোচর হয়,[তদ্রূপ] ॥ ১১৩॥ ৭॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—কথং পুনরিদানীম্ ইমং সর্ব্বমাত্মৈবেতি গ্রহীতুং শক্যতে? চিন্মাত্রানুগমাৎ সর্ব্বত্র চিৎস্বরূপতৈবেতি গম্যতে। তত্র দৃষ্টান্ত উচ্যতে—
যৎস্বরূপব্যতিরেকেণাগ্রহণং যস্য, তস্য তদাত্মত্বমেব লোকে দৃষ্টম্; স যথা- স ইতি দৃষ্টান্তঃ; লোকে যথা দুন্দুভেঃ ভের্য্যাদেঃ হন্যমানস্য তাড্যমানস্য দণ্ডাদিনা,- ন বাহ্যান্ শব্দান্ বহির্ভূতান্ শব্দবিশেষান্ দুন্দুভিশব্দসামান্যাৎ নিষ্কৃষ্টান্ দুন্দুভি- শব্দবিশেষান্ ন শত্রুয়াৎ গ্রহণায় গ্রহীতুম্; দুন্দুভেস্তু গ্রহণেন, দুন্দুভিশব্দসামান্য- বিশেষত্বেন দুন্দুভিশব্দাঃ এতে ইতি শব্দবিশেষা গৃহীতা ভবন্তি, দুন্দুভিশব্দসামান্য- ব্যতিরেকেণাভাবাৎ তেষাম্, দুন্দুভ্যাঘাতস্য বা, দুন্দুভেরাহননমাঘাতঃ,-দুন্দুভ্যা-- ঘাতবিশিষ্টস্য শব্দসামান্যস্য গ্রহণেন তদগতা বিশেষা গৃহীতা ভবন্তি, নতু ত এব- নির্ভিদ্য গ্রহীতুং শক্যন্তে, বিশেষরূপেণাভাবাত্তেষাম্, তথা প্রজ্ঞানব্যতিরেকেণ স্বপ্নজাগরিতয়োর্ন কশ্চিদ্বস্তুবিশেষো গৃহ্যতে; তস্মাৎ প্রজ্ঞানব্যতিরেকেণাভাবো যুক্তস্তেষাম্ ॥ ১১৩৷ ৭ ॥
টীকা।—স্থিরবস্থায়াং সর্ব্বশত্রুনাশকং কটুঘ্নকং, কষায়কাদ্বিধ্যাদিভিঃ—কষং:
পুনরিতি। ঘটঃ স্ফুরতীত্যাদিপ্রত্যয়মাশ্রিত্য পরিহরতি-চিন্মাত্রেতি। স যথা দুন্দুভেরিত্যাদি বাক্যমবতারয়তি-তত্রেতি। সর্ব্বত্র চিদভিরেকেণাসত্ত্বং সপ্তম্যর্থঃ। দৃষ্টান্তে বিবক্ষিতং সংক্ষিপতি-যৎস্বরূপেতি। দুন্দুভিদৃষ্টান্তমাদায়াক্ষরাণি ব্যাচষ্টে-স যপেত্যাদিনা। শব্দ- বিশেষানের বিশদয়তি-দুন্দুভীতি। কথং তর্হি দুন্দুভিশব্দবিশেষাণাং গ্রহণং, তদাহ- দুন্দুভেস্তিতি। দুন্দুভিশব্দসামান্যস্যেতি যাবৎ। উক্তেহর্থে দুন্দুভ্যাঘাতস্যেত্যাদিবাক্যমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-দুন্দুভ্যাঘাতস্যেতি। বাশব্দার্থমাহ-তদ্গতা বিশেষা ইতি। উত্তমর্থং ব্যতিরেক- মুখেন বিশদয়তি-ন স্থিতি। বিবক্ষিতং দাষ্টান্তিকমাচষ্টে-তথেতি। তত্রৈব বস্তুবিশেষ- গ্রহণসম্ভাবনামভিপ্রেত্য স্বপ্নজাগরিতয়োরিত্যুক্তম্। ১১৩।৭।
ভাষ্যানুবাদ।—আচ্ছা, এই সমস্ত জগৎই যে, আত্মস্বরূপ, এখন তাহা বুঝিবার উপায় কি?[ইহার উত্তর]—ঘটপটাদি সর্ব্বত্রই চৈতন্যাত্মক প্রকাশের সম্বন্ধ অনুগত থাকায় সর্ব্বপদার্থের চৈতন্যরূপতাই প্রতীত হইয়া থাকে(১); তদ্বিষয়ে এইরূপ দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইতেছে—
যাহার অভাবে যাহার প্রতীতি হয় না, জগতে সে পদার্থের তদভিন্নভাব দেখিতে পাওয়া যায়। শ্রুতির ‘সঃ’ পদটি দৃষ্টান্তরূপে প্রযুক্ত; জগতে দুন্দুভি বা ভেরীপ্রভৃতি প্রচণ্ডশব্দকর বাদ্যবিশেষ আহত-দণ্ডাদি দ্বারা তাড়িত হইতে থাকিলে যেমন বাহিরের শব্দসমূহকে অর্থাৎ অন্যান্য বিশেষ বিশেষ শব্দগুলিকে সাধারণ দুন্দুভিধ্বনি হইতে পৃথক্ করিয়া গ্রহণ করিতে পারা যায় না; পরন্তু দুন্দুভির গ্রহণে অর্থাৎ ‘সামান্যবিশেষভাবাপন্ন এ সমস্ত দুন্দুভিরই শব্দ’, এইরূপে গ্রহণ করিলে, তাহাতে বিশেষ বিশেষ শব্দগুলিও গৃহীত হইয়া যায়; কারণ, সাধারণ দুন্দুভিশব্দ ছাড়া সে সকল শব্দের পৃথক্ অস্তিত্ববোধ থাকে না; অথবা দুন্দুভ্যা- ঘাতের-আঘাত অর্থ আহনন-তাড়ন; সেই দুন্দুভির আঘাতোৎপন্ন শব্দমাত্রের গ্রহণ করিলেই, তদ্গত বিশেষ বিশেষ শব্দেরও যেমন গ্রহণ করা হইয়া থাকে; কিন্তু কোনরূপেই সেই সকল বিশেষ শব্দ আর পৃথক্ করিয়া গ্রহণ করিতে পারা যায় না; কেন না, সেখানে সে সমুদয় শব্দের বিশেষাকারে অভিব্যক্তিই নাই;
ঠিক তেমন, কি স্বপ্নাবস্থায়, কিম্বা জাগরণাবস্থায় কোন অবস্থাতেই প্রজ্ঞান ব্যতিরেকে অর্থাৎ প্রকাশাত্মক জ্ঞানের সম্বন্ধ ব্যতিরেকে কোন বিশেষ বস্তুই গৃহীত (প্রতীতি গোচর) হয় না; অতএব প্রজ্ঞান ব্যতিরেকে যে, এ সমস্ত বস্তুর অভাব বলা হইয়াছে, তাহা যুক্তিসঙ্গতই বটে ॥ ১১৩॥ ৭॥
স যথা শঙ্খস্য ধ্যায়মানস্য ন বাহ্যান্ শব্দান্ শকুয়াগ্রহণায়, শঙ্খস্য তু গ্রহণেন শঙ্খধ্মস্য বা শব্দো গৃহীতঃ ॥ ১১৪ ॥ ৮ ॥
সরলার্থঃ।—[অস্মিন্নর্থে দৃষ্টান্তান্তরমুচ্যতে “স যথা” ইতি]। সঃ (দৃষ্টান্তঃ)—শঙ্খস্য শ্মায়মানস্য(আপূর্য্যমাণস্য শব্দায়মানস্য সতঃ) বাহ্যান্ শব্দান্ গ্রহণায়(গ্রহীতুং) ন শকুয়াৎ; শঙ্খমস্য শঙ্খশব্দস্য বা গ্রহণেন তু(পুনঃ) শব্দঃ (বাহ্যঃ ধ্বনিঃ) গৃহীতঃ[ভবতি]; ‘এবম্’ ইত্যাদ্যত্তরেণ সম্বন্ধঃ ॥ ১১৪॥৮॥
মূলানুবাদ।—আরো একটি দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইতেছে; সেই দৃষ্টান্তটি এই—শঙ্খ যেমন বায়ুদ্বারা পূরিত হইয়া শব্দের সহিত যোজিত হইলে অর্থাৎ শঙ্খ বাজাইতে থাকিলে যেমন বাহিরের অন্য কোনও শব্দ পৃথক্ করিয়া গ্রহণ করা যায় না, পরন্তু আপূর্য্য- মাণ শঙ্খের বা শঙ্খশব্দের গ্রহণে অন্য শব্দও গৃহীত হয়[ইহাও তেমন]॥ ১১৪॥৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা স যথা শঙ্খস্য শ্মায়মানস্য শব্দেন সংযোজ্যমানস্যা- পূর্ব্বমাণস্য ন বাহ্যান্ শব্দান্ শত্রুয়াদিত্যেবমাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ১১৪ ॥ ৮ ॥
টীকা।—তথা দুন্দুভিদৃষ্টান্তবদিতি যাবৎ। শঙ্খস্য তু গ্রহণেনেত্যাদিবাক্যমাদিশব্দার্থঃ। দুন্দুভেস্তু গ্রহণেনেত্যাদিবাক্যং দৃষ্টান্তয়তি—পূর্ব্ববদিতি। ১১৪।৮।
ভাষ্যানুবাদ।—সেইরূপ অপর একটি দৃষ্টান্ত—যেমন শঙ্খ শ্মায়মান হইলে অর্থাৎ শব্দসংযোজিত হইলে বাহিরের কোন শব্দ পৃথক্ ভাবে ধরিতে পারা যায় না; ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ১১৪ ॥৮॥
স যথা বীণায়ৈ বাদ্যমানায়ৈ ন বাহ্যান্ শব্দান্ শত্রু- য়াদ্ গ্রহণায়, বীণায়ৈ তু গ্রহণেন বীণাবাদস্য বা শব্দো গৃহীতঃ ॥ ১১৫ ॥ ৯॥
সরলার্থঃ।—তত্রাপরো দৃষ্টান্ত উচ্যতে—“স যথা” ইত্যাদি। সঃ(দৃষ্টান্তঃ) বধা বীণায়ৈ বাদ্যমানায়ৈ(বীণায়া বাদ্যমানায়াঃ সত্যাঃ) বাহ্যান্ শব্দান্ গ্রহণায়
৬২৭
(গ্রহীতুং) ন শকুয়াৎ(শক্রোতি)[জনঃ]; বীণায়ৈ(বীণায়াঃ) বীণাবাদস্য (বীণাবাদনস্য) বা গ্রহণেন তু(পুনঃ) শব্দঃ(বাহ্যঃ শব্দঃ) গৃহীতঃ[ভবতীতি শেষঃ, এবম্] ॥ ১১৫ ॥ ৯ ॥
মূলানুবাদ।—আরো একটি দৃষ্টান্ত বলা হইতেছে; তাহা এই—যেমন বীণাযন্ত্র বাজাইতে থাকিলে বাহিরের অন্য কোন শব্দ গ্রহণ করিতে পারা যায় না, পরন্তু বীণার কিম্বা বীণাধ್ವನির গ্রহণের সঙ্গে অন্য শব্দও গৃহীত হয়,[এইপ্রকার] ॥ ১১৫ ॥ ৯ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা বীণায়ৈ বাদ্যমানায়ৈ বীণায়া বাদ্যমানায়াঃ। অনেকদৃষ্টান্তোপাদানমিহ সামান্যবহুত্বখ্যাপনার্থম্—অনেকে হি বিলক্ষণাশ্চে- তনাচেতনরূপাঃ সামান্যবিশেষাঃ—তেষাম্পারম্পর্য্যগত্যা যথা একস্মিন্ মহাসা- মান্যেহন্তর্ভাবস্তথা প্রজ্ঞানঘনে কথং নাম প্রদর্শয়িতব্য ইতি; দুন্দুভিশঙ্খবীণাশব্দ- সামান্যবিশেষাণাং যথা শব্দত্বেহন্তর্ভাবঃ, এবং স্থিতিকালে তাবৎ সামান্য- বিশেষাব্যতিরেকাদ ব্রহ্মৈকত্বং শক্যমবগন্তুম্, এবমুৎপত্তিকালে প্রাগুৎপত্তেব্র হ্মৈ- বেতি শক্যমবগন্তুম্ ॥ ১১৫ ॥ ৯ ॥
টীকা। -তথেতি দৃষ্টান্তদ্বয়পরামর্শঃ। একেনৈব দৃষ্টান্তেন বিবক্ষিতার্থসিদ্ধৌ কিমিত্যনেক- দৃষ্টান্তোপাদানমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অনেকেতি। ইহেতি জগদুচ্যতে শ্রুতির্ব্বা। সামান্যবহুত্বমেব স্ফুটয়তি-অনেকে হীতি। তেষাং স্বস্বসামান্যেহন্তর্ভাবেহপি কুতো ব্রহ্মণি পর্য্যবসানমিত্যা- শঙ্ক্যাহ-তেষামিতি। কথমিত্যস্মাৎ পূর্ব্বং তথেত্যধ্যাহারঃ। ইতি মন্যতে শ্রুতিরিতি শেষঃ। বিমতং নাত্মাতিরেকি তদতিরেকেণাগৃহ্যমাণত্বাৎ, যদ্যদতিরেকেণাগৃহ্যমাণং তত্তদভিরেকি ন ভবতি, যথা দুন্দুভ্যাদিশব্দাস্তৎসামান্যাভিরেকেণাগৃহ্যমাণাস্তদতিরেকেণ ন সতীত্যনুমানং বিরক্ষন্নাহ-দুন্দুভীতি। শব্দত্বেহস্তর্ভাবস্তথা প্রজ্ঞানঘনে সর্ব্বং জগদন্তর্ভবতীতি শেষঃ। দৃষ্টান্ত- ত্রয়মবষ্টভ্য নিষ্টঙ্কিতমর্থমুপসংহরতি-এবমিতি। ১১৫।৯।
ভাষ্যানুবাদ।—সেইরূপ বীণাযন্ত্র বাজাইতে থাকিলে ইত্যাদি। সামান্য ধৰ্ম্মই যে, বহুপ্রকার আছে, তাহা বুঝাইবার জন্য এখানে বহু দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইল। অভিপ্রায় এই যে, পরস্পর বিলক্ষণস্বভাব চেতনাচেতনাত্মক একজাতীয় বিশেষ বস্তু জগতে বহু আছে, পরস্পরা সম্বন্ধে সে সমুদয়ের যেমন একায়নতা, —একই মহাসামান্যে অন্তর্ভাব হয়, প্রজ্ঞানঘনেও যে সেইরূপই হয়, তাহা কি প্রকারে বুঝান যাইতে পারে, অর্থাৎ তাহা বুঝাইবার নিমিত্তই বহু দৃষ্টান্তের উল্লেখ হইয়াছে। সামান্য-বিশেষাত্মক দুন্দুভি, শঙ্খও বীণাশব্দের যেরূপ শব্দসামান্যে অন্তর্ভাব হয়, তদ্রূপ জগতের স্থিতিকালেও সামান্যবিশেষভাব
রহিত হয় না বলিয়া[সামান্যরূপে] ব্রহ্মৈকত্ব অবধারণ করিতে পারা যায়। ১১৫॥৯॥✓ ৭।২
স যথাদ্রৈধাগ্নেরভ্যাহিতাৎ পৃথগ্ধূমা বিনিশ্চরন্ত্যেবং বা অরেহস্য মহতো ভূতস্য নিশ্বসিতমেতদ্ যদৃখেদো যজুর্ব্বেদঃ সামবেদো হথর্বাঙ্গিরস ইতিহাসঃ পুরাণং বিদ্যা উপনিষদঃ শ্লোকাঃ সূত্রাণ্যনুব্যাখ্যানানি ব্যাখ্যানান্যস্যৈবৈতানি সর্ব্বাণি নিশ্বসি- তানি ॥ ১১৬ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।—[উৎপত্তেঃ প্রাগপি ব্রহ্মৈকত্বাবধারণার্থমাহ—“স যথা” ইত্যাদি।] সঃ(দৃষ্টান্তঃ), যথা অভ্যাহিতাৎ(প্রজ্বলিতাৎ সতঃ) আর্দ্রৈধাগ্নেঃ (আর্দ্রকাষ্ঠ-সমন্বিতাৎ অগ্নেঃ) পৃথক্(নানারূপাঃ) ধূমাঃ(ধূমাঃ বিস্ফুলিঙ্গা- দয়শ্চ) বিনিশ্চরস্তি(বিশেষেণ নির্গচ্ছন্তি), অরে মৈত্রেয়ি, এবং(যথোক্তবদেব) অস্য মহতঃ(সর্ব্বাতিশায়িনঃ) ভূতস্য(নিত্যসিদ্ধস্য ব্রহ্মণঃ) নিশ্বসিতং(নিশ্বাস- বৎ অযত্নপ্রসূতং) এতৎ।[এতৎ কিম্?] যৎ(যঃ) ঋগ্বেদঃ, যজুর্ব্বেদঃ, সাম- বেদঃ, অথর্ব্বাঙ্গিরসঃ—(ইত্যেবং চতুর্ব্বিধো মন্ত্রভাগঃ), ইতিহাসঃ(উর্ব্বশী-পুরু- রবঃসংবাদাদিঃ), পুরাণং(পুরাবৃত্তপ্রকাশকং—“অসদ্বা ইদমগ্র আসীৎ” ইত্যাদ্যাত্মকম্), বিদ্যা(দেবজনবিদ্যা—নৃত্যগীতাদিশাস্ত্রম্), উপনিষদঃ(ব্রহ্মবিদ্যা- প্রকাশিকাঃ), শ্লোকাঃ(ব্রাহ্মণভাগস্থানি সংক্ষিপ্তার্থকানি বাক্যানি), সূত্রাণি (বস্তুসংগ্রাহকানি বাক্যানি—“আত্মেত্যেবোপাসীত” ইত্যাদীনি), অনুব্যাখ্যা- নানি(মন্ত্রবিবরণানি), ব্যাখ্যানানি(অর্থবাদাঃ); এতানি(ঋগ্বেদাদীনি) সর্ব্বাণি অস্য(ব্রহ্মণঃ) এব নিশ্বসিতানি(নিশ্বাসবৎ অযত্নপ্রসূতানীত্যর্থঃ) ॥ ১১৬ ॥ ১০ ॥
মূলানুবাদ।—উৎপত্তির পূর্ব্বেও জগতের ব্রহ্মাত্মভাব অবধারণের জন্য বলিতেছেন—প্রদীপ্ত আর্দ্র কাষ্ঠ হইতে যেরূপ নানা- প্রকার ধূম(ধূম ও স্ফুলিঙ্গপ্রভৃতি) নির্গত হয়, হে মৈত্রেয়ি, তদ্রূপ এই মহান্ স্বতঃসিদ্ধ পরব্রহ্মেরও ইহা নিশ্বাসস্বরূপ অর্থাৎ নিশ্বাসের ন্যায় তাঁহা হইতে অযত্নপ্রসূত।(ইহা কি?) যাহা ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ, অথর্বাঙ্গিরস, ইতিহাস, পুরাণ, বিদ্যা(নৃত্যগীতাদিশাস্ত্র), উপনিষদ্(ব্রহ্মবিদ্যা), শ্লোক, সূত্র, অনুব্যাখ্যান, ব্যাখ্যান বা অর্থবাদবাক্য, এ সমস্ত নিশ্চয়ই এই ব্রহ্মের নিশ্বাসবৎ অযত্নপ্রসূত ॥ ১১৬॥ ১০॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—এবম্ উৎপত্তিকালে প্রাগুৎপত্তেঃ ব্রহ্মৈবেতি শক্য- মবগন্তুম্; যথা—অগ্নের্বিস্ফুলিঙ্গধূমাঙ্গারার্চ্চিষাৎ প্রাগবিভাগাদগ্নিরেবেতি ভবত্য- গ্যেকত্বম্ এবং জগৎ নামরূপবিকৃতং প্রাগুৎপত্তেঃ প্রজ্ঞানঘন এবেতি যুক্তং গ্রহীতুমিত্যেতদুচ্যতে।—
স যথা আর্দ্রৈধাগ্নেঃ আর্দ্রৈরেধোভিঃ ইদ্ধোহগ্নিঃ আর্দ্রৈধাগ্নিঃ, তস্মাদভ্যা- হিতাৎ পৃথক্ ধূমাঃ পৃথক্ নানাপ্রকারাঃ; ধূমগ্রহণং বিস্ফুলিঙ্গাদিপ্রদর্শনার্থম্, ধূমবিস্ফুলিঙ্গাদয়ঃ বিনিশ্চরন্তি বিনির্গচ্ছন্তি; এবম্—যথায়ং দৃষ্টান্তঃ; অরে মৈত্রেয়ি, অস্য পরমাত্মনঃ প্রকৃতস্য মহতো ভূতস্য নিশ্বাসিতমেতৎ; নিশ্বাসিত- মিব নিশ্বাসিতম্; যথা অপ্রযত্নেনৈব পুরুষনিশ্বাসো ভবতি, এবং বৈ অরে। ১
কিং তন্নিশ্বসিতমিব ততো জাতমিত্যুচ্যতে-যৎ ঋগ্বেদঃ, যজুর্ব্বেদঃ, সাম- বেদঃ, অথর্ব্বাদিরসঃ-চতুর্বিধং মন্ত্রজাতম্, ইতিহাস ইতি উর্বশীপুরুরবসোঃ সংবাদাদি:-“উর্ব্বশী হাপ্সরাঃ” ইত্যাদি ব্রাহ্মণমেব, পুরাণম্-“অসদ্বা ইদমগ্র- আসীৎ” ইত্যাদি, বিদ্যা-দেবজন-বিদ্যা-‘বেদঃ সোহয়ম্’ ইত্যাদ্যা, উপনিষদঃ ‘প্রিয়মিত্যেতদুপাসীত’ ইত্যাদ্যাঃ, শ্লোকাঃ-ব্রাহ্মণপ্রভবা মন্ত্রাঃ-‘তদেতে শ্লোকাঃ’ ইত্যাদয়ঃ, সূত্রাণি-বস্তুসংগ্রহবাক্যানি বেদে, যথা-‘আত্মেত্যে- বোপাসীত’ ইত্যাদীনি, অনুব্যাখ্যানানি-মন্ত্রবিবরণানি, ব্যাখ্যানানি-অর্থবাদাঃ, অথবা বস্তুসংগ্রহবাক্যবিবরণান্যনুব্যাখ্যানানি, যথা চতুর্থাধ্যায়ে “আত্মেত্যেবোপা- সীত” ইত্যস্য, যথা বা “অন্যোৎসাবন্যোহহমম্মীতি ন স বেদ যথা পশুরেবম্” ইত্যস্যায়মেবাধ্যায়শেষঃ; মন্ত্রবিবরণানি ব্যাখ্যানানি-এবমষ্টবিধং ব্রাহ্মণম্। এবং মন্ত্রব্রাহ্মণয়োরেব গ্রহণম্। ২
নিয়তরচনাবতো বিদ্যমানশ্যৈব বেদস্যাভিব্যক্তিঃ পুরুষনিশ্বাসবৎ, ন চ পুরুষবুদ্ধিপ্রযত্নপূর্ব্বকঃ; অতঃ প্রমাণং নিরপেক্ষ এব স্বার্থে; তস্মাদ যতেনোক্তং, তত্তথৈব প্রতিপত্তব্যম্ আত্মনঃ শ্রেয় ইচ্ছত্তিঃ-জ্ঞানং বা কৰ্ম্ম বেতি। নামপ্রকাশবশুদ্ধি রূপস্য বিক্রিয়াব্যবস্থা; নামরূপয়োরেব হি পরমাত্মো- পাধিভূতয়োঃ ব্যাক্রিয়মাণয়োঃ সলিলফেনবৎ তত্ত্বান্যত্বেনানির্ব্বক্তব্যয়োঃ সর্ব্বাব- স্থয়োঃ সংসারত্বমিতি, অতো নাম্ন এব নিঃশ্বসিতত্বমুক্তম, তদ্বচনেনৈব ইতরস্য নিশ্বসিতত্বসিদ্ধেঃ। অথবা সর্ব্বস্য দ্বৈতজাতস্যাবিদ্যাবিষয়ত্বমুক্তম্-“ব্রহ্ম তং পরাদাৎ, ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মা” ইতি; তেন বেদস্যাপ্রামাণ্যমাশঙ্ক্যেত, তদাশঙ্কা- নিবৃত্ত্যর্থমিদমুক্তম্-পুরুষনিশ্বাসবদপ্রযত্নোখিতত্বাৎ প্রমাণং বেদঃ, ন যথা অন্যো গ্রন্থ ইতি ॥ ১১৬৷ ১০ ॥
টাকা। -স যথার্দ্রৈধাগ্নেরিত্যাদিবাক্যস্য তাৎপর্য্যমাহ-এবমিত্যাদিনা। স্থিতিকালবদিত্যে- বংশদার্থঃ। তত্র বাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-ইত্যেতদিতি। মহতোহনবচ্ছিন্নস্থ ভূতস্ত পরমার্থ- স্তেতি যাবৎ। নিস্বসিতমিবেত্যুক্তং ব্যনক্তি-যথেতি। অরে মৈত্রেয়ি ততো জাতমিতি শেষঃ। তদেবাকাঙ্ক্ষাপূর্বকং বিশদয়তি-কিং তদিত্যাদিনা। ইতিহাস ইতি ব্রাহ্মণমেবেতি সম্বন্ধঃ। সংবাদাদিরিত্যাদিপদেন প্রাণসংবাদাদিগ্রহণম্। অসদ্বা ইদমগ্র আসীদিত্যাদীত্যত্রাদিশব্দেনা- সদেবেদমগ্র আসীদিতি গৃহ্যতে। দেবজনবিদ্যা নৃত্যগীতাদিশাস্ত্রম্। বেদঃ সোহয়ং বেদাদ্বহি- র্ন ভবতীত্যর্থঃ। ইত্যাদ্যা বিদ্যেতি সম্বন্ধঃ। আদিশব্দঃ শিল্পশাস্ত্রসংগ্রহার্থঃ। প্রিয়মিত্যেত- দুপাসীতেত্যাদ্য। ইত্যত্রাদিশব্দঃ সত্যস্য সত্যমিত্যুপনিষৎসংগ্রহার্থঃ। তদেতে শ্লোকা ইত্যাদয় ইত্যত্রাদিশব্দেন তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি। অসন্নেব স ভবতীত্যাদি গৃহ্যতে। ইত্যাদীনীত্যাদি- পদমথ যোহন্যাং দেবতামুপান্তে ব্রহ্মবিদাপ্নোতি পরমিত্যাদি গ্রহীতুম্। অর্থবাদেষু ব্যাখ্যান- পদপ্রবৃত্তৌ হেত্বভাবং শঙ্কিত্বা পক্ষান্তরমাহ-অথবেতি। ইতিহাসাদিশব্দব্যাখ্যানমুপসংহরতি- এবমিতি। ব্রাহ্মণমিতিহাসাদিপদবেদনীয়মিতি শেষঃ।
ঋগাদিশব্দানামিতিহাসাদিশব্দানাং চ প্রসিদ্ধার্থত্যাগে কো হেতুরিত্যাশঙ্ক্য নিশ্বসিতশ্রুতিঃ ইতিহাসাদিশব্দানাং প্রসিদ্ধার্থত্যাগে হেতুঃ, পরিশেষত্ত্বন্যত্রেত্যভিপ্রেত্যাহ-এবং মন্ত্রেতি। নমু প্রথমে কাণ্ডে বেদস্য নিত্যত্বেন প্রামাণ্যং স্থাপিতং, তদনিত্যত্বে তদ্ধানিরিত্যত আহ- নিয়তেতি। নিয়তেত্যাদৌ বেদো বিশেষ্যতে। কল্পান্তেহস্তর্হিতান্ বেদানিত্যাদিবাক্যান্নিয়ত- রচনাবত্তং বেদস্য গম্যতে। অনাদিনিধনা ইত্যাদেশ সদাতনত্বং তস্য নিশ্চয়তে। ন চ কৃতকত্বাদপ্রামাণ্যং, প্রত্যক্ষাদৌ ব্যভিচারাৎ। ন চ পৌরুষেয়ত্বাদনপেক্ষত্বহেত্বভাবাদপ্রামাণ্যম্। বুদ্ধিপূর্ব্বপ্রণীতত্বাভাবেন তৎসিদ্ধেঃ। ন চোন্মত্তবাক্যসাদৃশ্যমবাধিতার্থত্বাদিতি ভাবঃ। সিদ্ধে বেদস্য প্রামাণ্যে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। নামপ্রপঞ্চসৃষ্টিরেবাত্রোপদিষ্টা ন রূপপ্রপঞ্চসৃষ্টি:, সা চোপদেষ্টব্যা, সৃষ্টিপরিপূর্তেরন্যথাহনুপপত্তেরিত্যাশঙ্ক্যাহ-নামেতি। যদ্যপি নামতন্ত্রা রূপ- সৃষ্টিরিতি নামসৃষ্টিবচনেন রূপসৃষ্টিরর্থাদুক্তা, তথাপি সর্ব্বসংসারসৃষ্টির্নোক্তা নামরূপয়োরের সংসারত্বে প্রাক্ তৎসৃষ্টেঃ সংসারো ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-নামরূপয়োরিতি। সর্ব্বাবস্থয়ো- র্ব্যক্তাব্যক্তাবস্থয়োরিতি যাবৎ। নামপ্রপঞ্চস্যৈবাত্র সর্গোক্তিমুপপাদিতমুপসংহরতি-ইতীতি। অতঃশব্দার্থং স্ফুটরতি-তদ্বচনেনেতি। নিশ্বসিতশ্রুতিং বিধান্তরেণাবতারয়তি-অথবেত্যা- দিনা। মিথ্যাত্বেইপি প্রতিবিম্ববৎ প্রামাণ্যসম্ভবাদুন্মত্তাদিবাক্যানাং চ মিথ্যাজ্ঞানাধীনপ্রযত্ন- জন্তত্বেনামানত্বাদ বেদস্য তদভাবাদ্বিষয়াব্যভিচারাচ্চ নাপ্রামাণ্যমিত্যাহ-তদাশঙ্কেতি। অন্যো গ্রন্থে। বুদ্ধাদিপ্রণীতঃ-স্বর্গকামশ্চৈত্যং বন্দেতেত্যাদিঃ। ১১৬। ১০।
ভাষ্যানুবাদ।—স্থিতিকালের ন্যায় উৎপত্তিকালেও অর্থাৎ উৎপত্তির পূর্ব্বেও ব্রহ্মৈকত্ব অবধারণ করিতে পারা যায়। অগ্নি হইতে ধূম, স্ফুলিঙ্গ ও শিখা প্রভৃতি প্রাদুর্ভূত হইবার পূর্ব্বে যেরূপ এক(ধূমাদিসম্বন্ধশূন্য) অগ্নিই অবধারিত হয়, তদ্রূপ নাম-রূপাত্মক বিকৃতিবিশিষ্ট এই জগৎকেও উৎপত্তির পূর্ব্বে একমাত্র প্রজ্ঞানঘন বলিয়াই অবধারণ করা যুক্তিযুক্ত। এখানে এই বিষয়ই প্রতিপাদিত হইয়াছে—
৬৩১
সেই দৃষ্টান্তটি এইরূপ—সংস্থাপিত আর্দ্রধাগ্নি হইতে—আর্দ্রকাষ্ঠে প্রজ্বলিত অগ্নির নাম আর্দ্রধাগ্নি। সেই অগ্নি হইতে পৃথক্—নানাপ্রকার ধূমরাশি— ধূমশব্দটি বিস্ফুলিঙ্গাদিরও বোধক, ধূম ও বিস্ফুলিঙ্গাদি যেরূপ বিনির্গত হইয়া থাকে; এইপ্রকার অর্থাৎ উক্ত দৃষ্টান্তের ন্যায়, অরে মৈত্রেয়ি, এই প্রস্তাবিত মহান্ নিত্যসিদ্ধ পরমাত্মার ইহা নিশ্বসিত—নিশ্বাসের মত, অর্থাৎ লোকের নিশ্বাস যেমন অনায়াসে নিষ্পন্ন হইয়া থাকে, তদ্রূপ ॥ ১
সেই ব্রহ্ম হইতে নিশ্বাসের ন্যায় যাহা যাহা প্রাদুর্ভূত হয়, তাহা বলা হইতেছে -যাহা ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ ও অথর্ব্বাঙ্গিরস, এই চারি প্রকার মন্ত্ররাশি, (১) ইতিহাস-উর্ব্বশী-পুরুরবার সংবাদপ্রভৃতি, যেমন-‘উর্ব্বশী নামে এক অপ্সরা ছিল’ ইত্যাদি, তাহাও ব্রাহ্মণাংশেরই অন্তর্গত; পুরাণ-(পুরাবৃত্তপ্রকাশক) ‘এই জগৎ অগ্রে অসৎই ছিল’ ইত্যাদি; বিদ্যা-দেবজনবিদ্যা(নৃত্যগীতাদি) যথা ‘ইহা সেই বেদ’ ইত্যাদি; উপনিষদ্-(ব্রহ্মবিদ্যাপ্রকাশক বেদভাগ), ‘প্রিয়- রূপেই উপাসনা করিবে’ ইত্যাদি; শ্লোক-ব্রাহ্মণভাগস্থ মন্ত্রসমূহ, যথা “তদেতে শ্লোকাঃ” ইত্যাদি; সূত্র-সত্যবিষয়সংগ্রহাত্মক বাক্যসমূহ, যথা-‘আত্মা বলিয়াই উপাসনা করিবে’ ইত্যাদি। অনুব্যাখ্যান-মন্ত্রের বিবরণ বা ব্যাখ্যা; ব্যাখ্যান-অর্থবাদবাক্য,(যে সমস্ত বাক্যে বিধির প্রশংসা ও নিষেধের নিন্দা করা হয়, তাহা); অথবা অনুব্যাখ্যান অর্থ-বস্তুসংগ্রহাত্মক বাক্যের বিবরণ বা ব্যাখ্যা, যেমন চতুর্থ অধ্যায়ে ‘আত্মা ইত্যেবোপাসীত’ এই বাক্যের, অথবা যেমন “যে লোক ‘উপাশ্য অন্য এবং আমি অন্য’ এইরূপে জানে, প্রকৃতপক্ষে সে তাঁহাকে জানে না; সে ব্যক্তি দেবগণের পশুসদৃশ”, এই বাক্যের ব্যাখ্যাত্মক হইতেছে এই অধ্যায়ের অবশিষ্টাংশ; আর ব্যাখ্যান অর্থ-মন্ত্রের বিবরণ বা ব্যাখ্যা, এই আট প্রকার ব্রাহ্মণভাগ; এইরূপে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণভাগের উল্লেখ করা হইল ॥ ২
* এখানে বুঝিতে হইবে যে, নির্দিষ্ট প্রণালী অনুসারে রচনাবিশেষসম্পন্ন বেদ পূর্ব্বেও. বিদ্যমানই ছিল; সেই বিদ্যমান বেদই পুরুষ-নিশ্বাসবৎ ব্রহ্ম হইতে অভিব্যক্ত হইয়াছে মাত্র; কিন্তু কোনও ব্যক্তিবিশেষের চিন্তাপূর্ব্বক বিরচিত হয় নাই; এই কারণে বেদ স্বার্থ-প্রতিপাদনবিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ, অর্থাৎ বেদের প্রামাণ্য-নিশ্চয়ের জন্য অপর কোনও প্রমাণের অপেক্ষা করে না, উহা স্বতঃপ্রমাণ; অতএব যাহারা নিজের কল্যাণ ইচ্ছা করে, তাহাদের পক্ষে, বেদশাস্ত্র জ্ঞান বা কৰ্ম্ম—যাহা যেরূপে নিরূপণ করিয়া গিয়াছে, তাহা সেইরূপেই গ্রহণ করা উচিত। কেন না, কোনও রূপ বা বস্তুর যে বিকার উপস্থিত হয়, বিভিন্নপ্রকার নামাভিব্যক্তিই তাহার কারণ, অর্থাৎ নাম-বিশেষযোগেই বস্তুর বিভিন্নাবস্থা ঘটিয়া থাকে,(স্বরূপতঃ নহে)। বিশেষতঃ পরমাত্মার উপাধিভূত নাম ও রূপই ব্যাকৃতাবস্থা প্রাপ্ত হয়, এবং জল ও তাহার ফেনার ন্যায় নাম ও রূপকে ভিন্ন বা অভিন্ন বলিয়া নিরূপণ করা যায় না; যে কোন অবস্থায় থাকুক না কেন, সেই নাম ও রূপ লইয়াই সংসার; এইজন্য এখানে কেবল নামকে (শব্দরাশিকে) নিশ্বাসবৎ উৎপন্ন বলা হইল; কারণ, তাহার নির্দেশেই অপরেরও—রূপেরও নিশ্বাসবৎ উৎপত্তি প্রতিপন্ন হইয়া থাকে। অথবা[ইহার অভিপ্রায় এইরূপ—] ইতঃপূর্ব্বে “ব্রহ্ম তং পরাদাৎ” ইত্যাদি শ্রুতিতে নিখিল জগৎপ্রপঞ্চকেই অবিদ্যাধিকারস্থ(অসত্য) বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে; তাহার ফলে(জগতের অন্তর্ভূত) বেদেরও অপ্রামাণ্য আশঙ্কিত হইতে পারিত; সেই আশঙ্কা-নিবৃত্তির জন্যই এই কথা বলা হইয়াছে যে, লোকের নিঃশ্বাস যেরূপ অযত্নপ্রসূত অর্থাৎ স্বাভাবিক চেষ্টার ফল মাত্র, তদ্রূপ বেদরাশিও পরম পুরুষের নিঃশ্বাসবৎ অযত্নপ্রসূত; কিন্তু অপরাপর গ্রন্থ যেরূপ লোকের চেষ্টাসাপেক্ষ, বেদ সেরূপ নহে; এই জন্যই ইহা স্বতঃপ্রমাণ(১) ॥ ১১৬ ॥ ১০ ॥
৬৩৩
স যথা সর্ব্বাসামপাৎ সমুদ্র একায়নমেবং সর্বেষাং স্পর্শানাং ত্বগেকায়নমেবং সর্বেষাং রসানাং জিহ্বৈকায়ন- মেবং সর্বেষাং গন্ধানাং নাসিকে একায়নমেবং সর্বেষাং রূপাণাঞ্চক্ষুরেকায়নমেবং সর্বেষাং শব্দানাং শ্রোত্রমেকায়ন- মেবং সর্বেষাং সঙ্কল্পানাং মন একায়নমেবং সর্বাসাং বিদ্যানাং হৃদয়মেকায়নমেবং সর্বেষাং কর্মণাং হস্তাবেকায়নমেবং সর্বেষা- মানন্দানামুপস্থ একায়নমেবং সর্বেষাং বিসর্গাণাং পায়ুরেকায়ন- মেবং সর্বেষামধ্বনাং পাদাবেকায়নমেবং সর্বেষাং বেদানাং বাগেকায়নম্ ॥ ১১৭ ॥ ১১ ॥
সরলার্থঃ। -[সৃষ্টিকালবৎ প্রলয়কালেহপি প্রপঞ্চানাং ব্রহ্মৈকত্বং দর্শয়িতুং দৃষ্টান্তান্তরমাহ-“স যথা” ইত্যাদি।] সঃ(দৃষ্টান্তঃ) উচ্যতে-যথা সমুদ্রঃ সর্ব্বাসাৎ অপাম্(জলানাং) একায়নং(একত্বেনাশ্রয়স্থানং) এবং(তথা) সর্বেষাং বাযাত্মকানাং স্পর্শানাং ত্বক্ একায়নং(মুখ্যমাশ্রয়স্থানম্);[অত্র ত্বক্- শব্দেন স্পর্শসামান্যমভিধীয়তে, বিশেষাণাং সামান্যমাত্রেহন্তর্ভাবস্য ন্যায্যত্বাৎ, জল- সমুদ্রাদিদৃষ্টান্তসাম্যাচ্চ; এবমুত্তরত্রাপি বোধ্যম্]। এবং(তথা) সর্বেষাং ‘গন্ধানাং নাসিকে একায়নম্, এবং সর্বেষাং রসানাং জিহ্বা একায়নম্, এবং সর্ব্বেবাং রূপাণাং চক্ষুঃ একায়নম্, এবং সর্ব্বেষাং শব্দানাং শ্রোত্রম্ একায়নম্, এবং সর্ব্বেষাৎ সংকল্পানাং মনঃ একায়নম্, এবং সর্ব্বাসাং বিদ্যানাং হৃদয়ং(বুদ্ধিঃ) একায়নম্, এবং সর্ব্বেষাৎ কৰ্ম্মণাং হস্তৌ একায়নম্, এবং সর্ব্বেষাম্ আনন্দানাং উপস্থঃ একায়নম্, এবং সর্ব্বেষাৎ বিসর্গাণাং পায়ুঃ(মলদ্বারং) একায়নম্, এবং সর্বেষাম্ অধ্বনাং(পথাং) পাদৌ একায়নম্, এবং সর্ব্বেষাং বেদানাং বাক্ একায়নম্।[অত্র সর্ব্বত্র অবাদীনাং ষষ্ঠ্যন্তানাং তত্তদ্বিশেষরূপতয়া গ্রহণম্;
প্রণমান্তানাং সমুদ্রাদীনাং তু তত্তৎসামান্যতয়া গ্রহণম্, বিশেষাণাং চ সামান্যে অন্তর্ভাবঃ সমীচীন এব ইতি মন্তব্যম্] ॥ ১১৭ ॥ ১১ ॥
মূলানুবাদ:-[এখন প্রলয়কালেও ব্রহ্মাতিরিক্ত জগৎ- সত্তার অভাবপ্রদর্শনের অভিপ্রায়ে দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিতেছেন-] সেই দৃষ্টান্তটি এই-সমুদ্র যেরূপ সমস্ত জলের একমাত্র আশ্রয়স্থান, এই- প্রকার ত্বগিন্দ্রিয় সমস্ত স্পর্শের আশ্রয়। এইরূপ নাসিকাদ্বয় সমস্ত গন্ধের আশ্রয়; এইরূপ জিহ্বা সমস্ত রসের আশ্রয়স্থান; এই প্রকার চক্ষু সমস্ত রূপের আশ্রয়; এইরূপ শ্রবণেন্দ্রিয় সমস্ত শব্দের আশ্রয়;; এইরূপ হৃদয় অর্থাৎ বুদ্ধিবিজ্ঞান সমস্ত জ্ঞানের একমাত্র আশ্রয়; এইরূপ হস্তদ্বয় সমস্ত কর্ম্মের একমাত্র আশ্রয়; এইরূপ উপস্থ বা জননেন্দ্রিয় সমস্ত আনন্দের একমাত্র আশ্রয়; এইরূপ পায়ু বা মলদ্বার সমস্ত ত্যাগের একমাত্র আশ্রয়; এইরূপ পদদ্বয় সমস্ত পথের একমাত্র আশ্রয়; এইরূপ বাগিন্দ্রিয় সমস্ত বেদের একমাত্র আশ্রয়স্থান। [এখানে এইরূপ বুঝিতে হইবে যে, জলসমষ্টিরূপ সমুদ্র হইতেছে জলমাত্রেরই সাধারণ রূপ, আর নদ, নদী ও তড়াগাদির জল হইতেছে সেই জলেরই বিশেষ বিশেষ রূপমাত্র; বিশেষ ধর্মগুলি সাধারণ-- ধর্মেরই অন্তর্ভূত হইয়া থাকে; সুতরাং নদ-নদীপ্রভৃতি বিশেষ বিশেষ স্থানগত জলগুলি যেমন সেই জলসমষ্টিভূত সমুদ্রেরই অন্তর্নিবিষ্ট, তেমনি বায়ু প্রভৃতির বিশেষ বিশেষ ধৰ্ম্ম স্পর্শাদিগুণও তৎসামান্যাত্মক ত্বপ্রভৃতির অন্তর্নিবিষ্ট; অতএব সামান্য ধর্ম্মের সত্তার অতিরিক্ত বিশেষধর্মের কোনও সত্তা নাই]॥ ১১৭ ॥ ১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—কিঞ্চান্যৎ; ন কেবলং স্থিত্যুৎপত্তিকালয়োরেব প্রজ্ঞান- ব্যতিরেকেণাভাবাজ্জগতো ব্রহ্মত্বম্, প্রলয়কালে চ; জলবুদ্বুদফেনাদীনামিব সলিলব্যতিরেকেণাভাবঃ, এবপ্রজ্ঞানব্যতিরেকেণ তৎকার্য্যাণাং নামরূপকর্ম্মণাং তস্মিন্নেব লীয়মানানামভাবঃ; তস্মাদেকমেব ব্রহ্ম প্রজ্ঞানঘনমেকরসং প্রতিপত্তব্য-- মিত্যত আহ। প্রলয়প্রদর্শনায় দৃষ্টান্তঃ—১
স ইতি দৃষ্টান্তঃ; যথা যেন প্রকারেণ, সর্ব্বাসাং নদীবাপীতড়াগাদিগতা- নামপাৎ, সমুদ্রোহন্ধিঃ একায়নম্ একগমনম্—একপ্রলয়ঃ অবিভাগপ্রাপ্তিরিত্যর্থঃ।
৬৩৫
যথায়ং দৃষ্টান্তঃ, এবং সর্ব্বেষাং স্পর্শানাং মৃদুকর্কশকঠিনপিচ্ছিলাদীনাং বায়োরাত্ম- ভূতানাং ত্বক্ একায়নম্। ত্বগিতি ত্বগবিষয়ং স্পর্শসামান্যমাত্রম্, তস্মিন্ প্রবিষ্টাঃ স্পর্শবিশেষাঃ—আপ ইব সমুদ্রং—তদ্ব্যতিরেকেণাভাবভূতা ভবন্তি; তস্যৈব হি- তে সংস্থানমাত্রা আসন্। ২
তথা তদপি স্পর্শসামান্যমাত্রং ত্বশব্দবাচ্যৎ মনঃসঙ্কল্পে মনোবিষয়সামান্য-- মাত্রে, ত্বগ্নিষয় ইব স্পর্শবিশেষাঃ, প্রবিষ্টং তদ্ব্যতিরেকেণাভাবভূতং ভবতি; এবং মনোবিষয়োহপি বুদ্ধিবিষয়সামান্যমাত্রে প্রবিষ্টঃ তদ্ব্যতিরেকেণাভাবভূতো ভবতি;- বিজ্ঞানমাত্রমেব ভূত্বা প্রজ্ঞানঘনে পরে ব্রহ্মণি-আপ ইব সমুদ্রে প্রলীয়তে। এবং পরম্পরাক্রমেণ শব্দাদৌ সহ গ্রাহকেণ করণেন প্রলীনে প্রজ্ঞানঘনে উপাধ্যভাবাৎ সৈন্ধবঘনবৎ প্রজ্ঞানঘনমেকরসম্ অনন্তম্ অপারং নিরন্তরং ব্রহ্ম ব্যবতিষ্ঠতে। তস্মাদাত্মৈব একমদ্বয়মিতি প্রতিপত্তব্যম্। ৩
তথা সর্বেষাং গন্ধানাং পৃথিবীবিশেষাণাৎ নাসিকে ঘ্রাণবিষয়সামান্যম্।’ তথা সর্ব্বেষাং রসানাৎ অব্বিশেষাণাং[জিহ্বা?] জিহ্বেন্দ্রিয়বিষয়সামান্যম্। তথা সর্ব্বেষাং রূপাণাৎ তেজোবিশেষাণাং চক্ষুঃ চক্ষুর্বিষয়সামান্যম্; তথা শব্দানাং শ্রোত্রাদিবিষয়সামান্যং পূর্ব্ববৎ। তথা শ্রোত্রাদিবিষয়সামান্যানাং মনোবিষয়সামান্যে সঙ্কল্পে, মনোবিষয়সামান্যস্যাপি বুদ্ধিবিষয়সামান্যে বিজ্ঞানমাত্রে, বিজ্ঞানমাত্রং ভূত্বা পরস্মিন্ প্রজ্ঞানঘনে প্রলীয়তে। তথা কর্ম্মেন্দ্রিয়াণাং বিষয়া বদনাদানগমন- বিসর্গানন্দবিশেষাস্তৎক্রিয়াসামান্যেঘেব প্রবিষ্টা ন বিভাগযোগ্যা ভবন্তি-সমুদ্র- ইব অব্বিশেষাঃ। তানি চ সামান্যানি প্রাণমাত্রং, প্রাণশ্চ প্রজ্ঞানমাত্রমেব- “যো বৈ প্রাণঃ সা প্রজ্ঞা, যা বৈ প্রজ্ঞা স প্রাণঃ” ইতি কৌষীতকি- নোহধীয়তে। ৪
ননু সর্ব্বত্র বিষয়শ্যৈব প্রলয়োহভিহিতঃ; নতু করণস্য; তত্র কোহভিপ্রায়ঃ? ইতি। বাঢ়ম্; কিন্তু বিষয়সমানজাতীয়ং করণং মন্যতে শ্রুতিঃ, ন তু জাত্যন্তরম্। বিষয়শ্যৈব স্বাত্মগ্রাহকত্বেন সংস্থানান্তরং করণং নাম—যথা রূপবিশেষস্যৈব সংস্থানং প্রদীপঃ করণং সর্ব্বরূপপ্রকাশনে, এবং সর্ব্ববিষয়বিশেষাণামের স্বাত্মবিশেষ-- প্রকাশকত্বেন সংস্থানান্তরাণি করণানি প্রদীপবৎ। তস্মান্ন করণানাং পৃথক্-- প্রলয়ে যত্নঃ কার্য্যঃ, বিষয়সামান্যাত্মকত্বাদ্বিষয়-প্রলয়েনৈব প্রলয়ঃ সিদ্ধো ভবতি করণানামিতি ॥ ১১৭ ॥ ১১॥
টীকা।—স যথা সর্ব্বাসামপামিত্যাদিসমনন্তরগ্রন্থমুখাপয়তি—কিঞ্চান্ধাদিতি। তদেব ব্যাকরোতি—ন কেবলমিতি। প্রলয়কালে চ প্রজ্ঞানব্যতিরেকেণাভাবাজ্জগতো ব্রহ্মত্বমিতিঃ
• সম্বন্ধঃ। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-জলেতি। তথাপি প্রজ্ঞানমেবৈকমেবং স্যান্ন ব্রহ্মেত্যা- শঙ্ক্যাহ-তন্মাদিতি। সত্যজ্ঞানাদিবাক্যাদব্রহ্মস্তন্মাত্রত্বাদিত্যর্থঃ। যথোক্তং ব্রহ্ম চেৎ প্রতি- পত্তব্যং, কিমিতি তর্হি স যথেত্যাদি বাক্যমিত্যাশঙ্ক্য তচ্ছেযত্বেন প্রলয়ং দর্শয়িতুং দৃষ্টান্তবচন- মেতদিত্যাহ-অত আহেতি। প্রলীয়তেহস্মিন্নিতি প্রলয়ঃ, একশ্চাসৌ প্রলয়শ্চেত্যেকপ্রলয়ঃ। ‘তড়াগাদিগতানামপাং কুতঃ সমুদ্রে লয়ঃ, ন হি তাসাং তেন সঙ্গতিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-অবিভাগেতি। অত্র হি সমুদ্রশব্দেন জলসামান্যমুচ্যতে, তদ্ব্যতিরেকেণ চ জলবিশেষাণামভাবো বিবক্ষিতঃ, তেষাং তৎসংস্থানমাত্রত্বাদতশ্চাসামস্মিন্নবিভাগস্থ প্রাপ্তিরিতি সমুদ্রেইবিভাগপ্রাপ্তিরিত্যর্থঃ। পিচ্ছিলীনামিত্যাদিশব্দেনানুক্তস্পর্শবিশেষাঃ সর্ব্বে গৃহ্যন্তে। বিষয়াণামিন্দ্রিয়কার্য্যত্বাভাবাৎ কুতঃ স্পর্ণানাং ত্বচি বিলয়ঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ত্বগিতীতি। স্পর্শবিশেষাণাং স্পর্শসামান্যেহস্তর্ভাবং প্রপঞ্চঃতি-তস্মিন্নিতি। ২
তথাপি সমস্তস্থ জগতো ব্রহ্মব্যতিরেকেণাভাবাদ ব্রহ্মত্বমিত্যেতৎ কথং প্রতিজ্ঞাত- মিত্যাশঙ্কা পরম্পরয়া ব্রহ্মণি সর্ব্বপ্রবিলয়ং দর্শরিতুং ক্রমমনুক্রামতি-তথেতি। মনসি সতি বিষয়- ‘বিষরিভাবস্য দর্শনাদসতি চাদর্শনান্মনঃস্পন্দিতমাত্রং বিষয়জাতমিতি তস্য তদ্বিষয়মাত্রে প্রবিষ্টস্ত ‘তদতিরেকেণাসত্ত্বমিত্যর্থঃ। সঙ্কল্পবিকল্পাত্মকমনঃস্পন্দিতদ্বৈতস্য সঙ্কল্পাত্মকে মনস্যন্তর্ভাবাত্তস্থ্য চ সঙ্কল্পস্যাধ্যবসায়পারতন্ত্রাদর্শনাদধ্যবসায়াত্মিকায়াং চ বুদ্ধৌ তদ্বিষয়স্থ্য পূর্ব্ববদনুপ্রবেশান্ মনোবিষয়সামান্যস্থ বুদ্ধিবিষয়সামান্যে প্রবিষ্টস্থ্য তদ্ব্যতিরেকেণাসত্ত্বমিত্যাহ-এবমিতি। সর্ব্বং জগদুক্তেন ন্যায়েন বুদ্ধিমাত্রং ভূত্বা তদ্ যচ্ছেচ্ছান্ত আত্মনীতি শ্রুত্যা ব্রহ্মণি পর্যবস্যতীত্যাহ -বিজ্ঞানমাত্রমিতি। ননু জগদিদং বিলীয়মানং শক্তিশেষমেব বিলীয়তে। তত্ত্বজ্ঞানাদৃতে তস্য ‘নিঃশেষনাশানাশ্রয়ণাৎ; তথা চ কুতো ব্রহ্মৈকরসস্থ প্রতিপত্তিরত আহ-এবমিতি। শক্তি- ‘শেষলয়েহপি তস্যা দুর্নিরূপত্বাদ বস্ত্বৈকরস্যধীরবিরুদ্ধেতি ভাবঃ। একায়নপ্রক্রিয়াতাৎপর্যমুপ- সংহরতি-তস্মাদিতি। ঘ্রাণবিষয়সামান্যমিত্যাদাবেকায়নমিতি সর্বত্র সম্বন্ধঃ। ৩
কথং পুনরত্র প্রতিপর্যায়ং ব্রহ্মণি পর্যবসানং, তত্রাহ-তথেতি। যথা সর্বেষু -পর্যায়েষু ব্রহ্মণি পর্যবসানং, তথোচ্যুত ইতি যাবৎ। পূর্ব্ববদিতি ত্বমিষয়সামান্যবদিত্যর্থঃ। সঙ্কল্পে লয় ইতি শেষঃ। বিজ্ঞানমাত্র ইত্যত্রাপি তথৈব। এবং সর্বেষাং কৰ্ম্মণামিত্যাদেরর্থমাহ-তথা কর্মেন্দ্রিয়াণামিতি। ক্রিয়াসামান্যানাং সূত্রাত্মসংস্থানভেদত্বমভ্যুপেত্যাহ-তানি চেতি। ক্রিয়া- জ্ঞানশক্ত্যোশ্চিদুপাধিভূতয়োশ্চিদভেদাভেদমভিপ্রেত্য প্রাণশ্চেত্যাদি ভাষ্যম্। তত্র তয়োরন্যোহ্যা- ‘ভেদে মানমাহ-যো বা ইতি। ৪
শ্রুতিমুখাৎ করণলয়ো ন প্রতিভাতি, স্বয়ং চ ব্যাখ্যায়তে, তত্র কো হেতুরিতি পৃচ্ছতি —নন্বিতি। শ্রুত্যা করণলয়স্যানুক্তত্বমঙ্গীকরোতি—বাঢ়মিতি। পৃষ্টমভিপ্রায়ং প্রকটয়তি—কিং ত্বিতি। করণস্য বিষয়সাজাত্যং বিবৃণোতি—বিষয়স্যৈবেতি। কিমত্র প্রমাণমিত্যাশঙ্ক্যানুমান- ‘মিতি সূচরতি—প্রদীপবদিতি। চক্ষুস্তৈজসং রূপাদিষু মধ্যে রূপস্যৈব ব্যঞ্জকদ্রব্যত্বাৎ সম্প্রতিপন্ন- বদিত্যাদীন্যনুমানানি শাস্ত্রপ্রকাশিকায়ামধিগন্তব্যানি। করণানাং বিষয়সাজাত্যে ফলিতমাহ— তস্মাদিতি। পৃথগ্বিষয়প্রলয়াদিতি শেষঃ। একায়নপ্রক্রিয়াসমাপ্তাবিতিশকঃ। ১১৭।১১।
৬৩৮
ভাষ্যানুবাদ।—আরও এক কথা; কেবল সৃষ্টিকালে ও স্থিতিসময়েই যে, ব্রহ্মব্যতিরেকে সত্তা থাকে না বলিয়া জগতের ব্রহ্মাত্মকতা, তাহা নহে, প্রলয়- কালেও সেইরূপ; জলজ ফেন, তরঙ্গ ও বুদ্বুদ প্রভৃতির যেরূপ জল ব্যতিরেকে কোনও অস্তিত্ব নাই, তদ্রূপ প্রজ্ঞানঘন ব্রহ্ম হইতে সমুৎপন্ন নাম, রূপ ও কর্মরাশি যখন তাঁহাতে বিলীন হয়, তখনও প্রজ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্ম ব্যতিরেকে নামরূপাদির কোনও অস্তিত্ব থাকে না; অতএব বুঝিতে হইবে যে, ব্রহ্ম নিশ্চয়ই এক ও এক- মাত্র প্রজ্ঞানস্বরূপ; এখন এ কথাই দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাইতেছেন। বক্ষ্যমাণ দৃষ্টান্ত- গুলি প্রলয়ের উদাহরণরূপে প্রদর্শিত হইতেছে। ১
শ্রুতির ‘সঃ’ পদটি দৃষ্টান্তবোধক; ‘যথা’ অর্থ-যে প্রকারে; সমুদ্র যেপ্রকার নদী, বাপী ও তড়াগাদিগত সমস্ত বিশেষ বিশেষ জলের একায়ন-একমাত্র গন্তব্য স্থান-প্রলয়ের একমাত্র নিকেতন অর্থাৎ সমুদ্রের সহিত জলের অবিভাগাবস্থাপ্রাপ্তি হয়। এই দৃষ্টান্তটি যে প্রকার, ঠিক সেই প্রকার বায়ুর আত্ম- ভূত অর্থাৎ বায়ু-স্বভাব মৃদু, কর্কশ, কঠিন ও পিচ্ছিলাদি সর্ব্বপ্রকার স্পর্শেরই ত্বক্ হইতেছে একায়ন। এখানে ত্বশব্দে ত্বগিন্দ্রিয়গ্রাহ্য সামান্যতঃ স্পর্শমাত্রই বুঝিতে হইবে। জলসমূহ যেরূপ সমুদ্রে প্রবিষ্ট হয়, তদ্রূপ বিশেষ বিশেষ সমস্ত স্পর্শই সেই স্পর্শসামান্যে অন্তর্ভুত হয়-তাহার অভাবে অভাবগ্রস্ত হয়; কারণ, স্থিতিকালে সেই বিশেষ বিশেষ স্পর্শগুলি সেই সামান্যেরই অবস্থাবিশেষরূপে প্রকটিত হইয়া থাকে মাত্র;[সুতরাং প্রলয়কালে সে সমুদয় বিশেষগুলি সেই সামান্যের মধ্যেই বিলীন হইয়া অদৃশ্য হইয়া পড়ে]। ২
ত্বকে স্পর্শবিশেষের অন্তর্ভাবের ন্যায় সেই ত্বকশব্দবাচ্য স্পর্শসামান্যও আবার মনঃসংকল্পে অর্থাৎ মনের বিষয়ীভূত যাহা কিছু আছে, তাহাতে-বিশেষ বিশেষ স্পর্শসমূহ যেরূপ তদ্বিষয়ে প্রবিষ্ট হইয়া থাকে, তদ্রূপ প্রবিষ্ট হয় অর্থাৎ মানস সঙ্কল্প ছাড়া তাহার আর কোনও অস্তিত্ব থাকে না; এইরূপ মনের বিষয় সঙ্কল্পও সাধারণতঃ বুদ্ধির বিষয়মাত্রের অন্তঃপ্রবিষ্ট হয়-তদতিরিক্ত সত্তাশূন্য হইয়া থাকে। এই বুদ্ধিবিজ্ঞানে বিলীন হইয়া তদাত্মকভাব প্রাপ্ত হইবার পর, জলসমূহ যেমন সমুদ্রে মিলিয়া যায়, তেমনি সেই বিজ্ঞানও আবার প্রজ্ঞানঘন পরব্রহ্মে বিলীন হয়। এবংবিধ পরম্পরাক্রমে গ্রহণীয় শব্দাদি বিষয় ও তদ্গ্রাহক ইন্দ্রিয়বর্গ প্রজ্ঞানঘন পরব্রহ্মে বিলীন হইলে পর, উপাধিকৃত সর্ব্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্মের তিরোধান হইয়া যায়, প্রজ্ঞানঘন ব্রহ্মও তখন সৈন্ধবপিণ্ডের ন্যায় একরস(এক স্বভাব), অপরিচ্ছিন্ন, অসীম ও ভেদশূন্য
হইয়া থাকেন। অতএব আত্মাকেই অদ্বিতীয় একমাত্র সত্য বলিয়া বুঝিতে হইবে। ৩
সেইরূপ নাসিকাদ্বয় অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়মাত্রই হইতেছে-সমস্ত গন্ধের অর্থাৎ গন্ধোপাদান বিশেষ বিশেষ সমস্ত ভূমির[একায়ন]; সেইরূপ জিহ্বা অর্থাৎ রসনেন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সামান্য হইতেছে-সমস্ত রসের-বিশেষাবস্থাপন্ন সমস্ত জলের [ একায়ন]; সেইরূপ চক্ষু অর্থাৎ চক্ষুরিন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষণ্ণসামান্য হইতেছে-সমস্ত রূপের-বিশেষ বিশেষ সমস্ত তেজের[একায়ন]; সেইরূপ শ্রবণেন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সামান্য হইতেছে সমস্ত শব্দের[একায়ন], ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্বের মত। সেইরূপ শ্রবণেন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সামান্যের লর হয় মনের সাধারণ বিষয়াত্মক সংকল্পে; সেই মানস বিষয়সামান্যেরও আবার বুদ্ধির সাধারণ বিষয়াত্মক বিজ্ঞানে বিজ্ঞানাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া, পরিশেষে সেই বিজ্ঞানঘনও পরব্রহ্মে বিলীন হইয়া থাকে। সেইরূপ কর্ম্মেন্দ্রিয়সমূহের বচন, গ্রহণ, গমন, মলত্যাগ ও আনন্দ- প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ ক্রিয়াত্মক বিষয়গুলিও সেই সেইজাতীয় ক্রিয়াসামান্যে প্রবিষ্ট হয়; তখন সমুদ্রে প্রবিষ্ট জলসমূহের ন্যায় বিভাগযোগ্য আর কিছু থাকে না-যাহা মিলিয়া এক হইয়া যাইতে পারে(১)। সেই সেই সাধারণ ভাবগুলিও আবার সর্ব্বসামান্যাত্মক প্রাণস্বরূপে পরিণত হয়; সেই প্রাণ ত বস্তুতঃ বিজ্ঞানাতি- রিক্ত নহে, পরন্তু শুদ্ধ বিজ্ঞানস্বরূপই বটে; কারণ, কৌষীতকিব্রাহ্মণে পঠিত আছে যে, ‘যাহা প্রাণ নামে প্রসিদ্ধ, তাহা বস্তুতঃ প্রজ্ঞা; আবার যাহা প্রজ্ঞা বলিয়া প্রসিদ্ধ, তাহাও প্রাণস্বরূপ’ ইতি। ৪
ভাল, সকল স্থলে কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়েরই লয়ের কথা অভিহিত হইয়াছে, কিন্তু কোথাও ত বিষয়গ্রাহক ইন্দ্রিয়াদির লয়ের কথা অভিহিত হয় নাই; ইহার
অভিপ্রায় কি? হাঁ, এ আপত্তি আংশিক সত্য বটে, কিন্তু শ্রুতি মনে করেন যে, -করণবর্গ ও বিষয়সমূহ, উভয়ই একজাতীয়, ভিন্নজাতীয় নহে; কারণ, শব্দাদি বিষয়সমূহই স্ব-স্ব-প্রতীতির উপায়ভূত অবস্থান্তর প্রাপ্ত হইয়া করণ-সংজ্ঞায়—চক্ষুঃ- প্রভৃতি নামে অভিহিত হয় মাত্র। রূপপ্রকাশনের উপায়ভূত প্রদীপ যেমন তৈজস রূপেরই অবস্থাবিশেষ মাত্র; ঠিক সেই প্রদীপেরই মত বিশেষ বিশেষ বিষয়েই স্বগত বৈচিত্র্যবিশেষ-প্রত্যায়ক বিশেষ বিশেষ অবস্থাগুলিই চক্ষুঃপ্রভৃতি করণ- বর্গরূপে প্রকটিত হয়; সেই জন্যই করণবর্গের প্রলয়-নিরূপণের জন্য আর পৃথক্ প্রযত্বের আবশ্যক হয় না; কেন না, করণবর্গ যখন বিষয়সমূহেরই সামান্যাত্মক বা সাধারণ অবস্থা মাত্র, তখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহের প্রলয়-কথনেই করণ-সমুহেরও প্রলয়োক্তি সিদ্ধ হইতেছে ॥ ১১৭ ॥ ১১ ॥ ২৫১
আভাসভাষ্যম্।—তত্রেদং সর্ব্বং যদয়মাত্মেতি প্রতিজ্ঞাতম্; তত্র হেতুরভিহিত আত্মসামান্যত্বমাত্মজত্বমাত্মপ্রলয়ত্বঞ্চ। তস্মাদুৎপত্তিস্থিতিপ্রলয়কালেষু প্রজ্ঞানব্যতিরেকেণাভাবাৎ প্রজ্ঞানং ব্রহ্মৈব আত্মৈবেদং সর্ব্বমিতি প্রতিজ্ঞাতং যৎ, ‘তৎ তর্কতঃ সাধিতম্। স্বাভাবিকোহয়ং প্রলয় ইতি পৌরাণিকা বদন্তি; যস্তু বুদ্ধিপূর্ব্বকঃ প্রলয়ো ব্রহ্মবিদাং ব্রহ্মবিদ্যানিমিত্তা, অয়মাত্যন্তিক ইত্যাচক্ষতে— অবিদ্যানিরোধদ্বারেণ যো ভবতি; তদর্থোহয়ং বিশেষারম্ভঃ—
আভাসভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে যে, দৃশ্যমান যাহা কিছু, তৎসমস্তই আত্মস্বরূপ; তদ্বিষয়ে, আত্মার সাধারণভাব, আত্মা হইতে উৎপত্তি, এবং আত্মাতেই প্রলয়, এই কয়টি হেতুর উল্লেখ করা হইয়াছে; অতএব উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়সময়ে চৈতন্যসত্তার অতিরিক্ত সত্তা না থাকায় “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম” “আত্মৈবেদং সর্ব্বম্” ইত্যাদি পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাত বিষয়েরও সত্যতা সমর্থিত হইয়াছে; কিন্তু পৌরাণিক সম্প্রদায় বলিয়া থাকেন যে, ইহা হইতেছে স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক প্রলয়, আর ব্রহ্মবিদ্গণের ব্রহ্মবিদ্যাপ্রভাবে যে, জ্ঞানকৃত প্রলয়, তাহাই আত্যন্তিক প্রলয়; সৃষ্টির কারণীভূত অবিদ্যানিবৃত্তি দ্বারা তাহা সম্পন্ন হইয়া থাকে;[ইহার পর আর পুনর্ব্বার সৃষ্টি হইবে না], এই বিষয়টি প্রতিপাদন করি- বার জন্য পরবর্তী বিশেষ উপদেশের আবশ্যক হইতেছে—
স যথা সৈন্ধবখিল্য উদকে প্রান্ত, উদকমেবানু বিলীয়েত ন হাস্যোদ্গ্রহণায়ের স্যাৎ। যতো যতত্ত্বাদদীত লবণমেবৈবং বা অর ইদং মহদ্ভূ তমনন্তমপারং বিজ্ঞানঘন এব। এতেভ্যো
ভূতেভ্যঃ সমুত্থায় তান্যেবানু বিনশ্যতি, ন প্রেত্য সংজ্ঞাস্তীত্যরে ব্রবীমীতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ ॥ ১১৮ ॥ ১২ ॥
সরলার্থঃ।—[অথ দৃষ্টান্তান্তরমুচ্যতে—] সঃ(দৃষ্টান্তঃ)—যথা(যদ্বৎ) সৈন্ধবখিল্যঃ(লবণপিণ্ডঃ) উদকে(জলে) প্রান্তঃ(প্রক্ষিপ্তঃ সন্) উদকম্ এব অনু(স্বযোনিং জলম্ এব লক্ষ্যীকৃত্য) বিলীয়েত; অন্য(সৈন্ধবখিল্যস্য) উদ্গ্রহণায়(পূর্ব্ববৎ পৃথকৃত্য গ্রহীতুং) ন হ(নৈব) স্যাৎ(কশ্চিদপি সমর্থঃ ন ভবেদিত্যর্থঃ)। তু(পুনঃ) যতঃ যতঃ(যস্মাৎ যস্মাৎ অংশাৎ) আদদীত (উদকম্ আদায় আচামেৎ),[সর্ব্বত্র] লবণম্(লবণরসম্) এব[আস্বাদয়েৎ, ন তু সৈন্ধবখিল্যম্]; অরে মৈত্রেয়ি, এবং বৈ(এবমেব) ইদং(পরমাত্মাখ্যং) মহৎ(অপরিচ্ছিন্নং) ভূতং(নিত্যবস্তু) অনন্তম্ অপারম্ বিজ্ঞানঘনঃ(বিজ্ঞান- মাত্ররূপঃ) এব(নিশ্চয়ে)[ন ত্বন্যৎ কিঞ্চিৎ,] এতেভ্যঃ(যথোক্তেভ্যঃ) ভূতেভ্যঃ (পৃথিব্যাদিভ্যঃ) সমুত্থায়(উৎপদ্য) তানি অনু বিনশ্যতি(ভূতানি লক্ষ্যীকৃত্য বিনশ্যতীত্যর্থঃ); প্রেত্য(বিনাশানন্তরং) সংজ্ঞা(অরমহৎ, ইমে অন্যে ইত্যাদিরূপা বিশেষবুদ্ধিঃ) ন অস্তি,[তদা নামরূপাদিকৃতবিশেষ- বুদ্ধিরপি বিলীয়তে ইতি ভাবঃ] ইতি(এতৎ) অরে মৈত্রেয়ি, ব্রবীমি(কথয়ামি) ইতি যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ(উক্তবান্ কিল)॥ ১১৮ ॥ ১২ ॥
মূলানুবাদ।—অপর দৃষ্টান্ত বলিতেছেন—সেই দৃষ্টান্তটি এইরূপ,—সৈন্ধবখিল্য অর্থাৎ লবণপিণ্ড যেমন জলে নিক্ষিপ্ত হইলে সেই জলের সঙ্গে মিলিয়া যায়, কেহই আর তাহা পৃথক্ করিয়া উঠাইতে সমর্থ হয় না; কিন্তু সেই জলের যে যে অংশ হইতে জল লইয়া আস্বাদন করা যায়, সেইখানেই লবণরস অনুভূত হইয়া থাকে; অরে মৈত্রেয়ি, ঠিক তেমনি এই নিত্যসিদ্ধ মহৎ অনন্ত অপার বিজ্ঞানঘনই (শুধু চিম্মাত্রস্বরূপ জীবাত্মাই) এই আকাশাদি ভূতকে অবলম্বন করিয়া প্রাদুর্ভূত হয়, আবার সেই সমস্ত ভূতের সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়া যায়। মিলিত হইবার পর, তাহার আর নামরূপাদি সম্বন্ধজনিত কোনও বিশেষ ধর্ম্ম থাকে না; অরে মৈত্রেয়ি, আমি ইহাই তোমাকে বলিতেছি—এই কথা যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি বলিলেন ॥ ১১৮॥ ১২॥ শৌচবর্জ্জিতম্।—তত্র পৃষ্ঠে উপাধীয়তে—ন যথেতি। দৈববাচ্যঃ—
৬৪১
সিন্ধোর্বিকারঃ সৈন্ধবঃ, সিন্ধুশব্দেনোদকমভিধীয়তে, স্যন্দনাৎ সিন্ধুরুদকম্, তদ্বি- কারঃ তত্রভবো বা সৈন্ধবঃ, সৈন্ধবশ্চাসৌ খিল্যশ্চেতি সৈন্ধবখিল্যঃ; খিল এব খিল্যঃ, স্বার্থে যৎপ্রত্যয়ঃ। উদকে সিন্ধৌ স্বযোনৌ প্রান্তঃ প্রক্ষিপ্তঃ উদকমেব বিলীয়মানম্ অনুবিলীয়েত; যত্তভৌমতৈজসসম্পর্কাৎ কাঠিন্য-প্রাপ্তিঃ খিল্যস্য স্বযোনিসম্পর্কাদপগচ্ছতি,-তৎ উদকস্য বিলয়নম্, তদনু সৈন্ধবখিল্যো বিলীয়ত- ইত্যুচ্যতে; তদেতদাহ-উদকমেবানু বিলীয়েত ইতি। নহ নৈব অস্য খিল্যস্যোগ্রহণায় উদ্ধত্য পূর্ব্ববদ্গ্রহণায় গ্রহীতুম্ নৈব সমর্থঃ কশ্চিৎ স্যাৎ সুনিপুণোহপি; ইব-শব্দোহনর্থকঃ; গ্রহণায় নৈব সমর্থঃ; কস্মাৎ? যতো যতঃ যম্মাদ্যস্মাদ্দেশাৎ তদুদকমাদদীত-গৃহীত্বা আস্বাদয়েৎ, লবণাস্বাদমের তদুদকম্, ন তু খিল্যভাবঃ। ১
টীকা।—স যথা সৈন্ধবধিল্য ইত্যাদিঃ সম্বন্ধং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি—তত্রেত্যাদিনা। পূর্ব্বঃ সন্দর্ভস্তত্রেত্যুচ্যতে। প্রতিজ্ঞাতেহর্থে পূর্ব্বোক্তং হেতুমনুদ্য সাধ্যসিদ্ধিং ফলং দর্শয়তি—তস্মাদিতি। উক্তহেতোর্যথোক্তং ব্রহ্মৈব সর্বমিদং জগদিতি যৎ প্রতিজ্ঞাতমিদং সর্ব্বং যদয়মাত্মেতি, তৎপূর্ব্বোক্তদৃষ্টান্তপ্রবন্ধরূপতর্কবশাৎ সাধিতমিতি যোজনা। উত্তরবাক্যস্য বিষয়পরিশেষার্থমুক্ত- প্রলয়ে পৌরাণিকসম্মতিমাহ—স্বাভাবিক ইতি। কাৰ্য্যাণাং প্রকৃতাবাশ্রিতত্বং স্বাভাবিকত্বম্। প্রলয়াস্তরেহপি তেষাং সম্মতিং সঙ্গিরতে—যস্তিতি। দ্বিতীয়প্রলয়মধিকৃত্যানন্তরগ্রন্থমবতারয়তি —অবিধেতি। তত্রেত্যাত্যন্তিকপ্রলয়োক্তিঃ। উদকং বিলীয়মানমিত্যযুক্তং, কাঠিন্যবিলয়েহপি তল্লয়াদর্শনাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—যত্তদিতি। ন হেতি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—নৈবেতি। অন্বয়প্রদর্শ- নার্থং নৈবেতি পুনরুক্তম্। ১
যথায়ং দৃষ্টান্তঃ, এবমেব তু অরে মৈত্রেয়ি, ইদং পরমাত্মাখ্যং মহদ্ভূতম্। যস্মাৎ মহতো ভূতাদবিদ্যয়া পরিচ্ছিন্না সতী কার্যকরণোপাধিসম্বন্ধাৎ খিল্যভাবমাপন্নাসি, মর্ত্যা জন্মমরণাশনায়াপিপাসাদিসংসারধর্মবত্যসি, নামরূপকার্য্যাত্মিকা অমুষ্যান্বয়াহ- মিতি; স খিল্যভাবঃ তব কার্যকরণভূতোপাধিসম্পর্কভ্রান্তিজনিতঃ মহতি ভূতে স্বযোনৌ মহাসমুদ্রস্থানীয়ে পরমাত্মনি অজরেহমরেহভয়ে শুদ্ধে সৈন্ধবঘনবদেক- রসে প্রজ্ঞানঘনেহনস্তেহপারে নিরন্তরেহবিদ্যাজনিতভ্রান্তিভেদবর্জিতে প্রবেশিতঃ; তস্মিন্ প্রবিষ্টে স্বযোনিগ্রস্তে খিল্যভাবেহবিদ্যাকৃতে ভেদভাবে প্রণাশিতে— ইদমেকমদ্বৈতং মহদ্ভূতম্ মহচ্চ তদ্ভূতঞ্চ মহদ্ভূতং সর্ব্বমহত্তরত্বাৎ, আকাশাদিকারণত্বাচ্চ, ভূতং ত্রিঘপি কালেষু স্বরূপাব্যভিচারাৎ সর্ব্বদৈব পরিনিষ্পন্নমিতি ত্রৈকালিকো নিষ্ঠাপ্রত্যয়ঃ। অথবা ভূতশব্দঃ পরমার্থবাচী, মহচ্চ পারমার্থিকঞ্চেত্যর্থঃ। লৌকিকন্তু যদ্যপি-মহদ্ ভবতি, স্বপ্নমায়াকৃতং হিমবদাদি-পর্ব্বতোপমং ন পরমার্থবস্তু; অতো বিশিনষ্টি—ইদন্তু মহচ্চ তদ্ভূতঞ্চেতি। ২
মহদ্ভূতমেকমদ্বৈত মিত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। অন্যার্থস্য সর্ব্বোপনিষৎপ্রসিদ্ধত্বপ্রদর্শনার্থো বৈশব্দঃ। ইদং মহদ্ভূতমিত্যত্রেদংশব্দার্থং বিশদয়তি-যম্মাদিত্যাদিনা। তদিদং পরমাত্মাখ্যং মহদ্ভূতমিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। খিল্যভাবাপত্তিকার্য্যং কথয়তি-মর্ত্যেত্যাদিনা। কোহসৌ খিল্যভাবোহভি- প্রেততস্তত্রাহ-নামরূপেতি। কার্যকরণসঙ্ঘাতে তাদাত্ম্যাভিমানোেত্র খিল্যভাব ইত্যর্থঃ। ইতিশব্দেনাভিমানো লক্ষ্যতে। যথোক্তে খিলাভাবে সতি কুতো ভূতস্য মহত্ত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-স খিল্যভাব ইতি। খিল্যভাবঃ, স্বশব্দার্থঃ। পরস্য পরিশুদ্ধত্বার্থমজরাদি- বিশেষণানি। কেন রূপেণৈকরস্যং, তদাহ-প্রজ্ঞানেতি। তস্যাপরিচ্ছিন্নত্বমাহ-অনন্ত ইতি। তস্য সাপেক্ষত্বং বারয়তি-অপার ইতি। প্রতিভাসমানে ভেদে কথং যথোক্তং তত্ত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ -অবিদ্যেতি। ভবতু যথোক্তে তত্ত্বে খিল্যভাবস্থ্য প্রবেশস্তথাপি কিং স্যাদিত্যত আহ- তস্মিন্নিতি। মহত্ত্বং সাধয়তি-সর্ব্বেতি। ভূতত্বমুপপাদয়তি-ত্রিষপীতি। মহদিত্যুক্তে পারমার্থিকং চেতি বিশেষণং কিমর্থমিত্যাশঙ্ক্যাহ-লৌকিকমিতি। জাগ্রৎকালীনং পরিদৃশ্যমানং হিমবদাদি মহদ্ যদ্যপি ভবতি, তথাইপি স্বপ্নমায়াদিসমত্বান্ন তৎপরমার্থবস্তু। ন হি দৃশ্যং জড়মিন্দ্রজালাদেব্বি- শিষ্যতেহতো লৌকিকান্ মহতো ব্রহ্ম ব্যাবর্তয়িতুং বিশেষণমিত্যর্থঃ। ২
অনন্তং নাস্যান্তো বিদ্যত ইত্যনন্তম্; কদাচিদাপেক্ষিকং স্যাদিত্যতো বিশিনষ্টি অপারমিতি। বিজ্ঞপ্তিব্বিজ্ঞানং, বিজ্ঞানঞ্চ তঘনশ্চেতি বিজ্ঞানঘনঃ, ঘনশব্দো জাত্যন্তরপ্রতিষেধার্থঃ-যথা সুবর্ণঘনোয়োঘন ইতি। এব-শব্দোহবধারণার্থঃ, নান্যজ্জাত্যন্তরমন্তরালে বিদ্যত ইত্যর্থঃ। যদীদমেকমদ্বৈতং পরমার্থতঃ স্বচ্ছৎ সংসারদুঃখাসম্পৃক্তম্, কিংনিমিতোহয়ং খিল্যভাব আত্মন:-জাতো মৃতঃ সুখী দুঃখ্যহং মমেত্যেবমাদিলক্ষণোহনেকসংসারধর্মোপদ্রুতঃ?-ইতি, উচ্যতে- এতেভ্যঃ ভূতেভ্যঃ-যান্যেতানি কার্যকরণবিষয়াকারপরিণতানি নামরূপাত্মকানি সলিলফেনবুদ্বুদোপমানি স্বচ্ছস্য পরমাত্মনঃ সলিলোপমস্য, যেষাং, বিষয়পর্যন্তানাং প্রজ্ঞানঘনে ব্রহ্মণি পরমার্থবিবেকজ্ঞানেন প্রবিলাপনমুক্তং নদীসমুদ্রবৎ-এতেভ্যো হেতুভূতেভ্যো ভূতেভ্যঃ সত্যশব্দবাচ্যেভ্যঃ সমুখায় সৈন্ধবখিল্যবৎ-যথাহস্ত্যঃ সূর্য্যচন্দ্রাদিপ্রতিবিম্বঃ, যথা বা স্বচ্ছশ্য স্ফটিকন্যালক্তাদ্যপাধিভ্যো রক্তাদিভাবঃ, এবং কার্যকরণভূত-ভূতোপাধিভ্যো বিশেষাত্মখিল্যভাবেন সমুখায় সম্যগুথায়, যেভ্যো ভূতেভ্য উত্থিতঃ, তানি যদা কার্যকরণবিষয়াকারপরিণতানি ভূতানি আত্মনো বিশেষাত্মখিল্যহেতুভূতানি শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশেন ব্রহ্মবিদ্যয়া নদীসমুদ্রবৎ প্রবিলাপিতানি বিনশ্যন্তি, সলিলফেনবুদ্বুদাদিবৎ, তেষু বিনশ্যৎসু অন্বেব এব বিশেষাত্মখিল্যভাবো বিনশ্যতি; যথোদকালক্তকাদিহেত্বপনয়ে সূর্য্যচন্দ্রস্ফটিকাদি- প্রতিবিম্বো বিনশ্যতি, চন্দ্রাদিস্বরূপমের পরমার্থতো ব্যবতিষ্ঠতে, তদ্বৎ প্রজ্ঞানঘন- মনন্তমপারং স্বচ্ছং ব্যবতিষ্ঠতে। ৩
আপেক্ষিকং স্যাদানস্ত্যমিতি শেষঃ। অবধারণরূপমর্থমেব ক্ষোরয়তি-নান্যদিতি। এতেভ্যো ভূতেভ্যঃ সমুখায়েত্যাদিসমনন্তরবাক্যব্যাবর্ত্যামাশঙ্কামাহ-যদীদমিতি। বস্তুতঃ শুদ্ধত্বে কিং সিধ্যতি, তদাহ-সংসারেতি। তর্হি তস্মিন্নিমিত্তাভাবান্ন তস্য খিল্যত্বমিতি মত্বাহ-কিংনিমিত্ত ইতি। খিল্যভাবমেব বিশিনষ্টি-জাত ইতি। অনেক: সংসাররূপো ধর্ম্মোহশনায়াপিপাসাদি- স্তেনোপদ্রুতো দূষিত ইতি যাবৎ। খিল্যভাবে নিমিত্তং দর্শয়ন্নুত্তরমাহ-উচ্যতইতি। এতচ্ছন্দার্থং ব্যাকরোতি-যানীতি। স্বচ্ছস্থ পরমাত্মনঃ কার্যকরণবিষয়াকারপরিণতানীতি সম্বন্ধঃ। তানি ব্যবহারসিদ্ধ্যর্থং বিশিনষ্টি-নামরূপাত্মকানীতি। তেষামতিদুর্ব্বলত্বং সূচয়তি -সলিলেতি। স্বচ্ছত্বে দৃষ্টান্তমাহ-সলিলোপমস্যেতি। তেষাং প্রত্যক্ষত্বেইপি প্রকৃতত্বাভাবে কথমেতচ্ছবেন পরামর্শঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-যেষামিতি। উক্তমেকায়নপ্রক্রিয়ায়ামিতি শেষ‘। ব্রহ্মণি প্রজ্ঞানঘনে ভূতানাং প্রলয়ে দৃষ্টান্তমাহ-নদীতি। হেতৌ পঞ্চমীতি দর্শয়তি-হেতুভূতেভ্য ইতি। পূর্বস্মিন্ ব্রাহ্মণে ষষ্ঠ্যন্তসত্যশব্দবাচ্যতয়া তেষাং প্রকৃতত্বমাহ-সত্যেতি। যথা সৈন্ধবঃ সন্ খিল্যঃ সিন্ধোস্তেজঃসম্বন্ধমপেক্ষ্যোদ্গচ্ছতি, তথা ভূতেভ্যঃ খিল্যভাবো ভবতীত্যাহ- সৈন্ধবেতি। সমুখানমের বিবৃণোতি-যথেত্যাদিনা। তান্যেবেত্যাদি ব্যাচষ্টে-যেভ্য ইতি। খিল্যহেতুভূতানি তত্র হেতুত্বোপেতানীতি ‘যাবৎ। ব্রহ্মবিদ্যোৎপত্তৌ হেতুমাহ-শাস্ত্রেতি। তৎফলং সদৃষ্টান্তমাচষ্টে-নদীতি। যথা সলিলে ফেনাদয়ো বিনশ্যন্তি, তথা তেষু ভূতেষু বিনশ্যৎসু সৎস্বনু পশ্চাৎ পিল্যভাবো নশ্যতীত্যাহ-সলিলেতি। কিং পুনর্ভূতানাং খিল্যভাবস্য চ বিনাশে সত্যবশিষ্যতে? তত্রাহ-যথেতি। ৩
ন তত্র প্রেত্য বিশেষসংজ্ঞাস্তি কার্য্যকরণসঙ্ঘাতেভ্যো বিমুক্তস্য ইত্যেবম্, অরে মৈত্রেয়ি, নাস্তি বিশেষসংজ্ঞেতি ব্রবীমি—অহমস্মি অমুষ্য পুত্রঃ, মমেদং ক্ষেত্রং ধনং, সুখী দুঃখীত্যেবমাদিলক্ষণা, অবিদ্যাকৃতত্ত্বাত্তস্যাঃ; অবিদ্যায়াশ্চ ব্রহ্মবিদ্যয়া নিরন্বয়তো নাশিতত্বাৎ কুতো বিশেষসংজ্ঞাসম্ভবো ব্রহ্মবিদশ্চৈতন্য- স্বভাবস্থিতস্য? শরীরাবস্থিতস্যাপি বিশেষসংজ্ঞা নোপপদ্যতে, কিমুত কার্য্য- করণবিমুক্তস্য সর্ব্বতঃ—ইতি হ উবাচ উক্তবান্ কিল পরমার্থদর্শনং মৈত্রেয্যে ভার্য্যায়ৈ যাজ্ঞবল্ক্যঃ ॥ ১১৮॥ ১২॥
তত্রেতি কৈবল্যোক্তিঃ। উক্তমেব বাক্যার্থং স্ফুটয়তি-নাস্তীতি। ব্রহ্মবিদোহশরীরস্য বিশেষসংজ্ঞাভাবং কৈমুতিকন্যায়েন কথয়তি-শরীরাবস্থিতস্যেতি। সুষুপ্তস্যেতি যাবৎ। সর্ব্বতঃ কার্য্যকরণবিমুক্তস্যেতি সম্বন্ধঃ। ১১৮। ১২।
ভাষ্যানুবাদ।—উক্ত বিষয়ে দৃষ্টান্ত সংগৃহীত হইতেছে—‘স যথা’ ইত্যাদি। সৈন্ধবখিল্য—সৈন্ধব অর্থ—সিন্ধুর বিকার। এখানে সিন্ধু অর্থে জল অভিহিত হইয়াছে; কারণ, স্যন্দন বা ক্ষরণ হওয়া জলেরই স্বাভাবিক ধর্ম্ম; স্যন্দন হেতুই জলের নাম সিন্ধু; যাহা ঐ সিন্ধুর বিকার, বা সিন্ধে উৎপন্ন, তাহা সৈন্ধব। খিল্য অর্থ—খিল(পিণ্ড), স্বার্থে তদ্ধিত ‘ব’ প্রত্যয় হইয়াছে। সৈন্ধব-
খিল্য অর্থ—যাহা সৈন্ধব, তাহাই খিল্য। সেই সৈন্ধবখিল্য স্বযোনি জলে নিক্ষিপ্ত হইয়া জলের সঙ্গেই বিলীন হইয়া যায়; পার্থিব উত্তাপ-সংযোগ বশতঃ খিল্যের যে কঠিনতা হইয়া থাকে, স্বকারণীভূত জলসংস্পর্শে তাহার অপগম বা অন্তর্দ্ধান, তাহাই[সৈন্ধবখিল্যের উপাদানভূত] উদকের বিলয়; সুতরাং সেই জল-বিলয়ের সঙ্গে সঙ্গেই যে, সৈন্ধবখিল্যের বিলয় হইয়া থাকে, এখানে “উদকমেব অনু বিলীয়েত” কথায় তাহাই ব্যক্ত করা হইতেছে। অতি বিচক্ষণ লোকও এই সৈন্ধবখিল্যকে পূর্ব্বের ন্যায় পৃথক্ করিয়া উদ্ধার করিতে সমর্থ হয় না; কারণ? যে হেতু, যে যে অংশ হইতে ঐ জল গ্রহণ করা যায়—গ্রহণ করিয়া আস্বাদন করা যায়, সেই জলে কেবল লবণাস্বাদই পাওয়া যায়, কিন্তু খিল্যভাব আর দেখিতে পাওয়া যায় না। এখানে[“গ্রহণায়—ইব”] এই ‘ইব’ শব্দটির কোনই অর্থ নাই। ১
অরে মৈত্রেয়ি, যেরূপ দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইল, ঠিক এইরূপই পরমাত্মাখ্য মহৎ ভূত(নিত্যসিদ্ধ পদার্থ)-তুমি অবিদ্যাপ্রভাবে যে মহৎ ভূত হইতে বিচ্ছিন্ন ও পরিচ্ছিন্ন হইয়া দেহেন্দ্রিয়াদি উপাধিসম্পর্ক বশতঃ খিল্যভাব(পৃথক্ ব্যক্তিভাব) প্রাপ্ত হইয়াছ-মর্ত্যরূপে জন্ম, মরণ, অশনায়া, পিপাসা প্রভৃতি সংসার-ধৰ্ম্মযুক্ত হইয়াছ; আমি অমুকের বংশজাত-অমুক বলিয়া আপনাকে নাম-রূপ-কার্য্যাত্মক মনে করিতেছ। দেহেন্দ্রিয়াদি উপাধিসম্পর্ক-জনিত ভ্রমাত্মক তোমার সেই খিল্যভাবটি যদি অজর, অমর, অভয়, অনন্ত, অপার, নিত্যশুদ্ধ ও সৈন্ধবপিণ্ডবৎ একরসাত্মক জ্ঞানস্বরূপ ব্যবধানরহিত এবং অবিদ্যা-জনিত ভ্রম- রহিত নিত্যসিদ্ধ মহৎ স্বযোনি পরমাত্মাতে প্রবেশিত হয়;-তাহাতে প্রবিষ্ট হইলে উক্ত খিল্যভাবটিও স্বকারণে বিলীন হইয়া যায়; তখন অবিদ্যাকৃত সমস্ত ভেদও বিনষ্ট হইয়া যায়, তখন-এই এক অদ্বিতীয় মহৎ ভূত ব্রহ্মবস্তু সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ বলিয়া এবং আকাশাদি মহাভূতের কারণ বলিয়াও মহৎ, এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ‘ও বর্তমান এই কালত্রয়েই তাহার স্বরূপহানি ঘটে না, সর্ব্বদাই সিদ্ধবৎ থাকে, এই কারণেই ভূ-ধাতুর উত্তর নিষ্ঠাপ্রত্যয়(‘ক্ত’ প্রত্যয়) হইয়াছে। অথবা ভূতশব্দটি পরমার্থ বস্তুবোধক;[বুঝিতে হইবে যে,] তিনি মহৎও বটে, এবং পরমার্থ সত্যও বটে; জাগতিক পদার্থগুলি যদিও স্বপ্ন ও মায়াসমুথিত হিমালয়াদি পর্ব্বতসদৃশ মহৎ হউক, তথাপি তাহা কখনই পারমার্থিক সত্য নহে; এইজন্যই এখানে ‘মহৎ’ ও ‘ভূত’ শব্দে ব্রহ্মকে বিশেষিত করা হইয়াছে। ২
[সেই মহৎ ভূতটি] অনন্ত; কারণ, দেশকালাদি দ্বারা তাহার অন্ত বা সীমা নির্দ্ধারিত করা যায় না; আনন্ত্য ধর্মটি সময়বিশেষে আপেক্ষিকও হইতে পারে; এই জন্য বিশেষ করিয়া বলিতেছেন,-‘অপারম্’, অর্থাৎ তাঁহার আনন্ত্য আপেক্ষিক নহে, স্বাভাবিক। বিজ্ঞান অর্থ-বিশেষ জ্ঞান; বিজ্ঞানঘন অর্থ- বিজ্ঞানও বটে, ঘনও বটে; ‘ঘন’ শব্দটি অন্যজাতীয় পদার্থের সম্বন্ধপ্রতিষেধক; যেমন-সুবর্ণঘন(কেবলই সুবর্ণ), অয়োঘন(কেবলই লৌহ) ইত্যাদি। [বিজ্ঞানঘন এব] এই ‘এব’ শব্দটির অর্থ অবধারণ-নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে অন্য- জাতীয় কোন পদার্থ বিদ্যমান নাই। ভাল কথা, এই পরমাত্মা যদি নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয় যথার্থ নির্মূল ও সংসারদুঃখে অসংশ্লিষ্টই হয়, তাহা হইলে এই আত্মার অন্যথাভাবের কারণ কি? যাহার ফলে-জীবগণ ‘আমি জাত, মৃত, সুখী,’ দুঃখী এবং আমি আমার ইত্যাদি অনেক প্রকার সংসারধর্ম্মে উৎপীড়িত হইয়া থাকে? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন-“এতেভ্য: ভূতেভ্যঃ”-স্বচ্ছ নিরা- বিল সলিলসদৃশ পরমাত্মার এই যে, জলীয় ফেন বুদ্বুদের ন্যায় দেহ, ইন্দ্রিয় ও বিষয়াকারে পরিণত নামরূপাত্মক ধৰ্ম্ম, পরমার্থবিবেক-জ্ঞান দ্বারা কার্য্য, করণ ও বিষয়াত্মক সে সমস্ত ধর্ম্মের-সমুদ্রে নদী-নালার ন্যায় প্রজ্ঞানঘন পরমাত্মাতে বিলীন করার কথা উক্ত হইয়াছে। সত্য-শব্দবাচ্য সেই মহৎ ভূত হইতে সৈন্ধব- খিল্যের ন্যায় সমুত্থিত হইয়া-অর্থাৎ জলের সাহায্যে যেরূপ চন্দ্রসূর্যাদির প্রতি- বিশ্ব উত্থিত হয়, অলক্ত(আলতা) প্রভৃতি লোহিত দ্রব্যের সহযোগে যেরূপ স্বভাবশুভ্র স্ফটিকে লৌহিত্যাদি ভাব উপস্থিত হয়, তদ্রূপ দেহেন্দ্রিয়াদি ভাবে পরিণত ভূতাত্মক উপাধির সহিত সম্বন্ধনিবন্ধন আত্মারও বিশেষ বিশেষ খিল্য- ভাব উপস্থিত হইয়া থাকে; আত্মার বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিভেদে খিল্যভাব প্রাপ্তির হেতুভূত এই দেহ, ইন্দ্রিয় ও বিষয়াকারে পরিণত সেই ভূতসমূহই আবার যখন শাস্ত্র ও আচার্য্যোপদেশজনিত ব্রহ্মবিদ্যাপ্রভাবে সমুদ্রে নদীসমূহের ন্যায় বিলাপিত(বিনাশিত) হয়, তখন সেই ভূতসমূহ বিনষ্ট হইবার সঙ্গে সঙ্গে, কথিত সেই আত্মারও সেই বিশেষ বিশেষ খিল্যভাব বিনষ্ট হইয়া যায়। প্রতিবিম্ব সমুদ্ভবের হেতুভূত জলের ও অলক্তাদি(আলতা প্রভৃতি) বস্তুর অভাবে যেমন জলাদিগত চন্দ্র সূর্য্য ও স্ফটিকাদির প্রতিবিম্বও বিনষ্ট হইয়া যায়-তখন তাহারা কেবল চন্দ্র সূর্যাদিরূপেই অবস্থান করে, তেমনি উপাধিভূত ভূতবর্গের বিলয় হইলে পর, তজ্জনিত ঐ খিল্যভাবও অনন্ত অপার নিৰ্ম্মল প্রজ্ঞানঘনস্বরূপে অবস্থান করিয়া থাকে। ৩
অরে মৈত্রেরি, আমি বলিতেছি—সেই কৈবল্যাবস্থায় যখন প্রেত হয়— কার্য্যকরণাত্মক দেহপিণ্ড হইতে বিমুক্ত হয়, তখন তাহার আর বিশেষ সংজ্ঞা অর্থাৎ ‘আমি অমুক, অমুকের পুত্র, আমার এই ক্ষেত্র ও ধনসম্পদ, আমি সুখী দুঃখী’ ইত্যাদি প্রকার বিশেষ জ্ঞান থাকে না; কারণ, একমাত্র অবিদ্যা হইতেই ঐ প্রকার বিশেষ বিজ্ঞান সমুৎপন্ন হইয়া থাকে; সেই অবিদ্যাই যখন ব্রহ্মবিদ্যা দ্বারা সমূলে বিধ্বস্ত হইয়া যায়, তখন নিজের স্বভাবসিদ্ধ চৈতন্যরূপে অবস্থিত সেই ব্রহ্মবিদ্ ব্যক্তির ‘বিশেষ সংজ্ঞা-সম্ভাবনের সম্ভাবনাই থাকে না; তখন দেহেন্দ্রিয়সম্বন্ধ সত্তার আর কথা কি? যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি স্বীয় ভার্য্যা মৈত্রেয়ীকে এইরূপ পরমার্থ জ্ঞানের উপদেশ দিয়াছিলেন ॥ ১১৮ ॥ ১২ ॥ ৫।৪
সা হোবাচ মৈত্রেয্যত্রৈব মা ভগবানমুমুহন্ ন প্রেত্য সংজ্ঞা- স্তীতি; স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যো ন বা অরেহহং মোহং ব্রবীম্যালং বা অর ইদং বিজ্ঞানায় ॥ ১১৯ ॥ ১৩ ॥
সরলার্থঃ।—সা(এবং প্রবোধিতা) মৈত্রেয়ী উবাচ হ(কিল) ভগবান্ (পূজনীয়ো ভবান্) ‘ন প্রেত্য সংজ্ঞাস্তীতি’ অত্র(বিষয়ে) এব মা(মাম্) অমুমুহৎ(বিমোহিতবান্)।[এবমুক্তঃ] সঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ—অরে(হে মৈত্রেয়ি), অহং ন বৈ(নৈব) মোহং(মোহকরং বাক্যম্) ব্রবীমি; অরে(হে মৈত্রেয়ি), ইদং(মদুক্তঃ ‘ন প্রেত্য সংজ্ঞাস্তীতি’ বাক্যার্থঃ) বিজ্ঞানায়(বিশেষেণ জ্ঞাতুম্) বৈ অলং(পর্যাপ্তং যোগ্যমিত্যর্থঃ) ॥ ১১৯ ॥ ১৩॥
মূলানুবাদ।—মৈত্রেয়ী এইরূপ প্রবোধ প্রাপ্ত হইয়া যাজ্ঞ- বন্ধ্যকে বলিলেন—পূজনীয় আপনি যে, বলিয়াছেন—প্রেত্যভাবের পর বিশেষ বিজ্ঞান থাকে না, এখানেই আমাকে বিমোহিত করিয়াছেন, অর্থাৎ প্রেত্যভাবের পর যে, বিশেষ বিজ্ঞান কেন থাকে না, তাহা আমি বুঝিতেছি না। তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—অরে মৈত্রেয়ি, আমি নিশ্চয়ই তোমাকে মোহকর(ভ্রান্তিজনক মিথ্যা) বাক্য বলিতেছি না; এ বিষয়টি বিশেষরূপে হৃদয়ঙ্গম করিবারও উপযুক্ত বটে॥ ১১৯॥ ১৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—এবং প্রতিবোধিতা সা হ কিল উবাচ উক্তবতী মৈত্রেয়ী— অত্রৈব এতস্মিন্নেবৈকস্মিন্ বস্তুনি ব্রহ্মণি বিরুদ্ধধর্ম্মবস্তুমাচক্ষাণেন ভগবতা
৬৪৭
মম মোহঃ কৃতঃ, তদাহ—অত্রৈব মা ভগবান্ পূজাবান্ অমুমুহৎ মোহং কৃতবান্। কথং তেন বিরুদ্ধধর্মবত্ত্বমুক্তমিতি? উচ্যতে—পূর্ব্বং বিজ্ঞানঘন এবেতি প্রতিজ্ঞায়, পুনর্ন প্রেত্য সংজ্ঞাস্তীতি। কথং বিজ্ঞানঘন এব? কথং বা ন প্রেত্যসংজ্ঞাস্তীতি? ন হ্যষ্ণঃ শীতশ্চাগ্নিরেবাইকো ভবতি, অতো মুঢ়াহস্ম্যত্র। স’হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—ন বৈ অরে মৈত্রেয়ি, অহং মোহং ব্রবীমি, মোহনং বাক্যং ন ব্রবীমীত্যর্থঃ।
ননু কথং বিরুদ্ধধর্মত্বমবোচঃ-বিজ্ঞানঘনং সংজ্ঞাভাবঞ্চ; ন ময়েদমেকস্মিন্ ধৰ্ম্মিণি অভিহিতম্; ত্বয়ৈবেদং বিরুদ্ধধর্মত্বেন একং বস্তু পরিগৃহীতং ভ্রান্ত্যা; ন তু ময়োক্তম্-ময়া তু ইদমুক্তম্;-যস্ত অবিদ্যাপ্রত্যুপস্থাপিতঃ কার্য্যকরণ- সম্বন্ধ্যাত্মনঃ খিল্যভাবঃ, তস্মিন্ বিদ্যয়া নাশিতে, তন্নিমিত্তা যা বিশেষসংজ্ঞা শরীরাদিসম্বন্ধিনি অন্যত্বদর্শনলক্ষণা, সা কার্য্যকরণসঙ্ঘাতোপাধৌ প্রবিলাপিতে নশ্যতি, হেত্বভাবাৎ, উদকাদ্যাধারনাশাদিব চন্দ্রাদিপ্রতিবিম্বঃ তন্নিমিত্তশ প্রকা- শাদিঃ; ‘ন পুনঃ পরমার্থচন্দ্রাদিত্যস্বরূপনাশবৎ অসংসারি-ব্রহ্মস্বরূপস্য বিজ্ঞান- ঘনস্য নাশঃ; তদ্ বিজ্ঞানঘন ইত্যুক্তম্; স আত্মা সর্ব্বস্য জগতঃ; পরমার্থতো ভূতনাশান্ন বিনাশী; বিনাশী ত্ববিদ্যাকৃতখিল্যভাবঃ “বাচারম্ভণং বিকারো নাম- ধেরম্” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। অয়ন্তু পারমার্থিকোহবিনাশী বা অরে অয়মাত্মা, অতঃ অলং পর্যাপ্তং বৈ অরে ইদং মহদ্ভূতম্ অনন্তমপারং যথাব্যাখ্যাতং বিজ্ঞানায় বিজ্ঞাতুম্, “ন হি বিজ্ঞাতুর্বিজ্ঞাতেব্বিপরিলোপো বিদ্যতে অবিনাশিত্বাৎ” ইতি হি বক্ষ্যতি ॥ ১১৯ ॥ ১৩॥
টীকা।—উক্তং পরমার্থদর্শনমেব ব্যক্তীকর্ত্তুং চোদয়তি—এবমিতি। তেন যাজ্ঞবল্ক্যেনেতি যাবৎ। ইতি বদতা বিরুদ্ধধর্মবত্ত্বমুক্তমিতি শেষঃ। এবং বদনেহপি কুতো বিরুদ্ধধৰ্ম্মবত্তোক্তি- শুত্রাহ—কথমিতি। একস্যৈব বিজ্ঞানঘনত্বে সংজ্ঞারাহিত্যে চ কুতো বিরোধধীরিত্যাশঙ্ক্যাহ— ন হীতি। বিরোধবুদ্ধিফলমাহ—অত ইতি। অত্রেত্যুক্তবিষয়পরামর্শঃ। ন বা ইতি প্রতীকং গৃহীত্বা ব্যাকরোতি—অর ইতি। মোহনং বাক্যং ব্রবীত্যেব ভবানিতি শঙ্কতে—নম্বিতি। সমাধত্তে—ন ময়েতি। কথং তর্হি মমৈকস্মিন্নেব বস্তুনি বিরুদ্ধধৰ্ম্মবত্ত্ববুদ্ধিরিত্যাশঙ্ক্যাহ— ত্বয়ৈবেতি। ত্বয়া তর্হি কিমুক্তমিতি, তত্রাহ—ময়া ত্বিতি। খিল্যভাবস্থ্য বিনাশে প্রত্যগাত্ম- স্বরূপমের বিনশ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ—ন পুনরিতি। ব্রহ্মস্বরূপস্যানাশে কিমায়াতমিত্যাশঙ্ক্যাহ— তদিতি। বিজ্ঞানঘনস্য প্রত্যক্তং দর্শয়তি—আত্মেতি। কথং তর্হি তান্যেবানুবিনশ্যতীতি, তত্রাহ—ভূতনাশেতি। খিল্যভাবস্যাবিদ্যাকৃতত্বে প্রমাণমাহ—বাচারস্তণমিতি। খিল্যভাববৎ প্রত্যগাত্মনোহপি বিনাশিত্বং স্যাদিতি চেন্নেত্যাহ—অরং ত্বিতি। পারমার্থিকত্বে প্রমাণমাহ— অবিনাশীতি। অবিনাশিত্বফলমাহ—অত ইতি। পর্যাপ্তং বিজ্ঞাতুমিতি সম্বন্ধঃ। ইদমিত্যাদি-
পদানাং গতার্থত্বাদব্যাখ্যেরত্বং সূচয়তি—যথেতি। বিজ্ঞানঘন এবেত্যত্র বাক্যশেষং প্রমাণয়তি— ন হীতি। ১১৯। ১৩। ভাষ্যানুবাদ।—মৈত্রেয়ী এইরূপে উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া বলিলেন—এই বিষয়েই অর্থাৎ একই ব্রহ্মে বিরুদ্ধ ধর্ম্মের উপদেশ করিয়া আমার মোহ বা ভ্রম সমুৎপাদন করিয়াছেন। এই কথাই প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন যে, ভগবান্— পূজনীয় আপনি এই বিষয়েই আমাকে মোহিত করিয়াছেন। তিনি যে, কিরূপে বিরুদ্ধ ধর্ম-সম্বন্ধ নির্দেশ করিয়াছেন, তাহা বলিতেছেন—প্রথমে প্রতিজ্ঞা করা হইয়াছে যে, আত্মা নিশ্চয়ই বিজ্ঞানঘন; শেষে আবার বলা হইয়াছে যে, প্রেত্য- ভাবের পর আর বিশেষ সংজ্ঞা থাকে না। কিরূপেই বা বিজ্ঞানঘনও বটে, আবার কিরূপেই বা প্রেত্যভাবের পর সংজ্ঞা-লোপ সম্ভবপর হয়? কারণ, একই অগ্নি কখনই শীতল ও উষ্ণ হইতে পারে না; অতএব কাজেই আমি এবিষয়ে বিমূঢ়া হইতেছি। এ কথার পর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—অরে মৈত্রেয়ি, আমি ‘কখনই মোহ বলিতেছি না, অর্থাৎ মোহকর বাক্য বলিতেছি না।
মৈত্রেয়ীর আশঙ্কা এই যে, একবার ‘বিজ্ঞানঘন’ আবার ‘সংজ্ঞার অভাব’ বলায় তুমি ত আত্মার সম্বন্ধে বিরুদ্ধ ধর্মই নির্দেশ করিতেছ?[তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] আমি একই বস্তুতে উক্ত ধর্মদ্বয় নির্দেশ করি নাই; তুমিই ভ্রান্তি- বশতঃ একই বস্তুকে উক্ত বিরুদ্ধ-ধর্মবিশিষ্টরূপে গ্রহণ করিয়াছ মাত্র; আমি সেরূপ কথা কখনও বলি নাই; আমি বলিয়াছি, অবিদ্যাপ্রভাবে আত্মার যে, দেহেন্দ্রিয়াদি-সম্বন্ধাধীন খিল্যভাব(ব্যক্তিত্ব) উপস্থিত হয়, আত্মজ্ঞান দ্বারা সেই খিল্যভাব তিরোহিত হইলে পর, দেহেন্দ্রিয়াদিসঙ্ঘাতোপাধি ও বিষয়াসঙ্গজনিত শরীরাদি-সম্বন্ধাধীন ভেদদর্শনাত্মক সেই বিশেষ সংজ্ঞাও বিলুপ্ত হইয়া যায়; কারণ, তখন তাহার কারণীভূত অবিদ্যাদি দোষ বর্তমান থাকে না; কাজেই প্রতিবিম্বাধার জলাদি-বিনাশে যেরূপ তদগত চন্দ্রাদি-প্রতিবিম্ব ও তজ্জনিত প্রকা- শাদি ধর্ম্মের বিলোপ হইয়া থাকে, ইহাও তদ্রূপ; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু প্রতিবিম্বনাশে যেরূপ বিম্বাধার চন্দ্র ও আদিত্যাদি পদার্থের স্বরূপহানি ঘটে না, তদ্রূপ বিশেষ সংজ্ঞালোপেও অসংসারী ব্রহ্মস্বরূপ বিজ্ঞানঘনের স্বরূপতঃ বিনাশ হয় না; এইজন্য তাঁহাকে ‘নিত্য বিজ্ঞানঘন’ বলা হইয়াছে। সেই বিজ্ঞানঘনই সর্ব্ব জগতের আত্মা; সুতরাং দেহোপাদান ভূতসমূহের বিনাশেও তাহার স্বরূপতঃ বিনাশ হয় না; কিন্তু অবিশ্বাকৃত খিল্যভাবটিরই কেবল বিনাশ হয়; কারণ, অন্য শ্রুতিতে আছে-বিকারমাত্রই(কার্যবস্তুমাত্রই) কেবল বাক্যারব্ধ নাম মাত্র। অরে মৈত্রেয়ি, পরমার্থ সৎ এই আত্মা কিন্তু অবিনাশী; অতএব এই অনন্ত অপার
৬৪৯
মহৎ পরমসত্য পরমাত্মার স্বরূপ যেরূপ বর্ণনা করিলাম, তাহা বুঝিতে পারা যায়; ইহার পরেও বলিবেন—‘অবিনাশী বলিয়াই বিজ্ঞাতার বিজ্ঞানের বিলোপ বা বিনাশ হয় না’ ইতি ॥ ১১৯ ॥ ১৩ ॥
যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি তদিতর ইতরং জিঘ্রতি, তদিতর ইতরং পশ্যতি, তদিতর ইতরং শৃণোতি, তদিতর ইতরমভিবদতি, তদিতর ইতরং মনুতে, তদিতর ইতরং বিজানাতি, যত্র বা অস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ, তৎ কেন কং জিঘ্রেৎ, তৎ কেন কং পশ্যেৎ, তৎ কেন কং শৃণুয়াৎ, তৎ কেন কমভিবদেৎ, তৎ কেন কং মন্বীত, তৎ কেন কং বিজানীয়াৎ। যেনেদং সর্ব্বং বিজানাতি তং কেন বিজানীয়াৎ, বিজ্ঞাতারমরে কেন বিজানীয়াদিতি ॥ ১২০ ॥ ১৪ ॥
সরলার্থঃ। -যদুক্তং-ন প্রেত্য সংজ্ঞাস্তীতি, তদুপপাদয়িতুমাহ- যত্রেত্যাদি।[অরে মৈত্রেয়ি,] যত্র(অবিদ্যাবস্থায়াং) হি(নিশ্চয়ে), দ্বৈতম্ ইব ভবতি(একস্মিন্ অদ্বয়ে ব্রহ্মণি ভিন্নমিব বস্তুন্তরং প্রতীয়মানং ভবতি), তৎ (তত্র) ইতরঃ ইতরং জিঘ্রতি(কর্তৃভূতঃ একঃ কৰ্ম্মভূতম্ অন্যং জিঘ্রতীত্যর্থঃ); তৎ(তত্র) ইতরঃ ইতরং পশ্যতি, তৎ ইতরঃ ইতরং শৃণোতি; তৎ ইতরঃ ইতরম্ অভিবদতি, তৎ ইতর ইতরম্ মনুতে, তৎ ইতরঃ ইতরং বিজানাতি। [তদা ভেদসাপেক্ষঃ সর্ব্বো ব্যবহারঃ প্রবর্ততে ইতি ভাবঃ।][পক্ষান্তরে] -যত্র বৈ সর্ব্বং(নামরূপাত্মকং জগৎ) অন্য(ব্রহ্মবিদঃ) আত্মা এব অভূৎ (আত্মব্যতিরেকেণ সর্বেষামভাবঃ সম্পদ্যতে), তৎ(তত্র বিদ্যাবস্থায়াং) কেন (করণেন) কং(বিষয়ং) জিঘ্রেৎ(ঘ্রাণেন্দ্রিয়গ্রাহ্যং কুৰ্য্যাৎ)? তৎ কেন কং পশ্যেৎ? তৎ কেন কং শৃণুয়াৎ? তৎ কেন কম্ অভিবদেৎ(প্রণমেৎ)? তৎ কেন কং মন্বীত? তৎ কেন কং বিজানীয়াৎ(সর্ব্বাত্মকত্বোপপত্তৌ ভেদাভাবাৎ আঘ্রাণাদিব্যাপারাণামত্যন্তনিবৃত্তিঃ সুতরাং সংপদ্যতে ইতিভাবঃ)। অরে মৈত্রেয়ি, যেন(চৈতন্যেন) ইদং(দৃশ্যমানং) সর্ব্বং বিজানাতি(বিশেষেণ অবগচ্ছতি), কেন(করণেন) তং(বিজ্ঞানঘনম্ আত্মানং) বিজানীয়াৎ?(জ্ঞাতুং শকুয়াৎ?); বিজ্ঞাতারং(সর্ব্ববিজ্ঞানসাক্ষিভূতং তং) কেন বিজানীয়াৎ?(ন কেনাপীত্যর্থঃ) ইতি ॥ ১২০ ॥ ১৪ ॥
মূলানুবাদ?—অয়ি মৈত্রেয়ি, যে অবস্থায় দ্বৈতবৎ—ভিন্নের ন্যায় প্রতীয়মান হয়, সেই অবস্থায়ই অপরে অপরকে(গন্ধ) আঘ্রাণ করে, একে অপরকে দর্শন করে, অন্যে অন্যকে শ্রবণ করে, একে অপরকে অভিবাদন করে, অপরে অপরকে চিন্তা করে, অপরে অপরকে বিশেষরূপে জানে; অর্থাৎ সেই অবিদ্যাবস্থাতেই ভেদসাপেক্ষ দর্শনাদি সমস্ত ব্যবহার নিষ্পন্ন হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে, যে অবস্থায় সমস্তই (জগৎই) সাধকের আত্মস্বরূপ হইয়া যায়, আত্মাতিরিক্ত কোন বস্তুরই সত্তা-স্ফূর্ত্তি হয় না, তখন কিসের দ্বারা কাহাকে আঘ্রাণ করিবে? কিসের দ্বারা কাহাকে দর্শন করিবে? কিসের দ্বারা কাহাকে শ্রবণ করিবে? কিসের দ্বারা কাহাকে অভিবাদন করিবে? কিসের দ্বারা কাহাকে চিন্তা করিবে? কিসের দ্বারা কাহাকে বিশেষরূপে জানিবে? জীবগণ, যে বিজ্ঞানের সাহায্যে অপর সমস্ত বিষয় জানিয়া থাকে, তাহাকে আবার কিসের দ্বারা জানিবে? অয়ি মৈত্রেয়ি, বিজ্ঞাতাকে আবার কিসের দ্বারা জানিবে? অর্থাৎ সে সময় ভেদসাপেক্ষ সমস্ত ব্যবহারই বিলুপ্ত হইয়া যায় ॥ ১২০ ॥ ১৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—কথং তর্হি প্রেত্য সংজ্ঞা নাস্তীত্যুচ্যতে,—শৃণু— বত্র যস্মিন্নবিদ্যাকল্পিতে কার্য্যকরণসঙ্ঘাতোপাধিজনিতে বিশেষাত্মনি খিল্যভাবে, হি যস্মাদ দ্বৈতমিব পরমার্থতোহদ্বৈতে ব্রহ্মণি দ্বৈতমিব ভিন্নমিব বস্তুন্তরমাত্মন: উপলক্ষ্যতে। ননু দ্বৈতেনোপমীয়মানত্বাৎ দ্বৈতস্য পারমার্থিকত্বমিতি? ন,— “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্” ইতিশ্রুত্যন্তরাদেকমেবাদ্বিতীয়মাত্মৈবেদং সর্ব্বমিতি চ। ১
তৎ তত্র যস্মাদ দ্বৈতমিব, তস্মাদেবেতরোহসৌ পরমাত্মনঃ খিল্যভূত আত্মা- অপরমার্থঃ চন্দ্রাদেরিবোদকচন্দ্রাদিপ্রতিবিম্বঃ—ইতরো ঘ্রাতা ইতরেণ ঘ্রাণেন ইতরং ঘ্রাতব্যং জিঘ্রতি।(১) ইতর ইতরমিতি কারকপ্রদর্শনার্থং, জিঘ্রতীতি ক্রিয়াফলয়োরভিধানম্। যথা ছিনত্তীতি যথোদ্যম্যোদ্যম্য নিপাতনং ছেদ্যস্য চ- দ্বৈধীভাবঃ উভয়ং ছিনত্তীত্যেকেনৈব শব্দেনাভিধীয়তে ক্রিয়াফলাবসানত্বাৎ,
৬৫১.
ক্রিয়াব্যতিরেকেণ চ তৎফলস্যানুপলম্ভাৎ। ইতরো ঘ্রাতা ইতরেণ ঘ্রাণেনেতরং ঘ্রাতব্যং জিঘ্নতি, তথা সর্ব্বং পূর্ব্ববদ্বিজানাতি, ইয়মবিদ্যাবদবস্থা। ২
যত্র তু ব্রহ্মবিদ্যয়া অবিদ্যা নাশমুপগমিতা, তত্রাত্মব্যতিরেকেণ অন্যস্যাভাবঃ। বত্র বৈ অন্য ব্রহ্মবিদঃ সর্ব্বং নামরূপাদি আত্মন্যেব প্রবিলাপিতম্ আত্মৈব সংবৃত্তং— বত্রৈবমাত্মৈবাভূৎ, তৎ তত্র কেন করণেন কং ঘ্রাতব্যং কঃ জিঘ্রেৎ? তথা পশ্যেৎ, বিজানীয়াৎ। ৩ 11-8-42
সর্ব্বত্র হি কারকসাধ্যা ক্রিয়া; অতঃ করাকাভাবেহনুপপত্তিঃ ক্রিয়ায়াঃ;. ক্রিয়াভাবে চ ফলাভাবঃ; তস্মাদবিদ্যায়ামের সত্যাং ক্রিয়াকারকফলব্যবহারো ন ব্রহ্মবিদঃ। আত্মত্বাদেব সর্ব্বস্য নাত্মব্যতিরেকেণ কারকং ক্রিয়াফলং বাস্তি। ন চানাত্মা সন্ সর্ব্বমাত্মৈব ভবতি কস্যচিৎ; তস্মাদবিদ্যয়ৈবানাত্মত্বং পরিকল্পিতম্;- নতু পরমার্থত আত্মব্যতিরেকেণাস্তি কিঞ্চিং; তস্মাৎ পরমার্থাত্মৈকত্বপ্রত্যয়ে ক্রিয়াকারকফলপ্রত্যয়ানুপপত্তিঃ; অতো বিরোধাদ’ ব্রহ্মবিদঃ ক্রিয়াণাং তৎ সাধনানাঞ্চাত্যন্তমেব নিবৃত্তিঃ। ‘কেন কথম্’ ইতি ক্ষেপার্থং বচনম্ প্রকারান্ত- রানুপপত্তিদর্শনার্থম্; কেনচিদপি প্রকারেণ ক্রিয়াকরণাদিকারকানুপপত্তেঃ। কেনচিৎ কঞ্চিৎ কশ্চিৎ কথঞ্চিন্ন জিঘ্রেদেবেত্যর্থঃ। ৪
যত্রাপ্যবিদ্যাবস্থায়াম্ অন্যঃ অন্যং পশ্যতি, তত্রাপি যেনেদং সর্ব্বং বিজানাতি,- তং কেন বিজানীয়াৎ? যেন বিজানাতি, তস্য করণস্য বিজ্ঞেয়ে বিনিযুক্তত্বাৎ; জ্ঞাতুশ্চ জ্ঞেয়ে এব হি জিজ্ঞাসা, নাত্মনি। ন চাগ্নেরিবাত্মাত্মনো বিষয়ঃ, ন’ চাবিষয়ে জ্ঞাতুজ্ঞানমুপপদ্যতে; তস্মাদ যেনেদং সর্ব্বং বিজানাতি, তং বিজ্ঞাতারং কেন করণেন কো বান্যো বিজানীয়াৎ। যদা তু পুনঃ পরমার্থবিবেকিনো ব্রহ্ম- বিদো বিজ্ঞাতৈব কেবলোহদ্বয়ো বর্ত্ততে, তং বিজ্ঞাতারমরে কেন বিজানীয়া- দিতি ॥ ১২০ ॥ ১৪ ॥
টীকা। -আত্মনো বিজ্ঞানঘনত্বং প্রামাণিকং চেৎ, তর্হি নিষেধবাক্যমযুক্তমিতি শঙ্কতে-কথ-- মিতি। অবিদ্যাকৃতবিশেষবিজ্ঞানাভাবাভিপ্রায়েণ নিষেধবাক্যোপপত্তিরিত্যুত্তরমাহ-শৃণ্বিতি।- বস্মিন্নুক্তলক্ষণে খিল্যভাবে সতি যম্মাদ যথোক্তে ব্রহ্মণি দ্বৈতমিব দ্বৈতমুপলক্ষ্যতে, তস্মাৎ তস্মিন্ সতীতর ইতরং জিঘ্রতীতি সম্বন্ধঃ। দ্বৈতমিবেত্যুক্তমনুদ্য ব্যাচষ্টে-ভিন্নমিবেতি। ইব- শব্দস্যোপমার্থত্বমুপেত্য শঙ্কতে-নন্বিতি। দ্বৈতেন দ্বৈতস্যোপমীয়মানত্বাদ দৃষ্টান্তস্য দাষ্টান্তিকস্য চ তস্য বস্তুত্বং স্যাৎ, উপমানোপমেয়য়োশ্চন্দ্রমুখয়োর্বস্তুত্বোপলম্ভাদিত্যর্থঃ। দ্বৈতপ্রপঞ্চস্য মিথ্যাত্ববাদিশ্রুতিবিরোধান্ন তস্য সত্যতেতি পরিহরতি-ন বাচারস্তুণমিতি। তত্র তস্মিন্ খিল্যভাবে সতীতি যাবৎ। স্বপ্নাদিদ্বৈতমিব জাগরিতেহপি দ্বৈতং যম্মাদালক্ষ্যতে, তস্মাৎ
পরমাত্মনঃ সকাশাদিতরোহসাবাত্মা খিল্যভূতোৎপরমার্থঃ সন্নিতরং জিভ্রতীতি যোজনা। পরমাদিতরস্মিন্নাত্মন্যপরমার্থে খিল্যভূতে দৃষ্টান্তমাহ-চন্দ্রাদেরিবেতি ইতরশব্দমনুদ্য তস্যার্থ- মাহ-ইতরো ঘ্রাতেতি। অবিদ্যাদশায়াং সর্ব্বাণ্যপি কারকাণি সন্তি, কর্তৃকৰ্ম্মনির্দেশস্থ সর্ব্বকারকোপলক্ষণত্বাদিত্যাহ-ইতর ইতি। ক্রিয়াফলয়োরেকশব্দত্বে দৃষ্টান্তং বিবৃণোতি- যথেতি। দৃষ্টান্তেংপি বিপ্রতিপত্তিমাশঙ্ক্যানন্তরোক্তং হেতুমেব স্পষ্টয়তি-ক্রিয়েতি। অতশ্চ জিভ্রতীত্যত্রাপি ক্রিয়াফলয়োরেকশব্দত্বমবিরুদ্ধমিতি শেষঃ। উক্তং বাক্যার্থমনুষ্য বাক্যাস্তরেষভি- দিশতি-ইতর ইতি। তখেভরো দ্রষ্টেতরেণ চক্ষুষেতরং দ্রষ্টব্যং পশ্যতীত্যাদি দ্রষ্টব্যমিতি শেষঃ। উত্তরেষপি বাক্যেযু পূর্ববাক্যবৎ কর্তৃকৰ্ম্মনির্দেশস্থ সর্ব্বকারকোপলক্ষণত্বং ক্রিয়াপদস্য চ ক্রিয়া- তৎফলাভিধায়িত্বং তুল্যমিত্যাহ-সর্ব্বমিতি। যত্র হীত্যাদিবাক্যার্থমুপসংহরতি-ইয়মিতি। ১ যত্র যা অন্যেত্যাদিবাক্যস্য তাৎপর্য্যমাহ-যত্র ত্বিতি। উত্তেহর্থে বাক্যাক্সরাণি ব্যাচষ্টে- যত্রেতি। তমেবার্থং সঙ্ক্ষিপতি-যত্রৈবমিতি। সর্ব্বং কর্তৃকরণাদীতি শেষঃ। তৎ কেনেত্যাদি ব্যাকরোতি-তৎ তত্রেতি। কিংশব্দসাক্ষেপার্থং কথয়তি-সর্ব্বত্র হীতি। ব্রহ্মবিদোহপি কারকদ্বারা ক্রিয়াদি স্বীক্রিয়তামিত্যাশঙ্ক্যাহ-আত্মত্বাদিতি। সর্ব্বস্যাত্মত্বাসিদ্ধিমাশঙ্কা সর্ব্ব- মাল্লৈবাভূমিভি শ্রুত্যা সমাধত্তে-ন চেতি। কথং তহি সর্ব্বমাত্মব্যতিরেকেণ ভাতীত্যাশঙ্ক্যাহ- তস্মাদিতি। ভেদভানস্যাবিদ্যাকৃতত্বে ফলিতমাহ-তস্মাৎ পরমার্থেতি। তদ্ধেতোরজ্ঞান- স্থাপনীতত্বাদিতি শেষঃ। একত্বপ্রত্যয়াদজ্ঞাননিবৃত্তিদ্বারা ক্রিয়াদিপ্রত্যয়ে নিবৃত্তেহপি ক্রিয়াদি স্যাপনেত্যাহ-অত ইতি। করণপ্রমাণরোরভাবে কার্য্যস্থ বিরুদ্ধত্বাদিতি যাবৎ। ননু কিংশব্দে প্রশ্নার্থে প্রতীয়মানে কথং ক্রিয়াতৎসাধনয়োরত্যন্তনিবৃত্তিবিদুষো বিবক্ষ্যতে, তত্রাহ-কেনেতি। কিংশব্দস্থ প্রাগেব ক্ষেপার্থত্বমুক্তং, তচ্চ ক্ষেপার্থং বচো বিদুষঃ সর্ব্বপ্রকারক্রিয়াকারকাদ্যসম্ভব- প্রদর্শনার্থমিত্যত্যস্তমেব ক্রিয়াদিনিবৃত্তিবিদুষো যুক্তেত্যর্থঃ। সর্ব্বপ্রকারানুপপত্তিমেবাভিনয়তি- কেনচিদিতি। ২ কৈবল্যাবস্থামাস্থায় সংজ্ঞাভাববচনমিত্যুক্ত। ভত্রৈব কিং পুনর্সায়ং বস্তু মবিদ্যাবস্থায়ামপি সাক্ষিণো জ্ঞানাবিষন্নত্বমাহ-যত্রাপীতি। যেন কুটস্থবোধেন ব্যাপ্তো লোকঃ সর্ব্বং জানাতি, তং সাক্ষিণং কেন করণেণ কো বা জ্ঞাতা জানীয়াদিত্যত্র হেতুমাহ-যেনেতি। যেন চক্ষুরাদিনা লোকো জানাতি, তস্য বিষয়গ্রহণেনৈবোপক্ষীণত্বান্ন সাক্ষিণি প্রবৃত্তিরিত্যর্থঃ। আত্মনোৎসন্দিগ্ধ- ভাবত্বাচ্চ প্রমেরদ্বাসিদ্ধিরিত্যাহ-জ্ঞাতুশ্চেতি। কিঞ্চাত্মা দ্বেনৈব জ্ঞায়তে? জ্ঞাতরুরেণ বা? নাস্তু ইত্যাহ-ন চেতি। ন দ্বিতীয় ইত্যাহ-ন চাবিষয় ইতি। জ্ঞাতরন্তরস্যাভাবাৎতস্যা- বিষয়োহয়মাত্মা কুতস্তেন জ্ঞাতুং শক্যতে। ন হি জ্ঞাতরন্তরমস্তি, নাদ্যোহতোহস্তি দ্রষ্টেত্যাদি- শ্রুতেরিত্যর্থঃ। আপনি প্রমাতৃপ্রমাণরোরভাবে জ্ঞানাবিষয়ত্বং ফলতীত্যাহ-তস্যাদিতি। বিজ্ঞাতারমিত্যাদিবাক্যস্যার্থং প্রপঞ্চয়তি-যদা স্থিতি। তদেবং স্বরূপাপেক্ষং বিজ্ঞানঘনত্বং, বিশেষবিজ্ঞানাপেক্ষং তু সংজ্ঞাভাববচনমিত্যবিরোধ ইতি। ১২০। ১৪।
ইতি বৃহদারণ্যকভাষটীকায়াং দ্বিতীয়াধ্যায়ে চতুর্থং ব্রাহ্মণম্। ২।৪। ভাষ্যানুবাদ।—তবে যে, মৃত্যুর পর আর সংজ্ঞা থাকে না বলা হইতেছে,
৬৫৩
তাহা কি প্রকার, শ্রবণ কর,-যেহেতু যে অবস্থায়-অবিদ্যাকল্পিত-দেহেন্দ্রিয়- সঙ্ঘাতাত্মক উপাধিজনিত বিশেষাকারে পরিচিত যে খিল্যভাব-দশায় দ্বৈতের ন্যায়-প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম এক অদ্বিতীয় হইলেও দ্বৈতেরই মত-আত্মা হইতে ভিন্ন বস্তুরই মত প্রতীত হয়। এখানে প্রশ্ন হইতে পারে যে, ‘দ্বৈতমিব’ বলিয়া যখন দ্বৈতের সঙ্গে তুলিত করা হইতেছে, তখন দ্বৈতপদার্থের সত্যতা ত নিশ্চয়ই স্বীকৃত হইতেছে, অর্থাৎ দ্বৈত বলিয়া কোন সত্য পদার্থ না থাকিলে যখন তাহার সহিত উপমানোপমেয়ভাব কল্পিতই হইতে পারে না, তখন অবশ্যই ব্রহ্মেতর পদার্থেরও অস্তিত্ব নিশ্চয়ই স্বীকার করা হইতেছে? না, এরূপ আশঙ্কা হইতে পারে না; কারণ, ‘বিকার বা জন্য পদার্থমাত্রই বাক্যারব্ধ নাম মাত্র’ এবং ‘ব্রহ্ম নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয়’ ইত্যাদি শ্রুতিতে[দ্বৈতের মিথ্যাত্বই অবধারিত হইয়াছে]। ১
সেই অবস্থায়—যেহেতু দ্বৈতেরই মত হয়, সেই হেতুই, জলে প্রতিফলিত চন্দ্রাদি-প্রতিবিম্বের ন্যায় পরমাত্মা হইতে ভিন্নবৎ প্রতিপন্ন খিল্যভাবাপন্ন এই অপর আঘ্রাণকর্তা প্রকৃত সত্য না হইলেও অপর—ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা আগ্রেয় বিষয় (গন্ধ) আঘ্রাণ করিয়া থাকে। এখানে ‘ইতরঃ’ ও ‘ইতরং’ পদ দুইটি কারক- প্রদর্শক, অর্থাৎ প্রথমান্ত পদটি কর্তৃকারকের, আর দ্বিতীয়ান্ত পদটি কর্ম্মকারকের নির্দেশকরূপে প্রযুক্ত হইয়াছে; এবং ‘জিঘ্নতি’ পদটি ক্রিয়া ও ক্রিয়াফল-প্রকা- শনার্থ প্রযুক্ত হইয়াছে। ‘ছিনত্তি’ পদটি ইহার দৃষ্টান্ত স্থল,—‘ছিনত্তি’ বলিলে যেমন কুঠারের বারংবার উত্তোলনপূর্ব্বক নিপাতন ও ছেদনীয় বৃক্ষাদির দ্বিধাভাব সম্পাদন, এই উভয়ই(নিপাতন ক্রিয়া ও তৎফল দ্বিধা করণ) একই ‘ছিনত্তি’ ক্রিয়ায় বুঝাইয়া থাকে; কারণ, ছেদনের ফল ক্রিয়াতেই পর্য্যবসিত হয় এবং ক্রিয়া ব্যতিরেকে তাহার উপলব্ধিও হয় না। পরবর্তী ‘পশ্যতি’ ও ‘বিজানাতি’ প্রভৃতির সম্বন্ধেও এইরূপই ব্যবস্থা। এ পর্য্যন্ত যাহা বলা হইল, তৎসমস্তই অবিদ্যাবস্থা;[অতঃপর বিদ্যাবস্থার কথা বলা হইতেছে—] ২
পক্ষান্তরে, যে অবস্থায় ব্রহ্মবিদ্যা-প্রভাবে অবিদ্যা বিনাশিত হইয়া যায়, সে অবস্থায় আত্মাতিরিক্ত কোন বস্তুরই অস্তিত্ব বোধ থাকে না। যে অবস্থায় দৃশ্যমান নামরূপাদি বস্তুনিচয় এই ব্রহ্মবিদের আত্মস্বরূপে বিলাপিত হয় অর্থাৎ যে অবস্থায় সর্ব্বজগৎই এইরূপে আত্মস্বরূপ হইয়া যায়—আত্মাই হয়, সে অবস্থায় কে কাহার দ্বারা অর্থাৎ কোন্ সাধনের সাহায্যে কোন্ আগ্নেয় বস্তু কে আঘ্রাণ করিবে? কোন্ দ্রষ্টব্য বিষয় দর্শন করিবে বা বিশেষরূপে জানিবে? ক্রিয়ামাত্রই কারকসাধ্য;
কাজেই কারকের অভাবে ক্রিয়ার অভাব হয়, এবং ক্রিয়ার অভাবে ক্রিয়াফলেরও সম্ভব হয় না। ৩
অতএব ক্রিয়া কারক ও ফল-ঘটিত যে সমস্ত ব্যবহার বিদ্যমান আছে, তৎ- সমস্তই অবিদ্যা-সাপেক্ষ—অবিদ্যা থাকিলে থাকে, আর অবিদ্যা না থাকিলে থাকে না; সুতরাং ব্রহ্মবিদের জ্ঞানমহিমায় সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায় বলিয়া, তখন সে সমস্ত ব্যবহারেরও সম্ভাবনা থাকে না; বস্তুতঃ তাঁহার নিকট আত্মাতিরিক্ত -কারক বা ক্রিয়াফলের অস্তিত্বই থাকে না। বিশেষতঃ যাহা অনাত্মা পদার্থ, তাহা কখনই আত্মস্বরূপ হইতে পারে না; অতএব বুঝিতে হইবে যে, দৃশ্যমান দ্বৈতভাব কেবল অবিদ্যা-কল্পিতমাত্র; প্রকৃতপক্ষে আত্মসত্তা ব্যতিরেকে কোন বস্তুরই সত্তা নাই; কাজেই যথার্থ আত্মৈকত্বজ্ঞান উপস্থিত হইলে পর, ক্রিয়া কারক ও ফল ব্যবহার সমস্তই বিলুপ্ত হইয়া যায়। অতএব বিরুদ্ধস্বভাব বলিয়াই ব্রহ্মবিদের সম্বন্ধে ক্রিয়া ও ক্রিয়াসাধনের অত্যন্ত নিবৃত্তি হইয়া পড়ে। ‘কেন কথম্’ বাক্যটি ক্ষেপার্থক অর্থাৎ কোন প্রকারেই যে, কারকাদি-ব্যবহার উপপন্ন হয় না, তাহা প্রকাশ করাই ঐ কথার উদ্দেশ্য। কোন প্রকারেই ক্রিয়া-কারকাদি উপপন্ন না হওয়ায়—কোনও ব্যক্তি কোনও উপায়ে বা কোনও প্রকারে কোন বিষয়ই আঘ্রাণ করিতে পারে না, এইরূপ বাক্যার্থ নিষ্পন্ন হইতেছে। ৪
আর যে, অবিদ্যা-দশায় অপরে অপরকে দর্শন করিয়া থাকে, সে অবস্থায়ও, লোকে যাহা দ্বারা(বিজ্ঞান দ্বারা) এই সমস্ত বিষয় অবগত হয়, সেই বিজ্ঞানকে আবার কিসের দ্বারা জানিবে?[অভিপ্রায় এই যে,] যাহা দ্বারা জানা হয়, তাহা হয়—করণ, সেই করণাত্মক বিজ্ঞানটি জ্ঞাতব্য বিষয়ের প্রকাশন-কার্য্যেই নিদ্দিষ্ট থাকে, আর জ্ঞাতার জিজ্ঞাসাও(জানিবার ইচ্ছাও) সেই বিজ্ঞেয় বিষয়েই হইয়া থাকে—আত্মবিষয়ে হয় না। অগ্নি নিজে যেমন নিজের বিষয় হয় না, বিজ্ঞানও তেমনি নিজে নিজের বিষয় বা বিজ্ঞেয় হয় না; অথচ যাহা যাহার বিষয় নয়, তদ্বিষয়ে কখনও তাহার জ্ঞান-প্রকাশ সমুৎপন্ন হয় না; অতএব যাহা দ্বারা এ সমস্ত বিষয় জানা যায়, সেই বিজ্ঞাতাকে আবার অন্য কে অর্থাৎ অন্য কোন্ বিজ্ঞাতা কিসের দ্বারা জানিবে? যে অবস্থায় যথার্থ বিবেকজ্ঞানসম্পন্ন ব্রহ্মবিদের নিকট অদ্বিতীয় বিজ্ঞাতাই একমাত্র সত্য বস্তুরূপে প্রতিভাত হইতে থাকে, অয়ি মৈত্রেয়ি,(সে অবস্থায়) সেই বিজ্ঞাতাকে কিসের দ্বারা জানিবে? ॥ ১২০ ॥ ১৪ ॥
আভাসভাষ্যম্।—যৎ কেবলং কর্ম্মনিরপেক্ষমমৃতত্বসাধনম্, তদ্বক্তব্যমিতি মৈত্রেয়ীব্রাহ্মণমারব্ধম্। তচ্চ আত্মজ্ঞানং সর্ব্বসন্ন্যাসাঙ্গবিশিষ্টম্; আত্মনি চ বিজ্ঞাতে সর্ব্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি; আত্মা চ প্রিয়ঃ সর্ব্বস্মাৎ, তস্মাদাত্মা দ্রষ্টব্যঃ; স চ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্য ইতি চ দর্শনপ্রকারা উক্তাঃ। তত্র শ্রোতব্য আচার্য্যাগমাভ্যাম্; মন্তব্যস্তর্কতঃ; তত্র চ তর্ক উক্তঃ—“আত্মৈবেদং সর্ব্বম্” ইতি প্রতিজ্ঞাতস্য হেতুবচনম্—আত্মৈকসামান্যত্বমাত্মৈকোদ্ভবত্বমাত্মৈক- প্রলয়ত্বঞ্চ। তত্রায়ং হেতুরসিদ্ধ ইত্যাশঙ্ক্যতে আত্মৈকসামান্যোদ্ভবপ্রলয়াখ্যঃ; তদাশঙ্কানিবৃত্ত্যর্থমেতদ্ ব্রাহ্মণমারভ্যতে।
যস্মাৎ পরস্পরোপকার্য্যোপকারকভূতম্ জগৎ সর্ব্বং পৃথিব্যাদি, যচ্চ লোকে পরস্পরোপকার্য্যোপকারকভূতম্, তদেককারণপূর্ব্বকমেকসামান্যাত্মকমেকপ্রলয়ং চ দৃষ্টম্। তস্মাদিদমপি পৃথিব্যাবিলক্ষণং জগৎ পরস্পরোপকার্য্যোপকারকত্বাৎ তথাভূতং ভবিতুমর্হতি। এষ হ্যর্থোহস্মিন্ ব্রাহ্মণে প্রকাশ্যতে; অথবা “আত্মৈবেদং সর্ব্বম্” ইতি প্রতিজ্ঞাতস্য আত্মোৎপত্তি-স্থিতি-লয়ত্বং হেতুমুক্তা, পুনরাগমপ্রধানেন মধুব্রাহ্মণেন প্রতিজ্ঞাতস্যার্থস্য নিগমনং ক্রিয়তে। তথাহি নৈয়ায়িকৈরুক্তম্— “হেত্বপদেশাৎ প্রতিজ্ঞায়াঃ পুনর্ব্বচনং নিগমনম্” ইতি। অন্যৈর্ব্যাখ্যাতম্—আ দুন্দুভিদৃষ্টান্তাৎ শ্রোতব্যার্থম্ আগমবচনম্, প্রাত্মধুব্রাহ্মণাৎ মন্তব্যার্থম্ উপপত্তি- প্রদর্শনেন, মধুব্রাহ্মণেন তু নিদিধ্যাসনবিধিরুচ্যত ইতি। সর্ব্বথাপি তু যথা আগমেনাবধারিতম্, তর্কতস্তথৈব মন্তব্যম্; যথা তর্কতো মতস্য তর্কাগমাভ্যাং নিশ্চিতস্য তথৈব নিদিধ্যাসনং ক্রিয়তে—ইতি পৃথঙ্নিদিধ্যাসনবিধিরনর্থক এব। তস্মাৎ পৃথক্প্রকরণবিভাগোহনর্থক ইত্যম্মদভিপ্রায়ঃ শ্রবণমনননিদিধ্যাসনানামিতি। সর্ব্বথাপি তু অধ্যায়দ্বয়স্যার্থোহস্মিন্ ব্রাহ্মণে উপসংহ্রিয়তে।
টাকা।—পূর্ব্বোত্তরব্রাহ্মণয়োঃ সঙ্গতিং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি—যৎ কেবলমিতি। কৈবল্যং ব্যাচষ্টে—কর্ম্মনিরপেক্ষমিতি। তচ্চাত্মজ্ঞানমুক্তমিতি সম্বন্ধঃ। ততো’ নিরাকাঙ্ক্ষত্বং সিদ্ধমিতি চকারার্থঃ। আত্মজ্ঞানং সংস্যাসিনামেবেতি নিয়ন্তং বিশিনষ্টি—সর্ব্বেতি। ননু কুতস্ততো নৈরাকাঙ্ক্ষ্যং সত্যপি তস্মিন্ বিজ্ঞেয়ান্তরসম্ভবাৎ, অন্ত আহ—আত্মনি চেতি। ন বা অরে পত্যুরিত্যাদাবুক্তং স্মারয়তি—আত্মা চেতি। তস্য নিরতিশয়প্রেমাস্পদত্বেন পরমানন্দত্বে ফলিত- মাহ—তস্মাদিতি। স চেদ্দর্শনাইস্তর্হি তদ্দর্শনে কানি সাধনানীত্যাশঙ্ক্যাহ—স চেতি। দর্শন-
প্রকারা দর্শনস্যোপায়প্রভেদাঃ। শ্রবণমননয়োঃ স্বরূপবিশেষং দর্শয়তি-তত্রেতি। কোহসৌ তর্কো যেনাত্মা মন্তব্যো ভবতি, তত্রাহ-তত্র চেতি। দুন্দুভ্যাদিগ্রন্থঃ সপ্তম্যর্থঃ। উক্তমেব তর্কং সংগৃহাতি-আত্মৈবেতি। প্রধানাদিবাদমাদায় হেত্বসিদ্ধিশঙ্কায়াং তন্নিরাকরণার্থমিদং ব্রাহ্মণমিতি সঙ্গতিং সঙ্গিরতে-তত্রায়মিতি।
কথং হেত্বসিদ্ধিশঙ্কোদপ্রিয়তে, তত্রাহ-যম্মাদিতি। তস্মাত্তথাভূতং ভবিতুমর্হতীত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। অন্যোন্যোপকার্য্যোপকারকভূত-জগদেকচৈতন্যানুবিন্ধমেকপ্রকৃতিকং চেত্যত্র ব্যাপ্তি- মাহ-যচ্চেতি। দৃষ্টং স্বপ্নাদীতি শেষঃ; দৃষ্টান্তে সিদ্ধমর্থং দার্ষান্তিকে যোজয়তি-তস্মাদিতি। তচ্ছব্দার্থং স্ফুটয়তি-পরস্পরেতি। তথাভূতমিত্যেককারণপূর্ব্বকাদি গৃহ্যতে। বিমতমেক- কারণকং পরস্পরোপকার্য্যোপকারকভূতত্বাৎ স্বপ্নবদিত্যযুক্তং, হেত্বসিদ্ধেঃ। ন হি সর্ব্বং জগৎ পরস্পরোপকার্য্যোপকারকভূতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-এষ হীতি। হেত্বসিদ্ধিশঙ্কাং পরিহর্তুং ব্রাহ্মণমিতি সঙ্গতিমুক্ত। প্রকারান্তরেণ তামাহ-অথবেতি। প্রতিজ্ঞা-হেতু ক্রমেণোক্তা হেতুসহিতস্থ প্রতিজ্ঞার্থস্য পুনর্ব্বচনং নিগমনমিত্যত্র তার্কিকসম্মতিমাহ-তথা হীতি। ভর্তৃপ্রপঞ্চানাং ব্রাহ্মণা- রস্তপ্রকারমনুবদতি-অন্যৈরিতি। দ্রষ্টব্যাদিবাক্যাদারভ্যাদুন্দুভিদৃষ্টাত্তাদাগমবচনং শ্রোতব্য ইত্যুক্তশ্রবণনিরূপণার্থম্। দুন্দুভিদৃষ্টান্তাদারভ্য মধুব্রাহ্মণাৎ প্রাগুপপত্তিপ্রদর্শনেন মন্তব্য ইত্যুক্ত- মনননিরূপণার্থমাগমবচনম্। নিদিধ্যাসনং ব্যাখ্যাতুং পুনরেতদ্ব্রাহ্মণমিত্যর্থঃ। এতদদুষয়তি- সর্ব্বণাংপীতি। শ্রবণাদেবিধেয়ত্বেহবিধেরত্বেংপীতি যাবৎ। অন্বয়ব্যতিরেকাভ্যাং শ্রবণে প্রবৃত্তস্য তৎপৌঙ্কল্যে সত্যর্থলব্ধং মননং ন বিধিমপেক্ষতে। যথা তর্কতো মতং তত্ত্বং, তথা তস্য শর্কাগমাভ্যাং নিশ্চিতস্যোভয়সামর্থ্যাদেব নিদিধ্যাসনসিদ্ধৌ তদপি বিধ্যপেক্ষমেবেত্যর্থঃ। ত্রয়াণাং বিধ্যনপেক্ষত্বে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। ইতি পরকীয়ব্যাখ্যানমযুক্তমিতি শেষঃ। সিদ্ধান্তেহপি শ্রবণাদিবিধ্যভ্যুপগমাৎ কথং পরকীয়ং প্রস্থানং প্রত্যাখ্যাতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্ব্বথাপি ত্বিতি। তদ্বিধ্যভ্যুপগমেহপীতি যাবৎ।
আভাসভাষ্যানুবাদ।—যাহা কর্ম্মের সাহায্য না লইয়া, কেবল নিজেই মোক্ষ-সম্পাদনে সমর্থ, সেরূপ সাধনবিশেষ নিরূপণের নিমিত্ত অতীত মৈত্রেয়ী- ব্রাহ্মণ আরব্ধ হইয়াছে। সর্ব্বসন্ন্যাসবিশিষ্ট আত্মজ্ঞানই সেই অভিমত মোক্ষ- সাধন; আত্মাকে জানিলেই অপর সমস্ত বিষয় বিজ্ঞাত হওয়া যায়, এবং আত্মাই সর্ব্বাপেক্ষা সমধিক প্রিয়; এইজন্য আত্মাকে দর্শন করিবে। যে যে উপায়ে আত্মাকে দর্শন করিতে হইবে, তাহাও ‘শ্রোতব্য’ ‘মন্তব্য’ ‘নিদিধ্যাসিতব্য’ কথায় ব্যক্ত করা হইয়াছে; তন্মধ্যে আচার্য্য ও শ্রুতিবাক্য হইতে আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিবে, এবং তর্ক দ্বারা তদ্বিষয়ে মনন(চিন্তা) করিবে; তর্কের উপকারিতা সেখানেই উক্ত হইয়াছে—প্রথমত ‘এ সমস্তই আত্মস্বরূপ’ এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া, সেই প্রতিজ্ঞাত বিষয় সমর্থনের জন্য—একমাত্র আত্মা হইতেই উৎপত্তি, আত্মাতেই অবস্থিতি এবং আত্মাতেই লয়’, এই তিনটি হেতুর উপন্যাস করিয়াছেন। এখন
৬৫৭
আশঙ্কা হইতেছে যে, সেই আত্ম-সামান্যত্ব, আত্মৈকাবস্থিতত্ব ও আত্মৈকপ্রলয়ত্বরূপ প্রাগুক্ত হেতুত্রয় ত সিদ্ধ হইতেছে না, অর্থাৎ একমাত্র আত্মা হইতেই যে, জগতের উৎপত্তি, আত্মাতেই স্থিতি এবং আত্মাতেই প্রলয় হইয়া থাকে, এ বিষয়ে ত কোনই প্রমাণ নাই। এই আশঙ্কা অপনয়নের নিমিত্ত এই পঞ্চম ব্রাহ্মণ (পরিচ্ছেদ) আরব্ধ হইতেছে।
যেহেতু পৃথিব্যাদি সমস্ত জগৎই পরস্পর পরস্পরের উপকার্য্যোপকারকভাবা- পন্ন, অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরের উপকারভাগী হয়, এবং যেহেতু এইরূপে পরস্পর উপকার্য্যোপকারকভাবাপন্ন বস্তুমাত্রকেই একই কারণ হইতে উৎপন্ন, একই সাধারণ ধৰ্ম্মসম্পন্ন এবং একই স্থানে বিলীন হইতে দেখা যায়; সেইহেতুই—এই পৃথিব্যাদি সমস্ত জগৎ পরস্পর পরস্পরের উপকার্য্যোপকারকভাবাপন্ন হওয়ায় সেইরূপই হইবার যোগ্য; এই বিষয়টি এই পঞ্চম ব্রাহ্মণে প্রতিপাদিত হইতেছে। অথবা ইহার অভিপ্রায় এইরূপ;—প্রথমে “আত্মৈব ইদং সর্ব্বম্” এই শ্রুতিতে ব্রহ্মের সর্ব্বাত্মভাব প্রতিজ্ঞা করিয়া, তৎসমর্থনের জন্য আত্মা হইতে জগতের উৎপত্তি, আত্মাতে স্থিতি ও আত্মাতেই লয়—এই তিনটি হেতুর উল্লেখ করা হইয়াছে; এখন আবার আগম- প্রধান(শুধু শাস্ত্রানুসারে) এই মধুব্রাহ্মণ দ্বারা সেই প্রতিজ্ঞাত সর্ব্বাত্মভাবেরই নিগমন বা উপসংহার করা হইতেছে। নৈয়ায়িকগণও বলিয়াছেন—‘হেতুচ্ছলে যে, প্রতিজ্ঞাত বিষয়ের পুনঃ কথন, তাহার নাম—নিগমন’;[সুতরাং এই মধু- ব্রাহ্মণটিও প্রতিজ্ঞাত সর্ব্বাত্মভাবের নিগমনস্থানবর্তী]।
অপর আচার্য্যগণ ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে, পূর্ব্বোক্ত দুন্দুভিপর্য্যন্ত দৃষ্টান্ত- প্রদর্শক উপনিষদ্বাক্যগুলি শ্রোতব্যার্থ—অর্থাৎ উক্ত বাক্যে ‘শ্রোতব্যঃ’ বাক্যের তাৎপর্য্যবিষয় বর্ণিত হইয়াছে; আর মধু-ব্রাহ্মণের পূর্ব্বপর্যন্ত যুক্তিপ্রদর্শক বাক্যসন্দর্ভে ‘মন্তব্য’—বাক্যের অর্থ বা মননপ্রকার প্রদর্শিত হইয়াছে; আর এই মধুব্রাহ্মণে সেই পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাত বিষয়ের নিদিধ্যাসন বিহিত হইতেছে (১)। উক্ত সমস্ত মতেই এই কথা দাঁড়াইতেছে যে, শাস্ত্র দ্বারা যে
(১) তাৎপর্য্য—“তাভ্যাং নির্বিচিকিৎসেহর্থে চেতসঃ স্থাপিতস্য যৎ। একতানত্বমেতদ্ধি নিদিধ্যাসনমুচ্যতে।”
অর্থাৎ যাহা শাস্ত্র হইতে শ্রুত, বাক্যের তাৎপর্য্য-পর্যালোচনা দ্বারা অবধারিত, এবং যাহা মননের—শাস্ত্রানুকূল যুক্তিতর্কের সাহায্যে বিচারিত; সুতরাং নিঃসন্দিগ্ধ, এমন বিষয়ে যে, চিত্তের একভানভাব(একাগ্রতা), তাহার নাম—নিদিধ্যাসন। ধ্যান ও নিদিধ্যাসন প্রায় সমানার্থক শব্দ।
বিষয় যেরূপ অবধারিত হয়, তর্ক দ্বারা তাহা সেইরূপেই মনন করিতে হয়; আবার তর্কের সাহায্যে যাহা যেরূপ অবধারিত হয়, তর্কও আগমাব- ধারিত সেই বিষয়টি ঠিক সেইরূপেই নিদিধ্যাসন(ধ্যান) করিতে হয়; সুতরাং নিদিধ্যাসনের জন্য আর পৃথক্ বিধানের আবশ্যক হয় না; কাজেই পরপক্ষোক্ত পৃথক্ প্রকরণবিভাগ কল্পনা নিরর্থক হইয়া পড়িতেছে; অতএব শ্রবণ মনন ও নিদিধ্যাসন সম্বন্ধে আমরা যেরূপ অভিপ্রায় নির্দেশ করিয়াছি, তাহাই সমীচীন। তবে একথা সত্য যে, পূর্ব্বোক্ত দুইটি অধ্যায়ে যে বিষয় অভিহিত হইয়াছে, এই মধুব্রাহ্মণে তাহারই উপসংহার করা হইতেছে(কিন্তু কোনও নূতন বিষয় সন্নি- বেশিত হইতেছে না)। ইয়ং পৃথিবী সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যৈ পৃথিব্যৈ সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্যাং পৃথিব্যাং তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং শারীরস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২১ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—ইয়ং(দৃশ্যমানা) পৃথিবী সর্ব্বেষাং ভূতানাং(প্রাণিনাং) মধু(কার্য্যম্),[পৃথিবী হি প্রাণিকৰ্ম্মবশাৎ সমুৎপন্না প্রাণিনামুপকারকত্বাৎ মধুবৎ প্রিয়ত্বাদ্বা মধু—মধু ইবেত্যর্থঃ]; তথা, সর্ব্বাণি ভূতানি(প্রাণিনঃ) অস্যৈ (অস্যাঃ) পৃথিব্যে(পৃথিব্যাঃ) মধু(উপকাৰ্য্যতয়া মধু ইবেত্যর্থঃ); অস্যাৎ পৃথিব্যাং যঃ চ(যোহপি) অয়ং(অনুভূয়মানঃ) তেজোময়ঃ(চিন্মাত্রস্বরূপঃ) অমৃতময়ঃ(অমরণস্বভাবঃ) পুরুষঃ(কূটস্থঃ), যঃ চ(যোহপি) অয়ং অধ্যাত্মং (দেহাভিমানী) শারীরঃ(শরীরাধিষ্ঠিতঃ) তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ(জীবঃ), [স চ সর্ব্বেষাৎ ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি এতয়োঃ মধু ইত্যর্থঃ]। অয়ম্ এব সঃ, যঃ অয়ং আত্মা(ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মা, ইতি যঃ প্রতিজ্ঞাতঃ); তথা ইদম্ অমৃতং(যং মৈত্রেয্যৈ উক্তম্ অমৃতত্বসাধনম্), ইদং ব্রহ্ম(‘ব্রহ্ম তে ব্রবাণি’ ইত্যত্র যৎ প্রতিজ্ঞাতম্), ইদং সর্ব্বং(যৎ ‘সর্ব্বং বিদিতং ভবতি’ ইতি প্রাগুক্তং তদিত্যর্থঃ) ॥ ১২১ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ।—এই পৃথিবী সমস্ত ভূতের মধু, অর্থাৎ সর্ব- ভূতের কর্মোপার্জ্জিত এই পৃথিবী[মধুকর-ভোগ্য মধুচক্রের ন্যায়] সর্ব- ভূতের ভোগ্য বা মধুবৎ প্রিয়; তেমনি সর্বভূতও আবার এই পৃথিবীর মধু, অর্থাৎ পৃথিবীর উপকার-সাধক; আর এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠিত যে,
৬৫৯
এই চৈতন্যময় অমরণশীল কূটস্থ পুরুষ, এবং এই যে, দেহাভিমানী শরীরাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ[জীবাত্মা], ইহারাও সর্বভূতের মধু, এবং সর্বভূতও আবার ইহাদের মধু—পরস্পর উপকারক, ইনিই তাহা—যাহা এই আত্মা অর্থাৎ পূর্বপ্রতিজ্ঞাত আত্মা; ইহাই সেই অমৃত—যাহা মৈত্রেয়ীর নিকট অমৃতত্বসাধন বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে; ইহাই সেই ব্রহ্ম—যাহা “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি” বাক্যে উক্ত হইয়াছে, এবং ইহাই সেই সর্ব্ব—যাহা ব্রহ্মজ্ঞানে বিদিত হওয়া যায় বলিয়া কথিত হইয়াছে ॥ ১২১॥ ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইয়ং পৃথিবী প্রসিদ্ধা সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু—সর্ব্বেষাং ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানাং ভূতানাং প্রাণিনাং মধু কার্য্যং—মধ্বিব মধু; যথা একো মধ্বপূপোহনেকৈৰ্ম্মধুকরৈনির্ব্বর্তিতঃ, এবমিয়ং পৃথিবী সর্ব্বভূতনির্ব্বর্তিতা :তথা সর্ব্বাণি ভূতানি পৃথিব্যে পৃথিব্যা অস্যা মধু কার্য্যম্। কিঞ্চ, যশ্চায়ং পুরুষো- হস্যাৎ পৃথিব্যাং তেজোময়ঃ চিন্মাত্রপ্রকাশময়ঃ, অমৃতময়ঃ অমরণধৰ্ম্মা পুরুষঃ, বশ্চায়মধ্যাত্মং শারীরঃ—শরীরে ভবঃ, পূর্ব্ববৎ তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষঃ, স চ লিঙ্গাভিমানী; স চ সর্ব্বেষাৎ ভূতানামুপকার-করণত্বেন মধু; সর্ব্বাণি চ ভূতানি অস্য মধু, চ-শব্দসামর্থ্যাৎ। এবমেতচ্চতুষ্টয়ং তাবদেকং সর্ব্বভূতকার্য্যম্; সর্ব্বাণি চ ভূতান্যস্য কার্য্যম্; অতোহস্যৈককারণপূর্ব্বকতা। ১
যম্মাদেকস্মাৎ কারণাদেতৎ জাতম্, তদেবৈকং পরমার্থতো ব্রহ্ম, ইতরৎ কার্য্যং বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়মাত্রম্—ইত্যেষ মধুপৰ্য্যায়াণাং সর্ব্বেষামর্থঃ সঙ্ক্ষে- পতঃ। অয়মেব সঃ, যোহয়ং প্রতিজ্ঞাতঃ—ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মেতি, ইদমমৃতম্, যৎ মৈত্রেয্যৈ অমৃতত্বসাধনমুক্তম্ আত্মবিজ্ঞানম্, ইদং তদমৃতম্, ইদং ব্রহ্ম—যৎ “ব্রহ্ম তে ব্রবাণি, জ্ঞপয়িষ্যামি” ইত্যধ্যায়াদৌ প্রকৃতম্, যদ্বিষয়া চ বিদ্যা ব্রহ্ম- বিদ্যেত্যুচ্যতে; ইদং সর্ব্বম্, যস্মাদ্ ব্রহ্মণো বিজ্ঞানাৎ সর্ব্বং ভবতি ॥ ১২১ ॥ ১ ॥
টাকা।—এবং সঙ্গতিং ব্রাহ্মণস্যোক্ত্বা: তদক্ষরাণি ব্যাকরোতি—ইয়মিত্যাদিনা। যদুক্তং মধ্বিঃ মধ্বিতি, তদ্বৃণোতি—যথেতি। ন কেবলমুক্তং মধুদ্বয়মেব, কিন্তু মধ্বন্তরং চাস্তীত্যাহ— কিং চেতি। পুরুষশব্দস্য ক্ষেত্রবিষয়ত্বং বারয়তি—স চেতি। তস্য পৃথিবীবন্মধুত্বমাহ—স চ সর্বেষামিতি। সর্বেষাং চ ভূতানাং তং প্রতি, মধুত্বং দর্শয়তি—সর্বাণি চেতি। নম্বাদ্যমেব মধুদ্বয়ং শ্রুতমশ্রুতং তু মধুদ্বয়মশক্যং কল্পয়িতুং, কল্পকাভাবাদত আহ—চ-শব্দেতি। প্রথম- পর্যায়ার্থমুপসংহরতি—এবমিতি। পৃথিবী সর্বাণি! ভূতানি পার্থিবঃ পুরুষঃ শারীরশ্চেতি চতুষ্টয়মেকং মধ্বিতি শেষঃ। মধুশব্দার্ধমাহ—সর্ব্বেতি। অস্যেতি পৃথিব্যাদেরিতি যাবৎ
পরস্পরমুপকার্য্যোপকারকভাবে ফলিতমাহ-অত ইতি। অস্যেতি সর্ব্বং জগদুচ্যতে। উক্তং চ যস্মাৎ পরস্পরোপকার্য্যোপকারকভূতমিত্যাদি। ভবত্বনেন ন্যায়েন মধুপৰ্য্যায়েষু সর্বেষু কারণোপদেশঃ, ব্রহ্মোপদেশস্ত কথমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যম্মাদিতি। স প্রকৃত আত্মৈবায়ং চতুর্ধোক্তো ভেদ ইতি যোজনা। ইদমিতি চতুষ্টয়কল্পনাধিষ্ঠানবিষয়ং জ্ঞানং পরামৃশতি। ইদং ব্রহ্মেত্যত্র চতুষ্টয়াধিষ্ঠানমিদংশব্দার্থঃ। তৃতীয়ে চ তস্য প্রকৃতত্বং দর্শয়তি-যদ্বিষয়েতি। ইদং সর্ব্বমিত্যত্র ব্রহ্মজ্ঞানমিদমিত্যুক্তম্। সর্ব্বং সর্ব্বাপ্তিসাধনমিতি যাবৎ। তদেব স্পষ্টয়তি-যম্মাদিতি। ১২১।১।
ভাষ্যানুবাদ।—এই প্রসিদ্ধ পৃথিবী হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, অর্থাৎ ব্রহ্মা হইতে আরম্ভ করিয়া তৃণপর্যন্ত সমস্ত ভূতের মধু—কার্য্য(কর্ম্মলব্ধ ফল); মধু অর্থ—মধুর ন্যায়; যেমন একটি মধুচক্র বহু মধুকর দ্বারা নির্মিত হইয়া থাকে, তেমনি এই পৃথিবীও সমস্ত ভূতের কর্ম্মফলে উৎপন্ন হইয়াছে;[কাজেই পৃথিবীকে সর্ব্বভূতের কার্য্য বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে]। সেইরূপ সমস্ত ভূতবর্গও এই পৃথিবীর মধু অর্থাৎ কার্য্য বা উপকারক। অপিচ, এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠিত এই যে, তেজোময়—শুদ্ধ চৈতন্যমাত্রস্বরূপ ও অমৃতময়—মরণরহিত পুরুষ, এবং এই যে, তেজোময় ও অমৃতময় শরীরাভিব্যক্ত(শরীরাভিমানী) অধ্যাত্ম পুরুষ, লিঙ্গদেহাভিমানী সেই পুরুষ হইতেছে—সর্ব্বভূতের উপকারক—মধু।[শ্রুতিতে] চ-শব্দ থাকায় বুঝিতে হইবে যে, সমস্ত ভূতবর্গও ইহার মধু। এইরূপে পৃথিবী, সর্ব্বভূত, পার্থিব পুরুষ ও শারীর পুরুষ, এই চারিটি হইতেছে একই মধু অর্থাৎ সর্ব্বভূতের কার্য্যস্বরূপ; আবার সর্ব্বভূতও এই চতুষ্টয়ের মধু বা কার্য্যস্বরূপ; কাজেই এই চারিটি একই কারণ হইতে প্রাদুর্ভূত হইয়াছে বুঝিতে হইবে।
উক্ত চারিটি বস্তু যে, একই কারণ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে, প্রকৃতপক্ষে সেই কারণীভূত এক-বস্তুটি হইতেছেন ব্রহ্ম; তদ্ভিন্ন অপর কার্য্যমাত্রই বাক্যারব্ধ নাম মাত্র(সত্য বস্তু নহে); ইহাই হইতেছে মধু-পর্যায়োক্ত সমস্ত কথার সংক্ষিপ্ত তাৎপর্য্যার্থ। এই কারণীভূত ব্রহ্মই হইতেছেন সেই আত্মা, যাহার কথা “ইদং সর্ব্বং যদয়মাত্মা” বাক্যে প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে; ইহাই অমৃত, অর্থাৎ মৈত্রেয়ীর নিকট অমৃতত্বসাধন বলিয়া, যে আত্মজ্ঞান অভিহিত হইয়াছে, ইহাই সেই অমৃতত্বসাধন; ইহাই ব্রহ্ম—এই অধ্যায়ের প্রথমেই ‘ব্রহ্ম তে ব্রবাণি’ ও ‘জ্ঞপরিষ্যামি’ বলিয়া যে ব্রহ্মের প্রসঙ্গ করা হইয়াছে, এবং যদ্বিষয়ক বিদ্যা ‘ব্রহ্মবিদ্যা’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে, ইহাই সেই ব্রহ্ম; এবং ইহাই ‘সর্ব্ব’— বিজ্ঞানস্বরূপ যে ব্রহ্ম হইতে ‘সর্ব্ব’(সমস্ত বস্তু) উৎপন্ন হইয়া থাকে, ইহা হই- তেছে সেই সর্ব্বময় ॥ ১২১॥ ১॥
৬৬১
ইমা আপঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বাসামপাণ্ সর্ব্বাণি ভূতানি মধু যশ্চায়মাস্বপ্সু তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং রৈতসস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃত- মিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২২ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।—তথা ইমাঃ আপঃ(জলানি) সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু(কার্য্যং— মধুবৎ প্রিয়াঃ), সর্ব্বাণি ভূতানি আসাম্ অপাৎ মধু(কার্য্যম্); যঃ চ(যোহপি) অয়ং আসু অপ্সু[অধিষ্ঠিতঃ], তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং রৈতসঃ(রেতসি অভিব্যক্তঃ) তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ।[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং(পূর্ব্বোক্তঃ) আত্মা; ইদং(পূর্ব্বোক্তং) অমৃতং(অমৃতত্বসাধনম্); ইদং ব্রহ্ম(পূর্ব্বোক্তম্); ইদং সর্ব্বং(পূর্ব্বোক্তং ব্রহ্মোৎপন্নং সর্ব্বমিত্যর্থঃ) ॥ ১২২॥২॥
মূলানুবাদ?—এই জলসমূহ হইতেছে—সমস্ত ভূতের মধু (কর্ম্মজনিত ফল); সমস্ত ভূত আবার এই ভূতসমূহের মধু; আর এই যে, জলাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, অধ্যাত্ম(দেহ- সম্বন্ধী) তেজোময় অমৃতময় রৈতস(শুক্রাধিষ্ঠিত) পুরুষ, এই পুরুষই তাহা,—যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃতত্বসাধন, যাহা এই ব্রহ্ম, এবং যাহা এই সর্ব্ব বলিয়া পূর্ব্বে উক্ত হইয়াছে॥ ১২২॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা আপঃ। অধ্যাত্মং রেতসি অপাং বিশেষতোহ- বস্থানম্॥ ১২২॥ ২॥
টীকা।—যথা পৃথিবী মধুত্বেন ব্যাখ্যাতা, তথাপোহপি ব্যাখ্যেরা ইত্যাহ—তথেতি। রৈতস ইতি বিশেষণস্যার্থমাহ—অধ্যাত্মমিতি। ‘আপো রেতো, ভূত্বা শিশ্নং প্রাবিশন্’ ইতি হি শ্রুত্যন্তরম্। ১২২।২।
ভাষ্যানুবাদ।—জলসমূহও সেইরূপ অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত পৃথিবীর, ন্যায়। দেহমধ্যে শুক্রেতেই জলের বিশেষাধিষ্ঠান হইয়া থাকে;[এই জন্য অধ্যাত্ম পুরুষকে ‘রৈতস’ বলা হইয়াছে] ॥ ১২২ ॥ ২ ॥
অয়মগ্নিঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যাগ্নেঃ সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্নগ্নৌ তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং বাঙ্ময়স্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃত- মিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২৩॥ ৩॥
সরলার্থঃ।—অয়ং অগ্নিঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, তথা সর্ব্বাণি ভূতানি অস্য অগ্নেঃ মধু; যঃ চ অয়ম্ অস্মিন্ অগ্নৌ[ অধিষ্ঠিতঃ] তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ম্ অধ্যাত্মং(দেহসম্বন্ধী) তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ বাত্ময়ঃ(বাচি অভিব্যক্তরূপঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ।[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং(পূর্ব্বোক্তঃ) আত্মা, ইদম্ অমৃতম্, ইদং ব্রহ্ম, ইদং সর্ব্বম্[ব্যাখ্যা প্রথমশ্রুতিবৎ]॥ ১২৩॥৩॥
মূলানুবাদ।-সেইরূপ এই অগ্নি হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু; ভূতবর্গও আবার এই অগ্নির মধু; আর এই যে, উক্ত অগ্নিস্থিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ এবং এই যে, বাঙ্ময় তেজোময় অমৃতময় অধ্যাত্ম পুরুষ, ইহাই তাহা,-যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, যাহা এই ‘সর্ব’ বলিয়া উক্ত হইয়াছে ॥ ১২৩ ॥ ৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা অগ্নিঃ; বাচি অগ্নেবিশেষতোহবস্থানম্ ॥ ১২৩॥ ৩॥ টীকা।—পৃথিব্যামপ্সু চোক্তং ন্যায়মগ্নাবতিদিশতি—তথেতি। বাঘ্নয় ইত্যস্যার্থমাহ— বাচীতি। অগ্নির্ব্বাগ ভূত্বা মুখং প্রাবিশদিতি হি ক্রয়তে ॥ ১২৩॥ ৩॥
ভাষ্যানুবাদ।—অগ্নিও পূর্ব্ববৎ[ সর্ব্বভূতের মধু ইত্যাদি] ॥ ১২৩॥৩॥
অয়ং বায়ুঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্য বায়োঃ সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্ বায়ৌ তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়- মধ্যাত্মং প্রাণস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়- মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২৪ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—অয়ং বায়ুঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি অন্য বায়োঃ মধু, যঃ চ অয়ং অস্মিন্ বায়ৌ[ অধিষ্ঠিতঃ] তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, তথা যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ প্রাণঃ পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ, [ সঃ কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদং অমৃতম্, যৎ ইদং সর্ব্বম্[ পূর্ব্বোক্ত- মিত্যর্থঃ] ॥ ১২৪ ॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ।—এই বায়ু হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, এবং এই সমস্ত ভূতও আবার এই বায়ুর মধু; আর এই যে, বায়ুতে অধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ এবং এই যে, অধ্যাত্ম তেজোময় অমৃতময় প্রাণ পুরুষ, ইহাই হইতেছে তাহা, যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃতত্বসাধন, যাহা এই ব্রহ্ম, এবং যাহা এই ‘সর্ব’ বলিয়া অভিহিত হইয়াছে॥ ১২৪॥৪॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা বায়ুঃ; অধ্যাত্মং প্রাণো ভূতানাং শরীরার- ন্তকত্বেনোপকারাৎ মধুত্বম্; তদন্তর্গতানাং তেজোময়াদীনাং করণত্বেনোপকারাৎ মধুত্বম্। তথাচোক্তম্ “তস্যৈ বাচঃ পৃথিবী শরীরং জ্যোতীরূপময়- মগ্নিঃ” ইতি ॥ ১২৪॥ ৪ ॥
টীকা।—অগ্নাবুক্তং ন্যায়ং বায়ৌ যোজয়তি—তথেতি। ‘বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা নাসিকে প্রাবিশৎ’ ইতি শ্রুত্যন্তরমাশ্রিত্যাহ—অধ্যাত্মমিতি। পৃথিব্যাদীনাং তদন্তর্ব্বর্ত্তিনাং চ পুরুষাণা- মেকবাক্যোপাত্তানামেকরূপং মধুত্বমিতি শঙ্কাং পরিহরন্নবান্তরবিভাগমাহ—ভূতানামিতি। পৃথিব্যাদীনাং কার্য্যত্বং, তেজোময়াদীনাং করণত্বমিত্যত্র সপ্তান্নাধিকারসম্মতিমাহ—তথাচোক্ত- মিতি। ১২৪। ৪।
ভাষ্যানুবাদ।—বাহ্য বায়ু এবং অধ্যাত্ম(দেহাবলম্বী) প্রাণও পূর্ব্ববৎ মধু। বায়ুই প্রাণিগণের দেহারম্ভের কারণ; এই জন্য উহা মধুরূপে কল্পিত হইয়াছে; আর তদন্তর্গত তেজোময়াদি ভাবসমূহ উপকারসিদ্ধির সহায়তা করে; এই জন্য মধুরূপে কল্পিত হইয়াছে। অন্যত্রও এ কথা উক্ত আছে—‘সেই দেবতার পৃথিবী শরীর এবং এই অগ্নি হইতেছে জ্যোতির্ময় রূপ’ ইত্যাদি॥ ১২৪॥ ৪॥
অয়মাদিত্যঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যাদিত্যস্য সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্নাদিত্যে তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়- মধ্যাত্মং চাক্ষুষস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২৫ ॥ ৫ ॥
সরলার্থঃ।—অয়ং আদিত্যঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি অস্য আদিত্যস্য মধু; তথা যঃ চ অয়ং অস্মিন্ আদিত্যে তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ চাক্ষুষঃ(চক্ষুরধিষ্ঠিতঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতং, যৎ ইদং ‘সর্ব্বম্’ (প্রাগুক্তমিত্যর্থঃ) ॥ ১২৫ ॥ ৫ ॥
মূলানুবাদ।—এই আদিত্য হইতেছেন সমস্ত ভূতের মধু, এবং এই ভূতবর্গ হইতেছে এই আদিত্যের মধু; আর এই যে, আদিত্যাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, দেহাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় চাক্ষুষ পুরুষ, ইহাই হইতেছে তাহা, যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, এবং যাহা এই ‘সর্ব্ব’ বলিয়া অভিহিত হইয়াছে ॥ ১২৫ ॥ ৫ ॥
শৈলকভট্টম্।—তথাদিত্যো মধু, চক্ষুরধ্যাত্মম্ ॥ ১২৫ ॥ ৫ ॥
টীকা।—যদ্যপ্যাদিত্যতৃতীয়ে ভূতেহস্তর্ভবতি, তথাপি দেবতাভেদমাশ্রিত্যাম্বুক্তং ন্যায়ং তস্মিন্নতিদিশতি—তথেতি। ‘আদিত্যশ্চক্ষুর্ভূত্বাক্ষিণী প্রাবিশৎ’ ইতি শ্রুতিমাশ্রিত্যাহ—চাক্ষুষ- ইতি। ১২৫।৫।
ভাষ্যানুবাদ।—সেইরূপ আদিত্যও বাহ্য মধু, এবং চাক্ষুষ পুরুষ হইতেছে অধ্যাত্ম মধু ॥ ১২৫ ॥ ৫ ॥
ইমা দিশঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধু, আসাং দিশাং সর্ব্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মাসু দিক্ষু তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়- মধ্যাত্মং শ্রৌত্রঃ প্রাতিশ্রুৎকস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়- মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২৬ ॥ ৬ ॥
সরলার্থঃ।—ইমাঃ দিশঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি ভূতানি আসাং দিশাং মধু; তথা যঃ চ(যোহপি) অয়ং আসু দিক্ষু তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ প্রাতিশ্রুৎকঃ (শ্রবণসময়ে ভবঃ) শ্রৌত্রঃ(শ্রোত্রাধিষ্ঠিতঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ।[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং ‘সর্ব্বম্’ (প্রাগুক্তম্, ইত্যর্থঃ) ॥ ১২৬॥ ৬॥
মূলানুবাদ।—এই দিক্সমূহ হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, এবং সমস্ত ভূতও আবার এই দিক্সমূহের মধু; আর এই যে, নানাদিকস্থিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, অধ্যাত্ম প্রাতিশ্রুৎক (প্রত্যেক শ্রবণসময়ে অভিব্যক্ত) শ্রৌত্র—শ্রবণেন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতা পুরুষ, ইহাই তাহা, যাহা এই আত্মা, যাহা; এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, যাহা এই ‘সর্ব্ব’ বলিয়া পূর্ব্বে উক্ত হইয়াছে॥ ১২৬॥ ৬॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা দিশো মধু। দিশাং যদ্যপি শ্রোত্রমধ্যাত্মং, শব্দ- প্রতিশ্রবণবেলায়ান্তু বিশেষতঃ সন্নিহিতো ভবতি—ইত্যধ্যাত্মম্ প্রাতিশ্রুৎকঃ; প্রতিশ্রুৎকায়াং প্রতিশ্রবণবেলায়াং ভবঃ প্রাতিশ্রুৎকঃ ॥ ১২৬॥ ৬॥
টীকা।—আদিত্যগতং ন্যায়ং দিক্ষু সম্পাদয়তি—তথেতি। ‘দিশঃ শ্রোত্রং ভূত্বা কর্ণে প্রাবিশন্’ ইতি শ্রুতেঃ শ্রোত্রমেব দিশামধ্যাত্মং; তথাচাধ্যাত্মং শ্রৌত্র ইত্যেব বক্তব্যে কথং প্রাতিশ্রুৎক ইতি বিশেষমিত্যাশঙ্ক্যাহ—দিশামিতি। তথাপীত্যস্মিন্নর্থে তু-শব্দঃ। ১২৬।৬।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্ববৎ দিক্সমূহও মধু। যদিও শ্রোত্রই দিক্-
৬৬৫
সমূহের অধ্যাত্মপরিণাম হউক, তথাপি শব্দশ্রবণসময়ে বিশেষরূপে দিক্- সান্নিধ্য ঘটে বলিয়া তাহাকে ‘প্রাতিশ্রুৎক’ বিশেষণে বিশেষিত করা হইয়াছে; প্রত্যেক শ্রবণসময়ে সন্নিহিত হয় বলিয়া ঐ পুরুষকে ‘প্রাতিশ্রুৎক’ বলা হয় ॥ ১২৬ ॥ ৬ ॥
অয়ং চন্দ্রঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্য চন্দ্রস্য সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিশ্চন্দ্রে তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়- মধ্যাত্মং মানসস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়- মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদৎ সর্ব্বম্ ॥ ১২৭ ॥ ৭ ॥
সরলার্থঃ।—অয়ং চন্দ্রঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি ভূতানি অস্য চন্দ্রস্য মধু, যঃ চ অয়ং অস্মিন্ চন্দ্রে তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ মানসঃ পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং ‘সর্ব্বম্’(পূর্ব্বমুক্ত- মিত্যর্থঃ) ॥ ১২৭ ॥ ৭ ॥
মূলানুবাদ।—এই চন্দ্র হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, সমস্ত ভূত আবার এই চন্দ্রের মধু; এই যে, চন্দ্রাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, দেহসম্বন্ধী তেজোময় অমৃতময় মানস পুরুষ, ইহাই হইতেছে তাহা, যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম এবং যাহা এই ‘সর্ব’ বলিয়া অভিহিত হইয়াছে ॥ ১২৭॥ ৭॥
শৈলকভ্যং।—তথা চন্দ্রঃ অধ্যাত্মং মানসঃ॥ ১২৭॥ ৭॥
টীকা।—দিক্ষু ব্যবস্থিতং ন্যায়ং চন্দ্রে দর্শয়তি—তথেতি। ‘চন্দ্রমা মনো ভূত্বা হৃদয়ং প্রাবিশৎ’ ইতি শ্রুতিমনুসৃত্যাহ—অধ্যাত্মমিতি। ১২৭। ৭।
ভাষ্যানুবাদ।—চন্দ্র এবং অধ্যাত্ম মানস পুরুষও পূর্ব্ববৎ মধু ॥ ১২৭ ॥ ৭ ॥
ইয়ং বিদ্যুৎ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যৈ বিদ্যুতঃ সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্যাং বিদ্যুতি তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং তৈজসস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২৮ ॥ ৮ ॥
সরলার্থঃ।—ইহাং বিদ্যুৎ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি
অস্যৈ(অস্যাঃ) বিদ্যুতঃ মধু; যঃ চ অয়ং অস্যাৎ বিদ্যুতি তেজোময়ঃ অমৃত- ময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ তৈজসঃ(বৈদ্যুতঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ; যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং ‘সর্ব্বম্’ (পূর্ব্বমুক্তমিত্যর্থঃ) ॥ ১২৮॥৮॥
মূলানুবাদ।—এই বিদ্যুৎ হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, এবং সমস্ত ভূত হইতেছে এই বিদ্যুতের মধু, আর এই যে, বিদ্যুৎস্থিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, অধ্যাত্ম তেজোময় অমৃতময় তৈজস পুরুষ, ইহাই তাহা, যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, এবং যাহা এই ‘সর্ব্ব’ পদবাচ্য ॥১২৮৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা বিদ্যুৎ। ত্বক্তেজসি ভবস্তৈজসোঽধ্যা- ত্মম্॥ ১২৮॥৮॥
টীকা।—চন্দ্রবদ্বিদ্যুতোহপি মধুত্বমাহ—তথেতি। অধ্যাত্মং তৈজস ইত্যস্যার্থমাহ— ভর্গিতি। ১২৮।৮।
ভাষ্যানুবাদ।—বিদ্যুৎও পূর্ব্ববৎ মধু। ত্বগিন্দ্রিয়গত তেজে অভিব্যক্ত বলিয়া পুরুষ তৈজস; সেই পুরুষ হইতেছে অধ্যাত্ম বা দেহসম্বন্ধী ॥ ১২৮॥৮॥
অয়ং স্তনয়িত্বঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্য স্তনয়িত্বোঃ সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্ স্তনয়িত্বৌ তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং শাব্দঃ সৌবরস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১২৯ ॥ ৯ ॥
সরলার্থঃ।—অয়ং স্তনয়িত্বঃ(মেঘঃ) সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি অন্য স্তনয়িত্বোঃ মধু; যঃ চ অয়ং অস্মিন্ স্তনয়িত্বৌ তেজোময়ঃ অমৃত- ময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ সৌবরঃ(স্বরে ভবঃ—সৌবরঃ) শাব্দঃ পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং ‘সর্ব্বম্’(পূর্ব্বোক্তং, তদিত্যর্থঃ) ॥ ১২৯॥ ৯॥
মূলানুবাদ।—এই স্তনয়িত্ব(মেঘ) হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, সমস্ত ভূতও আবার এই স্তনয়িত্বর মধু; আর এই যে, স্তনয়িত্ব- স্থিত তেজোময় অমৃতময়(আধিদৈবিক) পুরুষ, এবং এই যে, তেজোময় অমৃতময় অধ্যাত্ম সৌবর—স্বরাভিব্যক্ত শাব্দ পুরুষ, ইহাই
তাহা, যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, এবং যাহা এই ‘সর্ব’ পদবাচ্য ॥ ১২৯ ॥ ৯ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা স্তনয়িত্বঃ। শব্দে ভবঃ শাব্দঃ অধ্যাত্মং যদ্যপি, তথাপি স্বরে বিশেষতো ভবতীতি সৌবরঃ অধ্যাত্মম্ ॥ ১২৯ ॥ ৯ ॥
টীকা।—পর্জন্যোহপি বিদ্যুদাদিবৎ সর্বেষাং ভূতানাং মধু ভবতীত্যাহ—তথেতি। অধ্যাত্মং শব্দঃ সৌবর ইত্যস্যার্থমাহ—শব্দে ভব ইতি। যদ্যপ্যধ্যাত্মং শব্দে ভব ইতি ব্যুৎপত্ত্যা শাব্দঃ পুরুষঃ, তথাপি স্বরে বিশেষতো ভবতীত্যধ্যাত্মং সৌবরঃ পুরুষ ইতি যোজনা॥ ১২৯। ৯।
ভাষ্যানুবাদ।—স্তনয়িত্ব, মেঘও সেইরূপ। যদিও শব্দাধিষ্ঠিত পুরুষই অধ্যাত্ম পুরুষ হউক, তথাপি স্বরেতে বিশেষভাবে অভিব্যক্ত হয় বলিয়া অধ্যাত্ম পুরুষকে সৌবর বলা হইয়াছে ॥ ১২৯ ॥ ৯ ॥
অয়মাকাশঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যাকাশস্য সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্নাকাশে তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়- মধ্যাত্মং হৃদ্যাকাশস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদ্ সর্ব্বম্ ॥ ১৩০ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।—অয়ম্ আকাশঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি অস্য আকাশস্য মধু; তথা যঃ চ অয়ম্ অস্মিন্ আকাশে তেজোময়ঃ অমৃত- মরঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং হৃদি তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ আকাশঃ (তদাখ্যঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[সঃ কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং ‘সর্ব্বম্’(পূর্ব্বোক্তং, তদিত্যর্থঃ) ॥ ১৩০ ॥ ১০ ॥
মূলানুবাদ:-এই আকাশ হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, এবং সমস্ত ভূতও আবার এই আকাশের মধু; আর এই যে, আকাশা- ধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, হৃদয়াভিব্যক্ত তেজোময় অমৃতময় দেহসম্বন্ধী পুরুষ, ইহাই তাহা,-যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম এবং যাহা এই ‘সর্ব’ বলিয়া কথিত হইয়াছে ॥ ১৩০ ॥ ১০ ॥
শঙ্করভাষ্যম্।—তথাকাশঃ অধ্যাত্মং হৃদ্যাকাশঃ॥ ১৩০॥ ১০॥
টীকা।—স্তনয়িত্বাবুক্তং শ্যায়মাকাশেহতিদিশতি—তথেতি। ১৩০। ১০।
ভাষ্যানুবাদ।—আকাশও সেইরূপ মধু; ইহার অধ্যাত্ম হইতেছে- হৃদয়াকাশ ॥ ১৩০ ॥ ১০ ॥
আভাস-ভাষ্যম্।—আকাশান্তাঃ পৃথিব্যাদয়ো ভূতগণা দেবতা- গণাশ্চ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতাত্মান উপকুর্ব্বন্তো মধু ভবন্তি প্রতি শরীরিণমিত্যুক্তম্; যেন তে প্রযুক্তাঃ শরীরিভিঃ সম্বধ্যমানা মধুত্বেনোপকুর্ব্বন্তি, তদ্বক্তব্যমিতী- দমারভ্যতে ॥ ১৩০ ॥ ১০ ॥
আভাসভাষ্যানুবাদ।—পৃথিবী হইতে আকাশ পর্য্যন্ত ভূতসমূহ এবং তদধিষ্ঠাতা দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিভূত দেবতাগণও প্রত্যেক দেহীর উপকার সাধন করে বলিয়া মধু-সংজ্ঞায় অভিহিত হইয়াছে; কিন্তু যাহা দ্বারা প্রেরিত হইয়া তাহারা দেহীর সহিত সম্বন্ধ লাভ করত মধুরূপে উপকার করিয়া থাকে, তাহা বলা হয় নাই—এখন বলিতে হইবে; এই জন্য পরবর্তী শ্রুতি আরব্ধ হইতেছে।
অয়ং ধর্মঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্য ধৰ্ম্মস্য সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্ ধর্মে তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়ম- ধ্যাত্মং ধার্মস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদ- মমৃতমিদং ব্রহ্মেদৎ সর্ব্বম্ ॥ ১৩১॥ ১১॥
সরলার্থঃ।—অয়ং(অনুভূয়মানঃ) ধর্ম্মঃ(পুণ্যং) সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি ভূতানি অন্য ধর্ম্মস্য মধু; যঃ চ অয়ম্ অস্মিন্ ধর্ম্মে[অধিষ্ঠিতঃ] তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ম্ অধ্যাত্মং(দেহসম্বন্ধী) তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ ধার্ম্মঃ(ধর্মাধিষ্ঠিতঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[কঃ?] যঃ অয়ং আত্মা,[যৎ] ইদম্ অমৃতম্,[যৎ] ইদং ব্রহ্ম,[যৎ] ইদং সর্ব্বং(পূর্ব্বোক্তম্ ইত্যর্থঃ) ॥ ১৩১ ॥ ১১ ॥
মূলানুবাদ।—যাহার ফল প্রত্যক্ষগোচর হইয়া থাকে, সেই এই ধর্ম্ম হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু; সমস্ত ভূতও আবার এই ধর্ম্মের মধু; এই যে, উক্ত ধর্মাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, দেহসম্বন্ধী তেজোময় অমৃতময় ধার্ম্ম—ধর্মাধিষ্ঠাতা পুরুষ, ইহাই তাহা —যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত এবং যাহা এই ‘সর্ব্ব’ বলিয়া উক্ত হইয়াছে ॥ ১৩১ ॥ ১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অয়ং ধর্ম্মঃ। অয়ম্-ইত্যপ্রত্যক্ষোহপি ধর্ম্মঃ কার্য্যেণ তৎপ্রযুক্তেন প্রত্যক্ষেণ ব্যপদিশ্যতে—অয়ং ধর্ম্ম ইতি প্রত্যক্ষবৎ। ধর্ম্মশ্চ
৬৯৯
ব্যাখ্যাতঃ শ্রুতিস্মৃতিলক্ষণঃ, ক্ষত্রাদীনামপি নিয়ন্তা জগতো বৈচিত্র্যকৃৎ পৃথিব্যাদীনাং পরিণামহেতুত্বাৎ, প্রাণিভিরমুষ্ঠীয়মানরূপশ্চ; তেন চ ‘অয়ং ধৰ্ম্মঃ’ ইতি প্রত্যক্ষেণ ব্যপদেশঃ। সত্য-ধর্ময়োশ্চ অভেদেন নির্দেশঃ কৃতঃ শাস্ত্রাচারলক্ষণয়োঃ, ইহ তু ভেদেন ব্যপদেশ একত্বে সত্যপি, দৃষ্টাদৃষ্টভেদরূপেণ কার্য্যারম্ভকত্বাৎ। যস্ত অদৃষ্টোহপূর্ব্বাখ্যো ধৰ্ম্মঃ, স সামান্যবিশেষাত্মনা অদৃষ্টেন রূপেণ কার্য্যমারভতে, সামান্যরূপেণ পৃথিব্যাদীনাং প্রয়োক্তা ভবতি, বিশেষ- রূপেণ চ অধ্যাত্মং কার্যকরণসঙ্ঘাতস্য। তত্র পৃথিব্যাদীনাং প্রয়োক্তরি যশ্চায়- মস্মিন্ ধর্ম্মে তেজোময়ঃ, তথাধ্যাত্মং কার্যকরণসঙ্ঘাতকর্তরি ধর্ম্মে ভবঃ— ধার্ম্মঃ ॥ ১৩১ ॥ ১১ ॥
টীকা। -পর্যায়ান্তরং বৃত্তমনুদ্য উত্থাপয়তি-আকাশান্তা ইতি। প্রতি শরীরিণং সর্বেষাং শরীরিণাং প্রত্যেকমিতি যাবৎ। ধৰ্ম্মস্য শাস্ত্রৈকগম্যত্বেন পরোক্ষত্বাদয়মিতি নির্দেশানহত্বমা- শঙ্ক্যাহ-অয়মিতীতি। যদ্যপি ধর্মোহপ্রত্যক্ষোহয়মিতি-নির্দেশানহঃ, তথাপি পৃথিব্যাদিধৰ্ম- কার্য্যস্থ প্রত্যক্ষত্বাৎ তেন কারণস্যাভেদমৌপচারিকমাদায় প্রত্যক্ষঘটাদিবদয়ং ধৰ্ম্ম ইতি ব্যপ- দেশোপপত্তিরিত্যর্থঃ। কোহসৌ ধৰ্ম্মঃ, যস্য প্রত্যক্ষত্বেন ব্যপদেশঃ, তত্রাহ-ধর্মশ্চেতি। ব্যাখ্যাতস্তচ্ছেয়োরূপমত্যসৃজত ধৰ্ম্মমিত্যাদাবিতি শেষঃ। তর্হি তস্য প্রত্যক্ষত্বান্ন চোদনা- লক্ষণত্বমিত্যাশক্য গৌণত্বমুখ্যত্বাভ্যামবিরোধনভিপ্রেত্যাহ-শ্রুতীতি। তস্মিন্নেব কার্যলিঙ্গক- মনুমানং সূচয়তি-ক্ষত্রাদীনামিতি। তত্রৈবানুমানান্তরং বিবক্ষিত্বোক্তম্-জগত ইতি। জগদ্ববৈচিত্র্যকারিত্বে হেতুমাহ-পৃথিব্যাদীনামিতি। ধৰ্ম্মস্য প্রত্যক্ষেণ ব্যপদেশে হেত্বন্তরমাহ- প্রাণিভিরিতি। তেনানুষ্ঠীয়মানাচারেণ প্রত্যক্ষেণ ধৰ্ম্মস্য লক্ষ্যমাণত্বেনেতি যাবৎ। ননু তৃতীয়ে- ধ্যায়ে যো বৈ স ধৰ্ম্মঃ, সত্যং বৈ তদিতি সত্যধৰ্ম্ময়োরভেদবচনাৎ তয়োর্ভেদেনাত্র পর্যায়- দ্বয়োপাদানমনুপপন্নম্, অত আহ-সতোতি। কথমেকত্বে সতি ভেদেনোক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ- দৃষ্টেতি। অদৃষ্টেন রূপেণ কার্যারম্ভকত্বং প্রকটয়তি-যস্থিতি। সামান্যাত্মনারম্ভকত্বমুদাহরতি- সামান্যরূপেণেতি। বিশেষাত্মনা কার্য্যারম্ভকত্বং ব্যনক্তি-বিশেষেতি। ধর্মস্য দ্বৌ ভেদাবুক্তৌ, তয়োর্মধ্যে প্রথমমধিকৃত্য যশ্চেত্যাদি বাক্যমিত্যাহ-তত্রেতি। দ্বিতীয়ং বিষয়ীকৃত্য যশ্চায়- মধ্যাত্মমিত্যাদি প্রবৃত্তমিত্যাহ-তথেতি। ১৩১। ১১।
ভাষ্যানুবাদ।—‘অয়ং ধর্ম্মঃ’ ইত্যাদি। ‘অয়ং’ অর্থ—যাহা প্রত্যক্ষ- গোচর। ধর্ম্ম স্বয়ং প্রত্যক্ষগোচর না হইলেও ধর্ম্মফল প্রত্যক্ষগোচর হইয়া থাকে; এই জন্য ‘অয়ং’ শব্দে ধর্ম্মের প্রত্যক্ষবৎ নির্দেশ করা হইয়াছে। শ্রুতি ও স্মৃতি- শাস্ত্রে ধর্ম্মের প্রকৃত স্বরূপ বর্ণিত হইয়াছে। এই ধর্ম্মই ক্ষত্রিয়াদি জাতির নিয়মন করে, এবং পৃথিব্যাদি ভূতসমূহের পরিণতি ঘটায় বলিয়া জগৎ-বৈচিত্র্যেরও কারণ হয়; এবং প্রাণিগণকর্তৃক অনুষ্ঠিত হইলেই ইহার স্বরূপ অভিব্যক্ত হইয়া থাকে; এই জন্যও ‘অয়ং ধর্ম্মঃ’ বলিয়া প্রত্যক্ষবৎ ব্যবহার করা হইয়াছে। ইতঃ-
পূর্ব্বে শাস্ত্রীয় আচারাত্মক সত্য ও ধর্ম্মের অভেদ নির্দেশ করা হইয়াছে; এখানে কিন্তু অভেদ সত্ত্বেও দৃষ্ট ও অদৃষ্টাত্মক কার্য্যবিভাগানুসারে সত্য ও ধর্ম্মের ভেদ নির্দেশ করা হইল। যাহা অদৃষ্টাত্মক অপূর্ব্বনামক ধৰ্ম্ম, তাহা অদৃষ্ট বা অপ্রত্যক্ষভাবেই সামান্যাকারে ও বিশেষাকারে কার্য্য সমুৎপাদন করিয়া থাকে, —সামান্যাকারে পৃথিব্যাদি পদার্থনিচয়ের প্রেরণ বা কার্য্যোন্মুখতা-সম্পাদন করে, আবার বিশেষভাবে অধ্যাত্ম দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিরও প্রবর্ত্তক হইয়া থাকে; তন্মধ্যে পৃথিব্যাদি-প্রেরক ধর্ম্মে ইহা যেরূপ তেজোময় ও অমৃতময়, তদ্রূপ অধ্যাত্ম দেহেন্দ্রিয়াদি-সংঘাতপ্রবর্ত্তক ধর্ম্মেও[পুরুষ তেজোময় ও অমৃতময়] ॥ ১৩১ ॥ ১১ ॥
ইদং সত্যং সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্য সত্যস্য সর্ব্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্ সত্যে তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং সাত্যন্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১৩২ ॥ ১২ ॥
সরলার্থঃ।—ইদং(আচারলক্ষণং) সত্যং সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, তথা সর্ব্বাণি ভূতানি অস্য সত্যস্য মধু(কার্য্যম্); যঃ চ অয়ং অস্মিন্ সত্যে(সত্যার্থে অধিষ্ঠিতঃ) তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ সাত্যঃ পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ; যঃ অয়ং আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং সর্ব্বম্(পূর্ব্বমুক্তম্ ইত্যর্থঃ) ॥ ১৩২ ॥ ১২ ॥
মূলানুবাদ?—এই সদাচারাত্মক সত্য হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, আবার সমস্ত ভূত হইতেছে এই সত্যের মধু; আর এই যে, সত্যাধিষ্ঠিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, দেহসম্বন্ধী তেজো- ময় অমৃতময় অধ্যাত্মপুরুষ, ইহাই তাহা—যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, যাহা এই ‘সর্ব’ বলিয়া কথিত ॥ ১৩২ ॥ ১২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা দৃষ্টেনানুষ্ঠীয়মানেনাচাররূপেণ সত্যাখ্যো ভবতি, স এব ধর্ম্মঃ, সোহপি দ্বিপ্রকার এব সামান্য-বিশেষাত্মরূপেণ; সামান্যরূপঃ পৃথি- ব্যাদিসমবেতঃ, বিশেষরূপঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতসমবেতঃ। তত্র পৃথিব্যাদিসমবেতে বর্তমানক্রিয়ারূপে সত্যে, তথা অধ্যাত্মং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতসমবেতে সত্যে ভবঃ— সাত্যঃ, “সত্যেন বায়ুরাবাতি” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। ১৩২॥ ১২॥
টীকা।—ইদং সত্যমিত্যস্মিন্ পর্যায়ে সত্যশব্দার্থমাহ—তথা দৃষ্টেনেতি। সোংপীত্যপি- শব্দো ধর্ম্মোদাহরণার্থঃ। দ্বয়োরপি প্রকারয়োর্বিনিয়োগং বিভজতে—সামানুরূপ ইতি।
৬৭১
উভয়ত্র সমবেতশব্দস্তত্র তত্র কারণত্বেনানুগত্যর্থঃ। যশ্চায়মস্মিন্নিত্যাদিবাক্যস্য বিষয়মাহ— তত্রেতি। সত্যে যশ্চেত্যাদি বাক্যমিতি শেষঃ। যশ্চায়মধ্যাত্মমিত্যাদিবাক্যস্য বিষয়মাহ— তথাহধ্যাত্মমিতি। সত্যস্য পৃথিব্যাদৌ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতে চ কারণত্বে প্রমাণমাহ—সত্যে- নেতি ॥ ১৩২ ॥ ১২ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—লোকের প্রত্যক্ষসিদ্ধ সদাচারানুষ্ঠান দ্বারা যে সত্য নিষ্পন্ন হয়, তাহাই ধর্মশব্দবাচ্য। সেই সত্যসংজ্ঞক ধৰ্ম্ম দুইপ্রকার—সামান্যাত্মক ও বিশেষাত্মক; তন্মধ্যে পৃথিব্যাদি ভূতপদার্থে সমবেত সত্য হইল সামান্য ধৰ্ম্ম, আর কার্য্য-করণভাবে পরিণত দেহ-সম্বদ্ধ সত্য হইল বিশেষ ধৰ্ম্ম; তন্মধ্যে পৃথিব্যাদি ভূতে সম্বন্ধ হইয়া যে সত্য-ধৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হয়, তাহা হইতে এবং অধ্যাত্ম দেহেন্দ্রিয়-সম্বদ্ধরূপে অনুষ্ঠিত সত্যধর্ম হইতে যাহা সম্ভূত হয়, তাহার নাম সাত্য; কারণ, অন্য শ্রুতিতে আছে—‘বায়ু সত্যধৰ্ম্ম-যোগেই প্রবাহিত হইয়া থাকে’ ॥ ১৩২ ॥ ১২ ॥
ইদং মানুষং সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্য মানুষস্য সর্ব্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্মানুষে তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মধ্যাত্মং মানুষস্তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১৩৩ ॥ ১৩ ॥
সরলার্থঃ।—ইদং(অনুভূয়মানং) মানুষৎ(মনুষ্যত্বাদি-জাতিভেদঃ) সর্ব্বেষাং ভূতানাৎ মধু, তথা সর্ব্বাণি ভূতানি অস্য মানুষস্য মধু; যঃ চ অয়ং অস্মিন্ মানুষে তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ; যঃ চ অয়ং অধ্যাত্মং তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ মানুষঃ(মনুষ্যাদ্যধিষ্ঠিতঃ) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[কঃ?] যঃ অয়ং(পূর্ব্বোক্তঃ)। ১৩৩॥ ১৩॥
মূলানুবাদ।—এই লোকপ্রসিদ্ধ মনুষ্যত্বাদি জাতিবিশেষ হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু, এবং সমস্ত ভূত হইতেছে এই মনুষ্যাদির মধু; এই যে, মানুষনিষ্ঠ তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এবং এই যে, অধ্যাত্ম তেজোময় অমৃতময় মানুষ পুরুষ, ইহাই তাহা—যাহা এই আত্মা, যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম, যাহা এই ‘সর্ব্ব’ স্বরূপ বলিয়া উক্ত হইয়াছে, তদাত্মক ॥ ১৩৩॥ ১৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ধর্ম্মসত্যভ্যাং প্রযুক্তোহয়ং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতবিশেষঃ। স যেন জাতিবিশেষেণ সংযুক্তো ভবতি, স জাতিবিশেষো মানুষাদিঃ
তত্র মানুষাদিজাতিবিশিষ্টা এব সর্ব্বে প্রাণিনিকায়াঃ পরস্পরোপকার্য্যোপ- কারকভাবেন বর্তমানা দৃশ্যন্তে; অতো মানুষাদিজাতিরপি সর্ব্বেষাৎ ভূতানাং মধু। তত্র মানুষাদিজাতিরপি বাহ্যাধ্যাত্মিকী চেত্যুভয়থা নির্দেশভাগ্ ভবতি ॥ ১৩৩॥ ১৩॥
টীকা।—ইদং মানুষমিত্যত্র মানুষগ্রহণং সর্ব্বজাত্যুপলক্ষণমিত্যভিপ্রেত্যাহ—ধর্ম্ম-সত্যাভ্যা- মিতি। কথং পুনরেষা জাতিঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু ভবতি, তত্রাহ—তত্রেতি। ভোগভূমিঃ সপ্তম্যর্থঃ। যশ্চায়মস্লিন্নিত্যাদিবাক্যদ্বয়স্য বিষয়ভেদং দর্শয়তি—তত্রেতি। ব্যবহারভূমাবিতি যাবৎ। ধর্ম্মাদিবদিত্যপেরর্থঃ। নির্দ্দিষ্টঃ স্বশরীরনিষ্ঠা জাতিরাধ্যাত্মিকী, শরীরান্তরাশ্রিতা তু বাহ্যেতি ভেদঃ। বস্তুতত্ত্ব তত্র নোভয়থাত্বমিত্যভিপ্রেত্য নির্দ্দেশভাগিত্যুক্তম্॥ ১৩৩॥ ১৩৪॥
ভাষ্যানুবাদ।—দেহেন্দ্রিয়াদি সংঘাতসম্পন্ন পুরুষ ধর্ম্ম ও সত্য দ্বারা পরিচালিত হইয়া থাকে। যে জাতিবিশেষের সহিত তাহার সম্বন্ধ হইয়া থাকে, সেই জাতিবিশেষ হইতেছে—মনুষ্যত্বাদি। দেখিতে পাওয়া যায়—সমস্ত প্রাণীই মনুষ্যত্বাদি-জাতিবিশেষবিশিষ্ট হইয়া পরস্পর পরস্পরের উপকার্য্যোপকারকভাবে অবস্থান করিতেছে; অতএব মনুষ্যত্বাদি জাতিও সমস্ত ভূতের মধু। এই মনুষ্য- ত্বাদি জাতিও বাহ্য ও আধ্যাত্মিক ভেদে দুই প্রকার; সুতরাং উহাও উভয় প্রকারে নির্দেশের যোগ্য;[এই জন্য শ্রুতি উহার বাহ্যাধ্যাত্মিকভাব নির্দেশ করিয়াছেন]॥ ১৩৩॥ ১৩॥
অয়মাত্মা সর্বেষাং ভূতানাং মধ্বস্যাত্মনঃ সর্বাণি ভূতানি মধু, যশ্চায়মস্মিন্নাত্মনি তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মাত্মা তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব সঃ, যোহয়মাত্মেদমমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্ব্বম্ ॥ ১৩৪ ॥ ১৪ ॥
সরলার্থঃ।—অয়ং আত্মা(মনুষ্যত্বাদিজাতিবিশিষ্টঃ দেহঃ) সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু, সর্ব্বাণি চ ভূতানি অন্য আত্মনঃ মধু; তথা যঃ চ অয়ং অস্মিন্ আত্মনি(দেহে)[অধিষ্ঠিতঃ] তেজোময়ঃ অমৃতময়ঃ পুরুষঃ, যঃ চ অয়ং তেজো- ময়ঃ অমৃতময়ঃ আত্মা(আত্মসম্বন্ধী) পুরুষঃ, অয়ম্ এব সঃ;[কঃ?] যঃ অয়ম্ আত্মা, যৎ ইদম্ অমৃতম্, যৎ ইদং ব্রহ্ম, যৎ ইদং সর্ব্বম্(উক্তার্থমেত- দিত্যর্থঃ) ॥ ১৩৪ ॥ ১৪ ॥
মূলাসুবাদ।—মনুষ্যত্বাদি জাতিবিশিষ্ট এই দেহ সমস্ত ভূতের মধু, এবং সমস্ত ভূতও এই আত্মার(দেহের) মধু। সেইরূপ, এই যে,
৬৭৩
আত্মগত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ; এবং এই যে, তেজোময় অমৃতময় অধ্যাত্ম আত্মা—পুরুষ, ইহা হইতেছে তাহা—যাহা এই আত্মা যাহা এই অমৃত, যাহা এই ব্রহ্ম ও যাহা এই সর্ববলিয়া কথিত হইয়াছে ॥ ১৩৪৷১৪॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যস্তু কার্য্যকরণসঙ্ঘাতো মানুষাদিজাতিবিশিষ্টঃ, সোহয়মাত্মা সর্ব্বেষাং ভূতানাং মধু। নম্বয়ং শারীরশব্দেন নির্দিষ্টঃ পৃথিবীপর্য্যায়- এব? ন, পার্থিবাংশস্যৈব তত্র গ্রহণাৎ; ইহ তু সর্ব্বাত্মা প্রত্যস্তমিতাধ্যাত্মাধি- ভূতাধিদৈবাদিসর্ব্ববিশেষঃ সর্ব্বভূতদেবতাগণবিশিষ্টঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতঃ, সঃ ‘অয়- মাত্মা’ ইত্যুচ্যতে। তস্মিন্নস্মিন্ আত্মনি তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহমূর্তরসঃ সর্ব্বাত্মকো নিদ্দিশ্যতে; একদেশেন তু পৃথিব্যাদিষু নির্দিষ্টঃ, অত্রাধ্যাত্মবিশেষা- ভাবাৎ স ন নিদ্দিশ্যতে। যস্তু পরিশিষ্টো বিজ্ঞানময়ঃ—যদর্থোহয়ং দেহলিঙ্গ- সঙ্ঘাত আত্মা, সঃ “যশ্চায়মাত্মা” ইত্যুচ্যতে ॥ ১৩৪ ॥ ১৪ ॥
টীকা।—অন্তিমং পর্যায়মবতারয়তি—যস্তিতি। আত্মনঃ শারীরেণ গতত্বাৎ পুনরুক্তিরনুপ- যুক্তেতি শঙ্কতে—নন্বিতি। অবয়বাবয়বি-বিষয়ত্বেন পর্যায়দ্বয়মপুনরুক্তমিতি পরিহরতি— নেত্যাদিনা। পরমাত্মানং ব্যাবর্ত্তয়তি—সর্ব্বভূতেতি। চেতনং ব্যবচ্ছিনত্তি—কার্য্যেতি। যশ্চায়মস্মিন্নিত্যাদিবাক্যস্য বিষয়মাহ—তস্মিন্নিতি। যশ্চায়মধ্যাত্মমিতি কিমিতি নোক্তমিত্যা- শঙ্ক্যাহ—একদেশেনেতি। অত্রেত্যন্ত্যপর্যায়োক্তিঃ। যশ্চায়মাত্মেত্যস্যার্থমাহ—যস্তিতি ॥১৩৪॥১৪॥
ভাষ্যানুবাদ।—মনুষ্যত্বাদি জাতিবিশিষ্ট এই যে, দেহেন্দ্রিয়সংঘাতাত্মক আত্মা, সেই এই আত্মা হইতেছে সমস্ত ভূতের মধু। ভাল, এই আত্মা ত পৃথিবী- পর্যায়েই ‘শারীর’ শব্দে উক্ত হইয়াছে,[এখানে আবার তাহার পৃথক্ উক্তি কেন?] না—এ আপত্তি হইতে পারে না; কেন না, সেখানে শারীর শব্দে কেবল পার্থিবাংশই অভিহিত হইয়াছে, আর এখানে অভিহিত হইতেছে— অধ্যাত্ম অংশ। অধিদৈব ও অধিভূতাদি সর্ব্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্মবিবর্জ্জিত এবং সমস্ত ভূত ও দেবগণে বেষ্টিত দেহেন্দ্রিয়াদি-সংঘাতই এই আত্মা-শব্দে অভিহিত হইয়াছে,(কিন্তু শরীরের অংশবিশেষ নহে)। এখানে সেই এই সংঘাতরূপী আত্মাতেই তেজোময় অমৃতময় সর্ব্বাত্মক অমূর্ত্ত-রস পুরুষের নির্দেশ করা হইতেছে। ইতঃপূর্ব্বে তাহারই একদেশ পৃথিব্যাদিপর্যায়ে যাহা উক্ত হইয়াছে, এখানে কিন্তু অধ্যাত্মবিষয়ে বিশেষ কিছু বক্তব্য না থাকায়, তাহার আর প্রতিনির্দেশ করা আবশ্যক হইতেছে না; পরন্তু এতদতিরিক্ত যে, স্থূল-সূক্ষ্ম দেহসমষ্টিরূপ বিজ্ঞান- ময় আত্মা,—যাহার জন্য এই প্রকরণের আরম্ভ, সেই আত্মাই এখানে “যশ্চায়- মাত্মা” বলিয়া অভিহিত হইতেছে॥ ১৩৪॥ ১৪॥ ৫-৪১
স বা অয়মাত্মা সর্বেষাং ভূতানামধিপতিঃ সর্বেষাং ভূতানাং রাজা, তদ্যথা রথনাভৌ চ রথনেমৌ চারাঃ সর্ব্বে সমর্পিতা এবমেবাস্মিন্নাত্মনি সর্ব্বাণি ভূতানি সর্ব্বে দেবাঃ সর্ব্বে লোকাঃ সর্ব্বে প্রাণাঃ সর্ব্ব এত আত্মানঃ সমর্পিতাঃ ॥ ১৩৫ ॥ ১৫ ॥
সরলার্থঃ।—সঃ(অনন্তরোক্তঃ) অয়ং(কার্য্য-করণোপাধিবিশিষ্টঃ) আত্মা সর্ব্বেষাং ভূতানাং অধিপতিঃ(অধিষ্ঠায় পালকঃ—স্বতন্ত্র ইত্যর্থঃ), সর্ব্বেষাং ভূতানাং রাজা(ঔপচারিকরাজত্ব-প্রতিষেধার্থং রাজবিশেষণম্); তৎ(তত্র দৃষ্টান্তঃ) যথা(যদ্বৎ) রথনাভৌ চ রথনেমৌ(রথচক্রস্য প্রান্তভাগে) চ সর্ব্বে অরাঃ (শলাকাঃ) সমর্পিতাঃ[ভবন্তি], এবম্ এব(যথোক্তদৃষ্টান্তবদেব) সর্ব্বাণি ভূতানি, সর্ব্বে দেবাঃ, সর্ব্বে লোকাঃ, সর্ব্বে প্রাণাঃ, এতে(পূর্ব্বোক্তাঃ) সর্ব্বে আত্মানঃ অস্মিন্(বিজ্ঞানময়ে) আত্মনি সমর্পিতাঃ(সন্নিবেশিতাঃ তদায়ত্তা ইত্যর্থঃ)। ১৩৫ ॥ ১৫ ॥
মূলানুবাদ।—সেই এই দেহেন্দ্রিয়াদি-সম্বন্ধ বিজ্ঞানময় আত্মাই সমস্ত ভূতের অধিপতি(পরিচালক) এবং সমস্ত ভূতের রাজা। এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, রথের নাভিরন্ধে ও রথচক্রের নেমিতে(প্রান্তভাগে) যেরূপ চক্রশলাকাসমূহ সন্নিবেশিত থাকে, ঠিক তদ্রূপ সমস্ত ভূত, সমস্ত দেবতা, সমস্ত লোক, সমস্ত প্রাণ এবং উক্ত সমস্ত আত্মা এই আত্মাতে সন্নিবেশিত আছে ॥ ১৩৫ ॥ ১৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যস্মিন্নাত্মনি পরিশিষ্টো বিজ্ঞানময়োহন্ত্যে পর্যায়ে প্রবেশিতঃ, সোহয়মাত্মা, তস্মিন্নবিদ্যাকৃত-কার্য্যকরণসঙ্ঘাতোপাধিবিশিষ্টে ব্রহ্ম- বিদ্যয়া পরমার্থাত্মনি প্রবেশিতে, স এবমুক্তোহনন্তরোহবাহ্যঃ কৃৎস্নঃ প্রজ্ঞানঘনভূতঃ সর্ব্বেষাং ভূতানাময়মাত্মা সর্ব্বৈরুপাস্যঃ, সর্ব্বেষাৎ ভূতানামধিপতিঃ সর্ব্বভূতানাং স্বতন্ত্রঃ, ন কুমারামাত্যবৎ; কিং তহি? সর্ব্বেষাং ভূতানাৎ রাজা; রাজত্ববিশেষণ- মধিপতিরিতি—ভবতি কশ্চিদ্রাজোচিতবৃত্তিমাশ্রিত্য রাজা, ন ত্বধিপতিঃ; অতো বিশিনষ্টি অধিপতিরিতি। এবং সর্ব্বভূতাত্মা বিদ্বান্ ব্রহ্মবিদ্ মুক্তো ভবতি। ১
যদুক্তম্—ব্রহ্মবিদ্যয়া সর্ব্বং ভবিষ্যন্তো মনুষ্যা মন্যন্তে—কিমু তদ্ ব্রহ্ম অবেৎ, যস্মাৎ তৎ সর্ব্বমভবৎ—ইতীদম্, তদ্ব্যাখ্যাতম্। এবমাত্মানমেব সর্ব্বাত্মত্বেনাচার্য্যা- গমাভ্যাং শ্রুত্বা, মত্বা তর্কতঃ, বিজ্ঞায় সাক্ষাৎ, এবম্—যথা মধুব্রাহ্মণে দর্শিতং, তথা। তস্মাদব্রহ্মবিজ্ঞানাদেবংলক্ষণাৎ পূর্ব্বমপি ব্রহ্মৈব সৎঅবিদ্যা অব্রহ্মাসীৎ,
সর্ব্বমেব চ সৎ অসর্ব্বমাসীৎ, তাং ত্ববিদ্যামস্মাদ বিজ্ঞানাৎ তিরস্কৃত্য ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মৈব সন্ ব্রহ্মাভবৎ, সর্ব্বং সৎ সর্ব্বমভবৎ। ২
পরিসমাপ্তঃ শাস্ত্রার্থঃ, যদর্থঃ প্রস্তুতঃ; তস্মিন্নেতস্মিন্ সর্ব্বাত্মভূতে ব্রহ্মবিদি সর্ব্বাত্মনি সর্ব্বং জগৎ সমর্পিতম্-ইত্যেতস্মিন্নর্থে দৃষ্টান্ত উপাদীয়তে-তদ্যথা রথনাভৌ চ রথনেমৌ চ অরাঃ সর্ব্বে সমর্পিতা:-ইতি প্রসিদ্ধোহর্থঃ, এবমেত- স্মিন্ আত্মনি পরমাত্মভূতে ব্রহ্মবিদি সর্ব্বাণি ভূতানি ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানি, সর্ব্বে দেবাঃ অগ্ন্যাদয়ঃ, সর্ব্বে লোকাঃ ভূরাদয়ঃ, সর্ব্বে প্রাণাঃ বাগাদয়ঃ, সর্ব্বে এতে আত্মানঃ-জলচন্দ্রবৎ প্রতিশরীরানুপ্রবেশিনোহবিদ্যাকল্পিতাঃ, সর্ব্বং জগদস্মিন্ সমর্পিতম্। ৩
যদুক্তম্—ব্রহ্মবিদ্ বামদেবঃ প্রতিপেদে অহং মনুরভবং সূর্য্যশ্চেতি, স এষ সর্ব্বাত্মভাবো ব্যাখ্যাতঃ। স এষ বিদ্বান্ ব্রহ্মবিৎ সর্ব্বোপাধিঃ সর্ব্বাত্মা সর্ব্বো ভবতি; নিরুপাধিনিরুপাখ্যোহনন্তরোহবাহ্যঃ কৃৎস্নঃ প্রজ্ঞানঘনোহ- জোহজরোহমৃতোহভয়োহচলো নেতি নেত্যস্থুলোহনণুরিত্যেবংবিশেষণো ভবতি। ৪
তমেতমর্থমজানন্তস্তার্কিকাঃ কেচিৎ পণ্ডিতম্মন্যাশ্চাগমবিদঃ শাস্ত্রার্থং বিরুদ্ধং মন্যমানা বিকল্পয়ন্তো মোহমগাধমুপযান্তি। তমেতমর্থমେତৌ মন্ত্রাবনুবদতঃ- “অনেজদেকং মনসো জবীয়ঃ” “তদেজতি তন্নৈজতি” ইতি। তথা চ তৈত্তি- রীয়কে-“যস্মাৎ পরং নাপরমস্তি কিঞ্চিৎ”, “এতৎ সাম গায়ন্নাস্তে।” “অহমন্ন- মহমন্নমহমন্নম্” ইত্যাদি। তথা চ ছান্দোগ্যে-“জক্ষৎ ক্রীড়ন রমমাণঃ” “স যদি পিতৃলোককামঃ”, “সর্ব্বগন্ধঃ সর্ব্বরসঃ” “সর্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিৎ” ইত্যাদি। আথর্ব্বণে চ-“দূরাৎ স দূরে তদিহান্তিকে চ।” কঠবল্লীঘপি-“অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্”, “কস্তং মদামদং দেবম্”, “তদ্ধাবতোহন্যানত্যেতি তিষ্ঠৎ” ইতি চ। তথা গীতাসু-“অহং ক্রতুরহং যজ্ঞঃ।” “পিতাহমস্য জগতঃ।” “নাদত্তে কস্য- চিৎ পাপম্”, “সমং সর্ব্বেযু ভূতেষু” “অবিভক্তং বিভক্তেষু”, “গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ” ইত্যেবমাদ্যাগমার্থং বিরুদ্ধমিব প্রতিভান্তং মন্যমানাঃ স্বচিত্তসামর্থ্যাদর্থনির্ণয়ায় বিকল্পয়ন্তঃ-অস্ত্যাত্মা, নাস্ত্যাত্মা, কর্তা, অকর্তা, মুক্তো বদ্ধঃ, ক্ষণিকো বিজ্ঞান- মাত্রং, শূন্যঞ্চ-ইত্যেবং বিকল্পয়ন্তো ন পারমধিগচ্ছন্তি অবিদ্যায়াঃ; বিরুদ্ধধৰ্ম্ম- দর্শিত্বাৎ সর্বত্র। তস্মাৎ তত্র য এব শ্রুত্যাচার্য্যদর্শিতমার্গানুসারিণঃ, ত এবা- বিদ্যায়াঃ পারমধিগচ্ছন্তি। ত এব চাম্মান্মোহসমুদ্রাদগাধাদুত্তরিষ্যন্তি, নেতরে স্ববুদ্ধিকৌশলানুসারিণঃ ॥ ১৩৫ ॥ ১৫ ॥
টাকা।—স বা অয়মাত্মেত্যার্থমাহ—যস্মিন্নিতি। পরিশিষ্টঃ পূর্ব্বপর্যায়েহনুপদিষ্টোহন্তে; চ পর্যায়ে যশ্চায়মাত্মেত্যুক্তো বিজ্ঞানময়ো বস্মিন্নাত্মনি খিল্যদৃষ্টান্তবচসা প্রবেশিতঃ, তেন পরেণাত্মনা তাদাত্ম্যং গতো বিদ্বানত্রাত্মশব্দার্থঃ। উক্তমাত্মশব্দার্থমনুদ্য সর্ব্বেধামিত্যাদি ব্যাচষ্টে—তস্মিন্নিতি। অবিদ্যয়া কৃতঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাত এবোপাধিস্তেন বিশিষ্টে জীবে তস্মিন্ পরমার্থাত্মনি ব্রহ্মণি ব্রহ্মবিদ্যয়া প্রবেশিতে, স এবায়মাত্মা যথোক্তবিশেষণঃ সর্ব্বৈরূপাস্যঃ সর্ব্বেবাং ভূতানামধিপতিরিতি সম্বন্ধঃ। ব্যাখ্যেয়ং পদমাদায় তস্য বাচ্যমর্থমাহ—সর্ব্বেষামিতি। তস্যৈব বিবক্ষিতোহর্থঃ সর্ব্বেরুপাস্য ইত্যুক্তঃ। স্বাতন্ত্র্যং ব্যতিরেকদ্বারা স্ফোরয়তি—নেত্যাদিনা। সর্ব্বেধাং ভূতানাং রাজেত্যেবাতবৈ যথোক্তার্থসিদ্ধৌ কিমিত্যধিপতিরিতি বিশেষণমিত্যা- শঙ্ক্যাহ —রাজত্বেতি। রাজত্বজাত্যনাক্রান্তোহপি কশ্চিৎ তদুচিতপরিপালনাদিব্যবহারবানিত্যুপ- লব্ধং, ন পুনস্তস্য স্বাতন্ত্র্যং, রাজপরতন্ত্রত্বাৎ; তস্মাৎ ততো ব্যবচ্ছেদার্থমধিপতিরিতি বিশেষণ- মিত্যর্থঃ। রাজাধিপতিরিত্যুভয়োরপি মিথো বিশেষণবিশেষ্যত্বমভিপ্রেত্য বাক্যার্থং নিগময়তি— এবমিতি। ১
উক্তস্য বিদ্যাফলস্য তৃতীয়েনৈকবাক্যত্বমাহ-যদুক্তমিতি। তদেব ব্যাখ্যাতং ক্ষোরয়তি- এবমিতি। মৈত্রেয়ীব্রাহ্মণোক্তক্রমেণেতি যাবৎ। এবমিত্যস্যার্থং কথয়তি-যথেতি। মধুব্রাহ্মণে পূর্ব্বব্রাহ্মণে চোক্তক্রমেণাত্মনি শ্রবণাদিত্রয়ং সম্পাদ্য বিদ্বান্ ব্রহ্মাভবদিতি সম্বন্ধঃ। নমু মোক্ষাবস্থায়ামের বিদুষো ব্রহ্মত্বাপরিচ্ছিন্নত্বং, ন প্রাচ্যামবিদ্যাদশায়ামিত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। সমানাধিকরণং পঞ্চমীত্রয়ম্। এবংলক্ষণাৎ-অহং ব্রহ্মাস্মীতি শ্রবণাদিকৃতাত্তত্ত্বসাক্ষাৎকারাদিতি যাবৎ। অব্রহ্মত্বাদিধীধ্বস্তিস্তর্হি কথমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তাং ত্বিতি। ২
বৃত্তমনুঘোত্তরগ্রন্থমবতারয়তি-পরিসমাপ্ত ইতি। যস্য শাস্ত্রস্যার্থো বিষয়প্রয়োজনাখ্যো ব্রহ্মকণ্ডিকায়াং চতুর্থাদৌ চ প্রস্তুতস্তস্যার্থো যথোক্তন্যায়েন নির্দ্ধারিত ইত্যনুবাদার্থঃ। সর্ব্বাত্ম- ভূতত্বং সর্পাদিবৎ কল্পিতানাং সর্ব্বেষামাত্মভাবেন স্থিতত্বম্। সর্ব্বং ব্রহ্ম তদ্রূপত্বং সর্ব্বাত্মত্বম্। সর্ব্ব এত আত্মান ইতি কুতো ভেদোক্তিরাত্মৈক্যস্য শাস্ত্রীয়ত্বাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-জলচন্দ্রবদিতি। দাষ্টান্তিকভাগস্থ সংপিণ্ডিতমর্থমাহ-সর্ব্বমিতি। উক্তস্য সর্ব্বাত্মভাবস্থ্য তৃতীয়েনৈকবাক্যত্বং নিদ্দিশতি-যদুক্তমিতি। সর্ব্বাত্মভাবে বিদুষঃ সপ্রপঞ্চত্বং স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-স এব ইতি। সর্ব্বেণ কল্পিতেন দ্বৈতেন সহিতমধিষ্ঠানভূতং ব্রহ্ম প্রত্যগ্ভাবেন পশ্যন্ বিদ্বান্ সর্ব্বোপাধিস্তত্ত- রূপেণ স্থিতঃ সর্ব্বো ভবতি। তদেবং কল্পিতং সপ্রপঞ্চত্বমবিদ্বদৃষ্ট্যা বিদুষোহভীষ্টমিত্যর্থঃ; বিদ্বদৃষ্ট্যা তস্য নিষ্প্রপঞ্চত্বং দর্শয়তি-নিরুপাধিরিতি। নিরুপাখ্যত্বং শব্দপ্রত্যয়াগোচরত্বং; ব্রহ্মাণ: সপ্রপঞ্চত্বমবিদ্যাকৃতং, নিষ্প্রপঞ্চত্বং তাত্ত্বিকমিত্যাগমার্থাবিরোধ উক্তঃ। ৩
কথং তহি তার্কিকা মীমাংসকাশ্চ শাস্ত্রার্থং বিরুদ্ধং পশ্যন্তো ব্রহ্মান্তি নাস্তীত্যাদি বিকল্পয়ন্তো মোমুহ্যন্তে, তত্রাহ-তমেতমিতি। বাদিব্যামোহস্যাজ্ঞানং মূলমুক্ত। প্রকৃতে ব্রহ্মণো দ্বৈরুপ্যে প্রমাণমাহ-তমিত্যাদিনা। তৈত্তিরীয়শ্রুতাবাদিশব্দেনাহমন্নমন্নমদন্তমগ্নীত্যাদি গৃহ্যতে। ছান্দোগ্যশ্রুতাবাদিশব্দেন সত্যকামঃ সত্যসঙ্কল্পো বিজরো বিমৃত্যুরিত্যাদি গৃহীতম্। শ্রুতিসিদ্ধে দ্বৈরূপ্যে স্মৃতিমপি সংবাদয়তি-তথেতি। পূর্ব্বোক্তপ্রকারেণাগমার্থবিরোধসমাধানে বিদ্যমান- হপি তদজ্ঞানাদ্বাদিবিভ্রান্তিরিত্যুপসংহরতি-ইত্যেবমাদীতি। বিকল্পমের স্ফুটরতি-অস্তীতি।
৬৭৭
সর্ব্বত্র শ্রুতিস্মৃতিধাত্মনীতি যাবৎ। কে তর্হি পারমবিদ্যায়াঃ সমধিগচ্ছন্তি? তত্রাহ-তস্মা- দিতি। ব্রহ্মজ্ঞানফলমাহ-ত এবেতি। ১৩৫। ১৫।
ভাষ্যানুবাদ।—অন্তিম পর্যায়ে অর্থাৎ চতুর্দ্দশ শ্রুত্যুক্ত যে আত্মাতে বিজ্ঞানময় আত্মার সন্নিবেশ কথিত হইয়াছে, সেই আত্মাই[এখানে আত্মশব্দে অভিহিত হইয়াছে]। অবিদ্যাজনিত দেহেন্দ্রিয়াদি-উপাধিবিশিষ্ট সেই আত্মা ব্রহ্মবিদ্যাপ্রভাবে পরমাত্মায় প্রবেশিত—সংযোজিত হইলে পর, যথোক্তপ্রকার অনন্তর অবাহ্য পূর্ণ প্রজ্ঞানঘন এবং অব্যবহিত পূর্ব্বশ্রুতিতে ‘তেজোময়’ প্রভৃতি বাক্যে যাহা উক্ত হইয়াছে, সর্ব্বভূতের আত্মা ও সর্ব্বভূতের উপাসনীয় সেই এই ব্রহ্ম- বিদ্যাসম্পন্ন বিজ্ঞানাত্মা(জীব) সমস্ত ভূতের(প্রাণীর) অধিপতি অর্থাৎ সর্ব্বভূতের পরিচালক—স্বাধীন, এবং সমস্ত ভূতের রাজা—রাজার ন্যায় রাজকুমার এবং রাজ- মন্ত্রীরও আধিপত্য থাকে সত্য, কিন্তু তাহাদের আধিপত্য সেইরূপ নহে; এই জন্য বলিলেন—তিনি সর্ব্বভূতের রাজা অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোন কোন লোক রাজোচিত ব্যবহার অবলম্বন করিয়াও ‘রাজা’ বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়া থাকে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অধিপতি নহে; সেইজন্য বিশেষ করিয়া ‘অধিপতি’ বলিলেন। এই প্রকার সর্ব্বভূতে আত্ম-বুদ্ধিসম্পন্ন(ব্রহ্মবুদ্ধিসম্পন্ন) ব্রহ্মজ্ঞ বিদ্বান্ পুরুষ মুক্তি- লাভ করিয়া থাকেন। ১
ইতঃ পূর্ব্বে যে, বলা হইয়াছে—‘মনুষ্যগণ ব্রহ্মবিদ্যাপ্রভাবে সর্ব্বাত্মভাব লাভ করিবার পূর্ব্বে মনে করে যে, ব্রহ্মই বা এমন কোন বিষয় জানিয়াছিলেন, যাহা জানিয়া তিনি সর্ব্বাত্মক হইয়াছেন’? সে কথার এইরূপ ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রথমতঃ আচার্য্য ও শাস্ত্র হইতে আত্মার সর্ব্বাত্মভাব শ্রবণ করিয়া, পরে অনুকূল যুক্তির সাহায্যে মনন করিয়া অর্থাৎ শ্রুতার্থের দৃঢ়তা সম্পাদন করিয়া, তাহার পর মধুব্রাহ্মণে যেরূপ বিজ্ঞানপ্রণালী প্রদর্শিত হইয়াছে, তদনুসারে সাক্ষাৎকার করিয়া—বুঝিতে হইবে যে, উক্তপ্রকার ব্রহ্মবিজ্ঞানের পূর্ব্বেও ব্রহ্ম- স্বরূপই ছিল; কেবল অবিদ্যাবশে অব্রহ্মের ন্যায় হইয়াছিল, এবং সর্ব্বাত্মক হইয়াও অসর্ব্ববৎ হইয়াছিল; এই ব্রহ্মবিদ্যা দ্বারা সেই অবিদ্যা অপনীত করিয়া ব্রহ্মবিৎ পুরুষ স্বয়ং ব্রহ্মস্বরূপ থাকিয়াও ব্রহ্ম হইয়াছেন, এবং সর্ব্বাত্মক হইয়াছেন মাত্র।(*) ২
(*) তাৎপর্য্য—আত্মা স্বভাবতঃই ব্রহ্মস্বরূপ এবং সর্ব্বাত্মক; কেবল অবিদ্যার সহিত সম্বন্ধ হওয়ায় আত্মা আপনার ব্রহ্মভাব ও সর্ব্বাত্মকতা ভুলিয়া যায়—বুঝিতে পারে না। সাধনসেবায় ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হইলে, তৎপ্রতিপক্ষ অবিদ্যা অন্তর্হিত হইয়া যায়, অবিদ্যার
যে উদ্দেশ্য-সিদ্ধির জন্য এই মন্ত্রের(এই ব্রাহ্মণের) অবতারণা হইয়াছিল, তাহার কথা এখানে পরিসমাপ্ত হইল; এখন, সেই সর্ব্বাত্মভূত ব্রহ্মবিৎ আত্মাতে এই সমস্ত জগৎ কিরূপে প্রতিষ্ঠিত আছে, তাহা বলিতে হইবে। তদ্বিষয়ে প্রথমতঃ একটি দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইতেছে—যেমন রথচক্রের নাভিরন্ধ্রে ও রপনেমির(চক্রের প্রান্তভাগের নাম নেমি,) উপরে সমস্ত চক্রশলাকা সন্নিবেশিত থাকে, ঠিক তেমনি পরমাত্মভাবাপন্ন এই ব্রহ্মবিৎ-আত্মাতেও ব্রহ্মাদি স্তম্বপর্য্যন্ত সমস্ত ভূতনিবহ, অগ্নিপ্রভৃতি সমস্ত দেবতা, ভূরাদি সমস্ত লোক, বাক্প্রভৃতি সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং জলচন্দ্রবৎ প্রতিশরীরে(প্রত্যেক শরীরমধ্যে) অনুপ্রবিষ্ট অবিদ্যা-বশবর্তী এই সমস্ত আত্মা—অধিক কি, সম্মুখস্থ সমস্ত জগৎই অনু- প্রবিষ্ট থাকে। ইতঃপূর্ব্বে আরও যে, বলা হইয়াছে—‘বামদেব ঋষি অনুভব করিয়াছিলেন যে, আমিই মনু হইয়াছিলাম, আমিই সূর্য্য হইয়াছিলাম’, এখানে সেই সর্ব্বাত্মভাবও ব্যাখ্যাত হইল।[এখানে বুঝান হইল যে,] ব্রহ্মজ্ঞ বিদ্বান্ পুরুষই সর্ব্বোপাধিসম্পন্ন সর্ব্বাত্মক ও সর্ব্বময় হন, তিনিই আবার সর্ব্বোপাধি- বিবর্জিত অনির্দেশ্য, বাহ্যাভ্যন্তররহিত পূর্ণ প্রজ্ঞানঘন, অজ অজর, অমর অভয় অচল এবং ‘নেতি নেতি’ শ্রুতিগম্য অস্থুল অনণু(অণু নহে) ইত্যাদি বিশেষণেও বিশেষিত হন। ৩
কোন কোন তর্কপটু—তার্কিক এবং বেদজ্ঞের ভিতরেও পণ্ডিতম্মন্য(যাঁহারা আপনাকে অসাধারণ পণ্ডিত বলিয়া মনে করেন, এরূপ) কোন কোন ব্যক্তি ইহার প্রকৃত অর্থ বুঝিতে না পারিয়া—অধিকন্তু শাস্ত্রার্থ বিরুদ্ধ হইতেছে মনে করিয়া নানাপ্রকার অসৎ কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করতঃ বিষম ব্যামোহে পতিত হইয়া থাকেন।[প্রকৃতপক্ষে কিন্তু] নিম্নোদ্ধৃত মন্ত্র দুইটিও আমাদের অভি- প্রেত অর্থেরই অনুমোদন করিতেছে; যথা—‘যিনি নিষ্ক্রিয় হইয়াও মনের অপেক্ষা অধিক বেগবান্’, ‘তিনি সক্রিয়ও বটে, অক্রিয়ও বটে’ ইত্যাদি। তৈত্তিরীয় উপনিষদেও এইরূপই আছে—‘বদপেক্ষা উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট কিছু নাই,’ ‘এই সাম গান করিতেছে’ ‘আমি অন্ন, আমি অন্ন, আমি অন্ন’ ইত্যাদি। ছান্দোগ্যেও সেইরূপ দ্বৈতভাবের কথা আছে—‘তিনি হাসিতেছেন, ক্রীড়া করিতেছেন এবং রমণ করিতেছেন’ ‘তিনি যদি পিতৃলোকাভিলাষী হন’, ‘তিনি সর্ব্বগন্ধযুক্ত ও
৬৭৯
সর্ব্বরস-সম্পন্ন,’ ‘যিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্ববিৎ অর্থাৎ সামান্যাকারে ও বিশেষাকারে সমস্ত জানেন’ ইত্যাদি। আথর্ব্বণোপনিষদেও আছে-‘তিনি দূর হইতেও দূরে, আবার নিকট হইতেও নিকটে আছেন’ ইত্যাদি। কঠোপনিষদেও আছে-‘তিনি অণু অপেক্ষাও অতিশয় অণু, আবার মহৎ অপেক্ষাও মহত্তর’ ‘মত্ত ও মত্ততাহীন সেই দেবতাকে[আমি ভিন্ন কে জানিতে পারে?]’ ‘তিনি নিশ্চল হইয়াও ধাবমান অন্য সমস্তকে অতিক্রমণ করেন’ ইতি। এইরূপ ভগবদ্গীতাতেও দ্বৈরূপ্যের কথা আছে; যথা-‘আমিই শ্রৌত ও স্মার্ত্ত যজ্ঞস্বরূপ,’ ‘আমিই এ জগতের পিতা,’ ‘প্রভু(পরমেশ্বর) কাহারও পাপ গ্রহণ করেন না’ ‘সর্ব্বভূতে সমান’ ‘পরস্পর পৃথগ ভাবাপন্ন বস্তুনিচয়েও তিনি অবিভক্ত একরূপ’ ‘তিনিই নিয়ত সকলকে গ্রাস করিয়া থাকেন এবং জন্মাইয়া থাকেন’, এবংবিধ শাস্ত্রগুলির অর্থ বিরুদ্ধবৎ প্রতীয়মান হইতেছে মনে করিয়া এবং নিজ নিজ বুদ্ধিশক্তি অনু- সারে অর্থবিশেষ নির্ণয় করিবার অভিপ্রায়ে নানাপ্রকার কল্পনা করিতে যাইয়া, কেহ কেহ মনে করেন-দেহাদির অতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব আছে, কেহ মনে করেন-নাই; কেহ বলেন-কর্তা, কেহ বলেন-অকর্তা; কেহ বলেন-আত্মা বদ্ধ, আবার কেহ বলেন-আত্মা মুক্ত; কেহ বলেন-আত্মা শুধু বুদ্ধি-বিজ্ঞান মাত্র, আবার কেহ বলেন-শূন্যই আত্মা,(১) ইত্যাদি বহুবিধ কল্পনার আশ্রয় করিতে যাইয়া সর্বত্রই বিরোধ দেখিতে পান; সুতরাং সেই অবিদ্যারও আর কুলকিনারা পান না। অতএব যাঁহারা শ্রুতি ও আচার্য্য-প্রদর্শিত সিদ্ধান্ত-পথের অনুসরণ করিয়া থাকেন, প্রকৃতপক্ষে তাঁহারাই কেবল এই অবিদ্যা-বিভ্রমের পার পাইয়া থাকেন, এবং তাঁহারাই এই অগাধ মোহ-সমুদ্র হইতে উদ্ধার পাইতে সমর্থ হন, কিন্তু নিজ নিজ বুদ্ধিনৈপুণ্যানুসারিগণ কখনই পারেন না ॥ ১৩৫ ॥ ১৫ ॥ ৪৭
(১) তাৎপর্য্য—আত্মার সম্বন্ধে বিরুদ্ধবাদ বহুতর আছে; তন্মধ্যে এখানে যে কয়েকটি মতের উল্লেখ আছে, তাহার সংক্ষিপ্ত পরিচয় এই—দেহেন্দ্রিয়াদির অতিরিক্ত নিত্য সত্য আত্মার অস্তিত্ব আস্তিকমাত্রেই স্বীকার করেন; কিন্তু নাস্তিকেরা তাহা স্বীকার করেন না। নৈয়ায়িকেরা আত্মার কর্তৃত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্তীরা তাহা মানেন না; তাঁহারা বলেন—কর্তৃত্ব ধর্মটি বুদ্ধির, আত্মাতে তাহার আরোপ হয় মাত্র। নৈয়ায়িকেরা আত্মার বাস্তব বন্ধ মোক্ষ স্বীকার করেন, কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্তিগণ আত্মাকে নিত্যমুক্ত বলিয়া স্বীকার করেন। বৌদ্ধদিগের মধ্যে একদল বলেন—অনুভবগোচর বুদ্ধিবিজ্ঞানই আত্মা, তদতিরিক্ত চেতন কোন আত্মা নাই; অন্য দল বলেন—শূন্যই জগতের তত্ত্ব, সেই শূন্যত্বই আত্মার প্রকৃতরূপ ইত্যাদি।
আভাসভাষ্যম্।—পরিসমাপ্তা ব্রহ্মবিদ্যাহমৃতত্বসাধনভূতা, যাং মৈত্রেয়ী পৃষ্টবতী ভর্তারম্—“যদেব ভগবানমৃতত্বসাধনং বেদ, তদেব মে ব্রূহি” ইতি; এতস্যা ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ স্বত্যর্থেয়মাখ্যায়িকা আনীতা। তস্যা আখ্যায়িকায়াঃ সঙ্ক্ষেপতো- হর্থপ্রকাশনার্থাবেতৌ মন্ত্রো ভবতঃ। এবং হি মন্ত্র-ব্রাহ্মণাভ্যাং স্বতত্বাদমৃতত্ব- সর্ব্বপ্রাপ্ত্যাদিসাধনত্বং ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ প্রকটীকৃতং রাজমার্গমুপনীতং ভবতি—যথা আদিত্য উদ্যন্ শার্ব্বরং তমোহপনয়তীতি, তদ্বৎ। ১
অপি চ, এবং স্তুতা ব্রহ্মবিদ্যা—যা ইন্দ্ররাজ-রক্ষিতা, সা দুষ্প্রাপ্যা দেবৈরপি; যম্মাদশ্বিভ্যামপি দেবভিষগ্ভ্যামিন্দ্ররক্ষিতা বিদ্যা মহতায়াসেন প্রাপ্তা। ব্রাহ্মণস্য শিরশ্ছিত্বাশ্ব্যং শিরঃ প্রতিসন্ধায় তস্মিন্নিন্দ্রেণ চিম্নে পুনঃ স্বশির এব প্রতিসন্ধায়, তেন ব্রাহ্মণস্য স্বশিরসৈবোক্তা অশেষব্রহ্মবিদ্যা শ্রুতা। তস্মাত্ততঃ পরতরং কিঞ্চিৎ পুরুষার্থ- সাধনং ন ভূতং ন ভাবি বা, কুত এব বর্তমানমিতি নাতঃ পরা স্তুতিরস্তি। ২
অপি চৈবং স্থূয়তে ব্রহ্মবিদ্যা,—সর্ব্বপুরুষার্থানাং কৰ্ম্ম হি সাধনমিতি লোকে প্রসিদ্ধম্। তচ্চ কৰ্ম্ম বিত্তসাধ্যম্, তেনাশাপি নাস্তি অমৃতত্বস্য। তদ্বিদমমৃতত্বং কেবলয়াত্মবিদ্যয়া কৰ্ম্ম-নিরপেক্ষয়া প্রাপ্যতে; যস্মাৎ কৰ্ম্মপ্রকরণে বক্তুং প্রাপ্তাপি সতী প্রবর্গ্যপ্রকরণে কৰ্ম্মপ্রকরণাদুত্তীর্য্য কৰ্ম্মণা বিরুদ্ধত্বাৎ কেবলসন্ন্যাসসহিতা- ভিহিতা অমৃতত্বসাধনায়; তস্মান্নাতঃ পরং পুরুষার্থসাধনমস্তি। ৩
অপিচৈবং স্তুতা ব্রহ্মবিদ্যা,—সর্ব্বো হি লোকো দ্বন্দ্বারামঃ, “স বৈ নৈব রেমে, তস্মাদেকাকী ন রমতে” ইতি শ্রুতেঃ। যাজ্ঞবল্ক্যো লোকসাধারণোহপি সন্ আত্ম- জ্ঞানবলাৎ ভার্য্যাপুত্রবিত্তাদিসংসাররতিং পরিত্যজ্য প্রজ্ঞানতৃপ্ত আত্মরতির্ব্বভূব। অপি চ, এবং স্তুতা ব্রহ্মবিদ্যা,—যস্মাদ্ যাজ্ঞবল্ক্যেন সংসারমার্গাদ্ব্যুত্তিষ্ঠতাপি প্রিয়ায়ৈ ভার্য্যায়ৈ প্রীত্যর্থমেবাভিহিতা, “প্রিয়ং ভাষসে এহ্যাস্ব” ইতি লিঙ্গাৎ। ৪
টাকা।—তদ্যথেত্যাদিবাক্যার্থং বিস্তরেণোক্তা বৃত্তং কীর্তয়তি—পরিসমাণ্ডেতি। ব্রহ্মবিদ্য পরিসমাপ্তা চেৎ, কিমুত্তরগ্রন্থেনেত্যাশঙ্ক্যাহ—এতস্যা ইতি। ইয়মিতি প্রবর্গ্যপ্রকরণস্থামা- খ্যায়িকাং পরামৃশতি। আনীতা “ইদং বৈ তন্মধিত্যাদিনা ব্রাহ্মণেনেতি শেষঃ। তদেতদূষিরিত্যা দেস্তাৎপর্য্যমাহ—তস্যা ইতি। তদ্বাং নরেত্যাদিরেকো মন্ত্রঃ; আথর্ব্বণায়েত্যাদিরপরঃ মন্ত্রব্রাহ্মণাভ্যাং বক্ষ্যমাণরীত্যা ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ স্ততত্বে কিং সিধ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ—এবং হীতি। তস্য মুক্তিসাধনত্বং দৃষ্টান্তেন স্ফুটয়তি—যখেতি। ১
কেন প্রকারেণ ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ স্তুতত্বং, তদাহ-অপি চেতি। অপি-শব্দঃ স্তাবকব্রাহ্মণ সম্ভাবনার্থঃ। মন্ত্রদ্বয়সমুচ্চয়ার্থশ্চ-শব্দঃ। এবং-শব্দসূচিতং স্তুতিপ্রকারমেব প্রকটয়তি-যদ্রেতি তস্যা দুষ্প্রাপ্যত্বে হেতুমাহ-যস্মাদিতি। মহান্তমায়াসং স্ফুটয়তি-ব্রাহ্মণস্যেতি। কৃতার্থে নাপীন্দ্রেণ রক্ষিতত্বে বিদ্যায়া দৌর্লভ্যে চ ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। ২
৬৮১
ন কেবলমুক্তেনৈব প্রকারেণ বিদ্যা স্তূয়তে, কিন্তু প্রকারান্তরেণাপীত্যাহ—অপি চেতি। ‘তদেব প্রকারান্তরং প্রকটয়তি—সর্ব্বেতি। কেবলয়েত্যস্য ব্যাখ্যানং কর্মনিরপেক্ষয়েতি। তত্র হেতুমাহ—যম্মাদিতি। কিমিতি কৰ্ম্মপ্রকরণে প্রাপ্তাহপি প্রকরণান্তরে কথ্যতে, তত্রাহ— ‘কৰ্ম্মণেতি। প্রসিদ্ধং পূমর্থোপায়ং কৰ্ম্ম ত্যক্ত্বা বিদ্যায়ামেবাদরে তদধিকতা সমধিগতেতি ফলিতমাহ—তম্মাদিতি। ৩
প্রকারান্তরেণ ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ স্তুতিং দর্শয়তি—অপি চেতি। অনাত্মরতিং ত্যক্তাত্মন্যেব রতিহেতুত্বান্ মহতীয়ং বিদ্যেত্যর্থঃ। বিধান্তরেণ তস্যাঃ স্তুতিমাহ—অপি চৈবমিতি। কথং ব্রহ্মবিদ্যা ভার্য্যায়ৈ শ্রীত্যর্থমেবোক্তেতি গম্যতে, তত্রাহ—প্রিয়মিতি। ৪
আভাসভাষ্যানুবাদ।—মৈত্রেয়ী ‘যদেব মে ভগবান্ অমৃতত্ব-সাধনং বেদ, তদেব মে ক্রহি’ ইত্যাদি বাক্যে স্বীয় পতি যাজ্ঞবল্ক্যকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, মুক্তিলাভের উপায়ভূত সেই ব্রহ্মবিদ্যার প্রসঙ্গ এখানেই পরিসমাপ্ত হইল। এই ব্রহ্মবিদ্যার প্রশংসার্থই উক্ত আখ্যায়িকাটির এখানে অবতারণা করা হইয়াছে। সেই আখ্যায়িকাতে যে সমস্ত তত্ত্ব বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে, সংক্ষেপতঃ সেই রহস্য-প্রকাশনার্থ পরবর্তী দুইটি মন্ত্র প্রবৃত্ত হইয়াছে; কারণ, সূর্য্য উদিত হইবামাত্র যেমন নৈশ তমোরাশি নিঃশেষে অপনীত হয়, তেমনি যথোক্ত মন্ত্র ও ব্রাহ্মণবাক্য দ্বারা(১) প্রশংসিত হওয়ায়, কথিত ব্রহ্মবিদ্যার অমৃতত্ব- সাধনত্ব ও সর্ব্বভাবপ্রাপ্তি-হেতুত্ব অত্যন্ত পরিস্ফুট হইবে। ১
অপিচ; এইরূপেও[পরবর্তী মন্ত্রদ্বয়ে] ব্রহ্মবিদ্যার বিশেষ প্রশংসা সাধিত হইতেছে যে, স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র, যে ব্রহ্মবিদ্যাকে গোপনে রক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা দেবগণেরও দুর্লভ; কেন না, দেব-ভিষক্ অশ্বিনীকুমারও ইন্দ্ররক্ষিত এই ব্রহ্মবিদ্যা বিশেষ চেষ্টায় লাভ করিয়াছিলেন। অশ্বিনীকুমার প্রথমতঃ[উপদেষ্টা] ব্রাহ্মণেরই(দধ্যঙ্ আথর্ব্বণ ঋষিরই) শিরশ্ছেদন করিয়া, তাহাতে অশ্বশির সংযো- জিত করিয়া দিয়াছিলেন।[ঋষি সেই অশ্বমুখে এই ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশ করিতে প্রবৃত্ত হইলে পর,] ইন্দ্র আসিরা তাঁহার সেই অশ্বশির কর্তন করিয়া ফেলিলেন; তখন অশ্বিনীকুমার ঋষির নিজ মস্তক পুনঃ যথাযথভাবে সংযোজিত করিয়া
দিলেন। তাহার পর সেই ব্রাহ্মণ(ঋষি) নিজমুখেই সম্পূর্ণ ব্রহ্মবিদ্যা বলিলেন;- তাঁহারাও যথাযথভাবে সেই ব্রহ্মবিদ্যা শ্রবণ করিলেন—যদপেক্ষা উৎকৃষ্টতর মুক্তি- সাধন আর কিছু হয় নাই, হইবে না এবং বর্তমানেও নাই, ইহা অপেক্ষা আর অধিক স্তুতি কি হইতে পারে? ২
পক্ষান্তরে, এই রূপেও ব্রহ্মবিদ্যা প্রশংসিত হইতেছে যে, কর্মই সর্ব্ববিধ পুরুষার্থের(ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের) প্রাপ্তি-সাধন বলিয়া জগতে প্রসিদ্ধ; সেই ধৰ্ম্ম হইতেছে বিত্তসাধ্য; অথচ বিত্ত দ্বারা কখনও সেই অমৃতত্বলাভের আশা নাই; পক্ষান্তরে কর্মনিরপেক্ষ একমাত্র আত্মবিদ্যা(ব্রহ্মবিদ্যা) দ্বারাই যথোক্ত অমৃতত্ব বা মুক্তিলাভ করিতে পারা যায়। বিশেষতঃ যেহেতু কৰ্ম্ম- প্রকরণেই ব্রহ্মবিদ্যার কথাও বলিতে পারা যাইত, কিন্তু কর্মের সহিত ব্রহ্মবিদ্যা নিতান্ত বিরুদ্ধ; সেই জন্যই কর্মপ্রকরণ অতিক্রম করিয়া অমৃতত্ব-লাভের জন্য’ পৃথকভাবে শুদ্ধ সন্ন্যাসের সহিত ব্রহ্মবিদ্যা নিরূপণ করা হইয়াছে। ইহা হইতেও বুঝা যাইতেছে যে, ব্রহ্মবিদ্যা অপেক্ষা পুরুষার্থসিদ্ধির আর উৎকৃষ্ট উপায় নাই। [ইহাও ব্রহ্মবিদ্যা-প্রশংসার অপর কারণ]। ৩
প্রকারান্তরেও ব্রহ্মবিদ্যা প্রশংসিত হইতেছে—জগতের লোকমাত্রই দ্বন্দ্বারাম অর্থাৎ দ্বিতীয় বস্তু লাভে সন্তুষ্ট হইয়া থাকে; ‘আদি পুরুষ কিছুতেই প্রীতি লাভ করিতে পারিলেন না’ ‘সেইজন্য এখনও লোকে একাকী রতি অনুভব করে না’ এই শ্রুতিবাক্যও এবিষয়ে প্রমাণ। যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি সাধারণ সংসারী হইয়াও একমাত্র আত্ম-জ্ঞানের প্রভাবে ভার্য্যাপুত্রাদিময় সংসারের আসক্তি পরিত্যাগ করিয়া, আত্ম-জ্ঞানে তৃপ্ত ও আত্মরতি হইয়াছিলেন। তাহার পর এইভাবেও ব্রহ্মবিদ্যার স্তুতি করা হইল যে, যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি সংসারাশ্রম হইতে যখন প্রব্রজ্যা। গ্রহণ করিতেছেন, তখনও তিনি নিজের প্রিয়তমা ভার্য্যার পূর্ণ তৃপ্তিসাধনের জন্য এই ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ দিয়াছিলেন; কারণ, তাঁহার নিজের উক্তিতেই আছে— ‘মৈত্রেয়ি, তুমি প্রিয় কথা বলিতেছ; এস, নিকটে উপবেশন কর’ ইতি,[লোকে প্রিয়জনকে উত্তম বস্তুই দিয়া থাকে; যাজ্ঞবল্ক্য নিজের প্রিয়তমা ভার্য্যাকে ব্রহ্মবিদ্যা প্রদান করায় বুঝা যাইতেছে যে, এই ব্রহ্মবিদ্যা অতি উত্তম পরমপুরুষার্থ- সাধন; সুতরাং ইহাও ব্রহ্মবিদ্যার প্রশংসার কথা ভিন্ন আর কিছুই নহে]। ৪
ইদং বৈ তন্মধু দধ্যঙাথর্ব্বণোহশ্বিভ্যামুবাচ। তদেতদৃষিঃ পশ্যন্নবোচৎ তদ্বান্নরা সনয়ে দহ্স উগ্রমাবিষ্কর্ণোমি তন্যতুর্ন
বৃষ্টিম্। দধ্যঙ্ হ যন্মধ্বার্থর্ব্বণো বামশ্বস্য শীর্ষা প্র যদীমুবাচেতি ॥ ১৩৬ ॥ ১৬ ॥
সরলার্থঃ।—[ইদানীং যথোক্তমধুবিদ্যায়াঃ স্তুত্যর্থমিয়মাখ্যায়িকাভিধীয়তে “ইদং—বৈ” ইতি।] দধ্যঙ্ আথর্ব্বণঃ(তন্নামক ঋষিঃ) তৎ(পূর্ব্বোক্তং) ইদং বৈ(প্রসিদ্ধং) মধু(মধুবিদ্যাং) অশ্বিভ্যাং(অশ্বিনীকুমার-নামকাভ্যাং দেব-- ভিষগ্ভ্যাম্) উবাচ(উক্তবান্)। ঋষিঃ(মন্ত্রঃ) তৎ এতৎ(বিদ্যোপদেশ- রূপং কৰ্ম্ম) পশ্যন্(জানন্) অবোচৎ।[কিম্? ইত্যাহ—] হে নরাঃ(নরা- কারৌ অশ্বিনৌ), বাং(যুবয়োঃ) সনয়ে(ধনায় মোক্ষফলায় অনুষ্ঠিতং) উগ্রং (ক্রুরং) তৎ(যথাবৃত্তং) দংসঃ তদাখ্যং কৰ্ম্ম তন্যতুঃ(মেঘঃ) বৃষ্টিং(বারি- বর্ষণং) ন(ইব) আবিষ্করণোমি(প্রকাশয়ামি, মেঘো যথা গর্জিতাদিভিঃ বৃষ্টিং প্রকাশয়তি, তথা অহমপি যুবয়োরেতৎ কৰ্ম্ম লোকে প্রকাশয়ামি ইত্যর্থঃ)। [কিং প্রকাশয়িষ্যসি? ইত্যাহ—] দধ্যঙ্ আথর্ব্বণঃ ঋষিঃ যৎ অশ্বস্য শীর্ষা (অশ্বমস্তকেন) বাং(যুবাভ্যাং) মধু(মধুবিদ্যাং) প্রোবাচ(উক্তবান্) ইতি। [অত্র ‘ঈং’ ইতি অনর্থকো নিপাতঃ] ॥ ১৩৬ ॥ ১৬ ॥
মূলানুবাদ।—এই মধুবিদ্যা দধ্যনামক আথর্বণ ঋষি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে বলিয়াছিলেন; মন্ত্ররূপী ঋষি তাহা জানিতে পারিয়া অশ্বিনীকুমারকে বলিলেন,—হে নরাকার অশ্বিনীকুমারদ্বয়, তোমরা যে লাভের জন্য এইরূপ[ঋষির শিরশ্ছেদরূপ] নৃশংস কৰ্ম্ম করিয়াছ; মেঘ যেরূপ গর্জনাদি দ্বারা বারিবর্ষণ সূচনা করিয়া দেয়, তদ্রূপ আমিও বলিয়া দিব যে, দধ্যঙ্ ঋষি অশ্বশির দ্বারা তোমা- দিগকে এই গোপনীয় মধুবিদ্যা বলিয়াছেন ॥ ১৩৬ ॥ ১৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্রেয়ং স্তুত্যর্থা আখ্যায়িকেত্যবোচাম। কা পুনঃ সা আখ্যায়িকা, ইত্যুচ্যতে—ইদমিতি অনন্তরনিদ্দিষ্টং ব্যপদিশতি, বুদ্ধৌ সন্নি- হিতত্বাৎ। বৈ-শব্দঃ স্মরণার্থঃ; তদিত্যাখ্যায়িকানির্বৃত্তং প্রকরণান্তরাভিহিতং পরোক্ষং বৈ-শব্দেন স্মারয়ন্নিহ ব্যপদিশতি। যৎ তৎ প্রবর্গ্যপ্রকরণে সূচিতম্, ন আবিষ্কৃতং মধু, তদিদং মধু ইহানন্তরং নির্দিষ্টম্—ইয়ং পৃথিবীত্যাদিনা। কথং তত্র প্রকরণান্তরে সূচিতং—দধ্যভূ হ বা আভ্যামাথর্ব্বণো মধুনাম ব্রাহ্মণ- মুবাচ। ১
তদনয়োঃ প্রিয়ং ধাম, তদেকৈনমোক্ষোঽপ্যগচ্ছতি। স হোবাচ—ইন্দ্রেশ
বা উক্তোহস্মি-এতচ্চেদন্যস্মৈ অনুক্রয়াঃ, তত এব তে শিরশ্ছিন্দ্যামিতি। তস্মাদ্বৈ বিভেমি; যদ্বৈ মে স শিরোন ছিন্দ্যাৎ, তদ্বামুপনেয্যে ইতি। তৌ হোচতুরাবাং ত্বা তস্মাৎ ত্রাস্যাবহে ইতি। কথং মা ত্রাস্যেথে? ইতি; যদা নাবুপনেষ্যসে, অথ তে শিরশ্ছিত্বা অন্যত্রাহৃত্যোপনিধাস্যাবঃ; অথাশ্বস্য শির আহৃত্য তত্তে প্রতিধাস্যাবঃ; তেন নাবনুবক্ষ্যসি। স যদা নাবনুবক্ষ্যসি, অথ তে তদিন্দ্রঃ শিরচ্ছেৎস্যতি; অথ তে স্বশির আহৃত্য তত্তে প্রতিধাস্যাব ইতি। তথেতি তৌ হোপনিন্যে। তৌ যদোপনিন্যে, অথাস্য শিরশ্ছিত্বান্যত্রোপনিদধতুঃ; অথাশ্বস্য শির আহৃত্য তদ্ধাস্য প্রতিদধতুঃ; তেন হাভ্যামনুবাচ। স যদাভ্যামনুবাচ, অথাস্য তদিন্দ্রঃ শিরশ্চিচ্ছেদ; অথাস্য স্বং শির আহৃত্য তদ্ধাস্য প্রতিদধতুরিতি। যাবত্তু প্রবর্গ্যকৰ্মাঙ্গভূতং মধু, তাবদেব তত্রাভিহিতম্; ন তু কক্ষ্যমাত্মজ্ঞানাখ্যম্। তত্র যা আখ্যায়িকাভিহিতা, সেহ স্তুত্যর্থা প্রদর্শ্যতে-ইদং বৈ তন্মধু দধ্যঙাথর্ব্ব- ণোহনেন প্রপঞ্চেনাশ্বিভ্যামুবাচ। ২
তদেতদূষিঃ-তদেতৎ কৰ্ম্ম, ঋষিঃ মন্ত্রঃ, পশ্যন্ উপলব্ধমানঃ, অবোচদুক্তবান্। কথম্? তদ্দংস ইতি ব্যবহিতেন সম্বন্ধঃ। দংস ইতি কর্মণো নামধেয়ম্; তচ্চ দৎসঃ কিংবিশিষ্টম্? উগ্রং ক্রুরম্; বাৎ যুবয়োঃ; হে নরা নরাকারৌ অশ্বিনৌ। তচ্চ কৰ্ম্ম কিস্নিমিত্তম্? সনয়ে লাভায়; লাভলুব্ধো হি লোকেহপি ক্রুরং কৰ্ম্ম আচরতি, তথৈব এতাবুপলভ্যেতে, যথা লোকে। তৎ আবিঃ প্রকাশং কৃণোমি করোমি, যদ্ রহসি ভবদ্ভ্যাং কৃতম্। কিমিবেত্যুচ্যতে-তন্যতুঃ পর্জন্যঃ, ন ইব, নকারস্তু পরিষ্টাদুপচার উপমার্থীয়ো বেদে, ন প্রতিষেধার্থঃ; যথাশ্বং ন-অশ্ব- মিবেতি যদ্বৎ; তন্যতুরিব বৃষ্টিং-যথা পর্জন্যো বৃষ্টিং প্রকাশয়তি স্তনয়িত্বাদিশব্দৈঃ, তদ্বদহং যুবয়োঃ ক্রুরং কৰ্ম্ম আবিষ্করণোমি ইতি সম্বন্ধঃ। ৩
ননু অশ্বিনোঃ স্তুত্যর্থো কথমিমৌ মন্ত্রৌ স্যাতাম্, নিন্দাবচনৌ হি ইমৌ? নৈষ দোষঃ; স্তুতিরেবৈষা, ন নিন্দাবচনৌ। যম্মাদীদৃশমপ্যতিক্রুরং কৰ্ম্ম কুর্ব্বতোঃ যুবয়োর্ন লোম চ হীয়ত ইতি; ন চান্যৎ কিঞ্চিদ্ধীয়তে এবেতি স্তুতাবেতৌ ভবতঃ। নিন্দাৎ প্রশংসাং হি লৌকিকাঃ স্মরন্তি; তথা প্রশংসারূপা চ নিন্দা লোকে প্রসিদ্ধা। দধ্যনামাথর্ব্বণঃ-হ ইতি অনর্থকো নিপাতঃ; যৎ মধু কক্ষ্য- মাত্মজ্ঞানলক্ষণম্, আথর্ব্বণো বাং যুবাভ্যামশ্বস্য শীর্ষা শিরসা প্র যৎ ইম্ উবাচ- যং প্রোবাচ মধু। ঈম্-ইতি অনর্থকো নিপাতঃ ॥ ১৩৬ ॥ ১৬ ॥
টীকা।—আখ্যায়িকায়াঃ স্তত্যর্থত্বং প্রতিপাদ্য বৃত্তমনুদ্যাকাঙ্গাপূর্ব্বকং তামবতার্য্য ব্যাকরোভি—তত্রেত্যাদিনা। ব্রহ্মবিদ্যা সপ্তম্যর্থঃ। পদার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ—যদিতি।
৬৮৫
দধ্যঙ্ভিত্যাদি ব্যাকুর্ব্বন্নাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকং প্রবর্গ্যপ্রকরণস্থামাখ্যায়িকামনুকীর্ত্তয়তি—কথমিত্য- দিনা। আদ্যামশ্বিভ্যামিতি যাবৎ। ১
কেন কারণেনোবাচেত্যপেক্ষায়ামাহ-তদেনয়োরিতি। এনয়োরশ্বিনোস্তন্মধু প্রীত্যাস্পদ- মাসীৎ, তদ্বশাতাভ্যাং প্রার্থিতো ব্রাহ্মণস্তদুবাচেত্যর্থঃ। যদশ্বিভ্যাং মধু প্রার্থিতং, তদেতেন বক্ষ্য- মাণেন প্রকারেণ প্রযচ্ছন্নেবৈনয়োরশ্বিনোরাচার্য্যত্বেন ব্রাহ্মণঃ সমীপগমনং কৃতবানিত্যাহ- তদেবেতি। আচার্য্যত্বানন্তরং ব্রাহ্মণস্য বচনং দর্শয়তি-স ‘হোবাচেতি। এতচ্ছব্দো মধ্বনুভব- বিষয়ঃ। যদ্যর্থো যচ্ছব্দঃ। তচ্ছব্দস্তহীত্যর্থঃ। বাং যুবামুপনেষ্যে শিষ্যত্বেন સ્વીকরিয্যামীতি যাবৎ। তৌ দেবভিষজাবশ্বিনৌ শিরচ্ছেদনিমিত্তং মরণং পঞ্চমার্থঃ। নাবাবামুপনেষ্যসে শিষ্যত্বেন স্বীকরিষ্যসি যদেতি যাবৎ। অথ-শব্দস্তদেত্যর্থঃ। ব্রাহ্মণস্যানুজ্ঞানন্তর্য্যমথেত্যুক্তম্। মধু- প্রবচনানন্তর্য্যং তৃতীয়স্যাথশব্দস্যার্থঃ। যদশ্বস্য শিরো ব্রাহ্মণে নিবদ্ধং, তস্য চ্ছেদনানন্তর্য্যং চতুর্থস্যাথশব্দস্যার্থঃ। তর্হি সমস্তমপি মধু প্রবর্গ্যপ্রকরণে প্রদর্শিতমেবেতি কৃতমনেন ব্রাহ্মণে- নেত্যাশক্যাহ-যাবস্থিতি। প্রবর্গ্যপ্রকরণে স্থিতাখ্যায়িকা কিমর্থমত্রানীতেত্যাশঙ্ক্য তস্য ব্রহ্ম- বিদ্যায়াঃ স্তুত্যর্থেয়মাখ্যায়িকেত্যত্রোক্তমুপসংহরতি-তত্রেতি। ব্রাহ্মণভাগব্যাখ্যাং নিগময়তি- ইদমিতি। ২
তদ্বামিত্যাদিমন্ত্রমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-তদেতদিতি। কথং লাভায়াপি ক্রুরকর্মানুষ্ঠানমত আহ- লাভেতি। ননু প্রতিষেধে মুখ্যো নকারঃ কথমিবার্থে ব্যাখ্যায়তে, তত্রাহ-নকারস্থিতি। বেদে পদাদুপরিষ্টাদ্ যো নকারঃ শ্রুতঃ, স খলূপচারঃ সম্নুপমার্থোহপি সম্ভবতি, ন নিষেধার্থ এবেত্যর্থঃ। তন্ত্রোদাহরণমাহ-যথেতি। অশ্বং ন গূঢ়মশ্বিনেত্যত্র নকারো যথোপমার্থীয়স্তথা প্রকৃতেহ- পীত্যর্থঃ। তদেব স্পষ্টরতি-অশ্বমিবেতি যদ্বদিতি। উপমার্থীয়ে নকারে সতি বাক্যস্বরূপমনুষ্য তদর্থং কথয়তি-তন্যতুরিত্যাদিনা। ৩
বিদ্যাস্ততিদ্বারা তদ্বন্তাবশ্বিনাবত্র ন স্তূরেতে, কিং তু ক্রুরকর্মকারিত্বেন নিন্দ্যেতে, তদা চাখ্যায়িকা বিদ্যাস্তত্যর্থেত্যযুক্তমিতি শঙ্কতে-নন্বিতি। আখ্যায়িকায়া বিদ্যাস্তত্যর্থত্বমবিরুদ্ধ- মিতি পরিহরতি-নৈষ ইতি। লোমমাত্রমপি ন হীয়ত ইতি যস্মাৎ, তস্মাদ্বিদ্যাস্তত্যা তদ্বতোঃ স্তুতিরেবাত্র বিবক্ষিতেতি যোজনা। যদ্যপি ক্রুরকর্মকারিণোরস্বিনোর্ দৃষ্টহানিস্তথাহপ্যদৃষ্টহানিঃ স্যাদেবেত্যাশঙ্ক্য কৈমুতিকন্যায়েনাহ-ন চেতি। কথং পুনর্নিন্দায়াং দৃশ্যমানায়াং স্তুতিরিষ্যতে, তত্রাহ-নিন্দামিতি। নহি নিন্দা নিন্দ্যং নিন্দিতুমপি তু বিধেরং স্তোতুমিতি ন্যায়াদিত্যর্থঃ। যথা নিন্দা ন নিন্দ্যং নিন্দিতুমেব, তথা স্তুতিরপি স্তুত্যং স্তোতুমেব ন ভবতি, কিন্তু নিন্দিতুমপি; তথা চ নানয়োর্ব্ববস্থিতত্বমিত্যাহ-তথেতি। তদ্বামিত্যাদিমন্ত্রস্য পূর্বার্দ্ধং ব্যাখ্যায়াখ্যায়িকায়াঃ স্তুত্যর্থত্ববিরোধং চোধৃত্যোত্তরার্দ্ধং ব্যাচষ্টে-দধ্যনামেতি। যৎ কক্ষ্যং জ্ঞানাখ্যং মধু, তদাথর্ব্বণো যুবাভ্যামন্বস্থ শিরসা প্রোবাচ। যচ্চাসৌ মধু যুবাভ্যামুক্তবাংস্তদহমাবিষ্করণোমীতি সম্বন্ধঃ। ১৩৬। ১৬।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, এই আখ্যায়িকাটি মধুবিদ্যার প্রশংসার্থ প্রস্তুত হইয়াছে। সেই আখ্যায়িকাটি কি, তাহা এখন বলা হইতেছে— শ্রুতির ‘ইদং’ শব্দটি অব্যবহিত পূর্ব্বোক্ত বিষয়ের নির্দেশ করিতেছে; কারণ,
‘তাহাই বুদ্ধিস্থ; ‘বৈ’ শব্দটি স্মরণার্থক; অর্থাৎ অন্যপ্রকরণোক্ত দূরবর্তী যে বিষয়টি স্বতন্ত্র আখ্যায়িকায় বর্ণিত হইয়াছে, এখানে ‘বৈ’ শব্দে তাহাই স্মরণ করাইয়া দিতেছে। প্রবর্গ্যপ্রকরণে যে মধু কেবল সূচিতমাত্র হইয়াছে— স্পষ্ট কথায় অভিহিত হয় নাই, অব্যবহিত পূর্ব্বোক্ত মধুব্রাহ্মণে তাহাই “ইয়ং পৃথিবী” ইত্যাদিবাক্যে বিস্পষ্টরূপে কথিত হইয়াছে। সেই প্রবর্গ্যপ্রকরণেই বা এই মধুবিদ্যা বিজ্ঞাপিত হইয়াছে কিরূপে, অর্থাৎ দধ্যঙ আপর্বণ ঋষি কি কারণে অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে এই মধুব্রাহ্মণ অর্থাৎ মধুবিদ্যা বলিয়াছিলেন,[তাহা বলা হইতেছে]। ১
এই মধুব্রাহ্মণ অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের বড়ই প্রিয়। দধ্যঙ আথর্ব্বণ ঋষি বক্ষ্য- মাণ প্রণালীতে তাঁহাদিগকে সেই বিদ্যা দান করিবার জন্য আচার্য্যরূপে তাঁহাদের সমীপে উপস্থিত হইয়াছিলেন;[তিনি তাহাদের প্রার্থনা শুনিয়া] বলিলেন-দেবরাজ ইন্দ্র আমাকে আদেশ করিয়াছেন যে, আপনি যদি এই বিদ্যা অপর কাহাকেও প্রদান করেন, তাহা হইলে আমি নিশ্চয়ই আপনার শিরশ্ছেদন করিব; সেই কারণে আমি ভীত হইতেছি। তিনি যদি আমার শিরশ্ছেদন না করেন, তাহা হইলে, আমি তোমাদিগকে উপদেশ দিতে পারি।[এ কথা শুনিয়া] অশ্বিনীকুমারদ্বয় বলিলেন-আমরা আপ- নাকে ইন্দ্রের নিকট হইতে রক্ষা করিব।[ঋষি জিজ্ঞাসা করিলেন,] কিরূপে রক্ষা করিবে?[তাঁহারা বলিলেন,] আপনি যে সময় আমাদিগকে উপদেশ দিবেন, সে সময় আমরা আপনার এই মস্তক কর্তন করিয়া অন্যত্র রাখিয়া দিব, এবং অশ্বের মস্তক আনিয়া আপনার গলদেশে লাগাইয়া দিব; আপনি সেই অশ্বমুখে আমাদিগকে উপদেশ করিবেন। আপনি সেই মুখে যখন আমাদিগকে উপদেশ দিবেন, তখন নিশ্চয়ই ইন্দ্র আপনার সেই মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিবেন; আমরা তাহার পর আপনার নিজ মস্তক আনিয়া সংযো- জিত করিয়া দিব।[তিনি] তথাস্তু বলিয়া তাঁহাদিগকে উপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি যখন তাঁহাদিগকে উপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হইলেন, তখন তাঁহারা ইহার মস্তকটি ছেদন করিয়া অন্যত্র রাখিয়া দিলেন, এবং একটি অশ্বমস্তক আনিয়া তাহাতে লাগাইয়া দিলেন; ঋষি সেই অশ্বশিরের সাহায্যে তাঁহাদিগকে উপদেশ দিতে লাগিলেন। তিনি যখন অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে উপদেশ দিতে- ছিলেন, সেই সময় ইন্দ্র তাঁহার মস্তক ছেদন করিলেন; তাহার পর অশ্বিনীকুমার- দ্বয় তাঁহার নিজের মস্তক আনিয়া লাগাইয়া দিলেন ইতি। ১
৬৮৭
এই মধুবিদ্যার যতটুকু অংশ প্রবর্গ্য ক্রিয়ার অঙ্গ, কেবল ততটুকুই সেখানে কথিত হইয়াছে; কক্ষ্য অর্থাৎ আত্মজ্ঞানাত্মক মধুর কথা কিছুই বলা হয় নাই। [বুঝিতে হইবে যে,] সেখানে যে আখ্যায়িকা প্রদত্ত হইয়াছে, এখানে কেবল মধুবিদ্যার প্রশংসার্থই সে কথার উল্লেখ করিয়া জানান হইতেছে যে, দধ্যঙ্ আথর্ব্বণ ঋষি এইরূপ প্রণালীতে এই মধুবিদ্যা অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে বলিয়া- ছিলেন। ২
“তদেতৎ ঋষিঃ”—‘তৎ এতৎ’ অর্থ—উল্লিখিত কার্য্য। এখানে ঋষি অর্থ মন্ত্র; মন্ত্ররূপী ঋষি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কর্তৃক অনুষ্ঠিত এই কর্ম্ম দর্শন করত—অনুভব করিয়া বলিয়াছিলেন। কি প্রকার? ‘দংস’ শব্দটি কর্ম্মের সংজ্ঞা; এবং ব্যবহিত কর্ম্মের সহিত ইহার সম্বন্ধ। সেই ‘দংস’ কার্য্যটি কি প্রকার? না, উগ্র— ক্রুর অর্থাৎ অত্যন্ত হিংসাত্মক। সেই কর্ম্মের উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য—লাভ; লোকে লাভের প্রত্যাশায় অতি গর্হিত কর্ম্মও করিয়া থাকে, ইহাদের দুইজনকেও ঠিক সেই রূপই দেখিতেছি। হে নর অর্থাৎ মনুষ্যাকৃতি অশ্বিনীকুমারদ্বয়, তোমা- দের অনুষ্ঠিত এই নৃশংসকর্ম্ম আমি প্রকাশ করিয়া দিতেছি,—তোমরা গোপনে যে কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ। কাহার ন্যায়,—মেঘ যেমন গর্জনাদি দ্বারা অবি- জ্ঞাত বৃষ্টির সংবাদ প্রকাশ করিয়া দেয়, তেমনি আমিও তোমাদের সেই গোপনে অনুষ্ঠিত ক্রুর কর্ম্মের কথা প্রকাশ করিয়া দিতেছি। শ্রুতির ‘ন’ শব্দটি ‘ইব’ স্থানীয়(সাদৃশ্যার্থক); যেমন ‘অশ্বং ন’ বলিলে অশ্বসদৃশ বুঝায়, তদ্রূপ। ৩
ভাল, জিজ্ঞাসা করি, এই মন্ত্র দুইটি অশ্বিনীকুমারের প্রশংসাসূচক হইল কিরূপে? বরং নিন্দার্থক বলিয়াই ত মনে হইতেছে? না,-এ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, এই দুইটি মন্ত্র স্তুতিবাচকই বটে,-নিন্দাবাচক নহে; যেহেতু এখানে বলা হইয়াছে যে, ঈদৃশ ক্রুর কৰ্ম্ম করিলেও তোমাদের উভয়ের একটি লোমও নষ্ট হয় নাই; সুতরাং আর কিছু অনিষ্ট ত হয়ই নাই; অতএব এইরূপ অশ্বিনীকুমারের স্তুতিতেই মন্ত্রদুইটিরও বিনিয়োগ বুঝা যাইতেছে। ব্যবহারাভিজ্ঞ লোকেরা নিন্দাকেও স্তুতিরূপে গ্রহণ করিয়া থাকেন; আবার প্রশংসা-বিশেষকেও সময়ে সময়ে নিন্দাত্মক বলিয়া মনে করেন। দধ্যঙ্-নামক আর্থর্ব্বণ ঋষি অশ্ব- মস্তক দ্বারা তোমাদিগকে যে, গোপনীয় আত্মজ্ঞানরূপ মধু সম্পূর্ণরূপে বলিয়াছেন, [তাহা আমি প্রকাশ করিয়া দিব]। শ্রুতির ‘হ’ পদটি অর্থহীন ‘নিপাত’ শব্দ; ‘ঈম’ পদটিও অর্থহীন নিপাত শব্দ ॥ ১৩৬॥ ১৬॥
ইদং বৈ তন্মধু দধ্যঙাথর্ব্বণোহশ্বিভ্যামুবাচ। তদেতদূষিঃ পশ্যন্নবোচৎ। আথর্ব্বণায়াশ্বিনা দধীচেহশ্ব্যশিরঃ প্রত্যৈরয়তম্। স বাং মধু প্রবোচদৃতায়ন্ ত্বাষ্ট্রং যদ্দস্রাবপি কক্ষ্যং বামিতি ॥১৩৭ ॥ ১৭ ॥
সরলার্থঃ।—[অস্মিন্নর্থে পুনরপি মন্ত্রান্তরমুচ্যতে—“ইদং বৈ” ইত্যাদি]। দধ্যং আথর্ব্বণঃ[তন্নামা ঋষিঃ] ইদং মধু[আত্মজ্ঞানং] অশ্বিভ্যাম্ উবাচ। ঋষিঃ (মন্ত্রঃ) তৎ এতৎ(অশ্বিনীকুমারকৃতং কর্ম্ম) পশ্যন্(উপলভমানঃ সন্) অবোচৎ (অশ্বিনীকুমারৌ উক্তবান্)—হে অশ্বিনৌ,[যুবাং] আথর্ব্বণায়(অথর্ব্ববেদবিদে) দধীচে(তন্নায়ে ঋষয়ে) অশ্ব্যৎ(অশ্বসম্বন্ধি) শিরঃ(মস্তকং) প্রত্যৈরয়তৎ (সংযোজিতবস্তৌ)। দস্রো(হে ক্রুরকর্ম্মাণৌ অশ্বিনৌ), সঃ(অশ্বশিরঃসম্পন্নঃ দধ্যঋষিঃ) ঋতায়ন্(প্রতিশ্রুতং পালয়ন্) বাং(যুবাভ্যাং) কক্ষ্যৎ(গোপনীয়ম্— অবচনীয়ম্ অপি) ত্বাষ্ট্রং(আদিত্যসম্বন্ধি প্রবর্গ্যকর্ম্মাদভূতং) মধু প্রবোচৎ (উক্তবান্) ইতি॥ ১৩৭॥ ১৭॥
মূলানুবাদ।-দধ্যঙ্ আথর্বণ ঋষি এই মধুবিদ্যা অশ্বিনী- কুমারদ্বয়কে বলিয়াছিলেন। স্বয়ং মন্ত্ররূপী ঋষি অশ্বিনীকুমারের তথাবিধ নৃশংস কৰ্ম্ম দর্শন করিয়া বলিয়াছিলেন-হে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, তোমরা আথর্বণ দধ্যঙ্ ঋষির জন্য অশ্বশির সংযোজিত করিয়া দিয়াছ; হে দস্র(অশ্বিনীকুমারদ্বয়), তিনি স্বীয় অঙ্গীকার প্রতিপালনের জন্য, তোমরা অযোগ্য হইলেও তোমাদিগকে গোপনীয় আদিত্যসম্বন্ধী মধু- বিদ্যা উপদেশ দিয়াছেন।[ইহা আমি প্রকাশ করিয়া দিব]॥ ১৩৭ ॥ ১৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদং বৈ তন্মধু ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ মন্ত্রান্তরপ্রদর্শনার্থম্। তথা অন্যো মন্ত্রস্তামেবাখ্যায়িকামনুসরতি স্ম। আথর্ব্বণঃ দধ্যঙ্ নাম—আথর্ব্বণোহ- ন্যোবিদ্যতে—ইত্যতো বিশিনষ্টি—দধ্যঙ্নাম আথর্ব্বণঃ; তস্মৈ দধীচে আথর্ব্ব- ণায়—; হে অশ্বিনাবিতি মন্ত্রদৃশো বচনম্। ১
অশ্যম্ অশ্বস্য স্বভূতং শিরঃ, ব্রাহ্মণস্য শিরসি ছিন্নে অশ্বস্য শিরশ্ছিত্বা-ঈদৃশ- মতিক্রুরং কৰ্ম্ম কৃত্বা অন্যৎ শিরো ব্রাহ্মণং প্রতি ঐরয়তং গমিতবস্তৌ যুবাম্। সচ আথর্ব্বণো বাং যুবাভ্যাং তন্মধু প্রবোচৎ, যৎ পূর্ব্বং প্রতিজ্ঞাতং-বক্ষ্যামীতি।
৬৮৯
স কিমর্থমেবং জীবিতসন্দেহমারুহ্য প্রবোচদিত্যুচ্যতে-ঋতায়ন্-যৎ পূর্ব্বং প্রতিজ্ঞাতং সত্যং, তৎ পরিপালয়িতুমিচ্ছন্; জীবিতাদপি হি সত্যধৰ্ম্মপরিপালনা গুরুতরেত্যেতস্য লিঙ্গমেতৎ। ২
কিং তন্মধু প্রবোচদিত্যুচ্যতে-ত্বাষ্ট্রম্; ত্বষ্টা আদিত্যঃ, তস্য সম্বন্ধি-যজ্ঞস্য শিরশ্ছিন্নং ত্বষ্টাহভবৎ; তৎপ্রতিসন্ধানার্থং প্রবর্গ্যং কৰ্ম্ম। তত্র প্রবর্গ্যকৰ্মাঙ্গভূতং যদ্বিজ্ঞানং, তৎ ত্বাষ্ট্রং মধু-যজ্ঞস্য শিরশ্ছেদন-প্রতিসন্ধানাদিবিষয়ং দর্শনম্, তৎ ত্বাষ্ট্রং যন্মধু; হে দস্ত্রৌ দস্রাবিতি পরবলানাম্ উপক্ষপয়িতারৌ শত্রুণাং বা হিংসি- তারৌ। অপি চ, ন কেবলং ত্বাষ্ট্রমেব মধু কৰ্ম্মসম্বন্ধি যুবাভ্যামবোচৎ; অপি চ কক্ষ্যং গোপ্যং রহস্যং পরমাত্মসম্বন্ধি যদ্বিজ্ঞানং মধু-ব্রাহ্মণেনোক্তম্ অধ্যায়দ্বয়- প্রকাশিতম্, তচ্চ বাং যুবাভ্যাং প্রবোচদিত্যনুবর্ত্ততে ॥ ১৩৭ ॥ ১৭ ॥
টীকা।—সমানার্থত্বে কিমিতি পুনরুচ্যতে, তত্রাহ—মন্ত্রান্তরেতি। তুল্যার্থস্য ব্রাহ্মণস্য তাৎপর্য্যমাহ—তথেতি। বিশেষণকৃত্যং দর্শয়ন্ ব্যাকরোতি—দধ্যনামেতি। প্রথমমধ্যমিত্যাদি- পদার্থবচনমন্বস্তেত্যাদৌ ছিত্ত্বেত্যস্য কর্ম্মোক্তিঃ অন্যং শির ইত্যত্র ত্বন্বয়ার্থমুক্তমিতি বিভাগঃ। প্রেক্ষাপূর্ব্বকারিণামীদৃশী প্রবৃত্তিরযুক্তেতি শঙ্কিত্বা সমাধত্তে—স কিমর্থমিতি। ঋতায়ন্নিত্যত্রার্থ- সিদ্ধমর্থং কথয়তি—জীবিতাদপীতি। ১—২
“যজ্ঞস্য শিরোহচ্ছিদ্যত, তে দেবা অশ্বিনাবক্রবন্ ভিষজৌ বৈস্থ ইদং যজ্ঞস্য শিরঃ প্রতিধত্তম্” ইত্যাদিশ্রুত্যন্তরমাশ্রিত্যাহ—যজ্ঞস্যেত্যাদিনা। প্রবর্গ্যকর্মণ্যেবং প্রবৃত্তেহপি প্রকৃতে বিজ্ঞানে কিমায়াতং, তদাহ—তত্রেতি। উক্তমেব সংগৃহ্নাতি—যজ্ঞস্যেতি। যদ্যথোক্তং দর্শনং, তত্ত্বাষ্ট্রং মধু, যচ্চ তন্মধু তৎপ্রবোচদিতি সম্বন্ধঃ। অধ্যায়দ্বয়প্রকাশিতং তৃতীয়চতুর্থাভ্যামধ্যায়াভ্যাং প্রকটিতমিতি যাবৎ। ১৩৭। ১৭।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বের ন্যায় আরও একটি মন্ত্র-প্রদর্শনার্থ ‘ইদং বৈ তৎ মধু’ ইত্যাদি বাক্য উপদিষ্ট হইতেছে। পূর্ব্বের ন্যায় অপর একটি মন্ত্রও পূর্ব্বকথিত আখ্যায়িকারই অনুসরণ করিতেছে। অথর্ব্ববেদজ্ঞ আরও ঋষি আছেন; এইজন্য আথর্ব্বণ ঋষিকে দধ্যঙ্ নামে বিশেষিত করা হইয়াছে। হে অশ্বিনৌ, এই সম্বোধনটি মন্ত্রদ্রষ্টার উক্তি। ১
‘অশ্ব্য’ অর্থ—অশ্বের নিজস্ব অর্থাৎ অশ্বসম্বন্ধী মস্তক; হে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, তোমরা উভয়ে যে, সেই ব্রাহ্মণের শিরশ্ছেদনের পর অশ্বের শির ছেদন করিয়া— এবংবিধ অতিশয় নৃশংসকর্ম্ম করিয়া সেই দধ্যঙ্ ঋষিকে অশ্বশিরে সংযোজিত করিয়াছ; এবং তিনিও যে, তোমাদিগকে সেই পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাত মধুবিদ্যা বলিয়া- ছেন। তিনি যে, এইরূপ জীবনসংশয় দশায় উপস্থিত হইয়াও ঐ বিদ্যা বলিয়াছেন, তাহার কারণ কি? কারণ বলা হইতেছে—‘ঋতায়ন্’ অর্থাৎ পূর্ব্বে যে, উপদেশ
দিবার জন্য প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক সত্য করিয়াছিলেন, সেই অঙ্গীকৃত সত্য পরিপালনের জন্য[বলিয়াছিলেন]। সত্যরক্ষা করা যে, জীবনাপেক্ষাও অধিক গুরুতর, এই ঘটনায় তাহাই সূচিত হইল। ২
তিনি কোন্ মধুর কথা বলিয়াছিলেন, তাহা বলিতেছেন—‘ত্বাষ্ট্রম্’ ইতি, ত্বষ্টা অর্থ আদিত্য; তৎসম্পর্কিত কৰ্ম্ম—ত্বাষ্ট্র। কোন এক সময় ত্বষ্টা আদিত্য যজ্ঞমূর্ত্তির শিরশ্ছেদন করিয়াছিলেন, তাহার সেই ছিন্ন শির সংযোজনের জন্য ‘প্রবর্গ্য’ নামক কর্ম্মের সৃষ্টি হয়; সেই প্রবর্গ্যকর্ম্মের অঙ্গস্বরূপ যে বিজ্ঞান, তাহারই নাম ত্বাষ্ট্র মধু;—যজ্ঞমূর্ত্তির ছিন্ন শির সংযোজনাদি-বিষয়ক বিজ্ঞানাত্মক যে ত্বাষ্ট্র মধু,[তিনি তাহা বলিয়াছিলেন]। হে দস্রদ্বয় অর্থাৎ রিপুবলক্ষয়- কারিন্—শত্রুসংহারকদ্বয়, তোমাদিগকে যে, তিনি কেবল ত্বাষ্ট্র মধুই বলিয়াছেন, তাহা নহে, পরন্তু অতীত দুই অধ্যায়ে ব্রাহ্মণদ্বারা পরমাত্মসম্বন্ধী যে গোপনীয় রহস্যাত্মক মধুবিজ্ঞান উক্ত হইয়াছে, তাহাও তিনি তোমাদের দুইজনকে বলিয়া- ছেন। এখানে ‘প্রবোচৎ’ ক্রিয়াপদটি না থাকিলেও পূর্ব্ববাক্য হইতে আনীত হইয়াছে ॥ ১৩৭ ॥ ১৭ ॥
ইদং বৈ তন্মধু দধ্যঙাথর্ব্বণোহশ্বিভ্যামুবাচ। তদেতদূষিঃ পশ্যন্নবোচৎ—পুরশ্চক্রে দ্বিপদঃ পুরশ্চক্রে চতুষ্পদঃ। পুরঃ স পক্ষী ভূত্বা পুরঃ পুরুষ আবিশদিতি। স বা অয়ং পুরুষঃ সর্ব্বাসু পূর্ষু পুরি শয়ো নৈনেন কিঞ্চনানাবৃতং নৈনেন কিঞ্চনা- সংবৃতম্ ॥ ১৩৮॥ ১৮॥
সরলার্থঃ।—[পুনরপি প্রপঞ্চার্থং মন্ত্রান্তরমুচ্যতে—‘ইদং বৈ তন্মধু’ ইত্যাদি]। আথর্ব্বণঃ দধ্যঙ্(তন্নামক ঋষিঃ) ইদং বৈ মধু অশ্বিভ্যাম্ উবাচ; ঋষিঃ(মন্ত্রঃ) তৎ এতৎ(কর্ম্ম) পশ্যন্ অবোচৎ—সঃ(পরমেশ্বরঃ) দ্বিপদঃ (পদদ্বয়যুক্তাঃ) পুরঃ(পুরাণি শরীরাণি) চক্রে, চতুষ্পদঃ(পদচতুষ্টয়যুক্তাঃ) পুরঃ(পুরাণি) চক্রে; সঃ পুরুষঃ(পরমেশ্বরঃ) পুরঃ(প্রথমং) পক্ষী(লিঙ্গ- শরীরং) ভূত্বা পুরঃ(নানাশরীরাণি) আবিশৎ(প্রবিবেশ) ইতি। সঃ বৈ অয়ং(পরমেশ্বরঃ) সর্ব্বাসু পূর্ব্ব(শরীরেষু) পুরিশয়ঃ(হৃদয়পুণ্ডরীকে পুরে শয়ানঃ—অভিব্যক্তঃ সন্)[পুরুষ উচ্যতে]। এনেন(এতেন পুরুষেণ) অনাবৃতং (অনাচ্ছাদিতং) কিঞ্চন(কিঞ্চিদপি) ন; এনেন অসংবৃতং(অন্তরননুপ্রবিষ্টম্) কিঞ্চন ন,[অন্তর্বহিশ্চ সর্ব্বমনেন সম্বদ্ধমিত্যাশয়ঃ] ॥ ১৩৮॥ ১৮॥
৬৯১
মূলানুবাদ:-অথর্ববেদজ্ঞ দধ্যঋষি অশ্বিনীকুমারকে সেই মধুবিদ্যা বলিয়াছিলেন; মন্ত্ররূপী ঋষিতাহ দর্শন করিয়া বলিয়াছিলেন।- সেই পুরুষ(পরমেশ্বর) প্রথমে দ্বিপদযুক্ত শরীরসমূহ নির্মাণ করিয়াছিলেন; এবং চতুষ্পদযুক্ত শরীরসমূহ রচনা করিয়াছিলেন; তিনিই আবার পক্ষী- লিঙ্গশরীরাত্মক হইয়া সমস্ত শরীরে প্রবেশ করিয়াছিলেন। এই সেই পরমেশ্বর যেহেতু সমস্ত শরীরে এবং সমস্ত পুরে-হৃদয়পুণ্ডরীকমধ্যে অবস্থান করেন; সেই হেতু ‘পুরুষ’ নামে(অভিহিত) হন; কোন বস্তুই ইহা দ্বারা অনাচ্ছাদিত(অব্যাপ্ত) নাই; কোন বস্তুই ইহা দ্বারা অসংবৃত-অভ্যন্তরে অপ্রবিষ্ট নাই, অর্থাৎ জগতে এমন কোনও পদার্থ নাই, যাহা ভিতরে ও বাহিরে ইহা দ্বারা পরিব্যাপ্ত নয় ॥ ১৩৮৷ ১৮ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদং বৈ তৎ মধ্বিতি পূর্ব্ববৎ। উক্তৌ দ্বৌ মন্ত্রৌ প্রবর্গ্যসম্বন্ধ্যাখ্যায়িকোপসংহর্তারৌ; দ্বয়োঃ প্রবর্গ্যকর্মার্থয়োরধ্যায়য়োরর্থ আখ্যা- রিকাভূতাভ্যাং মন্ত্রাভ্যাং প্রকাশিতঃ; ব্রহ্মবিদ্যার্থয়োত্তধ্যায়য়োরর্থ উত্তরাভ্যা- মৃগ্ভ্যাং প্রকাশরিতব্যঃ—ইত্যতঃ প্রবর্ত্ততে। যৎ কক্ষ্যং চ মধু উক্তবান্ আথর্ব্বণো যুবাভ্যামিত্যুক্তম্; কিং পুনস্তন্মধু ইত্যুচ্যতে—।
পুরশ্চক্রে-পুরঃ পুরাণি শরীরাণি-যত ইয়মব্যাকৃত-ব্যাকরণপ্রক্রিয়া-স পরমেশ্বরঃ, নামরূপে অব্যাকৃতে ব্যাকুর্ব্বাণঃ প্রথমং ভূরাদীন্ লোকান্ সৃষ্ট্বা চক্রে কৃতবান্-দ্বিপদঃ দ্বিপাদুপলক্ষিতানি মনুষ্যশরীরাণি পক্ষিশরীরাণি; তথা পুরঃ শরীরাণি চক্রে চতুষ্পদঃ চতুষ্পাদুপলক্ষিতানি পশুশরীরাণি; পুরঃ পুরস্তাৎ, স ঈশ্বরঃ পক্ষী লিঙ্গশরীরং ভূত্বা পুরঃ শরীরাণি পুরুষ আবিশদিত্যস্যার্থমাচষ্টে শ্রুতি:- স বা অয়ং পুরুষঃ সর্ব্বাসু পূষু সর্ব্বশরীরেযু, পুরিশয়ঃ পুরি শেত ইতি পুরিশয়ঃ সন্ পুরুষ ইত্যুচ্যতে। ন এনেনানেন কিঞ্চন কিঞ্চিদপি অনাবৃতম্ অনাচ্ছাদিতম্, তথানেনেন কিঞ্চন অসংবৃতম্-অন্তরননুপ্রবেশিতম্; বাহ্যভূতেনান্তর্ভুতেন চ ন অনাবৃতম্ এবং স এব নামরূপাত্মনা অন্তর্বহির্ভাবেন কার্য্যকরণেরূপেণ ব্যবস্থিতঃ। ‘পুরশ্চক্রে’ ইত্যাদি মন্ত্রঃ সঙ্ক্ষেপতঃ আত্মৈকত্বমাচষ্ট ইত্যর্থঃ ॥ ১৩৮৷৷১৮৷৷
টীকা।—উক্তমন্ত্রাভ্যাং বক্ষ্যমাণমন্ত্রয়োরপুনরুক্তত্বার্থবত্ত্বং বক্তুং বৃত্তং কীর্ত্তয়তি—উক্তাবিতি। আখ্যায়িকাবিশেষণপ্রাপ্তং সঙ্কোচং পরিহরতি—দ্বয়োরিতি। উত্তরমন্ত্রদ্বয়প্রবৃত্তিং প্রতিজানীতে —ব্রহ্মেতি। সম্প্রত্যবান্তরসঙ্গতিমাহ—যৎ কক্ষ্যং চেতি। হিরণ্যগর্ভকর্তৃকং শরীরনির্মাণমত্র নোচ্যতে, কিন্তু প্রকরণবলাদীশ্বরকর্তৃকমিত্যাহ—যত ইতি। শরীরসৃষ্ট্যপেক্ষয়া লোকসৃষ্টি-
প্রাণম্যং, পুরস্তাদ্দেহহৃষ্টানন্তরং প্রবেশাৎ পূর্বমিতি যাবৎ। সহি সর্ব্বেষু শরীরেষু বর্তমানঃ পুরি শেত ইতি ব্যুৎপত্যা পুরিশয়ঃ সন্ পুরুষো ভবতীত্যুক্ত। প্রকারান্তরেণ পুরুষত্বং ব্যুৎপাদয়তি —নেত্যাদিনা। বাক্যদ্বয়স্যৈকার্থত্বমাশঙ্কা সর্ব্বং জগদোতপ্রোতত্বেনাত্মব্যাপ্তনিত্যর্থবিশেষমাত্রি- ত্যাহ—বাহ্যভূতেনেতি। পূর্ণত্বে সত্যায়নঃ ‘দিব্যো হ্যমূর্ত্তঃ’ ইত্যাদিশ্রুতিমাশ্রিতা ফলিতমাহ— এবমিতি। মন্ত্রব্রাহ্মণয়োরর্থ বৈমত্যমাশঙ্ক্যাহ—পুর ইতি। ১৩৮। ১৮।
ভাষ্যানুবাদ।— “ইদং বৈ তৎ মধু” ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ। পূর্ব্বোক্ত মন্ত্র দুইটি প্রবর্গ্য কৰ্ম্ম সম্পর্কিত আখ্যায়িকার উপসংহারাত্মক; অর্থাৎ প্রথম দুই অধ্যায়ে আখ্যায়িকারূপে বিন্যস্ত উক্ত মন্ত্রদ্বয়ে প্রবর্গ্যকর্ম্মাঙ্গভূত বিষয় প্রকাশিত হইয়াছে, এখন ব্রহ্মবিদ্যা-প্রকাশক অধ্যায়দ্বয়ের প্রতিপাদ্য বিষয় পরবর্তী দুইটি মন্ত্রে প্রকাশ করিতে হইবে; এইজন্য তাহার উপন্যাস করা হইতেছে।
ইতঃপূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, আথর্বণ ঋষি তোমাদিগকে গোপনীয় মধুবিদ্যা বলিয়াছেন; সেই মধুই বা কিপ্রকার, এখন তাহা বলা হইতেছে—
“পুরশ্চক্রে” ইত্যাদি। এখানে ‘পুরঃ’(পুর) অর্থ শরীরসমূহ। যাহা হইতে এই অনভিষ্যক্ত জগতের অভিব্যক্তি-ক্রম সম্পাদিত হইয়াছে, সেই পরমেশ্বর অব্যাকৃত জগৎকে ব্যাকৃত বা প্রকটিত করিতে প্রবৃত্ত হইয়া প্রথমে ভূপ্রভৃতি লোকসমূহ সৃষ্টি করিয়া, দ্বিপদসমূহকে-দুইপদযুক্ত মনুষ্য ও পক্ষিশরীরসমূহ এবং চতুষ্পদ-পশুশরীরসমূহ নির্মাণ করিয়াছিলেন। সেই পরমেশ্বরই পক্ষী হইয়া-লিঙ্গশরীররূপ(১) ধারণ করিয়া পুরুষরূপে(জীবরূপে) স্থূলশরীরসমূহে প্রবেশ করিলেন। এখন ‘পুরুষ আবিশৎ’ কথার অর্থ শ্রুতি নিজেই প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন-সেই এই আত্মা সমস্ত পুরে অর্থাৎ সমস্ত দেহে হৃদয়মধ্যে অবস্থান করেন বলিয়া ‘পুরুষ’ শব্দে অভিহিত হইয়া থাকেন। ইঁহা দ্বারা অনাবৃত- অনাচ্ছাদিত কোন বস্তু নাই, এবং ইহা দ্বারা অসংবৃত অর্থাৎ তিনি যাহার অভ্য- স্তরে প্রবিষ্ট না আছেন, এরূপ কোনও বস্তু নাই; ফলকথা, বাহিরে ও অন্তরে ইঁহার দ্বারা পরিব্যাপ্ত নয়, এরূপ কোনও বস্তু জগতে নাই। বুঝিতে হইবে যে, সেই পরমেশ্বরই নামরূপাত্মক কার্যকরণরূপে(দেহেন্দ্রিয়াদিরূপে) অন্তরে ও
৬৯৩
বাহিরে বিশেষভাবে অবস্থিত আছেন। “পুরশ্চক্রে” ইত্যাদি মন্ত্রটি, সংক্ষেপতঃ আত্মার একত্ব বা অদ্বৈতভাবই প্রতিপাদন করিতেছে ॥ ১৩৮ ॥ ১৮ ॥
ইদং বৈ তন্মধু দধ্যঙাথর্ব্বণোহশ্বিভ্যামুবাচ। তদেতদূষিঃ পশ্যন্নবোচৎ। রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব তদ্য রূপং প্রতিচক্ষণায়। ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে, যুক্তা হ্যস্য হরয়ঃ শতা দশেতি। অয়ং বৈ হরয়োহয়ং বৈ দশ চ সহস্রাণি বহুনি চানন্তানি চ, তদেতদ্ ব্রহ্মাপূর্ব্বমনপরমনন্তরমবাহ্যময়মাত্মা ব্রহ্ম সর্ব্বানুভূরিত্যনুশাসনম্ ॥ ১৩৯ ॥ ১৯ ॥
সরলার্থঃ।—দধ্যং আথর্ব্বণঃ বৈ ইদং মধু অশ্বিভ্যামুবাচ। ঋষিঃ (মন্ত্রঃ) তৎ এতৎ(কৰ্ম্ম) পশ্যন্ অবোচৎ,—[সঃ পরমেশ্বরঃ] রূপং রূপং (প্রতিবস্তু)[অভিব্যাপ্য] প্রতিরূপঃ(তত্তদ্বত্বনুরূপঃ) বভূব।[কিমর্থং পুনঃ তস্য প্রতিরূপভবনম্? ইত্যাহ—] অস্য(পরমেশ্বরস্য) তৎ(ঔপাধিকং রূপং) প্রতিচক্ষণায়(লোকে প্রখ্যাপয়িতুং—প্রকটয়িতুমিত্যর্থঃ)। ইন্দ্রঃ (পরমেশ্বরঃ, ‘ইদিপরমৈশ্বর্য্যে’ ইত্যস্য রূপম্), মায়াভিঃ(নামরূপকৃত- মিথ্যাভিমানৈঃ, স্বগতশক্তিভির্বা) পুরুরূপঃ(বহুরূপঃ) ঈয়তে(গম্যতে— প্রতীয়তে ইতি যাবৎ; নতু পরমার্থতঃ বহুরূপত্বমস্যেতি ভাবঃ)। অস্য (জীবরূপাবস্থিতস্য পরমেশ্বরস্য) শতা(শতানি) দশ চ হরয়ঃ বিষয়াহরণ- সাধনানি ইন্দ্রিয়াণি) যুক্তাঃ(নিয়তসম্বদ্ধাঃ)[সন্তি] ইতি।[অত্র বিষয়ভেদাৎ, ব্যক্তিভেদাদ্বা ইন্দ্রিয়াণাং দশশতত্ত্বং বোধ্যম্]।[পরমেশ্বরাৎ হরীণাং ভেদমাশঙ্ক্য তন্নিবৃত্ত্যর্থমাহ—‘অয়ম্’ ইত্যাদি।] অয়ং(পরমেশ্বরঃ) বৈ(এব) হরয়ঃ(ইন্দ্রিয়াণি), অয়ং বৈ দশ, সহস্রাণি চ, বহুনি অনন্তানি চ; [কিং বহুনা] তৎ এতৎ ব্রহ্ম অপূর্ব্বং(পূর্ব্বং কারণং যস্য নাস্তি, তৎ তথাবিধম্), অনপরং(নাস্তি অপরং উদ্ভিন্নং কিঞ্চিৎ যস্য, তৎ তথাবিধম্), অনন্তরং(অভ্যন্তর- রহিতম্), অবাহ্যং(বহির্ভাবশূন্যম্, সর্ব্বতঃ সর্ব্বাত্মকমিত্যর্থঃ); তচ্চ ব্রহ্ম অয়ং আত্মা(জীবরূপঃ) সর্ব্বানুভূঃ(সর্ব্বং বস্তু অনুভবতীতি সর্ব্বানুভূঃ সর্ব্বাত্মকমিত্যর্থঃ) ইতি অনুশাসনং(বেদান্তানামুপদেশ ইত্যর্থঃ) ॥ ১৩৯॥ ১৯॥
[ ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়ে পঞ্চমব্রাহ্মণব্যাখ্যা ॥ ২ ॥ ৫ ॥]
মূলানুবাদ।—পুনশ্চ সেই কথাই বলিতেছেন—দধ্যং আথর্বণ ঋষি এই মধুবিদ্যা অশ্বিনীকুমারকে বলিয়াছিলেন। মন্ত্ররূপী ঋষি ইহা দর্শন করিয়া বলিলেন—পরমেশ্বর প্রত্যেক বস্তুর অনুরূপ হইয়াছিলেন; জগতে আপনার রূপপ্রকাশনার্থ তাঁহার সেই সমস্ত রূপ প্রকটিত হইয়াছিল। ইন্দ্র(পরমেশ্বর) মায়া দ্বারা অর্থাৎ মায়াময় নামরূপ-জনিত অভিমান দ্বারা, অথবা বহুবিধ মায়াশক্তি-প্রভাবে বহু- রূপে প্রতিভাত হইয়া থাকেন। শত ও দশসংখ্যক অর্থাৎ ব্যক্তিভেদে বহুসংখ্যক ইন্দ্রিয়সমূহও ইহাতে সংযুক্ত রহিয়াছে।[শ্রুতি নিজেই এ কথার অর্থ বলিতেছেন—] এই পরমেশ্বরই হরি অর্থাৎ ইন্দ্রিয় এবং তিনিই দশ, সহস্র, বহু ও অনন্ত। এই ব্রহ্মের পূর্ব্ব(কারণ) নাই, অপর বা ভিন্ন পদার্থও নাই, অন্তর নাই, এবং বাহিরও নাই; এই ব্রহ্মই সর্ব্বানুভবিতা আত্মা॥ ১৩৯॥ ১৯॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদং বৈ তন্মধিত্যাদি পূর্ব্ববৎ। রূপং রূপং প্রতি- রূপো বভূব,—রূপং রূপং প্রতি প্রতিরূপো রূপান্তরং বভূবেত্যর্থঃ, প্রতিরূপো- হনুরূপো বা; যাদৃক্সংস্থানৌ মাতাপিতরৌ তৎসংস্থানস্তদনুরূপ এব পুত্রো জায়তে; ন হি চতুষ্পদো দ্বিপাদ জায়তে, দ্বিপদো বা চতুষ্পাৎ। স এব হি পরমেশ্বরো নামরূপে ব্যাকুর্ব্বাণো রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব। কিমর্থং পুনঃ প্রতিরূপমাগমনং তস্যেত্যুচ্যতে। তদস্যাত্মনো রূপং প্রতিচক্ষণায় প্রতিখ্যাপ- নায়; যদি হি নামরূপে ন ব্যাক্রিয়িতে, তদা অস্যাত্মনো নিরুপাধিকং রূপং প্রজ্ঞানঘনাখ্যং ন প্রতিখ্যায়েত; যদা পুনঃ কার্যকরণাত্মনা নাম-রূপে ব্যাকৃতে ভবতঃ, তদাস্য রূপং প্রতিখ্যায়েত। ১
ইন্দ্রঃ পরমেশ্বরঃ মায়াভিঃ প্রজ্ঞাভিঃ, নামরূপভূতকৃত-মিথ্যাভিমানৈর্ব্বা, ন তু পরমার্থতঃ, পুরুরূপ বহুরূপ ঈয়তে গম্যতে—একরূপ এব প্রজ্ঞানঘনঃ সন্ অবিদ্যা- প্রজ্ঞাভিঃ। কস্মাৎ পুনঃ কারণাৎ? যুক্তা রথ ইব বাজিনঃ স্ববিষয়প্রকাশনায়, হি যম্মাদস্য হরয়ো হরণাদিন্দ্রিয়াণি, শতা শতানি, দশ চ, প্রাণিভেদবাহুল্যাৎ শতানি দশ চ ভবন্তি। তস্মাদিন্দ্রিয়বিষয়বাহুল্যাৎ তৎপ্রকাশনায়ৈব চ যুক্তানি তানি, নাত্মপ্রকাশনায়, “পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভূঃ” ইতি হি কাঠকে। তস্মাক্তৈ রেব বিষয়স্বরূপৈরীয়তে, ন প্রজ্ঞানঘনৈকরসেন স্বরূপেণ। ২
৬৯৫
এবং তর্হি অয়ম্ অন্যঃ পরমেশ্বরঃ, অন্যে হরয় ইত্যেবং প্রাপ্তে উচ্যতে-অয়ং বৈ হরয়ঃ, অয়ং বৈ দশ চ সহস্রাণি বহুনি চানন্তানি চ, প্রাণিভেদস্যানন্ত্যাৎ। কিং বহুনা, তদেতদ্ ব্রহ্ম-য আত্মা, অপূর্ব্বং-নাস্য কারণং পূর্ব্বং বিদ্যত ইতি অপূর্ব্বম্; নাস্যাপরং কার্য্যং বিদ্যত ইত্যনপরম্; নাস্য জাত্যন্তরমন্তরালে বিদ্যত ইত্যনন্তরম্; তথা বহিরস্য ন বিদ্যতে ইত্যবাহ্যম্। কিং পুনস্তৎ নিরন্তরং ব্রহ্ম? অয়মাত্মা; কোহসৌ? যঃ প্রত্যগাত্মা দ্রষ্টা শ্রোতা মস্তা বোদ্ধা বিজ্ঞাতা সর্ব্বানুভূঃ-সর্ব্বাত্মনা সর্ব্বমনুভবতীতি সর্ব্বানুভূরিতি, এতদনুশাসনং সর্ব্ব- বেদান্তোপদেশঃ, এষ সর্ব্ববেদান্তানামুপসংহৃতোহর্থঃ; এতদমৃতমভয়ম্। পরি- সমাপ্তশ্চ শাস্ত্রার্থঃ ॥ ১৩৯ ॥ ১৯ ॥
টীকা।—প্রাচীনমেব ব্রাহ্মণমনুদ্য মন্ত্রান্তরমবতারয়তি—ইদমিতি। প্রতি-শব্দস্তন্ত্রেণোচ্চ- রিতঃ। রূপং রূপমুপাধিভেদং প্রতি প্রতিরূপো রূপান্তরং প্রতিবিম্বং বভুবেত্যেতৎ—প্রতিরূপো বভুবেত্যত্র বিবক্ষিতমিতি যোজনা। অনুরূপো বেত্যুক্তং বিবৃণোতি—যাদৃগিত্যাদিনা। উক্ত- মর্থমনুভবারূঢ়ং করোতি—ন হীতি। রূপান্তর-ভবনে কর্ত্তন্তরং বারয়তি—স এব হীতি। প্রতিখ্যাপনায় শাস্ত্রাচার্য্যাদিভেদেন তত্ত্বপ্রকাশনায়েত্যর্থঃ। তদেব ব্যতিরেকেণান্বয়েন চ- স্ফুটয়তি—যদি হীত্যাদিনা। ১
মায়াভিঃ প্রজ্ঞাভিরিতি পরপক্ষমুক্ত। স্বপক্ষমাহ-মায়াভিরিতি। মিথ্যাধীহেতুভূতানাদ্য- নির্ব্বাচ্য-দণ্ডায়মানাজ্ঞানবশাদেষ বহুরূপো ভাতি। প্রকারভেদাৎ তু বহুক্তিরিতি বাক্যার্থমাহ- একরূপ এবেতি। অবিদ্যাপ্রজ্ঞাভির্ব্বহুরূপো গম্যত ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। পরস্য বহুরূপত্বে- নিমিত্তং প্রশ্নপূর্ব্বকং নিবেদয়র্তি-কস্মাদিত্যাদিনা। যথা রথে যুক্তা বাজিনো রথিনং স্বগোচরং দেশং প্রাপয়িতুং প্রবর্তন্তে, তথাস্য প্রতীচো রথস্থানীয়ে শরীরে যুক্তা হরয়ঃ স্ববিষয়প্রকাশনায় যস্মাৎ প্রবর্তন্তে, তস্মাদিন্দ্রিয়াণাং তদ্বিষয়াণাং চ বহুলত্বাত্তত্তদ্রূপৈরেব বহুরূপো ভাতীতি যোজনা। হরিশব্দস্যেন্দ্রিয়েষু প্রবৃত্তৌ নিমিত্তমাহ-হরণাদিতি। প্রতীচো বিষয়ান্ প্রতীতি শেষঃ। ইন্দ্রিয়বাহুল্যে হেতুমাহ-প্রাণীতি। ইন্দ্রিয়বিষয়বাহুল্যাৎ প্রত্যগাত্মা বহুরূপ ইতি শেষঃ। নম্বাত্মানং প্রকাশয়িতুমিন্দ্রিয়াণি প্রবৃত্তানি, ন তু রূপাদিকমেব, তৎ কথং তদ্বিষয়বশা- দাত্মনোঽন্যথা প্রথেত্যাশঙ্ক্যাহ-তৎপ্রকাশনায়েতি। তস্মাদিন্দ্রিয়বিষয়বাহুল্যাদিত্যত্রোক্তমুপ- সংহরতি-তস্মাদিতি। যদ্বা যথোক্তশ্রুতিবশেন লব্ধমর্থমাহ-তস্মাদিতি। যম্মাদিন্দ্রিয়াণি পরাগ্নিবিষয়ে প্রবৃত্তানি, তস্মাত্তৈরিন্দ্রিয়ৈ্বিষয়স্বরূপৈরেবায়ং প্রত্যগাত্মা গম্যতে, ন তু শ্বাসাধারণেন রূপেণেত্যর্থঃ। ২
যুক্তা হীতি সম্বন্ধমাশ্রিত্য শঙ্কতে-এবং তহীতি। অয়মিত্যাদিবাক্যেন পরিহরতি- অয়মিতি। তত্তদিন্দ্রিয়াদিরূপেণাত্মন এবাবিদ্যয়া ভানাৎ সম্বন্ধস্য চ কল্পিতত্বান্নাদ্বৈতহানি- রিত্যর্থঃ। ইন্দ্রিয়ানস্ত্যে হেতুমাহ-প্রাণিভেদস্যেতি। বাক্যার্থব্যাখ্যানার্থমিথং গতেন সন্দর্ভেণ
ভূমিকামারচয্য তৎপরং বাক্যমবতার্য্য ব্যাকরোতি-কিং বহুনেত্যাদিনা। ন কেবলমধ্যায়স্বয়- স্থৈবার্থোহত্র সঙ্ক্ষিপ্যোপসংহৃতঃ, কিন্তু সর্ব্ববেদান্তানামিত্যাহ-এষ ইতি। তস্যোভরবিধপুরুষার্থ- রূপত্বমাহ-এতদিতি। বক্তব্যান্তরপরিশেষশঙ্কাং পরিহরতি-পরিসমাপ্তশ্চেতি। ১৩৯।১৯।
ইতি বৃহদ্রথনাটকনিষ্কাশনীকাণ্ডং দ্বিতীয়ধ্যায়ে পঞ্চমঃ প্রপঞ্চঃ। ২। ৫। ১।
ভাষ্যানুবাদ।—‘ইদং বৈ তন্মধু’ ইত্যাদির অর্থ পূর্ব্ববৎ। ‘রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব’ কথার অর্থ—পৃথক্ পৃথক্ প্রত্যেক বস্তুর অনুরূপ রূপসম্পন্ন হইয়াছিলেন। প্রতিরূপই বল, আর অনুরূপই বল, ফলকথা, পিতা-মাতার শরীরসংস্থান যেরূপ থাকে, তাহার সন্তানও ঠিক তদনুরূপই হইয়া থাকে; কারণ, চতুষ্পদ প্রাণী হইতে কখনও দ্বিপদের উৎপত্তি হয় না, কিংবা দ্বিপদ প্রাণী হইতেও চতুষ্পদের উৎপত্তি হয় না; এইরূপ সেই পরমেশ্বরও নাম ও রূপ প্রকটিত করিতে যাইয়া বিভিন্ন পদার্থের অনুরূপ হইয়াছিলেন। এখন তাঁহার ঐরূপ প্রতিরূপ প্রাপ্তির উদ্দেশ্য বলা হইতেছে—এই আত্মার স্বরূপ-খ্যাপন করাই ঐরূপ প্রতি- রূপপ্রাপ্তির উদ্দেশ্য; কারণ, জগতে যদি নাম ও রূপ প্রকাশিত না হইত, তাহা হইলে তদবস্থায় কখনই তাঁহার সর্ব্বোপাধিবিবর্জ্জিত শুদ্ধ বিজ্ঞানঘন রূপটি জগতে পরিজ্ঞাত হইত না। পরন্তু যখনই কার্য্য-করণভাবরূপে নাম ও রূপ প্রকটিত হয়, তখনই তাঁহার স্বরূপ লোকের জ্ঞানগোচর হইবার উপযুক্ত হয়। ১
ইন্দ্র-পরমেশ্বর মায়া দ্বারা-প্রকৃষ্ট জ্ঞান দ্বারা, অথবা নাম ও রূপাত্মক উপাধিজনিত মিথ্যা অভিমানরাশি দ্বারা পুরুরূপে অর্থাৎ বহুরূপে প্রতীত হন; বাস্তবিকপক্ষে কিন্তু তিনি প্রজ্ঞানঘনরূপ একমাত্র রূপ। তথাপি তাঁহার অবিদ্যা-প্রসূত বিবিধ ভেদ জ্ঞানবশে[নানাকারে প্রকাশ পাইয়া থাকেন মাত্র। এরূপ হইবার] কারণ কি? যেহেতু, রথে যেরূপ অশ্বসমূহ সংযো- জিত হয়, সেইরূপ নিজ নিজ বিষয়সমূহ প্রকাশ বা উপলব্ধিগোচর করিয়া দিবার জন্য শত ও দশ অর্থাৎ দশটি করিয়া শত শত হরি অর্থাৎ ইন্দ্রিয় এই আত্মার সহিত সম্মিলিত হইয়া আছে। এখানে প্রাণিগণের সংখ্যাগত বাহুল্য- নিবন্ধন দশ ইন্দ্রিয়ের এইরূপ বহুত্বোক্তি(শত সংখ্যা) বলা হইয়াছে। অতএব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের বহুত্বনিবন্ধন সে সমুদয়কে প্রকাশ করিবার জন্যই ইন্দ্রিয়সমূহ সংযোজিত হইয়াছে, কিন্তু আত্মপ্রকাশনের উদ্দেশ্যে নহে; কারণ, কঠোপনিষদে আছে ‘স্বয়ম্ভূ পরমেশ্বর ইন্দ্রিয়গণকে পরাক্ বা বাহ্যবস্তু দর্শনে নিযুক্ত বহির্মুখ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন’; অতএব বুঝিতে হইবে যে, সেই সেই বাহ্য বিষয়ের আকারেই তিনি প্রতীত হইয়া থাকেন, কিন্তু স্বীয় প্রজ্ঞান ঘনরূপে নহে। ২
৬৯৭
এপর্যন্ত যাহা বলা হইল, তাহাতে বুঝা যাইতে পারে যে, পরমেশ্বর ও হরি-পদ- বাচ্য ইন্দ্রিয়সমূহ পরস্পর বিভিন্ন; এই আশঙ্কা অপনয়নের নিমিত্ত বলিতেছেন— এই পরমেশ্বরই হরি বা ইন্দ্রিয়, এবং ইহাই দশ, শত, সহস্র, বহু ও অনন্ত। প্রাণিগণের অনন্তত্ব নিবন্ধনই ঐরূপে বহুত্ব উক্ত হইল। অধিক কি, এই ব্রহ্মই আত্মা, এবং অপূর্ব্ব—ইহার পূর্ব্ববর্তী কারণ বিদ্যমান না থাকায় ইহা অপূর্ব্ব; ইহা হইতে অপর বা ভিন্ন কার্য্য বিদ্যমান নাই বলিয়া ইহা অনপর; ইহার মধ্যে আর অন্য-জাতীয় কোন পদার্থ নাই, এই কারণে ইহা অনন্তর; সেইরূপ ইহার বহির্ভূত কোন পদার্থ না থাকায় ইহা অবাহ্য। সর্ব্বতোভাবে ব্যবধানরহিত সেই ব্রহ্ম কে? [উত্তর—] এই আত্মা। এই আত্মাই বা কে? যাহা দ্রষ্টা, শ্রোতা, মন্তা(চিন্তা- কারী), বিজ্ঞাতা(অনুভবকর্ত্তা), বোদ্ধা(হৃদয়ঙ্গমকর্ত্তা) এবং সর্ব্বানুভূ— সর্ব্বতোভাবে সর্ব্ববস্তু অনুভব করে বলিয়া ‘সর্ব্বানুভূ’ পদবাচ্য; তিনি এতৎ স্বরূপ। ইহাই অনুশাসন—সমস্ত বেদান্তশাস্ত্রের সংক্ষিপ্ত মর্ম্মোপদেশ; ইহাই অমৃত ও অভয়-শব্দবাচ্য। দ্বিতীয় অধ্যায়ের বক্তব্য বিষয় এখানেই সমাপ্ত হইল ॥ ১৩৯॥ ১৯॥
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়ে পঞ্চম ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ২ ॥ ৫ ॥
অথ বংশঃ—পৌতিমায্যো গৌপবনাদ্গৌপবনঃ পৌতিমায্যাৎ পৌতিমায্যো গৌপবনাদ্গৌপবনঃ কৌশিকাৎ কৌশিকঃ কৌণ্ডি- ন্যাৎ কৌণ্ডিন্যঃ শাণ্ডিল্যাৎ শাণ্ডিল্যঃ কৌশিকাচ্চ গৌতমাচ্চ গৌতমঃ ॥ ১৪০ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(অনন্তরং) বংশঃ(অতীতাধ্যায়চতুষ্টয়স্য আচার্য্যক্রমঃ) [উচ্যতে]। তত্র প্রথমান্তঃ শিষ্যঃ, পঞ্চম্যন্তস্তু আচার্য্যঃ,[অনেকেহপি ঋষয়ঃ সমাননামতয়া প্রসিদ্ধাঃ; ততঃ পৌনরুক্ত্যং নাশঙ্কনীয়মিত্যাশয়ঃ। এবমুত্তরত্রাপি বোধ্যম্] ॥১৪০—১৪২॥ ১—৩॥
মূলানুবাদ।—অতঃপর বংশ অর্থাৎ গত চারি(উপনিষদের হিসাবে দুই) অধ্যায়ে উক্ত বিদ্যার উপদেষ্টা আচার্য্যগণের পারম্পর্য্য- ক্রম কথিত হইতেছে—[শ্রুতিতে আচার্য্যের নাম পঞ্চমী বিভক্তি দ্বারা, আর শিষ্যের নাম প্রথমা বিভক্তি দ্বারা নির্দিষ্ট হইয়াছে]।
গৌপবননামক আচার্য্য হইতে শিক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্যের নাম পৌতিমাষ্য। এইরূপ পৌতিমাষ্য হইতেও অপর গৌপবন, গৌপবন হইতে অপর পৌতিমাষ্য, কৌশিক হইতে গৌপবন, কৌণ্ডিন্য হইতে কৌশিক, শাণ্ডিল্য হইতে কৌণ্ডিন্য, এবং কৌশিক, শাণ্ডিল্য এবং গৌতম হইতে শিক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্যের নাম গৌতম ॥ ১৪০ ॥ ১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অপেদানীং ব্রহ্মবিদ্যার্থস্য মধুকাণ্ডস্য বংশঃ স্তুত্যর্থো ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ। মন্ত্রশ্চায়ং স্বাধ্যায়ার্থো অপার্থশ্চ; তত্র বংশ ইব বংশঃ, যথা বেণু- র্ব্বংশঃ পর্ব্বণঃ পর্ব্বণো হি ভিদ্যতে, তদ্বদগ্রাৎ প্রভৃতি মূলপ্রাপ্তেরয়ং বংশঃ। অধ্যায়- চতুষ্টয়স্যাচার্য্যপরম্পরাক্রমো বংশ ইত্যুচ্যতে। তত্র প্রথমান্তঃ শিষ্যঃ, পঞ্চম্যন্ত আচার্য্যঃ। পরমেষ্ঠী বিরাট্, ব্রহ্মণো হিরণ্যগর্ভাৎ, ততঃ পরম্ আচার্য্যপরম্পরা নাস্তি। যৎ পুনব্রহ্ম, তন্নিত্যং স্বয়ম্ভু, তস্মৈ ব্রহ্মণে স্বয়ম্ভবে নমঃ ॥ ১৪০—১৪৩॥ ১—৩
ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ বৃহদারণ্যকবৃত্তৌ দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ
সমাপ্তঃ ॥ ২ ॥
টীকা।—ব্রহ্মবিদ্যাং সঙ্ক্ষেপবিস্তরাভ্যাং প্রতিপাদ্য বংশব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমাহ—অথেতি। মহাজনপরিগৃহীতা হি ব্রহ্মবিদ্যা, তেন সা মহাভাগধেয়েতি স্তুতিঃ। ব্রাহ্মণস্যার্থান্তরমাহ— মন্ত্রশ্চেতি। স্বাধ্যায়ঃ স্বাধীনোচ্চারণক্ষমত্বে সত্যধ্যাপনং, জপস্তু প্রত্যহমাবৃত্তিরিতি ভেদঃ। যথোক্তনীত্যা ব্রাহ্মণারম্ভে দ্বিতে বংশশব্দার্থমাহ—তত্রেতি। তদেব স্ফুটয়তি—যথেতি। শিক্ষ্যাবসানোপলক্ষণীভূতাৎ পৌতিমাষ্যাদারভ্য তদাদির্বেদাখ্যব্রহ্মমূলপর্যন্তোহয়ং বংশঃ পর্ব্বণঃ পর্ব্বশো ভিন্নত ইতি সম্বন্ধঃ। বংশশব্দেন নিষ্পন্নমর্থমাহ—অধ্যায়চতুষ্টয়স্যেতি। অথাত্র শিষ্যাচার্য্যবাচকশব্দাভাবে কুতো ব্যবস্থেতি, তত্রাহ—তত্রেতি। পরমেষ্টি-ব্রহ্মশব্দয়োরেকার্থত্ব- মাশঙ্ক্যাহ—পরমেষ্ঠীতি। কুতস্তর্হি ব্রহ্মণা বিদ্যাপ্রাপ্তিস্তত্রাহ—তত ইতি। স্বয়ংপ্রতিভাতবেদো হিরণ্যগর্ভো নাচাৰ্য্যান্তরমপেক্ষতে; ঈশ্বরানুগৃহীতস্য তস্য বুদ্ধাবাবির্ভূতাদ্বেদাদেব বিদ্যালাভ- সম্ভবাদিত্যর্থঃ। কুতস্তর্হি বেদো জায়তে, তত্রাহ—যৎপুনরিতি। পরস্যৈব ব্রহ্মণো বেদ- রূপেণাবস্থানাত্তস্থ্য নিত্যত্বান্ন হেত্বপেক্ষেত্যর্থঃ। আদাবন্তে চ কৃতমঙ্গলা গ্রন্থাঃ প্রচারিণো ভবস্তীতি- দ্যোতরিতুমস্তে ব্রহ্মণে নম ইত্যুক্তম্। তদ্বাচষ্টে—তস্মা ইতি। ১৪০—১৪৩৷১—৩৷
ভাষ্যানুবাদ।—ইহার পর এখন ব্রহ্মবিদ্যার প্রশংসার্থ ব্রহ্মবিদ্যাপ্রকাশক মধুকাণ্ডের বংশ ঋষি কথিত হইতেছে। এই বংশ-ব্রাহ্মণটি স্বাধ্যায় ও জপো- পযোগী মন্ত্রস্বরূপও বটে(১)। বংশ অর্থ বংশের(বাঁশের) মত; লোকপ্রসিদ্ধ বাঁশ যেমন পর্ব্বে পর্ব্বে বিভক্ত হইয়া থাকে, তেমনি এই বংশও অগ্র হইতে মূল পর্যন্ত শিষ্যাচার্য্যভেদে বিভাগ প্রাপ্ত হইয়াছে। এখানে অতীত চারি অধ্যায়ে (উপনিষদের হিসাবে দুই অধ্যায়ে) পরম্পরাগত আচার্য্যক্রমকে বংশ বলা হইয়াছে। তন্মধ্যে প্রথমা বিভক্ত্যন্ত পদগুলি শিষ্যবোধক, আর পঞ্চমী-বিভক্ত্যন্ত পদগুলি আচার্য্যবোধক। এখানে পরমেষ্ঠী অর্থ—বিরাট্ পুরুষ; ‘ব্রহ্মণঃ’ অর্থ হিরণ্যগর্ভ হইতে। বুঝিতে হইবে যে, তাঁহার উপরে আর আচার্য্যক্রম নাই। এখানে যাহাকে ব্রহ্ম বলা হইয়াছে, বুঝিতে হইবে, তিনি নিত্য স্বয়ম্ভু; বেদবিদ্যা তাঁহার নিত্য প্রতিভাত; সেই স্বয়ম্ভু ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে নমস্কার ॥ ১৪০—১৪২ ॥ ১—৩ ॥
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদে দ্বিতীয়াধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ২ ॥ ২ ॥
আগ্নিবেশ্যাদাগ্নিবেশ্যঃ শাণ্ডিল্যাচ্চানভিম্লাতাচ্চানভিম্লাত আনভিম্লাতাদানভিম্লাত আনভিম্লাতাদানভিম্লাতো গৌতমাদৃগৌ-
প্রথমং ব্রাহ্মণম্।
আভাসভাষ্যম্।—জনকো হ বৈদেহ ইত্যাদি যাজ্ঞবন্ধ্যং কাণ্ডমারভ্যতে। উপপত্তিপ্রধানত্বাদতিক্রান্তেন মধুকাণ্ডেন সমানার্থত্বেহপি সতি ন পুনরুক্ততা; মধুকাণ্ডং হি আগমপ্রধানম্। আগমোপপত্তী হি আত্মৈকত্বপ্রকাশনায় প্রবৃত্তে শক্তুতঃ করতলগতবিম্বমিব দর্শয়িতুম্। “শ্রোতব্যো মন্তব্যঃ” ইতি হ্যুক্তম্; তস্মাদাগমার্থস্যৈব পরীক্ষাপূর্ব্বকং নির্দ্ধারণায় যাজ্ঞবন্ধ্যং কাণ্ডমুপ- পত্তিপ্রধানমারভ্যতে। ১
আখ্যায়িকা তু বিজ্ঞানস্তত্যর্থা উপায়বিধিপরা বা। প্রসিদ্ধো হ্যপায়ো বিদ্বদ্ভিঃ শাস্ত্রেষু চ দৃষ্টঃ—দানম্; দানেন হ্যপনমস্তে প্রাণিনঃ; প্রভূতং হিরণ্যং গোসহস্রদানঞ্চেহ উপলব্ধ্যতে; তস্মাদন্যপরেণাপি শাস্ত্রেণ বিদ্যাপ্রাপ্ত্যুপায়দান- প্রদর্শনার্থা আখ্যায়িকারব্ধা।
অপি চ, তদ্বিদ্যাসংযোগঃ তৈশ্চ সহ বাদকরণং বিদ্যাপ্রাপ্ত্যুপায়ো ন্যায়- বিদ্যায়াৎ দৃষ্টঃ; তচ্চাস্মিন্নধ্যায়ে প্রাবল্যেন প্রদর্শ্যতে; প্রত্যক্ষাপি বিদৎ- সংযোগে প্রজ্ঞাবৃদ্ধিঃ; তস্মাদ্বিদ্যাপ্রাপ্ত্যুপায়প্রদর্শনার্থৈবাখ্যায়িকা।
টীকা।—মধুকাণ্ডে ত্বাত্রং কক্ষাং চেতি মধুদ্বয়ং ব্যাখ্যাতম্; সম্প্রতি কাণ্ডান্তরারভ্যং প্রতি- জানীতে—জনক ইতি। ননু পূর্ব্বস্মিন্নধ্যায়দ্বয়ে ব্যাখ্যাতমেব তত্ত্বমুত্তরত্রাপি বক্ষ্যতে, তথা চ পুনরুক্তেরলং মুনিকাণ্ডেনেতি, তত্রাহ—উপপত্তীতি। তুল্যমুপপত্তিপ্রধানত্বং মধুকাণ্ডস্যাপীতি চেন্নেত্যাহ—মধুকাণ্ডং হীতি। ননু প্রমাণাদাগমাদেব তত্ত্বজ্ঞানমুৎপৎস্যতে, কিমুপপত্যা কাণ্ডেন চেতি, তত্রাহ—আগমেতি। করণত্বেনাগমস্তত্ত্বজ্ঞানহেতুরুপপত্তিরুপকরণতয়া পদার্থপরিশোধন- দ্বারা তদ্ধেতুরিত্যত্র গমকমাহ—শ্রোতব্য ইতি। করণোপকরণয়োরাগমোপপত্যোস্তত্ত্বজ্ঞান- হেতুত্বে সিদ্ধে ফলিতমুপসংহরতি—তস্মাদিতি। ১
যথোক্তরীত্যা কাণ্ডারস্তোহপি কিমিত্যাখ্যায়িকা প্রণীয়তে, তত্রাহ—আখ্যায়িকা ত্বিতি। বিজ্ঞানবতাং পূজাত্র প্রযুজ্যমানা দৃশ্যতে। তথা চ বিজ্ঞানং মহাভাগধেয়মিতি স্তুতিরত্র বিবক্ষিতেতার্থঃ। বিদ্যাগ্রহণে দানাখ্যোপায়প্রকারজ্ঞাপনপরা বাংখ্যায়িকেত্যর্থান্তরমাহ— উপায়েতি। কথং পুনর্দ্দানস্থ্য-বিদ্যাগ্রহণোপারত্বং, তত্রাহ—প্রসিদ্ধো হীতি।
“একশৃঙ্গরা বিদ্যা পুষ্টলেন ধনেন বা।”
ইত্যাদৌ জ্ঞানাখ্যো বিদ্যাগ্রহণোপায়ো যস্মাৎ প্রসিদ্ধঃ, তস্মাত্তস্য তদুপায়ত্বে নাস্তি বক্তব্য- নিত্যর্থঃ। ‘দানে সর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতম্’ ইত্যাদিশ্রুতিষু বিদ্বস্তিরের বিদ্যাগ্রহণোপায়ো দৃষ্টস্তস্মান্ন
তস্যোপায়ত্বে বিবক্ষিতব্যমিত্যাহ-বিদ্বস্তিরিতি। উপপন্নং চ দানস্য বিদ্যাগ্রহণোপায়ত্বমিত্যাহ -দানেনেতি। ভবতু দানং বিদ্যাগ্রহণোপায়ঃ, তথাপীয়মাখ্যায়িকা কথং তৎপ্রদর্শনপরেত্যা- শঙ্ক্যাহ-প্রভূতমিতি। ননু সমুদিতেষু ব্রাহ্মণেষু ব্রহ্মিষ্ঠতমং নির্দ্ধারয়িতুং রাজা প্রবৃত্তস্তৎ- কথমন্যপরেণ গ্রন্থেন বিদ্যাগ্রহণোপায়বিধানায়াখ্যায়িকারভ্যতে, তত্রাহ-তস্মাদিতি। উপলভ্যো যথোক্তস্তচ্ছব্দার্থঃ। ২
ইতশ্চাখ্যায়িকা বিদ্যাপ্রাপ্ত্যুপায়প্রদর্শনপরেত্যাহ-অপি চেতি। তস্মিন্ বেদ্যে অর্থে বিদ্যা যেষাং তে তদ্বিদ্যান্তৈঃ সহ সম্বন্ধশ্চ তৈরেব প্রশ্নপ্রতিবচনদ্বারা বাদকরণং চ বিদ্যাপ্রাপ্তা- বুপায় ইত্যত্র গমকমাহ-ন্যায়বিদ্যায়ামিতি। তত্ত্বনির্ণয়ফলং হি বীতরাগকথামিচ্ছন্তি। তদ্বিদ্যসংযোগাদেবিদ্যাপ্রাপ্ত্যুপায়ত্বেইপি কথং প্রকৃতে তৎপ্রদর্শনপরত্বমত আহ-তচ্চেতি। তদ্বিদ্যসংযোগাদীতি যাবৎ। ন কেবলং তর্কশাস্ত্রবশাদেব তদ্বিদ্যসংযোগে প্রজ্ঞাবৃদ্ধিঃ কিন্তু স্বানুভববশাদপীত্যাহ-প্রত্যক্ষা চেতি। আখ্যায়িকাতাৎপর্য্যমুপসংহরতি-তস্মাদিতি।
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর ‘জনকঃ হ বৈদেহঃ’ ইত্যাদি যাজ্ঞবল্কীয় কাণ্ড(প্রকরণ) আরব্ধ হইতেছে। অতীত মধুকাণ্ডের সহিত এই যাজ্ঞবল্কীয় কাণ্ডের বিষয়গত সাম্য থাকিলেও এখানে যুক্তির প্রাধান্য থাকার পুনরুক্ততা দোষ হইতেছে না; কেন না, মধুকাণ্ডে প্রধানতঃ শ্রুতিদ্বারাই তত্ত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে; অথচ শ্রুতি ও যুক্তি, উভয়ই যদি একযোগে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলেই করতলস্থিত বিল্বফলের ন্যায় আত্মৈকত্ব প্রতিপাদনে সম্যক্ সাফল্যলাভ হইতে পারে; কারণ, “শ্রোতব্যঃ মন্তব্যঃ” বাক্যে স্বয়ং শ্রুতিও যুক্তির আদরণীয়তা স্বীকার করিয়াছেন। অতএব বিচারপূর্ব্বক শাস্ত্রার্থ নির্ধারণের জন্যই যুক্তিপ্রধান এই যাজ্ঞবল্কীয় কাণ্ড(প্রকরণ) আরব্ধ হইতেছে। ১
আখ্যায়িকার উদ্দেশ্য—ব্রহ্মবিদ্যার স্তুতি অথবা বিদ্যালাভের উপায় প্রদর্শন করা। দান যে, বিদ্যালাভের একটি উত্তম উপায়, ইহা লোকপ্রসিদ্ধও বটে, এবং শাস্ত্রদৃষ্টও বটে; কারণ, দান-প্রভাবেই প্রাণিগণ বশীভূত হইয়া থাকে। এখানেও প্রভৃত পরিমাণে সুবর্ণ ও সহস্রসংখ্যক গোদানের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যাই- তেছে; অতএব বুঝিতে হইবে যে, বিষয়ান্তর প্রতিপাদনের জন্য শাস্ত্রারম্ভ হইলেও বিদ্যালাভের উপায়ভূত দান-প্রদর্শনের জন্যই বক্ষ্যমাণ আখ্যায়িকার অবতারণা হইতেছে। বিশেষতঃ তদ্বিদ্যসংযোগ অর্থাৎ এক-বিদ্যাব্যবসায়ীর দর্শনলাভ, এবং তাহাদের সহিত সিদ্ধান্ত নিরূপণ করাও সিদ্ধান্তাভিজ্ঞদিগের (সম্বন্ধে) বিদ্যালাভের উপায় বলিয়া অন্যত্র দৃষ্ট হইয়াছে; এই প্রকরণেও(ষষ্ঠ ব্রাহ্মণেও) সেই তদ্বিদ্য-সংযোগের ব্যবহার-প্রাচুর্য্য রহিয়াছে, এবং বিদ্বৎ-সমাগমে
যে, জ্ঞানবৃদ্ধি হইয়া থাকে, ইহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ বটে(১)। অতএব বুঝিতে হইবে বে, বিস্তাপ্রাপ্তির উপায় প্রদর্শন করাই এই আখ্যায়িকা-সমাবেশের। প্রধান উদ্দেশ্য। ২
ওঁম্ জনকো হ বৈদেহো বহুদক্ষিণেন যজ্ঞেনেজে; তত্র হ কুরুপঞ্চালানাং ব্রাহ্মণা অভিসমেতা বভূবুঃ, তস্য হ জনকস্য বৈদেহস্য বিজিজ্ঞাসা বভূব—কঃ স্বিদেষাং ব্রাহ্মণানামনুচানতম ইতি। সহ গবাৎসহস্রমবরুরোধ দশ দশ পাদা একৈকস্যাঃ শৃঙ্গয়োরাবদ্ধা বভূবুঃ ॥ ১৪৩॥ ১॥ সরলার্থঃ।—[ অতঃপরং যুক্তিসমন্বিতেনাগমেন আত্মৈকত্বং প্রতিপাদয়িতু- মিদং যাজ্ঞবন্ধ্যং কাণ্ডমারভ্যতে—] জনকঃ(তদুপাধিকঃ) বৈদেহঃ(বিদে- হাধিপতিঃ) বহুদক্ষিণেন(তদ্বাখ্যেন, ভূরিদক্ষিণকতয়া অশ্বমেধেন বা) যজ্ঞেন ঈজে(ইষ্টবান্) হ(ঐতিহ্যে); তত্র(যজ্ঞে) কুরুপঞ্চালানাং ব্রাহ্মণাঃ(কুরু- দেশীয়াঃ পঞ্চালদেশীয়াশ্চ ব্রাহ্মণাঃ) অভিসমেতাঃ(সর্ব্বতঃ সমাগতাঃ) বভূবুঃ। [ তত্র চ] তস্য(যজ্ঞকর্ত্তৃঃ) বৈদেহস্য জনকস্য বিজিজ্ঞাসা(বিশেষেণ জ্ঞাতুমিচ্ছা) বভূব—এষাং(উপস্থিতানাং) ব্রাহ্মণানাং(ব্রহ্মবিদাৎ মধ্যে) কঃ স্বিৎ(কাম- প্রবেদনে) অনুচানতমঃ(ব্রহ্মবিত্তমঃ)[ সর্ব্বেহপি এতে অনুচানাঃ, এষাং মধ্যে অতিশয়েন অনুচানঃ কঃ? ইত্যর্থঃ] ইতি। সঃ(জনকঃ) গবাৎ সহস্রং(সহস্র-
(১) তাৎপর্য্য—তদ্বিদ্য-সংযোগ্য ও দান যে, সিদ্ধিলাভের প্রধান উপায়, আচার্য্য ঈশ্বর- কৃষ্ণও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন— “উহঃ শব্দোংধ্যয়নং দুঃখবিঘাতাস্ত্রয়ঃ সুহৃৎপ্রাপ্তিঃ। দানং চ সিদ্ধরোহষ্টৌ সিদ্ধেঃ পূর্ব্বোহস্কুশস্ত্রিবিধঃ।”
অর্থাৎ-সিদ্ধিলাভের উপায় আটটি-(১) উহ,(২) শব্দ,(৩) অধ্যয়ন,(৪-৬) ত্রিবিধ দুঃখনিবৃত্তি,(৭) সুহৃৎপ্রাপ্তি ও(৮) দান। তন্মধ্যে গুরুর নিকট যথাবিধি শাস্ত্র- গ্রহণের নাম অধ্যয়ন; অধীত শাস্ত্রের অর্থবোধের নাম শব্দ; অধীত শাস্ত্রার্থের বিচারের নাম উহ; সমবিদ্যা-ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎলাভের নাম সুহৃৎপ্রাপ্তি; এবং অভিজ্ঞ গুরুকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য প্রচুর ধনদানের নাম দান। জিজ্ঞাসু ব্যক্তি সমবিদ্য লোককে পাইয়া তাহার সহিত জিজ্ঞাস্য বিষয়ের অবধারণার্থ আলোচনা করিবেন; এইরূপ আলোচনাকে ‘তদ্বিদ্যসংবাদ’ বলে। এতদনুরূপ কথা অন্যত্রও উক্ত আছে-“গুরুশুশ্রূষা বিদ্যা পুষ্কলেন ধনেন বা। অথবা বিদ্যা বিদ্যা চতুর্থী নোপপদ্যতে।” এখানে ধনদানের সহিত গুরুশুশ্রূষা ও বিভাবিনিময়কে বিদ্যা- লাভের তুল্য উপায় বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে।
৭০৫
সংখ্যকাঃ গাঃ) অবরুরোধ(দানার্থং স্থাপিতবান্); একৈকস্যাঃ(প্রত্যেকশঃ গবাং) শৃঙ্গয়োঃ দশ দশ পাদাঃ আবদ্ধাঃ বভূবুঃ।[সুবর্ণস্য পলচতুর্থভাগঃ পাদ উচ্যতে; পলপরিমাণন্তু—“পলং তু লৌকিকৈর্মানৈঃ সাষ্টরত্তিদ্বিমাসকম্। তোলক- ত্রিতয়ং গ্রাহ্যং জ্যোতিজ্ঞৈঃ স্মৃতিসম্মতম্” ইত্যুক্তলক্ষণম্] ॥ ১৪৩॥ ১॥
মূলানুবাদ?—পুরাকালে বিদেহাধিপতি মহারাজ জনক ‘বহুদক্ষিণ’ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন; সেই যজ্ঞক্ষেত্রে কুরুদেশীয় ও পঞ্চালদেশীয় ব্রাহ্মণগণ সমাগত হইয়াছিলেন। সেই বিদেহাধিপতি জনকের হৃদয়ে বিশেষ জিজ্ঞাসার উদয় হইয়াছিল,—তিনি জানিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন যে, এই ব্রাহ্মণগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বেদবিদ্ ব্রাহ্মণ কে? তিনি[এই উদ্দেশ্যে] সহস্র গাভী পৃথক্ করিয়া রাখিয়াছিলেন, এবং প্রত্যেক গোর শৃঙ্গদ্বয়ে দশ-দশ পাদ সুবর্ণ বাঁধিয়া ছিলেন। এক পলের চারি ভাগের একভাগকে ‘পাদ’ বলা হইয়াছে ॥ ১৪৩॥ ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—জনকো নাম হ কিল সম্রাট্ রাজা বভূব বিদেহা- নাম্; তত্র ভবো বৈদেহঃ। স চ বহুদক্ষিণেন যজ্ঞেন—শাখান্তরপ্রসিদ্ধো বা বহুদক্ষিণো নাম যজ্ঞঃ, অশ্বমেধো বা দক্ষিণাবাহুল্যাৎ বহুদক্ষিণ ইহোচ্যতে,— তেনেজে অযজৎ। তত্র তস্মিন্ যজ্ঞে নিমন্ত্রিতা দর্শনকামা বা কুরূণাং দেশানাং পঞ্চালানাঞ্চ ব্রাহ্মণাঃ—তেষু হি বিদুষাং বাহুল্যং প্রসিদ্ধম্,—অভিসমেতাঃ অভি- সঙ্গতাঃ বভূবুঃ। তত্র মহান্তং বিদ্বৎসমুদায়ং দৃষ্টা তস্য হ কিল জনকস্য বৈদেহস্য যজমানস্য, কো নু খবত্র ব্রহ্মিষ্ঠ ইতি বিশেষেণ জ্ঞাতুমিচ্ছা বিজিজ্ঞাসা বভূব। কথম্? কঃ স্বিৎ কো মু খলু এষাং ব্রাহ্মণানাম্ অনুচানতমঃ?—সর্ব্বে ইমে অনু- চানাঃ, কঃ স্বিদেষাং অতিশয়েনানুচান ইতি। ১
স হ অনুচানতমবিষয়োৎপন্নজিজ্ঞাসঃ সন্ তদ্বিজ্ঞানোপায়ার্থং গবাং সহস্রং প্রথমবয়সাম্ অবরুরোধ গোষ্ঠেহবরোধং কারয়ামাস; কিংবিশিষ্টাস্তা গাবোহ- বরুদ্ধা ইত্যুচ্যতে—পলচতুর্ভাগঃ পাদঃ সুবর্ণস্য; দশ দশ পাদা একৈকস্যাঃ গোঃ শৃঙ্গয়োঃ আবদ্ধা বভূবুঃ, পঞ্চ পঞ্চ পাদা একৈকম্মিন্ শৃঙ্গে ॥ ১৪৩॥ ১ ॥
টীকা।—রাজসুয়াভিষিক্তঃ সার্ব্বভৌমো রাজা সম্রাড়িত্যুচ্যতে। বহুদক্ষিণেন যজ্ঞেনাযজ- দিতি সম্বন্ধঃ। অশ্বমেধে দক্ষিণাবাহুল্যমশ্বমেধপ্রকরণে স্থিতম্। ব্রাহ্মণা অভিসঙ্গতা বভূবুরিতি সম্বন্ধঃ। কুরুপঞ্চালানামিতি কুতো বিশেষণং, তত্রাহ—তেষু হীতি। তত্র যজ্ঞশালায়ামিতি যাবৎ। বিজিজ্ঞাসামেবাকাক্ষাপূর্বিকাং ব্যুৎপাদয়তি—কথমিত্যাদিনা। অনুচানত্বমনুবচন- সমর্থত্বম্। এষাং মধ্যেহতিশয়েনানুচানোহনুচানতমঃ, স কঃ স্যাদিতি যোজনা। একস্য
৪৫
পলস্ত চত্বারো ভাগান্তেষামেকো ভাগঃ পাদ ইত্যুচ্যতে। প্রত্যেকং শৃঙ্গয়োর্দ্দশ দশ পাদাঃ সম্বধ্যেরন্নিতি শঙ্কাং নিরাকর্ত্তুং বিভজতে—পঞ্চেতি। একৈকস্মিন্ শৃঙ্গে আবদ্ধা বভূবুরিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ১৪৩।১।
ভাষ্যানুবাদ।—পুরাকালে জনকনামে বিদেহদিগের একজন সম্রাট্ ছিলেন; সেই বিদেহে সমুদ্ভূত বলিয়া তাঁহাকে বৈদেহ বলা হইত। তিনি বহুদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ‘বহুদক্ষিণ’ শব্দটি অন্য কোনও বেদশাখায় প্রসিদ্ধ যজ্ঞেরও নাম হইতে পারে, অথবা, অশ্বমেধ-যজ্ঞকেও বহুদক্ষিণ বলা যাইতে পারে; কারণ, তাহাতেও দক্ষিণার বাহুল্য রহিয়াছে। সেই যজ্ঞ- স্থলে, প্রসিদ্ধ বিদ্বদ্বহুল কুরুদেশীয় ও পঞ্চালদেশীয় বহুতর ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হইয়া অথবা দর্শনার্থী হইয়া সমাগত হইয়াছিলেন। সেই যজ্ঞক্ষেত্রে বহুতর বিদ্বানের সমাগম সন্দর্শন করিয়া, যজ্ঞকর্তা বৈদেহ জনক মহারাজের মনে বিজিজ্ঞাসা— বিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা হইয়াছিল যে, ইহাদের মধ্যে ব্রহ্মিষ্ঠ বা ব্রহ্মবিত্তম কে? অর্থাৎ যাঁহারা এখানে আসিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই অনুচান—বেদব্যাখ্যানে সমর্থ সত্য, কিন্তু ইঁহাদের মধ্যে অনুচানতম—অতিশয় অনুচান(বেদ- বিত্তম) কে? ১
তিনি অনুচানতম বিষয়ে জিজ্ঞাসু হইয়া, তাহা জানিবার উপযুক্ত উপায়- বোধে যৌবনাবস্থ সহস্র গো গোষ্ঠে বাঁধিয়া রাখিয়াছিলেন; গরুগুলি কি প্রকার, তাহা বলিতেছেন—এক একটি গোর শৃঙ্গদ্বয়ে দশ দশ পাদ অর্থাৎ প্রত্যেক শৃঙ্গে পাচ পাঁচ পাদ সুবর্ণ বাঁধা ছিল। এক পল সুবর্ণের চারি ভাগের এক ভাগকে পাদ বলা হয়(১)॥ ১৪৩॥ ১॥
তান্ হোবাচ ব্রাহ্মণা ভগবন্তো যো বো ব্রহ্মিষ্ঠঃ স এতা গা উদজতামিতি। তে হ ব্রাহ্মণা ন দধৃবুরথ হ যাজ্ঞবল্ক্যঃ স্বমেব ব্রহ্মচারিণমুবাচৈতাঃ সোম্যোদজ সামশ্রবা ৩ ইতি, তা হোদা- চকার, তে হ ব্রাহ্মণাশ্চক্রুধুঃ কথং নো ব্রহ্মিষ্ঠো ক্রুবীতেতি। অথ হ জনকস্য বৈদেহস্য হোতাশ্বলো বভূব, স হৈনং পপ্রচ্ছ— ত্বং নু খলু নো যাজ্ঞবল্ক্য ব্রহ্মিষ্ঠোহসী ৩ ইতি, স হোবাচ নমো
৭০৭
বয়ং ব্রহ্মিষ্ঠায় কুর্ম্মো গোকামা এব বয়ং স্ম ইতি, তং হ তত এব প্রষ্টুং দধ্রে হোতাশ্বলঃ ॥ ১৪৪ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।-[জনকঃ এবমধ্যবস্য] তান্(সভাসদঃ ব্রাহ্মণান্) উবাচ হ (ঐতিহ্যে)-ভগবন্তঃ(হে পূজনীয়াঃ) ব্রাহ্মণাঃ, বঃ(যুগ্মাকং মধ্যে) যঃ ব্রহ্মিষ্ঠঃ(বেদবিত্তমঃ), সঃ(ব্রহ্মিষ্ঠঃ) এতাঃ(অবরুদ্ধাঃ) গাঃ উদজতাম্ (স্বগৃহং প্রতি প্রেরয়তু) ইতি।[এতৎ শ্রুত্বা] তে(সভাস্থাঃ) ব্রাহ্মণাঃ হ ন দধুষুঃ(আত্মনঃ ব্রহ্মিষ্ঠতাং খ্যাপয়িতুং ন মনো দধুঃ); অথ(তেষামপ্রতিভাস- নানন্তরম্) যাজ্ঞবল্ক্যঃ এব স্বং(স্বীয়ং) ব্রহ্মচারিণম্(শিষ্যম্) উবাচ-হে সোম্য সামশ্রবঃ(সামবেদং শৃণোতি ইতি সামশ্রবঃ, তৎসম্বোধনম্), এতাঃ(গাঃ) উদজ(চালয়-অম্মদগৃহং প্রাপয়েত্যর্থঃ) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্যো হি যজুর্ব্বেদবিত্তরা প্রসিদ্ধঃ, তচ্ছিষ্যশ্চ সামবেদবিৎ; ‘ঋচ্যধ্যারূঢ়ং সাম গীয়তে’ ইতি ন্যায়েন সাম্নশ্চ ঋগভিন্নতয়া, অথর্ব্ববেদশ্য চ বেদত্রয়ান্তর্গততয়া অর্থাৎ যাজ্ঞবল্ক্যস্য চতুর্ব্বেদবিত্তং সূচিতমিতি ভাবঃ]।[এবমুক্তঃ সামশ্রবাঃ] তাঃ(গাঃ) উদাচকার(উৎ- কালিতবান্)।[যাজ্ঞবল্ক্যশ্য ব্রহ্মিষ্ঠতাখ্যাপনেন] তে ব্রাহ্মণাঃ চুক্রুধুঃ(ক্রুদ্ধাঃ বভূবুঃ) হ(কিল)-কথং নঃ(অস্মাকং মধ্যে)[অয়ম্ এব] ব্রহ্মিষ্ঠঃ(বেদ- বিত্তমোহস্মি) ইতি ক্রবীত(কথয়েৎ) ইতি। অথ(অনন্তরং) বৈদেহস্য জনকস্য হোতা(ঋত্বিক্) অশ্বলঃ(তদাখ্যঃ কশ্চিৎ ব্রাহ্মণঃ) বভূব হ(কিল); সঃ(অশ্বলঃ) এনং(যাজ্ঞবল্ক্যং) পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্) হ(কিল)-হে যাজ্ঞবল্ক্য, নু(প্রশ্নে) নঃ(অস্মাকং মধ্যে) ত্বং খলু(নিশ্চয়ে) ব্রহ্মিষ্ঠঃ অসি? ইতি।[এবমুক্তঃ] সঃ(যাজ্ঞবল্ক্য:) উবাচ হ-বয়ং ব্রহ্মিষ্ঠায় নমঃ কুৰ্ম্মঃ,[পরন্তু] বয়ং গোকামাঃ (গবামর্ণিনঃ) এব স্মঃ(ভবামঃ, নতু ব্রহ্মিষ্ঠাঃ ইতি ভাবঃ)। হোতা অশ্বলঃ ততঃ (যাজ্ঞবল্ক্যশ্য ব্রহ্মিষ্ঠত্বখ্যাপনাৎ) এব তং(যাজ্ঞবল্ক্য) প্রষ্টুং(জিজ্ঞাসিতুং) দধে (মনো ধৃতবান্) হ(কিল)৷ ১৪৪॥ ২॥
মূলানুবাদ।—বিদেহাধিপতি জনক সমাগত ব্রাহ্মণগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, আপনাদের মধ্যে যিনি সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বেদবিদ, তিনি এই গোসমূহ নিজভবনে লইয়া যাউন। [এই কথা শুনিয়া] সেই ব্রাহ্মণগণ[আপনাদিগকে ব্রাহ্মণোত্তম বলিয়া পরিচয় দিতে] সাহসী হইলেন না; অতঃপর যাজ্ঞবল্ক্য-নামক ঋষি নিজের ব্রহ্মচারীকেই(শিষ্যকেই) বলিলেন—হে সোম্য সামশ্রব, তুমি এই
গরুগুলি লইয়া যাও; ব্রহ্মচারী সেই গরুগুলি লইয়া চলিলেন;[তখন] উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ ক্রুদ্ধ হইলেন,[এবং যাজ্ঞবল্ক্যকে বলিলেন-] আমা- দের মধ্যে তুমিই[আপনাকে] ব্রহ্মিষ্ঠ বলিয়া পরিচয় দিতেছ কি প্রকারে? অনন্তর, বিদেহপতি জনকের অশ্বলনামক একজন হোতা (ঋত্বিক) ছিলেন; তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন—যাজ্ঞবল্ক্য, আমাদের মধ্যে তুমিই কি সর্বোত্তম ব্রাহ্মণ?[তদুত্তরে] যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, আমরা ব্রহ্মিষ্ঠকে নমস্কার করি; আমরা হইতেছি গোকাম অর্থাৎ গো-লাভের অভিলাষী মাত্র! যাজ্ঞবল্ক্যের ব্রহ্মিষ্ঠতা-জ্ঞাপক গো-গ্রহণের দরুণই অশ্বল তাঁহার নিকট প্রশ্ন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন॥ ১৪৪ ॥ ২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—গা এবমবরুধ্য ব্রাহ্মণান্ তান্ হ উবাচ—হে ব্রাহ্মণা ভগবন্তঃ ইত্যামন্ত্র্য—যঃ বঃ যুগ্মাকং ব্রহ্মিষ্ঠঃ—সর্ব্বে যুয়ং ব্রহ্মাণঃ, অতিশয়েন যুগ্মাকং ব্রহ্মা যঃ, সঃ এতা গা উদজতাং উৎকালয়তু স্বগৃহং প্রতি। তে হ ব্রাহ্মণা ন দধূযুঃ —তে হ কিলৈবমুক্তা ব্রাহ্মণাঃ ব্রহ্মিষ্ঠতামাত্মনঃ প্রতিজ্ঞাতুং ন দধূযুঃ, ন প্রগল্ভাঃ সংবৃত্তাঃ। অপ্রগল্ভভূতেষু ব্রাহ্মণেষু অথ হ যাজ্ঞবল্ক্যঃ স্বমাত্মীয়মেব ব্রহ্মচারিণম্ অন্তেবাসিনমুবাচ—এতাঃ গাঃ হে সোম্য উদজ উদগময় অস্মদ্গৃহান্ প্রতি, হে সামশ্রবঃ—সামবিধিং হি শৃণোতি, অতোহর্থাচ্চতুর্ব্বেদো যাজ্ঞবল্ক্যঃ। তা গা হ উদাচকার উৎকালিতবান্ আচার্য্যগৃহং প্রতি। ১
যাজ্ঞবল্ক্যেন ব্রহ্মিষ্ঠ-পণস্বীকরণেনাত্মনো ব্রহ্মিষ্ঠতা, প্রতিজ্ঞাতেতি তে হ চুকুধুঃ ক্রুদ্ধবন্তঃ ব্রাহ্মণাঃ। তেষাং ক্রোধাভিপ্রায়মাচষ্টে-কথং নঃ অস্মাক- মেকৈকপ্রধানানাং ব্রহ্মিষ্ঠোহম্মীতি ব্রুবীতেতি। অথ হ এবং ক্রুদ্ধেষু ব্রাহ্মণেষু জনকস্য যজমানস্য হোতা ঋত্বিক্ অশ্বলো নাম বভূব আসীৎ; স এনং যাজ্ঞবল্ক্যং -ব্রহ্মিষ্ঠাভিমানী রাজাশ্রয়ত্বাচ্চ ধৃষ্টঃ-যাজ্ঞবল্ক্যং পপ্রচ্ছ পৃষ্টবান্-কথম্? ত্বং মু খলু নো যাজ্ঞবল্ক্য ব্রহ্মিষ্ঠোহসী ৩ তি-প্লুতির্ভৎসনার্থা। স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্য:- নমস্কুর্মো বরং ব্রহ্মিষ্ঠায়, ইদানীং গোকামাঃ স্মো বয়মিতি। তং ব্রহ্মিষ্ঠপ্রতিজ্ঞং সন্তং তত এব ব্রহ্মিষ্ঠপণস্বীকরণাৎ প্রষ্টুং দধ্রে ধৃতবান্ মনো হোতা অশ্বলঃ ॥ ১৪৪ ॥ ২॥
টীকা।—ব্রাহ্মণা বেদাধায়নসম্পন্নাস্তদর্থনিষ্ঠা ইতি যাবৎ। উৎকালয়তুদাময়তু। যতো যাজ্ঞবল্ক্যাদ্যজুর্ব্বেদবিদঃ সকাশাদ্রহ্মচারী সামবিধিং শূণোতি, ঋক্ষু চাধ্যারঢ়ং সাম গীয়তে,
ত্রিব চ বেদেষুর্ভূতোঽধর্ব্ববেদস্তস্মাদ্যজুর্গোদিনো মুনেঃ শিষ্যস্য সামবেদাধ্যয়নানুপপত্তে- র্ব্বেদচতুষ্টয়বিশিষ্টো মুনিরিভ্যাহ—অত ইতি।
নিমিত্তনিবেদনপূর্ব্বকং ব্রাহ্মণানাং সভ্যানাং ক্রোধপ্রাপ্তিং দর্শয়তি-যাজ্ঞবল্ক্যেনেতি। ক্রোধানন্তর্ষমথশব্দার্থং কথয়তি-ক্রুদ্ধেষিতি। অশ্বলপ্রশ্নস্য প্রাথমিক হেতুঃ-রাজেতি। যাজ্ঞ- বন্ধ্যমিত্যনুবাদোহন্বয়প্রদর্শনার্থঃ। প্রশ্নমেব প্রশ্নপূর্ব্বকং বিশদয়তি-কথমিত্যাদিনা। অনৌ- দ্ধত্যং ব্রহ্মবিদো লিঙ্গমিতি সূচয়তি-স হেতি। কিমিতি তহি স্বগৃহং প্রতি গাবো ব্ৰহ্মিষ্ঠ- পণভূতা নীতান্তত্রাহ-ইদানীমিতি। ন তস্য তাদৃশী প্রতিজ্ঞা প্রতিভাতীত্যাশঙ্ক্যাহ-তত এবেতি। ১৪৪।২।
ভাষ্যানুবাদ।—মহারাজ জনক এইরূপে গোসমূহ অবরুদ্ধ করিয়া সম্বোধন-পূর্ব্বক সেই ব্রাহ্মণগণকে বলিলেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, আপনাদের মধ্যে যিনি ব্রহ্মিষ্ঠ—আপনারা সকলেই ব্রাহ্মণ সত্য, কিন্তু আপনাদের মধ্যে যিনি সর্বোত্তম ব্রহ্মবিদ্, তিনি এই গোসমূহ লইয়া যাউন, অর্থাৎ স্বগৃহাভি- মুখে প্রেরণ করুন।[একথা শুনিয়া] সেই ব্রাহ্মণগণ মনোযোগ করিলেন না, অর্থাৎ জনককর্তৃক ঐরূপে অভিহিত হইয়াও সমাগত ব্রাহ্মণগণ স্বীয় ব্রহ্মিষ্ঠতা জ্ঞাপনে প্রগল্ভতা প্রকাশ করিলেন না[চুপ করিয়া রহিলেন]। অনন্তর উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ তুষ্ণীভূত থাকিলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি নিজেরই ব্রহ্মচারীকে— শিষ্যকে বলিলেন—হে সোম্য সামশ্রবঃ, এই সমস্ত গো লইয়া যাও—আমাদের গৃহাভিমুখে লইয়া যাও। সামবেদোক্ত বিধি শ্রবণ করে বলিয়া শিষ্যকে ‘সাম- শ্রবঃ’ বলা হইয়াছে; শিষ্যকে ‘সামশ্রবঃ’ শব্দে সম্বোধন করায় জানা গেল যে, যাজ্ঞবল্ক্য চতুর্বেদজ্ঞ(১)। সেই শিষ্য ঐ গোসমূহ আচার্য্যের গৃহাভিমুখে লইয়া গেল। ১
যাজ্ঞবল্ক্যের ব্রহ্মিষ্ঠ-পণ অর্থাৎ ব্রহ্মিষ্ঠতার মূল্যস্বরূপ গোগ্রহণ দ্বারাই তাঁহার ব্রহ্মিষ্ঠতা প্রতিজ্ঞাত হইল; এইজন্য উপস্থিত ব্রাহ্মণবর্গ ক্রুদ্ধ হইলেন। তাঁহাদের ক্রোধোৎপত্তির কারণীভূত অভিপ্রায় বলিতেছেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, প্রত্যেক প্রধান আমাদের মধ্যে ‘আমি হইতেছি ব্রহ্মিষ্ঠ’ এ কথা তুমি বলিতেছ কি প্রকারে?
যজ্ঞকর্তা জনকের একজন হোতা—ঋত্বিক্ ছিলেন, তাঁহার নাম অশ্বল; তিনিও ব্রহ্মিষ্ঠাভিমানী; বিশেষতঃ রাজার আশ্রিত বলিয়াও তিনি সমধিক ধৃষ্টতাসম্পন্ন (বাচাল); ব্রাহ্মণগণ এইরূপে ক্রোধপরবশ হইলে পর, তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন; কি প্রকার? হে যাজ্ঞবল্ক্য, নিশ্চয় বল তুমিই কি আমাদের মধ্যে ব্রহ্মিষ্ঠ?[প্রশ্নেতে যে, ত্রিমাত্রাত্মক প্লুত স্বর প্রযুক্ত হইয়াছে], যাজ্ঞবল্ক্যকে ভর্ৎসনা করাই তাহার উদ্দেশ্য।[তদুত্তরে] যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—আমরা ব্রহ্মিষ্ঠকে নমস্কার করি; এখন আমরা হইতেছি কেবল গোকাম(গো-প্রার্থী); [তাই ঐরূপ বলিয়াছি]। যাজ্ঞবল্ক্য ঐরূপে ব্রহ্মিষ্ঠ-পণ স্বীকার করাতেই ব্রহ্মিষ্ঠতা-প্রতিজ্ঞাকারী সেই যাজ্ঞবল্ক্যকে হোতা অশ্বল প্রশ্ন করিতে কৃতনিশ্চয় হইলেন ॥ ১৪৪ ॥ ২॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যদিদৎসর্ব্বং মৃত্যুনাপ্তৎসর্ব্বং মৃত্যু- নাভিপন্নম্, কেন যজমানো মৃত্যোরাপ্তিমতিমুচ্যত ইতি। হোত্রত্বিজাগ্নিনা বাচা, বাথৈ যজ্ঞস্য হোতা তদেয়ং বাক্ সোহয়মগ্নিঃ স হোতা স মুক্তিঃ সাতিমুক্তিঃ ॥ ১৪৫ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ।—[তত্র যাজ্ঞবল্ক্যস্য আভিমুখ্যমাপাদয়িতুং সম্বোধয়ন্নাহ— যাজ্ঞবল্ক্যেতি]। হে যাজ্ঞবল্ক্য ইতি সম্বোধয়ন্[অশ্বলঃ] উবাচ হ—যৎ ইদং (অনুভূয়মানং) সর্ব্বং(কর্মসাধনং ঋত্বিগাদি) মৃত্যুনা(ফলাসঙ্গযুক্তেন কৰ্ম্মণা) আপ্তং(ব্যাপ্তং), সর্ব্বং মৃত্যুনা অভিপন্নং(বশীকৃতং চ), যজমানঃ কেন (দর্শনাত্মকেন সাধনেন) মৃত্যোঃ আপ্তিং(মৃত্যোরধিকারং) অতিমুচ্যতে (অতীত্য মুচ্যতে ইত্যর্থঃ) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হোত্রা ঋত্বিজা, অগ্নিনা বাচা[সাধনেন] ইতি।[শ্রুতিঃ স্বয়মেব তদর্থং ব্যাচষ্টে—“বাগবৈ” ইত্যাদিনা]। যজ্ঞস্য(যজমানস্য) বাক্ বৈ(এব) হোতা(ঋত্বিক্)।[কথমিত্যাহ—] তৎ(তত্র যজ্ঞে) যা ইয়ং(প্রসিদ্ধা) বাক্, সঃ অয়ং[অধিদৈবতে] অগ্নিঃ (“অগ্নির্বাগ্ভূত্বা মুখং প্রাবিশৎ” ইতি শ্রুতেঃ বাচঃ অগ্নিরূপত্বং বোধ্যম্); সঃ (অগ্নিঃ) হোতা, সঃ মুক্তিঃ(মুক্তিসাধনং), সা(অগ্নিরূপা বাক্) অতিমুক্তিঃ (মৃত্যোরতিক্রমোপায় ইত্যর্থঃ)। ১৪৫ ॥ ৩॥
মূলানুবাদ?—অশ্বল পুনশ্চ সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন—[ বল দেখি,] এই যে, যজ্ঞসাধন ঋত্বিক্ অগ্নি প্রভৃতি সকলেই সকাম কর্ম্মরূপ মৃত্যুকর্তৃক গ্রস্ত আছে, এবং সকলেই
৭১১
যে, মৃত্যুর বশীভূত হইয়া রহিয়াছে; যজমান কোন্ উপায়ে সেই মৃত্যু-গ্রাস হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারে?[তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] হোতা, ঋত্বিক্, অগ্নি ও বাক্ দ্বারা; কারণ, বাক্ই যজ্ঞের প্রকৃত হোতা; প্রসিদ্ধ যজ্ঞে যাহা বাক্,[অধিদৈবরূপে] তাহাই অগ্নি, তাহাই হোতা, তাহাই মুক্তি এবং তাহাই অতিমুক্তি অর্থাৎ অগ্নিভাব প্রাপ্তিরূপ ফলসাধন ॥ ১৪৫ ॥ ৩ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ। তত্র মধুকাণ্ডে পাংক্তেন কর্ম্মণা দর্শনসমুচ্চিতেন যজমানস্য মৃত্যোরত্যয়ো ব্যাখ্যাতঃ উদ্গীথপ্রকরণে সঙ্ক্ষেপতঃ; তস্যৈব পরীক্ষাবিষয়োহয়ম্—ইতি তদ্গতদর্শনবিশেষার্থোহয়ং বিস্তর আরভ্যতে। ১
যদিদং সাধনজাতম্ অস্য কৰ্ম্মণঃ ঋত্বিগগ্ল্যাদি মৃত্যুনা কৰ্ম্মলক্ষণেন স্বাভা- বিকাসঙ্গসহিতেন আপ্তং ব্যাপ্তম্; ন কেবলং ব্যাপ্তম্, অভিপন্নং চ মৃত্যুনা বশীকৃতং চ; কেন দর্শনলক্ষণেন সাধনেন যজমানঃ মৃত্যোরাপ্তিম্ অতিমৃত্যুগোচরত্ব- মতিক্রম্য মুচ্যতে, স্বতন্ত্রো মৃত্যোরবশো ভবতীত্যর্থঃ। ননুদ্গীথে এবাভিহিতম্— যেনাতিমুচ্যতে—মুখ্যপ্রাণাত্মদর্শনেনেতি? বাঢ়ম্ উক্তম্; যোহমুক্তো বিশেষস্তত্র, তদর্থোহয়মারম্ভ ইত্যদোষঃ। ২
হোত্রা ঋত্বিজা অগ্নিনা বাচেত্যাহ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। এতস্যার্থং ব্যাচষ্টে-কঃ পুনর্হোতা যেন মৃত্যুমতিক্রামতীতি? উচ্যতে-“বাগ্বৈ যজ্ঞস্য যজমানস্য”- “যজ্ঞো বৈ যজমানঃ” ইতি শ্রুতেঃ; যজ্ঞস্য যজমানস্য যা বাক্, সৈব হোতা অধিযজ্ঞে। কথম্? তৎ তত্র যা ইয়ং বাক্ যজ্ঞস্য যজমানস্য, সোহয়ং প্রসিদ্ধো- হগ্নিরধিদৈবতম্; তদেতৎ এ্যন্নপ্রকরণে ব্যাখ্যাতম্। স চাগ্নির্হোতা “অগ্নির্ব্বৈ হোতা” ইতি শ্রুতেঃ, তদেতদ্যজ্ঞস্য সাধনদ্বয়ম্-হোতা চ ঋত্বিক্” অধিযজ্ঞম্, অধ্যাত্মঞ্চ বাক্-এতদুভয়ং সাধনদ্বয়ং পরিচ্ছিন্নং মৃত্যুনা আপ্তং-স্বাভাবিকা- জ্ঞানাসঙ্গপ্রযুক্তেন কৰ্ম্মণা মৃত্যুনা প্রতিক্ষণমন্যথাত্বমাপাদ্যমানং বশীকৃতম্। তদ- নেনাধিদৈবতরূপেণাগ্নিনা দৃশ্যমানং যজমানস্য যজ্ঞস্য মৃত্যোরতিমুক্তয়ে ভবতি; তদেতদাহ-স মুক্তিঃ স হোতা অগ্নিঃ মুক্তিঃ অগ্নিস্বরূপদর্শনমেব মুক্তিঃ; যদৈব সাধনদ্বয়মগ্নিরূপেণ পশ্যতি, তদানীমেব হি স্বাভাবিকাদাসঙ্গান্ম ত্যোব্বিমুচ্যতে আধ্যাত্মিকাৎ পরিচ্ছিন্নরূপাদাধিভৌতিকাচ্চ। তস্মাৎ স হোতা অগ্নিরূপেণ দৃষ্টো মুক্তিঃ মুক্তিসাধনং যজমানস্য। ৩
সা অতিমুক্তিঃ-যৈব চ মুক্তিঃ, সা অতিমুক্তিরতিমুক্তিসাধনমিত্যর্থঃ। সাধনদ্বয়স্য পরিচ্ছিন্নস্থ্য যা অধিদৈবতরূপেণাপরিচ্ছিন্নেনাগ্নিরূপেণ দৃষ্টিঃ, সা মুক্তিঃ; যাসৌ মুক্তিরধিদৈবত-দৃষ্টিঃ, সৈব-অধ্যাত্মাধিভূতপরিচ্ছেদবিষয়াসঙ্গাস্পদং মৃত্যুম্ অতিক্রম্য অধিদেবতাত্বস্যাগ্নিভাবশ্য প্রাপ্তির্যা ফলভূতা, সা অতিমুক্তিরিত্যু- চ্যতে; তস্যা অতিমুক্তেম্মুক্তিরেব সাধনমিতি কৃত্বা সা অতিমুক্তিরিত্যাহ। যজ- মানস্য হ্যুতিমুক্তিব্বাগাদীনামগ্ন্যাদিভাব ইত্যুদগীথপ্রকরণে ব্যাখ্যাতম্; তত্র সামান্যেন মুখ্যপ্রাণদর্শনমাত্রং মুক্তিসাধনমুক্তম্, ন তদ্বিশেষঃ; বাগাদীনামগ্ন্যাদি- দর্শনম্; ইহ বিশেষো বর্ণ্যতে; মৃত্যুপ্রাপ্ত্যতিমুক্তিস্তু সৈব ফলভূতা, যা উদ্গীথ- ব্রাহ্মণেন ব্যাখ্যাতা-মৃত্যুমতিক্রান্তো দীপ্যত ইত্যাদ্যা ৷ ১৪৫ ॥ ৩॥
টীকা।—তত্র প্রথমং মুনেরাভিমুখ্যমাপাদয়িতুং সংবোধয়তি--যাজ্ঞবল্ক্যেতি। উত্তরীত্যাম্বল- প্রশ্নে প্রস্তুতে তস্যোদগীথাধিকারেণ সঙ্গতিমাহ—তত্রেতি। মধুকাণ্ডে পূর্ব্বত্র ব্যাখ্যাতে যদু- দগীথপ্রকরণং, তস্মিন্নাসঙ্গপাপ্যুনো মৃত্যোরত্যয়ঃ সমুচ্চিতেন কর্মণা সঙ্ক্ষেপতো ব্যাখ্যাত ইতি সম্বন্ধঃ। তস্যৈবোদগীথদর্শনস্যেতি যাবৎ। পরীক্ষাবিষয়ো বিচারভূমিরয়ং প্রশ্নপ্রতিবচনরূপো গ্রন্থ ইত্যর্থঃ। তচ্ছব্দঃ সমনন্তরনিদ্দিষ্টগ্রন্থবিষয়ঃ। দর্শনমুদগীথোপাসনং, তস্য বিশেষো বাগাদেরগ্নাদ্যাত্মত্ববিজ্ঞানং, তৎসিদ্ধার্থোহয়ং প্রক্রমঃ। ১
এবমবান্তরসঙ্গতিমুক্ত। প্রশ্নাক্ষরাণি ব্যাচষ্টে-যদিদমিতি। মৃত্যুনাপ্তমিত্যনেন মৃত্যুনাভিপন্নমিত্যস্য গতার্থত্বমাশঙ্ক্যাহ-ন কেবলমিতি। কর্মণো মৃত্যুত্বাত্তেন মৃত্যোরত্যয়া- যোগাত্তদত্যয়সাধনং কিঞ্চিদ্দর্শনমেব বাচ্যমিত্যাশয়েন পৃচ্ছতি-কেনেতি। দর্শনবিষয়ং প্রশ্ন- মাক্ষিপতি-নম্বিতি। যেন মুখ্যপ্রাণাত্মদর্শনেনাতিমুচ্যতে, তদুদ্গীথপ্রক্রিয়ায়ামেবোত্তং; তথাচ মৃত্যোরত্যয়োপায়স্থ বিজ্ঞানস্থ নির্জাতত্বাৎ কেনেতি প্রশ্নানুপপত্তিরিতি যোজনা। তস্যৈব পরীক্ষাবিষয়োহয়মিত্যাদাবুক্তমাদায় পরিহরতি-বাঢ়মিতি। উদগাথপ্রকরণে বাগাদেরগ্না- স্বাত্মত্বদর্শনরূপো যো বিশেষো বক্তব্যোহপি নোক্তস্তদুক্ত্যর্থোহয়ং প্রশ্নপ্রতিবচনরূপো গ্রন্থ ইতি কৃত্বা কেনেত্যাদিপ্রশ্নোপপত্তিরিত্যর্থঃ। ২
কীদৃক্ পুনর্দর্শনং মৃত্যুজয়সাধনং হোত্রেত্যাদাবুক্তমিত্যাশঙ্ক্যাহ-এতস্থেতি। ব্যাচষ্টে বাঘৈ যজ্ঞস্তেত্যাদিনেতি শেষঃ। ব্যাখ্যানমেব বিশদয়িতুং পৃচ্ছতি-কঃ পুনরিতি। দর্শন- বিষয়ং দর্শরন্নুত্তরমাহ-উচ্যত ইতি। যজ্ঞশব্দস্য যজমানে বৃদ্ধপ্রয়োগো নাস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-যজ্ঞ ইতি। যজমানস্য যা বাগধ্যাত্মং, সৈবাধিযজ্ঞে হোতাহস্ত, তথাপি কথং তয়োদ্দেবতাত্মনা দর্শনমিত্যাহ-কথমিতি। তয়োরগ্ন্যাত্মনা দর্শনমুত্তরবাক্যাবষ্টন্তেন ব্যাচষ্টে-তত্তত্রেতি। কথং পুনর্ব্বাগগ্যোরেকত্বং, তদাহ-তদেতদিতি। তয়োরেকত্বেইপি কুতো হোতুস্তদৈক্যমিত্যা- শঙ্ক্যাহ-স চেতি। স মুক্তিরিতেতদবতারয়িতুং ভূমিকাং করোতি-যদেতদিতি। ন কেবলমেতদুভয়ং মৃত্যুনা সংস্পৃষ্টমেব, কিন্তু তেন বশীকৃতং চেত্যাহ-স্বাভাবিকেতি। মৃত্যুনাপ্তং মৃত্যুনাহভিপন্নমিত্যনয়োরর্থমনুদ্য হোত্রেত্যাদেরর্থমনুবদতি-তদনেনেতি। সাধনদ্বয়ং তচ্ছব্দার্থঃ। যজমানগ্রহণং হোতুরুপলক্ষণম্। উক্তেহর্থে সমনন্তরবাক্যমবতার্য্য ব্যাকরোতি-তদেতদাহেতি।
৭১৩
মুক্তিশব্দস্তৎসাধনবিষয়ঃ। পদার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ-অগ্নিস্বরূপেতি। বাচো হোতুশ্চাগ্নি- স্বরূপেণ দর্শনমেব মুক্তিহেতুরিতি যাবৎ। উক্তমর্থং প্রপঞ্চয়তি-যদৈবেতি। স মুক্তিরিত্য- স্যার্থমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ৩
বাক্যান্তরং সমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-সাতিমুক্তিরিতি। মুক্ত্যতিমুক্ত্যেরসঙ্কীর্ণত্বং দর্শয়তি- সাধনদ্বয়স্যেতি। প্রাপ্তিরতিমুক্তিরিতি সম্বন্ধঃ। তামেব সংগৃহ্নাতি-যা ফলভূতেতি। ফল- ভূতায়ামগ্ন্যাদিদেবতাপ্রাপ্তৌ কথমতিমুক্তিশব্দোপপত্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্যা ইতি। ননু বাগা- দীনামগ্ন্যাদিভাবোহত্র ক্রয়তে, যজমানস্ত তু ন কিঞ্চিদুচ্যতে, তত্রাহ-যজমানস্যেতি। তর্হি তেনৈব গতার্থত্বাদনর্থকমিদং ব্রাহ্মণমিত্যাশঙ্ক্য বাঢ়মিত্যাদিনোক্তং স্মারয়তি-তত্রেতি। দর্শনবৎ ফলেহপি বিশেষ: স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-মৃত্যুপ্রাপ্তীতি। ১৪৫।৩।
ভাষ্যানুবাদ।—অশ্বল যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন;—বিজ্ঞানসহকৃত পাঙ্ক্তকর্ম্ম দ্বারা যে, যজমানের মৃত্যুভয় বারণ হয়, ইহা অতীত মধুব্রাহ্মণের উদ্গীথ- প্রকরণে সংক্ষেপে কথিত হইয়াছে; এখন আবার তাহারই পরীক্ষা বা বিস্তৃতভাবে বিচার করা আবশ্যক হইয়াছে; সেইজন্য সেই বিজ্ঞানসম্বন্ধেই আরও কিছু বিশেষ কথা বলিবার নিমিত্ত তাহারই বিবৃতিস্বরূপ এই প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে। ১
এই কর্মের(যজ্ঞের) ঋত্বিক্ ও অগ্নিপ্রভৃতি যাহা কিছু সাধন অর্থাৎ কৰ্ম্ম- সম্পাদনের উপকরণ, তৎসমস্তই স্বভাবসিদ্ধ ফলাসক্তি-সমন্বিত কৰ্ম্মরূপ মৃত্যুকর্তৃক ব্যাপ্ত(অধিকৃত); কেবল যে, ব্যাপ্তই বটে, তাহা নহে; পরন্তু অভিপন্নও বটে, অর্থাৎ মৃত্যু দ্বারা বশীকৃতও বটে।[জিজ্ঞাসা করি-] যজমান কি প্রকারে বিজ্ঞা- নাত্মক সাধন দ্বারা মৃত্যুর প্রাপ্তি অতিক্রম করিয়া অর্থাৎ মৃত্যুর অধিকার অতিক্রম করিয়া মুক্ত হন-মৃত্যুর বশীভূত না হইয়া স্বাতন্ত্র্য লাভ করিয়া থাকেন? ভাল কথা, উদগীথপ্রকরণেই ত কথিত হইয়াছে যে, মুখ্যপ্রাণে আত্মদৃষ্টি করিলে, তাহা দ্বারাই মৃত্যুর অধিকার অতিক্রম করিয়া মুক্ত হওয়া যায়, তবে আবার তাহার পুনরুক্তির প্রয়োজন কি? হাঁ, একথা আংশিক সত্য বটে; কিন্তু সেখানে সমস্ত বিশেষাংশ উক্ত হয় নাই, এখানে সেই অনুক্ত বিশেষাংশ নিরূপণের জন্যই এই কথার অবতারণা করা আবশ্যক হইয়াছে; সুতরাং পুনরুক্তি-দোষ হইতেছে না। ২
যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—‘হোত্রা ঋত্বিজা, অগ্নিনা বাচা’ ইতি। এখন একথার ব্যাখ্যা করিয়া বলিতেছেন—সেই হোতা কে,—যাহা দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করিতে পারা যায়, তাহা বলা হইতেছে—বাক্ই যজ্ঞের—যজমানের হোতা; অর্থাৎ ‘যজ্ঞই যজমান’ এই শ্রুতিবাক্য হইতে জানা যায় যে, যজ্ঞ-শব্দবাচ্য যজমা- নের যাহা বাক্, তাহাই অধিযজ্ঞে(অধ্যাত্মযাগে) হোতা। তাহা কি প্রকার?
না-সেখানে(যজ্ঞে) যজমানসম্বন্ধিনী যে বাক্, তাহাই অধিদৈবত অগ্নি বলিয়া প্রসিদ্ধ; একথা ‘অন্নত্রয়’ নিরূপণের প্রকরণেই বিশেষরূপে বুঝাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ‘অগ্নিই হোতা’ এই শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, সেই অগ্নিই প্রকৃত হোতা। যজ্ঞসম্বন্ধে যে, এই প্রসিদ্ধ সাধনদ্বয়-প্রসিদ্ধ- যজ্ঞের সাধন হইল হোতা(ঋত্বিক্), আর অধ্যাত্ম যজ্ঞের সাধন হইল বাক্, এই উভয়বিধ যজ্ঞসাধনই পরিচ্ছিন্ন(সসীম) এবং মৃত্যুকর্তৃক ব্যাপ্ত, অর্থাৎ অজ্ঞানজ স্বাভাবিক ফলাসক্তিসমন্বিত কর্মাত্মক মৃত্যু দ্বারা প্রতিমুহূর্তে বিকৃতিভাবাপন্ন- মৃত্যুর বশীভূত। এই বাক্রূপ সাধনটিকে অধিদৈবত অগ্নিরূপে দর্শন করিতে পারিলে তাহাই যজমানের মৃত্যুভয় অতিক্রমের কারণ হইয়া থাকে। এখন সেই কথাই বুঝাইয়া বলিতেছেন-তাহাই মুক্তি, সেই হোতৃস্বরূপ অগ্নিই হইতেছে মুক্তি অর্থাৎ অগ্নির স্বরূপবিজ্ঞানই মুক্তিলাভের হেতু। বুঝিতে হইবে, যজমান যখনই যজ্ঞের উক্ত সাধন দুইটিকে অগ্নিরূপে দর্শন করে, তখনই স্বভাবসিদ্ধ আসক্তি এবং আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক পরিচ্ছিন্নভাবরূপ মৃত্যু হইতে বিমুক্ত হইয়া থাকে। অতএব[বুঝিতে হইবে যে,] হোতাকে অগ্নিরূপে দর্শন করাই যজমানের মুক্তিলাভের উপায়। ৩
“সা অতিমুক্তিঃ” অর্থাৎ তাহাই অতিমুক্তি—যাহা মুক্তি, অর্থাৎ সেই মুক্তিই অতিমুক্তি-লাভের উপায়। অভিপ্রায় এই যে, পূর্ব্বোক্ত পরিচ্ছিন্ন সাধনদ্বয়ের যে, অপরিচ্ছিন্ন অধিদৈবত অগ্নিরূপে দর্শন বা চিন্তা, তাহারই নাম মুক্তি, আর এই যে, অধিদৈবত দর্শনাত্মক মুক্তি, তাহাই—আধ্যাত্মিক ও আধিভৌতিক পরিচ্ছেদযুক্ত বিষয়াসক্তির গোচরীভূত মৃত্যুকে অতিক্রম করিয়া যে, তৎফলস্বরূপ অধিদৈবাত্মক অগ্নিভাবপ্রাপ্তি, তাহাই ‘অতিমুক্তি’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। মুক্তিই সেই অতিমুক্তিলাভের প্রধান উপায়; এইজন্য মুক্তিকেই অতিমুক্তি বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। উদগীথপ্রকরণে কথিত হইয়াছে যে, বাক্-প্রভৃতি করণ- সমূহের যে, অগ্নিপ্রভৃতি দেবতাত্মভাব, তাহাই যজমানের অতিমুক্তি। সেখানে সাধারণভাবে কেবল মুখ্যপ্রাণদৃষ্টিকেই মুক্তিসাধন বলা হইয়াছে, কিন্তু তদগত কোন বিশেষ কথাই বলা হয় নাই; এখানে সেই অনুক্ত বিশেষ—বাক্প্রভৃতিতে প্রাণদৃষ্টি বর্ণিত হইতেছে। তাহার পর, উদগীথব্রাহ্মণে “মৃত্যুম্ অতিক্রান্তে’ দীপ্যতে” ইত্যাদি বাক্যে যে, বিদ্যা-ফল উল্লিখিত হইয়াছে, সেই ফলই এখানে মৃত্যুপ্রাপ্তির অতিক্রমণরূপ অতিমুক্তি নামে কথিত হইয়াছে, বস্তুতঃ ইহা তাহা হইতে অতিরিক্ত ফল নহে ॥ ১৪৫ ॥ ৩ ॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ, যদিদং সর্ব্বমহোরাত্রাভ্যামাপ্তং সর্ব্বমহোরাত্রাভ্যামভিপন্নং, কেন যজমানোহহোরাত্রয়োরাপ্তি- মতিমুচ্যত ইত্যধ্বর্য্যুণর্ত্তিজা চক্ষুষাদিত্যেন, চক্ষুর্ব্বে যজ্ঞস্যাধ্বর্য্য- স্তদযদিদং চক্ষুঃ সোহসাবাদিত্যঃ সোহধ্বর্য্যুঃ সঃ মুক্তিঃ সাতি- মুক্তিঃ ॥ ১৪৬ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—[ অশ্বলঃ পুনরপি সর্ব্ববিপরিণামহেতোঃ কালাৎ অতি- মুক্তিমাখ্যাতুং পৃচ্ছতি যাজ্ঞবল্ক্যেতি]। যাজ্ঞবল্ক্যেতি[সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—যৎ ইদং সর্ব্বং(কর্ম্মসাধনং) অহোরাত্রাভ্যাং(দিন-যামিনীভ্যাং) আপ্তম্, সর্ব্বম্ অহোরাত্রাভ্যাং অভিপন্নম্(পূর্ব্ববৎ); যজমানঃ কেন(কীদৃশেন সাধনেন) অহোরাত্রয়োঃ আপ্তিং(আক্রমণং) অতি(অতিক্রম্য) মুচ্যতে ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] অধ্বর্য্যুণা ঋত্বিজা, চক্ষুষা আদিত্যেন[অতি- মুচ্যতে ইতি ভাবঃ]।[কথং তদিত্যাহ—] চক্ষুঃ বৈ(এব) যজ্ঞস্য অধ্বর্য্যঃ; তৎ(তত্র অধিযজ্ঞে) যদ্ ইদং চক্ষুঃ,[অধিদৈবতে] সঃ অসৌ আদিত্যঃ সঃ অধ্বর্য্যঃ, সঃ মুক্তিঃ, সা অতিমুক্তিঃ(অতিমুক্তিসাধনমিত্যর্থঃ)। ১৪৬॥ ৪॥
মূলানুবাদ।-অশ্বল পুনরপি সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই যে, যজ্ঞ-সাধন-সমূহ অহোরাত্র (দিবারাত্র) দ্বারা আক্রান্ত এবং সমস্তই যে, অহোরাত্র দ্বারা বশীকৃত হইয়া রহিয়াছে, যজমান কোন্ উপায়ে সেই মৃত্যুর আক্রমণ অতিক্রম করিয়া মুক্ত হইতে পারে?(তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-) অধ্বর্য্য ঋত্বিক, চক্ষু ও আদিত্য দ্বারা[মুক্ত হইতে পারে]।[এ কথারই সমর্থনের জন্য বলিতেছেন-] যজমানের চক্ষুই অধ্বর্য্য; সেই যজ্ঞেতে যাহা যজমানের চক্ষু, তাহাই অধিদৈবতরূপে আদিত্য, তাহাই সেখানে অধ্বর্য্য; তাহাই মুক্তি, এবং তাহাই অতিমুক্তি ॥ ১৪৬॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যাজ্ঞবন্ধ্যেতি হোবাচ। স্বাভাবিকাদজ্ঞানাসঙ্গ- প্রযুক্তাৎ কর্মলক্ষণাৎ মৃত্যোরতিমুক্তিব্যাখ্যাতা। তস্য কৰ্ম্মণঃ সাসঙ্গস্য মৃত্যোরাশ্রয়ভূতানাং দর্শপূর্ণমাসাদিকৰ্ম্মসাধনানাং যো পরিণামহেতুঃ কালঃ, তস্মাৎ কালাৎ পৃথগতিমুক্তির্ব্বক্তব্যেতীদমারভ্যতে, ক্রিয়ানুষ্ঠানব্যতি- রেকেণাপি প্রাগৃর্দ্ধঞ্চ ক্রিয়ায়াঃ সাধনবিপরিণামহেতুত্বেন ব্যাপারদর্শনাৎ
কালস্য; তস্মাৎ পৃথক্ কালাদতিমুক্তিবক্তব্যোতাত আহ—যদিদং সর্ব্বমহো- রাত্রাভ্যামাপ্তম্। ১
স চ কালো দ্বিরূপঃ—অহোরাত্রাদিলক্ষণঃ, তিথ্যাদিলক্ষণশ্চ; তত্র অহো- রাত্রাদিলক্ষণাৎ তাবদতিমুক্তিমাহ—অহোরাত্রাভ্যাং হি সর্ব্বং জায়তে বর্দ্ধতে বিনশ্যতি চ; তথা যজ্ঞসাধনঞ্চ—যজ্ঞস্য যজমানস্য চক্ষুরধ্বর্য্যুশ্চ; শিষ্টান্যক্ষরাণি পূর্ব্ববন্নেয়ানি। ২
যজমানস্য চক্ষুরধ্বর্য্যুশ্চ সাধনদ্বয়ম্ অধ্যাত্মাধিভূতপরিচ্ছেদং হিত্বা অধিদৈবতা- ত্মনা দৃষ্টং যৎ, স মুক্তিঃ; সোহধ্বর্য্যুরাদিত্যভাবেন দৃষ্টো মুক্তিঃ; সৈব মুক্তিরেবাতি- মুক্তিরিতি পূর্ব্ববৎ; আদিত্যাত্মভাবমাপন্নস্য হি নাহোরাত্রে সম্ভবতঃ ॥ ১৪৬ ॥ ৪ ॥
টীকা। -প্রশান্তরমবতার্য্য তাৎপর্য্যমাহ-যাজ্ঞবন্দ্যেতি।[আশ্রয়ভূতানি কানি তানীত্যা- শঙ্ক্যাহ-দর্শপূর্ণমাসাদীতি। প্রতিক্ষণমন্যথাত্বং বিপরিণামঃ। অগ্ন্যাদিসাধনান্যাশ্রিত্য কাম্যং কৰ্ম্ম মৃতু‘শব্দিতমুৎপদ্যতে, তেষাং সাধনানাং বিপরিণামহেতুত্বাৎ কালো মৃত্যুস্ততোহতিমুক্তি- র্বক্তব্যোত্যত্তরগ্রন্থারম্ভ ইত্যর্থঃ। কর্মণো মুক্তিরুক্তা চেৎ, কালাদপি সোক্তৈব, তস্য কৰ্ম্মান্ত- ভাবেন মৃত্যুত্বাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-পৃথগিতি। কর্মনিরপেক্ষতয়া কালস্য মৃত্যুত্বং ব্যুৎপাদয়তি- ক্রিয়েতি। পৃথঙ্মৃত্যুত্বে সিদ্ধে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। উত্তরগ্রন্থস্থপ্রশ্নয়োর্বিষয়ং ভেতুং কালং ভিনত্তি-স চেতি। আদিত্যশ্চন্দ্রশ্চেতি কর্তৃভেদাৎ দ্বৈবিধ্যমুন্নেয়ম্। কালস্য দ্বৈরুপ্যে সত্যাদ্যকণ্ডিকাবিষয়মাহ-তত্রেতি। অহোরাত্রয়োমৃত্যুত্বে সিদ্ধে তাভ্যামতিমুক্তির্ব্বক্তব্যা, তদেব কথমিত্যাশঙ্ক্যাহ অহোরাত্রাভ্যামিতি। যজ্ঞসাধনং চ তথা তাভ্যাং জায়তে বর্দ্ধতে নশ্যতি চেতি সম্বন্ধঃ। প্রতিবচনব্যাখ্যানে যজ্ঞশব্দার্থমাহ-যজমানস্যেতি। স মুক্তিরিত্যন্য তাৎপৰ্য্যার্থমাহ-যজমানস্যেত্যাদিনা। তস্যৈবাহক্ষরার্থং কথয়তি-সোহধ্বর্ষুরিতি। যথোক্ত- রীত্যাদিত্যাত্মত্বেংপি কথমহোরাত্রলক্ষণাৎ মৃত্যোরতিমুক্তিরত আহ-আদিত্যেতি। ‘নোদেতা নাস্তমেতা’ ইত্যাদিশ্রুতেরাদিত্যে বস্তুতো নাহোরাত্রে শুঃ। তথা চ তদাত্মনি বিদুষ্যপি ন তে সম্ভবত ইত্যর্থঃ। ১৪৬।৪।
ভাষ্যানুবাদ।—অশ্বল পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন— স্বভাবসিদ্ধ অজ্ঞানাসক্তি-সমন্বিত কর্ম্মরূপ মৃত্যু হইতে অতিমুক্তির কথা পূর্ব্ব- শ্রুতিতে ব্যাখ্যাত হইয়াছে; ফলাসক্তিসমন্বিত সেই কর্ম্মরূপ মৃত্যু যে সকলকে আশ্রয় করিয়া উৎপন্ন হয়, অর্থাৎ যাহাদিগকে অবলম্বন করিয়া দর্শ-পূর্ণমাস প্রভৃতি কর্ম্মনিচয় আরব্ধ হইয়া থাকে, সেই সাধনসমূহও যাহা দ্বারা বিপরিণত(বিকারগ্রস্ত) হইয়া থাকে, পূর্ব্বোক্ত ‘অতিমৃত্যু’ নিশ্চয়ই সেই কাল হইতেও পৃথক্ বা স্বতন্ত্র বস্তু; কারণ, ক্রিয়ানুষ্ঠানের অভাবেও ক্রিয়াসাধনের পরিণামজনক কালের ব্যাপার সর্ব্বদাই প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে;
৭১৭
অতএব কাল হইতেও সম্পূর্ণ পৃথক্ অতিমৃত্যুর কথা স্বতন্ত্রভাবে অবশ্যই বক্তব্য; সেই উদ্দেশ্যেই বলিতেছেন—জগতে যে কোন বস্তু অনুভবগোচর হয়, তৎসমস্তই অহোরাত্র দ্বারা আক্রান্ত। ১
উপরে যে কালের কথা বলা হইল, সেই কাল আবার দুইভাগে বিভক্ত—এক দিবারাত্রাত্মক, অপর তিথিপ্রভৃতিস্বরূপ। তন্মধ্যে প্রথমে অহোরাত্রাত্মক কাল হইতে পৃথক্ অতিমুক্তির কথা বলিতেছেন—অহোরাত্র হইতেই সমস্ত বস্তু জন্ম লাভ করে, বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, এবং ধ্বংসগ্রস্ত হয়; এইরূপ যজ্ঞপদবাচ্য যজমানের চক্ষুঃস্বরূপ অধ্বর্য্যুও অহোরাত্র হইতে জন্ম, স্থিতি ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়। শ্রুতির অবশিষ্ট কথাগুলির ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ। ২
যজমানের চক্ষু(আদিত্য) ও অধ্বর্য্যু(ঋত্বিবিশেষ), এই দ্বিবিধ সাধনের উপর আধ্যাত্মিক ও আধিভৌতিকভাব পরিত্যাগপূর্ব্বক যে, অধিদৈবতভাবে দৃষ্টি, তাহাই মুক্তি অর্থাৎ অধ্বর্য্যুকে আদিত্যরূপে দর্শন করাই মুক্তি। পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও মুক্তিই অতিমুক্তিপদবাচ্য হইয়া থাকে; কারণ, যে লোক আদিত্যাদি দৈবতভাব প্রাপ্ত হয়, তাহার সম্বন্ধে আর অহোরাত্র-সম্বন্ধ সম্ভবপর হয় না॥ ১৪৬॥ ৪ ॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ—যদিদসর্ব্বং পূর্ব্বপক্ষাপরপক্ষাভ্যা- মাপ্তং সর্ব্বং পূর্ব্বপক্ষাপরপক্ষাভ্যামভিপন্নং, কেন যজমানঃ পূর্ব্বপক্ষাপরপক্ষয়োরাপ্তিমতিমুচ্যত ইতি। উদগাত্রত্বিজা বায়ুনা প্রাণেন; প্রাণো বৈ যজ্ঞস্যোদগাতা, তদেযাহয়ং প্রাণঃ স বায়ুঃ স উদ্গাতা স মুক্তিঃ সাতিমুক্তিঃ ॥ ১৪৭ ॥ ৫ ॥
সরলার্থঃ।—[ইদানীং তিথ্যাদিলক্ষণাৎ কালাদতিমুক্তিং বক্তুং যাজ্ঞ- বন্ধ্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—যৎ ইদং(দৃশ্যমানং) সর্ব্বং(বস্তু) পূর্ব্বপক্ষাপর- পক্ষাভ্যাং(শুক্ল-কৃষ্ণপক্ষাভ্যাং) ব্যাপ্তং—সর্ব্বং পূর্ব্বপক্ষাপরপক্ষাভ্যাম্ অভিপন্নং (কবলীকৃতম্)[ভবতি; তত্র পৃচ্ছামি—] যজমানঃ(যজ্ঞকর্তা) কেন(উপা- য়েন) পূর্ব্বপক্ষাপরপক্ষয়োঃ আপ্তিং(আক্রমণং) অতিমুচ্যতে(অতীত্য মুক্তো ভবতি)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] উদগাত্রা(সামবিদা) ঋত্বিজা বায়ুনা প্রাণেন(ঋত্বিক্-কর্ম্মণি নিযুক্তে উদগাতরি বায়ুভূত-প্রাণদৃষ্ট্যা অতিমুচ্যতে ইতি ভাবঃ)। বৈ(যতঃ) যজ্ঞস্য(যজমানস্য) প্রাণঃ উদ্গাতা; তৎ(তত্র) যঃ অয়ং প্রাণঃ, স বায়ুঃ, সঃ(প্রাণঃ) উদ্গাতা, সঃ(প্রাণঃ) মুক্তিঃ, সা(প্রসিদ্ধা)
অতিমুক্তিঃ[চ];[উদ্গাতরি অধ্যাত্ম-পরিচ্ছেদং পরিত্যজ্য যা প্রাণাত্মদৃষ্টিঃ, সৈব কালাদতিমুক্তিহেতুরিত্যাশয়ঃ] ॥ ১৪৭ ॥ ৫ ॥
মূলানুবাদ।—এখন তিথ্যাদিরূপ কাল হইতে অতিমুক্তির উপায় বলিতেছেন—অশ্বল পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই যে, সমস্ত জগৎ পূর্ব্বপক্ষ ও অপর পক্ষ দ্বারা—অর্থাৎ শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ দ্বারা ব্যাপ্ত—সমস্তই যে, শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষ দ্বারা কবলিত হইয়া রহিয়াছে;[জিজ্ঞাসা করি—] যজমান (যজ্ঞ-কর্তা) কি উপায়ে সেই শুক্ল-কৃষ্ণপক্ষের আক্রমণ হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] বায়ু-প্রাণাত্মক অধ্বর্য্য ঋত্বিকের দ্বারা[পরিত্রাণ পাইতে পারে]; কারণ, যজ্ঞরূপী যজমানের প্রাণই উদ্গাতা; যাহা এই প্রাণ, তাহাই বায়ুস্বরূপ, তাহাই উদ্গাতা, তাহাই মুক্তি এবং তাহাই অতিমুক্তি॥ ১৪৭ ॥ ৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদানীং তিথ্যাদিলক্ষণাদতিমুক্তিরুচ্যতে—যদিদং সর্ব্ব- মহোরাত্রয়োরবিশিষ্টয়োরাদিত্যঃ কর্তা, ন প্রতিপদাদীনাং তিথীনাম্; তাসান্ত বৃদ্ধিক্ষয়োপগমনেন প্রতিপৎপ্রভৃতীনাং চন্দ্রমাঃ কর্তা; অতস্তদাপত্যা পূর্ব্বপক্ষা- পরপক্ষাত্যয়ঃ, আদিত্যাপত্যা অহোরাত্রাত্যয়বৎ। তত্র যজমানস্য প্রাণো বায়ুঃ, স এবোদ্গাতা ইত্যুদ্গীথব্রাহ্মণেহবগতম্; “বাচা চ হ্যেব স প্রাণেন চোদগায়ৎ” ইতি চ নির্দ্ধারিতম্; “অথৈতস্য প্রাণন্যাপঃ শরীরং জ্যোতীরূপমসৌ চন্দ্রঃ” ইতি চ। প্রাণবায়ুচন্দ্রমসামেকত্বাচ্চন্দ্রমসা বায়ুনা চোপসংহারে ন কশ্চিদ্বিশেষঃ—এবং অন্যমানা শ্রুতির্বায়ুনাধিদৈবতরূপেণোপসংহরতি।
অপি চ, বায়ুনিমিত্তৌ হি বৃদ্ধিক্ষয়ৌ চন্দ্রমসঃ; তেন তিথ্যাদিলক্ষণস্য কালস্য কর্তুরপি কারয়িতা বায়ুঃ; অতো বায়ুরূপাপন্নঃ তিথ্যাদিকালাদতীতো ভবতীত্যুপ- পন্নতরং ভবতি; তেন শ্রুত্যন্তরে চন্দ্ররূপেণ ‘দৃষ্টিমুক্তিরতিমুক্তিশ্চ; ইহ তু কানাং সাধনদ্বয়স্য তৎকারণরূপেণ বাযাত্মনা দৃষ্টিমুক্তিরতিমুক্তিশ্চেতি ন শ্রুত্যোর্বিরোধঃ ॥ ১৪৭ ॥ ৫ ॥
টাকা।—কণ্ডিকান্তরস্য তাৎপর্য্যমাহ—ইদানীমিতি। নন্বহোরাত্রাদিলক্ষণে কালে তিথ্যাদিলক্ষণস্য কালসান্তর্ভাবাত্ততোঽতিমুক্তাবুক্তায়াং তিথ্যাদিলক্ষণাদপি কালাদাসাবুক্তৈ- বেতি কৃতং পৃথগারম্ভেণেভি, তত্রাহ—অহোরাত্রয়োরিতি। অবিশিষ্টয়োবৃদ্ধিক্ষয়শূন্যরোরিতি যাবৎ। কথং তর্হি তিথ্যাদিলক্ষণাৎ কালাদতিমুক্তিরত আহ—অতস্তদাপত্ত্যেতি। চন্দ্রপ্রাপ্ত্যা
তিথ্যাদ্যত্যয়ো মাধ্যন্দিনশ্রুত্যোচ্যতে, কাথশ্রুত্যা তু বায়ুভাবাপত্যা তদত্যয় উক্তঃ। তথা চ শ্রুত্যোর্বিরোধে কঃ সমাধিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-তত্রেতি। কাথশ্রুতাবিতি যাবৎ। উদ্গাতুরপি প্রাণাত্মকবায়ুরূপত্বং শ্রুতিদ্বয়ানুসারেণ দর্শয়তি-স এবেতি। ন কেবলমুদগাতুঃ প্রাণত্বং প্রতিজ্ঞামাত্রেণ প্রতিপন্নং, কিন্তু বিচার্য্য নির্দ্ধারিতং চেত্যাহ-বাচেতি। প্রাণচন্দ্রমসোশ্চৈকত্বং সপ্তান্নাধিকারে নির্ধারিতমিত্যাহ-অথেতি। উক্তয়া রীভ্যা প্রাণাদীনামেকত্বে শ্রুত্যোর- বিরোধং ফলিতমাহ-প্রাণেতি। মনোব্রহ্মণোশ্চন্দ্রমসা প্রাণোদগাত্রোশ্চ বায়ুনোপাস্যত্বেনোপ- সংগ্রহে মৃত্যুতরণে বিশেষো নাস্তীতি শ্রুত্যোর্বিকল্পেনোপপত্তিরিত্যর্থঃ। উপসংহরতি প্রাণ- মুদগাতারং চ তদ্রূপেণোপাস্যতয়া সংগৃহ্লাতি কাথশ্রুতিরিত্যর্থঃ। ইতশ্চ কাথশ্রুতিরুপপন্নে- ত্যাহ-অপি চেতি। বায়ুঃ সূত্রাত্মা তন্নিমিত্তৌ স্বাবয়বস্য চন্দ্রমসো বৃদ্ধিহ্রাসৌ। সূত্রাধীনা হি চন্দ্রাদের্জগতশ্চেষ্টেত্যর্থঃ। বৃদ্ধ্যাদিহেতুত্বে ফলিতমাহ-তেনেতি। কর্তৃশ্চন্দ্রস্যেত্যর্থঃ। বায়োশ্চন্দ্রমসি কারয়িতৃত্বেহপি প্রকৃতে কিমায়াতং, তদাহ-অত ইতি। উদিতামুদিতহোম- বদ্বিকল্পমুপেত্যাবিরোধমুপসংহরতি-তেনেতি। শ্রুত্যন্তরং মাধ্যন্দিনশ্রুতিঃ। সাধন- স্বয়স্যেত্যুভয়ত্র সম্বধ্যতে। তত্রাদৌ মনসো ব্রহ্মণশ্চেত্যর্থঃ। উত্তরত্র প্রাণস্যোদগাতুশ্চেত্যর্থঃ। তচ্ছব্দশ্চন্দ্রবিষয়ঃ। ১৪৭॥৫॥
ভাষ্যানুবাদ।—এখন তিথ্যাদিরূপ কাল হইতে অতিমুক্তি বলা হইতেছে—সূর্য্যদেব হইতেছেন—তুল্যস্বভাব দিবারাত্রের কর্তা, কিন্তু প্রতিপদ্ প্রভৃতি তিথিসমূহের হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পাদন দ্বারা চন্দ্র হইতেছেন—তিথিসমূহের কর্তা বা প্রবর্ত্তক; অতএব আদিত্যভাব। প্রাপ্তিতে যেমন অহোরাত্রাধিকার অতিক্রম করা যায়, তেমনি চন্দ্রভাব-প্রাপ্তি দ্বারাও শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের অধিকার অতিক্রম করিতে পারা যায়। উদগীথব্রাহ্মণে জানা গিয়াছে যে, যজমানের যে প্রাণবায়ু, তাহাই প্রকৃত উদ্গাতা(সামবেদীয় ঋত্বিক্); এবং সেখানে ইহাও অবধারিত হইয়াছে যে, ‘যজমান বাক্ ও প্রাণের সাহায্যেই উদঘাট গান করিয়াছিলেন এবং জল হইতেছে এই প্রাণের শরীর, আর এই চন্দ্র হইতেছে তাহার জ্যোতির্ম্ময় রূপ’; এইরূপে দেখা যাইতেছে যে, প্রাণ, বায়ু ও চন্দ্র প্রকৃতপক্ষে একই পদার্থ; সুতরাং উপসংহারে চন্দ্র ও বায়ুর উল্লেখ থাকাতেও বস্তুগত কোনও পার্থক্য ঘটিতেছে না; এই অভিপ্রায়েই শ্রুতি অধিদৈবতরূপ বায়ু দ্বারা কথার উপসংহার করিয়াছেন।
আরও এক কথা—চন্দ্রের যে, হ্রাস-বৃদ্ধি হইয়া থাকে, বায়ুই তাহার মুখ্য কারণ; অতএব বুঝা যাইতেছে যে, বায়ুই তিথ্যাদি-কালসম্পাদক চন্দ্রেরও প্রবৃত্তি বা কার্য্য ঘটাইয়া থাকে; অতএব যজমান যে, বায়ুভাব প্রাপ্ত হইয়া তিথ্যাদিরূপ কাল অতিক্রম করে, ইহা সুসঙ্গতই বটে। এই জন্যই, অন্য শ্রুতিতে(মাধ্যন্দিন শাখায়) যে, চন্দ্ররূপে দৃষ্টিকে মুক্তি ও অতিমুক্তি বলা হইয়াছে, আর কাণ্বশ্রুতিতে
যে, অহোরাত্র ও তিথ্যাদি, এই উভয়বিধ সাধনে তৎকারণীভূত বায়ুভাব- দর্শনে মুক্তি ও অতিমুক্তি বলা হইয়াছে, ইহাতেও কোনরূপ বিরোধ ঘটিতেছে না ॥ ১৪৭ ॥ ৫ ॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ—যদিদমন্তরিক্ষমনারম্বণামব, কেনা- ক্রমেণ যজমানঃ স্বর্গং লোকমাক্রমত ইতি। ব্রহ্মণত্বিজা মনসা চন্দ্রেণ; মনো বৈ যজ্ঞস্য ব্রহ্মা, তদযদিদং মনঃ সোহসৌ চন্দ্রঃ স ব্রহ্মা স মুক্তিঃ সাহতিমুক্তিরিত্যতিমোক্ষাঃ। অথ সম্পদঃ—॥ ১৪৮ ॥ ৬ ॥
সরলার্থঃ।—[অশ্বলঃ পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—যৎ. ইদম্ অন্তরিক্ষং(আকাশং) অনারম্বণং(নিরালম্বনং) ইব[দৃশ্যতে];[তদালম্বনৎ তু ন বিজ্ঞায়তে ইত্যভিপ্রায়ঃ]। কেন(তেন কেন) আক্রমণেণ(আলম্বনেন) যজ- মানঃ স্বর্গং লোকং আক্রমতে(ফলরূপেণ প্রাপ্নোতি)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্যঃ আহ—]. ব্রহ্মণা ঋত্বিজা মনসা চন্দ্রেণ[আক্রমতে]। মনঃ বৈ(এব) যজ্ঞস্য(যজমানস্য) ব্রহ্মা; তৎ(তস্মাৎ) যৎ ইদং মনঃ, সঃ(তৎ মনঃ) অসৌ(দ্যুলোকস্থঃ) চন্দ্রঃ, সঃ ব্রহ্মা, সঃ মুক্তিঃ, সা অতিমুক্তিঃ, ইতি(এবংপ্রকারাঃ) অতিমোক্ষাঃ (অতিমুক্তয় উক্তা ইত্যর্থঃ)। অথ(অতঃপরং) সম্পদঃ(সম্পদ্রূপাঃ ক্রিয়াঃ) [উচ্যন্তে—]॥ ১৪৮ ॥ ৬॥
মূলানুবাদ।-অশ্বল পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন-এই যে, অন্তরিক্ষ(আকাশমণ্ডল) নিরালম্বনবৎ দেখা যাইতেছে, অর্থাৎ ইহার কোনও অবলম্বন জানা যাইতেছে না; সেই অবিজ্ঞাত কোন্ অবলম্বন জানিলে পর যজমান স্বর্গলোক লাভ করিতে পারে?[তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] ঋত্বিক্ ব্রহ্মা ও মনোরূপী চন্দ্র দ্বারা; কেন না, প্রকৃতপক্ষে মনই যজ্ঞের ব্রহ্মা; যাহা এই মন, তাহাই এই চন্দ্র, তাহাই ব্রহ্মা, তাহাই মুক্তি ও তাহাই অতিমুক্তি; এই সমস্তই অতিমুক্তির প্রকারভেদ। অতঃপর সম্পদুপাসনার কথা বলা হইতেছে-৷ ১৪৮ ॥ ৬॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—মৃত্যোঃ কালাদতিমুক্তিব্যাখ্যাতা যজমানস্য। সোহ- তিমুচ্যমানঃ কেনাবষ্টন্তেন পরিচ্ছেদবিষয়ং মৃত্যুমতীত্য ফলং প্রাপ্নোতি—অতি-
৭২১
মুচ্যতে—ইতি? উচ্যতে—যদিদং প্রসিদ্ধমন্তরিক্ষমাকাশম্ অনারম্বণমনালম্বনমিব, ইবশব্দাদস্ত্যেব তত্রালম্বনম্, তত্ত্ব ন জ্ঞায়ত ইত্যভিপ্রায়ঃ। যত্তু তদজ্ঞায়মান- মালম্বনং, তৎ সর্ব্বনাম্না কেনেতি পৃচ্ছ্যতে; অন্যথা ফলপ্রাপ্তেরসম্ভবাৎ; যেনাব- ষ্টন্তেন আক্রমণেণ যজমানঃ কৰ্ম্মফলং প্রতিপদ্যমান অতিমুচ্যতে, কিং তদিতি প্রশ্ন- বিষয়ঃ; কেন আক্রমণেণ যজমানঃ স্বর্গং লোকমাক্রমত ইতি স্বর্গং লোকং ফলং প্রাপ্নোতি অতিমুচ্যুত ইত্যর্থঃ। ব্রহ্মণা ঋত্বিজা মনসা চন্দ্রেণেত্যক্ষরন্যাসঃ পূর্ব্ববৎ। ১
তত্রাধ্যাত্মং যজ্ঞস্য যজমানস্য যদিদং প্রসিদ্ধং মনঃ, সোহসৌ চন্দ্রঃ অধিদৈবম্; মনোহধ্যাত্মম্, চন্দ্রমা অধিদৈবতমিতি হি প্রসিদ্ধম্। স এব চন্দ্রমা ব্রহ্মা ঋত্বিক্, তেন—অধিভূতং ব্রহ্মণঃ পরিচ্ছিন্নং রূপম্ অধ্যাত্মং চ মনসঃ, এতদ্বয়ম্ অপরি- চ্ছিন্নেন্ চন্দ্রমসো রূপেণ পশ্যতি; তেন চন্দ্রমসা মনসা অবলম্বনেন কৰ্ম্মফলং স্বর্গং লোকং প্রাপ্নোতি অতিমুচ্যত ইত্যভিপ্রায়ঃ। ইতীত্যুপসংহারার্থং বচনম্; ইত্যে- বম্প্রকারা মৃত্যোরতিমোক্ষাঃ; সর্ব্বাণি হি দর্শনপ্রকারানি যজ্ঞাঙ্গবিষয়াণ্যস্মিন্নব- সরে উক্তানীতি কৃত্বা উপসংহারঃ—ইত্যতিমোক্ষাঃ—এবম্প্রকারা অতিমোক্ষা ইত্যর্থঃ। ২
অথ সম্পদঃ-অথ অধুনা সম্পদ উচ্যন্তে। সম্পৎ নাম-কেনচিৎ সামান্যেন অগ্নিহোত্রাদীনাং কৰ্ম্মণাৎ ফলবতাং তৎফলায় সম্পাদনম্, সম্পৎফলস্যৈব বা; সর্ব্বোৎসাহেন ফলসাধনানুষ্ঠানে প্রযতমানানাং কেনচিদ্বৈগুণ্যেনাসম্ভবঃ; তদি- দানীং আহিতাগ্নিঃ সন্ যৎকিঞ্চিৎ কৰ্ম্ম অগ্নিহোত্রাদীনাং যথাসম্ভবমাদায় আল- স্বনীকৃত্য কৰ্ম্মফলবিদ্বত্তায়াং সত্যাং যৎকৰ্ম্মফলকামো ভবতি, তদেব সম্পাদয়তি। অন্যথা রাজসূয়াশ্বমেধ-পুরুষমেধ-সর্ব্বমেধলক্ষণানামধিক্বতানাং ত্রৈবর্ণিকানামপ্য- সম্ভবঃ-তেষাং তৎপাঠঃ স্বাধ্যায়ার্থ এব কেবলঃ স্যাৎ, যদি তৎফলপ্রাপ্ত্যুপায়ঃ কশ্চন ন স্যাৎ। তস্মাত্তেষাং সম্পদৈব তৎফলপ্রাপ্তিঃ, তস্মাৎ সম্পদামপি ফলবত্ত্বম্, অতঃ সম্পদ আরভ্যন্তে-৷৷ ১৩৮ ॥ ৬॥
টীকা।—যদিদমন্তরিক্ষমিত্যাদি প্রশ্নান্তরং বৃত্তানুবাদপূর্ব্বকমুপাদত্তে—মৃত্যোরিতি। ব্যাখ্যানব্যাখ্যেয়ভাবেন ক্রিয়াপদে নেতব্যে। ইত্যেতৎ প্রশ্নরূপমুচ্যতে সমনন্তরবাক্যেনেতি যাবৎ। তদ্ব্যাচষ্টে—যদিদমিতি। কেনেতি প্রশ্নস্য বিষয়মাহ—যত্নিতি। প্রশ্নবিষয়ং প্রপঞ্চ- রতি—অন্যথেতি। আলম্বনমন্তরেণেতি যাবৎ। প্রশ্নার্থং সঙ্ক্রিপ্যোপসংহরতি—কেনেতি। অক্ষরন্যাসোহক্ষরাণামর্থেষু বৃত্তিরিতি যাবৎ। মনো বৈ যজ্ঞস্থেত্যাদেরর্থমাহ—তত্রেতি। ব্যবহারভূমিঃ সপ্তম্যর্থঃ। বাক্যার্থমাহ—ভেনেতি। তৃতীয়া তৃতীয়াভ্যাং সম্বধ্যতে। দর্শন- ফলমাহ—ভেনেতি। বাগাদীনামগ্ন্যাদিভাবেন দর্শনমুক্তং, ত্বগাদীনাং তু বাযাদিভাবেন দর্শনং
বক্তব্যম্, তৎ কথং বক্তব্যশেষে সত্যুপসংহারোপপত্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্ব্বাণীতি। বাগাদাবুক্ত- স্থায়স্য ত্বগাদাবতিদেশোহত্র বিবক্ষিত ইত্যাহ-এবপ্রকারা ইতি। ২
অথশব্দো দর্শনপ্রভেদকথনানন্তর্য্যার্থঃ। কেয়ং সম্পন্নামেতি পৃচ্ছতি-সম্পন্নামেতি। উত্তর- মাহ-কেনচিদিতি। মহতাং ফলবতামন্বমেধাদিকৰ্ম্মণাং কৰ্ম্মত্বাদিনা সামান্যেণাল্লীয়ঃসু কৰ্ম্মসু বিবক্ষিতফলসিদ্ধ্যর্থং সম্পত্তিঃ সম্পদুচ্যতে। যথাশক্ত্যগ্নিহোত্রাদিনির্বর্তনেনাম্বমেধাদি ময়া নির্বর্ত্যত ইতি ধ্যানং সম্পদিত্যর্থঃ। যদ্বা ফলস্যৈব দেবলোকাদেরুম্বলত্বাদিসামান্যেনাজ্যাঘাঃ- হুতিষু সম্পাদনং সম্পদিত্যাহ-ফলস্তেতি। সম্পদনুষ্ঠানাবসরমাদর্শয়তি-সর্ব্বোৎসাহেনেতি। অসম্ভবোহনুষ্ঠানস্ত্য যদেতি শেষঃ। কর্মিণামের সম্পদনুষ্ঠানেহধিকার ইতি দশায়তুমাহিতাগ্নিঃ সন্নিত্যুক্তম্। অগ্নিহোত্রাদীনামিতি নির্ধারণে ষষ্ঠী। যথাসম্ভবং বর্ণাশ্রমানুরূপানিতি যাবৎ। আদায়েত্যস্থ ব্যাখ্যানমালম্বনীকৃত্যেতি। ন কেবলং কস্মিত্বমের সম্পদনুষ্ঠাতুরপেক্ষাতে, কিন্তু ভৎফলবিদ্যাবত্ত্বমপীত্যাহ-কর্ম্মেতি। তদেব কৰ্ম্মফলমেবেত্যর্থঃ। কর্মাণ্যের ফলবস্তি ন সম্পদঃ, তৎকথং তাসাং কার্য্যতেত্যাশঙ্ক্যাহ-অন্যখেতি। বিহিতাধ্যয়নস্বার্থজ্ঞানানুষ্ঠানাদি- পরস্পরয়া ফলবত্ত্বমিষ্টন্। ন চাস্বমেধাদিষু সর্ব্বেযামনুষ্ঠানসম্ভবঃ, কৰ্ম্মস্বধিকৃতানানপি ত্রৈবর্ণি- কানাং কেষাঞ্চিদনুষ্ঠানাসম্ভবাদতস্তেষাং তদধ্যয়নার্থবত্ত্বানুপপত্যা। সম্পদামপি ফলবত্ত্বমেষ্টব্য- মিত্যর্থঃ। মহতোহস্বমেধাদিফলস্য কথমল্লীরস্যা সম্পদা প্রাপ্তিরিত্যাশঙ্কা শাস্ত্রপ্রামাণ্যাদিত্যভি- প্রেত্যাহ-যদীতি। তদা তৎপাঠঃ স্বাধ্যায়ার্থ এবেতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। অধ্যয়নস্য ফলবত্ত্বে বক্তব্যে ফলিতমাহ-ভস্মাদিতি। তেষাং রাজসূয়াদীনামিতি যাবৎ। ব্রাহ্মণাদীনাং রাজ- সুরাভধ্যয়নসামর্য্যাত্তেষাং সম্পদদৈব তৎফলপ্রাপ্তাবপি কিং সিধ্যতি, তদাহ-তস্মাৎ সম্পদা- মিতি। কৰ্ম্মণামিবেতি দৃষ্টান্তার্থোহপি-শব্দঃ। তাসাং ফলবত্ত্বে ফলিতমাহ-অত ইতি। ১৪৮। ৬৪
ভাষ্যানুবাদ।—যজমানের কালরূপী মৃত্যু হইতে যে প্রকারে অতি- মুক্তি হইতে পারে, তাহা কথিত হইল। সেই যজমান অতিমুক্তি লাভ সময়ে কোন উপায়ের আশ্রয়ে থাকিয়া সসীমবিষয়ক মৃত্যু অতিক্রম করিয়া ফল প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ অতিমুক্ত হয়, এখন সে কথা বলা হইতেছে—এই যে, প্রসিদ্ধ অন্তরিক্ষ—আকাশ অনারম্বণ অর্থাৎ নিরালম্বনের ন্যায় প্রতীত হইতেছে। [ অনারম্বণম্ ইব] শ্রুতিতে ‘ইব’ শব্দ থাকায় বুঝা যাইতেছে যে, নিশ্চয়ই ইহার একটা অবলম্বন বা আশ্রয় আছে, কিন্তু তাহা জানা যাইতেছে না; এই যে অবিজ্ঞাত আলম্বন, তাহাই এখানে সর্ব্বনাম ‘কেন’ পদে জিজ্ঞাসিত হইয়াছে; নচেৎ বিজ্ঞানফল-প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে না, অর্থাৎ এরূপ কোন একটি নির্দিষ্ট বস্তু গ্রহণ না করিলে পরবর্তী কথার সহিত এ কথার কোন সঙ্গতিই থাকে না। এখানে প্রষ্টব্য বিষয় হইতেছে এই যে, যজমান, যে অবষ্টম্ভ বা আশ্রয় বস্তুর বিজ্ঞানে কর্মফল প্রাপ্ত হইয়া অতিমুক্ত হয়, সেই বস্তুটি কি?—যজমান কোন আলম্বন- বিজ্ঞানে স্বর্গফল আক্রমণ করে অর্থাৎ ফলরূপে স্বর্গলোক লাভ করে—অতিমুক্ত
৭২৩
হয়। ‘ব্রহ্মণা ঋত্বিজা মনসা চন্দ্রেণ’ এই কথাগুলির অর্থ—পূর্ব্বোক্ত ‘উদ্গাত্রা ঋত্বিজা’ ইত্যাদি কথার অর্থের অনুরূপ। ১
তন্মধ্যে লোকপ্রসিদ্ধ মন হইতেছে—যজ্ঞ-শব্দবাচ্য যজমানের অধ্যাত্ম, আর প্রসিদ্ধ চন্দ্র হইতেছে অধিদৈবত রূপ; মন যে, অধ্যাত্ম আর চন্দ্র যে, অধিদৈবত, ইহা লোকপ্রসিদ্ধও বটে। সেই চন্দ্রই আবার ঋত্বিক্ ব্রহ্মা-স্বরূপ; এইজন্য ব্রহ্মার পরিচ্ছিন্ন অধিভূত(ভূতান্তর্গত) রূপ এবং অধ্যাত্ম-সম্বন্ধী মনের রূপ, এই উভয়বিধ সাধনকে যজমান অপরিচ্ছিন্ন অধি-দৈবত চন্দ্ররূপে দর্শন করেন। অভিপ্রায় এই যে সেই অধ্যাত্ম মন ও অধিদৈবত চন্দ্ররূপ অবলম্বন করিয়া অর্থাৎ উক্তপ্রকার ভাবনা- বলে কর্মফল—স্বর্গলোক লাভ করিয়া থাকেন,—অতিমুক্ত হন। বক্তব্য বিষয়ের উপসংহার সূচনার্থ ‘ইতি’ শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে,—যজ্ঞাদিসম্বন্ধে যত প্রকার দর্শন হইতে পারে, এই অবসরে সে সমস্তই বলা হইল; এই অভিপ্রায়ে উপসংহার করা হইল যে, “ইতি অতিমোক্ষাঃ”—অতিমোক্ষের উপায়সমূহ এই প্রকারই বটে, এতদতিরিক্ত আর কিছু নাই। ২
অতঃপর সম্পদ-ক্রিয়া-সমূহ কথিত হইতেছে-সম্পদ অর্থ-অধিক ফল- লাভের উদ্দেশ্যে স্বল্প ফলজনক অগ্নিহোত্রাদি কর্মসমূহকে তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট কর্মরূপে সম্পাদন করা, অথবা যজ্ঞকেই ফলরূপে ভাবনা করা(১);[অভিপ্রায় এই যে,] যাহারা পূর্ণ উদ্যমে ফলসাধন-কর্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়, তাহাদেরও কোন একটি বৈগুণ্য বশতঃ অনুষ্ঠানে ব্যাঘাত হইতে পারে; সেই কারণে অধিকৃত পুরুষ আহিতাগ্নি(অগ্নিহোত্রী) হইয়া সম্ভবমত যে কোন একটি কৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া বিজ্ঞাত কর্মফলের মধ্যে, যে কৰ্ম্মফলটি পাইতে অভিলাষী হয়, অবলম্বিত কৰ্ম্ম দ্বারা সেই ফলই সম্পাদন করিয়া লইতে পারেন; নচেৎ রাজসূয়, অশ্বমেধ, নরমেধ ও সর্ব্বমেধ প্রভৃতি যে সমস্ত কৰ্মে ব্রাহ্মণাদি
বর্ণত্রয়ের অধিকার উক্ত আছে, তাহাদেরও সেই সমস্ত কর্ম্মের অনুষ্ঠান করা অসম্ভব হইয়া পড়ে। তাহাদের যদি ঐ সমস্ত ফলপ্রাপ্তির কোন উপায়ই না থাকে, তবে সে সমুদয়ের উল্লেখ কেবল অধ্যয়নার্থ অর্থাৎ পাঠমাত্রেই পর্য্যবসিত হইতে পারে,(কোন কাজে আসিতে পারে না)। অতএব বলিতে হইবে যে, সম্পদ- রূপেই তাহাদের সেই সমস্ত ফলপ্রাপ্তি হইয়া থাকে; সুতরাং সম্পদেরও সফলতা আছে; সফলতা আছে বলিয়াই এখন সম্পদানুষ্ঠানের কথা আরব্ধ হইতেছে ॥ ১৪৮ ॥ ৬॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ—কতিভিরয়মদ্যগ্ভিহোতাস্মিন্ যজ্ঞে করিষ্যতীতি। তিসৃভিরিতি, কতমাস্তাস্তিস্র ইতি, পুরোহনু- বাক্যা চ যাজ্যা চ শস্যৈব তৃতীয়া, কিং তাভির্জয়তীতি, যৎ- কিঞ্চেদং প্রাণভুদিতি ॥ ১৪৯ ॥ ৭ ॥
সরলার্থঃ।—[অশ্বলঃ যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্ পুনরপি] উবাচ হ— অয়ং হোতা(ঋগ্বেদবিৎ ঋত্বিক্) অদ্য অস্মিন্(অনুষ্ঠীয়মানে) যজ্ঞে কতিভিঃ (কিয়ৎসংখ্যকাভিঃ) ঋভিঃ[কৰ্ম্ম] করিষ্যতি ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] তিসৃভিঃ(ঋক্ত্রয়েণ)[করিষ্যতি] ইতি।[অশ্বলঃ পুনরাহ—] তাঃ (ত্বদুক্তাঃ) তিস্রঃ(ত্রিত্বসংখ্যাকাঃ ঋচঃ) কতমাঃ(কিন্নামকাঃ) ইতি। [যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] ‘পুরোহনুবাক্যা’চ, ‘যাজ্যা’চ ‘শস্যা’ এব তৃতীয়া।[পুনঃ প্রশ্নঃ—] তাভিঃ(উক্তাভিঃ ঋভিঃ) কিং(কিন্নামকং ফলং) জয়তি(বশী- করোতি—লভতে)? ইতি।[উত্তরং—] ইদং(দৃশ্যমানং) যৎকিঞ্চ প্রাণভূৎ (প্রাণিজাতম্) ইতি॥ ১৪৯॥ ৭॥
মূলানুবাদ?—অশ্বল পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—যাজ্ঞবল্ক্য, এই হোতা আজ এই যজ্ঞে কতগুলি ঋকমন্ত্র দ্বারা কর্ম্ম করিবেন? যাজ্ঞ- বল্ক্য বলিলেন—তিনটি ঋকমন্ত্র দ্বারা।[পুনশ্চ প্রশ্ন হইল—] সেই তিনটি ঋক্ কি কি?[উত্তর—](১) ‘পুরোহনুবাক্যা,’(২) ‘যাজ্যা’ ও তৃতীয় ঋক্ ‘শস্যা’।[পুনঃ প্রশ্ন হইল,] সেই তিনটি ঋকের দ্বারা কোন্ ফল জয় করেন?[উত্তর—] এই যাহা কিছু প্রাণিজাত(জীব- জগৎ), তাহা জয় করেন॥ ১৪৯॥ ৭॥
শঙ্করভাষ্য।—বাণবর্দ্ধনমিতি হোবাচ অভিমুখীকরণায়। ‘কতিভি-
৭২৫
রয়মদ্য ঋভিহোতাস্মিন্ যজ্ঞে‘—কতিভিঃ কতিসঙ্খ্যাভিঃ ঋভিঃ ঋগ্জাতিভিঃ, অয়ং হোতা ঋত্বিক্, অস্মিন্ যজ্ঞে করিষ্যতি শস্ত্রং শংসতি? আহেতরঃ—তিসৃভিঃ ঋগ্জাতিভিঃ—ইত্যুক্তবন্তং প্রত্যাহ ইতরঃ—কতমাস্তাস্তিস্র ইতি? সঙ্খ্যো- বিষয়োহয়ং প্রশ্নঃ, পূর্ব্বস্তু সঙ্খ্যাবিষয়ঃ।
পুরোহনুবাক্যা চ—প্রাক্ প্রয়োগকালাৎ যাঃ প্রযুজ্যন্তে ঋচঃ, সা ঋগ্জাতিঃ পুরোহনুবাক্যেত্যুচ্যতে, যাগার্থং যাঃ প্রযুজ্যন্তে ঋচঃ, সা ঋগ্জাতির্য্যা; শস্ত্রার্থং যাঃ প্রযুজ্যন্তে ঋচঃ, সা ঋগ্জাতিঃ শস্যা; সর্ব্বাস্তু যাঃ কাশ্চন ঋচঃ, তাঃ স্তোত্রিয়া বা অন্যা বা সর্ব্বা এতাস্বেব তিসৃষু ঋগ্জাতিঘন্তর্ভবন্তি। কিং তাভি- র্জয়তীতি? যৎকিঞ্চেদং প্রাণভুদিতি। অতশ্চ সঙ্ঘ্যাসামান্যাৎ যৎকিঞ্চিৎ প্রাণভৃজ্জাতম্, তৎ সর্ব্বং জয়তি—তৎ সর্ব্বং ফলজাতং সম্পাদয়তি সঙ্খ্যাদি- সামান্যেন ॥ ১৪৯ ॥ ৭ ॥
টীকা।—সম্পদামারম্ভমুপপাদ্য প্রশ্নবাক্যমুখাপয়তি—যাজ্ঞবল্ক্যেতীতি। প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—কতিভিরিত্যাদিনা। কতিভিঃ কতমা ইতি প্রশ্নয়োর্বিষয়ভেদং দর্শয়তি—সংখ্যেয়েতি। স্তোত্রিয়া নাম অন্যাহপি কাচিদ্গজাতিরস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ—সর্ব্বাত্তিতি। অন্যা বেতি শস্ত্রজাতি- গ্রহঃ। বিধেয়ভেদাৎ সর্ব্বশব্দাপুনরুক্তিঃ। অতশ্চ সম্পত্তিকরণাদিত্যর্থঃ। সংখ্যাসামান্যা- ত্রিত্বাবিশেষাদিতি যাবৎ। প্রাণভৃজ্জাতং লোকত্রয়ং বিবক্ষিতম্॥ ১৪৯॥ ৭॥
ভাষ্যানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্যের মনোযোগার্থ অশ্বল তাহাকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—[ বল দেখি,] ‘কতিভিঃ অয়ম্ অদ্য ঋগ্ভিঃ অস্মিন্ যজ্ঞে’—এই হোতা—ঋগ্বেদজ্ঞ ঋত্বিক্ এই যজ্ঞে কয়টি স্তোত্রজাতীয় ঋক্ পাঠ করিয়া থাকেন? অপর—যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—ঋজ্বাতীয় তিনটি মন্ত্র। ‘এই কথা বলিলে পর, অপর(অশ্বল) জিজ্ঞাসা করিলেন—সেই তিনটি ঋক্ কি কি? ইহার মধ্যে প্রথম প্রশ্ন হইল সংখ্যা বিষয়ে, আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হইল— সংখ্যেয় বিষয়ে।
[উত্তর হইল—পুরোহনুবাক্যা, যাজ্যা ও শস্যানামক ঋক্ত্রয়ে। তন্মধ্যে—] ‘পুরোহনুবাক্যা’—যে সমস্ত ঋক্ যজ্ঞানুষ্ঠানের পূর্ব্বে পঠিত হয়, সে সমস্ত ঋক্ ‘পুরোহনুবাক্যা’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে; আর যজ্ঞসম্পাদনের সময় যে সমস্ত ঋকের প্রয়োগ হইয়া থাকে, সে সমস্ত ঋকের নাম—‘যাজ্যা’, এবং যে সমস্ত ঋক্ শস্ত্রার্থ স্তুতিরূপে প্রযুক্ত হইয়া থাকে, সে সমস্ত ঋকের নাম শস্যা; আরও যে সমস্ত ঋক্ আছে, সেগুলি স্তোত্রজাতীয়ই হউক বা অন্যজাতীয়ই হউক, সমস্তই এই ত্রিবিধ ঋক্জাতির অন্তর্গত। “কিং তাভির্জয়তীতি? যৎ কিঞ্চেদং
প্রাণভৃদিতি”—এ কথার মর্ম্ম এই যে, সংখ্যাগত সাদৃশ্য থাকায় ত্রিলোকমধ্যে যাহা কিছু প্রাণিবিশেষ আছে, এই ‘সম্পদ্’ কর্ম্মের সাহায্যে সে সমস্তকে জয়! করে, অর্থাৎ তিনটি ঋকের দ্বারা কর্ম্ম সম্পাদন করিয়া স্বর্গ মর্ত্য ও পাতাল এই তিন লোকের প্রাণিভোগ্য সমস্ত ফল সম্পাদন করিয়া থাকে ॥ ১৪৯ ॥ ৭ ॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ কত্যয়মদ্যাধ্বর্যুরস্মিন্ যজ্ঞ আহুতী- হোয্যতীতি, তিস্র ইতি, কতমাস্তাস্তিস্র ইতি? যা হুতা উজ্জ্বলন্তি, ‘যা হুতা অতিনেদন্তে, যাহুতা অধিশেরতে। কিং তাভির্জয়তীতি, যা হুতা উজ্জ্বলন্তি দেবলোকমেব তাভির্জয়তি, দীপ্যত ইব হি দেবলোকঃ, যা হুতা অতিনেদন্তে পিতৃলোকমেব তাভির্জয়ত্যতীব হি পিতৃলোকঃ, যা হুতা অধিশেরতে মনুষ্যলোকমেব তাভি- র্জয়ত্যধ ইব হি মনুষ্যলোকঃ ॥ ১৫০ ॥৮॥
সরলার্থঃ।—[পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—অয়ং অধ্বর্য্যুঃ (যজুর্ব্বেদজ্ঞঃ ঋত্বিক্) অদ্য অস্মিন্ যজ্ঞে কতি(কিয়ৎসংখ্যাকাঃ) আহুতীঃ হোষ্যতি ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] তিস্রঃ[আহুতীঃ হোষ্যতি] ইতি। [পুনঃ প্রশ্নঃ] তাঃ(ত্বদুক্তাঃ) তিস্রঃ(আহুতয়ঃ) কতমাঃ? ইতি।[উত্তরং] যাঃ(আহুতয়ঃ) হুতাঃ(অপিতাঃ সত্যঃ) উজ্জ্বলন্তি, যাঃ হুতাঃ অতি নেদন্তে (অতীব শব্দং কুর্ব্বন্তি), যাঃ চ হুতাঃ অধিশেরতে(ভূমেরধো গত্বা তিষ্ঠন্তি)। [পুনঃ প্রশ্নঃ] তাভিঃ(আহুভিভিঃ) কিং জয়তি(কিং ফলং লভতে) ইতি। [অত্রোত্তরম্] যাঃ হুতাঃ উজ্জ্বলন্তি, তাভিঃ(আহুতিভিঃ) দেবলোকম্ এব জয়তি, হি(যস্মাৎ) দেবলোকঃ দীপ্যতে ইব,[অত্র ফলগত-দীপ্তিসামান্যাৎ আহুতিষু তৎসম্পত্তিঃ ক্রিয়তে ইতি ভাবঃ]; যাঃ হুতাঃ অতিনেদন্তে, তাভিঃ পিতৃলোকম্ এব জয়তি; হি(যস্মাৎ) পিতৃলোকঃ(তৎসম্বন্ধী যমলোকঃ নিপীড্যমানৈঃ নারকিভিঃ) অতীব[শব্দায়মানঃ ভবতি; অতঃ শব্দসাম্যাৎ সম্পৎ ক্রিয়তে ইতি ভাবঃ]; যাঃ চ হুতাঃ অধিশেরতে, তাভিঃ মনুষ্যলোকম্ এব জয়তি; হি(যস্মাৎ) মনুষ্যলোকঃ অধঃ(স্বর্গাদিলোকাপেক্ষয়া অধোগত ইব) [লক্ষ্যতে; অতঃ তাসু আহুতিষু মনুষ্যলোক সম্পত্তিঃ ক্রিয়তে ইতি ভাবঃ]॥১৫০॥৮॥
মূলানুবাদ।—অশ্বন পুনশ্চ সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে
জিজ্ঞাসা করিলেন-এই অধ্বর্য্য অর্থাৎ যজুর্বেদবিদ্ ঋত্বিক্ আজ এই যজ্ঞে কয়টি আহুতি দ্বারা হোম করিবেন? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-তিনটি দ্বারা। পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন-সেই তিনটি আহুতি কি কি? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] যে সমস্ত আহুতি অর্পিত হইয়া প্রজ্বলিত হয়, যে সমস্ত আহুতি অতীব শব্দ করে, আর যে সমস্ত আহুতি গলিত হইয়া ভূমধ্যে সঞ্চিত হয়,[সেই তিনটি আহুতি দ্বারা হোম করিবেন]।[পুন- বার প্রশ্ন হইল,] যজমান সেই তিনটি দ্বারা কোন্ কোন্ লোক জয় করে?[উত্তর-] যে সমস্ত আহুতি উজ্জ্বল হয়, সে সমস্ত আহুতি দ্বারা স্বর্গলোক জয় করে; কারণ, স্বর্গলোক স্বভাবতঃই যেন দীপ্তিমান্ বলিয়া প্রতীত হয়; আর যে সমস্ত আহুতি বিকট শব্দ করে, সে সমস্ত আহুতি দ্বারা পিতৃলোক জয় করে; কারণ, পিতৃলোক-সম্পর্কিত যমালয়ে যাতনাপ্রাপ্ত নারকি পুরুষগণ বিকট শব্দ করিয়া থাকে;[উভয়ের মধ্যে এইরূপ শব্দগত সাদৃশ্য রহিয়াছে]; আর যে সমস্ত আহুতি ভূগর্ভে সঞ্চিত হয়, সে সমস্ত আহুতি দ্বারা যজমান মনুষ্যলোক জয় করিয়া থাকে; কারণ, মনুষ্যলোক সাধারণতঃ স্বর্গাদিলোক অপেক্ষা যেন নিম্নবর্তী বলিয়াই বোধ হয়;[এইরূপ সাদৃশ্য নিবন্ধন যজমান ঐ আহুতিতে মনুষ্যলোকত্ব সম্পাদন করিবে] ॥ ১৫০ ॥৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচেতি পূর্ব্ববৎ। কত্যয়মদ্যাধ্ব- র্যুরস্মিন্ যজ্ঞ আহুতীহোষ্যতীতি—কতি আহুতিপ্রকারাঃ? তিস্র ইতি। কত- মাস্তাঃ তিস্র ইতি পূর্ব্ববৎ। ইতর আহ—যা হুতা উজ্জ্বলন্তি সমিদাজ্যাহুতয়ঃ, যা হুতা অতিনেদন্তে অতীব শব্দং কুর্ব্বন্তি মাংসাদ্যাহুতয়ঃ, যা হুতা অধিশেরতে অধি—অধো গত্বা ভূমেঃ অধিশেরতে পয়ঃসোমাহুতয়ঃ। কিং তাভির্জয়তীতি; তাভিরেবং নির্ব্বর্তিতাভিরাহুতিভিঃ কিং জয়তীতি।
যা আহুতয়ো হুতা উজ্জ্বলন্তি উজ্জ্বলনযুক্তা আহুতয়ো নির্ব্বর্তিতাঃ,-ফলঞ্চ দেবলোকাখ্যং উজ্জ্বলমেব; তেন সামান্যেন যা ময়া এতা উজ্জ্বলন্ত্য আহুতয়ো নির্ব্বর্ত্যমানাঃ, তা এতাঃ-সাক্ষাদ্দেবলোকস্য কর্ম্মফলস্য রূপং দেবলোকাখ্যং ফলমেব ময়া নির্ব্বর্ত্যতে-ইত্যেবং সম্পাদয়তি। যা হুতা অতিনেদন্তে আহুতয়ঃ, পিতৃলোকমেব তাভির্জয়তি, কুৎসিতশব্দকর্তৃত্বসামান্যেন; পিতৃলোকসম্বদ্ধায়াং
হি সংযমিন্যাং পূর্যাৎ বৈবস্বতেন যাত্যমানানাং ‘হা হতাঃ স্মঃ, মুঞ্চ মুঞ্চ’ ইতি শব্দো ভবতি; তথা অবদানাহুতয়ঃ; তেন পিতৃলোকসামান্যাৎ, পিতৃলোক এব ময়া নির্ব্বর্ত্যতে—ইতি সম্পাদয়তি। যা হুতা অধিশেরতে, মনুষ্যলোকমের তাভি- জয়তি, ভূষ্যুপরিসম্বন্ধসামান্যাৎ; অধ ইব হি অধ এব হি মনুষ্যলোকঃ উপরিতনান্ সাধ্যান্ লোকানপেক্ষ্য, অথবা অধোগমনমপেক্ষ্য; অতো মনুষ্যলোক এব ময়া নির্ব্বর্ত্যতে—ইতি সম্পাদয়তি পয়ঃসোমাহুতিনির্ব্বর্তনকালে ॥ ১৫০ ॥৮॥
টীকা।—প্রথমঃ সংখ্যাবিষয়ো দ্বিতীয়স্তু সংখ্যেয়বিষয়ঃ প্রশ্ন ইতি বিভাগং লক্ষয়তি— পূর্ব্ববদিতি। তেন সামান্যেনোজ্বলত্বেনেতি যাবৎ। উক্তমর্থং সঙ্ক্ষিপ্যাহ—দেবলোকাখ্য- মিতি। কথং মাংসাদ্যাহুতীনাং পিতৃলোকেন সহ যথোক্তং সামান্যমত আহ—পিতৃলোকেতি। অধোগমনমপেক্ষ্যেতি—অস্তি হি সোমাভ্যাহুতীনামধস্তাদগমনম্, অস্তি চ মনুষ্যলোকস্য পাপ- প্রচুরস্য তাদৃগ্গমনং, তদপেক্ষ্যেত্যর্থঃ। অতঃ সামান্যাদিতি যাবৎ॥ ১৫০॥৮॥
ভাষ্যানুবাদ।—‘যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ’ এ কথার অর্থ পূর্ব্ববৎ। ‘কতি অয়ম্ অদ্য অধ্বর্য্যুঃ অস্মিন্ যজ্ঞে হোষ্যতি ইতি’[এই বাক্যে জিজ্ঞাসা করা হইল যে,] আহুতি কত প্রকার?[উত্তর হইল—] তিন প্রকার;[পুনঃ প্রশ্ন হইল—] সেই তিনটি আহুতি কি কি? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—ঘৃত ও সমিৎ- প্রভৃতি দ্রব্যময় যে সমস্ত আহুতি অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত হইয়া প্রজ্বলিত হয়, এবং মাংসাদিদ্রব্যাত্মক যে সমস্ত আহুতি অগ্নিতে অর্পিত হইয়া অতীব শব্দ করে, আর দুগ্ধ ও সোমরসাদি দ্রব্যাত্মক যে সমস্ত আহুতি অগ্নিতে অর্পিত হইয়া ভূগর্ভে বাইয়া স্থিতিলাভ করে,[সেই আহুতিত্রয়ের দ্বারা]।[পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করি- লেন—] সেই তিনটি আহুতি দ্বারা কোন্ কোন্ ফল জয় করে? অর্থাৎ উক্তপ্রকারে সম্পাদিত সেই আহুতিসমূহ দ্বারা কোন্ কোন্ ফল লাভ করে?[উত্তর হইল—]
যে সমস্ত আহুতি অগ্নিতে অর্পিত হইয়া প্রজ্বলিত হয়; সম্পাদিত সেই আহুতিসমূহ যেমন উজ্জ্বলনযুক্ত, তাহার ফলও তেমনি উজ্জ্বল—দেবলোক(স্বর্গ- লোক)। ফল ও আহুতিগত এই প্রকার উজ্জ্বলতা-ধর্ম্মের সাম্য থাকায় যজমান মনে করিবে যে, আমার সম্পাদিত যে, এই সমস্ত উজ্জ্বল আহুতি, এই আহুতি- সমূহই সাক্ষাৎ দেবলোকরূপ আহুতি-ফলস্বরূপ, এবং এই আহুতি সম্পাদনেই দেবলোকনামক কর্মফলও আমার সম্পাদিত হইল; যজমান এইরূপে কর্মসম্পদ্ নির্ব্বাহ করিয়া থাকেন। আর যে সমস্ত আহুতি অতিমাত্র শব্দ করিয়া থাকে, কুৎসিত(বিকট) শব্দ-করণরূপ ধর্ম্মের সাম্য থাকায়, সে সমস্ত আহুতি দ্বারা নিশ্চয়ই পিতৃলোক জয় করে। পিতৃলোকের সহিত যমভবনের সম্বন্ধ আছে;
সেই যমপুরীতে যাহারা গমন করে, তাহারা যমরাজকর্তৃক নিপীড়িত হইয়া ‘আমরা ম’লেম, ছাড়-ছাড়’ বলিয়া চীৎকার করিতে থাকে; মাংসাদির আহুতি হইতেও ঐরূপ বিকট শব্দ উত্থিত হইয়া থাকে; পিতৃলোকের সহিত এইরূপ শব্দসাম্য থাকায়, যজমান মনে করিবেন যে, এই আহুতি-সম্পাদনেই আমার পিতৃলোক প্রাপ্তিরূপ কৰ্ম্ম-ফলও সম্পাদিত হইতেছে; যজমান এইরূপে সম্পৎ- কৰ্ম্ম নির্ব্বাহ করিয়া থাকেন। আর যে সমস্ত আহুতি গলিয়া ভূমিগত হয়, সেই সমস্ত আহুতি দ্বারা মনুষ্যলোকই জয় করিয়া থাকে; কারণ, ভূমির উপরে অবস্থিতিরূপ-ধৰ্ম্মটি উভয়েরই সমান; কেন না, কর্মলভ্য উপরিস্থ অপরাপর লোক অপেক্ষা মনুষ্যলোকটি যেন অধঃ-নিম্নবর্তী বলিয়াই মনে হয়; অথবা নিম্নগামিত্ব ধর্মের তুলনায়ও ঐরূপ প্রতীতি হয়; অতএব দুগ্ধ ও ঘৃতাদিময় আহুতি সম্পাদনকালে,-‘আমি এই আহুতি দ্বারা মনুষ্যলোকই সম্পাদন করিতেছি’- এইরূপে সম্পদ-কর্ম করিয়া থাকেন ॥ ১৫০ ॥৮॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ, কতিভিরয়মদ্য ব্রহ্মা যজ্ঞং দক্ষিণতো দেবতাভির্গোপায়তীত্যেকয়েতি, কতমা সৈকেতি, মন এবেত্য- নন্তং বৈ মনোহনন্তা বিশ্বে দেবা অনন্তমেব স তেন লোকং জয়তি ॥ ১৫১ ॥ ৯॥
সরলার্থঃ।—[ অশ্বলঃ পুনরপি যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—অয়ং ব্রহ্মা অদ্য(যজ্ঞানুষ্ঠানকালে) দক্ষিণতঃ(অগ্নের্দক্ষিণভাগে স্বাসনে উপবিষ্টঃ সন্) কতিভিঃ(কিয়ৎসংখ্যকাভিঃ) দেবতাভিঃ যজ্ঞং গোপায়তি(রক্ষতি) ইতি। [ যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] একয়া(দেবতয়া) ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ—] সা(ত্বদুত্তা) একা দেবতা কতমা?(সা নামতঃ স্বরূপতশ্চ কা?) ইতি।[উত্তরম্—] মনঃ(অন্তঃকরণং) এব ইতি; বৈ(যতঃ) মনঃ অনন্তং,(বৃত্তীনামানন্ত্যাৎ মনসোহনস্তত্বমিত্যাশয়ঃ), বিশ্বে দেবাঃ(সঙ্ঘবৃত্তয়ঃ দেবতাভেদাঃ)[অপি] অনন্তাঃ(সংখ্যাতোহপরিমেয়াঃ);[অতঃ] সঃ(ব্রহ্মা) তেন(মনসা) অনন্তম্ এব লোকং(ফলং) জয়তি(লভতে ইত্যর্থঃ)॥ ১৫১ ॥ ৯ ॥
মূলানুবাদ?—অশ্বল পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন—ব্রহ্মা(একজন ঋত্বিক্) আজ দক্ষিণ ভাগে নিজের আসনে বসিয়া[হোতার দক্ষিণে ব্রহ্মার আসন থাকে], কোন্ কোন দেবতা দ্বারা এই যজ্ঞ রক্ষা করিতেছেন?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] একটি
দেবতা দ্বারা।[অশ্বল জিজ্ঞাসা করিলেন—] সেই একটি দেবতা কে? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] সেই দেবতাটি হইতেছে—মন; কেন না, মনও অনন্ত-বৃত্তিবিশিষ্ট, আর বিশ্বে দেবগণও অনন্ত; অতএব ব্রহ্মা এই মনো- দেবতা দ্বারা অনন্ত লোক জয় করেন, অর্থাৎ অনন্ত ফল প্রাপ্ত হন ॥ ১৫১ ॥ ৯ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। -যাজ্ঞবন্দ্যেতি হোবাচেতি পূর্ব্ববৎ। অয়ম্ ঋত্বিক্ ব্রহ্মা দক্ষিণতো ব্রহ্মাসনে স্থিত্বা যজ্ঞং গোপায়তি। কতিভির্দেবতাভিঃ গোপায়- তীতি প্রাসঙ্গিকমেতদ্ বহুবচনম্, একয়া হি দেবতয়া গোপায়ত্যসৌ; এবং জ্ঞাতে বহুবচনেন প্রশ্নো নোপপদ্যতে স্বয়ং জানতঃ; তস্মাৎ পূর্ব্বয়োঃ কণ্ডিকয়োঃ প্রশ্ন- প্রতিবচনেষু-কতিভিঃ কতি, তিসৃভিস্তিস্রঃ-ইতি প্রসঙ্গং দৃষ্টা ইহাপি বহুবচনেনৈব প্রশ্নোপক্রমঃ ক্রিয়তে; অথবা প্রতিবাদিব্যামোহার্থং বহুবচনম্। ইতর আহ-একয়েতি; একা সা দেবতা, যয়া দক্ষিণতঃ স্থিত্বা ব্রহ্মাসনে যজ্ঞং গোপায়তি। কতমা সা একেতি-মন এবেতি, মনঃ সা দেবতা; মনসা হি ব্রহ্মা ব্যাপ্রিয়তে ধ্যানেনৈব, “তস্য যজ্ঞস্য মনশ্চ বাক্ চ বর্তনী, তয়োরন্যতখন মনসা সংস্করোতি ব্রহ্মা” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ; তেন মন এব দেবতা, তয়া মনসা হি গোপা- য়তি ব্রহ্মা যজ্ঞম্। তচ্চ মনো বৃত্তিভেদেনানন্তম্; বৈ-শব্দঃ প্রসিদ্ধাবদ্যোতকঃ; প্রসিদ্ধং মনস আনন্ত্যম্; তদানন্ত্যাভিমানিনো দেবাঃ, অনন্তা বৈ বিশ্বে দেবাঃ, “সর্ব্বে দেবা যত্রৈকং ভবন্তি” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ, তেনানন্ত্যসামান্যাদনন্তমের স তেন লোকং জয়তি ॥ ১৫১ ॥ ৯ ॥
টাকা।—দক্ষিণত আহবনীয়স্যেতি শেষঃ। প্রাসঙ্গিকং বহুবচনমিত্যুক্তং প্রবটয়তি— একয়া হীতি। জল্পকথা প্রস্তুতেতি হৃদি নিধায় বহুক্তের্গত্যন্তরমাহ—অথবেতি। মনসো দেবতাত্বং সাধয়তি—মননেতি। বর্তনী বর্দ্ধনী, তয়োর্ব্বাত্মনসয়োর্ব্বর্ত্তনোরন্যতঃ বাচং মনসা মৌনেন ব্রহ্মা সংস্করোতি, বাগ্নিসর্গে প্রায়শ্চিত্তবিধানাদিতি শ্রুত্যন্তরস্যার্থঃ। তথাপি কথং সম্পদঃ সিদ্ধিস্তত্রাহ—তচ্চেতি। দেবাঃ সর্ব্বে যস্মিন্ মনস্যেকং ভবস্ত্যভিন্নত্বং প্রতিপদ্যন্তে, তস্মিন্ বিশ্বদেবদৃষ্ট্যা ভবত্যনন্তলোকপ্রাপ্তিরিতি শ্রুত্যন্তরস্যার্থঃ। অনন্তমেবেত্যাদি ব্যাচষ্টে— তেনেতি। উক্তেন প্রকারেণেতি যাবৎ। তেন মনসি বিশ্বদেবদৃষ্ট্যধ্যাসেনেত্যর্থঃ। স ইত্যুপাসকোক্তিঃ। ১৫১।৯।
ভাষ্যানুবাদ।—‘যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ’ কথার অর্থ—পূর্ব্ববৎ। ঋত্বিকরূপে বৃত ব্রহ্মা সাধারণতঃ হোতার দক্ষিণভাগে স্বীয় আসনে উপবেশনপূর্ব্বক যজ্ঞরক্ষা করিয়া থাকেন। এই ঋত্বিক্ ব্রহ্মা আজ কতগুলি দেবতা দ্বারা যজ্ঞ
৭৩১
রক্ষা করিতেছেন? পূর্ব্ব পূর্ব্ব প্রশ্নে বহুবচনের প্রয়োগ থাকায় প্রসঙ্গক্রমে এখানেও দেবতা-শব্দের পর বহুবচনের(‘দেবতাভিঃ’) প্রয়োগ করা হইয়াছে; কেন না, ব্রহ্মা যে, একটিমাত্র দেবতা দ্বারা যজ্ঞরক্ষা করিয়া থাকেন, ইহা যখন অশ্বলের জানাই আছে, তখন তাহার পক্ষে একত্ব-জ্ঞান সত্ত্বে বহুবচনে(দেবতাভিঃ) প্রশ্ন করা সঙ্গত হইতে পারে না; অতএব বুঝিতে হইবে যে, পূর্ব্বোক্ত দুইটি শ্রুতিবাক্যে ‘কতিভিঃ, কতি, এবং তিসৃভিঃ, তিস্রঃ’ এইরূপ বহুবচনে প্রশ্ন ও প্রতিবচন থাকায় এখানেও প্রসঙ্গক্রমে বহুবচনেই প্রশ্নেরম্ভ করা হইতেছে; অথবা প্রতিবাদীর বুদ্ধি-ভ্রম সমুৎপাদনের জন্যও বহুবচন প্রদত্ত হইতে পারে।
প্রশ্নোত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-একটি দেবতা দ্বারা; অর্থাৎ ব্রহ্মা দক্ষিণভাগে আসনে উপবেশনপূর্ব্বক যাহা দ্বারা যজ্ঞ রক্ষা করেন, সেই দেবতাটি এক(অনেক নহে)।[পুনঃ প্রশ্ন-] সেই একটি দেবতাই বা কে?[উত্তর-] মনই-সেই দেবতাটি হইতেছে মন; কারণ, ‘মন ও বাক্ হইতেছে সেই যজ্ঞের দুইটি বৰ্ম্ম, ব্রহ্মা মানসিক সংকল্প বা মৌনব্রত দ্বারা তদুভয়ের এক একটিকে পরিষ্কৃত করেন; অভিপ্রায় এই যে; চক্ষুর দুই পার্শ্বে দুইটি কোণ আছে, চক্ষুর পীড়াদায়ক তৈলাদি কোন বস্তু চক্ষুতে পড়িলে, তাহা সাধারণতঃ ঐ দুইটি কোণে(বর্ম্মে) আশ্রয় লয়; এবং লোকে কর-সম্মদন দ্বারা যেমন চক্ষুর সেই দুইটি কোণকে পরিষ্কার করিয়া থাকে, তেমনি যজ্ঞকালে যদি বাক্য ও মনের যাহা কিছু দোষ উপস্থিত হয়, ব্রহ্মা ধ্যান-প্রভাবে সেই সকল দোষ বিদূরিত করেন।’ এইরূপ অন্য শ্রুতি হইতেও জানা যায় যে, ব্রহ্মা কার্য্যকালে মানস ধ্যানেই ব্যাপৃত থাকেন; অতএব মনই ইহার দেবতা; সেই মনোদেবতার সাহায্যেই ব্রহ্মা যজ্ঞ রক্ষা করিয়া থাকেন। সেই মন আবার স্বীয় বৃত্তিভেদে-ধ্যানাদি ব্যাপারানুসারে অনন্ত; বৈ-শব্দটি প্রসিদ্ধিদ্যোতক, অর্থাৎ মনের বৃত্তি-সংখ্যা যে, অনন্ত, ইহা লোক- প্রসিদ্ধ; বিশ্বদেবগণও মনের সেই বৃত্তিগত আনন্ত্যাভিমানী; অতএব তাঁহারাও অনন্ত; ‘সমস্ত দেবতা যাহাতে-যে মনেতে একীভাব প্রাপ্ত হন’ এই শ্রুত্যন্তরও এ বিষয়ে প্রমাণ। অতএব উভরের মধ্যে ‘অনন্তত্ব’ ধর্ম্মের সাম্য থাকায় সেই যজমান ঐরূপ সম্পৎ-ক্রিয়া দ্বারা অনন্ত লোকই জয় করেন অর্থাৎ অনন্ত ফল লাভ করেন ৷ ১৫১ ॥ ৯ ॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ কত্যয়মদ্যোদগাতাস্মিন্ যজ্ঞে স্তোত্রিয়াঃ স্তোষ্যতীতি, তিস্র ইতি, কতমাস্তাস্তিস্র ইতি, পুরোহনুবাক্যা চ
যাজ্যা চ শস্যৈব তৃতীয়া, কতমাস্তাঃ, যা অধ্যাত্মমিতি, প্রাণ এব পুরোহনুবাক্যাংপানো যাজ্যা, ব্যানঃ শস্যা, কিং তাভির্জয়তীতি, পৃথিবী-লোকমেব পুরোহনুবাক্যয়া জয়ত্যন্তরিক্ষলোকং যাজ্যয়া দ্যুলোকংশস্যয়া; ততো হ হোতাশ্বল উপররাম ॥ ১৫২ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।—[ অশ্বলঃ পুনরপি যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—অরম্ উদ্গাতা(সামবেদজ্ঞঃ ঋত্বিক্) অস্মিন্ যজ্ঞে কতি(কিয়ৎসংখ্যাকাঃ) স্তোত্রিয়াঃ (স্তোত্রযোগ্যাঃ ঋচঃ) স্তোষ্যতি(পঠিষ্যতি)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] তিস্রঃ(ত্রিত্বসংখ্যাকাঃ ঋচঃ) ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ—] তাঃ(ত্বদুক্তাঃ) তিস্রঃ কতমাঃ(কিন্নামধেয়াঃ)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] পুরোহনুবাক্যা চ, যাজ্যা চ, তৃতীয়া শস্যা এব।[পুনঃ প্রশ্নঃ—] তাঃ(ত্বদুক্তাঃ ঋচঃ) কতমাঃ? (কিংস্বরূপাঃ?) যাঃ(ঋচঃ) অধ্যাত্মং(দেহে ভবন্তি) ইতি।[অত্রোত্তরম্—] প্রাণঃ(ঊর্দ্ধগমনাত্মকঃ) এব পুরোহনুবাক্যা; অপানঃ[এব] যাজ্যা, ব্যানঃ [এব] শস্যা(তদাখ্যা ঋক্)। তাভিঃ(উক্তাভিঃ ঋগ্ভিঃ) কিং জয়তি (কিং ফলং লভতে)? ইতি প্রশ্নঃ;[উত্তমম্—] পুরোহনুবাক্যয়া পৃথিবীলোকম্ এব জয়তি, যাজ্যয়া অন্তরিক্ষলোকং, শস্যয়া চ দ্যুলোকং[জয়তীতি শেষঃ]। ততঃ(অতঃপরং) হোতা অশ্বলঃ হ(ঐতিহ্যে) উপররাম(প্রশ্নাৎ বিরতো বভূব ইত্যর্থঃ)॥ ১৫২॥ ১০॥
মূলানুবাদ?—অশ্বল পুনশ্চ সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন—এই উদ্গাতা আজ এই যজ্ঞে কতগুলি স্তোত্রিয় (স্তবযোগ্য) ঋক্ দ্বারা স্তব করিবেন?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] তিনটি ঋকের দ্বারা।[পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন—] সেই তিনটি ঋক্ কি কি?[উত্তর হইল—] সেই তিনটি ঋক্—পুরোহনুবাক্যা, যাজ্যা ও তৃতীয় ঋক্ শস্যা।[পুনঃ প্রশ্ন হইল—] দেহসম্বন্ধী সেই তিনটি কি কি?[উত্তর—] প্রাণই পুরোহনুবাক্যা, অপানই যাজ্যা, এবং ব্যানই শস্যা। ভাল, সেই তিনটি ঋকের দ্বারা কোন্ কোন্ ফল লাভ করেন?[উত্তর—] পুরোহনুবাক্যা দ্বারা পৃথিবী লোক, যাজ্যা দ্বারা
৭৩৩
অন্তরিক্ষ লোক, এবং শস্যা দ্বারা দ্যুলোক জয় করেন। ইহার পর হোতা অশ্বল প্রশ্ন হইতে বিরত হইলেন ॥ ১৫২ ॥ ১০ ॥
ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে প্রথম-ব্রাহ্মণ-ব্যাখ্যা ॥ ৩ ॥ ১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যাজ্ঞবন্দ্যেতি হোবাচেতি পূর্ব্ববৎ। কতি স্তোত্রিয়াঃ স্তোষ্যতীতি অয়মুদগাতা। স্তোত্রিয়া নাম ঋক্-সামসমুদায়ঃ কতিপয়ানামৃচাম্। স্তোত্রিয়া বা শস্যা বা যাঃ কাশ্চন ঋচঃ, তাঃ সর্ব্বাঃ তিস্র এবেত্যাহ; তাশ্চ ব্যাখ্যাতাঃ—পুরোহনুবাক্যা চ যাজ্যা চ শস্যৈব তৃতীয়েতি। তত্র পূর্ব্বমুক্তম্—যৎ কিঞ্চেদং প্রাণভূৎ সর্ব্বং জয়তীতি; তৎ কেন সামান্যেনেতি উচ্যতে। ১
কতমাস্তাস্তিস্র ঋচঃ, যা অধ্যাত্মং ভবন্তীতি; প্রাণ এব পুরোহনুবাক্যা, পশব্দ- সামান্যাৎ; অপানো যাজ্যা, আনন্তৰ্য্যাৎ-অপানেন হি প্রত্তং হবির্দেবতা গ্রসন্তি, যাগশ্চ প্রদানম্; ব্যানঃ শস্যা, “অপ্রাণন্ননপানন্ ঋচমভিব্যাহরতি” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। কিং তাভির্জয়তীতি ব্যাখ্যাতম্; তত্র বিশেষসম্বন্ধসামান্যমনুক্তমিহোচ্যতে; সর্ব্ব- মন্যদ্ব্যাখ্যাতম্। লোকসম্বন্ধসামান্যেন পৃথিবীলোকমেবপুরোহনুবাক্যয়াজয়তি; অন্ত- রিক্ষলোকং যাজ্যয়া, মধ্যমত্বসামান্যাৎ; দ্যুলোকং শস্যয়া, ঊর্দ্ধত্বসামান্যাৎ। ততো হ তস্মাদাত্মনঃ প্রশ্ননির্ণয়াৎ অসৌ হোতা অশ্বল উপররাম-নায়মস্মদেগাচর ইতি ॥১৫২
ইতি বৃহদারণ্যক তৃতীয়াধ্যায়ে প্রথমমশ্বল-ব্রাহ্মণভাষ্যম্ ॥ ৩ ॥ ১ ॥
টীকা। -পূর্ব্ববদিত্যভিমুখীকরণায়েত্যর্থঃ। প্রতিবচনমুপাদত্তে-স্তোত্রিয়া বেতি। প্রগীত- মৃগ্জাতং স্তোত্রম্, অপ্রগীতং শস্ত্রম্। কতমাস্তাস্তিস্র ইত্যাদেস্তাৎপর্য্যমাহ-তাশ্চেতি। প্রশ্নান্তরং বৃত্তমনুঘোপাদত্তে-তত্রেতি। যজ্ঞাধিকারঃ সপ্তম্যর্থঃ। পুরোহনুবাক্যাদিনা লোক- এয়জয়লক্ষণং ফলং কেন সামান্যেনেত্যপেক্ষায়াং সংখ্যাবিশেষেণেত্যুক্তং স্মারয়তি-তদিতি। অধিযজ্ঞে এয়মুক্তং স্মারয়িত্বাহধ্যাত্মবিশেষং দর্শয়িতুমুত্তরো গ্রন্থ ইত্যাহ-উচ্যত ইতি। প্রাণাদৌ পুরোহনুবাক্যাদৌ চ পৃথিব্যাদিলোকদৃষ্টিরিতি প্রশ্নপূর্ব্বকমাহ-কতমা ইতি। অপানে যাজ্যা- দৃষ্টৌ হেত্বন্তরমাহ-অপানেন হীতি। হস্তাদ্যাদানব্যাপারেণেতি যাবৎ। প্রাণাপানব্যাপার- ব্যতিরেকেণ শস্ত্রপ্রয়োগস্য শ্রুত্যন্তরে সিদ্ধত্বাদ ব্যেনে শস্যা দৃষ্টিরিত্যাহ-অপ্রাণন্নিতি। তত্র পুরোহনুবাক্যাদিষু চেতি যাবৎ। ইহেত্যনন্তরবাক্যোক্তিঃ। সর্ব্বমন্যদিতি সংখ্যাসামান্যোক্তিঃ। কিং তদ্বিশেষসম্বন্ধসামান্যং, তদাহ-লোকেতি। পৃথিবীলক্ষণেন লোকেন সহ প্রথমত্বেন সম্বন্ধসামান্যং পুরোহনুবাক্যায়ামস্তি, তেন তয়া পৃথিবীলোকমেব প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ। অশ্বলস্য তুষ্কীস্তাবং ভজতোহভিপ্রায়মাহ-নায়মিতি। ১৫২। ১০।
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যটীকায়াং তৃতীয়াধ্যায়স্য প্রথমমস্কন্ধব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ১ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—‘যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ’ এই অংশের অর্থ পূর্ব্ববৎ। এই উদ্গাতা কতগুলি স্তোত্রিয় পাঠ করিবেন? সামাকারে পরিণত কতকগুলি
মন্ত্রসমষ্টির নাম স্তোত্রিয়া ঋক্। স্তোত্রিয়া অথবা শস্যা নামে যে কোন ঋক্ আছে, সে সমস্তকে তিন বলিয়াই নির্দেশ করিতেছেন, এবং পুরোহনুবাক্যা, যাজ্যা ও তৃতীয় শস্যা—এই কথায় সেই অর্থ ই বিবৃত করিয়াছেন। ১
ইতঃপূর্ব্বে অধিযজ্ঞ সম্বন্ধে কথিত হইয়াছে যে, ‘এই যাহা কিছু প্রাণিমণ্ডল, সে সমুদয়কে জয় করেন’, এবং কিরূপ ধর্মসাম্যে জয় করেন, তাহাও উক্ত হই- য়াছে; এখন অধ্যাত্ম যজ্ঞসম্বন্ধে যাহা কিছু বিশেষ আছে, তাহা প্রদর্শন করিতে- ছেন।[প্রশ্ন হইল-] অধ্যাত্মবিষয়ে প্রয়োগার্হ(প্রয়োগের উপযুক্ত) সেই তিনটি ঋক্ কি কি?[উত্তর হইল-] প্রাণই পুরোহনুবাক্যা; কারণ, উভয়েতেই প-অক্ষরটি সমান; অপান হইতেছে যাজ্যা; কারণ, আনন্তর্য্য ধৰ্ম্ম উভয়েতেই সমান; কেন না, যাগ অর্থ-দেবতা উদ্দেশে দ্রব্য প্রদান; সেই প্রদানকার্য্যটি অপানবায়ু দ্বারাই নির্বাহিত হয়। অগ্রে অপান দ্বারা হোমীয় দ্রব্য প্রদত্ত হয়, অনন্তর দেবতাগণ সেই হবিঃ ভোজন করেন; সুতরাং উভয়েতেই আনন্তর্য্য ধর্ম্মের সাম্য রহিয়াছে। ব্যান হইতেছে শস্যা; কারণ, শ্রুত্যন্তরে আছে-‘প্রাণ ও অপা- নের ক্রিয়া স্থগিত রাখিয়া ব্যানবায়ু দ্বারা ঋকের উচ্চারণ করিয়া থাকে’(১)। ২
যজমান সে সমস্ত ঋকের দ্বারা কি ফল লাভ করে, তাহা ব্যাখ্যাত হইয়াছে। সেখানে সম্বন্ধগত সাম্যপ্রভৃতি যাহা কিছু অনুক্ত রহিয়াছে, এখন এখানে কেবল তাহাই বলা হইতেছে; ইহা ছাড়া আর যাহা কিছু আছে, তাহা পূর্ব্বেই বর্ণিত হইয়াছে। পৃথিবী-লোকের সহিত সম্বন্ধগত সাম্য থাকায় পুরোহনুবাক্যা দ্বারা পৃথিবী লোকই জয় করে, মধ্যবর্তিত্বরূপ ধর্মসাম্য থাকায় যাজ্যা দ্বারা অন্তরিক্ষ লোক এবং ঊর্দ্ধত্ব(সর্ব্বোপরি স্থিতিরূপ), ধর্ম্মের সাম্য থাকায় শস্যা ঋকের দ্বারা দ্যুলোক(স্বর্গলোক) জয় করে। তাহার পর—আপনার প্রশ্নোত্তর লাভের পর, সেই হোতা অশ্বল বিরত হইলেন—এ ব্যক্তি আমাদের পরাজেয় নহে বুঝিয়া নিবৃত্ত হইলেন ॥ ১৫২ ॥ ১০ ॥
ইতি বৃহদারণ্যক তৃতীয়াধ্যায়ে প্রথম ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৩ ॥ ১ ॥
আভাসভাষ্যম্।—আখ্যায়িকাসম্বন্ধঃ প্রসিদ্ধ এব। মৃত্যোরতি- মুক্তির্ব্যাখ্যাতা কাললক্ষণাৎ কর্ম্মলক্ষণাচ্চ। কঃ পুনরসৌ মৃত্যুঃ, যস্মাদতিমুক্তি- র্ব্যাখ্যাতা? স চ স্বাভাবিকাজ্ঞানাসঙ্গাস্পদঃ অধ্যাত্মাধিভূতবিষয়পরিচ্ছিন্নো গ্রহাতিগ্রহণলক্ষণো মৃত্যুঃ। তস্মাৎ পরিচ্ছিন্নরূপাৎ মৃত্যোরতিমুক্তস্য রূপাণি অগ্ন্যা- দিত্যাদীনি উদগীথপ্রকরণে ব্যাখ্যাতানি, অশ্বলপ্রশ্নে চ তদ্গতো বিশেষঃ কশ্চিৎ; তচ্চৈতৎ কৰ্ম্মণাং জ্ঞানসহিতানাং ফলম্। এতস্মাৎ সাধ্যসাধনরূপাৎ সংসারাৎ মোক্ষঃ কর্তব্যঃ—ইত্যতো বন্ধনরূপস্য মৃত্যোঃ স্বরূপমুচ্যতে; বদ্ধস্য হি মোক্ষঃ কর্তব্যঃ। ১
যদপ্যতিমুক্তস্য স্বরূপমুক্তম্, তত্রাপি গ্রহাতিগ্রহাভ্যামবিনির্ম্মুক্ত এব মৃত্যু- রূপাভ্যাম্; তথাচোক্তম্-“অশনায়া হি মৃত্যুঃ”, “এষ এব মৃত্যুঃ” ইতি আদি- ত্যস্থং পুরুষমঙ্গীকৃত্যাহ; “একো মৃত্যুর্ব্বহবা” ইতি চ; তদাত্মভাবাপন্নো হি মৃত্যোরাপ্তিমতিমুচ্যুত ইত্যুচ্যতে। ন চ তত্র গ্রহাতিগ্রহৌ মৃত্যুরূপৌ নস্তঃ; “অথৈতস্য মনসো দ্যৌঃ শরীরং জ্যোতীরূপমসাবাদিত্যঃ”, “মনশ্চ গ্রহঃ, স কামেনাতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ” ইতি, বক্ষ্যতি- “প্রাণো বৈ গ্রহঃ, সোহপানেনাতি- গ্রাহেণ” ইতি-“বাগ্থৈ গ্রহঃ, স নাম্নাতিগ্রাহেণ” ইতি চ। তথা এ্যন্নবিভাগে ব্যাখ্যাতমস্মাভিঃ; সুবিচারিতং চৈতৎ-যদেব প্রবৃত্তিকারণং, তদেব নিবৃত্তি- কারণং ন ভবতীতি। ২
কেচিত্তু সর্ব্বমেব নিবৃত্তিকারণং মন্যন্তে। অতঃ কারণাৎ-পূর্ব্বস্মাৎ পূর্ব্বস্মাৎ মৃত্যোর্মুচ্যতে-উত্তরমুত্তরং প্রতিপদ্যমানঃ-ব্যাবৃত্ত্যর্থমের প্রতিপদ্যতে; ন তু তাদর্থ্যম্-ইত্যত আ দ্বৈতক্ষয়াৎ সর্ব্বং মৃত্যুঃ, দ্বৈতক্ষয়ে তু পরমার্থতো মৃত্যো- রাপ্তিমতিমুচ্যতে; অতশ্চাপেক্ষিকী গৌণী মুক্তিরন্তরালে। ৩
সর্ব্বমেতদেবম্ অবাইদারণ্যকম্। ননু সর্ব্বৈকত্বং মোক্ষঃ, “তস্মাৎ তৎ সর্ব্ব- মভবৎ” ইতি শ্রুতেঃ। বাঢ়ম্, ভবত্যেতদপি, ন তু “গ্রামকামো যজেত” “পশুকামো যজেত” ইত্যাদিশ্রুতীনাং তাদর্থ্যম্; যদি হি অদ্বৈতার্থত্বমেবাসাম্ গ্রামপশু- স্বর্গ্যাদ্যর্থত্বং নাস্তীতি গ্রামপশুস্বর্গাদয়ো ন গৃহ্যেরন্; গৃহ্যন্তে তু কৰ্ম্মফলবৈচিত্র্য- বিশেষাঃ; যদি চ বৈদিকানাং কর্মণাং তাদর্থ্যমেব, সংসার এব নাভবিষ্যৎ। ৪
অথ তাদর্থ্যোহপি অনুনিষ্পাদিত-পদার্থস্বভাবঃ সংসার ইতি চেৎ, যথা চ
রূপদর্শনার্থ আলোকে সর্ব্বোহপি তত্রস্থঃ প্রকাশ্যত এব; ন, প্রমাণানুপপত্তেঃ; অদ্বৈতার্থত্বে বৈদিকানাং কৰ্ম্মণাং বিদ্যাসহিতানাম্ অন্যস্যানুনিষ্পাদিতত্বে প্রমাণা- নুপপত্তিঃ-ন প্রত্যক্ষং, নানুমানম্, অতএব চ ন আগমঃ। উভয়মেকেন বাক্যেন প্রদশ্যত ইতি চেৎ-কুল্যাপ্রণয়নালোকাদিবৎ; তন্ন, এবম্ বাক্যধর্মানুপপত্তেঃ; ন চৈকবাক্যগতস্যার্থস্য প্রবৃত্তিনিবৃত্তির্বিধানত্বমবগন্তং শক্যতে; কুল্যাপ্রণয়নালো- কাদাবর্থস্য প্রত্যক্ষত্বাদদোষঃ। ৫
যদপ্যুচ্যতে—মন্ত্রা অস্মিন্নর্থে দৃষ্টা ইতি; অয়মেব তু তাবদর্থঃ প্রমাণাগম্যঃ; মন্ত্রাঃ পুনঃ কিমস্মিন্নর্থে অহোস্বিদন্যস্মিন্নর্থে ইতি মৃগ্যমেতৎ। তস্মাদ্গ্রহাতি- গ্রহলক্ষণো মৃত্যুর্বন্ধঃ, তস্মান্নোক্ষো বক্তব্য ইত্যত ইদমারভ্যতে। ৬
ন চ জানীমো বিষয়সন্ধাবিবান্তরালেহবস্থানমর্দ্ধজরতীয়ং কৌশলম্। যত্তু মৃত্যোরতিমুচ্যত ইত্যুক্তা গ্রহাতিগ্রহাবুচ্যেতে, তত্ত্বর্থসম্বন্ধাৎ; সর্ব্বোহয়ং সাধ্য- সাধনলক্ষণো বন্ধঃ, গ্রহাতিগ্রহাবিনির্ম্মোকাৎ; নিগড়ে হি নির্জ্ঞাতে নিগড়িতস্য মোক্ষায় যত্নঃ কর্তব্যো ভবতি, তস্মাত্তাদর্থ্যেনারম্ভঃ। ৭
টীকা। -ব্রাহ্মণান্তরমবতারয়ন্নাখ্যায়িকা কিমর্থেতি শঙ্কমানং প্রত্যাহ-আখ্যায়িকেতি। যাজ্ঞবন্ধ্যো হি বিদ্যাপ্রকর্ষবশাদত্র পূজাভাগী লক্ষ্যতে নার্তভাগঃ, তথা বিদ্যামান্দ্যাৎ, অতো বিদ্যাস্তত্যর্থেয়মাখ্যায়িকেত্যর্থঃ। ইদানীং ব্রাহ্মণার্থং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি-মৃত্যোরিতি। মৃত্যুস্বরূপং পৃচ্ছতি-কঃ পুনরসাবিতি। তৎস্বরূপনিরূপণার্থং ব্রাহ্মণমুখাপয়তি-স চেতি। মৃত্যুরিতি সম্বন্ধঃ। স্বাভাবিকং নৈসর্গিকমনাদিসিদ্ধমজ্ঞানং, তস্মাদাসঙ্গঃ স আম্পদমিবাস্পদং যস্য সতথেতি বিগ্রহঃ। তস্য বিষয়মুক্ত। ব্যাপ্তিমাহ-অধ্যাত্মেতি। তস্য স্বরূপমাহ-গ্রহেতি। যথোক্তমৃত্যুব্যাপ্তিমগ্ন্যাদীনাং কথয়তি-তস্মাদিতি। তান্যপি গ্রহাতিগ্রহগৃহীতান্যেবার্থেন্দ্রিয়- সংসগিত্বাদিত্যর্থঃ। তদ্গতো বিশেষোহগ্ন্যাদিগতো দৃষ্টিভেদ ইতি যাবৎ। কশ্চিদ্ব্যাখ্যাত ইতি সম্বন্ধঃ। সূত্রস্যাপি মৃত্যুগ্রস্তত্বমভিপ্রেত্যাহ-তচ্চেতি। অগ্ন্যাদিত্যাত্মকং সৌত্রং পদমিতি যাবৎ। ফলং যথোক্তমৃত্যুগ্রস্তমিতি শেষঃ। কিমিতি মৃত্যোর্ব্বন্ধনরূপস্থ্য স্বরূপমুচ্যতে, তত্রাহ-এতস্মাদিতি। ননু মোক্ষে কর্তব্যে বন্ধনরূপোপবর্ণনমনুপযুক্তমিত্যাশঙ্ক্যাহ-বদ্ধস্য হীতি। ১
অগ্ন্যাদীনাং যথোক্তমৃত্যুব্যাপ্তিমুক্তাং ব্যক্তীকরোতি-যদপীতি। অবিনির্মুক্ত এবাতি- মুক্তোহপীতি শেষঃ। তথাপি কথং সূত্রস্য যথোক্তমৃত্যুব্যাপ্তিস্তত্রাহ-তথা চেতি। তথাপি কথমগ্নাদীনাং মৃত্যুব্যাপ্তিঃ, ন হি তত্র প্রমাণমস্তি, তত্রাহ-এক ইতি। বহবা ইতি চ্ছান্দসম্। তথাপি বিদুষো মৃত্যোরতিমুক্তস্য ন তদাপ্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-তদাত্মেতি। সৌত্রে পদে মৃত্যুব্যাপ্তিং প্রকারান্তরেণ প্রকটয়তি-ন চেতি। মনসি কার্যকরণরূপেণ দিবশ্চাদিত্যস্য চৈক্যমস্ত, তথাপি কথং গ্রহাতিগ্রহগৃহীতত্বং সূত্রস্যেত্যাশঙ্ক্যাহ-মনশ্চেতি। বাগাদেৰ্ব্বক্তব্যাদেশ গ্রহত্বেইতিগ্রহত্বে চ হিরণ্যগর্ভে কিমায়াতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তথেতি। কৰ্ম্মফলস্য সংসারত্বাচ্চ তৎফলং সৌত্রং পদং
৭৩৭
মৃত্যুগ্রস্তমেবেত্যাহ-সুবিচারিতং চেতি। যদেব কৰ্ম্ম বন্ধপ্রবৃত্তিপ্রযোজকং, তদেব বন্ধনিবৃত্তেন কারণমতঃ কর্মফলং হৈরণ্যগর্ভং পদং বন্ধনমেবেত্যর্থঃ। ২
স্বমতমুক্ত। মতান্তরমাহ-কেচিত্তিতি। সর্বমেব কর্মেতি শেষঃ। স্বর্গকামবাক্যে দেহাত্মত্ব- নিবৃত্তির্গোদোহনবাক্যে স্বতন্মাধিকারনিবৃত্তিনিত্যনৈমিত্তিকবিধিঘর্থান্তরোপদেশেন স্বাভাবিক- প্রবৃত্তিনিরোধো নিষেধেষু সাক্ষাদেব নৈসর্গিকপ্রবৃত্তয়ো নিরুধ্যন্তে, তদেবং সর্বমেব কর্মকাণ্ডং নিবৃত্তিদ্বারেণ মোক্ষপরমিত্যর্থঃ। ননু শাস্ত্রীয়াৎ কৰ্ম্মণে। হেতোরুত্তরমুত্তরং কার্যকরণসঙ্ঘাত- মতিশয়বস্তমাহগ্রজাৎ প্রতিপদ্যমানঃ সঙ্ঘাতাৎ পূর্বস্মান্ মুচ্যতে, তৎ কুতো নিবৃত্তিপরত্বং কৰ্ম্ম- কাণ্ডস্যেত্যাশঙ্ক্যাহ-অভঃ কারণাদিতি। যদ্ধীদমুত্তরমুত্তরং সাতিশয়ং ফলং প্রাজাপত্যং পদং, তদপি প্রাসাদোহণক্রমেণ ব্যাবৃত্তিদ্বারা মোক্ষমবতারয়িতুং, ন তু তত্রৈব প্রাজাপত্যে, পদে শ্রুতেস্তাৎপর্য্যং; তস্যাপি নিরতিশয়ফলত্বাভাবাদিত্যর্থঃ। ফলিতমাহ-ইত্যত ইতি। যস্মাৎ পূর্ব্বং পূর্ব্বং পরিত্যজ্যোত্তরমুত্তরং প্রতিপদ্যমানস্তত্তন্নিবৃত্তিদ্বারা মুক্ত্যর্থমেব তত্তৎপ্রতিপদ্যতে, ন তু তত্তৎপদপ্রাপ্ত্যর্থমের বাক্যং পর্যবসিতং, তস্যান্তবত্ত্বেনাফলত্বাৎ। তস্মাৎ দ্বৈতক্ষয়পর্য্যন্তং সর্ব্বোহপি ফলবিশেষো মৃত্যুগ্রস্তত্বাৎ প্রাসাদারোহণন্যায়েন মোক্ষার্থোহবতিষ্ঠতে, হিরণ্যগর্ভপদ- প্রাপ্ত্যা দ্বৈতক্ষয়ে তু বস্তুতো মৃত্যোরাপ্তিমতীত্য পরমাত্মরূপেণ স্থিতো মুক্তো ভবতি। তথা চ মনুষ্যভাবাদুর্দ্ধমর্বাক্ চ পরমাত্মভাবান্ মধ্যে যা তত্তৎপদপ্রাপ্তিঃ, সা খলাপেক্ষিকী সতী গৌণী মুক্তিমুখ্যা তু পূর্ব্বোক্তৈবেত্যর্থঃ। ৩
সর্বমেতদুৎপ্রেক্ষামাত্রেণারচিতং, ন তু বৃহদারণ্যকস্য শ্রুত্যন্তরস্থ্য বার্থ ইতি দূষয়তি- সর্বমেতদিতি। সর্ব্বৈকত্বলক্ষণো মোক্ষো বৃহদারণ্যকার্থ এবাস্মাভিরুচ্যতে, তৎকথমম্মদুক্ত- মবাইদারণ্যকমিতি শঙ্কতে-নন্বিতি। অঙ্গীকরোতি-বাঢ়মিতি। অঙ্গীকৃতমংশং বিশদয়তি- ভবতীতি। এতৎ সর্ব্বৈকত্বমারণ্যকার্থো ভবত্যপীতি যোজনা। কথং তর্হি সর্বমেতদবার্হদারণ্যক- মিত্যুক্তং, তত্রাহ-ন ত্বিতি। ত্বদুক্তয়া রীত্যা কৰ্ম্মশ্রুতীনাং যথোক্তমোক্ষার্থত্বং ঘটতে, তেন সর্বমেতদৌৎপ্রেক্ষিকং, ন শ্রৌতমিত্যুক্তমিত্যর্থঃ। কর্মশ্রুতীনাং মোক্ষার্থত্বাভাবং সমর্থয়তে- যদি হীতি। ভস্মাত্তাসাং ন মোক্ষার্থতেতি শেষঃ। কিঞ্চ সংসারস্তাবদ্ধৰ্মাধর্মহেতুকঃ, তৌ চ বিধিনিষেধাধীনৌ, তয়োশ্চেৎ ত্বদুক্তরীত্যা মোক্ষার্থত্বং, তদা হেত্বভাবাৎ সংসার এব ন স্যাদিত্যাহ -যদি চেতি। ৪
বিধিনিষেধয়োনিবৃত্তিদ্বারা মুক্ত্যর্থত্বেহপি বিদ্যাদিজ্ঞানাদমুনিষ্পাদিতো যঃ কৰ্ম্মপদার্থ, তস্যায়ং স্বভাবো যতুত কর্তারমনর্থেন সংষুনক্তীতি চোদয়তি-অথেতি। মোক্ষার্থমপি কর্মকাণ্ডং সংসারার্থং ভবতীতি সদৃষ্টান্তমাহ-যথেতি। প্রমাণাভাবেন পরিহরতি-নেতি। তদেব ব্যনক্তি-অদ্বৈতার্থত্ব ইতি। অন্যস্য বন্ধস্যেতি যাবৎ। অনুপপত্তিং ক্ষোরয়তি-ন প্রত্যক্ষ- মিতি। কর্মশ্রুতিবাক্যস্যাবান্তরতাৎপর্য্যং যথাশ্রুতেহর্থে গৃহ্যতে, নিবৃত্তিদ্বারা মুক্তৌ তু মহা- তাৎপর্য্যমিত্যঙ্গীকৃত্য শঙ্কতে-উভয়মিতি। কৃত্রিমাঃ ক্ষুদ্রাঃ সরিতঃ কুল্যাস্তাসাং প্রণয়নং স্নানার্থং পানীয়ার্থমাচমনীয়াদ্যর্থং চ, প্রদীপশ্চ প্রাসাদশোভার্থং কৃতো গমনাদিহেতুরপি ভবতি, বৃক্ষমূলে চ সেচনমনেকার্থং, তথা কর্মকাণ্ডমনেকার্থমিত্যুপপাদয়তি-কুল্যেতি। একস্য বাক্যস্য যথাশ্রুতেনার্থেনার্থবত্ত্বে সম্ভবতি নান্যত্র তাৎপর্য্যং কল্যং কল্পকাভাবাৎ, ন চ ত্বদুক্তয়া রীত্যানে-
কার্থত্বলক্ষণো ধর্ম্মো বাক্যস্যৈকস্যোপপদ্যতে, অর্থৈকত্বাদেকং বাক্যমিতি ন্যায়াদিতি পরিহরতি— তন্নৈবমিতি। বাক্যস্যানেকার্থত্বাভাবেহপি তদর্থস্য কর্ম্মণো বন্ধমোক্ষাখ্যানেকার্থত্বং স্যাদিত্য- শঙ্ক্যাহ—ন চেতি। পরোক্তং দৃষ্টান্তং বিঘটয়তি—কুল্যেতি। ৫
বিদ্যাং চাবিদ্যাং চেত্যাদয়ো মন্ত্রাঃ সমুচ্চয়পরা দৃষ্টাঃ, সমুচ্চয়শ্চ কর্মকাণ্ডস্য নিবৃত্তিদ্বারা মোক্ষার্থত্বমিত্যস্মিন্নর্থে সিধ্যতীতি শঙ্কতে-যদপীতি। কর্মকাণ্ডস্যোক্তরীত্যা মোক্ষার্থত্বে নাস্তি প্রমাণমিতি পরিহরতি-অয়মেবেতি। মন্ত্রাণাং সমুচ্চয়পরত্বাত্তস্থ্য চ যথোক্তার্থাক্ষেপকত্বাৎ কুতোহস্যার্থস্য প্রমাণাগম্যতেত্যাশঙ্ক্যাহ-মন্ত্রাঃ পুনরিতি। তেষাং ন সমুচ্চয়পরতেত্যগ্রে ব্যক্তীভবিষ্যতীত্যর্থঃ। পরমতাসম্ভবে স্বমতমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। বন্ধনিরূপণমনুপযোগী- ত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মান্মোক্ষ ইতি। ৬
যতু কর্মকাণ্ডং বন্ধায় মুক্তয়ে বা ন ভবতি, কিন্তুন্তরাবস্থানকারণমিতি, তদ্দুষয়তি-ন চেতি। যথা, ন জাগত্তি ন স্বপিতীতি বিষয়গ্রহণচ্ছিদ্রেহন্তরালেহবস্থানং দুর্ঘটং, যথা চার্দ্ধং কুকুট্যাঃ পাকার্থমর্দ্ধং চ প্রসবায়েতি কৌশলং নোপলভ্যতে, তথা কর্মকাণ্ডং ন বন্ধায় নাপি সাক্ষান্মো- ক্ষায়েতি ব্যাখ্যানং কর্তুং ন জানীম ইত্যর্থঃ। যতু শ্রুতিরেবোত্তরোত্তরপদপ্রাপ্ত্যভিধানব্যাজেন মোক্ষে পুরুষমবতারয়তীতি, তত্রাহ-যত্ত্বিতি। মৃত্যোরাপ্তিমতীত্য মুচ্যত ইত্যুক্ত। যদেতদ্- গ্রহাতিগ্রহবচনং, তদয়ং সর্ব্বঃ সাধ্যসাধনলক্ষণো বন্ধ ইত্যনেনাভিপ্রায়েণোচ্যতে, তস্যার্থেন মৃত্যুপদার্থেনাম্বয়দর্শনাদিতি যোজনা। অর্থসম্বন্ধাদিত্যুক্তং স্ফুটয়তি-গ্রহাতিগ্রহাবিনির্মোকা- দিতি। এষা হি শ্রুতির্বন্ধমেব প্রতিপাদয়তি ন তু মোক্ষে পুরুষমবতারয়তীতি ভাবঃ। ননু পুরুষস্যাপেক্ষিতো মোক্ষঃ প্রতিপাদ্যতাং, কিমিত্যনর্থাত্মা বন্ধঃ প্রতিপাদ্যতে, তত্রাহ-নিগড়ে হীতি। বন্ধজ্ঞানং বিনা ততো বিশ্লেষাযোগান্ মুমুক্ষোঃ সপ্রযোজকবন্ধজ্ঞানার্থত্বেনানন্তর- ব্রাহ্মণপ্রবৃত্তিরিত্যুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ৭
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—আখ্যায়িকার সহিত প্রকৃত বিষয়ের যে, কিরূপ সম্বন্ধ বা উপযোগিতা, তাহা প্রসিদ্ধই আছে। ইতঃপূর্ব্বে কাল ও কর্মরূপ মৃত্যু হইতে অতিমুক্তির কথা বর্ণিত হইয়াছে; এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, এই মৃত্যু পদার্থ টি কি, যাহা হইতে অতিমুক্তি বর্ণিত হইয়াছে। হাঁ, তাহা হইতেছে স্বভাবসিদ্ধ অজ্ঞানময় আসক্তির অধিকারভুক্ত এবং অধ্যাত্ম ও অধিভূত বিষয় দ্বারা পরিচ্ছিন্ন গ্রহ ও অতিগ্রহাত্মক মৃত্যু। সেই পরিচ্ছিন্নাত্মক মৃত্যু হইতে যে লোক অতিমুক্ত হয়, তাহার অগ্নি ও আদিত্যাদিময় রূপপ্রাপ্তি ইতঃপূর্ব্বে উদগীথপ্রকরণে ব্যাখ্যাত হইয়াছে, এবং অশ্বলের প্রশ্নেও তৎসম্পর্কিত কোন কোন বিশেষ কথা বর্ণিত হইয়াছে। সে সমস্তই হইতেছে জ্ঞানসহ অনুষ্ঠিত কর্ম্মের ফল,(শুদ্ধ কর্ম্মের ফল নহে)। সাধ্য-সাধনভাবাপন্ন এই মৃত্যুময় সংসার হইতে জীবকে মুক্ত করিতে হইবে, এই উদ্দেশ্যে এখন জীবের বন্ধনাত্মক মৃত্যুর স্বরূপ অভিহিত হইতেছে; কারণ, বদ্ধ ব্যক্তিরই বন্ধনবিমোচন করা আবশ্যক হয়। ১
৭৩৯
আর পূর্ব্বে যে, অতিমুক্তের স্বরূপ নির্দেশ করা হইয়াছে, তাহাতেও মৃত্যু- রূপী গ্রহ ও অতিগ্রহ হইতে বিমুক্তির কথা অনুক্তই রহিয়াছে। দেখ, অন্যত্র উক্ত হইয়াছে—আদিত্য-মণ্ডলাধিষ্ঠিত পুরুষকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন—‘অশ- নায়াই(ভোজনেচ্ছাই) মৃত্যু’ এবং ‘একই মৃত্যু বহুপ্রকার’ ইত্যাদি শ্রুতি বলিতেছেন যে, সেই আদিত্যভাবাপন্ন ব্যক্তি মৃত্যুর অধিকার অতিক্রম করে। অবশ্য, একথাও বলা যাইতে পারে না যে, গ্রহ ও অতিগ্রহ মৃত্যুর স্বরূপই নয়; কারণ, শ্রুতি নিজেই বলিয়াছেন—‘দ্যুলোক হইতেছে এই মনের শরীর, এই আদিত্য হইতেছে জ্যোতির্ময় রূপ’, এবং ‘মন একটি গ্রহ, সে আবার কামরূপী অতিগ্রহ দ্বারা চালিত হয়‘। পরেও বলিবেন—’প্রাণ হইতেছে গ্রহ, তাহা আবার অপানরূপ অতিগ্রহ দ্বারা পরিগৃহীত, এবং বাক্ হইতেছে গ্রহ, সে আবার নাম- রূপী অতিগ্রহ দ্বারা পরিগৃহীত‘। অন্নত্রয়ের বিভাগস্থলেও আমরা এইরূপই ব্যাখ্যা করিয়াছি। বিশেষতঃ যাহা প্রবৃত্তির কারণ, তাহা যে, কখনও নিবৃত্তির কারণ হইতে পারে না, আমরা উত্তমরূপে বিচারপূর্ব্বক সে মীমাংসা করিয়াছি। ২
কেহ কেহ কিন্তু সমস্ত কর্মকেই নিবৃত্তিসাধন বলিয়া মনে করেন। এই কারণে লোকে পূর্ব্ব পূর্ব্ব মৃত্যুর গ্রাস হইতে বিমুক্ত হইয়া আবার পর পর মৃত্যু- গ্রাসে পতিত হয়; তাহা হইতে বিমুক্তিলাভই এই সকলের উদ্দেশ্য, কিন্তু মৃত্যুগ্রস্ত থাকা কখনই উহার উদ্দেশ্য নহে। এই কারণে দ্বৈতসম্বন্ধ বিধ্বস্ত না হওয়া পর্য্যন্ত যাহা কিছু কৰ্ম্ম, তৎসমস্তই মৃত্যুপদবাচ্য। দ্বৈতক্ষয় হইলেই যথার্থ মৃত্যুর অধিকার হইতে বিমুক্তি লাভ হয়; এই জন্যই বলিতে হয় যে, ইহার মধ্য- বর্তী যে মুক্তি, তাহা আপেক্ষিক—গৌণ মুক্তি(যথার্থ মুক্তি নহে)। ৩
তাহাদের এ সমস্ত কথা নিশ্চয়ই বৃহদারণ্যক-সম্মত কথা নহে। কেন? সর্ব্ব- পদার্থের সহিত একত্ব বা অভিন্নভাব প্রাপ্তিই ত মোক্ষ; কারণ, শ্রুতি বলিতে- ছেন—‘তিনি সেই ব্রহ্মবিজ্ঞানের প্রভাবে সর্ব্বাত্মভাব প্রাপ্ত হইলেন’ ইতি। হাঁ, ইহা কতকটা সত্য বটে, অর্থাৎ এরূপও কল্পনা হইতে পারে সত্য, কিন্তু তা বলিয়া, ‘গ্রামাভিলাষী ব্যক্তি যজ্ঞ করিবে’ ‘পশুকামনায় যজ্ঞ করিবে’ ইত্যাদি শ্রুতিরও মোক্ষসাধকতা কল্পনা করা যাইতে পারে না। এই সমস্ত শ্রুতিরও যদি অদ্বৈত-তত্ত্ব প্রতিপাদনই তাৎপর্য্য হইত, আর গ্রাম, পশু ও স্বর্গাদির প্রতিপাদন যদি উদ্দেশ্য-বহির্ভূত হইত, তাহা হইলে এই সমস্ত শ্রুতিবাক্যে কখনই গ্রাম, পশু ও স্বর্গাদি ফলের উল্লেখ থাকিত না; অথচ সমস্ত শ্রুতিবাক্যেই বিবিধ বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মফলের উল্লেখ দৃষ্ট হইয়া থাকে।। পক্ষান্তরে, কেবল অদ্বৈত-
তত্ত্ব প্রতিপাদন করাই যদি বেদোক্ত সমস্ত কর্ম্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে ত কর্ম্মফলাত্মক এই সংসারেরই আবির্ভাব অসম্ভব হইত। ৪
যদি বল, অদ্বৈত-তত্ত্বসাধনে কর্ম্মের তাৎপর্য্য হইলেও, তাহার স্বতঃসিদ্ধ স্বভাব হইতে সংসারের প্রাদুর্ভাব হইয়া থাকে। যেমন, কোন একটি বস্তু- প্রকাশনের জন্য আলোক প্রজ্বলিত হইলেও, তত্রত্য অপরাপর সমস্ত বস্তুই তাহা দ্বারা প্রকাশ পাইয়া থাকে, ইহাও তদ্রূপ; না—এরূপ কথা হইতে পারে না; কারণ, এবিষয়ে কোন প্রমাণ নাই; জ্ঞান-সহকারে অনুষ্ঠিত বৈদিক কৰ্ম্মসমূহের অদ্বৈততত্ত্ব-সিদ্ধি মুখ্য উদ্দেশ্য হইলেও যে, তদতিরিক্ত সংসার তাহার আনুষঙ্গিক ফলরূপে নিষ্পন্ন হইতে পারে, এ বিষয়ে কোনও প্রমাণ নাই। প্রথমতঃ প্রত্যক্ষ প্রমাণের সম্ভাবনা নাই, দ্বিতীয়তঃ অনুমানও হইতে পারে না; সুতরাং আগম বা শব্দ-প্রমাণেরও সম্ভাবনা থাকিতে পারে না। যদি বল, কুল্যাখনন ও প্রদীপ প্রজ্বালনের ন্যায়, ক্রিয়াবিধায়ক একই বাক্যে উভয়ই—মোক্ষ ও স্বর্গাদি ফল প্রদর্শিত হইতে পারে(১); না—এরূপও হইতে পারে না; কেন না, তাহা হইলে বাক্যের স্বাভাবিক রীতি রক্ষা পায় না; কারণ, একই বাক্যে প্রবৃত্তি- সাধনতা(প্রবর্তকতা) ও নিবৃত্তি-সাধনতা, এই উভয় ধর্ম্ম কখনই প্রতীত হইতে দেখা যায় না: কুল্যানির্মাণ ও আলোক-প্রজ্বালন স্থলে অবশ্য এ দোষ ঘটে না; কারণ, উহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ;[প্রত্যক্ষসিদ্ধ বিষয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোন যুক্তিতর্কই স্থান পায় না]। ৫
আরও যে বলা হইয়াছে—এবিষয়ে বহুতর মন্ত্র দেখিতে পাওয়া যায়। তোমার সে কথাটিও অপ্রামাণিক; কেন না, সেই মন্ত্রগুলি কি তোমার অভিমত অর্থেরই প্রকাশক, না অন্যার্থের প্রকাশক, প্রথমে তাহাই অনুসন্ধান করা আবশ্যক; [ সুতরাং এরূপ অপ্রামাণিক কথার উপর নির্ভর করিয়া কোন সিদ্ধান্ত সংস্থাপন করিতে পারা যায় না]। অতএব(স্বীকার করিতে হইবে যে,) গ্রহ ও অতিগ্রহ- রূপী মৃত্যুই বন্ধন; সেই বন্ধন হইতে মুক্তির উপায় নির্দেশ করা একান্ত আবশ্যক হইয়াছে, সেই অবশ্য-কর্তব্য বিষয়ের নিরূপণার্থই এই প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে।৬
৭৪১
বিষয়-সন্ধিতে অর্থাৎ না জাগরণ, না নিদ্রা—এইরূপ মধ্যবর্তী অবস্থায় অবস্থান যেমন দুষ্কর, তেমনি অর্দ্ধজরতীয় ন্যায়ে—বৈদিক কর্ম্ম বন্ধেরও কারণ নয়, আবার সাক্ষাৎ মোক্ষেরও কারণ নয়—এরূপ মধ্যাবস্থায় অবস্থানের কৌশল আমরা জানি না।(১) তবে যে, প্রথমে মৃত্যু হইতে অতিমুক্তির কথা বলিয়া, পরে গ্রহাতি- গ্রহের কথা বলা হইয়াছে, তাহা কেবল অর্থসঙ্গতি রক্ষার জন্য। অভিপ্রায় এই যে, যত কিছু বন্ধন আছে, তৎসমস্তই গ্রহ ও অতিগ্রহ পরিত্যাগ না করার ফল; অথচ নিগড় বা বন্ধনশৃঙ্খলের তত্ত্ব(স্বরূপ) পরিজ্ঞাত থাকিলেই নিগড়িতের (বদ্ধ ব্যক্তির) বন্ধনচ্ছেদনে যত্ন করা সম্ভব হইতে পারে; সেই উদ্দেশ্যেই এখন গ্রহাতিগ্রহের কথা আরব্ধ হইতেছে। ৭
অথ হৈনং জারৎকারব আর্ত্তভাগঃ পপ্রচ্ছ যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ, কতি গ্রহাঃ কত্যতিগ্রহা ইতি। অষ্টৌ গ্রহা অষ্টাবতিগ্রহা ইতি, যে তেহষ্টৌ গ্রহা অষ্টাবতিগ্রহাঃ কতমে ত ইতি ॥ ১৫৩॥১॥
সরলার্থঃ।—[অতঃ পরং গ্রহাতিগ্রহলক্ষণাৎ মৃত্যোরতিমুক্তিং বক্তমুপ- ক্রমতে—অথ হেত্যাদিনা।] অথ(অশ্বল-বিরামানন্তরং) জারৎকারবঃ(জরৎ- কারুবংশীয়:) আর্ত্তভাগঃ(ঋতভাগস্যাপত্যং, তন্নামা বা ঋত্বিক্) এনং(যাজ্ঞ- বল্ক্যৎ) পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্) হ।[সঃ] যাজ্ঞবল্ক্যেতি[সম্বোধয়ন্] উবাচ হ— গ্রহাঃ কতি(কিয়ৎসংখ্যকাঃ)? অতিগ্রহাঃ[চ] কতি? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্যঃ আহ—] গ্রহাঃ অষ্টৌ, অতিগ্রহাঃ[চ] অষ্টৌ ইতি।[আর্ত্তভাগ আহ—] যে তে অষ্টৌ গ্রহাঃ, অষ্টৌ অতিগ্রহাঃ[ত্বয়া উক্তাঃ], কতমে(কিংস্বরূপাঃ) তে? ইতি॥ ১৫৩॥১॥
মূলানুবাদ?—অশ্বল প্রশ্ন হইতে বিরত হইলে পর, জরৎ- কারুবংশীয় আর্ত্তভাগনামকঋত্বিক্যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন— হে যাজ্ঞবল্ক্য, গ্রহ কতগুলি এবং অতিগ্রহই বা কতগুলি?[যাজ্ঞবল্ক্য
বলিলেন—] গ্রহ আটটি, এবং অতিগ্রহও আটটি।[আর্ত্তভাগ পুনর্ব্বার প্রশ্ন করিলেন—] সেই আটটি গ্রহ কি কি? এবং সেই আটটি অতি- গ্রহই বা কি কি? ॥ ১৫৩॥ ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ হৈনম্—হ-শব্দ ঐতিহ্যার্থঃ। অথ অনন্তরং, অশ্বলে উপরতে, প্রকৃতং যাজ্ঞবল্ক্যং জরৎকারু-গোত্রঃ জারৎকারবঃ, ঋতভাগস্যা- পত্যমার্ত্তভাগঃ পপ্রচ্ছ। যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচেতি অভিমুখীকরণায়। পূর্ব্ববৎ প্রশ্নঃ—কতি গ্রহাঃ কত্যতিগ্রহাঃ। ইতি-শব্দো বাক্যপরিসমাপ্ত্যর্থঃ। ১
তত্র নির্জাতেযু বা গ্রহাতিগ্রহেষু প্রশ্নঃ স্যাৎ, অনিজ্ঞাতেষু বা? যদি তাবদ্ গ্রহা অতিগ্রহাশ্চ নিজ্ঞাতাঃ, তদা তদগতস্যাপি গুণস্য সঙ্খ্যায়া নির্জাতিত্বাৎ কতি গ্রহাঃ কত্যতিগ্রহা ইতি সঙ্খ্যাবিষয়ঃ প্রশ্নো নোপপদ্যতে; অথ অনিজ্ঞাতাঃ, তদা সঙ্খ্যেয়বিষয়প্রশ্নঃ—ইতি কে গ্রহাঃ কে অতিগ্রহাঃ ইতি প্রষ্টব্যম্, ন তু কতি গ্রহাঃ কত্যতিগ্রহা ইতি প্রশ্নঃ। অপি চ, নির্জাতসামান্যকেষু বিশেষবিজ্ঞানায় প্রশ্নো ভবতি,—যথা কতমেহত্র কঠাঃ, কতমেহত্র কালাপা ইতি। ন চাত্র গ্রহাতিগ্রহা নাম পদার্থাঃ কেচন লোকে প্রসিদ্ধাঃ, যেন বিশেষার্থঃ প্রশ্নঃ স্যাৎ। ননু চ ‘অতি- মুচ্যতে’ ইত্যুক্তম্, গ্রহগৃহীতস্য হি মোক্ষঃ “স মুক্তিঃ, সাতিমুক্তিঃ” ইতি হি দ্বিরুক্তম্; তস্মাৎ প্রাপ্তা গ্রহা অতিগ্রহাশ্চ। ২.
ননু তত্রাপি চত্বারো গ্রহা অতিগ্রহাশ্চ নির্জাতাঃ—বাক্চক্ষুঃ প্রাণমনাংসি, তত্র কতীতি প্রশ্নো নোপপদ্যতে, নির্জাতত্বাৎ; ন, অনবধারণার্থত্বাৎ; ন হি চতুষ্টং তত্র বিবক্ষিতম্; ইহ তু গ্রহাতিগ্রহাদর্শনে অষ্টত্ব-গুণবিবক্ষয়া কতীতি প্রশ্ন উপপদ্যত এব; তস্মাৎ “স মুক্তিঃ, সাতিমুক্তিঃ” ইতি মুক্ত্যতিমুক্তী দ্বিরুক্তে; গ্রহাতিগ্রহা অপি সিদ্ধাঃ। অতঃ কতিসঙ্খ্যকা গ্রহাঃ, কতি বা অতিগ্রহা ইতি পৃচ্ছতি। ইতর আহ—অষ্টৌ গ্রহাঃ, অষ্টাবতিগ্রহা ইতি। যে তেহষ্টৌ গ্রহা অভিহিতাঃ, কতমে তে নিয়মেন গ্রহীতব্যা ইতি ॥ ১৫৩॥ ১॥
- টীকা।—কতি গ্রহা ইত্যাদিঃ প্রথমঃ সংখ্যাবিষয়ঃ প্রশ্নঃ, কতমে ত ইতি দ্বিতীয়ঃ সংখ্যের- বিষয়ঃ, ইত্যাহ—পূর্ব্ববদিতি। সম্প্রতি প্রশ্নমাক্ষিপতি—তত্রেত্যাদিনা। আদ্যং প্রশ্নমাক্ষিপ্য দ্বিতীয়মাক্ষিপতি—অপি চেতি। বিশেষতশ্চাজ্ঞাতেধিতি চশব্দার্থঃ। মুক্ত্যুতিমুক্তিপার্থদ্বয়- প্রতিযোগিনৌ বন্ধনাখ্যো গ্রহাতিগ্রহৌ সামান্থেন প্রাপ্তৌ, প্রশ্নস্তু বিশেষবুভুৎসায়ামিতি প্রষ্টা চোদয়তি—ননু চেতি। ২
তথাপি প্রশ্নদ্বয়মনুপপন্নমিত্যাক্ষেপ্তা ক্রতে—ননু তত্রেতি। বাঘৈ যজ্ঞস্য হোতেত্যাদাবিতি যাবৎ। নির্জাতত্বাদ্বিশেষস্যেতি শেষঃ। অতিমোক্ষোপদেশেন ত্বগাদেরপি সূচিতত্বাৎ তেষু
৭৪৩
চতুষ্ট, স্যানির্দ্ধারণাদবিশেষেণ প্রপন্নেষু বাগাদিযু বিশেষবুভুৎসায়াং সন্ধ্যাদিবিষয়ত্বে প্রশ্নস্যোপ- পন্নার্থত্বান্নাক্ষेपোপপত্তিরিতি সমাধত্তে-নানবধারণার্থত্বাদিতি। তদেব স্পষ্টয়তি-ন হীতি। তত্র পূর্ব্বব্রাহ্মণে বাগাদিখিতি যাবৎ। ফলিতাং প্রথমপ্রশ্নোপপত্তিং কথয়তি-ইহ ত্বিতি। ননু গ্রহাণামের পূর্ব্বত্রোপদেশাতিদেশাভ্যাং প্রতিপন্নত্বাৎ তেষু বিশেষবুভুৎসায়াং কতি গ্ৰহা ইতি প্রশ্নেহপ্যতিগ্রহাণামপ্রতিপন্নত্বাৎ কথং কত্যতিগ্রহা ইতি প্রশ্নঃ স্যাদত আহ-তন্মাদিতি। পূর্বস্মাদ ব্রাহ্মণাদিতি যাবৎ। বাগাদয়ো বক্তব্যাদয়শ্চ চত্বারো গ্রহাশ্চাতিগ্ৰহাশ্চ যদ্যপি বিশেষতো নিজ্ঞাতাঃ, তথাহপ্যতিদেশপ্রাপ্তাশ্চত্বারো বিশেষতো ন জ্ঞায়ন্তে, তেন তেষু বিশেষতো জ্ঞান- সিদ্ধয়ে প্রশ্ন ইত্যভিপ্রেত্য বিশিনষ্টি-নিয়মেনেতি। ১৫৩।১।
ভাষ্যানুবাদ।—শ্রুতির হ-শব্দটি ঐতিহ্যার্থক, অর্থাৎ পুরাবৃত্তদ্যোতক। অনন্তর—অশ্বল নিবৃত্ত হইলে পর, জ্বরৎকারুগোত্রীয় আর্ত্তভাগ—ঋতভাগের পুত্র সেই যাজ্ঞবল্ক্য ঋষিকে প্রশ্ন করিলেন,—যাজ্ঞবল্ক্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রথমে তাঁহাকে সম্বোধন করা হইয়াছে। পূর্ব্বের ন্যায় প্রশ্ন হইল—গ্রহ কতটি, এবং অতিগ্রহ কতটি? ইতি শব্দটি বাক্যসমাপ্তিসূচক। ১
এখন জিজ্ঞাস্য হইতেছে যে, গ্রহ ও অতিগ্রহসমূহ বিজ্ঞাত থাকিলেই তদ্বিষয়ে প্রশ্ন করা সম্ভব হয়? কিংবা অবিজ্ঞাত থাকিলেই সম্ভব হয়? তন্মধ্যে, গ্রহ ও অতিগ্রহ যদি বিজ্ঞাত থাকে, তাহা হইলে গ্রহাতিগ্রহের গুণও-সংখ্যাও বিজ্ঞাতই আছে; সুতরাং এপক্ষে ‘গ্রহ ও অতিগ্রহ কতগুলি?’ এইরূপ সংখ্যাবিষয়ক প্রশ্ন সঙ্গত হইতে পারে না; আর যদি গ্রহ ও অতিগ্রহ অবিজ্ঞাতই থাকে, তাহা হইলেও সংখ্যেয়(যাহার সংখ্যা করা হয়, সেই) গ্রহ ও অতি- গ্রহের স্বরূপসম্বন্ধেই প্রশ্ন করা উচিত হয়, কিন্তু গ্রহ ও অতিগ্রহের সংখ্যা সম্বন্ধে প্রশ্ন করা উচিত হয় না। বিশেষতঃ যে বিষয় সামান্যাকারে জানা থাকে, সেই বিষয়েই কোন কিছু বিশেষ জানিবার জন্য প্রশ্ন হইয়া থাকে; যেমন -‘এখানে কঠশাখাধ্যায়ী কত জন, এবং এখানে কলাপাধ্যায়ী কত জন?’ আলোচ্য স্থলে কিন্তু গ্রহ ও অতিগ্রহনামে কোন পদার্থ জগতে প্রসিদ্ধ নাই, যাহাতে তদ্গত বিশেষ বৃত্তান্ত জানিবার জন্য প্রশ্ন হইতে পারে। কেন, ‘অতি- মুচ্যতে’ কথাতেই ত ইহা ব্যক্ত করা হইয়াছে; কারণ, যে লোক মৃত্যুদ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহার পক্ষেই মুক্তিলাভ আবশ্যক হয়; এই জন্যই ‘স মুক্তিঃ, সা অতিমুক্তি:’ বাক্যে একথা দুবার করিয়া বলা হইয়াছে; অতএব বলিতে হইবে যে, ইতঃ- পূর্ব্বেই গ্রহ ও অতিগ্রহের কথা বলা হইয়াছে; সুতরাং তদ্বিষয়ে প্রশ্ন করা অসঙ্গত হইতেছে না। ২
ভাল কথা, সেখানেই ত বাক্, চক্ষুঃ, প্রাণ ও মন, এই চারিটি গ্রহ ও অতি-
গ্রহ বিজ্ঞাত হইয়াছে; সুতরাং গ্রহাতিগ্রহের সংখ্যা নিশ্চিত থাকায় এখানে আবার সংখ্যাবিষয়ক প্রশ্ন করা সঙ্গত হইতে পারে না। না,-একথাও হইতে পারে না; কারণ, সেখানে ইহার কোন সংখ্যা-বিশেষ নির্ণীত হয় নাই; কেননা, চতুঃসংখ্যা নির্দেশ করা সেখানে শ্রুতির অভিপ্রেত ছিল না; কাজেই এখানে গ্রহ ও অতিগ্রহ নিদর্শনস্থলে উহাদের অষ্টত্ব-সংখ্যা নির্দেশ আবশ্যক হইতেছে; এজন্য এখানে ‘কতি?’ বলিয়া সংখ্যাবিষয়ক প্রশ্ন করা সুসঙ্গতই হইয়াছে। অতএব পূর্ব্বে “স মুক্তিঃ, সা অতিমুক্তিঃ” বলিয়া মুক্তি ও অতিমুক্তির দুইবার নির্দেশ করায়-ফলে গ্রহ ও অতিগ্রহের অস্তিত্বও প্রতীত হইয়াছে। কাজেই এখানে সংখ্যাবিষয়ে প্রশ্ন করিতেছেন। তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-গ্রহ ও অতিগ্রহ আটটি।[পুনঃ প্রশ্ন হইল-] সেই যে আটটি গ্রহ ও অতিগ্রহ উক্ত হইয়াছে; কোন্ কোন্ বস্তুকে সেই গ্রহ ও অতিগ্রহ বলিয়া নিশ্চিতরূপে গ্রহণ করিতে হইবে? ॥ ১৫৩॥ ১॥
প্রাণো বৈ গ্রহঃ সোহপানেনাতিগ্রাহেণ গৃহীতোহপানেন হি গন্ধান্ জিঘ্রতি ॥ ১৫৪ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।—[গ্রহাতিগ্রহাণাং স্বরূপনিদ্দিধারয়িষয়া যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] প্রাণঃ(প্রকরণাৎ প্রাণোহত্র বায়ুসহিতঃ ঘ্রাণো মন্তব্যঃ), বৈ(প্রসিদ্ধৌ), গ্রহঃ (গৃহ্নাতীতি গ্রহঃ—ধারকঃ); সঃ(প্রাণঃ) অপানেন(প্রকরণাৎ গন্ধেন) অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ(আশ্রিতঃ); হি(যস্মাৎ)[সর্ব্বো লোকঃ] অপানেন (অপানসাহায্যেন) গন্ধান্ জিঘ্ৰতি(ঘ্রাণেন অনুভবতি)॥ ১৫৪ ॥ ২ ॥
মূলাহুবাদ।—প্রাণ অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয় হইতেছে গ্রহ, তাহা আবার অপান-পদবাচ্য গন্ধ দ্বারা পরিগৃহীত; কারণ, অপান বায়ুর সাহা- য্যেই প্রাণিগণ ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা গন্ধ গ্রহণ করিয়া থাকে।[এখানে অপান অর্থ—প্রশ্বাস, যাহা নাসারন্ধ্র দ্বারা দেহমধ্যে প্রবেশ করে] ॥ ১৫৪ ॥২॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্রাহ—প্রাণো বৈ গ্রহঃ—প্রাণ ইতি ঘ্রাণমুচ্যতে, প্রকরণাৎ; বায়ুসহিতঃ সঃ; অপানেনেতি গন্ধেনেত্যেতৎ; অপানসচিবত্বাদপানো গন্ধ উচ্যতে; অপানোপহৃতং হি গন্ধং ঘ্রাণেন সর্ব্বো লোকো জিঘ্রতি; তদেতদু- চ্যতে—অপানেন হি গন্ধং জিঘ্রতীতি ॥ ১৫৪ ॥ ২ ॥
টীকা।—দ্বিতীয়ে প্রশ্নে পরিহারমুখাপয়তি—তত্রাহেতি। প্রাণশব্দস্য ঘ্রাণবিষয়ত্বে পূর্ব্বোত্তরগ্রন্থয়োর্ব্বাগাদীনাং প্রকৃতত্বং হেতুমাহ—প্রকরণাদিতি। তস্য গন্ধেন গৃহীতত্বসিদ্ধ্যর্থং
৭৪৫
বিশিনষ্টি—বায়ুসহিত ইতি। অপানশব্দস্য গন্ধবিষয়েত্বে গন্ধস্যাপানেনাবিনাভাবং হেতুমাহ— অপানেতি। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ—অপানোপহৃতং হীতি। অপশ্বাসোহত্রাপানশব্দার্থঃ। উক্তেহর্থে বাক্যং পাতয়তি—তদেতদিতি। ১৫৪।২।
ভাষ্যানুবাদ।—তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—প্রাণই গ্রহ; এখানে ইন্দ্রিয়ের প্রস্তাব থাকায় প্রাণ-শব্দে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের নির্দেশ বুঝিতে হইবে।[বায়ু সহযোগেই তাহা গন্ধগ্রাহী হইয়া থাকে; এই জন্য বলিলেন যে,] সেই ঘ্রাণও আবার বায়ুসমন্বিত। অপান দ্বারা অর্থাৎ গন্ধ দ্বারা অপানবায়ু গন্ধ-গ্রহণের সাহায্য করে, এই নিমিত্ত গন্ধকে অপান বলা হইয়াছে; কেননা, প্রাণিগণ অপান বায়ু দ্বারা সমাহৃত গন্ধই আঘ্রাণ করিয়া থাকে; “অপানেন হি গন্ধান্ জিঘ্ৰতি” কথায় ঐরূপ অর্থ ই ব্যক্ত করা হইয়াছে॥ ১৫৪॥ ২॥
বাথৈ গ্রহঃ, স নাম্নাতিগ্রাহেণ গৃহীতো বাচা হি নামান্যভি- বদতি ॥ ১৫৫ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ।—বাক্ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ(বাগ্রূপঃ গ্রহঃ)[স্ব- বিষয়েণ] নাম্না(শব্দাত্মকেন) অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ(বশীকৃতঃ); হি(যতঃ) বাচা(বাগিন্দ্রিয়েণ) নামানি(শব্দান্) অভিবদতি(ব্যাহরতি) [লোকঃ]॥ ১৫৫॥৩॥
মূলানুবাদঃ—বাগিন্দ্রিয় হইতেছে—গ্রহ, তাহা স্ব-বিষয়ী- ভূত নামরূপ অতিগ্রহ দ্বারা কবলিত হয়; কারণ, লোকে বাগিন্দ্রিয়ের সাহায্যেই বিবিধ শব্দ উচ্চারণ করিয়া থাকে ॥ ১৫১ ॥ ৩ ॥
জিহ্বা বৈ গ্রহঃ, স রসেনাতিগ্রাহেণ গৃহীতো জিহ্বয়া হি রসান্ বিজানাতি ॥ ১৫৬ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।—জিহ্বা বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ(জিহ্বারূপঃ গ্রহঃ) রসেন(জিহ্বাগ্রাহ্য-মাধুর্য্যাদিনা) অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ; হি(যতঃ)[লোকঃ] জিহ্বয়া রসান্(মধুরাম্নাদিকান্) বিজানাতি(বিশেষেণ—প্রত্যক্ষতঃ অনুভবতি)॥ ১৫৬॥ ৪॥
মূলানুবাদ।—জিহ্বা হইতেছে—গ্রহ; তাহা আবার রসরূপ অতিগ্রহ দ্বারা বশীকৃত; কেননা, লোকজিহ্বা দ্বারাই মধুরাম্লাদি রস প্রত্যক্ষতঃ অনুভব করিয়া থাকে ॥ ১৫৬॥ ৪ ॥
৭৪৮৬
চক্ষুর্ব্বে গ্রহঃ, স রূপেণাতিগ্রাহেণ গৃহীতশ্চক্ষুষা হি রূপাণি পশ্যতি ॥ ১৫৭ ॥ ৫ ॥
পশ্যতি ॥ ১৫৭ ॥ ৫ ॥ সরলার্থঃ।—চক্ষুঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ(চক্ষুরূপঃ গ্রহঃ) রূপেণ (শ্বেতপীতাদিরূপেণ) অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ; হি(যতঃ)[লোকঃ] চক্ষুষা (করণেন) রূপাণি(শ্বেতপীতাদীনি) পশ্যতি ॥ ১৫৭ ॥৫॥ মূলানুবাদঃ—চক্ষু হইতেছে—গ্রহ, সেই চক্ষুরূপ গ্রহটি আবার শ্বেত-পীতাদি রূপাত্মক অতিগ্রহ দ্বারা আয়ত্তীকৃত; কারণ, লোকে চক্ষু দ্বারাই বিবিধ রূপ নিরীক্ষণ করিয়া থাকে ॥ ১৫৭ ॥৫॥ শ্রোত্রং বৈ গ্রহঃ, স শব্দেনাতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ শ্রোত্রেণ হি শব্দান্ শৃণোতি ॥ ১৫৮ ॥৬॥ সরলার্থঃ।—শ্রোত্রং(শ্রবণেন্দ্রিয়ং) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ শব্দেন অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ; হিঃ(যতঃ)[লোকঃ] শ্রোত্রেণ(করণেন) শব্দান্ (ধ্বনিরূপান্ বর্ণরূপাংশ্চ) শৃণোতি ॥ ১৫৮ ॥৬॥ মূলানুবাদঃ—শ্রবণেন্দ্রিয় হইতেছে—গ্রহ, তাহা আবার শব্দরূপী অতিগ্রহ দ্বারা গৃহীত; কারণ, লোকে শ্রবণেন্দ্রিয় দ্বারাই নানাবিধ শব্দ শ্রবণ করিয়া থাকে ॥ ১৫৮৷৷৬॥ মনো বৈ গ্রহঃ, স কামেনাতিগ্রাহেণ গৃহীতো মনসা হি কামান্ কাময়তে ॥ ১৫৯ ॥৭॥ সরলার্থঃ।—মনঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ কামেন(সংকল্পাত্মকেন) অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ; হি(যতঃ)[লোকঃ] মনসা কামান্(প্রার্থনীয়ান্) কাময়তে(অভিলষতি) ॥ ১৫৯ ॥৭॥ মূলানুবাদঃ—মন হইতেছে গ্রহ, তাহা কামরূপ অতিগ্রহ দ্বারা গৃহীত; কেন না, লোকে মনের সাহায্যেই প্রার্থনীয় বিষয় পাইতে অভিলাষ করে ॥ ১৫৯ ॥৭॥ হস্তৌ বৈ গ্রহঃ, স কর্মণাতিগ্রাহেণ গৃহীতো হস্তাভ্যাং হি কর্ম্ম করোতি ॥ ১৬০ ॥৮॥ সরলার্থঃ।—হস্তৌ(করো) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ(হস্তরূপঃ
৭৪৭
গ্রহঃ) কৰ্ম্মণা(ক্রিয়ারূপেণ) অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ; হি(যতঃ)[লোকঃ] হস্তাভ্যাং(করণাভ্যাং) কৰ্ম্ম(ক্রিয়াং) করোতি(সম্পাদয়তি) ॥ ১৬০ ॥৮॥
মূলানুবাদ।—হস্তদ্বয় হইতেছে গ্রহ, উহারা আবার কর্ম্ম বা ক্রিয়াত্মক অতিগ্রহ দ্বারা কবলিত; কারণ, লোকে হস্তদ্বয়ের সাহায্যেই ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া থাকে ॥ ১৬০ ॥ ৮ ॥
ত্বথৈ গ্রহঃ, স স্পর্শেনাতিগ্রাহেণ গৃহীতত্ত্বচা হি স্পর্শান্ বেদয়তে ইত্যেতেহষ্টৌ গ্রহা অষ্টাবতিগ্রহাঃ ॥ ১৬১ ॥ ৯ ॥
সরলার্থঃ।—ত্বক্(ত্বগিন্দ্রিয়ং) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) গ্রহঃ, সঃ(ত্বগাত্মকঃ গ্রহঃ) স্পর্শেন অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ; হি(যতঃ)[লোকঃ] ত্বচা(ত্বগিন্দ্রিয়েণ) স্পর্শান্(শীতোষ্ণাদিরূপান্) বেদয়তে(অনুভবতি); ইতি(যথোক্তাঃ) এতে অষ্টৌ(অষ্টবিধাঃ) গ্রহাঃ, অষ্টৌ অতিগ্রহাঃ[চ ব্যাখ্যাতা ইতি শেষঃ] ॥ ১৬১ ॥ ৯ ॥
মূলানুবাদ:-ত্বগিন্দ্রিয় হইতেছে গ্রহ, তাহা আবার শীতোষ্ণাদি-স্পর্শরূপ অতিগ্রহ দ্বারা গৃহীত; কেন না, লোকে সাধারণতঃ ত্বগিন্দ্রিয়ের সাহায্যেই শীতোষ্ণাদি স্পর্শ অনুভব করিয়া থাকে ॥১৬১৷৷৯৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—বাগ্ধৈ গ্রহঃ—বাচা হি অধ্যাত্মপরিচ্ছিন্নয়া আসঙ্গ- বিষয়াস্পদয়া অসত্যানৃতাসভ্য-বীভৎসাদিবচনেষু ব্যাপৃতয়া গৃহীতঃ লোকঃ অপ- হৃতঃ, তেন বাক্ গ্রহঃ; স নাম্না অতিগ্রাহেণ গৃহীতঃ—স বাগাখ্যো গ্রহঃ, নাম্না বক্তব্যেন বিষয়েণ অতিগ্রাহেণ—অতিগ্রাহেণেতি দৈর্ঘ্যৎ ছান্দসম্; নাম বক্তব্যার্থা হি বাক্; তেন বক্তব্যেরার্থেন তাদর্থ্যেন প্রযুক্তা বাক্ তেন বশীকৃতা; তেন তৎ- কার্য্যমকত্বা নৈব তস্যা মোক্ষঃ; অতো নাম্নাতিগ্রহেণ গৃহীতা বাগিত্যুচ্যতে; বক্তব্যাসঙ্গেন হি প্রবৃত্তা সর্ব্বানর্থৈর্যুজ্যতে। সমানমন্যৎ। ইত্যেতে ত্বপর্য্যন্তা অষ্টৌ গ্রহাঃ, স্পর্শপর্যন্তাশ এতেহষ্টাবতিগ্রহা ইতি ॥ ১৫৫—১৬১ ॥ ৩—৯ ॥
টীকা।—বাচো গ্রহত্বমুপপাদয়তি—বাচা হীতি। আসঙ্গস্য বিষয়ঃ শব্দাদিরেবাস্পদং যস্যা বাচস্তয়েতি বিগ্রহঃ। তৎসিদ্ধ্যর্থমধ্যাত্মপরিচ্ছিন্নয়েতি বিশেষণম্। অসত্যং পরপীড়াকরং মিথ্যাবচনং, তদেব স্বদৃষ্টমাত্রবিরোধ্যনৃতং, বিপরীতং বা। আদিপদেনেষ্টানিষ্টোক্তিগ্রহঃ। বাচি প্রকৃতায়াং স নায়েতি কথমুচ্যতে, তত্রাহ—স বাগাখ্য ইতি। বক্তব্যেন বাচো বশীকৃতত্বং সাধয়তি—বক্তব্যার্থেতি। তাদর্থ্যেন বচনকরণত্বেনেতি যাবৎ। বচনার্থে বাচো বক্তব্যেন বশীকৃতত্বে ফলিতমাহ—তেনেতি। তৎকার্য্যং বচনং মোক্ষশ্চাসাধারণে দেবতাত্মনি পর্য্যবসানম্। বক্তব্যার্থোক্তিং বিনা বাচোঽপর্য্যবসানে সিদ্ধমর্থমাহ—অত ইতি। বাচোঽতিগ্রহগৃহীতত্বমনু-
ভবেন সাধয়তি—বক্তব্যেতি। বাচা হীত্যাদেরপানেন হীত্যাদিনা তুল্যার্থত্বাদব্যাখ্যেয়ত্বমাহ— সমানমিতি। ঘ্রাণং বাগ্ জিহ্বা চক্ষুঃ শ্রোত্রং মনো হস্তৌ ত্বগিত্যুক্তান্ গ্রহান্নিগময়তি—ইত্যেত ইতি। গন্ধো নাম রসো রূপং শব্দঃ কামঃ কৰ্ম্ম স্পর্শ ইত্যতিগ্রহানপি নিগময়তি—স্পর্শ- পর্যন্তাশ্চেতি। ১৫৫—১৬১। ৩—৯।
ভাষ্যানুবাদ।—স্বাভাবিক অনুরাগাস্পদ শব্দাদি বিষয় হইতেছে দেহাব- চ্ছিন্ন বাগিন্দ্রিয়ের গ্রহণীয়(বিষয়); সেই বাগিন্দ্রিয় সর্ব্বদা অসত্য(পরপীড়াকর মিথ্যা বাক্য), অনৃত(প্রত্যক্ষ-বিরুদ্ধ), অসভ্য(সভার অযোগ্য) ও নিন্দিতাদি বাক্য প্রয়োগে ব্যাপৃত থাকিয়া প্রাণিগণকে অপহরণ(বিমোহিত) করে; এইজন্য বাগিন্দ্রিয় ‘গ্রহ’-পদবাচ্য; তাহাও আবার নাম বা শব্দরূপ অতিগ্রহ দ্বারা গৃহীত, অর্থাৎ সেই বাগিন্দ্রিয়নামক গ্রহটিও আবার নাম— বক্তব্য-বিষয়রূপ অতিগ্রহ দ্বারা পরিগৃহীত হইয়া থাকে। বৈদিক প্রয়োগ বলিয়া ‘অতিগ্রহ’ শব্দের অকার দীর্ঘ(অতিগ্রাহ) হইয়াছে; প্রকৃতপক্ষে শব্দটি হইবে ‘অতিগ্রহ’। বক্তব্য শব্দই বাগিন্দ্রিয়ের মুখ্য বিষয়; এই জন্য—বক্তব্য বিষয়ের উচ্চারণেই নিযুক্ত থাকে বলিয়াই বাগিন্দ্রিয়কে ঐ বক্তব্য বিষয় দ্বারা বশীকৃত বলা হইয়াছে; কেন না, শব্দোচ্চারণ না করিয়া বাগিন্দ্রিয়ের কখনই নিস্তার নাই; এই কারণেই বাগিন্দ্রিয়কে নামরূপী অতিগ্রহ দ্বারা আক্রান্ত বলা হইল; বস্তুতঃ বক্তব্য বিষয়ে আসক্তি থাকাতেই বাগিন্দ্রিয় সেই সমস্ত বক্তব্য বিষয় প্রকাশ করিতে বাধ্য হয়, এবং তাহার ফলেই নানাবিধ অনর্থে জড়িত হয়। পরবর্তী অন্যান্য শ্রুতির অর্থও এই প্রকার। কথিত ত্বপর্য্যন্ত আটটি ইন্দ্রিয় ‘গ্রহ’-পদবাচ্য, আর স্পর্শপর্য্যন্ত আটটি বিষয় ‘অতিগ্রাহ’-পদবাচ্য ইতি ॥ ১৫৫— ১৬১॥ ৩—৯॥ যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যদিদং সর্ব্বং মৃত্যোরন্নং, কা স্বিৎ সা দেবতা যস্যা মৃত্যুরন্নমিত্যগ্নির্ব্বে মৃত্যুঃ সোহপামন্নমপ পুনর্মৃত্যুং জয়তি ॥ ১৬২ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।—[আর্ত্তভাগঃ পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ— যৎ ইদং(স্থূলসূক্ষ্মবস্তুজাতং) মৃত্যোঃ(বিনাশস্য) অন্নং(বিনাশগ্রস্তং), কা স্বিৎ(স্বিং-শব্দঃ কামপ্রবেদনে,) সা দেবতা, যন্যাঃ(দেবতায়াঃ) মৃত্যুঃ[অপি] অন্নম্?[সর্ব্বং হি জায়মানং বস্তু মৃত্যুনা কবলীকৃতং দৃশ্যতে, সঃ মৃত্যুরপি কেন- চিৎ কবলীক্রিয়তে ন বা? মৃত্যোরপি মৃত্যুরস্তি নাস্তি বা ইতি প্রশ্নার্থঃ]। [যাজ্ঞবল্ক্যঃ একৈকশো বিভজ্য তদুত্তরমাহ—] অগ্নিঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) মৃত্যুঃ
৭৪৯
(সর্ব্ববিনাশকঃ), সঃ(অগ্নিরূপঃ মৃত্যুঃ) অপাং(জলানাম্) অন্নং(ভক্ষ্যং— আপো হি অগ্নেঃ মৃত্যুরিতি ভাবঃ)।[যঃ এবং বেত্তি; সঃ] পুনঃ মৃত্যুং অপ- জয়তি(মৃত্বা পুনর্ন ম্রিয়তে, অমৃতত্বং লভতে ইত্যাশয়ঃ) ॥ ১৬২ ॥১০৷৷
মূলানুবাদ?—আর্ত্তভাগ সম্বোধনপূর্ব্বক পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—যাজ্ঞবল্ক্য, উৎপত্তিশীল সমস্ত পদার্থই মৃত্যুর বশীভূত; [জিজ্ঞাসা করি,] এমন দেবতা কে আছে, মৃত্যুও যাহার ভক্ষণীয় হয় —অর্থাৎ মৃত্যুরও মৃত্যু ঘটায়?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] অগ্নি হইতেছে একটি প্রসিদ্ধ মৃত্যু(সর্ববস্তু-বিধ্বংসকারী), তাহাও আবার জলের অন্ন —ভক্ষ্য—বিনাশ্য হয়, অর্থাৎ জল হইতেছে মৃত্যুরূপী অগ্নিরও মৃত্যু- স্বরূপ। যে লোক এই তত্ত্ব জানে, সে লোক পুনর্মৃত্যু জয় করে, অর্থাৎ অমৃতত্ব লাভ করে ॥ ১৬২ ॥ ১০ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—উপসংহৃতেষু গ্রহাতিগ্রহেষু আহ পুনঃ-যাজ্ঞ- বন্ধ্যেতি হোবাচ। যদিদং সর্ব্বং মৃত্যোরন্নং-যদিদং ব্যাকৃতৎ সর্ব্বং মৃত্যোরন্নম্-সর্ব্বং জায়তে বিপদ্যতে চ গ্রহাতিগ্রহলক্ষণেন মৃত্যুনা গ্রস্তম্। কা স্বিৎ কা নু স্যাৎ সা দেবতা, যস্যা দেবতায়া মৃত্যুরপ্যন্নং ভবেৎ “মৃত্যুর্যস্যোপ- সেচনম্” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। অয়মভিপ্রায়ঃ প্রষ্টু:-যদি মৃত্যোমৃত্যুৎ বক্ষ্যতি, অনবস্থা স্যাৎ; অথ ন বক্ষ্যতি, অস্মাদ গ্রহাতিগ্রহলক্ষণাৎ মৃত্যোর্মোক্ষো নোপপদ্যতে। গ্রহাতিগ্রহমৃত্যুবিনাশে হি মোক্ষঃ স্যাৎ; স যদি মৃত্যোরপি মৃত্যুঃ স্যাৎ, ভবেৎ গ্রহাতিগ্রহলক্ষণস্য মৃত্যোর্বিনাশঃ; অতো দুর্ব্বচনং প্রশ্নং মন্বানঃ পৃচ্ছতি-কা স্বিৎ সা দেবতেতি। অস্তি তাবৎ মৃত্যোমৃত্যুঃ। নন্বনবস্থা স্যাৎ-তস্যাপ্যন্যো মৃত্যুরিতি; ন অনবস্থা, সর্ব্বমৃত্যোমৃত্যুরুপ- পত্তেঃ। কথং পুনরবগম্যতে-অস্তি মৃত্যোমৃত্যুরিতি? দৃষ্টত্বাৎ,-অগ্নি- স্তাবৎ সর্ব্বস্য দৃষ্টো মৃত্যুঃ, বিনাশকত্বাৎ; সোহদ্ভির্ক্ষ্যতে,-সোহগ্নিরপামন্নম্; গৃহাণ তহি-অস্তি মৃত্যোমৃত্যুরিতি; তেন সর্ব্বং গ্রহাতিগ্রহজাতং ভক্ষ্যতে মৃত্যোমৃত্যুনা; তস্মিন্ বন্ধনে নাশিতে মৃত্যুনা ভক্ষিতে সংসারাৎ মোক্ষ উপপন্নো ভবতি। বন্ধনং হি গ্রহাতিগ্রহলক্ষণমুক্তম্; তস্মাচ্চ মোক্ষ উপপদ্যতে-ইত্যেতৎ প্রসাধিতম্; অতো বন্ধমোক্ষায় পুরুষপ্রয়াসঃ সফলো ভবতি; অতোহপজয়তি পুনর্মৃত্যুম্ ॥ ১৬২॥ ১০ ॥
টীকা।—প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—যদিদমিতি। যদিদং ব্যাকৃতং জগৎ সর্ব্বং মৃত্যোরন্নমিতি
যোজনা। তস্য তদন্নত্বং সাধয়তি-সর্ব্বমিতি। মৃত্যোরন্নত্বসম্ভাবনায়াং শ্রুত্যন্তরং সংবাদয়তি- মৃত্যুরিতি। মৃত্যোমৃত্যুমধিকৃতা প্রশ্নস্ত করটদন্তনিরূপণবদপ্রয়োজনত্বমাশঙ্ক্যাহ-অয়মিতি। সত্যেব গ্রহাতিগ্রহলক্ষণে মৃত্যৌ মোক্ষো ভবিষ্যতীতি চেন্নেত্যাহ-গ্রহেতি। অস্তু তর্হি গ্রহাতিগ্রহনাশে মুক্তিরিত্যত আহ-স যদীতি। ন চ মৃত্যোমৃত্যুরন্ত্যনবস্থানাদিত্যুক্ত মিতি ভাবঃ। পক্ষেহনবস্থানাৎ পক্ষে চামুক্তেরিত্যতঃ শব্দার্থঃ। অস্তি-পক্ষং পরিগৃহ্লাতি-অস্তি তাবদিতি। মৃত্যোমৃত্যুঃ ব্রহ্মাত্মসাক্ষাৎকারো বিবক্ষিতঃ, তস্যাপ্যন্যো মৃত্যুরস্তি চেদনবস্থা, নাস্তি চেৎ, তদ্ধেত্বজ্ঞানস্যাপি স্থিতেরমুক্তিরিতি শঙ্কতে-নন্বিতি। তত্রান্তিপক্ষং পরিগৃহ্য পরি- হরতি-নানবস্থেতি। যথোক্তস্য মৃত্যোঃ স্বপরবিরোধিত্বান্ন কিঞ্চিদবদ্যমিত্যর্থঃ। উক্তং পক্ষং প্রশ্নদ্বারা প্রমাণারূঢ়ং করোতি-কথমিতি। দৃষ্টত্বং স্পষ্টয়তি-অগ্নিস্তাবদিতি। দৃষ্টত্বফল- মাচষ্টে-গৃহাণেতি। তস্য কার্য্যং কথয়তি-তেনেতি। অপ পুনর্মৃত্যুং জয়তীত্যস্য পাতনিকাং করোতি-তস্মিন্নিতি। উক্তমেব ব্যক্তীকরোতি-বন্ধনং হীতি। প্রসাধিতং মৃত্যোরপি মৃত্যুরস্তীতি প্রদর্শনেনেতি শেষঃ। মোক্ষোপপত্তৌ ফলিতমাহ-অত ইতি। পুরুষপ্রয়াসঃ শমাদিপূর্ব্বকশ্রবণাদিঃ। তৎফলস্য জ্ঞানস্য ফলং দর্শয়ন্ বাক্যং যোজয়তি-অত ইতি। জ্ঞানং পঞ্চম্যর্থঃ। ১৬২।১০।
ভাষ্যানুবাদ।—গ্রহ ও অতিগ্রহের কথা পরিসমাপ্ত হইলে পর, আর্ত্তভাগ পুনশ্চ সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“যৎ ইদং সর্ব্বং মৃত্যোঃ অন্নম্” ইত্যাদি। উৎপত্তিশীল এই যাহা কিছু আছে, তৎসমস্তই মৃত্যুর অন্ন(ভক্ষ্য), অর্থাৎ সমস্ত পদার্থ ই জন্মে, আবার উক্ত গ্রহ ও অতিগ্রহরূপ মৃত্যু দ্বারা কবলিত হইয়া বিপন্নও হয়—বিনষ্টও হয়। এখন জিজ্ঞাসা করি, এমন কোনও দেবতা আছেন কি, এই মৃত্যুও যে দেবতার অন্ন—ভক্ষণীয় হয়? ‘মৃত্যু যাহার উপসেচন—অন্নোপকরণ ব্যঞ্জনাদিস্বরূপ’ এই শ্রুতিবাক্যে তাহার অস্তিত্ব সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। প্রশ্নকর্তার অভিপ্রায় এই যে, যাজ্ঞবল্ক্য যদি বলেন—মৃত্যুরও মৃত্যু আছে, তাহা হইলে ‘অনবস্থা’ দোষ উপস্থিত হইবে, আর যদি বলেন—মৃত্যুর মৃত্যু নাই, তাহা হইলেও যথোক্ত গ্রহাতিগ্রহরূপ মৃত্যু হইতে মুক্তি বা নিষ্কৃতি লাভ করা কাহারো পক্ষে সম্ভব হইতে পারে না; কেননা, পূর্ব্বে যে সর্ব্বগ্রাসী গ্রহাতিগ্রহনামক মৃত্যুর উল্লেখ করা হইয়াছে, সেই গ্রহাতি- গ্রহরূপী মৃত্যুর বিনাশ হইলেই তাহা হইতে মুক্তিলাভ সম্ভব হইতে পারে; যদি মৃত্যুরও মৃত্যু সম্ভব হয়, তবেই গ্রহাতিগ্রহরূপী মৃত্যুরও বিনাশ সম্ভবপর হয়, নচেৎ নহে; কাজেই আপনার প্রশ্নটি দুরুত্তর মনে করিয়া আর্ত্তভাগ জিজ্ঞাসা করিলেন—“কা স্বিৎ সা দেবতা” ইতি। ১
[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন হাঁ,] মৃত্যুরও মৃত্যু আছে। ভাল কথা, তাহা হইলে যে, ‘তাহারও অন্য মৃত্যু, তাহারও অন্য মৃত্যু’ এইরূপে অনবস্থা-দোষ ঘটে?—
৭৫১
অর্থাৎ মৃত্যুচিন্তার আর কোথাও বিশ্রাম, হইতে পারে না? না, অনবস্থা দোষ ঘটে না; কারণ? যেহেতু সর্ব্বসংহারকরূপে কল্পিত চরম মৃত্যুর আর অপর মৃত্যু থাকা সম্ভব হয় না। আচ্ছা, জিজ্ঞাসা করি, মৃত্যুরও যে, মৃত্যু আছে, ইহা কোন্ প্রমাণবলে জানা যাইতেছে?[উত্তর-] প্রত্যক্ষ দর্শন হইতেই (জানা যাইতেছে),-প্রত্যক্ষতঃ দেখিতে পাওয়া যায়, প্রথমতঃ অগ্নি হইতেছে সকলের মৃত্যু; কারণ, অগ্নিতে সকল বস্তুই ভস্মীভূত হইয়া যায়; সেই সর্ব্বসংহারক অগ্নিও আবার জল দ্বারা বিনষ্ট হইয়া থাকে; সুতরাং উক্ত অগ্নি হইতেছে জলের অন্ন-বিনাশ্য;[সুতরাং জলকে অগ্নির মৃত্যুস্বরূপ বলা যাইতে পারে;] এইরূপে ধরিয়া লও যে, মৃত্যুরও মৃত্যু আছে; অতএব বুঝিতে হইবে যে, সেই গ্রহাতিগ্রহরূপী মৃত্যুসমূহও অপর মৃত্যুকর্তৃক কবলিত হয়। মৃত্যুর মৃত্যুকর্তৃক সেই গ্রহাতিগ্রহরূপী বন্ধন ছিন্ন হইলে ‘পর, জীবেরও সংসার হইতে মুক্তিলাভ করা সম্ভবপর হয়; গ্রহ ও অতিগ্রহই যে, জীবের প্রধানতম বন্ধন, একথা পূর্ব্বেই কথিত হইয়াছে। সেই গ্রহাতি- গ্রহরূপ বন্ধন হইতে যে, কিরূপে নিষ্কৃতিলাভ হইতে পারে, তাহা প্রমাণিত হইল; অতএব বন্ধন ছেদনের জন্য যে, জীবের প্রযত্ন, তাহারও সাফল্য প্রদর্শিত হইল। এবংবিধ বিজ্ঞানের ফলে জীব পুনর্মৃত্য জয় করে, অর্থাৎ অমৃতত্ব লাভ করে। পুনর্ব্বার আর তাহাকে সংসারী হইতে হয় না ॥ ১৬২ ॥ ১০॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যত্রায়ং পুরুষো ম্রিয়ত উদ- স্মাৎ প্রাণাঃ ক্রামন্ত্যাহো ৩ নেতি, নেতি হোবাচ যাজ্ঞ- বল্ক্যোহত্রৈব সমবনীয়ন্তে, স উচ্ছ্বয়ত্যাধ্যায়ত্যাধ্মাতো মৃতঃ শেতে ॥ ১৬৩ ॥ ১১ ॥
সরলার্থঃ।—[ পরমাত্মদর্শনেন মৃত্যুনা মৃত্যৌ ভক্ষিতে সতি বিমুক্তং পুরুষমধিকৃত্য পৃচ্ছতি—যাজ্ঞবল্ক্যেতি]।[আর্ত্তভাগঃ পুনশ্চ] যাজ্ঞবল্ক্যেতি [ সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—অয়ং(ত্বদুক্তঃ মুক্তঃ) পুরুষঃ যত্র(যস্মিন্ কালে) ম্রিয়তে (দেহং পরিত্যজতি),[তদা] প্রাণাঃ(বাগাদয়ঃ গ্রহাঃ) অস্মাৎ(মুক্তপুরুষাৎ) উৎক্রামন্তি(ঊর্দ্ধং গচ্ছন্তি)? আহো(অথবা) ন[উৎক্রামন্তি]? ইতি। যাজ্ঞবল্ক্যঃ আহ—ন—(ন উৎক্রামন্তি) ইতি;[অপি তু] অত্র(অস্মিন্ স্বকারণে) এব(নিশ্চয়ে) সমবনীয়ন্তে(অবিভাগং একতাং গচ্ছন্তি)। সঃ(তদবস্থঃ পুরুষদেহঃ) উচ্ছ্বয়তি(স্ফীতো ভবতি), আত্মায়তি(বাহ্যবায়ুনা
পূর্ণো ভবতি);[ততশ্চ] আত্মাতঃ(বাহ্যবায়ুনা পূর্ণঃ) মৃতঃ(সন্) শেতে (নিশ্চেষ্টঃ তিষ্ঠতি) ॥ ১৬৩॥ ১১ ॥
মূলানুবাদ?—আর্ত্তভাগ পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, গ্রহাতিগ্রহবিমুক্ত পুরুষ যখন মরে—দেহ ত্যাগ করে, তখন তাঁহার প্রাণসমূহ(বাক্প্রভৃতি গ্রহগণ) এখান হইতে ঊর্দ্ধগামী হয়? অথবা হয় না? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—না, ঊর্দ্ধগামী হয় না; পরন্তু এখানেই স্বকারণীভূত পরমাত্মাতেই বিলয়—অভিন্নভাব প্রাপ্ত হয়। এই দেহ তখন স্ফীত হয়, বাহ্য বায়ু দ্বারা পরিপূর্ণ হয়, এবং বায়ুপূর্ণ অবস্থায় মরিয়া নিশ্চেষ্টভাবে পড়িয়া থাকে ॥ ১৬৩ ॥ ১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—পরেণ মৃত্যুনা মৃত্যৌ ভক্ষিতে পরমাত্মদর্শনেন, যোহসৌ মুক্তো বিদ্বান্, সোহয়ং পুরুষঃ যত্র যস্মিন্ কালে ম্রিয়তে, উৎ—উর্দ্ধম্, অস্মাদ্ব্রহ্মবিদো ম্রিয়মাণাৎ, প্রাণা বাগাদয়ো গ্রহাঃ নামাদয়শ্চ অতিগ্রহা বাসনা- রূপা অন্তঃস্থাঃ সপ্রযোজকাঃ ক্রামন্তি উর্দ্ধং উৎক্রামন্তি, আহোস্বিন্নেতি? নেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—ন উৎক্রামন্তি, অত্রৈব অস্মিন্নের পরেণাত্মনা অবিভাগং গচ্ছন্তি—বিদুষি কার্য্যাণি করণানি চ স্বযোনৌ পরব্রহ্মসতত্ত্বে সমবনীয়ন্তে একী- ভাবেন সমবসৃজ্যন্তে প্রলীয়ন্ত ইত্যর্থঃ—ঊর্ময় ইব সমুদ্রে। তথা চ শ্রুত্যন্তরৎ কলাশব্দবাচ্যানাং প্রাণানাং পরস্মিন্নাত্মনি প্রলয়ং দর্শয়তি—“এবমেবাস্য পরিদ্রষ্টু- রিমাঃ ষোড়শ কলাঃ পুরুষায়ণাঃ পুরুষং প্রাপ্যাস্তং গচ্ছন্তি” ইতি পরেণাত্মনা অবিভাগং গচ্ছন্তীতি দর্শিতম্। ন তর্হি মৃতঃ? ন হি; মৃতশ্চায়ম্, যস্মাৎ স উচ্ছ্বয়তি উচ্ছ্বনতাং প্রতিপদ্যতে, আত্মায়তি বাহ্যেন বায়ুনা পূর্য্যতে দূতিবৎ, আত্মাতো মৃতঃ শেতে নিশ্চেষ্টঃ। বন্ধননাশে মুক্তস্য ন কচিদ্ গমনমিতি বাক্যার্থঃ ॥ ১৬৩॥ ১১ ॥
টীকা।—সম্যজ্ঞানস্তাপ পুনর্মৃত্যুং জয়তীত্যুক্তং ফলং বিশদীকর্ত্তুং প্রশ্রান্তরমুখাপয়তি— পরেণেতি। পরেণ মৃত্যুনা পরমাত্মদর্শনেনেতি সম্বন্ধঃ। গ্রহাতিগ্রহলক্ষণো বন্ধঃ সপ্তম্যর্থঃ। গ্রহশব্দেন প্রযোজ্যরাশিগৃহীতঃ। নামাদীনাং স্থূলানাং বহিষ্ঠত্বেন স্বরসতস্ত্যক্তত্বাৎ কথং তদুৎ- ক্রান্তিঃ পৃচ্ছাতে, তত্রাহ—বাসনারূপা ইতি। তেষামনুংক্রান্তৌ মুক্ত্যসম্ভবং সূচয়তি— প্রযোজকা ইতি। উৎক্রান্তিপক্ষে “ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ” ইতি ন্যায়াৎ পুনরুৎপত্তিঃ স্যাৎ, অনুৎ- ক্রান্তিপক্ষে মরণপ্রসিদ্ধির্ব্বিরুধ্যেতেতি ভাবঃ। দ্বিতীয়ং পক্ষং পরিহরতি—নেতি হোবাচেত্যা- দিনা। কাৰ্যাণি করণানি চ সর্ব্বাণি পরেণাত্মনা সহাবিভাগং গচ্ছন্তি সন্ত্যস্মিন্নেব বিদুষি সমবনীয়ন্ত ইতি সম্বন্ধঃ। তেষাং বিদুষি বিলয়ে হেতুমাহ—স্বযোনাবিতি। বিদ্বানের হি
৭৫৩
পূর্ব্বমবিদ্যয়া তেষাং যোনিরাসীৎ, তস্মিন্ বিদ্যাদশায়াং তদ্বলাদবিদ্যায়ামপনীতায়াং পরিপূর্ণে তত্ত্বে তেষাং পর্যবসানং সম্ভবতীত্যর্থঃ। কারণে কাৰ্য্যাণাং প্রবিলয়ে দৃষ্টান্তমাহ-উর্ময় ইতি। প্রাণাদীনাং কারণসংসর্গাখ্যো লয়শ্চেৎ পুনরুৎপত্তিঃ স্যাদিত্যাশঙ্কা জ্ঞানে সত্যজ্ঞানধ্বংসান্নৈব- মিত্যভিপ্রেত্যাহ-তথা চেতি। সবিষয়াণ্যেকাদশেন্দ্রিয়াণি বায়বশ্চ পঞ্চেতি ষোড়শ কলাঃ, তাসাং স্বাতন্ত্র্যমাশ্রয়ান্তরং চ বারয়তি-পুরুষায়ণা ইতি। তাসাং নিবৃত্তিশ্চ পুরুষব্যতিরেকেণ নাস্তীতি সুচরতি-পুরুষং প্রাপ্যেতি। প্রাণাশ্চেন্নোৎক্রামন্তি, তর্হি মৃতো ন ভবতীতি প্রতীতিবিরোধং শঙ্কিত্বা পরিহরতি-ন তহীত্যাদিনা। দূতিশব্দো ভস্ত্রাবিষয়ঃ। প্রকৃতং বাক্যং প্রত্যক্ষসিদ্ধ- দেহমরণানুবাদকমিত্যভিপ্রেত্যাহ-বন্ধনেতি। ১৬৩। ১১। ভাষ্যানুবাদ।—পরমাত্মদর্শনরূপ অপর মৃত্যুকর্তৃক গ্রহাতিগ্রহরূপী মৃত্যু ভক্ষিত হইলে পর, যে পুরুষ বিদ্যাবলে বিমুক্ত হন, সেই এই পুরুষ যে সময়ে দেহ ত্যাগ করেন, সে সময়ে বাসনারূপে দেহমধ্যবর্তী প্রাণসমূহ—বাগাদি গ্রহগণ ও নামপ্রভৃতি অতিগ্রহগণ এই আসন্নমৃত্যু ব্রহ্মবিদ্ পুরুষ হইতে নির্গত হইয়া কি উর্দ্ধে গমন করে? অথবা গমন করে না? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন— না—উর্দ্ধে—লোকান্তরে গমন করে না; পরন্তু এখানেই পরমাত্মার সহিত অবিভাগ প্রাপ্ত হয়,—বিদ্বান্ পুরুষের দেহ ও ইন্দ্রিয়সমূহ—সমুদ্রোত্থিত তরঙ্গ- সমূহ যেমন সমুদ্রে মিলিয়া যায়, তেমনি স্বকারণীভূত পরব্রহ্মে বিলীন হয়— এক—অভিন্নরূপে অবস্থান করে। অপর শ্রুতিও কলা-নামে অভিহিত প্রাণ- সমূহের পরব্রহ্মে বিলয়নের কথা বলিতেছে—‘ঠিক এইরূপই আত্মদর্শীর পুরুষাশ্রিত (দেহস্থ) এই ষোড়শ কলা(১) পুরুষকে(পরমাত্মাকে) প্রাপ্ত হইয়া বিলীন হয়,’ এখানে দেখান হইয়াছে যে, প্রাণসমূহ পরমাত্মার সহিত অবিভাগ প্রাপ্ত হয়। ভাল কথা, তাহা হইলে ত পুরুষের আর মৃত্যু হইল না; না— তাহা নহে, এই পুরুষ মৃতই বটে; কারণ, সেই দেহ তখন উচ্ছ নতা প্রাপ্ত হয়— স্ফীত হয়, এবং আমাত হয় অর্থাৎ চর্মনির্মিত ভস্ত্রার ন্যায় বাহিরের বায়ু দ্বারা পরিপূর্ণ হয়; সেই অবস্থাতে মৃত হইয়া শয়ন করে—নিশ্চেষ্টভাবে পড়িয়া থাকে। শ্রুতির তাৎপর্য্যার্থ এই যে, বন্ধ-ধ্বংসের পর সেই বিদ্বান্ পুরুষের প্রাণসমূহ আর অন্যত্র কোথাও গমন করে না,(এখানেই শেষ হইয়া যায়) ॥ ১৬৩॥ ১১ ॥ যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যত্রায়ং পুরুষো ম্রিয়তে কিমেনং
ন জহাতীতি, নামেতি, অনন্তং বৈ নামানন্তা বিশ্বে দেবা অনন্তমেব স তেন লোকং জয়তি ॥ ১৬৪ ॥ ১২ ॥
সরলার্থঃ।—[আর্ত্তভাগঃ পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্] উবাচ হ— অয়ং(গ্রহাতিগ্রহমুক্তঃ) পুরুষঃ যত্র(যস্মিন্ কালে) ম্রিয়তে,[তদা] এনং (মৃতং পুরুষং) কিং(কিন্নামকং বস্তু) ন জহাতি?(ন পরিত্যজতি? এনং অনুবর্ত্ততে ইতি ভাবঃ) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] নাম—ইতি(সংজ্ঞা এব কেবলম্ এনং ন জহাতীত্যর্থঃ)। বৈ(যতঃ) নাম অনন্তং(আনন্ত্যগুণবৎ), বিশ্বে দেবাঃ[অপি] অনন্তাঃ(অসংখ্যেরাঃ); সঃ(বিদ্বান) তেন(আনন্ত্য- বিজ্ঞানেন) অনন্তম্ এব লোকং জয়তি॥ ১৬৪॥ ১২॥
মূলানুবাদ:-আর্তভাগ পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, সেই গ্রহাতিগ্রহবিমুক্ত পুরুষ মরিলে পর, কে তাহাকে পরিত্যাগ করে না, অর্থাৎ কে তাহার অনুগমন করে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] নাম-[তাহাকে ত্যাগ করে না]; নামও অনন্ত, বিশ্বদেবগণও অনন্ত; যিনি এই আনন্ত্য দর্শন করেন, তিনি সেই বিজ্ঞানবলে অনন্ত ফল লাভ করেন ॥ ১৬৪ ॥ ১২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—মুক্তস্য কিং প্রাণা এব সমবনীয়ন্তে? আহো স্বিৎ তৎপ্রযোজকমপি সর্ব্বম্? অথ প্রাণা এব, ন তৎপ্রযোজকং সর্ব্বম্; প্রযোজকে বিদ্যমানে পুনঃ প্রাণানাং প্রসঙ্গঃ। অথ সর্ব্বমেব কামকর্ম্মাদি; ততো মোক্ষ উপপদ্যতে—ইত্যেবমর্থ উত্তরঃ প্রশ্নঃ।
যাজ্ঞবন্ধ্যেতি হোবাচ-যত্রায়ং পুরুষো ম্রিয়তে, কিমেনৎ ন জহাতীতি? আহ ইতরঃ-নামেতি; সর্ব্বং সমবনীয়ত ইত্যর্থঃ, নামমাত্রং তু ন লীয়তে, আকৃতিসম্বন্ধাৎ; নিত্যং হি নাম; অনন্তং বৈ নাম; নিত্যত্বমেবানন্ত্যং নাম্নঃ। তদানন্ত্যাধিকৃতা অনন্তা বৈ বিশ্বে দেবাঃ; অনন্তমেব স তেন লোকং জয়তি, তন্নামানন্ত্যাধিকৃতান্ বিশ্বান্ দেবানাত্মত্বেনোপেত্য তেনানন্ত্যদর্শনেন অনন্তমেব লোকং জয়তি ॥ ১৬৪ ॥ ১২ ॥
টীকা।—প্রাণা নোৎক্রামস্তীতি বিশেষণমাশ্রিত্য প্রশ্নান্তরমাদত্তে—মুক্তস্যেতি। পক্ষদ্বয়েহপি প্রয়োজনং কথয়তি—অথেত্যাদিনা। যৎ পুত্রক্ষেত্রাদ্যভূৎ, তদধুনা নামমাত্রাবশেষমিত্যুক্তে নাবশিষ্টং কিঞ্চিদিতি যথাহবগম্যতে, তথাঽত্রাপি নামমাত্রং ম্রিয়মাণং বিদ্বাংসং ন জহাতীত্যুক্তে, ন কিঞ্চিদবশিষ্টমিতি দৃষ্টিঃ স্যাদিতি প্রত্যুক্তিতাৎপর্য্যমাহ—সর্ব্বমিতি। যথাশ্রুতমর্থমাশ্রিত্য
৭৫৫
প্রত্যুক্তিং ব্যাচষ্টে-নামমাত্রং ত্বিতি। বিদুষো নামনিত্যত্বে হেত্বন্তরমুত্তরবাক্যাবষ্টন্তেন দর্শয়তি- নিত্যং হীতি। অনন্তশব্দান্নায়ো ব্যক্তিপ্রাচুর্য্যে প্রতিভাতি কুতো নিত্যতেত্যাশঙ্ক্যাহ- নিত্যত্বমেবেতি। ব্যক্তিভেদস্য প্রসিদ্ধত্বান্ন তদ্বক্তব্যং, ব্রহ্মবিদঃ স্বদৃষ্ট্যা নামাপি ন শিষ্যতে পরদৃষ্ট্যা তদবশেষোক্তি:-শুকো মুক্ত ইত্যাদিব্যপদেশদর্শনাৎ, অতো নামনিত্যত্বং ব্যবহারিক- মিতি ভাবঃ। ব্রহ্মাস্মীতি দর্শনেন বিশ্বান্ দেবানাত্মত্বেনোপগম্যানস্তং লোকং জয়তীতি সিদ্ধানুবাদো ব্রহ্মবিদ্যাং স্তোতুমিত্যভিপ্রেত্যানন্তরবাক্যমাদত্তে-তদানন্ত্যেতি। তদ্ ব্যাচষ্টে- তন্নামানন্ত্যেতি। ১৬৪।১২।
ভাষ্যানুবাদ।—এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, মুক্ত পুরুষের কেবল প্রাণসমূহই কি এখানে বিলীন হয়? অথবা তৎসম্পর্কিত সমস্তই লীন হয়? যদি কেবল প্রাণসমুহই বিলীন হয়, তৎসম্পর্কিত আর কিছু বিলীন না হয়, তাহা হইলে, যে কারণে প্রাণসমাগম হইয়াছিল, তাহা বিদ্যমান থাকায় পুনর্ব্বারও প্রাণ-সম্বন্ধের সম্ভাবনা থাকে? আর যদি দেহ-প্রযোজক কাম-কর্মাদি, সমস্তই বিলীন হইয়া যায়, তাহা হইলেই প্রকৃতপক্ষে মুক্তিলাভ সম্ভবপর হইতে পারে; এই উদ্দেশ্যেই পরবর্তী প্রশ্নের অবতারণা করা হইতেছে। ১
আর্তভাগ জিজ্ঞাসা করিলেন—যাজ্ঞবল্ক্য, এই পুরুষ যখন মৃত হয়, তখন কে ইহাকে ত্যাগ করে না? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—নাম(সংজ্ঞা); অর্থাৎ অপর সমস্তই এখানে বিলীন হইয়া যায়, কেবল নামই একমাত্র বিলীন হয় না; কেননা, নামের কেবল দৈহিক আকৃতির সহিত সম্বন্ধ, দেহের সহিত নহে। নাম হইতেছে নিত্য এবং অনন্ত; নিত্যত্বই নামের অনন্তত্ব; সেই অনন্ত নামের অধিপতি বিশ্বদেবগণও অনন্ত; বিদ্বান্ পুরুষ এইরূপ বিজ্ঞানে নিশ্চয়ই অনন্ত ফল লাভ করেন,—নামের আনন্ত্যাধিপতি বিশ্বদেবতাগণকে আত্মস্বরূপে অধিগত হইয়া সেই আনন্ত্য বিজ্ঞানের ফলে বিজ্ঞাতাও অনন্ত ফলই লাভ করিয়া থাকেন ॥ ১৬৪ ॥ ১২॥
যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যত্রাস্য পুরুষস্য মৃতস্যাগ্নিং বাগপ্যেতি বাতং প্রাণশ্চক্ষুরাদিত্যং মনশ্চন্দ্রং দিশঃ শ্রোত্রং পৃথিবীৎ শরীরমাকাশমাত্মৌষধীর্লোমানি বনস্পতীন্ কেশা অপ্সু লোহিতঞ্চ রেতশ্চ নিধীয়তে, কায়ং তদা পুরুষো ভবতীত্যাহর সোম্য হস্তমার্ত্তভাগ, আবামেবৈতস্য বেদিষ্যাবো ন নাবেতৎ- সজন ইতি।
তৌ হোৎক্রম্য মন্ত্রয়াঞ্চক্রাতে তৌ হ যদূচতুঃ কর্ম্ম হৈব
তদূচতুরথ যৎ প্রশশসতুঃ কৰ্ম্ম হৈব তৎ প্রশশসতুঃ পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি পাপঃ পাপেনেতি, ততো হ জারং- কারব আর্ত্তভাগ উপররাম ॥ ১৬৫ ॥ ১৩ ॥ ইতি বহদ্ভাবকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম ॥ ৩ ॥২॥ ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।—[আর্ত্তভাগঃ পুনশ্চ সম্বোধয়ন্ পৃচ্ছতি—যাজ্ঞবল্ক্যেতি।] হে যাজ্ঞবল্ক্য, যত্র(যস্মিন্ কালে) অন্য(যথোক্তস্য) মৃতস্য পুরুষস্য বাক্ অগ্নিম্ অপ্যেতি (প্রাপ্নোতি), প্রাণঃ বাতং(বায়ুং), চক্ষুঃ আদিত্যং(সূর্য্যং), মনঃ চন্দ্র, শ্রোত্রং দিশঃ, শরীরং পৃথিবীং, আত্মা আকাশং, লোমানি ওষধীঃ(তৃণলতাঃ), কেশাঃ বনস্পতীন্(অপুষ্প-ফলশালিনঃ বৃক্ষান্)[অপিযন্তি], তথা, লোহিতং (রক্তং) চ রেতঃ(শুক্রং) চ অপ্সু(জলেষু) নিধীয়তে(বিলীয়তে), তদা অয়ং(মৃতঃ) পুরুষঃ কঁ(কুত্র) ভবতি(তিষ্ঠতি)? ইতি।
[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] হে সোম্য আর্তভাগ, হস্তং আহর(হস্তং অর্পয়) আবাং (ত্বং অহং চ) এব এতস্য(প্রশ্নস্য)[তত্ত্বং] বেদিষ্যাবঃ(জ্ঞাস্যাবঃ), মৌ (আবাং)[অপি] এতৎ(এতস্মিন্) সজনে(জনবহুলে স্থানে ইত্যর্থঃ) ন। [ইত্যুক্কা] তৌ(যাজ্ঞবল্কার্তভাগৌ) উৎক্রম্য(তস্মাৎ স্থানাৎ বহির্নিগম্য) মন্ত্রয়াঞ্চক্রাতে(বিচারিতবস্তৌ); তৌ হ(ঐতিহ্যে) যৎ উচতুঃ(উক্তবস্তৌ), তৎ হ(খলু) কৰ্ম্ম এব উচতুঃ। যৎ প্রশংসতুঃ, কৰ্ম্ম হ এব প্রশংসতুঃ; বৈ (যতঃ) পুণ্যেন কর্মণা পুণ্যঃ(পুণ্যাত্মা) ভবতি, পাপেন(কর্মণা) পাপঃ (পাপাত্মা) ভবতি, ইতি। ততঃ(এবং প্রশ্নোত্তরশ্রবণাৎ পরং) জারৎকারবঃ আর্তভাগ উপররাম(প্রশ্নাৎ বিরতো বভূব) ॥ ১৬৫ ॥ ১৩॥
মূলানুবাদ।—আর্ত্তভাগ পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই পুরুষ মরিলে পর, যখন তাহার বাক্ অগ্নিকে, প্রাণ বায়ুকে, চক্ষু আদিত্যকে, মন চন্দ্রকে, শ্রবণেন্দ্রিয় দিক্সমূহকে, শরীর পৃথিবীকে, আত্মা আকাশকে, লোমসমূহ তৃণলতাপ্রভৃতিকে, কেশরাশি বনস্পতিকে(বিনাপুষ্পে ফলদায়ক বৃক্ষসমূহকে) প্রাপ্ত হয়, এবং রক্ত ও শুক্র জলে বিলীন হয়, তখন এই পুরুষ কোথায় থাকে?
যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে সোম্য আর্ত্তভাগ, হস্তপ্রদান কর, অর্থাৎ তিনি আর্ত্তভাগের হাত ধরিয়া বলিলেন যে, এই প্রশ্নের রহস্য আমরা
৭৫৭
দু‘জনেই জানিব, কিন্তু এই জনবহুল সভাক্ষেত্রে নহে;[এই কথা বলিয়া আর্ত্তভাগের হস্তধারণপূর্ব্বক] তাহারা দু‘জনে উঠিয়া মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। তাঁহারা যাহা বলিয়াছিলেন, তাহাতে কর্ম্মের কথাই বলিয়াছিলেন, তাঁহারা যাহা প্রশংসা করিয়াছিলেন, তাহাতে কর্ম্মেরই প্রশংসা করিয়াছিলেন,—পুণ্য কর্ম্মদ্বারা জীব পুণ্যাত্মা হয়, আর পাপ কর্ম্ম দ্বারা পাপী হয়। ইহার পর জারৎকারব আর্ত্তভাগ প্রশ্ন হইতে নিবৃত্ত হইলেন ॥ ১৬৫ ॥ ১৩ ॥
ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয় ব্রাহ্মণের ব্যাখ্যা সমাপ্ত ॥ ৩ ॥ ২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—গ্রহাতিগ্রহরূপং বন্ধনমুক্তং মৃত্যুরূপম্; তস্য চ মৃত্যোর্মৃত্যু- সদ্ভাবাৎ মোক্ষশ্চোপপদ্যতে; স চ মোক্ষঃ গ্রহাতিগ্রহরূপাণামিহৈব প্রলয়ঃ, প্রদীপ- নির্ব্বাণবৎ; যত্তদ্ গ্রহাতিগ্রহাখ্যং বন্ধনং মৃত্যুরূপম্, তস্য যৎ প্রযোজকম্, তৎ- স্বরূপনির্ধারণার্থমিদমারভ্যতে—যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ। ১
অত্র কেচিদ্ বর্ণয়ন্তি,—গ্রহাতিগ্রহস্য সপ্রযোজকস্য বিনাশেহপি কিল ন মুচ্যতে; নামাবশিষ্টঃ অবিদ্যয়া ঊষরস্থানীয়য়া স্বাত্মপ্রভবয়া পরমাত্মনঃ পরিচ্ছিন্নো ভোজ্যাচ্চ জগতো ব্যাবৃত্তঃ উচ্ছিন্নকামকর্মা অন্তরালে ব্যবতিষ্ঠতে; তস্য পরমা- ত্মৈকত্বদর্শনেন দ্বৈতদর্শনমপনেতব্যমিতি—অতঃ পরং পরমাত্মদর্শনমারব্ধব্যম্— ইতি; এবমপবর্গাখ্যামন্তরালাবস্থাং পরিকল্প্যোত্তরগ্রন্থসম্বন্ধং কুর্ব্বন্তি। ২
তত্র বক্তব্যম্—বিশীর্ণেষু করণেষু বিদেহস্য পরমাত্মদর্শনশ্রবণমনননিদি- ধ্যাসনানি কথমিতি; সমবনীতপ্রাণস্য হি নামমাত্রাবশিষ্টস্যেতি তৈরুচ্যতে; “মৃতঃ শেতে” ইতি হ্যুক্তম্; ন মনোরথেনাপ্যেতদুপপাদয়িতুং শক্যতে। অথ জীবন্নেবা- বিদ্যামাত্রাবশিষ্টো ভোজ্যাদপাবৃত্ত ইতি পরিকল্প্যতে, তত্তু কিংনিমিত্তমিতি বক্তব্যম্। সমস্তদ্বৈতৈকত্বাত্মপ্রাপ্তিনিমিত্তমিতি যদ্যুচ্যেত, তৎ পূর্ব্বমেব নিরাকৃতম্; কর্মসহিতেন দ্বৈতৈকত্বাত্মদর্শনেন সম্পন্ন। বিদ্বান্ মৃতঃ সমবনীতপ্রাণঃ জগদাত্মত্বং হিরণ্যগর্ভস্বরূপং বা প্রাপ্নুয়াৎ, অসমবনীতপ্রাণঃ ভোজ্যাৎ জীবন্নেব বা ব্যাবৃত্তো বিরক্তঃ পরমাত্মদর্শনাভিমুখঃ স্যাৎ। ৩
ন চোভয়মেকপ্রযত্ননিষ্পাদ্যেন সাধনেন লভ্যম্; হিরণ্যগর্ভপ্রাপ্তিসাধনং চেৎ, ন ততো ব্যাবৃত্তিসাধনম্; পরমাত্মাভিমুখীকরণস্য ভোজ্যাদ্ব্যাবৃত্তেঃ সাধনং চেৎ, ন হিরণ্যগর্ভপ্রাপ্তিসাধনম্; ন হি যদগতিসাধনম্, তৎ নিবৃত্তেরপি। অথ মৃত্বা হিরণ্যগর্ভং প্রাপ্য ততঃ সমবনীতপ্রাণো নামাবশিষ্টঃ পরমাত্মজ্ঞানে অধিক্রিয়তে,
ততোহম্মদাদ্যর্থং পরমাত্মজ্ঞানোপদেশোহনর্থকঃ স্যাৎ; সর্ব্বেষাং হি ব্রহ্মবিদ্যা পুরুষার্থায়োপদিশ্যতে—“তদ্ যো যো দেবানাম্” ইত্যাদ্যয়া শ্রুত্যা। তস্মাদত্যন্ত- নিকৃষ্টা শাস্ত্রবাহ্যৈবেয়ং কল্পনা; প্রকৃতং তু বর্ত্তয়িষ্যামঃ। ৪ তত্র কেন প্রযুক্তং গ্রহাতিগ্রহলক্ষণং বন্ধনম্-ইত্যেতন্নিদিধারয়িষয়া আহ-যত্র অস্য পুরুষস্থ্য অসম্যদর্শিনঃ শিরঃপাণ্যাদিমতো মৃতস্য বাক্ অগ্নিমপ্যেতি, বাত প্রাণোহপ্যেতি, চক্ষুরাদিত্যমপ্যেতি-ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে; মনঃ চন্দ্রৎ, দিশঃ শ্রোত্রম্, পৃথিবীং শরীরম্, আকাশমাত্মা ইত্যত্র আত্মাধিষ্ঠানং হৃদয়াকাশমুচ্যতে; স আকাশমপ্যেতি; ওষধীরপিযন্তি লোমানি, বনস্পতীন্ অপিযন্তি কেশাঃ; অঙ্গু লোহিতং চ রেতশ্চ নিধীয়তে ইতি-পুনরাদানলিঙ্গম্। সর্ব্বত্র হি বাগাদিশব্দেন দেবতাঃ পরিগৃহ্যন্তে; ন তু করণান্যের অপক্রামন্তি প্রাক্ মোক্ষাৎ। তত্র দেবতা ভিরনধিষ্ঠিতানি করণানি ন্যস্তদাত্রাদ্যুপমানানি, বিদেহশ্চ কর্তা পুরুষঃ অস্বত্থঃ কিমাশ্রিতো ভবতীতি পৃচ্ছ্যতে-কায়ং তদা পুরুষো ভবতীতি-কিমাশ্রিতজদা পুরুষো ভবতীতি; যমাশ্রয়মাশ্রিত্য পুনঃ কার্যকরণসঙ্ঘাতমুপাদত্তে, যেন গ্রহাতি গ্রহলক্ষণবন্ধনং প্রযুজ্যতে, তৎ কিমিতি প্রশ্নঃ। ৫
অত্রোচ্যতে—স্বভাব-যদৃচ্ছা-কাল-কর্ম্ম-দৈব-বিজ্ঞানমাত্র-শূন্যানি বাদিভিঃ পরি- কল্পিতানি; অতঃ অনেকবিপ্রতিপত্তিস্থানত্বাৎ নৈব জল্পন্যায়েন বস্তুনির্ণয়ঃ; অত্র বস্তুনির্ণয়ঞ্চেদিচ্ছসি, আহর সোম্য হস্তম্ আর্ত্তভাগ হে, আবামের এতস্য ত্বৎপৃষ্ঠা বেদিতব্যং যৎ, তদ্বেদিষ্যাবঃ নিরূপয়িষ্যাবঃ। কস্মাৎ? ন নৌ আবয়োঃ এতদ্বত্ব সজনে জনসমুদায়ে নির্ণেতুং শক্যতে; অত একান্তং গমিষ্যাবঃ বিচারণায়। ৬
তৌ হেত্যাদি শ্রুতিবচনম্। তৌ যাজ্ঞবল্ল্যার্তভাগৌ একান্তং গত্বা কিং চক্রতুরিত্যুচ্যতে-তৌ হ উৎক্রম্য সজনাদ্দেশাৎ মন্ত্রয়াঞ্চক্রাতে; আদৌ লৌকিক- বাদিপক্ষাণামেকৈকং পরিগৃহ্য বিচারিতবস্তৌ। তৌ হ বিচার্য্য যদ্ উচতুঃ অপোহ্য পূর্ব্বপক্ষান্ সর্ব্বানেব-তৎ শৃণু; কৰ্ম্ম হৈবাশ্রয়ং পুনঃ পুনঃ কার্যকরণোপাদানহেতুং তৎ তত্র উচতুঃ উক্তবন্তৌ-ন কেবলম্; কালকর্মদৈবেশ্বরেঘভ্যুপগতেষু হেতুযু যৎ প্রশশংসতুস্তৌ, কৰ্ম্ম হৈব তৎ প্রশংসতুঃ-যস্মাৎ নির্দ্ধারিতমেতৎ কৰ্ম্মপ্রযুক্তং গ্রহাতিগ্রহাদিকার্য্যকরণোপাদানং পুনঃ পুনঃ, তস্মাৎ পুণ্যো বৈ শাস্ত্রবিহিতেন পুণ্যেন কর্মণা ভবতি, তদ্বিপরীতেন বিপরীতো ভবতি পাপঃ পাপেন-ইত্যেবং যাজ্ঞবল্ক্যেন প্রশ্নেষু নির্ণীতেষু ততোহশক্যপ্রকম্প্যত্বাদ যাজ্ঞবন্ধ্যস্য হ জারৎকারব আর্তভাগ উপররাম ॥ ১৬৫ ॥ ১৩ ॥
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয়মার্ত্তভাগ-ব্রাহ্মণভাষ্যম্ ॥ ৩ ॥ ২ ॥
টীকা।—যত্রাস্যেত্যাদেস্তাৎপর্য্যং বৃত্তানুবাদপূর্ব্বকং কথয়তি—গ্রহাভিগ্রহরূপমিত্যাদিনা। কিমেনমিত্যাদিবাক্যস্য স্বব্যাখ্যামুক্তা। যত্রেত্যাদেস্তাৎপর্য্যং চোক্তম্। ইদানীং ভর্তৃপ্রপঞ্চপ্রস্থান- মুখাপয়তি—অত্রেতি। কিমেনমিত্যাদাবিতি যাবৎ। সমুচ্চয়ানুষ্ঠানাব্দেহয়োঃ সপ্রযোজকয়ো- র্নাশেহপি পুংসো মুক্তির্ন চেৎ, তহি তস্য বন্ধত্বাযোগাৎ কামসৌ দশামবলম্বতামিত্যাশঙ্ক্যাহ— নামাবশিষ্ট ইতি। ক্ষিতেরূষরবদবস্থিতাত্মাবিদ্যয়া পরস্মাৎ পরিচ্ছিন্নশ্চেদাত্মা, তহি বন্ধপক্ষস্যৈব স্যাৎ, ন তু ভোজ্যাজ্জগতো ব্যাবৃত্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—উচ্ছিন্নেতি। সর্ব্বস্য কর্মাদিফলস্য সূত্রাত্মনঃ সমুচ্চয়াসাদিতস্য ভোগাদপ্রাপ্তার্থাভাবাৎ কামাসিদ্ধ্যা কৰ্ম্মাভাবাৎ প্রযোজকরাশেরুচ্ছিত্তি- রিত্যর্থঃ। কিমেনমিত্যাদাবন্তরালাবস্থস্য বিদ্যাধিকারিণো নির্দ্ধারণাত্তদপেক্ষিত বিদ্যাশেষত্বে- নোবস্তপ্রশ্নাদেরারম্ভং সম্ভাবয়তি—তস্যেতি। ইতি-শব্দো বর্ণয়ন্তীত্যনেন সম্বধ্যতে। তহি যত্রোষস্তপ্রশ্নাদৌ ব্রহ্মবিদ্যোচ্যতে, তস্যৈবারস্তো যুক্তঃ, যত্রাস্যেত্যাদিপ্ত বৃথেত্যাশঙ্ক্য ফলবদ্বিদ্যা- প্রাপ্তিশেষত্বেন নিবর্ত্ত্য-মৃত্যুপ্রয়োজকনির্দ্ধারণার্থো যত্রেত্যাদিরিত্যভিপ্রেত্যাহ—এবমিতি। ১
হিরণ্যগর্ভাদন্যোহনন্যো বা বিদ্যাধিকারী? প্রথমেইপি, মৃতস্য জীবতো বা বিদ্যাধিকারো বিবক্ষিতস্ত্বয়েতি পৃচ্ছতি-তত্রেতি। তত্রাদ্যমাক্ষিপতি-বিশীর্ণেধিতি। আক্ষেপং স্ফুটয়িতুং তদীয়ামুক্তিমনুবদতি-সমবনীতেতি। নামমাত্রাবশিষ্টস্যাধিকারো বিদ্যায়ামিতি শেষঃ। সমবনীতপ্রাণস্যেত্যত্র শ্রুতিং সংবাদয়তি-মৃত ইতি। কথমেতাবতা যথোক্তাক্ষেপসিদ্ধিস্তত্রাহ -ন মনোরথেনেতি। উপসংহৃতপ্রাণস্য শ্রবণাদ্যধিকারিত্বমেতচ্ছব্দার্থঃ। দ্বিতীয়ং শঙ্কতে- অথেতি। অপাবৃতো বিদ্যাধিকারীতি শেষঃ। জীবতো ভোজ্যাদ্ব্যাবর্তনং সম্যন্ধিয়ং বিনা দুঃশকমিতি মত্বা পৃচ্ছতি-তত্ত্বিতি। অপ্রাপ্তে কামো ভবতি, প্রাপ্তে নিবর্তত ইতি প্রসিদ্ধের- পরবিদ্যয়া কৰ্ম্মসমুচ্চিতয়া হৈরণ্যগর্ভপদপ্রাপ্তিরেব নিবৃত্তিকারণমিতি শঙ্কতে-সমন্তেতি। অপরবিদ্যাসমুচ্চিতং কৰ্ম্ম হৈরণ্যগর্ভভোগপ্রাপকং ন ভোগ্যান্নিবৃত্তিসাধনমিতি তৃতীয়ে ব্যুৎপাদিত- মিতি পরিহরতি-তৎ পূর্ব্বমেবেতি। উক্তমেব ব্যক্তীকুর্ব্বন্ বিভজতে-কর্মসহিতেনেতি। ২
অথৈকমেব সমুচ্চিতং কর্মোভয়ার্থং কিং নস্যাদত আহ-ন চেতি। উভয়ার্থত্বাভাবং সমর্থয়তে-হিরণ্যগর্ভেত্যাদিনা। সমুচ্চিতং কৰ্ম্ম নোভয়ার্থমিত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ-ন হীতি। হিরণ্যগর্ভো বিদ্যাধিকারীতি পক্ষং নিক্ষিপতি-অথেতি। দূষয়তি-তত ইতি। ননু মহামু- ভাবানামম্মদ্বিশিষ্টানামের ব্রহ্মবিদ্যোপদিশ্যমানা মোক্ষং ফলয়তি, নাম্মাকমিত্যাশঙ্ক্যাহ- সর্ব্বেষামিতি। ন চ ত্বন্মতেহপি যদ্দ্বারা শ্রবণাদি কৃত্বা বিদ্যোদয়ঃ, তদ্দ্বারৈব চিদাত্মনো মুক্তিসিদ্ধৌ কৃতমিতরত্র শ্রবণাদিনেতি বাচ্যম্। দ্বারভেদস্যানুষ্ঠাতৃবিভাগাধীনপ্রবৃত্তিপ্রযুক্ত-প্রয়োজনবদ্বিদ্যো- দয়স্য চ কাল্পনিকত্বেন যথাপ্রতীতি ব্যবস্থোপপত্তেঃ। বস্তুতো নির্বিশেষে চিন্মাত্রে নাবিদা- বিধে, বন্ধ-মুক্তী চেত্যভিপ্রেত্য পরপক্ষনিরাকরণমুপসংহৃত্য শ্রুতিব্যাখ্যানং প্রস্তৌতি- তস্মাদিতি। ৩
কর্তব্যে শ্রুতিব্যাখ্যানে যত্রেত্যাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমবতারয়তি-তত্রেতি। তত্র পুরুষশব্দেন বিদ্বানুক্তোহনন্তরবাক্যে তৎসন্নিধেরিত্যাশঙ্ক্য বক্ষ্যমাণকৰ্ম্মাশ্রয়ত্বলিঙ্গেন বাধ্যঃ সন্নিধিরিত্যভি- প্রেত্যাহ-অসম্যগ্দর্শিন ইতি। সন্নিধিবাধে লিঙ্গান্তরমাহ-নিধীয়ত ইতি। তস্য হি পুনরা- দানযোগ্য-দ্রব্যনিধানে প্রয়োগদর্শনাদিহাপি পুনরাদানং লোহিতাদেরাভাতি, অতঃ প্রসিদ্ধঃ
সংসারিগোচর এবায়ং প্রশ্ন ইত্যর্থঃ। অবিদুষো বাগাদিলয়াভাবাদ্বামনসি দর্শনাদিতি ন্যায়াতন্ত্র চাত্র শ্রুতেবিদ্বানের পুরুষস্তদীয়কলাবিলয়স্য শ্রুতিপ্রসিদ্ধত্বাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্বত্র হীতি। অগ্ন্যাদ্যংশানাং বাগাদিশব্দিতানামপক্রমণেইপি করণানাং তদভাবে তদধিষ্ঠানস্থ দেহস্যাণি ভাবেন ভোগসম্ভবান্ন প্রশ্নাবকাশোহস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-তত্রেতি। দেবতাংশেযুপসংহৃতেস্থিতি যাবৎ। তেষাং তাভিরনধিষ্ঠিতত্বে সত্যর্থক্রিয়াক্ষমত্বং ফলতীত্যাহ-ন্যস্যেতি। করণানামধিষ্ঠাতৃহীনানাং ভোগহেতুত্বাভাবেহপি কথমাশ্রয়প্রশ্নো ভোক্তুঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-বিদেহশ্চেতি। প্রশ্নং বিবৃণোতি -যমাশ্রয়মিতি। ৪
আহরেত্যাদিপরিহারমবতারয়তি—অত্রেতি। মীমাংসকা লোকায়তা জ্যোতির্ব্বিদো বৈদিকা দেবতাকাণ্ডীয়া বিজ্ঞানবাদিনো মাধ্যমিকাশ্চেত্যনেকে বিপ্রতিপত্তারঃ। জল্পন্যায়েন পরক্ষা- প্রচলিতমাত্রপর্য্যন্তেন বিচারেণেতি যাবৎ। অত্রেতি প্রশ্নোক্তিঃ। ৫
ননু প্রষ্টার্তভাগো যাজ্ঞবল্ক্যশ্চ প্রতিবক্তেতি দ্বাবিহোপলভ্যেতে। তথা চ তৌ হেত্যাদি- বচনমযুক্তং, তৃতীয়স্যাত্রাভাবাদত আহ—তৌ হেত্যাদীতি। তত্রেত্যেকান্তে স্থিত্বা বিচারাবস্থায়- মিতি যাবৎ। ন কেবলং কৰ্ম্ম কারণমুচতুঃ, কিন্তু তদেব কালাদিষু হেতুঘভ্যুপগতেষু সৎসু প্রশশংসতুঃ। অতঃ প্রশংসাবচনাৎ কর্মণঃ প্রাধান্যং গম্যতে, ন তু কালাদীনামহেতুর, তেষাং কৰ্ম্মস্বরূপনিষ্পত্তৌ কারকতয়া গুণভাবদর্শনাৎ ফলকালেহপি তৎপ্রাধান্যেনৈব তদ্ধেতুত্বসম্ভবাদিত্যাহ—ন কেবলমিতি। পুণ্যো বৈ পুণ্যেনেত্যাদি ব্যাচষ্টে—যস্মাদি- ত্যাদিনা। ১৬৫॥ ১৩॥
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যটীকায়াং তৃতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয়মার্ত্তভাগব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ২ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—গ্রহ ও অতিগ্রহরূপী মৃত্যুরূপ বন্ধনের কথা ইতঃপূর্ব্বে কথিত হইয়াছে, এবং সেই গ্রহাতিগ্রহরূপ মৃত্যুরও মৃত্যু থাকা সম্ভবপর বলিয়া মোক্ষলাভ যে সম্ভবপর হইতে পারে, এ কথাও অভিহিত হইয়াছে। প্রদীপ নির্ব্বাণের ন্যা গ্রহ ও অতিগ্রহরূপী মৃত্যুর যে, এখানেই বিলয়, তাহাই পূর্ব্বোক্ত মোক্ষ-শব্দের অর্থ। এখন সেই যে, গ্রহ ও অতিগ্রহসংজ্ঞক মৃত্যুস্বরূপ বন্ধন, তাহার প্রযোজক বা কারণের প্রকৃত স্বরূপ নির্দ্ধারণার্থ “যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ” ইত্যাদি শ্রুতি আরব্ধ হইতেছে। ১
এখানে কেহ কেহ এরূপও তাৎপর্য্য বর্ণনা করিয়া থাকেন যে, গ্রহাতিগ্রহ ও তৎপ্রবর্তক অবিদ্যা বিনষ্ট হইলেও পুরুষের মুক্তিলাভ হয় না; পরন্তু তাহা দ্বারা কেবল ঊষরভূমি-স্থানীয়(ক্ষারমৃত্তিকা-স্থানবর্তী) স্বাত্ম-সমুদ্ভূত অবিদ্যা দ্বারা পরমাত্মা হইতে বিচ্ছিন্ন থাকিয়া এবং ভোগ্য জগৎ হইতে পৃথক্ হইয়া কামকর্মবিরহিতভাবে মধ্যবর্তী অবস্থায় বর্তমান থাকে মাত্র। তাহার পরেও পরমাত্মার সহিত একত্বদর্শনরূপ বিদ্যা দ্বারা তাহার দ্বৈতদর্শন অপনয়ন করা আবশ্যক হয়; এইজন্য অবশিষ্ট পরমাত্ম-দর্শনের উপদেশ করা আবশ্যক হইয়াছে।
৭৬১
তাহারা এইরূপ একটি অপবর্গনামক মধ্যাবস্থা কল্পনা করিয়া পরবর্তী গ্রন্থের সহিত এই অংশের সম্বন্ধ বা সঙ্গতি সংস্থাপন করিয়া থাকেন। ২
[এস্থলে আমাদের বক্তব্য এই,] যে সময় পুরুষের সমস্ত করণবর্গ বিশীর্ণ হইয়া স্ব স্ব কারণে বিলীন হইয়া যায়, সে সময় দেহবিহীন সেই পুরুষের যে, পরমাত্ম- বিষয়ে শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন কিপ্রকারে হইতে পারে, একথার জবাব দেওয়া তাহাদের আবশ্যক। তাহারাই বলিয়া থাকেন যে, প্রাণ-বিনাশের পর পুরুষ কেবল নামমাত্রাবশিষ্ট হইয়া থাকে; স্বয়ং শ্রুতিও বলিয়াছেন যে, ‘মৃতাবস্থায় দেহটি পড়িয়া থাকে’,(সে অবস্থায় দেহেন্দ্রিয়াদি সাধনসমূহের অভাবেও) যে, বিদ্যাধিকার থাকিতে পারে, ইহা মনোরথ দ্বারাও উপপাদন করিতে পারা যায় না। আর যদি এরূপ কল্পনা কর যে, সেই পুরুষ জীবিতাবস্থায়ই নামমাত্রাবশিষ্ট থাকে, এবং ভোগোপযোগী সমস্ত বিষয় হইতে বিনিবৃত্ত হয়।[জিজ্ঞাসা করি,] কি কারণে যে, ঐরূপ সংঘটন হয়, তাহা তোমাকে অবশ্যই বলিতে হইবে। যদি বল, তখন সমস্ত দ্বৈত পদার্থের সহিত আত্মার একত্ব বা অভিন্নভাব হইয়া যায়, এইজন্যই ঐরূপ অবস্থা উপস্থিত হয়; পূর্ব্বেই এ কথার উত্তর দেওয়া হইয়াছে;[সুতরাং এখানে আর বিবৃতি করা অনাবশ্যক]।[এখন জিজ্ঞাসা করি-] কর্মানুষ্ঠানের সম- কালীন দ্বৈতাভিন্নরূপে পরমাত্মদর্শী বিদ্বান্ পুরুষ যে, মৃত্যুর পর জগদাত্মকতা কিংবা হিরণ্যগর্ভত্ব লাভ করিয়া থাকেন, তাহা কি তাঁহার প্রাণ বিলীন হইবার পরে? অথবা প্রাণ বিলীন হইবার পূর্ব্বেই-জীবদবস্থাতেই ভোগ্য বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়া বৈরাগ্য বলে পরমাত্মদর্শন বিষয়ে অগ্রসর হন। ৩
অথচ একই পুরুষের একই চেষ্টা দ্বারা যে সাধন নিষ্পাদিত হয়, সেই সাধন দ্বারা ঐ দুইপ্রকার ফল লাভ করা কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। পক্ষান্তরে, উহা যদি হিরণ্যগর্ভ-পদপ্রাপ্তিরই সাধন হয়, তাহা হইলে, উহা কখনই ভোগ- নিবৃত্তিকর বৈরাগ্যের সাধন হইতেই পারে না। যদি বল, ঐ সাধনটি যখন পুরুষকে পরমাত্মার দিকে লইয়া যায়, তখন কাজেই উহাকে ভোগনিবৃত্তিরও সাধন বলিতে হইবে। ভাল কথা, তাহা হইলে কখনই উহাকে হিরণ্যগর্ভ-পদপ্রাপ্তির সাধন বলিতে পার না;[কেননা, হিরণ্যগর্ভপদ কখনই ভোগবিবর্জিত নহে]; যাহা গতি-সাধন, তাহাই আবার গতিনিবৃত্তিরও(স্থিতিরও) সাধন বা উপায় হইতে পারে না। আর যদি বল, মৃত্যুর পর প্রথমে হিরণ্যগর্ভ-পদ প্রাপ্ত হন, পরে তাহার প্রাণ বিলীন হয়, তাহার পর নামমাত্রাবশিষ্ট থাকিয়া পরমাত্ম-বিষয়ক জ্ঞানলাভের অধিকারী হন, তাহা হইলেও, আমাদের মত লোকের জন্য পরমাত্মজ্ঞান
লাভের উপদেশ করা সম্পূর্ণ নিরর্থক হইয়া পড়ে; অথচ ‘দেবতাগণের মধ্যে যে যে ব্যক্তি পরমাত্মজ্ঞান লাভ করিয়াছিল’ ইত্যাদি শ্রুতি কিন্তু ব্যক্তি- নির্বিশেষে সকলের জন্যই পরম পুরুষার্থপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ দিতেছেন; অতএব এই প্রকার শাস্ত্রার্থ কল্পনা করা সর্ব্বশাস্ত্রবিরুদ্ধ ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট। আমরা এখন শ্রুতির যথার্থ তাৎপর্য্যের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইব। ৪
গ্রহ ও অতিগ্রহ কাহার প্রেরণায় প্রেরিত হইয়া পুরুষের বন্ধন ঘটায়, তাহা নির্দ্ধারণ করিবার অভিপ্রায়ে আর্তভাগ জিজ্ঞাসা করিলেন-হস্তমস্তকাদি-সম্পন্ন অসম্যগদর্শী(আত্মজ্ঞানরহিত) পুরুষ যে সময় মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তখন তাহার বাগিন্দ্রিয় অগ্নিতে বিলীন হয়, প্রাণ বায়ুতে লীন হয়, চক্ষুঃ সূর্যদেবকে প্রাপ্ত হয়; সর্ব্বত্রই ‘অপ্যেতি’(প্রাপ্ত হয়) ক্রিয়ার সম্বন্ধ আছে। মন চন্দ্রে, শ্রবণেন্দ্রিয় পূর্ব্বাদি দিকে, শরীর পৃথিবীতে, এবং আত্মা-এখানে আত্মা-শব্দে আত্মার অভিব্যক্তি-স্থান হৃদয়াকাশ বুঝাইতেছে-সেই হৃদয়াকাশ ভূতাকাশে, লোমসমূহ ওষধিতে(তৃণ লতা প্রভৃতিতে), কেশসমূহ বনস্পতিসমূহে[বিলীন হয়। যে সমস্ত বৃক্ষ পুষ্প ব্যতিরেকে ফল প্রসব করে, সেই সমস্ত গাছকে বনস্পতি কহে,] এবং লোহিত(রক্ত) ও শুক্র জলে নিহিত(রক্ষিত) হয়। এখানে ‘নিধীয়তে’ পদ-প্রয়োগের অভিপ্রায় এই যে, অন্যান্য নিহিত(গচ্ছিত) বস্তু যেমন পুনরায় গ্রহণ করা যায়, তেমনি এই শুক্র-শোণিতাদি পদার্থেরও পুনরুদ্ধার হইয়া থাকে, অর্থাৎ পুনরায় তাহার সংসারে সমাগম সম্ভবপর হয়। এখানে সর্ব্বত্রই বাগাদি-শব্দে তদভিমানী দেবতার লয় বুঝিতে হইবে, কিন্তু সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বাগাদি ইন্দ্রিয়েরই লয় বুঝিতে হইবে না; কারণ, মুক্তিলাভের পূর্ব্বে বাগাদি ইন্দ্রিয়সমূহ কখনই আত্মাকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না। সে সময় কেবল নিজ নিজ অধিষ্ঠাত্রী দেবতাকর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া ইন্দ্রিয়সমূহ হস্তচ্যুত অস্ত্রের ন্যায় অকর্মণ্য হইয়া থাকে, এবং কর্তা পুরুষও দেহ বিনষ্ট হওয়ায় স্বাধীন হইয়া পড়ে;[সুতরাং কোন কার্য্য করিতে পারে না]; এই অভিপ্রায়ে প্রশ্ন হইল- “কায়ং তদা পুরুষো ভবতি”-পুরুষ(আত্মা) তখন কাহাকে আশ্রয় করিয়া থাকে?-যে আশ্রয়ে আশ্রিত থাকিয়া সে পুনর্ব্বার নূতন করিয়া দেহেন্দ্রিয়াদি গ্রহণ করে, এবং যাহার দরুণ উক্ত গ্রহ ও অতিগ্রহাত্মক বন্ধন সংঘটিত হয়, সেই বস্তুটি কি? ইহা হইল আর্তভাগের প্রশ্ন। ৫
এই প্রশ্নের উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—এ বিষয়ে বিস্তর মতভেদ আছে— বিভিন্ন বাদিগণ এস্থলে স্বভাব, যদৃচ্ছা(আকস্মিক সংঘটন), কাল, কর্ম্ম, দৈব,
৭৮৩
বিজ্ঞানমাত্র ও শূন্যকে কারণরূপে কল্পনা করিয়া থাকেন;(১) অতএব, এ বিষয়ে বহুতর বিরুদ্ধ মতভেদ বিদ্যমান থাকায়, জল্প-কথার নিয়মানুসারে[তত্ত্বনির্ণয়পর কথাকে ‘জল্প’ কথা বলে।] এই বিষয়টি নির্ণয় করা সম্ভবপর হয় না; আর্ত্তভাগ, তুমি যদি এ বিষয়ের প্রকৃত তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা কর, তাহা হইলে হস্ত প্রসারণ কর—(অথবা আমার হস্ত গ্রহণ কর), আমরা উভয়েই তোমার জিজ্ঞাসিত বিষয়ের যাহা সারতত্ত্ব, তাহা নিরূপণ করিব; কারণ? যেহেতু আমাদের এই বিজ্ঞেয় বিষয়টি সজনে—বহুজনসমাকীর্ণ স্থানে নিরূপণ করা সম্ভবপর নহে। অতএব বিচারের জন্য চল, আমরা উভয়ে নিভৃত স্থানে গমন করি। ৬
‘তৌ হ’ ইত্যাদি কথাগুলি শ্রুতির উক্তি। সেই যাজ্ঞবল্ক্য ও আর্ত্তভাগ নিভৃত স্থানে যাইয়া কি বলিয়াছিলেন, তাহা কথিত হইতেছে-যে সমস্ত লোক লোকসিদ্ধ বিষয়সমূহ অবলম্বনপূর্ব্বক সিদ্ধান্তবিশেষ সংস্থাপন করিয়াছেন, প্রথমে তাঁহারা তাঁহাদের সেই সমস্ত মতের এক একটি বিষয় ধরিয়া আলোচনা করিয়াছিলেন আলোচনার পর, তাঁহারা অন্যান্য বাদিগণের মতবাদসমূহ খণ্ডন করিয়া যাহা বলিয়া- ছিলেন, অর্থাৎ যে সিদ্ধান্ত নিরূপণ করিয়াছিলেন, তাহা শ্রবণ কর; তাঁহারা বারংবার দেহেন্দ্রিয়-সম্বন্ধাত্মক সংসারের হেতুভূত কর্ম্মের কথাই বলিয়াছিলেন; কেবল যে, ঐরূপ সিদ্ধান্ত করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছিলেন, তাহা নহে; পরন্তু কাল, কর্ম, দৈব ও ঈশ্বরের কারণতা স্বীকারের পর, যাহার প্রশংসা করিয়াছিলেন, তাহাতে কর্মেরই প্রশংসা করিয়াছিলেন; কেন না, যেহেতু পুনঃ পুনঃ যে, গ্রহাতিগ্রহাদিময় কার্য্য-করণ গ্রহণ(শরীরধারণরূপ সংসারলাভ), কর্মকেই তাহার প্রধান প্রযোজক(হেতু) বলিয়া অবধারণ করিয়াছিলেন; কারণ, মানুষ শাস্ত্রবিহিত পুণ্যকর্ম দ্বারা পুণ্যবান্ হয়, আর তদ্বিপরীত পাপ কর্ম দ্বারা পাপী হয়। যাজ্ঞবল্ক্য এইরূপে প্রশ্নোত্তর প্রদান করিলে পর জারৎকারব আর্ত্তভাগ বুঝিলেন যে, বিচারে যাজ্ঞবল্ক্যকে পরাজিত করা, আমাদের পক্ষে অসম্ভব, তখন তিনি প্রশ্ন হইতে বিরত হইলেন ৷ ১৬৫ ॥ ১৩ ॥
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদের তৃতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয় আর্ন্তভাগ ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ৩ ॥ ২ ॥
আভাস-ভাষ্যম্।—অথ হৈনং ভুজ্যুর্লাহায়নিঃ পপ্রচ্ছ। গ্রহাতি- গ্রহলক্ষণং বন্ধনমুক্তম্; যস্মাৎ সপ্রযোজকাৎ মুক্তো মুচ্যতে, যেন বা বদ্ধঃ সংসরতি, স মৃত্যুঃ; তস্মাচ্চ মোক্ষ উপপদ্যতে, যস্মাৎ মৃত্যোমৃত্যুরস্তি। মুক্তস্য চ ন গতিঃ ক্বচিৎ, সর্ব্বোৎসাদো নামমাত্রাবশেষঃ প্রদীপনির্ব্বাণবদিতি চাবধৃতম্। তত্র সংসরতাং মুচ্যমানানাঞ্চ কার্যকরণানাং স্বকারণ-সংসর্গে সমানে মুক্তানামত্যন্তমেব পুনরনুপাদানম্, সংসরতান্ত পুনঃ পুনরুপাদানং যেন প্রযুক্তানাং ভবতি, তৎ কর্ম্মেত্যবধারিতং বিচারণপূর্ব্বকম্; তৎক্ষয়ে চ নামাবশেষেণ সর্ব্বোৎসাদো মোক্ষঃ। ১
টাকা। -ব্রাহ্মণান্তরমবতার্য্য বৃত্তং কীর্তয়তি-অথেত্যাদিনা। উক্তমেব তস্য মৃত্যুত্বং ব্যক্তী- করোতি-যম্মাদিতি। অগ্নির্ব্বে মৃত্যুরিত্যাদাবুক্তং স্মারয়তি-তস্মাদিতি। যত্রায়মিত্যাদা- যুক্তমনুদ্রবতি-মুক্তস্থ চেতি। যত্রাস্যেত্যাদৌ নির্ণীতমনুভাষতে-তত্রেতি। পূর্ব্বব্রাহ্মণস্থো গ্রন্থঃ সপ্তম্যর্থঃ। তস্য চাবধারিতমিভানেন সম্বন্ধঃ। সংসরতাং মুচ্যমানানাং চ যানি কার্যকরণানি তেষামিতি বৈয়ধিকরণ্যম্। অনুপাদানমুপাদানমিত্যুভত্র কার্যকরণানামিতি সম্বন্ধঃ। কর্ম্মণো ভাবাভাবাভ্যাং বন্ধমোক্ষাবুক্তৌ, তত্রাভাবদ্বারা কর্ম্মণো মোক্ষহেতুত্বং স্ফুটয়তি-তৎক্ষয়ে চেতি।
তচ্চ পুণ্যপাপাথ্যৎ কৰ্ম্ম “পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি, পাপঃ পাপেন” ইত্যবধারিতত্বাৎ; এতৎকৃতঃ সংসারঃ। তত্রাপুণ্যেন স্থাবরজঙ্গমেষু স্বভাব- দুঃখবহুলেষু নরকতির্য্যপ্রেতাদিষু চ দুঃখমনুভবতি-পুনঃপুনর্জায়মানো ম্রিয়মাণশ্চ-ইত্যেতদ্ রাজবত্মবৎ সর্ব্বলোকপ্রসিদ্ধম্। যস্ত শাস্ত্রীয়ঃ পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি, তত্রৈবাদরঃ ক্রিয়তে ইহ শ্রুত্যা; পুণ্যমেব চ কৰ্ম্ম সর্ব্বপুরুষার্থসাধনমিতি সর্ব্বে শ্রুতিস্মৃতিবাদাঃ। মোক্ষস্যাপি পুরুষার্থত্বাৎ তৎসাধ্যতা প্রাপ্তা; যাবদযাবৎ পুণ্যোৎকর্ষঃ, তাবত্তাবৎ ফলোৎকর্ষপ্রাপ্তিঃ; তম্মাদুত্তমেন পুণ্যোৎকর্ষেণ মোক্ষো ভবিষ্যতীত্যাশঙ্কা স্যাৎ; সা নিবর্তয়িতব্যা। জ্ঞানসহিতস্য চ প্রকৃষ্টস্য কৰ্ম্মণ এতাবতী গতিঃ, ব্যাকৃত-নামরূপাস্পদত্ত্বাৎ কৰ্ম্মণ স্তংফলশ্য চ; নতু অকার্য্যে নিত্যে অব্যাকৃতধর্মিণি অনামরূপাত্মকে ক্রিয়াকারক- ফলস্বভাববর্জিতে কর্মণো ব্যাপারোহস্তি। যত্র চ ব্যাপারঃ, স সংসার এবেত্যস্যার্থস্থ্য প্রদর্শনায় ব্রাহ্মণমারভ্যতে। ২
পৃষ্ঠাপাদপ্রস্থেহপি সসাদরকধারিণোঃ পুণ্যফলবৎ পাপফলমপ্যব বক্রবক্রথা ভবেৎ।
বিরাগাযোগাদিত্যাশক্য বত্তিষ্যমাণস্থ্য তাৎপর্য্যং বক্তুং ভূমিকাং করোতি-তত্রেতি। পুণ্যেঘ- পুণ্যেযু চ নির্দ্ধারণার্থা সপ্তমী স্বভাবদুঃখবহুলেষিত্যুভয়তঃ সম্বধ্যতে। তর্হি পুণ্যফলমপি সর্ব্ব- লোকপ্রসিদ্ধত্বান্নাত্র বক্তব্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যত্ত্বিতি। শাস্ত্রীয়ং সুথানুভবমিতি শেষঃ। ইহেতি ব্রাহ্মণোক্তিঃ। শাস্ত্রীয়ং কৰ্ম্ম সর্ব্বমপি সংসারফলমেবেতি বক্তুং ব্রাহ্মণমিত্যুক্ত। শঙ্কোত্তরত্বেনাপি তদবতারঃতি-পুণ্যমেবেত্যাদিনা। মোক্ষস্য পুণ্যসাধ্যত্বং বিধান্তরেণ সাধয়তি-যাবদ্যাব- দিতি। কথং তস্যা নিবর্তনমিত্যাশঙ্ক্যাহ-জ্ঞানসহিতস্যেতি। সমুচ্চিতমপি কৰ্ম্ম সংসার- ফলমেবেত্যত্র হেতুমাহ-ব্যাকৃতেতি। মোক্ষেহপি স্বর্গাদাবিব পুরুষার্থত্বাবিশেষাৎ কর্ম্মণো ব্যাপারঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন ত্বিতি। অকার্য্যত্বমুৎপত্তিহীনত্বম্। নিত্যত্বং নাশশূন্যত্বম্। অব্যাকৃতধর্মিত্বং ব্যাকৃতনামরূপরাহিত্যম্। ‘অশব্দমস্পর্শম্’ ইত্যাদি শ্রুতিমাশ্রিত্যাহ-অনা- মেতি। ‘নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ম্’ ইত্যাদিশ্রুতিমাশ্রিত্যাহ-ক্রিয়েতি। চতুর্ব্বিধক্রিয়াফলবিলক্ষণে মোক্ষে কর্ম্মণো ব্যাপারো ন সম্ভবতীতি ভাবঃ। ননু আ স্থাণোরা চ প্রজাপতেঃ সর্বত্র কৰ্ম্ম- ব্যাপারাৎ কথং মোক্ষে প্রজাপতিভাবলক্ষণে তদ্ব্যাপারো নাস্তি, তত্রাহ-যত্র চেতি। কৰ্ম্ম- ফলন্য সর্ব্বস্য সংসারত্বমেবেতি কুতঃ সিধ্যতি, তত্রাহ-ইত্যস্যেতি। ২
যতু কৈশ্চিদুচ্যতে—বিদ্যাসহিতং কৰ্ম্ম নিরভিসন্ধি বিষ-দধ্যাদিবৎ কার্য্যান্তরমারভত ইতি; তন্ন, অনারভ্যত্বাৎ মোক্ষস্য। বন্ধননাশ এব হি মোক্ষঃ, ন কার্য্যভূতঃ; বন্ধনঞ্চ অবিদ্যেত্যবোচাম।। অবিদ্যায়াশ ন কর্মণা নাশ উপপদ্যতে, দৃষ্টবিষয়ত্বাচ্চ কর্মসামর্থ্যস্য,—উৎপত্ত্যাপ্তি-বিকার-সংস্কারা হি কর্মসামর্থ্যস্য বিষয়াঃ; উৎপাদয়িতুং প্রাপয়িতুং বিকর্ত্তুং সংস্কর্ত্তুং চ সামর্থ্যং কর্মণঃ, নাতো ব্যতিরিক্তবিষয়োহস্তি কর্মসামর্থ্যস্য, লোকেহপ্রসিদ্ধত্বাৎ; ন চ মোক্ষ এষাং পদার্থানামন্যতমঃ; অবিদ্যামাত্রব্যবহিতইত্যবোচাম। ৩
বিদ্যাসহিতমপি কৰ্ম্ম সংসারফলং বিদ্যৈব মোক্ষার্থেতি স্বপক্ষশুদ্ধ্যর্থং বিচারয়ন্ পূর্ব্বপক্ষয়তি -যত্তিতি। যথা কেবলং বিষদধ্যাদি মরণজরাদিকরমপি মন্ত্রশর্করাদিযুক্তং জীবনপুষ্ট্যাদ্যারভতে, তথা স্বতো বন্ধফলমপি কৰ্ম্ম ফলাভিলাষমস্তরেণানুষ্ঠিতং বিদ্যাসমুচ্চিতং মোক্ষায় ক্ষমমিত্যর্থঃ। মুক্তে: সাধ্যত্বাঙ্গীকারে সমুচ্চিতকৰ্ম্মসাধ্যত্বং স্যাৎ, ন তু তস্যাং সাধ্যত্বং ধীমাত্রায়ত্তত্বাদিত্যুত্তরমাহ -তন্নেতি। হেতুমেব সাধয়তি-বন্ধনেতি। কিং তদ্বন্ধনং, তদাহ-বন্ধনং চেতি। অবিদ্যা- নাশোহপি কর্ম্মারন্তো ভবিষ্যতীতি চেন্নেত্যাহ-অবিদ্যায়াশ্চেতি। মোক্ষো ন কৰ্ম্মসাধ্যোহ- বিদ্যাস্তময়ত্বাদ্রহবিদ্যাস্তময়বদিত্যর্থঃ। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ-দৃষ্টবিষয়ত্বাচ্চেতি। ন কৰ্ম্মসাধ্যা মুক্তিরিতি শেষঃ। তদেব স্পষ্টরতি-উৎপত্তীতি। উক্তমেব কৰ্ম্মসামর্থ্যবিষন্নমন্বয়ব্যতিরেকাভ্যাং সাধয়তি-উৎপাদরিতুমিতি। অপ্রসিদ্ধত্বাদিতি চ্ছেদঃ। উৎপত্যাদীনামন্যতমত্বান্ মোক্ষস্যাপি কর্মসামর্থ্যবিষয়তা স্যাদিতি চেন্নেত্যাহ-ন চেতি। নিত্যত্বাদাত্মত্বাৎ কূটস্থত্বান্নিত্যশুদ্ধত্বানি- গুণত্বাচ্চেত্যর্থঃ। আত্মভূতো যথোক্তো মোক্ষস্তর্হি কিমিতি সর্বেষাং ন প্রথত. ইত্যাশঙ্ক্যাহ- অবিদ্যেতি। ৩
বাঢ়ম্; ভবতু কেবলস্যৈব কর্মণ এবংস্বভাবতা; বিদ্যাসংযুক্তস্য তু নিরভি- সন্ধের্ভবতি অন্যথা স্বভাবঃ; দৃষ্টং হি অন্যশক্তিত্বেন নির্জাতানামপি পদার্থানাং বিষ-দধ্যাদীনাং বিদ্যা-মন্ত্র-শর্করাদিসংযুক্তানামন্যবিষয়ে সামর্থ্যম্; তথা কৰ্ম্মণো- হপ্যস্থিতি চেৎ; ন; প্রমাণাভাবাৎ,-তত্র হি কৰ্ম্মণ উক্তবিষয়ব্যতিরেকেণ বিষয়ান্তরে সামর্থ্যাস্তিত্বে প্রমাণম্-ন প্রত্যক্ষং, নানুমানম্, নোপমানম্, নার্থা- পত্তিঃ, ন শব্দোহস্তি। ৪
উক্তং কৰ্ম্মসামর্থ্যং পূর্ব্বযাদঙ্গীকরোতি-বাঢ়মিতি। অঙ্গীকারের ক্ষোরয়তি-ভবত্বিতি। এবং স্বভাবতোৎপাদনাদৌ সমর্থতা। কা তর্হি বিপ্রতিপত্তিস্তত্রাহ-বিদ্যাসংযুক্তস্যেতি। অন্যখাস্বভাবশ্চতুর্ব্বিধক্রিয়াফলবিলক্ষণেহপি মোক্ষে সমর্থতেতি যাবৎ। উৎপত্যাদৌ সমর্থস্য কর্মণো বিদ্যাসংযুক্তস্য তদ্বিলক্ষণেহপি মোক্ষে সামর্থ্যমস্তীত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ-দৃষ্টং হীতি। উক্ত- দৃষ্টান্তবশাৎ কর্মণোহপি কেবলস্য সংসারফলস্য বিদ্যাসংযোগান্মুক্তিফলত্বমপি স্যাদিত্যাহ- তথেতি। সমাধত্তে-নেত্যাদিনা। ৪
ননু ফলান্তরাভাবে চোদনান্যথানুপপত্তিঃ প্রমাণমিতি। ন হি নিত্যানাং কর্মণাং বিশ্বজিন্ন্যায়েন ফলং কল্প্যতে; নাপি শ্রুতং ফলমস্তি; চোদ্যন্তে চ তানি; পারিশেষ্যাৎ মোক্ষস্তেষাৎ ফলমিতি গম্যতে, অন্যথা হি পুরুষা ন প্রবর্ত্তেরন্। ৫
অতীন্দ্রিয়ত্বাৎ কর্মণো মুক্তিসাধনত্বে প্রত্যক্ষাদ্যসম্ভবেহপ্যর্থাপত্তিরস্তীতি শঙ্কতে-নন্বিতি। নিত্যেযু কৰ্ম্মসু মোক্ষাতিরিক্তস্য ফলস্য শ্রুতস্যাভাবে সতি তদুপলভ্যমানচোদনায়া মোক্ষফলত্বং বিনানুপপত্তিস্তেষাং তৎসাধনত্বে মানমিত্যর্থঃ। নমু বিশ্বজিতা যজেতেত্যত্র যাগকর্তব্যতারূপো নিয়োগোহবগম্যতে, তস্য নিযোজ্যসাপেক্ষত্বাৎ “স স্বর্গঃ, স্যাৎ সর্ব্বান্ প্রত্যবিশিষ্টত্বাৎ” ইতি স্যায়েন স্বর্গকামো নিযোজ্যোংঙ্গীকৃতঃ, তথা নিত্যেষপি কৰ্ম্মসু ভবিষ্যতি স্বর্গো নিয়োজ্যবিশেষণম্, অত আহ-ন হীতি। জীবন্ জুহয়াদিতি জীবনবিশিষ্টস্য নিযোজ্যস্য লাভান্ন নিত্যেযু স্বর্গো নিযোজ্যবিশেষণমিত্যর্থঃ। ননু জীবনবিশিষ্টোহপি ফলাভাবে ন নিযোজ্যঃ স্যাত্তথা চ “কর্মণা পিতৃলোকঃ” ইতি দ্রুতং ফলং তেষু কল্পরিষ্যতে, নেত্যাহ-নাপীতি। নিত্যবিধিপ্রকরণে পিতৃ- লোকবাক্যস্যাশ্রবণাদিত্যর্থঃ। তর্হি ফলাভাবাচ্চোদনৈব মা ভূদিতি চেন্নেত্যাহ-চোদ্যন্তে চেতি। তথাপি ফলান্তরং কল্পতামিত্যাশঙ্ক্য কল্পকাভাবান্ মৈবমিত্যভিপ্রেত্যাহ-পারি- শেষ্যাদিতি। মুক্তের্ষৎ কল্পকং তদেব ফলান্তরস্থাপি কিং ন স্যাৎ, ইত্যাশঙ্ক্য তস্য নিরতিশয়ফল- বিষয়ত্বান্ মুক্তিকল্পকত্বমেবেত্যভিপ্রেত্যাহ-অন্যখেতি। ৫
ননু বিশ্বজিন্ন্যায় এবায়াতং, মোক্ষস্য ফলস্য কল্পিতত্বাৎ; মোক্ষে চান্যস্মিন্ বা ফলেহকল্পিতে পুরুষা ন প্রবর্ত্তেরন্—ইতি মোক্ষঃ ফলং কল্প্যতে শ্রুতার্থাপত্যা, যথা বিশ্বজিতি। নমু এবং সতি কথমুচ্যতে, বিশ্বজিন্ন্যায়ো ন ভবতীতি; ফলং চ কল্প্যতে, বিশ্বজিন্ন্যায়শ্চ ন ভবতীতি বিপ্রতিষিদ্ধমভিধীয়তে।
৭৬৭
মোক্ষঃ ফলমেব ন ভবতীতি চেৎ; ন, প্রতিজ্ঞাহানাৎ; কৰ্ম্ম কার্য্যান্তরং বিষ- দধ্যাদিবদারভত ইতি হি প্রতিজ্ঞাতম্; স চেন্মোক্ষঃ কর্মণঃ কাৰ্য্যং ফলমেব ন ভবতি, সা প্রতিজ্ঞা হীয়েত। কৰ্ম্মকাৰ্য্যত্বে চ মোক্ষস্য স্বর্গাদিফলেভ্যো বিশেষো বক্তব্যঃ। ৬
অনুপপত্যা চেন্নিযোজ্যলাভায় নিত্যেযু ফলং কল্পাতে, কথং তর্হি বিশ্বজিন্ন্যারো ন প্রাপ্নো- ভীতি সিদ্ধান্তী প্রত্যাহ-নন্বিতি। উক্তমেব বিবৃণোতি-মোক্ষে চেতি। অকল্পিতে সতীতি চ্ছেদঃ। শ্রুতার্থাপত্যা বিধেঃ শ্রুতস্য প্রবর্তকত্বানুপপত্ত্যেতি যাবৎ। বিশ্বজিতীব নিত্যেষু মোক্ষে ফলে কল্যমানে সতি ফলিতমাহ-নশ্বেবমিতি। কথমিত্যুক্তামমুপপত্তিমেব স্ফুটয়তি- ফলং চেতি। ফলকল্পনায়াং বিশ্বজিন্ন্যারোহবতরতি, মোক্ষস্ত স্বরূপস্থিতিত্বেনানুৎপাদ্যত্বাৎ ফলমেব ন ভবতীতি শঙ্কতে-মোক্ষ ইতি। নিগ্রহমুদ্ভাবন্নুত্তরমাহ-নেতি। প্রতিজ্ঞাহানিং প্রকটরতি-কর্ম্মেত্যাদিনা। কৰ্ম্মকাৰ্য্যত্বং মুক্তেরূপেত্যোক্তং, তদেবাযুক্তমিত্যাহ-কৰ্ম্মকাৰ্য্যত্বে চেতি। ৬
অথ ‘কৰ্ম্ম-কাৰ্য্যং ন ভবতি নিত্যানাং কৰ্ম্মণাং ফলং মোক্ষঃ’ ইত্যস্যা বচন- ব্যক্তেঃ কোহর্থ ইতি বক্তব্যম্। ন চ কার্য্য-ফলশব্দভেদমাত্রেণ বিশেষঃ শক্যঃ কল্পয়িতুম্। অফলঞ্চ মোক্ষঃ, নিত্যৈশ্চ কৰ্ম্মভিঃ ক্রিয়তে,-নিত্যানাং কৰ্ম্মণাং ফলং ন কাৰ্য্যমিতি চ-এযোহর্থো বিপ্রতিষিদ্ধোহভিধীয়তে-যথাগ্নিঃ শীত ইতি। ৭
ফলত্বেহপি কৰ্ম্মকাৰ্য্যত্বং ন মুক্তেরস্তীত্যুক্তং দোষং পরিহর্তুং চোদয়তি-অথেতি। প্রতিজ্ঞা- বিরোধেন প্রতিবিধত্তে-নিত্যানামিতি। ফলত্বমঙ্গীকৃত্য কার্য্যত্বেহনঙ্গীকৃতে কথং ব্যাঘাত ইত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। বিশেষোহর্থগত ইতি শেষঃ। ফলত্বমঙ্গীকৃত্য কাৰ্য্যত্বানঙ্গীকারে ব্যাঘাতমুক্ত। বৈপরীত্যোহপি তং ব্যুৎপাদয়তি-অফলং চেতি। আদ্যং ব্যাঘাতং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-নিত্যানামিতি। ৭
জ্ঞানবদিতি চেৎ, যথা জ্ঞানস্য কার্য্যং মোক্ষঃ জ্ঞানেনাক্রিয়মাণোহপ্যুচ্যতে, তদ্বৎ কর্মকার্য্যত্বমিতি চেৎ; ন, অজ্ঞান-নিবর্তকত্বাৎ জ্ঞানস্য; অজ্ঞানব্যবধান- নিবর্তকত্বাৎ জ্ঞানস্য মোক্ষো জ্ঞানস্য কার্য্যমিত্যুপচর্য্যতে; ন তু কৰ্ম্মণা নিবর্তয়ি- তব্যমজ্ঞানম্; ন চাজ্ঞানব্যতিরেকেণ মোক্ষস্য ব্যবধানান্তরং কল্পয়িতুং শক্যম্, নিত্যত্বান্মোক্ষস্য সাধকস্বরূপাব্যতিরেকাচ্চ—যৎ কৰ্ম্মণা নিবর্ত্যেত। ৮
দৃষ্টান্তেন ব্যাঘাতং পরিহরন্নাশঙ্কতে-জ্ঞানবদিতি চেদিতি। তদেব স্ফুটয়তি-যথেতি। দৃষ্টান্তং বিঘটয়তি-নেতি। জ্ঞানস্য মোক্ষ-ব্যবধিভূতাজ্ঞাননিবর্তকত্বান্ মোক্ষস্তেনাক্রিয়মাণো- হপি তৎকাৰ্য্যমিতি ব্যপদেশভাগ্ ভবতীত্যর্থঃ। তদেব স্ফুটয়তি-অজ্ঞানেতি। দাষ্টান্তিকং নিরাচষ্টে-ন ত্বিতি। যৎ কৰ্ম্মণা নিবর্ত্যেত, তন্মোক্ষস্য ব্যবধানান্তরং কল্পয়িতুং ন তু শক্যমিতি সম্বন্ধঃ। ব্যবধানধ্বংসে কর্মণোহপ্রবেশেইপি মুক্তাবেব তৎপ্রবেশঃ স্যাদিতি চেন্নেত্যাহ- নিত্যত্বাদিতি। ৮.
অজ্ঞানমেব নিবর্ত্তয়তীতি চেৎ; ন, বিলক্ষণত্বাৎ,-অনভিব্যক্তিরজ্ঞানম্ অভিব্যক্তিলক্ষণেন জ্ঞানেন বিরুধ্যতে; কৰ্ম্ম তু নাজ্ঞানেন বিরুধ্যতে; তেন জ্ঞানবিলক্ষণং কৰ্ম্ম। যদি জ্ঞানাভাবঃ, যদি সংশয়জ্ঞানম্, যদি বিপরীতজ্ঞানং বা উচ্যতে অজ্ঞানমিতি; সর্ব্বং হি তজ্জ্ঞানেনৈব নিবর্ত্যেত, নতু কর্মণা, অন্যতমেনাপি বিরোধাভাবাৎ। ৯
নিত্যকৰ্ম্মনিবর্ত্যং ব্যবধানান্তরং মা ভূৎ, অজ্ঞানমেব তন্নিবর্ত্যং ভবিষ্যতি, তথা চ মোক্ষস্য কর্মকার্য্যত্বং শক্যমুপচরিতুমিতি শঙ্কতে-অজ্ঞানমেবেতি। কর্মণো জ্ঞানাদ্বিলক্ষণত্বান্নাজ্ঞান- নিবর্ত্তকত্বমিত্যুত্তরমাহ-ন বিলক্ষণত্বাদিতি। বৈলক্ষণ্যমেব প্রকটয়তি-অনভিব্যক্তিরিতি। ইতশ্চ জ্ঞাননিবর্ত্যমেবাজ্ঞানমিত্যাহ-যদীতি। অন্যতমেন নিত্যাদিনা ব্যস্তেন সমস্তেন বা শ্রৌতেন স্মার্ত্তেন বেত্যর্থঃ। কৰ্ম্মাজ্ঞানয়োরবিরোধো হেত্বর্থঃ। ৯
অথাদৃষ্টং কৰ্ম্মণামজ্ঞাননিবর্তকত্বং কল্প্যমিতি চেৎ; ন, জ্ঞানেনাজ্ঞাননিবৃত্তৌ গম্যমানায়ামদৃষ্টনিবৃত্তিকল্পনানুপপত্তেঃ; যথা অবঘাতেন ব্রীহীণাং তুষনিবৃত্তৌ গম্যমানায়াম্ অগ্নিহোত্রাদি-নিত্যকর্মকার্য্যা অদষ্টা ন কল্প্যতে তুষনিবৃত্তিঃ, তদ্বদ্ অজ্ঞাননিবৃত্তিরপি নিত্যকর্মকাৰ্য্যা অদষ্টা ন কল্প্যতে। জ্ঞানেন বিরুদ্ধত্বঞ্চ অসকৃৎ কর্মণামবোচাম; যদবিরুদ্ধং জ্ঞানং কর্মভিঃ, তদেব লোকপ্রাপ্তিনিমিত্ত- মিত্যুক্তম্, “বিদ্যয়া দেবলোকঃ” ইতি শ্রুতেঃ। ১০
অজ্ঞাননিবর্ত্তকত্বং কর্মণো নান্বয়ব্যতিরেকসিদ্ধং, কিন্তুদৃষ্টমেব কল্যমিতি শঙ্কতে—অথেতি। দৃষ্টে সত্যদৃষ্টকল্পনা ন স্যায্যেতি পরিহরতি—ন জ্ঞানেনেতি। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন বুদ্ধাবারোপরতি —যথেত্যাদিনা। অদৃষ্টেতি চ্ছেদঃ। অস্তু জ্ঞানাদজ্ঞানধ্বস্তিঃ, কিন্তু কৰ্ম্মসমুচ্চিতাদিত্যাশঙ্ক্যাহ —জ্ঞানেনেতি। ননু কৰ্ম্মভিরবিরুদ্ধমপি হিরণ্যগর্ভাদিজ্ঞানমস্তি, তথা চ সমুচ্চিতং জ্ঞানমজ্ঞান- ধ্বংসি ভবিষ্যতি, নেত্যাহ—যদবিরুদ্ধমিতি। ১০
কিঞ্চান্যৎ, কল্প্যে চ ফলে নিত্যানাং কৰ্ম্মণাং শ্রুতানাম্, যৎ কৰ্ম্মভিবিরুধ্যতে —দ্রব্যগুণকৰ্ম্মণাং কার্য্যমেব ন ভবতি,—কিং তৎ কল্প্যতাম্, যস্মিন্ কৰ্ম্মণঃ সামর্থ্যমেব ন দৃষ্টম্? কিংবা যস্মিন্ দৃষ্টং সামর্থ্যম্? যচ্চ কৰ্ম্মণাং ফলমবিরুদ্ধম্, তৎ কল্প্যতামিতি। পুরুষপ্রবৃত্তিজননায় অবশ্যং চেৎ কর্মফলং কল্পয়িতব্যম্— কর্মাবিরুদ্ধবিষয় এব শ্রুতার্থাপত্তেঃ ক্ষীণত্বাৎ, নিত্যো মোক্ষঃ ফলং কল্পয়িতুৎ ন শক্যঃ, তদ্ব্যবধানাজ্ঞাননিবৃত্তির্ব্বা, অবিরুদ্ধত্বাদ দৃষ্টসামর্থ্যবিষয়ত্বাচ্চেতি। ১১
নিত্যানাং কর্মণাং সমুচ্চিতানামসমুচ্চিতানাং চ স্বরূপস্থিতৌ মোক্ষে তৎপ্রতিবন্ধকাজ্ঞান- ধ্বস্তৌ বা নাদৃষ্টং সামর্থ্যং কল্পামিত্যুক্তম্, ইদানীং তৎকল্পনামঙ্গীকৃত্যাপি দূষয়তি—কিঞ্চেতি। কর্মণাং নাস্তি মোক্ষে সামর্থ্যমিত্যেতদুক্তাদেব কারণান্ন ভবতি, কিং ত্বন্যচ্চ কারণং তত্রাস্তী- ত্যর্থঃ। তদেব দর্শয়িতুং বিচারয়তি—কল্লে চেতি। বিরোধমভিনয়তি—দ্রব্যেতি। কার্য্যত্বা-
৭৬৯
ভাবং সমর্থয়তে-যস্মিন্নিতি। পক্ষান্তরমাহ-কিং বেতি। সামর্থ্যবিষয়ং বিশদয়তি-যচ্চেতি। কথমিহ নির্ণয়স্তত্রাহ-পুরুষেতি। কল্পয়িতব্যং ফলমিতি সম্বন্ধঃ। উৎপত্যাদীনামন্যতমো হি কৰ্ম্মভিরবিরুদ্ধো বিষয়ঃ। তত্রৈব নিত্যকর্মচোদনানুপপত্তেরুপশান্তত্বান্নিত্যকৰ্ম্মফলত্বেন মোক্ষস্তদ্ব্যবধানাজ্ঞাননিবৃত্তির্ব্বা ন শক্যতে কল্পয়িতুম্। কর্মাজ্ঞানয়োর্বিরোধাভাবাৎ দৃষ্টং সামর্থ্যং যস্মিন্নুৎপত্যাদৌ, তদ্বিষয়ত্বাচ্চ কৰ্ম্মণঃ, তদ্বিলক্ষণে মোক্ষে ন ব্যাপারঃ। তথা চ নিত্য- কৰ্ম্মবিধিবশাৎ পুরুষপ্রবৃত্তিসম্পাদনায় ফলং চেৎ কল্পয়িতব্যং, তর্হি তদুৎপত্যাদীনামন্যতমমেব তদবিরুদ্ধং কল্যমিত্যর্থঃ। ইতি-শব্দঃ শ্রুতার্থাপত্তিপরিহারসমাপ্ত্যর্থঃ। ১১
পারিশেষ্যন্যায়াৎ মোক্ষ এব কল্পয়িতব্য ইতি চেৎ-সর্ব্বেষাং হি কৰ্ম্মণাং সর্ব্বং ফলম্; ন চান্যৎ ইতরকর্মফলব্যতিরেকেণ ফলং কল্পনাযোগ্যমস্তি; পরিশিষ্টশ্চ মোক্ষঃ; স চেষ্টঃ বেদবিদাং ফলম্; তস্মাৎ স এব কল্পয়িতব্য ইতি চেৎ; ন, কৰ্ম্মফলব্যক্তীনামানন্ত্যাৎ পারিশেষ্যন্যায়ানুপপত্তেঃ; ন হি পুরুষেচ্ছাবিষয়াণাং কৰ্ম্মফলানামেতাবত্ত্বং নাম কেনচিদসর্ব্বজ্ঞেনাবধৃতম্, তৎসাধনানাং বা পুরুষে- চ্ছানাং বা অনিয়তদেশকালনিমিত্তত্বাৎ পুরুষেচ্ছাবিষয়সাধনানাঞ্চ পুরুষেষ্টফল- প্রযুক্তত্বাৎ; প্রতিপ্রাণি চ ইচ্ছাবৈচিত্র্যাৎ ফলানাং তৎসাধনানাং চানন্ত্যসিদ্ধিঃ; তদানন্ত্যাচ্চ অশক্যমেতাবত্ত্বং পুরুষৈজ্ঞাতুম্; অজ্ঞাতে চ সাধনফলৈতাবত্ত্বে কথং মোক্ষস্য পরিশেষসিদ্ধিরিতি। ১২
মোক্ষ এব নিত্যানাং কৰ্ম্মণাং ফলত্বেন কল্পয়িতব্যঃ পারিশেষ্যন্যায়াদিতি শঙ্কতে-পারি- শেষ্যেতি। পারিশেষ্যন্যায়মেব বিশদয়তি-সর্ব্বেষামিতি। সর্ব্বং স্বর্গপশুপুত্রাদীতি যাবৎ। তথাপি মোক্ষাদন্যদেব নিত্যকৰ্ম্মফলং কিং ন স্যাত্তত্রাহ-ন চেতি। মোক্ষস্যাপীতরকর্মফল- নিবেশমাশঙ্ক্যাহ-পরিশিষ্টশ্চেতি। তস্য ফলত্বমেব কথং সিদ্ধং, তত্রাহ-স চেতি। পরি- শেষায়াতমর্থং নিগময়তি-তস্মাদিতি। পারিশেষ্যাসিদ্ধ্যা দূষয়তি-নেতি।
কৰ্ম্মফলব্যক্ত্যানন্ত্যমুক্তং ব্যনক্তি-ন হীতি। ফলবৎ ফলসাধনানাং ফলবিষয়েচ্ছানাং চানস্ত্যং কথয়তি-তৎসাধনানামিতি। তদানন্ত্যে হেতুমাহ-অনিয়তেতি। ইচ্ছাদ্ব্যানন্ত্যে হেত্বন্তর- মাহ-পুরুষেতি। এতাবত্ত্বং নাম নাস্তীত্যুভয়ত্র সম্বন্ধঃ। পুরুষস্যেষ্টং ফলং শোভনাধ্যাস- বিষয়ভূতং, তত্র বিষয়িণাং শোভনাধ্যাসেন প্রযুক্তত্বাদিতি হেত্বর্থঃ। ইচ্ছাদ্ব্যানন্ত্যং প্রাণিভেদেষু দর্শয়িত্বা তদানন্ত্যমেকৈকস্মিন্নপি প্রাণিনি দর্শয়তি-প্রতিপ্রাণি চেতি। ইচ্ছাদ্ব্যানন্ত্যে ফলিত- মাহ-তদানন্ত্যাচ্চেতি। সাধনাদিযেতাবত্ত্বাজ্ঞানেহপি কিং স্যাৎ, তদাহ-অজ্ঞাতে চেতি। ইতি-শব্দঃ পারিশেষ্যানুপপত্তিসমাপ্ত্যর্থঃ। ১২
কর্মফল-জাতিপারিশেষ্যমিতি চেৎ—সত্যপীচ্ছাবিষয়াণাং তৎসাধনানাঞ্চানন্ত্যে কর্মফলজাতিত্বং নাম সর্ব্বেষাং তুল্যম্, মোক্ষস্তু অকর্মফলত্বাৎ পরিশিষ্টঃ স্যাৎ, তস্মাৎ পরিশেষাৎ স এব যুক্তঃ কল্পয়িতুমিতি চেৎ; ন, তস্যাপি নিত্যকৰ্ম্ম- ফলত্বাভ্যুপগমে কৰ্ম্মফলসমানজাতীয়ত্বোগপত্তেঃ পরিশেষানুপপত্তিঃ। তস্মাদন্য-
থাপ্যুপপত্তেঃ ক্ষীণা শ্রুতার্থাপত্তিঃ; উৎপত্যাপ্তি-বিকার-সংস্কারাণামন্যতমমপি নিত্যানাং কর্মণাং ফলমুপপদ্যত ইতি ক্ষীণা শ্রুতার্থাপত্তিঃ। ১৩
প্রকারান্তরেণ পারিশেষ্যং শঙ্কতে-কর্মেতি। তামেব শঙ্কাং বিশদয়তি-সত্যপীতি। তথাহপি কথং মোক্ষস্য পরিশিষ্টত্বং, তদাহ-মোক্ষস্থিতি। পরিশেষফলমাহ-তস্মাদিতি। শঙ্কিতং পরিশেষং দূষয়তি-নেত্যাদিনা। অর্থাপত্তিপরিশেযৌ পরাকৃত্যার্থাপত্তিপরাকরণং প্রপঞ্চয়িতুং প্রস্তৌতি-তস্মাদিতি। অন্যথাংপ্যুপপত্তিং প্রকটয়তি-উৎপত্তীতি। ১৩
চতুর্ণামন্যতম এব মোক্ষ ইতি চেৎ; ন তাবদুৎপাদ্যঃ, নিত্যত্বাৎ; অতএব অবিকার্য্যঃ, অসংস্কার্য্যশ্চ, অতএব অসাধনদ্রব্যাত্মকত্বাচ্চ-সাধনাত্মকং হি দ্রব্যং সংস্ক্রিয়তে, যথা পাত্রাজ্যাদি প্রোক্ষণাদিনা; ন চ সংস্ক্রিয়মাণঃ সংস্কারনির্ব্বর্ত্যো বা-যুপাদিবৎ; পারিশেষ্যাদাপ্যঃ স্যাৎ; নাপ্যোহপি, আত্মস্বভাবত্বাদেকত্বাচ্চ। ইতরৈঃ কৰ্ম্মভির্ব্বলক্ষণ্যাৎ নিত্যানাং কর্মণাম্, তৎফলেনাপি বিলক্ষণেন ভবিতব্য- মিতি চেৎ; ন, কৰ্ম্মত্বসালক্ষণ্যাং, সলক্ষণং কস্মাৎ-ফলংন ভবতি ইতরকর্মফলৈঃ? নিমিত্তবৈলক্ষণ্যাদিতি চেৎ; ন, ক্ষামবত্যাদিভিঃ সমানত্বাৎ; যথা হি গৃহদাহাদৌ নিমিত্তে ক্ষামবত্যাদীষ্টিঃ, যথা “ভিন্নে জুহোতি, স্কন্নে জুহোতি” ইত্যেবমাদৌ নৈমিত্তিকেষু কৰ্ম্মসু ন মোক্ষঃ ফলং কল্প্যতে-তৈশ্চাবিশেষাৎ নৈমিত্তিকত্বেন, জীবনাদিনিমিত্তে চ শ্রবণাৎ, তথা নিত্যানামপি ন মোক্ষঃ ফলম্। ১৪
নিত্যানামুৎপত্যাদিফলত্বেহপি মোক্ষস্য তৎফলত্বং সিধ্যতীতি শঙ্কতে-চতুর্ণামিতি। তত্র মোক্ষস্থোৎপাদ্যত্বং দূষয়তি-ন তাবদিতি। উভয়ত্রাতঃশব্দো নিত্যত্বপরামর্শী। অসংস্কার্যত্বে হেত্বন্তরমাহ-অসাধনেতি। তদেব ব্যতিরেকমুখেন বিবৃণোতি-সাধনাত্মকং হীতি। ইতশ্চ মোক্ষস্যাসংক্রিয়মাণত্বমিত্যাহ-ন চেতি। যথা যুপস্তক্ষণাষ্টাশ্রীকরণাভ্যঞ্জনাদিনা সংস্ক্রিয়তে, যথা চাহবনীয়ঃ সংস্কারেণ নিষ্পাদ্যতে, ন তথা মোক্ষঃ, নিতাসুদ্ধত্বান্নিগুণত্বাচ্চে- ত্যর্থঃ। পক্ষান্তরমনুভাষ্য দূষয়তি-পারিশেষ্যাদিত্যাদিনা।
একত্বং পূর্ণত্বং সাধনবৈলক্ষণ্যং ফলবৈলক্ষণ্যং কল্পয়তীতি শঙ্কতে-ইতরৈরিতি। হেতু- বৈলক্ষণ্যাসিদ্ধৌ কল্পকাভাবাৎ ফলবৈলক্ষণ্যাসিদ্ধিরিতি দুষয়তি-ন কৰ্ম্মত্বেতি। নিমিত্তকৃতহেতু- বৈলক্ষণ্যবশাৎ ফলবৈলক্ষণ্যসিদ্ধিরিতি শঙ্কতে-নিমিত্তেতি। নিমিত্তবৈলক্ষণ্যং ফলবৈলক্ষণ্যস্যা- নিমিত্তমিতি পরিহরতি-ন ক্ষামবত্যাদিভিরিতি।
তদেব প্রপঞ্চয়তি-যথা হীতি। “যস্যাহিতাগ্নেরগ্নিগৃহান্ দহেৎ, অগ্নয়ে ক্ষামবতে পুরোডাশমষ্টাকপালং নির্বপেৎ” ইত্যত্র দহেদিতি বিধিবিভক্ত্যা প্রসিদ্ধার্থ-যচ্ছব্দোপহিতয়া গৃহদাহাখ্যনিমিত্তপরামর্শেনাগ্নয়ে ক্ষামবতে পুরোডাশমিত্যাদিনা ক্ষামবতী বিধীয়তে। “যস্তোভয়ং নির্বপেদিতি বিধান্যমাননির্ব্বাপনিমিত্তং হবিরাত্তিমনুদ্য নির্ব্বাপো বিধীয়তে। ভিন্নে জুহোতি স্কন্নে জুহোত্যণ যস্য পুরোডাশৌ ক্ষীয়তন্তং যজ্ঞং বরুণো গৃহ্লাতি, যদা তদ্ধবিস্তিষ্ঠেতাথ ‘তদেব হবিনির্বপেৎ। যজ্ঞো হি যজ্ঞস্থ প্রায়শ্চিত্তম্, ইতি চ ভেদনাদিনিমিত্তং প্রায়শ্চিত্তমুক্তং,
৭৭১
ন চ তন্মুক্তিফলং, তথা নিমিত্তভেদেহপি ন নিত্যং কৰ্ম্ম মুক্তিফলমিত্যর্থঃ। ক্ষামবত্যাদিতুল্যত্বং নিত্যকৰ্ম্মণাং কুতো লব্ধমিত্যাশঙ্ক্যাহ—তৈশ্চেতি। ক্ষামবত্যাদিভিরিতি যাবৎ। অবিশেষে হেতুর্নৈমিত্তিকত্বেনেতি। তদেব কথমিতি চেৎ, তত্রাহ—জীবনাদিতি। দাষ্টান্তিকং স্পষ্টয়তি— তথেতি। ১৪
আলোকস্য সর্বেষাং রূপদর্শনসাধনত্বে, উলুকাদয় আলোকেন রূপং ন পশ্য- ন্তীতি উলুকাদিচক্ষুষো বৈলক্ষণ্যাদিতরলোকচক্ষুর্ভিঃ ন রসাদিবিষয়ত্বং পরি- কল্প্যতে; রসাদিবিষয়ে সামর্থ্যস্যাদৃষ্টত্বাৎ, সুদূরমপি গত্বা যদ্বিষয়ে দৃষ্টং সামর্থ্যম্, তত্রৈব কশ্চিদ্বিশেষঃ কল্পয়িতব্যঃ। ১৫
নিত্যং কৰ্ম্ম কর্মান্তরাদ্বিলক্ষণমপি ন মোক্ষফলমিত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ—আলোকস্যেতি। চক্ষুরন্তরৈরুলুকাদিচক্ষুষো বৈলক্ষণ্যেহপি ন রসাদিবিষয়ত্বমিত্যত্র হেতুমাহ—রসাদীতি। বৈলক্ষণ্যং তহি কুত্রোপযুজ্যতে, তত্রাহ—সুদূরমপীতি। মনুষ্যান্ বিহায়োলুকাদৌ গত্বাপীতি যাবৎ। যদ্বিষয়ে রূপাদাবিত্যর্থঃ। বিশেষো দূরসূক্ষ্মাদিরতিশয়ঃ। ১৫
যৎ পুনরুক্তম্, বিদ্যা-মন্ত্র-শর্করাদিসংযুক্তবিষ-দধ্যাদিবৎ নিত্যানি কার্য্যান্ত- রমারমন্ত ইতি, আরভ্যতাং বিশিষ্টং কার্য্যম্, তদিষ্টত্বাদবিরোধঃ; নিরভিসন্ধেঃ কর্ম্মণো বিদ্যাসংযুক্তস্য বিশিষ্টকার্য্যান্তরারম্ভে ন কশ্চিদ্বিরোধঃ, দেবযাজ্যাত্ম- যাজিনোরাত্মযাজিনো বিশেষশ্রবণাৎ—“দেবযাজিনঃ শ্রেয়ানাত্মযাজী” ইত্যাদৌ, “যদেব বিদ্যয়া করোতি” ইত্যাদৌ চ। ১৬
দাষ্টান্তিকং পূর্ব্ববাদানুবাদপূর্ব্বকমাচষ্টে-যৎ পুনরিত্যাদিনা। তৎ তত্রেতি যাবৎ। তদেব বিবৃণোতি-নিরভিসন্ধেরিতি। বিদ্যাসংযুক্তং কৰ্ম্ম বিশিষ্টকার্য্যকরমিত্যত্র শতপথশ্রুতিং প্রমাণয়তি-দেবযাজীতি। তদাহরিত্যুপক্রম্য দেবযাজিনঃ শ্রেয়ানিত্যাদৌ কাম্যকর্তুদেব- যাজিনঃ সকাশাদাত্মশুদ্ধ্যর্থং কৰ্ম্ম কুর্বন্নাত্মযাজী শ্রেয়ানিত্যাত্মযাজিনো বিশেষশ্রবণাৎ সর্ব্বক্রতু- যাজিনামাত্মযাজী বিশিষ্যত ইতি স্মৃতেশ বিশিষ্টস্য কর্মণো বিশিষ্টকাৰ্য্যারম্ভকত্বমবিরুদ্ধমিত্যর্থঃ। ছান্দোগ্যেহপি বিদ্যাসংযুক্তস্য কর্মণো বিশিষ্টকাৰ্য্যারম্ভকত্বং দৃষ্টমিত্যাহ-যদেবেতি। ১৬
যস্ত পরমাত্মদর্শনবিষয়ে মনুনোক্তঃ আত্মযাজি-শব্দঃ—“সমং পশ্যন্নাত্মযাজী” ইত্যত্র, সমং পশ্যন্নাত্মযাজী ভবতীত্যর্থঃ; অথবা, ভূতপূর্ব্বগত্যা আত্মযাজী আত্ম- সংস্কারার্থং নিত্যানি কর্মাণি করোতি, “ইদং মেহনেনাঙ্গং সংস্ক্রিয়তে” ইতি শ্রুতেঃ। তথা “গার্ভৈহোমৈঃ” ইত্যাদিপ্রকরণে কার্য্যকরণসংস্কারার্থত্বং নিত্যানাং কর্মণাং দর্শয়তি; সংস্কৃতশ্চ য আত্মযাজী তৈঃ কৰ্ম্মভিঃ সমং দ্রষ্টং সমর্থো ভবতি, তস্য ইহ বা জন্মান্তরে বা সমমাত্মদর্শনমুৎপদ্যতে; সমং পশ্যন্ স্বারাজ্যমধি- গচ্ছতীত্যেষোহর্থঃ। আত্মযাজিশব্দস্ত ভূতপূর্ব্বগত্যা প্রযুজ্যতে জ্ঞানযুক্তানাং নিত্যানাং কৰ্ম্মণাং জ্ঞানোৎপত্তিসাধনত্বপ্রদর্শনার্থম্। ১৭
কিঞ্চান্যৎ,—
“ব্রহ্মা বিশ্বসৃজো ধর্ম্মো মহানব্যক্তমেব চ।
উত্তমাং সাত্ত্বিকীমেতাং গতিমাহুর্ম্মনীষিণঃ॥”
ইতি চ। দেবসাষ্টি ব্যতিরেকেণ ভূতাপ্যয়ং দর্শয়তি—“ভূতান্যপ্যেতি পঞ্চ বৈ।” “ভূতান্যত্যেতি” ইতি পাঠং যে কুর্ব্বন্তি, তেষাং বেদবিষয়ে পরিচ্ছিন্নবুদ্ধিত্বাদ- দোষঃ। ১৮
নবাধ্যায্যিগে। নিজকর্ম্মানুষ্ঠায়িবিষয়ো ন ভবতি—
“সর্ব্বভূতেষু চাত্মানং সর্ব্বভূতানি চাত্মনি।
সম্পশ্যন্নাত্মযাজী বৈ স্বারাজ্যমধিগচ্ছতি॥”
ইত্যত্র পরমাত্মদর্শনবিষয়ে তস্য প্রযুক্তত্বাৎ, অত আহ—যস্থিতি। যদি সমং পশ্যন্ ভবেৎ, তদা পরেণাত্মনৈকীভূতং স্বরাড, ভবতীত্যাত্মজ্ঞানস্তুতিরত্র বিবক্ষিতা। মহতী হীয়ং ব্রহ্মবিদ্যা, যদ্- ব্রহ্মবিদেবাত্মযাজী ভবতি। ন হি তস্য তদনুষ্ঠানং পৃথগপেক্ষতে। ব্রহ্মবিৎ পুণ্যকৃদিতি চ বক্ষ্যতীত্যর্থঃ। পরদর্শনবত্যাত্মযাজিশব্দন্য গত্যন্তরমাহ—অথ বেতি। ভূতা যা পূর্ব্বস্থিতিঃ, তামপেক্ষ্যাত্মযাজিশব্দো বিদুষীত্যর্থঃ।
তদেব প্রপঞ্চয়তি-আত্মেতি। তেষাং তৎসংস্কারার্থত্বে প্রমাণমাহ-ইদমিতি। তত্রৈব স্মৃতিং প্রমাণয়তি-তথেতি। গর্ভসম্বন্ধিভিহোমৈর্ম্মৌঞ্জীনিবন্ধনাদিভিশ্চ বৈজিকমেবৈনঃ শময়তীত্যস্মিন্ প্রকরণে নিত্যকর্মণাং সংস্কারার্থত্বং নিশ্চিতমিত্যর্থঃ। সংস্কারোহপি কুত্রোপ- যুজ্যতে, তত্রাহ-সংস্কৃতশ্চেতি। যো হি নিত্যকর্মানুষ্ঠায়ী, স তদনুষ্ঠানজনিতাপূর্ব্ববশাৎ, পরিশুদ্ধবুদ্ধিঃ সম্যদ্ধীযোগ্যো ভবতি,
‘মহাযজ্ঞশ্চ যজ্ঞশ্চ ব্রাহ্মীয়ং ক্রিয়তে তনুঃ।’
ইতি স্মৃতেরিতার্থঃ। কদা পুনরেষা সম্যন্ধীরুৎপদ্যতে, তত্রাহ-তস্যেতি। উৎপন্নস্য সম্যগ্- জ্ঞানস্য ফলমাহ-সমমিতি। কথং পুনঃ সম্যজ্ঞানবত্যাত্মযাজিশব্দ ইত্যাশঙ্ক্য পূর্ব্বোক্তং স্মারয়তি-আত্মেতি। কিমিতীহ ভূতপূর্ব্বগতিরাশ্রিতেতি, তত্রাহ-জ্ঞানযুক্তানামিতি। ঐহিকৈরামুগ্মিকৈব্বা কৰ্ম্মভিঃ শুদ্ধবুদ্ধেঃ শ্রবণাদিবশাদৈক্যজ্ঞানং মুক্তিফলমুদেতি। কৰ্ম্ম তু বিদ্যাসংযুক্তমপি সংসারফলমেবেতি ভাবঃ। ১৭
তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ—কিঞ্চেতি। বিদ্যাযুক্তমপি কৰ্ম্ম বন্ধায়ৈবেত্যত্র ন কেবলমুক্তমেব কারণং, কিন্তুন্যচ্চ তদুপপাদকমস্তীত্যর্থঃ। তদেব দর্শয়তি—ব্রহ্মেতি। সাত্ত্বিকী সত্ত্বগুণপ্রসূত- জ্ঞানসমুচ্চিতকৰ্ম্মফলভূতামিতি যাবৎ। অত্র হি বিদ্যাযুক্তমপি কৰ্ম্ম সংসারফলমেবেতি সূচ্যতে।
‘এব সর্ব্বঃ সমুদ্দিষ্টস্ত্রিপ্রকারস্য কর্ম্মণঃ। ত্রিবিরুদ্ধিবিধঃ কর্ম্মসংসারঃ সার্ব্বভৌতিকঃ॥’
ইত্যুপসংহারাদিতি চকারার্থঃ। ‘কিঞ্চ—
“প্রবৃত্তং কর্ম্ম সংসেবা দেবানামেতি সাষ্টিতাম্।” ইতি কর্ম্মফলভূতেদেবতা সদৃশৈশ্বর্য্যপ্রাপ্তিমুক্তঃ। তদতিরেকেণ—
৭৭৩
‘নিবৃত্তং সেবমানস্তু ভূতান্যপ্যেতি পঞ্চ বৈ।’
ইতি ভূতেষ্পীয়বচনান্ন সমুচ্চয়স্য মুক্তিফলতেত্যাহ—দেবসার্দ্ধীতি।
‘নিবৃত্তং সেবমানস্তু ভূতানুপেত্য(তো)তি পঞ্চ বৈ।’
ইতি পাঠান্ মুক্তিরেব সমুচ্চয়ানুষ্ঠানাদ্বিবক্ষিতেতি চেৎ, নেত্যাহ-ভূতানীতি। জ্ঞানমেব মুক্তিহেতুরিতি প্রতিপাদকোপনিষদ্বিরোধান্নায়ং পাঠঃ সাধীয়ানিত্যর্থঃ। ১৮
ন চার্থবাদত্বম্—অধ্যায়স্য ব্রহ্মান্ত-কর্ম্মবিপাকার্থস্য তদ্ব্যতিরিক্তাত্মজ্ঞানার্থস্য চ কর্মকাণ্ডোপনিষদ্্যাং তুল্যার্থত্বদর্শনাৎ; বিহিতাকরণ-প্রতিষিদ্ধকর্ম্মণাঞ্চ স্থাবর- শ্ব-সূকরাদিফলদর্শনাৎ, বাঞ্ছাশ্যাদিপ্রেতদর্শনাচ্চ। ১৯
ননু বিগ্রহবতী দেবতৈব নাস্তি, মন্ত্রময়ী হি সা দেবতা-শব্দপ্রত্যয়ালম্বনম্, অতো ব্রহ্মা বিশ্বসৃজ ইত্যাদেরর্থবাদত্বান্ন তদ্বলেন নিত্যকর্মণাং মুক্তিসাধনত্বং নিরাকর্তুং শক্যম্, অত আহ— ন চেতি। জ্ঞানার্থস্য সম্পশ্যন্নাত্মযাজীত্যাদেরিতি শেষঃ। কিঞ্চ—
“অকুর্ব্বন্ বিহিতং কৰ্ম্ম নিন্দিতং চ সমাচরন্। প্রসজ্জংশ্চেন্দ্রিয়ার্থেষু নরঃ পতনমৃচ্ছতি ॥ শরীরজৈঃ কর্ম্মদোষৈর্য্যাতি স্থাবরতাং নরঃ। বাচিকৈঃ পক্ষিমৃগতাং মানসৈরন্ত্যজাতিতাম্ ॥ শ্বসুকরখরোষ্ট্রাণাং গোজাবিমৃগপক্ষিণাম্। চণ্ডালপুক্কসানাং চ ব্রহ্মহা যোনিমৃচ্ছতি।” ইত্যাদিবাক্যৈঃ প্রতিপাদিতফলানাং প্রত্যক্ষেনাপি দর্শনাৎ, যথা তত্র নাভূতার্থবাদত্বং, তথা যথোক্তাধ্যায়স্যাপি নাভূতার্থবাদতেত্যাহ-বিহিতেতি। কিংচ, বঙ্গাদিদেশে ছদ্দিতাশ্যাদি- প্রেতানাং প্রত্যক্ষত্বাদধ্যয়নরহিতানামপি স্ত্রীশূদ্রাদীনাং বেদোচ্চারণদর্শনেন ব্রহ্মগ্রহসদ্ভাবাব- গমাচ্চ ন ব্রহ্মাদিবাক্যস্যার্থবাদতেত্যাহ-বান্তেতি। ১৯
ন চ শ্রুতিস্মৃতিবিহিত-প্রতিষিদ্ধব্যতিরেকেণ বিহিতানি বা প্রতিষিদ্ধানি বা কর্মাণি কেনচিদবগন্তং শক্যন্তে, যেষামকরণাদনুষ্ঠানাচ্চ প্রেত-শ্ব-সূকরস্থাবরাদীনি কর্মফলানি প্রত্যক্ষানুমানাভ্যামুপলভ্যন্তে। ন চৈষামকৰ্ম্মফলত্বং কেনচিদভ্যুপ- গম্যতে; তস্মাদ্বিহিতাকরণ-প্রতিষিদ্ধসেবানাৎ যথৈতে কৰ্ম্মবিপাকাঃ প্রেততির্য্যক্- স্থাবরাদয়ঃ, তথা উৎকৃষ্টেষপি ব্রহ্মান্তেষু কৰ্ম্মবিপাকত্বং বেদিতব্যম্। তস্মাৎ “স আত্মনো বপামুদখিদৎ” “সোহরোদীৎ” ইত্যাদিবৎ নাভূতার্থবাদত্বম্। ২০
ননু স্থাবরাদীনাং শ্রৌতস্মার্তকৰ্ম্মফলত্বাভাবান্ন তদ্দর্শনেন বচনানাং ভূতার্থত্বং শক্যং কল্পয়িতুম্, তত আহ-ন চেতি। সেবাদিদৃষ্টকারণসাম্যেহপি ফলবৈষম্যোপলস্তাদবশ্যমতীন্দ্রিয়ং কারণং বাচ্যম্। ন চ তত্র শ্রুতিস্মৃতী বিহায়ান্যন্মানমস্তি। তথা চ শ্রৌতস্মার্তকৰ্ম্মকৃতান্যের স্থাবরাদীনি ফলানীত্যর্থঃ। সন্নিহিতাসন্নিহিতেষু স্থাবরাদিযু প্রত্যক্ষানুমানয়োর্যথাযোগং প্রবৃত্তিরুনেয়া। স্থাবরাণাং জীবশূন্যত্বাদকৰ্ম্মফলত্বমিতি কেচিৎ, তান্ প্রত্যাহ-ন চৈষামিতি। অস্মদাদিবদেব বৃক্ষাদীনাং বৃদ্ধ্যাদিদর্শনাৎ সজীবত্বপ্রসিদ্ধেস্তস্মাৎ পশ্যন্তি পাদপা ইত্যাদিপ্রয়োগাচ্চ তেষাং
কর্ম্মফলত্বসিদ্ধিরিত্যর্থঃ। স্থাবরাদীনাং কর্ম্মফলত্বে সিদ্ধে ফলিতমাহ—তস্মাদিতি। ব্রহ্মাদীনাং পুণ্যকর্ম্মফলত্বেহপি প্রকৃতে কিং স্যাৎ, তদাহ—তস্মাদিতি। ২০
তত্রাপি অভূতার্থবাদত্বং মা ভূদিতি চেৎ; ভবত্বেবম্; ন চৈতাবতা অন্য ন্যায়স্য বাধো ভবতি, ন চাস্মৎপক্ষো বা দুষ্যতি। ন চ “ব্রহ্মা বিশ্বসৃজঃ” ইত্যাদীনাং কাম্য- কৰ্ম্মফলত্বং শক্যং বক্তুম্, তেষাং দেবাষ্টিতায়াঃ ফলস্যোক্তত্বাৎ। তস্মাৎ সাভি- সন্ধীনাং নিত্যানাং সর্ব্বমেধাশ্বমেধাদীনাং চ ব্রহ্মত্বাদীনি ফলানি। যেবাং পুনর্নি- ত্যানি নিরভিসন্ধীনি আত্মসংস্কারার্থানি, তেষাং জ্ঞানোৎপত্যর্থানি তানি, “ব্রাহ্মীয়ং ক্রিয়তে তনুঃ” ইত্যাদি-স্মরণাৎ; তেষামারাদুপকারকত্বাৎ মোক্ষসাধনান্যপি কর্মাণি ভবন্তীতি ন বিরুধ্যন্তে। যথা চায়মর্থঃ, ষষ্ঠে অনকাখ্যায়িকাসমাপ্তৌ বক্ষ্যামঃ। ২১
কর্মবিপাকপ্রকরণস্যাভূতার্থবাদত্বাভাবে দৃষ্টান্তেহপি তন্ন স্যাদিতি শঙ্কতে-তত্রাপীতি। অঙ্গীকরোতি-ভবত্বিতি। কথং তর্হি বৈধর্ম্যদৃষ্টান্তসিদ্ধিরত আহ-ন চেতি। বৈধর্মাদৃষ্টান্তা- ভাবমাত্রেণ কৰ্ম্মবিপাকাধ্যায়স্য নাভুতার্থবাদতেত্যন্য ন্যায়স্য নৈব বাধঃ, সাধর্ম্যদৃষ্টান্তাদপি তৎসিদ্ধেরিত্যর্থঃ। নমু ‘প্রজাপতিরাত্মনো বপামুদখিদৎ’ ইত্যাদীনামভূতার্থবাদত্বাভাবে কথমর্থবাদাধিকরণং ঘটিষ্যতে, তত্রাহ-ন চেতি। তদঘটনায়ামপি নাস্মৎপক্ষক্ষতিস্তবৈব তদ- ভূতার্থবাদত্বং ত্যজতস্তদ্বিরোধাদিত্যর্থঃ। ননু কর্মবিপাকপ্রকরণস্যার্থবাদত্বাভাবেহপি ব্রহ্মাদীনাং কাম্যকৰ্ম্মফলত্বান্ন জ্ঞানসংযুক্তনিত্যকৰ্ম্মফলত্বং, ততো মোক্ষ এব তৎফলমিত্যত আহ-ন চেতি। তেষাং কাম্যানাং কৰ্ম্মণামিতি যাবৎ। দেবসাষ্টিতায়া দেবৈরিন্দ্রাদিভিঃ সমানৈশ্বর্য্যপ্রাপ্তেরিত্যর্থঃ। উক্তত্বাৎ ‘প্রবৃত্তং কৰ্ম্ম সংসেব্য দেবানামেতি সাষ্টিতাম্’ ইত্যত্রেতি শেষঃ। ননু বিদ্যাসংযুক্তানাং নিত্যানাং কৰ্মণাং ফলং ব্রহ্মাদিভাবশ্চেৎ, কথং তানি জ্ঞানোৎপত্যর্থান্যাস্থীয়ন্তে, তত্রাহ- তস্মাদিতি। কৰ্ম্মণাং মুক্তিফলত্বাভাবস্তচ্ছব্দার্থঃ। মাভিসಂಧীনাং দেবতাভাবে ফলেহসুরাগবতা- মিতি যাবৎ।
নিত্যানি কর্মাণি শ্রৌতানি স্মার্তানি চাগ্নিহোত্রসন্ধ্যোপাসনপ্রভৃতীনি নিরভিসংধীনি ফলাভিলাষবিকলানি পরমেশ্বরার্পণবুদ্ধ্যা ক্রিয়মাণানি। আত্মশব্দো মনোবিষয়ঃ। কৰ্ম্মণাং চিত্তশুদ্ধিদ্বারা জ্ঞানোৎপত্যর্থত্বে প্রমাণমাহ-ব্রাহ্মীতি। কথং তর্হি কৰ্ম্মণাং মোক্ষসাধনত্বং কেচিদাচক্ষতে, তত্রাহ-তেষামিতি। সংস্কৃতবুদ্ধীনামিতি যাবৎ। কৰ্ম্মণাং পরম্পরয়া মোক্ষ- সাধনত্বং কথং সিদ্ধবদুচ্যতে, তত্রাহ-যথা চেতি। অয়মর্থস্তথেতি শেষঃ। ২১
যতু বিষ-দধ্যাদিবদিত্যুক্তম্, তত্র প্রত্যক্ষানুমানবিষয়ত্বাদবিরোধঃ। যস্ত অত্যন্তশব্দগম্যোহর্থঃ, তত্র বাক্যস্যাভাবে তদর্থপ্রতিপাদকস্য ন শক্যং কল্পয়িতুং বিষদধ্যাদি-সাধর্ম্যম্। ন চ প্রমাণান্তরবিরুদ্ধার্থ বিষয়ে শ্রুতেঃ প্রামাণ্যং কল্প্যতে, যথা শীতোহগ্নিঃ ক্লেদয়তীতি। শ্রুতে তু তাদর্থ্যে বাক্যস্য, প্রমাণান্তরস্যাভা- সত্বম্; যথা ‘খদ্যোতোহগ্নিঃ’ ইতি, ‘তলমলিনমন্তরিক্ষম্’ ইতি বালানাং যৎ প্রত্যক্ষমপি, তদ্বিষয়-প্রমাণান্তরস্য অযথার্থত্বে নিশ্চিতে নিশ্চিতার্থমপি বালপ্রত্যক্ষ-
৭৭৫
মাভাসীভবতি। তস্মাদ্বেদপ্রামাণ্যস্যাব্যভিচারাৎ তাদর্থ্যে সতি বাক্যস্য তথাত্বং স্যাৎ, ন তু পুরুষমতিকৌশলম্; ন হি পুরুষমতিকৌশলাৎ সবিতা রূপং ন প্রকাশয়তি, তথা বেদবাক্যান্যপি ন অন্যার্থানি ভবন্তি; তস্মান্ন মোক্ষার্থানি কর্মাণীতি সিদ্ধম্। অতঃ কৰ্ম্মফলানাং সংসারত্বপ্রদর্শনায়ৈব ব্রাহ্মণমারভ্যতে—
নিরস্তমপ্যধিকবিবক্ষয়া পুনরনুবদতি-যত্তিতি। বিষাদেমন্ত্রাদিসহিতস্য জীবনাদিহেতুত্বং প্রত্যক্ষাদিসিদ্ধম্, অতো দৃষ্টান্তে কার্য্যারম্ভকত্বে বিরোধো নাস্তীত্যাহ-তত্রেতি। কর্ম্মণো বিদ্যাসংযুক্তস্য কার্যান্তরারম্ভকত্বলক্ষণোহর্থঃ শব্দেনৈব গম্যতে। ন চ তত্র মানান্তরমস্তি। ন চ সমুচ্চিতস্য কর্ম্মণো মোক্ষারম্ভকত্বপ্রতিপাদকং বাক্যমুপলভ্যতে, তদভাবে কর্ম্মণি বিদ্যাযুক্তেইপি বিষদধ্যাদিসাধর্ম্যং কল্পয়িতুং ন শক্যমিত্যাহ-যস্তিতি। কর্মসাধ্যত্বে চ মোক্ষস্যানিত্যতা স্যাদিতি ভাবঃ।
‘অপাম সোমমমৃতা অভুম’ ইত্যাদিশ্রুতের্মোক্ষস্য কৰ্ম্মসাধ্যস্যাপি নিত্যত্বমিতি চেৎ, নেত্যাহ-ন চেতি। যৎ কৃতকং তদনিত্যমিত্যনুমানুগৃহীতং যদ্যথেহেত্যাদিবাক্যং, তদ্বিরোধেনার্থবাদ- শ্রুতেঃ স্বার্থেইপ্রামাণ্যমিত্যর্থঃ, প্রমাণান্তরবিরুদ্ধেহর্থে প্রামাণ্যং শ্রুতেনোচ্যতে চেদদ্বৈতশ্রুতেরপি কথং প্রত্যক্ষাদিবিরুদ্ধে স্বার্থে প্রামাণ্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-শ্রুতে ত্বিতি। তত্ত্বমস্যাদিবাক্যস্য ষড়্বিধতাৎপর্ষলিঙ্গৈঃ সদদ্বৈতপরত্বে নির্ধারিতিতে সম্ভেদবিষয়স্য প্রত্যক্ষাদেরাভাসত্বং ভবতীত্যর্থঃ। তদেব দৃষ্টান্তেন সাধয়তি-যথেত্যাদিনা। যদবিবেকিনাং যথোক্তং প্রত্যক্ষং, তদ্যদ্যপি প্রথম- ভাবিত্বেন প্রবলং নিশ্চিতার্থং চ, তথাহপি তস্মিন্নেবাকাশাদৌ বিষয়ে প্রবৃত্তস্যাপ্তবাক্যা- দেমানান্তরস্য যথার্থত্বে সতি তদ্বিরুদ্ধং পূর্ব্বোক্তমবিবেকিপ্রত্যক্ষমপ্যাভাসীভবতি, তথেদং দ্বৈতবিষয়ং প্রত্যক্ষাদ্যদ্বৈতাগমবিরোধে ভবত্যাভাস ইত্যর্থঃ।
ননু তাৎপর্য্যং নাম পুরুষস্য মনোধৰ্ম্মস্তদ্বশাচ্চেদদ্বৈতশ্রুতের্ষথার্থত্বং, তর্হি প্রতিপুরুষমন্যথৈব তাৎপর্য্যদর্শনাত্তদ্বশাদন্যথৈব শ্রুত্যর্থঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্য দাষ্টান্তিকং নিগময়ন্নুত্তরমাহ-তস্মাদিত্যা- দিনা। তাদর্থ্যমর্থপরত্বং, তথাত্বং যাথার্থ্যং, শব্দধৰ্ম্মস্তাৎপর্য্যং, তচ্চ ষড়্বিধলিঙ্গগম্যং, তথা চ শব্দস্য পুরুষাভিপ্রায়বশান্নান্যথার্থত্বমিত্যর্থঃ। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-ন হীতি। বিচারার্থ- মুপসংহরতি-তন্মাদিতি। বিদ্যাসংযুক্তস্যাপি কর্মণো মোক্ষারম্ভকত্বাসংভবস্তচ্ছব্দার্থঃ। মা ভূৎ কৰ্ম্মণাং মোক্ষার্থত্বং, কিং তাবতেত্যাশঙ্ক্য ব্রাহ্মণারম্ভং নিগময়তি-অত ইতি।
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর, ভুজ্যুনামক লাহ্যায়নি(লহের পুত্র) প্রশ্ন করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় ব্রাহ্মণে গ্রহ ও অতিগ্রহাত্মক বন্ধনের কথা বলা হইয়াছে; গ্রহাতিগ্রহাত্মক যে বন্ধন ও তৎপ্রযোজক কর্ম্ম হইতে মুক্ত হইয়া জীব মুক্তিলাভ করিয়া থাকে, এবং যাহা দ্বারা আবদ্ধ হইয়া সংসারী হইয়া থাকে, তাহাই প্রকৃত মৃত্যু বা মৃত্যুর নিদান; যেহেতু মৃত্যুরও মৃত্যু থাকা যুক্তি- সিদ্ধ, সেই হেতু পূর্ব্বোক্ত গ্রহাতিগ্রহাত্মক মৃত্যু হইতেও জীবের বিমুক্তিলাভ সম্ভবপর হয়। মুক্ত পুরুষের অন্য কোনও লোকান্তরে গতি হয় না এবং প্রদীপ
নির্ব্বাপিত হইলে যেমন তাহার নাম ভিন্ন আর কিছুই থাকে না, তেমনি মুক্ত পুরুষেরও অপর সমস্তই বিনষ্ট হইয়া যায়, কেবল নামমাত্র অবশিষ্ট থাকে, এ সমস্ত বিষয় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণেই অবধারিত হইয়াছে। অধিকন্তু, দেহেন্দ্রিয়াদি সাধন- সমুদয়ের নিজ নিজ কারণে বিলীন হওয়া সংসারী ও মোক্ষ্যমাণ(দেহপাতের পর যাহাদের মুক্তি হইবে, তাহারা), উভয়ের পক্ষে সমান হইলেও মুক্ত পুরুষ- দিগকে আর কখনও শরীর ধারণ করিতে হয় না; কিন্তু সংসারীদিগকে তাহা করিতে হয়; যাহার প্রেরণায় শরীর ধারণ করিতে হয়, তাহা যে কৰ্ম্ম ভিন্ন আর কিছুই হইতে পারে না, ইহাও বিচারপূর্ব্বক সেখানেই অবধারিত হইয়াছে, এবং সেই কর্মের ক্ষয় হইলে পর যে, নামমাত্র অবশিষ্ট থাকায় দেহেন্দ্রিয়াদি-সর্ব্বধর্ম্মের উচ্ছেদাত্মক মোক্ষ নিষ্পন্ন হয়, এ কথাও ব্যবস্থাপিত হইয়াছে। ১
সংসার-প্রবেশের কারণীভূত সেই কর্ম্মের নাম হইতেছে-পুণ্য ও পাপ, কারণ, “পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কৰ্ম্মণা ভবতি, পাপঃ পাপেন” এই শ্রুতিতে ঐরূপ অর্থই অবধারিত হইয়াছে। সেই পুণ্যপাপাখ্য কৰ্ম্মই জীবের সংসার-সমুৎপাদন করিয়া থাকে। তন্মধ্যে বিশেষ এই যে, যাহারা পাপ কৰ্ম্ম করে, তাহারা সেই পাপের ফলে স্থাবরজঙ্গমাদি দেহে, অথবা স্বভাবতঃ দুঃখবহুল নারকী, পশু-পক্ষী ও প্রেতযোনিতে বারংবার জন্ম ও মরণ-দুঃখ ভোগ করিয়া থাকে, ইহা রাজমার্গের ন্যায় অর্থাৎ রাজপথ যেমন সর্ব্বলোকের পরিজ্ঞাত, ইহাও ঠিক তেমনি সর্ব্বলোকের নিকট সুপরিচিত। যাহা শাস্ত্রোক্ত পুণ্য কৰ্ম্ম, “পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কৰ্ম্মণা ভবতি” শ্রুতিতে যাহার প্রশংসা রহিয়াছে, স্বয়ং শ্রুতিও তদ্বিষয়েই আদর প্রদর্শন করিতেছেন। আর সমস্ত শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্র সমস্বরে বলিতেছেন যে, পুণ্য- কৰ্ম্মই পুরুষের সর্ব্ববিধ অভীষ্ট সিদ্ধির উপায়; মোক্ষও যখন পুরুষার্থ-পুরুষের একান্ত অভীষ্ট, তখন বুঝা যাইতেছে যে, তাহাও পুণ্য কৰ্ম্ম দ্বারাই সিদ্ধ হইবার যোগ্য; অতএব, যে পরিমাণে পুণ্যের উৎকর্ষ সিদ্ধ হইবে, সেই পরিমাণেই তৎ- ফলেরও উৎকর্ষ সম্পন্ন হইবে; ইহা হইতে আশঙ্কা হইতে পারে যে মোক্ষফলও পুণ্যের চরম উৎকর্ষ-সাধন দ্বারাই লাভ করিতে হইবে; এখন সেই আশঙ্কা নিবারণ করা আবশ্যক হইতেছে।[সেই জন্য বুঝাইতে হইবে যে,] কৰ্ম্ম যতই উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত হউক না কেন, অধিক কি, জ্ঞানসহযোগে অনুষ্ঠিত হইলেও তাহার ফল কখনই পরিচ্ছিন্ন বৈ অপরিচ্ছিন্ন হইতে পারে না; কেন না, কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্মফল স্থল জগতের উপরই সম্ভবপর হয়, কিন্তু নামরূপ-বিবর্জিত এবং ক্রিয়া কারক ও
৭৭৭
ফলভাবরহিত অনভিব্যক্ত নিত্য বস্তু বিষয়ে কর্ম্মের কোনও অধিকার নাই, অর্থাৎ কৰ্ম্ম দ্বারা কখনই নিত্য ফল লাভ করা যায় না।[বুঝিতে হইবে,] যাহার উপর কর্ম্মের ব্যাপার বা কার্যকারিতা সম্ভব হয়, তাহা সংসার ভিন্ন আর কিছুই নহে। এই সমস্ত বক্তব্য বিষয় প্রদর্শনার্থ এই তৃতীয় ব্রাহ্মণ আরব্ধ হইতেছে। ২
কোন কোন পণ্ডিত বলিয়া থাকেন—ফলানুসন্ধান না করিয়া(নিষ্কাম ভাবে) অথবা জ্ঞানসহযোগে অনুষ্ঠিত কর্ম্মও বিষ ও দধিপ্রভৃতি বস্তুর ন্যায়(১) ভিন্ন ফল সমুৎপাদন করিয়া থাকে; সে কথাও হইতে পারে না; যে হেতু মোক্ষ কোনও কর্ম্মেরই ফল নহে; কেন না, জীবের অজ্ঞান-কল্পিত বন্ধন-চ্ছেদনই মোক্ষ, তাহা কস্মিন্ কালেও কার্য্য বা জন্য পদার্থ হইতে পারে না; আর জীবের বন্ধন যে, অবিদ্যা-কল্পিত মিথ্যা অবস্তুমাত্র, এ কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। কর্ম্ম দ্বারা কখনও সেই অবিদ্যার বিনাশ করা সম্ভবপর হয় না, বা হইতে পারে না; বিশেষতঃ প্রত্যক্ষসিদ্ধ উৎপত্ত্যাদি বিষয়েই কর্ম্মের সামর্থ্য বা অধিকার দেখিতে পাওয়া যায়;[সুতরাং অবিদ্যানিবৃত্তিরূপ মোক্ষ কর্ম্ম-সাধ্য হইতেই পারে না।] কেন না, উৎপত্তি, প্রাপ্তি, বিকার ও সংস্কারসাধনেই কর্ম্মের(ক্রিয়ার) শক্তি পরিচ্ছিন্ন(সীমাবদ্ধ);—সাধারণতঃ কোন বিষয় উৎপাদন করিতে, এক বস্তুর সহিত অপর বস্তুকে সংযোজিত করিতে, একাকার বস্তুকে অন্যাকারে পরিণত করিতে(বস্তুর বিকার ঘটাইতে) কিংবা বস্তুবিশেষের দোষাপনয়ন বা গুণাধান করিতে কর্ম্মের যথেষ্ট ক্ষমতা আছে, কিন্তু এতদতিরিক্ত কোনও বিষয়ে কর্ম্মের সামর্থ্য নাই, এবং তাহা লোকপ্রসিদ্ধও নহে। আলোচ্য মোক্ষপদার্থ ত উক্ত উৎপত্তি প্রভৃতির অন্তর্গত নহে; কারণ, মোক্ষ যে জীবের স্বাভাবিক ধর্ম্ম, এবং কেবল অজ্ঞানে আচ্ছাদিত হইয়া অপ্রাপ্তবৎ প্রতীত হয় মাত্র; একথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। ৩
(১) তাৎপর্য্য—‘বিষ, ও দধি প্রভৃতির ন্যায়’ কথার অভিপ্রায় এইঃ—বিষ যে প্রকারই হউক না কেন, মৃত্যুসাধন করাই তাহার কার্য্য; কিন্তু সেই বিষই আবার বস্তুবিশেষের সংযোগে অমৃতময় রসায়নে পরিণত হইয়া মৃত্যু নিবারণ করিয়া থাকে। দধিও সাধারণতঃ শ্লেষ্মাদি বৃদ্ধি করিয়া দেহের অনিষ্ট সাধন করিয়া থাকে; কিন্তু শর্করাদি বস্তুবিশেষ সহযোগে সেবন করিলে সেই দধিই আবার দেহের বিশেষ পুষ্টিসাধন করিয়া থাকে। এইরূপ শাস্ত্রোক্ত যাগযজ্ঞাদিক্রিয়ানিচয় সাধারণতঃ জীবের বন্ধনকর হইলেও নিষ্কামভাবে অনুষ্ঠান করিলে তাহাই আবার জীবের সর্ব্বকল্যাণকর মুক্তির সাধন হইতে পারে।
[বাদী এতদুত্তরে বলিতেছেন] হাঁ, তোমার কথা আংশিক সত্য বটে; কিন্তু সর্ব্বতোভাবে স্বীকার্য্য নহে। কেননা, জ্ঞানরহিত কর্মেরই ঐরূপ স্বভাব, কিন্তু জ্ঞানসহকারে অনুষ্ঠিত ফলাকাঙ্ক্ষারহিত নিষ্কাম কর্মের স্বভাব অন্যপ্রকার; কেন না, বিষ ও দধি প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থের সচরাচর যেরূপ শক্তি বা কার্য্য- কারিতা লোকপ্রসিদ্ধ আছে, সেই সমস্ত দধি-বিষাদি পদার্থও যখন বিদ্যা, মন্ত্র ও শর্করাদি পদার্থান্তরের সহিত সম্মিলিত হয়, তখন তাহাদেরই অন্যপ্রকার ক্রিয়াশক্তি দেখিতে পাওয়া যায়; কর্ম্মের সম্বন্ধেও সেইপ্রকার হউক; না— একথাও বলিতে পার না; কারণ, এ বিষয়ে কোনও প্রমাণ নাই। উৎপত্তি প্রভৃতি যে চারিটি বিষয়ে কর্ম্মের সামর্থ্য প্রদর্শিত হইয়াছে, তদতিরিক্ত বিষয়েও যে, তাহার সামর্থ্য আছে, বা থাকিতে পারে, তদ্বিষয়ে প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপ- মান, অর্থাপত্তি(১) অথবা আগম—কোন প্রমাণই নাই। ৪
ভাল, জিজ্ঞাসা করি, বিদ্যাসহকারে অনুষ্ঠিত নিষ্কাম কর্ম্মের যদি অন্য কোন ফল না-ই থাকে, তাহা হইলে ত তাহার বিধান করাই নিষ্ফল হইয়া পড়ে, ইহাই কি এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ নহে? দেখ, শাস্ত্রবিহিত নিত্যকর্মগুলির ‘বিশ্বজিৎ’ যাগের ন্যায়(২) ফলকল্পনা করা যাইতে পারে না, এবং বিধিবাক্যেও কোন ফলের উল্লেখ দেখা যায় না; অথচ সেই নিত্য কর্মগুলিরও শাস্ত্রে বিধান
৭৭৯
রহিয়াছে; সুতরাং ‘পরিশেষ’ নিয়মানুসারে(১) বুঝা যায় যে, মোক্ষই সে সমস্ত কর্ম্মের(নিত্যকর্ম্মের) একমাত্র ফল; তাহা না হইলে—কোনরূপ ফল না থাকিলে কোন পুরুষই সে সমস্ত কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইত না। ৫
ভাল কথা, তাহা হইলে ত সেই ‘বিশ্বজিৎ’ ন্যায়ই আসিয়া পড়িল; যেহেতু তোমাকেও নিরুপায় হইয়া মোক্ষ-ফল কল্পনা করিতে হইতেছে; কেন না, ‘শ্রুতার্থাপত্তি’ প্রমাণ বলে(২) যদি ‘বিশ্বজিৎ’ যজ্ঞের ন্যায় নিত্যকর্ম্মেও মোক্ষ কিংবা তদনুরূপ কোনও ফলবিশেষের কল্পনা না করা যায়, তাহা হইলে তদ্বিষয়ে লোকের প্রবৃত্তিই হইতে পারে না; এইরূপেই যদি ফলবিশেষ কল্পনা করিতে হয়, তবে আর ‘বিশ্বজিৎ ন্যায়’ হইতেছে না বলিতেছ কিপ্রকারে? অশ্রুত ফলেরও কল্পনা করা হইতেছে, অথচ ‘বিশ্বজিৎ’ যাগের মতও হইতেছে না, ইহা ত বিরুদ্ধ কথা হইতেছে। যদি বল, মোক্ষ প্রকৃতপক্ষে ফলই নহে; না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, তাহা বলিলে তোমার পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞা রক্ষা পায় না; প্রথমে তুমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছ যে, বিষ ও দধিপ্রভৃতির ন্যায় কৰ্ম্মও বিদ্যাসহযোগে অনুষ্ঠিত হইলে স্বতন্ত্র একপ্রকার ফল সমুৎপাদন করিয়া থাকে; এখন সেই মোক্ষ যদি কৰ্ম্ম-ফলই না হয়, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তোমার পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞা ব্যাহত হইয়া পড়িতেছে। পক্ষান্তরে, মোক্ষকে কৰ্ম্ম-ফল বলিলেও, স্বর্গাদি ফল হইতে মোক্ষফলের বৈলক্ষণ্য কতটুকু, তাহা নির্দেশ করা আবশ্যক হইতেছে। ৬
তুমি যে, বলিয়াছ—মোক্ষ নিত্যকর্ম্মের ফল বটে, কিন্তু তাহা কোন ক্রিয়া-জন্য নহে। তোমার এ কথাটির অর্থ কি, তাহা বলিতে হইবে। কেবল, ‘কার্য্য’ ও ‘ফল’ এই শব্দগত প্রভেদ দ্বারা অর্থগত কোনও প্রভেদ কল্পনা করিতে পারা যায় না; কেন না, ‘অগ্নি শীতল’ এ কথা যেরূপ বিরুদ্ধার্থ-প্রতিপাদক, মোক্ষ
(১) তাৎপর্য্য—‘পরিশেষ’ নিয়মটি এই প্রকারঃ—যতগুলি বিষয়ের প্রাপ্তিসম্ভাবনা থাকে, তন্মধ্যে অপর সমস্তগুলির প্রাপ্তি নিষিদ্ধ হইয়া গেলে যে, ফলে অবশিষ্ট বিষয়টির প্রাপ্তি, এই রকমে প্রাপ্তিকল্পনাকে ‘পরিশেষ’ ন্যায় বা ‘পারিশেষ্য’ বলে।
(২) তাৎপর্য্য—শ্রুতার্থাপত্তিও অর্থাপত্তি প্রমাণেরই একটি প্রভেদ মাত্র। কোন শব্দ শ্রবণ করিলে পর, তাহার অর্থসঙ্গতির অনুরোধে যদি ঐ শব্দের অপেক্ষিত কোনও অশ্রুত পদার্থ কল্পনা করিয়া লইতে হয়, তাহা হইলে তাহাকে শ্রুতার্থাপত্তি বলা হয়। যেমন—‘দ্বারং” বলিলে তদাকাঙ্ক্ষিত ‘পিধেহি’ ক্রিয়া উহ্য করিয়া লইতে হয়, তেমনি কৰ্ম্ম শ্রুতিতে ফলের উল্লেখ না থাকিলে, তদুপযুক্ত কোন একটি ফলবিশেষ কল্পনা করিয়া লইতে হয়। এখানেও নিত্যকর্মগুলির কোন ফলোল্লেখ না থাকিলেও যে, অবিশেষে মোক্ষ-ফল কল্পনা করা, তাহাও উক্ত শ্রুতার্থাপত্তিরই বিষয়।
কোন ক্রিয়ার ফল নয়, অথচ নিত্য কর্মদ্বারা নিষ্পন্ন হয়, অর্থাৎ মোক্ষ নিত্যকর্মের ফল বটে, কিন্তু নিত্যকর্ম হইতে জন্মে না,—ইত্যাদি কথাও ঠিক তদ্রূপই বিরুদ্ধার্থ-প্রতিপাদক হইতেছে। ৭
যদি বল, জ্ঞানের ন্যায় ইহারও উপপত্তি হইতে পারে-যেমন জ্ঞান দ্বারা মোক্ষের উৎপত্তি না হইলেও, মোক্ষকে জ্ঞানের ফল বলিয়া গ্রহণ করা হইয়া থাকে, ‘কৰ্ম্ম-কার্য্য’ কথাটিও ঠিক সেইরূপই হইতে পারে। না-একথা বলিতে পার না; কারণ, সেখানে জ্ঞান দ্বারা মোক্ষ-প্রতিবন্ধক অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়, অজ্ঞানরূপ প্রতিবন্ধকের নিবৃত্তি সাধন করে বলিয়াই মোক্ষকে জ্ঞানের কার্য্য বা জ্ঞান-ফল বলিয়া নির্দেশ করা হইয়া থাকে; কিন্তু কৰ্ম্ম দ্বারা ত আর সে অজ্ঞানের নিবৃত্তি হইতে পারে না; অথচ অজ্ঞান ভিন্ন আর কিছুই মোক্ষের প্রতিবন্ধক বলিয়াও কল্পনা করিতে পারা যায় না, যাহা কর্মদ্বারা নিবারিত হইতে পারে; কারণ, মোক্ষ নিত্যসিদ্ধ, এবং উহা সাধকের(মুমুক্ষুর) আত্মরূপ ভিন্ন স্বতন্ত্র নহে। ৮
যদি বল, কৰ্ম্ম কেবল অজ্ঞানেরই ধ্বংস সাধন করে মাত্র,(আর কিছুই করে না)। না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে যথেষ্ট বৈলক্ষণ্য রহিয়াছে। দেখ, অজ্ঞান হইতেছে আত্মস্বরূপের অনভিব্যক্তি, আর জ্ঞান হইতেছে তাহার অভিব্যক্তি বা স্ফুটপ্রতীতি; সুতরাং অনভিব্যক্তিরূপ অজ্ঞানের সহিত অভিব্যক্তিরূপ জ্ঞান স্বতই বিরুদ্ধ; কিন্তু কৰ্ম্ম কখনও অজ্ঞানের বিরোধী নহে; কাজেই জ্ঞান ও কৰ্ম্ম একরূপ নহে, পরন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নপ্রকৃতি। পক্ষান্তরে অজ্ঞানকে যদি জ্ঞানের অভাব, সংশয়জ্ঞান, কিংবা বিপরীতজ্ঞান(ভ্রম) বলিয়াই স্বীকার কর, সকল প্রকারেই কেবল জ্ঞান দ্বারাই সেই অজ্ঞানের নিবৃত্তি সম্ভব হয়; কিন্তু কৰ্ম্মদ্বারা নহে; কারণ, যথোক্তপ্রকার অজ্ঞানের মধ্যে কোনটির সঙ্গেই কর্মের বিরোধ নাই। ৯
যদি বল, কর্ম্মে যে, অজ্ঞান-নিবৃত্তি করে, ইহা অন্যত্র দৃষ্ট না হইলেও, নিত্য- কর্ম্মের সম্বন্ধে সেরূপ শক্তি কল্পনা করিব। না, সেরূপ কল্পনাও করিতে পার না; কারণ, জ্ঞানদ্বারা অজ্ঞাননিবৃত্তি যখন লোকপ্রসিদ্ধ এবং অনুভবগম্যও বটে, তখন নূতন করিয়া কর্ম্মকেও নিবৃত্তি-সাধন বলিয়া কল্পনা করা সমুচিত হয় না। উদাহরণ— যেমন ‘ব্রীহীন্ অবহস্তি’ এই শ্রুতিতে ধান্যে মুষল-প্রহারের বিধান আছে, সেখানে ধান্যের তুষনিবৃত্তিরূপ দৃষ্টফল সত্ত্বেও, মুষল-প্রহারের আর অদৃষ্ট ফল কল্পনা করা হয় না,(তেমনি এখানেও অজ্ঞাননিবৃত্তিকে অদৃষ্টফল বলিয়া কল্পনা করিতে
পার না)। জ্ঞান যে, অজ্ঞানের বিরোধী, এ কথা আমরা অনেকবার বলিয়াছি। আর ‘বিদ্যাপ্রভাবে(জ্ঞানদ্বারা) দেবলোক লাভ হয়’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য হইতেও জানা যায় যে, যে সমস্ত জ্ঞান বা উপাসনা কর্ম্মের সহিত বিরুদ্ধ নহে, উপাসক সে সমস্ত জ্ঞান বা উপাসনা দ্বারা দেবলোকরূপ(স্বর্গলোক) ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ১০
আরও এক কথা, যদি নিত্য কর্মের ফলকল্পনা করিতেই হয়, তাহা হইলেও যাহা কর্মের সহিত বিরুদ্ধ—অর্থাৎ যাহা কখনও দ্রব্য, গুণ বা কৰ্ম্ম হইতে উৎপন্ন হয় না, যে বিষয়ে কস্মিন্কালেও কর্মের উৎপাদন-সামর্থ্য পরিদৃষ্ট হয় না, তাহাই কল্পনা করা উচিত? না, যে বিষয়ে কর্মের সামর্থ্য দৃষ্ট হইয়াছে, অর্থাৎ যেরূপ ফল কর্মের বিরোধী নয়, সেইরূপ ফল কল্পনা করাই উচিত? বলা বাহুল্য যে, অবি- রুদ্ধ ফল কল্পনা করাই যুক্তিসঙ্গত। কর্মানুষ্ঠানে লোকের প্রবৃত্তি-সমুৎপাদনের জন্য যদি কর্মের ফল কল্পনা করিতেই হয়, তাহা হইলেও মোক্ষকে কিংবা মোক্ষ- প্রতিবন্ধক অজ্ঞাননিবৃত্তিকে ফলরূপে কল্পনা করিতে পার না; কারণ, তোমার অভিমত শ্রুতার্থাপত্তি প্রমাণটি কর্মের অবিরুদ্ধ ফল কল্পনা করিয়াই চরিতার্থ (পরিসমাপ্ত) হয়;[সুতরাং তাহার অনুরোধেও কর্মবিরোধী মোক্ষফল কল্পনা করা যাইতে পারে না।] কারণ, উহার সহিত কর্মের কোনরূপ বিরোধ নাই, অথচ উৎপত্যাদি বিষয়েই কর্মের সামর্থ্য প্রত্যক্ষসিদ্ধ,(যথোক্ত বিষয়ে নহে)। ১১
যদি বল, আমরা ‘পারিশেষ্য’ নিয়মানুসারে মোক্ষ-ফল কল্পনা করিব;—সমস্ত কৰ্ম্ম হইতেই সমস্ত ফল উৎপন্ন হইতে পারে; তন্মধ্যে যে সমস্ত বিষয় অন্যান্য কর্ম্মের ফলরূপে ব্যবস্থিত আছে, সেই সমস্ত বিষয়কেই আবার নিত্যকর্মেরও ফলরূপে কল্পনা করা যুক্তিসঙ্গত হয় না। মোক্ষই একমাত্র অবশিষ্ট রহিয়াছে; বেদবিদ্ লোকমাত্রেরই মোক্ষফল বিশেষ প্রিয়; সুতরাং তাহাই নিত্যকর্মের ফলরূপে কল্পনা করিতে হইবে। না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, কর্মের ফল যখন ব্যক্তিগত ভাবে অনন্ত বা অসংখ্য, তখন তৎসম্বন্ধে ‘পারিশেষ্যন্যায়’ প্রযোজ্যই হইতে পারে না। দেখ, যে লোক সর্বজ্ঞ নয়, এমন কোন লোকই বিভিন্ন পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন ইচ্ছানুযায়ী কৰ্ম্মফলের, অথবা তৎসাধন কর্মসমূহের কিংবা পুরুষগত বিভিন্নপ্রকার ইচ্ছার ইয়ত্তা বা পরিমাণ অবধারণ করিতে সমর্থ হয় না; কেন না, যে সমস্ত দেশ- কালাদিরূপ নিমিত্ত অবলম্বন করিয়া কৰ্ম্ম ও তৎফল নিষ্পন্ন হইয়া থাকে, প্রথমতঃ সে সমুদয়ের একটা স্থিরতা নাই; তাহার পর, যে বিষয়ে লোকের
অভিরুচি থাকে, সেই বিষয়ে ও তৎসাধনোদ্দেশ্যেই লোকের ইচ্ছা হইয়া থাকে। প্রত্যেক প্রাণীতে বিভিন্ন প্রকার রুচি অনুসারে ইচ্ছাও অনেকপ্রকার হইয়া থাকে; কাজেই ফল ও ফলসাধন কর্ম্মের আনন্ত্য সিদ্ধ হইতেছে; আনন্ত্য নিবন্ধনই তাহার পরিমাণ বা সংখ্যা পুরুষ-পরিগণনার বিষয় হইতে পারে না; ফল ও তৎসাধনেরই যদি পরিমাণ অবধারিত না হইল, তবে আর মোক্ষ-ফলে পারিশেষ্য সিদ্ধ হইবে কি প্রকারে?। ১২
যদি বল, কর্মফলের ব্যক্তিগত পরিমাণ নির্দিষ্ট না থাকিলেও তাহার জাতিগত বা সমাষ্টগত পরিমাণ ধরিয়া পারিশেষ্য-নিয়ম নির্দেশ করিতে পারা যায়। অভি- প্রায় এই যে, ইচ্ছার বিষয়(অভীষ্ট কৰ্ম্মফল) ও তৎসাধনসমূহ অনন্ত হইলেও কর্মফলত্বরূপ জাতিটি সর্ব্বত্রই তুল্য বা সমান;[সুতরাং কর্মফলত্বরূপে সমস্ত বিষয়ই পরিগণিত হইতেছে,] একমাত্র মোক্ষই অবশিষ্ট রহিয়াছে; কারণ, উহা অপর কোনও কর্মের ফলরূপে কল্পিত হয় নাই; অতএব অবশিষ্ট থাকায়(পারিশেষ্য নিয়মানুসারে) মোক্ষকেই নিত্যকর্মের ফলরূপে কল্পনা করা যুক্তিযুক্ত হইতেছে। না—উহাকেও নিত্যকর্মের ফল বলিয়া স্বীকার করিলে, তাহাও কর্মফলেরই সজাতীয় হওয়া উচিত; সুতরাং এমতেও পারিশেষ্য নিয়ম সিদ্ধ হইতেছে না। অতএব প্রকারান্তরেও যখন নিত্যকর্মের সাফল্য রক্ষা করিতে পারা যায়, তখন তাহাতেই ‘শ্রুতার্থাপত্তি’ চরিতার্থতা লাভ করিবে, অর্থাৎ উৎপত্তি, প্রাপ্তি, বিকার ও সংস্কার, এই চতুর্বিধ ফলের যে কোন একটি ফল নিত্যকর্মের সম্বন্ধেও সম্ভবপর হইতে পারে;(১) সুতরাং শ্রুতার্থাপত্তিরও সার্থকতা ব্যাহত হইতেছে না। ১৩
যদি বল, মোক্ষই উক্ত চতুর্বিধ ফলের অন্যতম ফল। না, তাহাও বলিতে পার না; কেননা, মোক্ষ যখন নিত্য, তখন উহা উৎপাদ্য হইতে পারে না; এই
৭৮৩
জন্যই উহা বিকার্য্য(বিকৃত হইবার যোগ্য) বা সংস্কার্যও হইতে পারে না। যাহা ক্রিয়াসাধ্য দ্রব্য, তাহারই বিকার ও সংস্কার হইতে পারে, যেমন যজ্ঞীয় পাত্র ও ঘৃতাদি দ্রব্য জলপ্রোক্ষণাদির দ্বারা সংস্কারসম্পন্ন হয়, ইহা ত তেমন নহে, যজ্ঞীয় এবং যুপাদির ন্যায় সংস্কারাইও নহে; কাজেই মোক্ষকে অবশিষ্ট প্রাপ্য ফল বলিয়া গ্রহণ করিতে পারা যায়; না-মোক্ষ প্রাপ্যও হইতে পারে না; কারণ, উহা আত্মার স্বভাবসিদ্ধ এবং অভিন্নাত্মক। যদি বল, নিত্য কর্মগুলি যখন অপরা- পর কৰ্ম্ম অপেক্ষা ভিন্নপ্রকৃতি, তখন তাহার ফলেও কিঞ্চিৎ বৈলক্ষণ্য থাকা অনুচিত হয় না; না-সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, কৰ্ম্মত্ব ধৰ্ম্ম যখন সকল কর্মেরই সমান, তখন তাহার ফলও অপরাপর কর্মফলের তুল্যস্বভাবই বা হইবে না কেন? যদি বল, নিত্য কর্মরূপ নিমিত্ত বা কারণের বৈলক্ষণ্য নিবন্ধন তাহার ফলেও বৈলক্ষণ্য হওয়াই ন্যায্য; আমরা বলি, না-তাহা হইতে পারে না; কারণ, ‘ক্ষামবতী’ কর্ম্মের(যাগের) সঙ্গে ইহার যথেষ্ট বৈলক্ষণ্য রহিয়াছে,-যেমন গৃহদাহাদি নিমিত্ত উপস্থিত হইলে ‘ক্ষামবতী’ নামক ইষ্টি(যাগ) করিতে হয়। যেমন-‘যজ্ঞপাত্র ভাঙ্গিলে হোম করিতে হয়’, ‘স্কন্ন হইলে(ফাট ধরিলে) হোম করিতে হয়’ ইত্যাদি। এই জাতীয় নৈমিত্তিক কর্মের স্থলে যেমন কেহই মোক্ষফল কল্পনা করে না, তেমনি নিত্যকর্মগুলিও যাবজ্জীবনের জন্য বিহিত বলিয়া নৈমিত্তিক কর্মের তুল্যরূপ; সুতরাং তাহারও ফল মোক্ষ হইতে পারে না। ১৪
অপিচ, নীলপীতাদি কোনপ্রকার রূপ দেখিতে হইলেই আলোকের আবশ্যক হয়; আলোকই সকলের পক্ষে রূপ-দর্শনের সাধারণ উপায়; কিন্তু পেচক প্রভৃতি এমন কতগুলি প্রাণী আছে, যাহারা রূপদর্শন কালে আলোকের সাহায্য অপেক্ষা করে না; কারণ, পেচকাদির চক্ষু আর অপর সকল প্রাণির চক্ষু একপ্রকার নহে,— উহাদের মধ্যে যথেষ্ট বৈলক্ষণ্য আছে; বৈলক্ষণ্য আছে বলিয়াই পেচক রূপ গ্রহণ করে না; কিন্তু তা বলিয়াই যে, পেচকাদির চক্ষু রসাদি গুণ গ্রহণ করে, এরূপ ত কল্পনা করিতে পারা যায় না; কারণ, রসাদি-গ্রহণ বিষয়ে চক্ষুর সামর্থ্য কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না; অতএব কল্পনার সাহায্যে যতদূরই যাওয়া যাউক না কেন, যাহার যে বিষয়ে সামর্থ্য বা কার্যকারিতা দৃষ্ট হইয়াছে, তাহার সেই বিষয়েই কোনপ্রকার বিশেষ শক্তি কল্পনা করিতে হইবে,(অভিনব কল্পনা করিলে চলিবে না)। ১৫
আরো যে, বলিয়াছ—দধি ও বিষ যেরূপ বিদ্যা, মন্ত্র ও শর্করাদির সহযোগে
অন্যপ্রকার ফল প্রদান করে, তদ্রূপ নিষ্কামভাবে অনুষ্ঠিত নিত্য কর্মগুলিও স্বতন্ত্র ফল প্রদান করিবে। ভাল, স্বতন্ত্র ফল প্রদান করে, করুক; উহা যদি ঈপ্সিত ফল হয়, তাহাতে কোন আপত্তি নাই। নিষ্কাম কর্মগুলি বিদ্যা বা উপাসনার সহযোগে অনুষ্ঠিত হইয়া বিশিষ্ট ফল জন্মাইলেও কোন ক্ষতি নাই; কারণ, শাস্ত্রে দেবযাজী (দেবতার উপাসক) ও আত্মযাজী(আত্মার উপাসক), এতদুভয়ের মধ্যে আত্মযাজীর শ্রেষ্ঠতা উক্ত আছে; যথা, ‘দেবযাজী অপেক্ষা আত্মযাজী শ্রেষ্ঠ’ এবং ‘বিদ্যাসহকারে যাহা করে, তাহাই উত্তম’ ইত্যাদি। ১৬
তবে মনু যে, পরমাত্মদর্শন বিষয়ে “সমং পশ্যন্ আত্মযাজী” এই বাক্যে ‘আত্ম- যাজী’ শব্দের প্রয়োগ করিয়াছেন, তাহার অর্থ—সর্ব্বভূতে সমতা দর্শনকারী লোক ‘আত্মযাজী’ নামে উক্ত হয়; অথবা ভূতপূর্ব্ব গতি অনুসারে অর্থাৎ সাধকের পূর্ব্বা- বস্থা ধরিয়া লইলেও এরূপ অর্থ করা যাইতে পারা যায় যে, যিনি আত্মশুদ্ধির জন্য নিত্যকর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন,(তিনি আত্মযাজী); কারণ, শ্রুতি বলিয়াছেন ‘এই নিত্যকর্ম্মের দ্বারা আমার অঙ্গ সংস্কৃত(বিশোধিত) হইতেছে’, এবং স্মৃতিশাস্ত্রও ‘গর্ভাধানাদি সংস্কার দ্বারা’ ইত্যাদি প্রকরণে দেহেন্দ্রিয়াদি- গত সংস্কারের জন্যই নিত্যকর্ম্মের উপযোগিতা প্রদর্শন করিতেছে। ঐরূপে সংস্কৃত বা পরিশোধিত হইয়া, যে আত্মযাজী সেই সমস্ত কর্মানুষ্ঠানের ফলে সর্ব্বত্র সমদর্শন করিতে সমর্থ হন, তাঁহার ইহ জন্মেই হউক বা পর জন্মেই হউক, সর্ব্ববিধ বৈষম্যবর্জিত আত্মদর্শন সম্পন্ন হইয়া থাকে এবং ঐরূপ সমদর্শন করিলেই স্বারাজ্য(মুক্তি) লাভের অধিকারী হয়। জ্ঞানসহযোগে অনুষ্ঠিত নিত্যকৰ্ম্ম যে, আত্মজ্ঞানলাভের উপায় বা সাধন, সেই অভিপ্রায় প্রকাশনার্থই ভূতপূর্ব্ব গতি(যাহা পূর্ব্বে হইয়া গিয়াছে, সেই অবস্থা) অবলম্বন করিয়াও ‘আত্মযাজী’ শব্দের প্রয়োগ হইতে পারে। ১৭
আরও এক কথা,—‘মনীষিগণ বলিয়া থাকেন যে, ব্রহ্মা, বিশ্বস্রষ্টা, ধৰ্ম্ম(যম), মহান্(মহৎ-তত্ত্বাভিমানী হিরণ্যগর্ভ) ও অব্যক্ত(প্রকৃতিতে লয়প্রাপ্ত), ইহারা সকলে সাত্ত্বিক কর্ম্মের উৎকৃষ্ট ফল’, ‘এবং নিষ্কাম কর্ম্মে পঞ্চভূত প্রাপ্ত হয়’ ইত্যাদি শাস্ত্রবাক্যগুলি ইন্দ্রাদি-দেবতার প্রাপ্তি ছাড়া পঞ্চভূতে বিমিশ্রণকেও নিষ্কাম কর্ম্মের ফল বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। ‘ভূতানি অপ্যেতি’র স্থলে, যাহারা ‘ভূতানি অত্যেতি’ পাঠ পরিকল্পনা করিয়া কর্ম্ম হইতেও মুক্তিফল-প্রাপ্তি সমর্থন করেন; বুঝিতে হইবে, বেদবিষয়ে তাহাদের বুদ্ধি বড় অল্প; সুতরাং তাহাদের অল্পবুদ্ধি-প্রসূত অসৎ কল্পনা দোষাবহ বলিয়া গ্রাহ্য নহে,(উহা উপেক্ষণীয়)। ১৮
৭৮৫.
আর এই ‘ভূতাপ্যয়’ বাক্যটি যে, অর্থবাদ—নিরর্থক বাক্য, তাহাও নহে; কারণ, যে অধ্যায়ে এই বচনটি সন্নিবিষ্ট আছে, সেই অধ্যায়ে কেবল দুইটি মাত্র বিষয়ের উল্লেখ আছে—একটি হইতেছে কর্মফলের শেষ সীমা—ব্রহ্মপদ প্রাপ্তি, আর অপরটি হইতেছে কর্মসম্বন্ধ-রহিত আত্মজ্ঞান; সুতরাং উক্ত দুইটি বিষয় যথাক্রমে কর্মকাণ্ডোক্ত ও উপনিষদুক্ত বিষয়ের সহিত তুল্য এবং অবিরুদ্ধ। বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান না করায়, এবং নিষিদ্ধ কর্মের সেবা করায় ফলতঃ স্থাবর, কুকুর ও শূকরাদি যোনিতে জন্মধারণ করিতে হয়;(১) এবং বাস্তভোজী একপ্রকার প্রেতদেহও দেখিতে পাওয়া যায়;[সুতরাং ঐ সমস্ত বাক্যকে ‘অর্থবাদ’ বলিয়া উপেক্ষা করিতে পারা যায় না]। ১৯
বিশেষতঃ শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত বিহিত ও নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম ছাড়া অন্যপ্রকার যে, বিহিত বা নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম আছে, তাহা কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না, যে সকলের অকরণে ও করণে প্রেত-শূকরাদিভাবপ্রাপ্তিরূপ নিকৃষ্ট ফল প্রত্যক্ষতঃ বা অনুমানের সাহায্যে অনুভব করা যাইতে পারে। আর পূর্ব্বোক্ত প্রেত শূকরাদি ভাব যে, কর্মফলই নয়, একথাও কেহ স্বীকার করে না; অতএব উক্ত প্রেত, পশুপক্ষী ও স্থাবরাদিভাব যেরূপ বিহিত কর্ম্মের অকরণ ও প্রতি- ষিদ্ধ কর্মাচরণের ফল, উৎকৃষ্ট ব্রহ্মাদিপদ-প্রাপ্তিও ঠিক তদ্রূপই কর্মফল বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। এই কারণেই ‘তিনি আপনার বপা(হৃদয়ের মেদ) কাটিয়া দিয়াছিলেন’, এবং ‘তিনি রোদন করিয়াছিলেন’ ইত্যাদি বাক্যের ন্যায় উক্ত “ভূতানি অপ্যেতি পঞ্চ বৈ” ইত্যাদি বাক্যকেও অযথার্থবাদী অর্থবাদ বলিতে পারা যায় না। ২০
যদি বল, এখানে যদি অভূতার্থবাদ না হয়, তবে কর্ম্ম-বিপাকপ্রকরণোক্ত
৫.
কথাগুলিও অভূতার্থবাদ(সত্যবাদ) না হউক? ভাল কথা,-না হয়, না হউক; শুধু সে কথায় ত আর অত্রত্য যুক্তির বাধা হইতে পারে না, কিংবা আমাদের অবলম্বিত পক্ষেরও(সিদ্ধান্তেরও) কোন দোষ ঘটিতে পারে না। তাহার পর, “ব্রহ্মা বিশ্বসৃজঃ” ইত্যাদি বাক্যোক্ত ব্রহ্মাদিভাব প্রাপ্তিকে কাম্য কর্মের ফল বলিয়াও কল্পনা করিতে পারা যায় না; কেন না, সেখানে দৈবসৃষ্টিই সেই সকল কাম্য কর্মের ফল বলিয়া অভিহিত হইয়াছে; অতএব বলিতে হইবে যে, যাহারা সাভিসন্ধি-কৰ্ম্মফলের অভিলাষী, তাহাদের অনুষ্ঠিত নিত্য কর্মের ও সর্ব্বমেধ-অশ্বমেধাদি কাম্য কর্মের ফল হয়-ব্রহ্মপদ-প্রাপ্তিপ্রভৃতি, আর যাহারা ফলাভিলাষরহিত-কেবল চিত্তশুদ্ধির জন্য নিত্যকর্মানুষ্ঠান করিয়া থাকেন, তাহাদের সেই সমস্ত নিত্যকর্ম হইতে তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়; কারণ, স্মৃতিশাস্ত্রে আছে-‘নিত্যকর্মের অনুষ্ঠান দ্বারা শরীরকে ব্রহ্মোপলব্ধির যোগ্য করিয়া থাকেন’ ইত্যাদি। সেই সমস্ত নিত্য কৰ্ম্মও পরম্পরা সম্বন্ধে মুক্তিলাভেরই সাহায্য করিয়া থাকে; এই জন্য সে সমুদয় কর্মকেও ‘মুক্তি-সাধন’ বলিলে কোনও বিরোধ হয় না; ইহাই যে, শাস্ত্রসিদ্ধান্ত, তাহা ষষ্ঠ অধ্যায়ে জনকের আখ্যায়িকা উপলক্ষে প্রদর্শন করিব। ২১
আর যে, বিষ ও দধি প্রভৃতির দৃষ্টান্ত দিয়াছ, তাহাও সঙ্গত হয় নাই; কারণ, উহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ; সুতরাং সে বিষয়ে কোনও বিরোধ বা বিসংবাদ নাই; কিন্তু যাহা একমাত্র শব্দগম্য, সে বিষয়ে তৎপ্রতিপাদক স্পষ্ট শব্দ না থাকিলে, কেবল বিষ ও দধ্যাদির তুলনায় অলৌকিক সামর্থ্য কল্পনা করিতে পারা যায় না। যে বিষয়ে বিরুদ্ধ প্রমাণান্তর রহিয়াছে, সেরূপ বিষয়ে কখনও শ্রুতির প্রামাণ্য কল্পনা করা যায় না; যেমন-‘অগ্নি শীতল ও ক্লেদ জন্মায়’ ইত্যাদি বাক্যের। পক্ষান্তরে, যেরূপ অর্থ-বিশেষে শ্রুতির তাৎপর্য্য স্পষ্টতঃ অবধারিত হয়, সেরূপ অর্থ প্রত্যক্ষাদি-প্রমাণবিরুদ্ধ বলিয়া প্রতিভাত হইলেও সে সমুদয় প্রমাণকে প্রমাণাভাস(যাহা আপাততঃ প্রমাণ বলিয়া মনে হয়, কিন্তু বাস্তবিক প্রমাণ নহে,) বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। যেমন-খদ্যোতকে(জোনাকি পোকাকে) অগ্নি বলিয়া মনে করা হয়, এবং আকাশকে তল ও মলিন বলিয়া জ্ঞান করা হয়। এই জাতীয় যে, অজ্ঞজনের প্রত্যক্ষ, তাহা অনুভবাত্মক হইলেও তদ্বিষয়ে যখন অপরাপর প্রমাণের সত্যতা বা অভ্রান্ততা স্থিরতর রহিয়াছে, তখন পূর্ব্বোক্তপ্রকার অজ্ঞজনের প্রত্যক্ষটি নিশ্চয়াত্মক হইলেও প্রমাণান্তর দ্বারা আভাসীকৃত(অপ্রমাণী- কৃত) হইয়া যায়; অতএব বেদের প্রামাণ্য যখন অব্যভিচারী-অস্বীকার
৭৮৭
করিবার উপায় নাই, তখন যে বাক্যের যেরূপ তাৎপর্য্য নির্ণীত হয়, তাহা সেই- রূপ বলিয়াই স্বীকার করিতে হইবে; সেখানে মানুষের বুদ্ধিকৌশল কাজে লাগে না। লোকের বুদ্ধিকৌশল প্রভাবে স্বয়ং প্রকাশমান সূর্য্যের প্রকাশ যেমন ব্যাহত হয় না, তেমনি লোকবুদ্ধির কল্পনাকৌশলে বেদবাক্যেরও অর্থান্তর সিদ্ধ হয় না। অতএব কোন কর্মই যে, সাক্ষাৎ সম্বন্ধে মোক্ষসাধন নহে, ইহা প্রমাণিত হইল। অতএব কর্মফল যে, সংসারের অতিরিক্ত নহে, পরন্তু সংসারেরই অন্তর্গত, তাহা প্রদর্শন করিবার জন্যই এই পরবর্তী ব্রাহ্মণ(পরিচ্ছেদ) আরব্ধ হইতেছে। অথ হৈনং ভুজ্যুর্লাহ্যায়নিঃ পপ্রচ্ছ যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ। মদ্রেষু চরকাঃ পর্য্যব্রজাম, তে পতঞ্চলস্য কাপ্যস্য গৃহানৈম; তস্যাসীদ্দু হিতা গন্ধর্ব্বগৃহীতা, তমপৃচ্ছাম—কোহসীতি, সোহ- ব্রবীৎ সুধন্বাহহঙ্গিরস ইতি, তং যদা লোকানামন্তানপৃচ্ছামাথৈ- নমক্রম—ক পারিক্ষিতা অভবন্নিতি ক পারিক্ষিতা অববন্, স ত্বা পৃচ্ছামি যাজ্ঞবল্ক্য, ক পারিক্ষিতা অববন্নিতি ॥ ১৬৬ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—অথ(আর্ত্তভাগস্য বিরামানন্তরম্), ভুজ্যুঃ(তন্নামকঃ) লাহ্যায়নিঃ(লহ্যস্য অপত্যম্ লাহ্যঃ, তস্যাপত্যং লাহ্যায়নিঃ) পপ্রচ্ছ(প্রষ্টুং প্রববৃতে)।[প্রবৃত্তশ্চ] হে যাজ্ঞবল্ক্য ইতি[সম্বোধয়ন্] উবাচ(উক্তবান্) হ—[বয়ং কদাচিৎ] চরকাঃ(অধ্যয়নার্থং ব্রতাচরণপরাঃ সন্তঃ) মদ্রেষু(মদ্রদেশে) পর্য্যব্রজাম(পর্য্যটনপরাঃ অভূম)। তে(বয়ং) কাপ্যস্য(কপি-গোত্রস্য) পতঞ্চলস্য(পতঞ্চলনাম্নঃ গৃহস্থস্য) গৃহান্(ভবনং) ঐম(গতবন্তঃ); তস্য (পতঞ্চলস্য) দুহিতা(কন্যা) গন্ধর্ব্বগৃহীতা(গন্ধর্ব্বো নাম দেবযোনিবিশেষঃ, তেন আবিষ্টা) আসীৎ। তং(গন্ধর্ব্বং) অপৃচ্ছাম(পৃষ্টবন্তঃ)—কঃ অসি(ত্বং কিন্নামা কিংস্বরূপশ্চ অসি)? ইতি। সঃ(গন্ধর্ব্বঃ এবং পৃষ্টঃ সন্) অব্রবীৎ(উক্ত- বান্)—আঙ্গিরসঃ(অঙ্গিরোগোত্রোৎপন্নঃ) সুধন্বা(সুধন্বনামা)[অস্মি] ইতি। তং(গন্ধর্ব্বং) যদা লোকানাং(ভুবনানাং) অন্তান্(অবসানানি—সীমানঃ) অ পৃচ্ছাম, অথ(তদা) এনং(গন্ধর্ব্বং) অক্রম(পৃষ্টবন্তঃ বয়ম্);[কিম্?] পারিক্ষিতাঃ (পরিতো দুরিতং ক্ষীয়তে যেন, স পরিক্ষিৎ—অশ্বমেধঃ, তদ্যাজিনঃ—পারিক্ষিতাঃ) ক(কুত্র) অববন্—পারিক্ষিতাঃ ক অববন্ ইতি। হে যাজ্ঞবল্ক্য, সঃ(গন্ধর্ব্বাৎ লব্ধ- নির্ণয়ঃ অহং) ত্বা(ত্বাং) পৃচ্ছামি—পারিক্ষিতাঃ ক অববন্? ইতি ॥ ১৬৬ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ?-জারৎকারব আর্ত্তভাগ প্রশ্ন হইতে বিরত হইলে পর, ভুজ্যুনামক লহ্যপৌত্র যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমরা অধ্যয়নার্থ ব্রহ্মচর্য্য- ব্রতাচরণপরায়ণ হইয়া মদ্রদেশে পর্যটন করিয়াছিলাম। সেই সময়ে একদা কপিবংশীয় পতঞ্চলনামক গৃহস্থের গৃহে উপস্থিত হইয়াছিলাম; তাহার একটি কন্যা গন্ধর্ব্বকর্তৃক আবিষ্টা ছিল। আমরা সেই গন্ধর্ব্বকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম-তুমি কে? সে বলিল, অঙ্গিরাবংশে আমার জন্ম, নাম সুধন্বা। আমরা তাহাকে যখন ভুবনকোশের(ব্রহ্মাণ্ডের) অবসান বা সীমা সম্বন্ধে প্রশ্ন করি, তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া- ছিলাম যে, পারিক্ষিতগণ কোথায় ছিল?-পারিক্ষিতগণ কোথায় ছিল? হে যাজ্ঞবল্ক্য, তোমাকেও জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, সেই পারিক্ষিতগণ কোথায় ছিল?[অভিপ্রায় এই যে, প্রশ্নের যথার্থ উত্তর আমরা গন্ধর্ব্বের নিকট হইতে জানিয়াছি; সুতরাং এ বিষয়ে তুমি আমাদিগকে ভুল বুঝাইয়া পার পাইবে না] ॥ ১৬৬॥ ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথানন্তরম্ উপরতে জারৎকারবে, ভুজ্যুরিতি নামতঃ, লহ্যস্যাপত্যং লাহাঃ, তদপত্যং লাহ্যায়নিঃ পপ্রচ্ছ—যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ— আদাবুক্তমশ্বমেধদর্শনম্, সমষ্টিব্যষ্টিফলশ্চ অশ্বমেধঃ ক্রতুঃ “জ্ঞানসমুচ্চিতো বা কেবল- জ্ঞানসম্পাদিতো বা সর্ব্বকৰ্ম্মণাৎ পরা কাষ্ঠা; “ক্রূণহত্যাশ্বমেধাভ্যাং ন পরং পুণ্য- পাপয়োঃ” ইতি হি স্মরন্তি; তেন হি সমষ্টিং ব্যষ্টীশ্চ প্রাপ্নোতি। তত্র ব্যষ্টয়ো নিজ্ঞাতা অণ্ডান্তরবিষয়া অশ্বমেধ-যাগ-ফলভূতাঃ; “মৃত্যুরস্যাত্মা ভবত্যেতাসাং দেবতানামেকো ভবতি” ইত্যুক্তম্। ১
মৃত্যুশ্চ অশনায়ালক্ষণো বুদ্ধ্যাত্মা সমষ্টিঃ প্রথমজো বায়ুঃ সূত্রং সত্যং হিরণ্য- গর্ভঃ; তস্য ব্যাকৃতো বিষয়ঃ-বদাত্মকং সর্ব্বং দ্বৈতৈকত্বম্, যঃ সর্বভূতান্তরাত্মা লিঙ্গমমূর্তরসঃ, যদাশ্রিতানি সর্বভূতকর্মাণি, যঃ কর্মণাং কৰ্ম্মসম্বদ্ধানাঞ্চ বিজ্ঞানানাং পরা গতিঃ-পরং ফলম্। তস্য কিয়ান্ গোচরঃ, কিয়তী ব্যাপ্তিঃ সর্বতঃ পরিমণ্ডলীভূতা, সা বক্তব্য। তস্যামুক্তায়াং সর্ব্বঃ সংসারো বন্ধনগোচর উক্তো ভবতি। তস্য চ সমষ্টি-ব্যষ্ট্যাত্মদর্শনস্যালৌকিকত্বপ্রদর্শনার্থমাখ্যায়িকাম্ আত্মনো বৃত্তাং প্রকুরুতে; তেন চ প্রতিবাদিবুদ্ধিং ব্যামোহয়িষ্যামীতি মন্যতে। ২
৭৮৯
মদ্রেষু-মদ্রা নাম জনপদাঃ, তেষু চরকা অধ্যয়নার্থং ব্রতচরণাৎ চরকাঃ অধ্যর্য্যবো বা, পর্য্যব্রজাম পর্য্যটিতবন্তঃ। তে পতঞ্চলস্য-তে বয়ং পর্য্যটন্তঃ পতঞ্চলস্য নামতঃ কাপ্যস্য কপিগোত্রস্য গৃহান্ ঐম গতবন্তঃ। তস্যাসীদ্দু হিতা গন্ধর্ব্বগৃহীতা-গন্ধর্ব্বেণ অমানুষেণ সত্ত্বেন কেনচিদাবিষ্টা; গন্ধর্বো বা ধিষ্ণ্যোহগ্নিঃ ঋত্বিগ দেবতা বিশিষ্টবিজ্ঞানত্বাদবসীয়তে; ন হি সত্ত্বমাত্রস্যেদৃশং বিজ্ঞানমুপ- পদ্যতে। তং সর্ব্বে বয়ং পরিবারিতাঃ সন্তঃ অপৃচ্ছাম-কোহসীতি-কত্ত্বমসি কিংনামা কিংসতত্ত্বঃ। সোহব্রবীদ্ গন্ধর্ব্বঃ-সুধন্বা নামতঃ, আঙ্গিরসঃ গোত্রতঃ। তং যদা যস্মিন্ কালে লোকানাম্ অন্তান্ পর্য্যবসানানি অপৃচ্ছাম-অথ এনং গন্ধর্ব্ব- মক্রম-ভুবনকোশ-পরিমাণজ্ঞানায় প্রবৃত্তেষু সর্ব্বেষু আত্মানং শ্লাঘয়ন্তঃ পৃষ্টবস্তো বয়ম্। কথম্? ক পারিক্ষিতা অভবন্নিতি। স চ গন্ধর্ব্বঃ সর্ব্বমম্মভ্যম্ অব্রবীৎ; তেন দিব্যেভ্যো ময়া লব্ধং জ্ঞানম্, তৎ তব নাস্তি; অতো নিগৃহীতোহসীত্যভি- প্রায়ঃ। সোহহং বিদ্যাসম্পন্নো লব্ধাগমো গন্ধর্ব্বাৎ, ত্বা ত্বাং পৃচ্ছামি যাজ্ঞবল্ক্য, ক পারিক্ষিতা অভাবন্, তৎ ত্বং কিং জানাসি? হে যাজ্ঞবল্ক্য, কথয়, পৃচ্ছামি-ক পারিক্ষিতা অভবন্নিতি ॥ ১৬৬॥ ১॥
টীকা।—ব্রাহ্মণারম্ভমেবং প্রতিপাদ্য তদক্ষরাণি ব্যাকরোতি—অথেতি। যাজ্ঞবল্ক্যমভিমুখীকৃত্য ভুজ্যুঃ স্বস্য পূর্ব্বনিবৃত্তাং কথাং কথয়ংস্তামবতারয়িতুমশ্বমেধস্বরূপং তৎফলং চ বিভজ্য দর্শয়তি— আদাবিতি। ক্রতুরুক্ত ইতি পূর্ব্বেণ সংবন্ধঃ। ক্রতোর্ব্বৈবিধ্যমাহ—জ্ঞানেতি। অশ্বমেধস্য দ্বিধা বিভক্তস্য সর্ব্বকৰ্ম্মোৎকর্ষমুদিগিরতি—সর্ব্বকৰ্ম্মণামিতি। তস্য পুণ্যশ্রেষ্ঠত্বে মানমাহ—ভ্রূণ- হত্যেতি। সমষ্টিব্যষ্টিফলশ্চেত্যুক্তং স্পষ্টয়তি—তেনেতি। অশ্বমেধেন সহকারি-কামনাভেদেন সমষ্টিং সমনুগতরূপাং, ব্যষ্টীশ্চ ব্যাবৃত্তরূপা দেবতাঃ প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ। কাঃ পুনর্ব্যষ্টয়ো বিবক্ষ্যন্তে, তত্রাহ—তত্রেতি। অগ্নিরাদিত্যো বায়ুরিত্যাদ্যা ব্যষ্টয়ো দেবতাঃ—সোহগ্নিরভবদিত্যাদাবণ্ডান্ত- বর্ত্তিন্যোঽশ্বমেধকলভূতা দর্শিতা ইত্যর্থঃ। কা তর্হি সমষ্টিদেবতেত্যুক্তে তত্রৈবোক্তং স্মারয়তি— মৃত্যুরিতি। ১
তামেব সমষ্টিরূপাং দেবতাং প্রপঞ্চয়িতুমিদং ব্রাহ্মণমিতি বক্তুং পাতনিকাং করোতি- মৃত্যুশ্চেতি। প্রাণাত্মকবুদ্ধিধর্মোহশনায়া কথং মৃত্যোর্লক্ষণং, তত্রাহ-বুদ্ধ্যাত্মেতি। তর্হি বুদ্ধের্ব্যষ্টিত্বান্মৃত্যুরপি তথা স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-সমষ্টিরিতি। প্রাগেব বাষ্ট্যুৎপত্তেরুৎপন্নত্বেন সমষ্টিত্বং সাধয়তি-প্রথমজ ইতি। সর্বাশ্রয়ত্বং দর্শয়তি-সূত্রমিতি। তত্র বায়ুর্বে গৌতমেত্যাদি বাক্যং প্রমাণমিতি সূচয়তি-বায়ুরিতি। তথাহপি কথং প্রথমজত্বং, ভূতানাং প্রথমমুৎপত্তেরিত্যা- শঙ্ক্যাহ-সত্যমিতি। হিরণ্যগর্ভস্যোক্তলক্ষণত্বেইপি কিমায়াতং মৃত্যোরিত্যাশঙ্ক্যাহ-হিরণ্যগর্ভ ইতি। জগদেব সমষ্টিব্যষ্টিরূপং ন সূত্রমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদাত্মকমিতি। দ্বৈতং ব্যষ্টিরূপম্, একত্বং সমষ্টিরূপং, তৎসর্ব্বং যদাত্মকং, তস্যেতি সম্বন্ধঃ। তস্যোক্তপ্রমাণত্বং প্রকটয়তি-যঃ সর্ব্বেতি। বিজ্ঞানাত্মানং ব্যাবর্ত্তয়তি-লিঙ্গমিতি। ‘তাস্য হোষ রসঃ’ ইতি শ্রুতিমনুসূত্যাহ-অমূর্ত্তেতি।
তস্য সাধনাশ্রয়ত্বং দর্শয়তি-যদাশ্রিতানীতি। তস্যৈব ফলাশ্রয়ত্বমাহ-যঃ কর্মণামিতি। পরা গতিরিত্যস্তৈব ব্যাখ্যানং পরং ফলমিতি। এবং ভূমিকামারচয্যানন্তরব্রাহ্মণমবতারয়তি- তস্যেতি। প্রশ্নমেব প্রকটয়তি-কিয়তীতি। সর্ব্বতঃ পরিতো মণ্ডলভাবমাসাদ্য স্থিতেতি যাবৎ। ননু কিমিতি সা বক্তব্য, তস্যামুক্তায়ামপি বক্তব্যসংসারাবশেষাদাকাঙ্ক্ষাবিশ্রান্ত্য- ভাবাদত আহ-তস্যামিতি। ইয়ান্ বন্ধো নাধিকো ন্যুনো বেত্যন্যব্যবচ্ছেদেন বন্ধপরিমাণ- পরিচ্ছেদার্থং কৰ্ম্মফলব্যাপ্তিরত্রোচ্যতে, তৎপরিচ্ছেদশ্চ বৈরাগ্যদ্বারা মুক্তিহেতুরিতি ভাবঃ। ব্রাহ্মণস্যৈবং প্রবৃত্তাবপি কিমিতি ভুজ্যুঃ স্বস্থ্য পূর্ব্বনিবৃত্তাং কথামাহেত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্য চেতি। সমষ্টিব্যষ্ট্যাত্মদর্শনস্যালৌকিকত্বপ্রদর্শনেন বা কিং স্যাৎ, তদাহ-তেন চেতি। ইতি মন্যতে ভুজ্যুরিতি শেষঃ। জল্পে পরপরজয়েনাত্মজয়স্যেষ্টত্বাদিত্যর্থঃ। ২
ধিক্যত্বমগ্নেরুপাস্যত্বম্। ‘অগ্নির্বৈ দেবানাং হোতা’ ইতি শ্রুতিমাশ্রিত্যাহ- ঋত্বিগিতি। যথোক্তগন্ধর্ব্বশব্দার্থসংগ্রহে লিঙ্গমাহ-বিশিষ্টেতি। তস্যান্যথাসিদ্ধিং দুষয়তি- ন হীতি। অথৈনমিত্যাদেরর্থং বিবৃণোতি-ভুবনেতি। ভবত্বেবং গন্ধর্ব্বং প্রতি ভবতঃ প্রশ্নঃ, তথাপি কিমায়াতং, তদাহ-স চেতি। তেন গন্ধর্ব্ববচনেনেতি যাবৎ। দিব্যেভ্যো গন্ধর্ব্বেভ্যঃ সকাশাদিত্যেতৎ। এতজ্ঞানাভাবে ত্বজ্ঞানমপ্রতিভা ব্রহ্মিষ্ঠত্বপ্রতিজ্ঞাহানিশ্চেত্যাহ-অত ইতি। প্রষ্টুরভিপ্রায়মুক্ত। প্রশ্নাক্ষরাণি ব্যাচষ্টে-সোহহমিতি। প্রথমা তাবৎ ক পারিক্ষিতা অভবন্নিত্যুক্তির্গন্ধর্ব্বপ্রশ্নার্থী। দ্বিতীয়া তদনুরূপপ্রতিবচনার্থা। যো হি ক পারিক্ষিতা অভবন্নিতি প্রশ্নো গন্ধর্ব্বং প্রতি কৃতস্তস্য প্রত্যুক্তিং সর্বাং নোহম্মভ্যমব্রবীদিতি তত্র বিবক্ষ্যতে, তৃতীয়া তু মুনিং প্রতি প্রশ্নার্থেতি বিভাগঃ। ১৬৬।১।
ভাষ্যানুবাদ।—শ্রুতির ‘অথ’ অর্থ—অনন্তর, অর্থাৎ জারৎকারব আর্ত্ত- ভাগ প্রশ্ন হইতে বিরত হইলে পর, ভুজ্যুনামক লাহ্যায়নি—লহ্যের পুত্র—লাহ্য, তাহার পুত্র—লাহ্যায়নি যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক প্রশ্ন করিয়াছিলেন। ইতঃপূর্ব্বে অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা বলা হইয়াছে। অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল দ্বিবিধ—সমষ্টি ও ব্যষ্টি, অর্থাৎ অনুষ্ঠানবিশেষে সমস্ত ফলও হয়, আবার অনুষ্ঠানবিশেষে পৃথক্ পৃথক্ ফলও হয়। জ্ঞানসহকারেই অনুষ্ঠিত হউক, কিংবা কেবল জ্ঞানদ্বারাই সম্পাদিত হউক, অশ্বমেধ যজ্ঞ হইতেছে সমস্ত কর্ম্মের শ্রেষ্ঠ কৰ্ম্ম; স্মৃতিশাস্ত্রকারগণ বলিয়াছেন, ‘ভ্রূণহত্যার বেশী পাপ নাই, আর অশ্বমেধ অপেক্ষা পুণ্য নাই’। লোকেও অশ্বমেধদ্বারা সমষ্টি ও ব্যষ্টি ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ব্রহ্মাণ্ডান্তর্গত যে সমস্ত বিষয় প্রতীতিগোচর হয়, সে সমস্ত বিষয়ই হইতেছে অশ্বমেধের ব্যষ্টি ফল। ১
[অতঃপর সমষ্টি ফলের কথা বলা হইতেছে।] পূর্ব্বেই কথিত হইয়াছে যে, ‘মৃত্যু ইহার আত্মা হয়, তিনি এই সমুদয় দেবতার অন্যতম হন’ ইত্যাদি। অশনায়ালক্ষণ অর্থাৎ সংহারাত্মক মৃত্যুই সমষ্টি-বুদ্ধিগত প্রথমোৎপন্ন পুরুষ;
৭৯১
বায়ু, সূত্রাত্মা, সত্য ও হিরণ্যগর্ভ প্রভৃতি তাহার নামান্তর। সমস্ত দ্বৈত জগৎ যাঁহা হইতে অপৃথক্ বা যদাত্মক, যিনি সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা, সূক্ষ্মদেহ-সমষ্টিতে অভিব্যক্ত ও অমূর্তরস অর্থাৎ সূক্ষ্ম পদার্থের সারভূত ও সর্ব্বভূতের সর্ব্বপ্রকার কর্মনিচয় যাহাতে আশ্রিত, এবং শাস্ত্রোক্ত কৰ্ম্ম ও কর্মাঙ্গ-বিজ্ঞানের(উপা- সনার) যিনি চরম ফল, দৃশ্যমান জগৎসমষ্টি তাঁহারই ভোগ্য বিষয়। সেই সমষ্টিভূত হিরণ্যগর্ভের ভোগ্য বিষয়ের পরিমাণ ও সর্বদিগব্যাপী বিস্তারই বা কত, এখন তাহা বলা আবশ্যক। তাহা বলিলেই ফলে ফলে জীবের বন্ধনক্ষেত্র সমস্ত সংসারের পরিমাণও উক্ত হইয়া যাইবে। সমষ্টি ও ব্যষ্টি-ফলাত্মক আত্ম- জ্ঞানের অলৌকিকতা জ্ঞাপনের জন্য প্রশ্নকর্তা আত্মবৃত্তান্তঘটিত একটি আখ্যায়ি- কার অবতারণা করিতেছেন। তিনি মনে করিতেছেন যে, এই প্রশ্নদ্বারাই প্রতি- বাদী যাজ্ঞবল্ক্যের বুদ্ধিভ্রম সমুৎপাদন করিব। ২
মদ্র একটি প্রসিদ্ধ দেশ; আমরা এক সময় সেই দেশে অধ্যয়নার্থ ‘চরক’ হইয়া অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য্য-ব্রত ধারণপূর্ব্বক পর্যটনপরায়ণ হইয়া, অথবা অধ্বর্য্যরূপে(যজুর্ব্বেদ- বিদ্রূপে) পর্যটন করিতেছিলাম।[সেই সময় আমরা] কপিবংশীয় পতঞ্চল- নামক গৃহস্থের বাড়ীতে উপস্থিত হইয়াছিলাম। পতঞ্চলের একটি কন্যা গন্ধর্ব্ব- গৃহীতা ছিল—গন্ধর্ব্ব অর্থ—মনুষ্যেতর জীব, তৎকর্তৃক আবিষ্টা(আক্রান্তা) ছিল। অথবা গন্ধর্ব্বটির যাদৃশ বিশিষ্ট জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়, তাহাতে বুঝা যাইতেছে যে, এখানে গন্ধর্ব্ব অর্থ—গৃহস্থের উপাস্য অগ্নিরূপী ঋত্বিকদেবতাবিশেষ; তাহা না হইলে, সাধারণ একটা প্রাণিমাত্রের এরূপ বিশেষ জ্ঞান থাকা সম্ভব হইতে পারে না। আমরা সকলে তাহাকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক বসিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম— তুমি কে?—তোমার নাম কি? এবং পরিচয় কি? তিনি বলিলেন—আমার নাম সুধন্বা, অঙ্গিরার বংশে জন্ম। আমরা যখন তাহাকে ব্রহ্মাণ্ডের অন্ত—শেষ- সীমা সম্বন্ধে প্রশ্ন করি, তখন সেই গন্ধর্ব্বকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। কি প্রকার? না, পারিক্ষিতগণ কোথায় থাকেন?
প্রশ্নকর্তার অভিপ্রায় এই যে, সেই গন্ধর্ব্ব আমাদিগকে সমস্ত কথা বলিয়া- ছিলেন; আমি এইরূপ দিব্য পুরুষের নিকট হইতে জ্ঞান লাভ করিয়াছি; তুমি কিন্তু তাহা পাও নাই; অতএব নিশ্চয়ই তুমি পরাজিত হইবে। হে যাজ্ঞবল্ক্য, গন্ধর্ব্ব হইতে লব্ধোপদেশ ও বিদ্যাসম্পন্ন সেই আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি— পারিক্ষিতগণ কোথায় থাকেন, তাহা তুমি জান কি? হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি—বল দেখি, পারিক্ষিতগণ কোথায় থাকেন? ॥ ১৬৬ ॥ ১ ॥
স হোবাচোবাচ বৈ সোহগচ্ছন্ বৈ তে তদ্যত্রাশ্বমেধযাজিনো গচ্ছন্তীতি, ক স্বশ্বমেধযাজিনো গচ্ছন্তীতি? দ্বাত্রিংশতং বৈ দেবরথাহ্যান্যয়ং লোকস্তং সমন্তং পৃথিবী দ্বিস্তাবৎ পর্য্যেতি, তাৎসমন্তং পৃথিবীং দ্বিস্তাবৎ সমুদ্রঃ পর্য্যেতি, তদ্যাবতী ক্ষুরস্য ধারা যাবদ্বা মক্ষিকায়াঃ পত্রম্, তাবানন্তরেণাকাশস্তানিন্দ্রঃ সুপর্ণো ভূত্বা বায়বে প্রাযচ্ছৎ, তান্ বায়ুরাত্মনি ধিত্বা তত্রাগমদ্ যত্রাশ্বমেধযাজিনোহভবন্নিত্যেবমিব বৈ স বায়ুমেব প্রশশংস, তস্মাদ্বায়ুরেব ব্যষ্টিবায়ুঃ সমষ্টিরপ পুনর্মৃত্যুং জয়তি য এবং বেদ, ততো হ ভুজ্যুর্লাহ্যায়নিরুপররাম ॥ ১৬৭ ॥ ২॥
ইতি তৃতীয়াধ্যায়স্য তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ। -সঃ(এবং পৃষ্টঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ) উবাচ হ-সঃ(যুগ্মৎপৃষ্টঃ গন্ধর্ব্বঃ) উবাচ(উক্তবান্) বৈ;(বৈ-শব্দঃ স্মারণার্থঃ, যাজ্ঞবল্ক্যঃ স্ববচনেন ভুজ্যুৎ গন্ধর্ব্বোক্তিং স্মারয়তীত্যর্থঃ),-তে(পারিক্ষিতাঃ) তৎ(তত্র) বৈ (প্রসিদ্ধৌ) অগচ্ছন্।[কুত্র?] যত্র(স্থানে) অশ্বমেধযাজিনঃ(অশ্বমেধ- যজ্ঞকর্তার:) গচ্ছন্তি-ইতি।[ভুজ্যুঃ পুনরাহ-] নু ভো যাজ্ঞবল্ক্য, অশ্বমেধ- যাজিনঃ ক(কুত্র) গচ্ছন্তি? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] অয়ং(অস্মদ্গোচরঃ লোকালোক-গিরিণা পরিচ্ছিন্নঃ) লোকঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) দ্বাত্রিংশতং দেবরথাহ্যানি(দেবশ্য সবিতুঃ আহ্নিক্যা গত্যা যাবৎ স্থানং পরিচ্ছিদ্যতে, তৎ দেবরথাহ্যম্, তদেব দ্বাত্রিংশদ্গুণিতং সৎ দেবরথাহ্যানি, তৎপরিমিতঃ অয়ং লোক ইত্যর্থঃ); পৃথিবী তং লোকং সমন্তং(সমন্তাৎ) দ্বিঃ (তদ্বৈগুণ্যেন) পর্য্যেতি(পরিতো ব্যাপ্নোতি)। সমুদ্রঃ তাবৎ তাং পৃথিবীং সমস্তং দ্বিঃ(তদ্বৈগুণ্যেন) পর্য্যেতি(পরিগতঃ)।[অধুনা যেন বিবরেণ অশ্বমেধযাজিনঃ বহির্নিগচ্ছন্তি, তদণ্ড-কপালয়োঃ বিবরপরিমাণমুচ্যতে-] তৎ (তত্র) ক্ষুরস্য ধারা(প্রান্তভাগঃ) যাবতী(যাবৎপরিমাণা সূক্ষ্মা), মক্ষি- কায়াঃ পত্রং(পক্ষপত্রং) বা যাবৎ, অন্তরেণ(অণ্ডকপালয়োর্মধ্যে) তাবান্ (তাবৎপরিমাণঃ) আকাশঃ(ছিদ্রং অস্তি);[তেন ছিদ্রেণ প্রাপ্তান্ পারি- ক্ষিতান্] ইন্দ্রঃ(পরমেশ্বরঃ) সুপর্ণঃ(পক্ষী) ভূত্বা বায়বে প্রাযচ্ছৎ(দত্তবান্); বায়ুঃ তান্(পরমেশ্বরাপিতান্) আত্মনি ধিত্বা(সংস্থাপ্য) তত্র অগমৎ, যত্র
অশ্বমেধযাজিনঃ অভবন্(স্থিতাঃ), ইতি—এবম্ ইব সঃ(গন্ধর্ব্বঃ) বায়ুম্ এব প্রশংসন্স; তস্মাৎ(গন্ধর্ব্বপ্রশংসনাৎ হেতোঃ) বায়ুঃ এব ব্যষ্টিঃ, বায়ুঃ সমষ্টিঃ (ব্যষ্টি-সমষ্টিফলাত্মকঃ)। যঃ এবং(যথোক্তগুণসম্পন্নং) বায়ুং বেদ(বিজা- নাতি), সঃ(বিদ্বান্) পুনঃ মৃত্যুৎ অপজয়তি(সকৃৎ মৃত্যু পুনঃ ন ম্রিয়তে ইত্যাশয়ঃ)। ভুজ্যুঃ লাহ্যায়নিঃ ততঃ(যাজ্ঞবল্ক্যপ্রদত্তোত্তরশ্রবণাৎ পরং) উপররাম(বিরতো বভূব) ॥ ১৬৭ ॥ ২॥
মূলানুবাদ।-যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-সেই গন্ধর্ব্ব তোমাদিগকে বলিয়াছিলেন-অশ্বমেধ-যজ্ঞকারিগণ যেখানে গমন করেন, সেই পারি- ক্ষিতগণও সেইস্থানেই গমন করেন।[ভুজ্যু পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করি- লেন-] অশ্বমেধযাজিগণই বা কোথায় গমন করেন?[তদুত্তরে যাজ্ঞ- বন্ধ্য বলিলেন-] সূর্যদেব একদিনে স্বীয় রথের দ্বারা যে পরিমাণ স্থান ভ্রমণ করেন, তাহার বত্রিশগুণ পরিমিত স্থান হইল এই লোক, তাহার দ্বিগুণ পরিমাণযুক্ত এই পৃথিবী আবার সেই লোককে পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছে; সমুদ্র আবার দ্বিগুণ পরিমাণে সেই পৃথিবীকে বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে।[এখন ব্রহ্মাণ্ড-খণ্ডদ্বয়ের মধ্যগত রন্ধ্রের পরিমাণ কথিত হইতেছে-] ক্ষুরের ধারা বা প্রান্তভাগ যেরূপ সূক্ষ্ম, অথবা মক্ষিকার পাখা যেরূপ সূক্ষ্ম, ব্রহ্মাণ্ড-কপাল-দ্বয়ের মধ্যে সেইরূপ ক্ষুদ্রপরিমাণ ছিদ্র আছে; ইন্দ্র-পরমেশ্বর(হিরণ্যগর্ভ) পক্ষিরূপী হইয়া সেখানে উপস্থিত পারিক্ষিতগণকে বায়ুর নিকট সমর্পণ করেন; বায়ু তাহাদিগকে আপনার উপরে স্থাপন করিয়া, অশ্বমেধ-যাজিগণ যেখানে আছেন, সেখানে লইয়া যান। তুমি মনে করিয়া দেখ, সেই গন্ধর্ব্ব এইরূপেই যেন বায়ুরই প্রশংসা করিয়াছিলেন। অতএব বায়ুই ব্যষ্টি ও সমষ্টি কৰ্ম্মফল; যে ব্যক্তি এইরূপ তত্ত্ব অবগত হন, তিনি পুনর্মৃত্যু জয় করেন, অর্থাৎ একবার মৃত্যুর পর আর মরেন না-অমৃতত্ব লাভ করেন ॥ ১৬৭ ॥ ২॥ শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ; উবাচ বৈ সঃ—বৈ-শব্দঃ স্মরণার্থঃ, উবাচ বৈ স গন্ধর্ব্বস্তুভ্যম্। অগচ্ছন্ বৈ তে পারিক্ষিতাঃ, তৎ তত্র; ক? যত্র যস্মিন্ অশ্বমেধযাজিনো গচ্ছন্তি—ইতি নির্ণীতে প্রশ্নে আহ—ক নু কস্মিন্ অশ্বমেধযাজিনো গচ্ছন্তীতি। তেষাং গতিবিবক্ষয়া ভুবনকোশ-পরিমাণমাহ—
দ্বাত্রিংশতং বৈ, দ্বে অধিকে ত্রিশৎ-দ্বাত্রিংশতং বৈ দেবরথাহ্যানি, দেবঃ আদিত্যঃ, তস্য রথো দেবরথঃ, তস্য রথস্য গত্যা অহ্লা যাবৎ পরিচ্ছিদ্যতে দেশপরি- মাণম্, তৎ দেবরথাহ্যুম্, তদ্বাত্রিংশদ্গুণিতং দেবরথাহ্যানি, তাবৎপরিমাণোহয়ং লোকঃ লোকালোকগিরিণা পরিক্ষিপ্তঃ-যত্র বৈরাজং শরীরম্, যত্র চ কৰ্ম্ম- ফলোপভোগঃ প্রাণিনাম্; স এষ লোকঃ এতাবান্ লোকঃ, অতঃ পরমলোকঃ; তৎ লোকং সমন্তং সমন্ততঃ লোকবিস্তারাদ্ দ্বিগুণপরিমাণবিস্তারেণ পরিমাণেন তৎ লোকং পরিক্ষিপ্তা পর্য্যেতি পৃথিবী; তাং পৃথিবীং তথৈব সমন্তং দ্বিস্তাবদ্ দ্বিগুণেন পরিমাণেন সমুদ্রঃ পর্য্যেতি, যৎ ঘনোদমাচক্ষতে পৌরাণিকাঃ। ১
তত্র অণ্ড-কপালয়োবিবরপরিমাণমুচ্যতে, যেন বিবরেণ মার্গেণ বহির্নির্গচ্ছন্তো ব্যাপ্নবস্তি অশ্বমেধযাজিনঃ। তত্র যাবতী যাবৎপরিমাণা ক্ষুরস্য ধারা অগ্রম্, যাবদ্বা সৌক্ষ্যেণ যুক্তং মক্ষিকায়াঃ পত্রম্, তাবান্ তাবৎপরিমাণঃ-অন্তরেণ মধ্যে অণ্ড-কপালয়োঃ, আকাশঃ ছিদ্রম্, তেনাকাশেনেত্যেতৎ; তান্ পারিক্ষিতা- নশ্বমেধযাজিন: প্রাপ্তান্ ইন্দ্রঃ পরমেশ্বর:-যোহশ্বমেধেহগ্নিশ্চিতঃ, সুপর্ণঃ- যদ্বিষয়ং দর্শনমুক্তং-“তস্য প্রাচী দিক্ শিরঃ” ইত্যাদিনা, সুপর্ণঃ পক্ষী ভূত্বা পক্ষপুচ্ছাদ্যাত্মকঃ সুপর্ণো ভূত্বা বায়বে প্রাযচ্ছৎ-মূর্তত্বান্নাস্ত্যাত্মনো গতিস্তত্রেতি। তান্ পারিক্ষিতান্ বায়ুরাত্মনি ধিত্বা স্থাপয়িত্বা স্বাত্মভূতান্ কৃত্বা, তত্র তস্মিন্ অগময়ৎ। ক? যত্র পূর্ব্বে অতিক্রান্তাঃ পারিক্ষিতা অশ্বমেধযাজিনোহভবন্নিতি। ২
এবমিব বৈ-এবমেব স গন্ধর্ব্বঃ বায়ুমেব প্রশংসস পারিক্ষিতানাং গতিম্। সমাপ্তা আখ্যায়িকা। তন্নিবৃত্তং তু অর্থম্ আখ্যায়িকাতোহপসৃত্য স্বেন শ্রুতিরূপে- ণৈব আচষ্টেইস্মভ্যম্। যম্মাদ্বায়ুঃ স্থাবরজঙ্গমানাং ভূতানামন্তরাত্মা, বহিশ্চ স এব, তস্মাদধ্যাত্মাধিভূতাধিদৈবভাবেন বিবিধা যা অষ্টিঃ ব্যাপ্তিঃ, স বায়ুরেব; তথা সমষ্টিঃ কেবলেন সূত্রাত্মনা বায়ুরেব। এবং বায়ুমাত্মানং সমষ্টিব্যষ্টিরূপাত্মক- ত্বেনোপগচ্ছতি, য এবং বেদ। তস্য কিং ফলমিত্যাহ-অপ পুনর্মৃত্যুৎ জয়তি- সকৃৎ মৃত্যু পুনর্ন ম্রিয়তে। ততঃ আত্মনঃ প্রশ্ননির্ণয়াৎ ভুজ্যুর্লাহ্যায়নিঃ উপররাম ॥ ১৬৭॥২॥
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্তৃতীয়োহধ্যায়শ্চ তৃতীয়ং ভুজ্যুব্রাহ্মণভাষ্যম্ ॥ ৩ ॥ ৩ ॥
টীকা।—অজ্ঞানাদিনিগ্রহং পরিহরন্নুত্তরমাহ—স হোবাচেতি। স্মরণার্থো গন্ধর্ব্বাল্লন্ধস্য জ্ঞানস্তেতি শেষঃ। কিমুবাচেত্যপেক্ষায়ামাহ—অগচ্ছন্নিতি। অহোরাত্রমাদিত্যরথগত্যা যাবান্ পন্থা মিতঃ, ভাবান্দেশো দ্বাত্রিংশগুণিতস্তৎকিরণব্যাপ্তঃ। স চ চন্দ্ররশ্মিব্যাপ্তেন দেশেন সাকং পৃথিবীত্যুচাতে।
৭৯৫
“রবিচন্দ্রমসৌধী বন্যমুখৈরবভাস্যতে।
সসমুদ্রসরিচ্ছেলা। তাবতী পৃথিবী স্মৃতা॥”
ইতি স্মৃতেরিত্যাহ—দ্বাত্রিংশতমিত্যাদিনা। অয়ং লোক ইত্যস্যার্থমাহ—তাবদিতি। তত্র লোকভাগং বিভজতে—যত্রেতি। উক্তং লোকমনুদ্যাবশিষ্টস্যালোকত্বমাহ—এতাবানিতি। তমিতি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—লোকমিত্যাদিনা। অন্বয়ং দর্শয়িতুং তং লোকমিতি পুনরুক্তিঃ। তত্র পৌরাণিকসংমতিমাহ—যং ঘনোদমিতি। উক্তং হি—
“অগ্নিস্য সমস্তাতু সংনিবিষ্টোঽমৃতোদধিঃ।
সমস্যাদঘ্নতোয়েন ধার্য্যমাণঃ স তিষ্ঠতি” ॥ ইতি । ১
তদ্যাবতীত্যাদেস্তাৎপর্য্যমাহ-তত্রেতি। লোকাদিপরিমাণে যথোক্তরীত্যা স্থিতে সতীতি যাবৎ। কপালবিবরস্যানুপযুক্তত্বাৎ কিং তৎপরিমাণচিন্তয়েত্যাশঙ্ক্যাহ-যেনেতি। ব্যবহারভূমিঃ সপ্তম্যর্থঃ। পরমাত্মানং ব্যাবর্তয়তি-যোহশ্বমেধ ইতি। সুপর্ণশব্দস্য শ্যেনসাদৃশ্যমাশ্রিত্য চিত্যেহগ্নৌ প্রবৃত্তিং দর্শয়তি-যদ্বিষয়মিতি। উক্তার্থং পদমনুবদতি-সুপর্ণ ইতি। ভূত্বেত্যস্যার্থমাহ- পক্ষেতি। ননু চিত্তোঽগ্নিরণ্ডাদ্বহিরশ্বমেধযাজিনো গৃহীত্বা স্বয়মেব গচ্ছতু, কিমিতি তান্ বায়বে প্রযচ্ছতি, তত্রাহ-মূর্ত্তত্বাদিতি। আত্মনশ্চিত্যস্যাগ্নেরিতি যাবৎ। তত্রেত্যণ্ডাদ্বাহ্যদেশোক্তিঃ। ইতি যুক্তং বায়বে প্রদানমিতি শেষঃ। আখ্যায়িকাসমাপ্তাবিতিশব্দঃ। পরিতো দুরিতং ক্ষীয়তে যেন, স পরিক্ষিৎ-অন্বমেধঃ, তদ্যাজিনঃ পারিক্ষিতাস্তেষাং গতিং বায়ুমিতি সংবন্ধঃ। ২
মুনিবচনে বর্তমানে কথমাখ্যায়িকাসমাপ্তিস্তত্রাহ-সমাপ্তেতি। বায়ুপ্রশংসায়াং হেতুমাহ- যম্মাদিতি। কিং পুনর্যথোক্তবায়ুতত্ত্ববিজ্ঞানফলং, তদাহ-এবমিতি। ১৬৭।২॥
ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যটীকায়াং তৃতীয়াধ্যায়স্য তৃতীয়ং ভুজ্যুব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ৩ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—এইরূপ জিজ্ঞাসার পর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—সেই গন্ধর্ব্ব তোমাদিগকে এইরূপ বলিয়াছিলেন। বৈ শব্দটি স্মরণার্থক; তাহার কথা স্মরণ করিয়া দেখ। সেই পারিক্ষিতগণ সেই স্থানে গিয়াছিলেন। কোথায়? অশ্ব- মেধযাজিগণ যেখানে যাইয়া থাকেন। এইরূপ গন্ধর্ব্ব-প্রশ্ন নির্ণীত হইলে পর, ভুজ্য পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—বল, সেই অশ্বমেধযাজীরাইবা কোথায় গমন করেন? অশ্বমেধযজ্ঞকারীদিগের গন্তব্য স্থান নিরূপণের উদ্দেশ্যে এখন ভুবন- কোশের(ব্রহ্মাণ্ডের) পরিমাণ বলিতেছেন—‘দ্বাত্রিংশৎ’ অর্থ—ত্রিশ আর দুইটি অধিক—বত্রিশ; ‘দেবরথাহ্যানি’ অর্থ—দেব অর্থ আদিত্য, তাঁহার রথ—দেবরথ; সেই দেবরথের প্রাত্যহিক গতিতে যে পরিমাণ স্থান পরিব্যাপ্ত হয়, তাহার নাম—‘দেবরথাহ্য’; তাহার বত্রিশগুণ পরিমিত স্থানকে লক্ষ্য করিয়া ‘দ্বাত্রিং- শতং দেবরথাহ্যানি’ বলা হইয়াছে। ঐ প্রকার পরিমাণবিশিষ্ট এই পৃথিবী লোকটি আবার ‘লোকালোক’ নামক পর্ব্বতে পরিবেষ্টিত হইয়া রহিয়াছে; ইহারই মধ্যে বৈরাজ শরীর(বিরাটপুরুষের শরীর) সন্নিবিষ্ট আছে, এবং ইহারই মধ্যে প্রাণি-
গণ নিজ নিজ কর্ম্মফল উপভোগ করিয়া থাকে। যথোক্ত পরিমাণবিশিষ্ট এই স্থানটি ‘লোক’ নামে অভিহিত; তাহার পরবর্তী স্থান ‘অলোক’ নামে কথিত। উক্ত ‘লোক’ স্থানটিকে আবার তাহার দ্বিগুণ পরিমাণ বিস্তৃতিবিশিষ্ট এই পৃথিবী বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে(১); পৃথিবীর দ্বিগুণ পরিমাণ সমুদ্র আবার চতুর্দিকে এই পৃথিবীকে পরিবেষ্টিত করিয়া আছে। পৌরাণিকগণ এই সমুদ্রকে ‘ঘনোদ’ বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন(২)। ১
এখন অণ্ড-কপাল-দ্বয়ের মধ্যগত বিবর বা রন্ধ্রের পরিমাণ কথিত হইতেছে (৩)। অশ্বমেধ যজ্ঞকারিগণ ঐ বিবরপথে বহির্গত হইয়া অভীষ্ট স্থান অধিকার করিয়া থাকেন। ক্ষুরের ধারা বা প্রান্তভাগের যতটুকু পরিমাণ, কিংবা মক্ষিকার পক্ষ যেরূপ অতিশয় সূক্ষ্ম, উক্ত অণ্ডকপাল-দ্বয়ের মধ্যে ঠিক সেই পরিমাণ আকাশ (ছিদ্র) অর্থাৎ ফাঁক আছে, পারিক্ষিতগণ সেই সূক্ষ্ম ছিদ্রপথে অশ্বমেধযজ্ঞকারীদিগের নিকট উপস্থিত হন। তাহার পর ইন্দ্র—পরমেশ্বর(উত্তম ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন হিরণ্যগর্ভ, কিন্তু পরব্রহ্ম নহে),—যিনি পূর্ব্বকালে অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়াছিলেন এবং প্রথমেই “তস্য প্রাচী দিক্ শিরঃ” ইত্যাদি বাক্যে যাহার সম্বন্ধে বিজ্ঞান বা বিদ্যার উপদেশ করা হইয়াছে, তিনিই সুপর্ণ হইয়া—পক্ষ-পুচ্ছযুক্ত পক্ষিরূপী হইয়া সেই পারিক্ষিত- গণকে সূক্ষ্ম বায়ুর হস্তে সমর্পণ করেন;[এখানে বুঝিতে হইবে যে, উক্ত পরমেশ্বর-পদবাচ্য হিরণ্যগর্ভও] মূর্ত্ত অর্থাৎ আকৃতিবিশিষ্ট; সুতরাং স্থূল; স্থুল বলিয়াই তাঁহারও সেখানে(সূক্ষ্ম ছিদ্রে) সাক্ষাৎ সম্বন্ধে প্রবেশের অধিকার নাই;
৭৯৭
তিনি[এইজন্যই সূক্ষ্ম বায়ুর নিকট সমর্পণ করেন।] বায়ু সেই পারিক্ষিতগণকে আপনার শরীরে সংস্থাপন করিয়া অর্থাৎ নিজেরই অনুরূপ করিয়া সেখানে লইয়া যান। কোথায় লইয়া যান? না, পূর্ব্ববর্তী পারিক্ষিত—অশ্বমেধযজ্ঞকারিগণ যেখানে গিয়াছেন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] সেই গন্ধর্ব্ব এইরূপেই পারিক্ষিত- দিগের অভীষ্ট স্থানপ্রাপ্তির সহায়ভূত বায়ুরই প্রশংসা করিয়াছিলেন। ২
আখ্যায়িকা বা গল্পটি এইস্থানেই সমাপ্ত হইল। উক্ত আখ্যায়িকার যাহা তাৎপর্য্যার্থ, ঋষি তাহা আমাদিগকে আখ্যায়িকার ভাব পরিত্যাগ করিয়া বলিয়া দিতেছেন,—যেহেতু বায়ুই স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমস্ত ভূতের অন্তরে আত্মাস্বরূপ, এবং বাহিরেও তদ্রূপ[স্থিতিসাধন]; অতএব জগতে যে, অধ্যাত্ম, অধিদৈবত ও অধিভূতরূপে নানাবিধ ব্যষ্টি বা বিভিন্নাকার বস্তু রহিয়াছে, প্রকৃতপক্ষে তাহা বায়ুই (বায়ু হইতে পৃথক্ নহে), এবং সমষ্টিরূপে যে, কেবল সূক্ষ্মাত্মা হিরণ্যগর্ভভাব, তাহাও বায়ুই,(তদ্ভিন্ন নহে)। যে লোক এই বায়ুকে যথোক্তপ্রকারে সমষ্টি ও ব্যষ্টিরূপে জানে—প্রাপ্ত হয়, তাহার ফল কি হয়, বলিতেছেন—তিনি পুনর্মরণ জয় করেন, অর্থাৎ একবার মৃত্যুর পর আর তাহার মৃত্যু হয় না(মুক্ত হন)। ভুজ্যু লাহ্যায়নি আপনার প্রশ্নের যথার্থ উত্তর প্রদত্ত হইল দেখিয়া প্রশ্ন হইতে বিরত হইলেন ॥ ১৬৭ ॥ ২ ॥
ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে তৃতীয় ভুজ্যুব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৩ ॥ ৩ ॥
আভাস-ভাষ্যম্।—অথ হৈনমুষস্তশ্চাক্রায়ণঃ পপ্রচ্ছ। পুণ্যপাপ- প্রযুক্তৈগ্রহাতিগ্রহৈগৃহীতঃ পুনঃপুনর্হাতিগ্রহান্ ত্যজন্ উপাদদৎ সংসরতী- ত্যুক্তম্। পুণ্যস্য চ পর উৎকর্ষো ব্যাখ্যাতো ব্যাকৃতবিষয়ঃ সমষ্টিব্যষ্টিরূপঃ দ্বৈতৈকত্বাত্মপ্রাপ্তিঃ। যস্তু গ্রহাতিগ্রহৈগ্রস্তঃ সংসরতি, সঃ অস্তি বা, নাস্তি? অস্তিত্বে চ কিংলক্ষণঃ—ইতি আত্মন এব বিবেকাবগমায় উষস্তপ্রশ্ন আরভ্যতে। তস্য চ নিরুপাধিস্বরূপস্য ক্রিয়াকারকবিনির্ম্মুক্তিস্বভাবস্য অধিগমাদ্ যথোক্তাদ্বন্ধনাদ্- বিমুচ্যতে সপ্রযোজকাৎ। আখ্যায়িকাসম্বন্ধস্তু প্রসিদ্ধঃ।
টাকা। -ব্রাহ্মণান্তরমবতারয়তি-অথেতি। তস্যাপুনরুক্তমর্থং বক্তু মার্ত্তভাগপ্রশ্নে বৃত্তং কীর্তয়তি-পুণ্যেতি। ভুজ্যাপ্রশান্তে সিদ্ধমর্থমুদ্রবতি-পুণ্যস্থ্য চেতি। নামরূপাভ্যাং ব্যাকৃতং জগদ্ধিরণ্যগর্ভাত্মক, তদ্বিষয়মুৎকর্ষং বিশিনষ্টি-সমষ্টীতি। কথং যথোক্তোৎকর্ষস্য পুণ্যকর্ম্মফলত্বং, তত্রাহ-দ্বৈতেতি। সংপ্রত্যনন্তরব্রাহ্মণস্য বিষয়ং দর্শয়তি-যস্তিতি। মাধ্যমিকানামন্যেষাং চাদ্যো বিবাদঃ কিংলক্ষণঃ-দেহাদীনামন্যতমস্তেভ্যো বিলক্ষণো বেতি যাবৎ। ইত্যেবং বিমৃশ্যাত্মনো দেহাদিভ্যো বিবেকনাধিগমায়েদং ব্রাহ্মণমিত্যাহ-ইত্যাত্মন ইতি। বিবেকাধি- গমস্য ভেদজ্ঞানত্বেনানর্থকরত্বমাশঙ্ক্য কহোলপ্রশ্নতাৎপর্য্যং সংগৃহ্লাতি-তস্য চেতি। ব্রাহ্মণ- সংবন্ধমুক্ত। আখ্যায়িকাসংবদ্ধমাহ-আখ্যায়িকেতি। বিদ্যাত্তত্যর্থা সুখাববোধার্থা চাখ্যায়ি- কেত্যর্থঃ।
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—‘অতঃপর উষস্তনামক চাক্রায়ণ(চক্র-নামক ঋষির পুত্র) উক্ত যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন’ ইত্যাদি। পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, পুণ্য ও পাপদ্বারা পরিচালিত জীবগণ গ্রহ ও অতিগ্রহ দ্বারা বশীভূত হইয়া গ্রহ ও অতিগ্রহসমূহকে বারংবার পর্যায়ক্রমে ত্যাগ ও গ্রহণ করত সংসারভোগ করিয়া থাকে; এবং পুণ্যকর্ম্মের সর্ব্বোৎকৃষ্ট ফল নির্দেশ করা হইয়াছে যে, ব্যক্তভাবাপন্ন সমষ্টি ও ব্যষ্টিরূপ দ্বৈত জগতের সহিত একত্ব প্রাপ্তি। এখন জিজ্ঞাসা হইতেছে যে, যাহা গ্রহ ও অতিগ্রহ দ্বারা আক্রান্ত হইয়া সংসারে প্রবেশ করে; প্রকৃত পক্ষে সেরূপ কোনও পদার্থ(স্থায়ী আত্মা) আছে কিনা? যদি থাকে, তাহা হইলেই বা তাহার লক্ষণ ও স্বরূপ কিরূপ?—এই প্রকারে আত্মার যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করিবার জন্য উষস্ত-প্রশ্ন আরব্ধ হইতেছে; কেন না, স্বভাবতঃ ক্রিয়াকারকাদি-বিনির্ম্মুক্ত সর্ব্বোপাধিবিবর্জ্জিত সেই আত্মতত্ত্বের উপলব্ধি হইলে, পূর্ব্বোক্ত গ্রহাতিগ্রহস্বরূপ বন্ধন ও তাহার প্রবর্ত্তক কর্ম্মাধিকার
৭৯৯
হইতে অনায়াসেই জীবের বিমুক্তি হইতে পারে। আখ্যায়িকার সহিত বিদ্যার যে, কি প্রকার সম্বন্ধ বা উপযোগিতা, তাহা প্রসিদ্ধই আছে, অর্থাৎ বিদ্যাস্তুতি প্রভৃতি যে সমস্ত উদ্দেশ্য পূর্ব্বে বর্ণিত হইয়াছে; এই আখ্যায়িকার উদ্দেশ্যও তাহাই—অন্যরূপ নহে।
অথ হৈনমুষস্তশ্চাক্রায়ণঃ পপ্রচ্ছ, যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাদ ব্রহ্ম য আত্মা সর্বান্তরস্তং মে ব্যাচক্ষেতি, এষ ত আত্মা সর্বান্তরঃ, কতমো যাজ্ঞবল্ক্য সর্বান্তরো যঃ প্রাণেন প্রাণিতি স ত আত্মা সর্বান্তরো যোহপানেনাপানীতি সত আত্মা সর্বান্তরো যো ব্যানেন ব্যানীতি স ত আত্মা সর্বান্তরো য উদানেনোদানিতি স ত আত্মা সর্বান্তর এষ ত আত্মা সর্বান্তরঃ ॥ ১৬৮ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।—[যঃ খলু যথোক্তেন গ্রহাতিগ্রহলক্ষণেন মৃত্যুনা গৃহীতঃ স্যাৎ, স এব আত্মা অস্তি নাস্তি বা ইতি সংশয়ে, তন্নিরূপণায় অয়মুষস্তপ্রশ্নঃ—অথ হৈনমিত্যাদিঃ।]
অথ(ভুজ্যবিরামানন্তরম্) উষস্তঃ(তন্নামকঃ) চাক্রায়ণঃ(চক্রস্য পুত্রঃ) এনং(যাজ্ঞবল্ক্যং) পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্); হে যাজ্ঞবল্ক্য,-ইতি[সম্বোধয়ন্] উবাচ (উক্তবান)-যৎ সাক্ষাৎ অপরোক্ষাৎ(অপরোক্ষং-প্রত্যক্ষচৈতন্যাত্মকং) ব্রহ্ম, যঃ[চ] সর্ব্বান্তরঃ(সর্বেষাম্ অভ্যন্তরস্থঃ) আত্মা, তং(আত্মানং) মে(মহ্যং) ব্যাচক্ষ(বিস্পষ্টং বর্ণয়),[যেনাহং সুখেন গ্রহীতুং শত্রুয়ামিতি ভাবঃ] ইতি। [যাজ্ঞবল্ক্য আহ-][হে উষস্ত,] এষঃ(ময়া নিৰ্দ্দিশ্যমানঃ) সর্ব্বান্তরঃ (পঞ্চভ্যঃ কোশেভ্যঃ পরঃ) তে(তব-দেহেন্দ্রিয়াদিসংঘাতাত্মনঃ) আত্মা। [উষস্তঃ পুনঃ পপ্রচ্ছ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, কতমঃ সঃ সর্ব্বান্তরঃ?(স্কুল- সূক্ষ্মদেহদ্বয়-চিদাত্মসু মধ্যে ত্বদুপদিষ্ট আত্মা কঃ?)[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] যঃ প্রাণেন(মুখনাসিকাসংচারিণা) প্রাণিতি(প্রাণনব্যাপারং সম্পাদয়তি- বিজ্ঞানাত্মা), সঃ তে(তব) সর্ব্বান্তরঃ আত্মা; যঃ অপানেন(পায়ুপ্রভৃতি- স্থানবর্তিনা) অপানীতি(অপান-ব্যাপারং করোতি), সঃ(বিজ্ঞানময়ঃ) তে(তব) সর্ব্বান্তরঃ আত্মা; যঃ ব্যানেন(দেহব্যাপিনা বায়ুনা) ব্যানীতি (দেহব্যাপিনীৎ চেষ্টাং করোতি), সঃ(বিজ্ঞানাত্মা) তে সর্ব্বান্তরঃ আত্মা;
চার্য্য(জ্ঞানাত্মকঃ) উদানেন(ঊর্দ্ধগামিনা উৎক্রমণবায়ুনা) উদানিতি (উৎক্রমণব্যাপারং করোতি), সঃ(বিজ্ঞানময়ঃ) তে সর্ব্বান্তরঃ আত্মা, ‘এষঃ তে আত্মা সর্ব্বান্তরঃ’ ইতি(উক্তোপসংহারঃ স্ববচোদার্ঢ্যায় ইতি ভাবঃ।)[‘অপা- নীতি’ ইতি ‘ব্যানীতি’ ইতি চ দীর্ঘশ্ছান্দসঃ] ॥ ১৬৮ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ:-গ্রহাতিগ্রহরূপী মৃত্যুকর্তৃক আক্রান্ত হইয়া সংসারে আবদ্ধ থাকিবার উপযুক্ত কেহ আছে কি না, তাহা নিরূপণের জন্য “অথ হৈনম্” ইত্যাদি শ্রুতি আরব্ধ হইতেছে। ভুজ্য ঋষি প্রশ্ন হইতে বিরত হইলে পর, চক্রপুত্র(চাক্রায়ণ) উষস্তনামক ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের নিকট প্রশ্ন করিলেন; তিনি সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন- হে যাজ্ঞবল্ক্য, যিনি সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ চৈতন্যাত্মক ব্রহ্ম, যিনি সর্বান্তর সর্বদেহের অভ্যন্তরস্থ আত্মা, তাঁহার স্বরূপ আমার নিকট ব্যাখ্যা কর। [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] ইনিই তোমার সর্বান্তর আত্মা।[উষস্ত জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, সেইটি কে-তাহার প্রকৃত স্বরূপ কি?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] যিনি(বুদ্ধি-সাক্ষী বিজ্ঞানাত্মা) প্রাণের দ্বারা প্রাণন করেন অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাসাদি কার্য্য করেন, তিনিই এই দেহেন্দ্রিয়-সমষ্টিভূত তোমার সর্বান্তর আত্মা; যিনি অপানবায়ুর সাহায্যে অপান-ব্যাপার নির্বাহ করিয়া থাকেন, তিনিই(বিজ্ঞানাত্মাই) তোমার সর্বান্তর আত্মা; যিনি ব্যানবায়ু দ্বারা দেহব্যাপী ব্যাপার করিয়া থাকেন, তিনিই তোমার সর্বান্তর আত্মা; যিনি উদানবায়ু দ্বারা উদান -উৎক্রমণাদি ব্যাপার করিয়া থাকেন, তিনিই তোমার সর্বান্তর আত্মা; এই বিজ্ঞানাত্মাই তোমার সর্বান্তর আত্মা ॥ ১৬৮ ॥ ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ হ এনং প্রকৃতং যাজ্ঞবল্ক্যম্ উষস্তো নামতশ্চক্র- স্যাপত্যং চাক্রায়ণঃ পপ্রচ্ছ,—যদ্ ব্রহ্ম সাক্ষাদব্যবহিতং কেনচিদ্ দ্রষ্টুরপরোক্ষাদ- গৌণম্, ন শ্রোত্রব্রহ্মাদিবৎ। কিং তৎ? য আত্মা—আত্মশব্দেন প্রত্যগাত্মোচ্যতে, তত্রাত্মশব্দস্য প্রসিদ্ধত্বাৎ; সর্ব্বস্যাভ্যন্তরঃ সর্ব্বান্তরঃ; যদ্-যঃ-শব্দাভ্যাং প্রসিদ্ধ আত্মা ব্রহ্মেতি, তমাত্মানং মে মহ্যং ব্যাচক্ষেতি—বিস্পষ্টম্—শৃঙ্গে গৃহীত্বা যথা গাং শেষয়তি, তথা আচক্ষ—সোহয়মিত্যেবং কথয়স্বেত্যর্থঃ। ১
এবমুক্তঃ প্রত্যাহ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—এষ তে তব আত্মা সর্ব্বান্তরঃ সর্ব্বস্যাভ্যন্তরঃ;